Nandita Pal

Classics Inspirational Romance


4.9  

Nandita Pal

Classics Inspirational Romance


দূরভাষী

দূরভাষী

3 mins 489 3 mins 489

মোবাইলের রিংটোনের শব্দে ঘুমটা ভাঙল তনুজার। রাত্রি তিনটে পনেরোয় চৈতির ফোন! ঘুমচোখে রিসিভ করল, “কী রে! এত রাতে ফোন কেন?” বিপরীতে ভেসে আসা কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য ওর পায়ের তলার মাটিটা যেন সরে গেল!”


চৈতির করোনা ভাইরাস সাস্পেক্টেড, ওকে আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে। কলেজের সাঁতারের ইভেন্টে ইতালির যে গ্রূপটা ছিল তাদের মধ্যে একজনের পসিটিভ। টেলিফোনে ওপাশ থেকে একজন বিদেশি ভারী গলায় বললেন, চিন্তা না করতে আর সেন্টার থেকে তনুজাকে দিনে দুবার জানানো হবে চৈতির শরীরের অবস্থা।


ফোনটা রেখে ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়ল তনুজা। মাথা টলছে যেন, কি করবে এখন, বুক ফেঁটে কান্না আসছে, চৈতিকে আবার দেখতে পাবে তো!! এতরাতে কাকে ও ফোন করবে,কিছু মাথায় আসছে না। চৈতি এবছর আমেরিকাতে পার্দু ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে যাবার পর ফ্ল্যাটে তনুজা একদম একা, পুরো অন্ধকার ফ্ল্যাটটা যেন ওকে গিলতে চাইছে। কলকাতায় মা আর দাদাকে ফোন করবে, না অফিসের কাউকে, অনেক ভেবে তৃষাকেই ফোন করলো। বোম্বেতে দীঘ্রদিনের বন্ধু তৃষা, একসাথে চাকরী করতো একসময়। সব শুনে তৃষা বললো পরদিন সকালে তনুজা কে নিয়ে ওর দাদার বাড়ি যাবে দাদারে,যে দাদা যশলোক হসপিটালের ডাক্তার।


তনুজা ঠায় বসে সোফায়, বারবার চোখ যাচ্ছে ঐ ছবিটায়, চৈতি ওর গলা জড়িয়ে আছে। একা মানুষ করেছে তনুজা মেয়েকে। মেয়ে যখন তিনবছর, চপলের সাথে ছাড়াছাড়ি। আর পারছিলো না তনুজা চপলের জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে, প্রতিদিন তর্কাতর্কি আর অশান্তি বাড়ি ফিরে, আর ছোট্ট চৈতি ভয়ে কেমন সিঁটিয়ে থাকতো। এই চাকরিটার ভরসায় একদিন ঘর ছেড়ে ভাসিতে একটা ফ্লাট ভাড়া নিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল। যুদ্ধটা ভীষণ কঠিন ছিল প্রথমে, কিন্তু ধীরে ধীরে তনুজা দেখলো মেয়ে যেন ফুলের মতো

ফুটে উঠছে। পড়াশুনায় খুব ভালো চৈতি, কিন্তু ওর সাহস বাড়ালো সাঁতারে। একবার একটি বাচ্চাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচায় চৈতি, সেবার সাহসী মেয়ের পুরস্কার ও পেয়েছিলো। যেদিকে তাকায় তনুজা, সবখানে চৈতির স্মৃতি। যত ব্যস্তই থাকতো দুজনে সারাদিন, মা মেয়ের গল্প শোবার পর যেন আর ফুরাতোই না। ছোটবেলায় এমন ও হয়েছে তনুজা ঝিন্দের বন্দী গল্প বলতে বলতে কখন যেন পরদিন চায়নার মাকে কি রান্না করতে বলবে ঘুমচোখে তাই বলে যেত। চৈতি পরদিন সেগুলো বলতো আর খিলখিল হাসতো। বড় হবার পর চৈতিও মাঝেমাঝে গল্প বলতো। চৈতির স্বপ্ন ও একদিন ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার কেটে পার হবে, সেই নিয়ে কত্ত গল্প। মা আর মেয়ে সেই কথাগুলো নিয়ে স্বপ্নের দেশে আকাশ ছুঁতো।


সকাল হতেই তৃষার সাথে সোজা ওর দাদার বাড়ি। তৃষার দাদা সব বোঝালেন, চোদ্দদিন চৈতিকে কিভাবে রাখবে সেন্টারে আর সারাক্ষন ডাক্তাররা থাকবে সেন্টারে। আর বেশি চিন্তা করতে না করলেন। ওনাকে চৈতির আপডেট গুলোও জানিয়ে রাখতে বললেন। মনটা একটু শক্ত হলো তনুজার। অফিসে গিয়ে ট্রাভেল ডেস্কে ভিসার কথা জিজ্ঞেস করতে বুঝলো ভিসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব, তবু একটা দরখাস্ত দিয়ে রাখলো পরদিন।


প্রতিদিন দু তিনবার আপডেট দিচ্ছে চৈতির সেন্টার থেকে। জ্বর ছিল চৈতির, মাঝে একদিন ICU তেও রাখতে হয়েছিল। এই চোদ্দোদিন তনুজার মনে হয়েছে চৈতি যেন ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কাটছে। একুশ মাইল প্রচণ্ড ঠান্ডা জলে, কখনো ঝড় উঠছে, কতরকম জীব চারপাশে চৈতির। বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে ওর গায়ে যখন দূরে জাহাজগুলো যাচ্ছে। চৈতি যেন আর পারছে না,ডুবে যাচ্ছে মনে হয়, তনুজা ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠেছে কদিন..'মা তুই পারবি' বলে। একরাতে তনুজা দেখে বিশাল একটা শার্ক যেন চৈতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, তনুজা ভয়ে কাঁটা, দরদর করে ঘামছে, ঠিক তখন মোবাইলে আপডেট আসে যে চৈতি ভালো আছে, ওর করোনা টেস্ট নেগেটিভ। তনুজার চোখে জল, ওর যেন মনে হলো চৈতি ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যেন সগর্বে উঠে আসছে, আর তনুজা তীরে দুহাত বাড়িয়ে মেয়ের জন্যে।


Rate this content
Log in