ডাকিনী
ডাকিনী
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা পুরনো শিমুলগাছ ছিল।
সন্ধ্যার পর সেই রাস্তা দিয়ে কেউ যেত না।
লোকমুখে শোনা যেত, সেখানে নাকি এক ডাকিনী থাকে।
কেউ বলত, সে রাতের অন্ধকারে পথিককে ডাকে।
কেউ বলত, তার চোখের দিকে তাকালে মানুষ নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যায়।
কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ হরিপদ এসব গল্প বিশ্বাস করতেন না।
এক বর্ষার রাতে তাঁর নাতনি মেঘলা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল।
অনেক খোঁজার পর দেখা গেল, সে শিমুলগাছের কাছে বসে আছে।
হরিপদ ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
— “এখানে এসেছিলি কেন?”
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,
— “ও আমাকে ডেকেছিল।”
— “কে?”
মেঘলা গাছটার দিকে তাকাল।
— “ওই মহিলা।”
গাছের তলায় সত্যিই একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সাদা শাড়ি। এলোমেলো চুল। হাতে একটা প্রদীপ।
গ্রামের লোকজন দূর থেকে চিৎকার করে উঠল—
“ডাকিনী!”
কিন্তু বৃদ্ধা পালালেন না।
শুধু বললেন,
— “তোমরা আমাকে ডাকিনী বলো কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বললেন,
— “বহু বছর আগে এই গ্রামে এক বিধবা মেয়েকে সবাই অপয়া বলেছিল। তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সে এই গাছটার নিচেই আশ্রয় নিয়েছিল।”
হরিপদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
কারণ তিনি সেই মেয়েটিকে চিনতেন।
অনেক বছর আগে তিনিও তাকে অপয়া বলেছিলেন।
বৃদ্ধা এবার মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললেন—
— “আমি কাউকে ভয় দেখাই না। যারা ভয় পায়, তারা নিজেরাই আমাকে ভয়ঙ্কর বানিয়েছে।”
পরদিন সকালে শিমুলগাছের নিচে আর কাউকে পাওয়া গেল না।
শুধু একটি পুরনো প্রদীপ পড়ে ছিল।
আর তার পাশে মাটিতে লেখা—
“সব ডাকিনী ডাইনি নয়।
কিছু মানুষকে সমাজই ডাকিনী বানিয়ে দেয়।”
সেদিনের পর থেকে গ্রামের লোকেরা আর সেই গাছটাকে ভয় পায়নি।
তবে হরিপদ প্রায়ই সেখানে গিয়ে বসতেন।
হয়তো ক্ষমা চাইতে।
নাকি নিজের পুরনো ভয়টার মুখোমুখি হতে—
সেটা তিনি নিজেও জানতেন না।
