সন্ধিপুজো
সন্ধিপুজো
অষ্টমীর রাত শেষ হয়ে আসছে।
পাড়ার পুরনো বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা। চারদিকে প্রদীপ, ধূপের গন্ধ, ঢাকের মৃদু আওয়াজ। সন্ধিপুজোর প্রস্তুতি চলছে।
বারো বছরের অয়ন ঠাকুরদালানের এক কোণে বসে ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
— “ঠাকুরদা, সন্ধিপুজো মানে কী?”
ঠাকুরদা একটু হেসে বললেন,
— “সন্ধি মানে জানিস?”
— “দু’টো জিনিসের মাঝখান?”
— “ঠিক তাই। একটা সময় শেষ হচ্ছে, আর একটা সময় শুরু হচ্ছে—এই মাঝের মুহূর্তটাই সন্ধি।”
অয়ন চুপ করে রইল।
ঠাকুরদা ধীরে বললেন,
— “জীবনেও এমন অনেক সন্ধি আসে। যেখানে পুরনো অভ্যাসকে ছেড়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”
ঠিক তখনই ঢাকের শব্দ বদলে গেল।
পুরোহিত মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। চারদিকে প্রদীপের আলো। অয়ন দেখল, তার বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকদিন ধরে বাবা আর কাকার মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে মনোমালিন্য চলছে। দু’জনের মুখে কথা নেই।
অয়ন বাবার কাছে গিয়ে আস্তে করে বলল,
— “বাবা, আজ তো সন্ধিপুজো।”
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
— “তার মানে?”
অয়ন বলল,
— “ঠাকুরদা বললেন, সন্ধি মানে পুরনোটা শেষ করে নতুন কিছু শুরু করা।”
বাবা কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে ধীরে কাকার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
দু’জনের চোখাচোখি হলো।
কোনও বড় কথা হলো না।
কোনও অভিযোগও নয়।
শুধু বাবা হাত বাড়িয়ে দিলেন।
কাকা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেই হাত ধরে ফেললেন।
ঠিক তখনই সন্ধিপুজোর ঘণ্টা বেজে উঠল।
অয়ন বুঝতে পারল না—
সেদিন দেবীর আরাধনা হয়েছিল ঠাকুরদালানে, নাকি মানুষের হৃদয়ে।
রাত আরও গভীর হলো।
কিন্তু একটি পুরনো অভিমান সেদিন সত্যিই শেষ হয়েছিল।
আর একটি নতুন সম্পর্কের শুরু হয়েছিল—
একটি ছোট্ট সন্ধিক্ষণে।
