STORYMIRROR

Sourav Nath

Classics

4  

Sourav Nath

Classics

চশমা

চশমা

11 mins
7

সময়টা ছিল দিনের অন্তিম ক্ষণ।  সূর্যাস্ত হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই।  তবুও মেঘের গায়ে লালচে রোদ্দুর তখনও পর্যন্ত আকাশের গায়ে শেষ আলিঙ্গনে লিপ্ত হয়ে আছে।  বিদায় বেলায় ছেড়ে যেতে মন চায় না।  অন্ধকারের আলিঙ্গন বড়ই নিষ্ঠুর।  মনে হয় অন্ধকারই নিত্য, আলো অনিত্য।  অখ্যাত এক নদীর ধারে মস্ত বড় বট গাছ আষ্টেপৃষ্ঠে মাটি আঁকড়ে সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে আছে।  তার মাথায় হাজার হাজার পাখির সংসারের বোঝা ।  সন্ধ্যের কালচে অন্ধকারের কালিমা নদীর জলকে কালো করে তুলেছে।  বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি নামছি নামছি করেও নামছে না।  রোদ বৃষ্টির লুকোচুরি খেলায় সারাদিনের মেঘলা আকাশে ভ্যাপসা গরমে গলদঘর্ম হতে হতে নাক থেকে বার বার চশমাটা খসে নাকের ডগা পর্যন্ত চলে আসছে কেদার বাবুর।  নিত্য দিনের অফিসের একই কাজ, কিন্তু কোনদিনই কাজের শেষ নেই তাঁর।  ছত্রিশ বছরের চাকরী জীবনের আর কয়েকটি মাস মাত্র বাকী।  এই ছত্রিশ বছরে একটিও দিন নেই যেদিন, তাঁর মনে হয়েছে যে তিনি তাঁর কাজ শেষ করতে পেরেছেন।  তবুও তিনি কর্মঠ মানুষ।  এই ছত্রিশ বছরে বহু প্রশংসা তিনি কুড়িয়েছেন তাঁর সততা ও কর্ম দক্ষতার জন্য। 


হাতের আস্তিনটা গুটিয়ে কনুইয়ের ডগা পর্যন্ত তুলে ধরে বাঁ হাতের কব্জিতে ঝুলে থাকা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলেন ছটা বেজে বত্রিশ মিনিট হয়েছে।  এক সময় ধবধবে সাদা ডায়ালের ঘড়িটা এখন কিছুটা পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করলেও, তার সময় জ্ঞান কিন্তু সেই একই রকম রয়ে গেছে।  কলেজে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার পরে তাঁর বাবা তাঁকে এই হাত ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন।  কেদার বাবু তাঁর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।  আজ আর বেশী দেরী করা বোধ হয় ঠিক হবে না।  একটু পরেই বৃষ্টি নামবে বোধ হয়।  আকাশে মেঘের ফাঁক থেকে বিদ্যুতের চোখ রাঙ্গানি মাঝে মধ্যেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে।  আর বেশী দেরী হলে বাড়ি ফেরার জন্য যান বাহন কিছুই পাওয়া যাবে না। 


রাস্তায় বেরিয়ে দেখলেন, সত্যিই যান বাহন কিছুই নেই।  ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।  বেশ বড় বড় ফোঁটা পড়ছে।  আজ বোধ হয় পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হবে।  কেদার বাবু তাঁর চামড়ার ব্যাগের ভেতর থেকে ফল্ডিং ছাতাটা বের করলেন।  ছাতা খুলতে খুলতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কালো মেঘের ভারে আকাশের বুক ভারী হয় আছে।  কেদার বাবু ছাতা খুলে নদীর ধারের রাস্তা ধরলেন।  ফাঁকা গ্রাম্য রাস্তার পিচ ওঠা এবড়ো খেবড়ো ছোট খাটো গাড্ডা ইতিমধ্যেই জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।  কেদার বাবু ভাবলেন, আজকে চামড়ার জুতোটা পড়ে এসে তিনি খুব ভুল করেছেন।  তবুও অগত্যা তিনি অন্ধকার পথে খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়েই বাড়ির দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।  পায়ে হেঁটে গেলে প্রায় এক ঘণ্টার পথ।  এই দুর্যোগের রাতে হয়তো ঘণ্টা দুয়েক লেগে যেতে পারে।  নদীর ধারে লাইট হাউসের পাশে চৌকিদার বিহারী-লালের কুঁড়ে ঘর।  অন্যান্য দিনে ঘরের সামনে খাটিয়া পেতে বসে বিড়ি টানে।  রাত্রি আটটার পরে তার ডিউটি শুরু হয়।  এখন বোধ হয় ঘুমোচ্ছে।  প্রতিদিনই বিহারী-লালের সাথে দেখা হয় কেদার বাবুর।  তাই তিনি একবার অভ্যাস বশতই ঘাড় ঘুরিয়ে কুঁড়ে ঘরটির দিকে তাকালেন, তারপর আবার চলতে শুরু করলেন।  প্রতিদিনের পরিচিত রাস্তা আজ দুর্যোগের রাতে নিতান্ত অপরিচিতের মতই লাগছে। 


বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেলেন কেদার বাবু।  মনে মনে ভাবতে লাগলেন তাঁর  রোজনামচার কথা।  তবে আজ বোধ হয় কেদার বাবু তাঁর রোজনামচার বাঁধা গতের বাইরে গিয়ে কিছু কাজ করেছেন।  আজ এক বিশেষ কাজের ভার কেদার-বাবুর কাঁধে পরেছিল।  সেই বিশেষ কাজের কথা মনে আসতেই কেদার বাবুর মনে হল শিবুদার কথা।  শিবু দা হল কেদার-বাবুর অফিসের অধস্তন এক অস্থায়ী কর্মচারী।  বয়স প্রায় পঞ্চান্নর কাছাকাছি হবে।  শিবুদার অভাবী চেহারায় যেন তার সারাটা জীবনের চাওয়া ও না পাওয়ার হিসেবের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান লেখা রয়েছে। 


বড় মায়া হয় চেহারাখানি দেখলে।  জানিনা কেন, কেদার-বাবুর বেশ ভালো লাগে লোকটাকে।  মানুষের মনে বোধ হয় অদৃশ্য এক বাঁধন থাকে – সেই কারণেই বোধ হয় অন্যের ভালো লাগা অপরজন ঠিক বুঝতে পেরে যায় যার জন্য আর আলাদা কোনও অভিব্যক্তির প্রয়োজন হয় না।


শিবুদাও বোধ হয় বোঝে কেদার-বাবুর সেই ভালোলাগার কথা।  মাঝে মাঝে কেদার-বাবু না চাইতেই দুকাপ করে চা দিয়ে যায় শিবুদা।  মানুষ কি শুধু টাকা পয়সা চায়!  সম্মানের চাহিদা বোধ হয় টাকা পয়সার থেকে আরও অনেক গুণে বড়। 


খুব একটা বেশীদিন হয়নি কেদার-বাবু এখানে বদলি হয়ে এসেছেন।  সকলের সাথে খুব একটা বেশী পরিচয়ও নেই।  অপরিচিত মানুষদের সাথে কাজ করার একটা বেশ সুবিধা তিনি বোধ করেন।  কিভাবে যে বিষয়টা কে বর্ণনা করা যায় – হ্যাঁ, এই মনে করুণ নতুন একটা বই আপনি পড়বার জন্য আপনি হাতে নিয়েছেন, বইয়ের কভারটা বেশ শক্তপোক্ত আর ভালো, উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভিতরের পাতার বা বইটার বিষয় বস্তুর গুণমান কেমন।  উপরের শক্ত মলাট উলটে যত পড়তে থাকবেন ততই বইটির বস্তুগত আর বিষয়গত গুণমান আপনার কাছে ধরা পড়বে।  আমার মনে হয় আপনার সামনে যদি একটি জলজ্যান্ত অপরিচিত মানুষ থাকে যার সাথে আপনাকে জীবনের বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করতে হবে, তাকেও জানার জন্য পড়তে হয়, তার অনুভূতি অনুভব করতে হয়।   আর অনুভূতি যে কেবল ভাষায় বর্ণনা করা যায়, এমনটা নয়।  ভাষা তো মানুষ নিজের সুবিধা মত করে সাজিয়ে সকলের সামনে প্রস্তুত করে।  কিন্তু অনুভূতি হল অকৃত্রিম।


বলা-বাহুল্য যাদের অনুভূতি কেদার-বাবুকে বেশ কিছুদিন ধরে স্পর্শ করেছে তাদের মধ্যে বিশেষ কয়েকজনকে যদি বাদ দেওয়া যায় শিবুদা হল অন্যতম একজন মানুষ।  আসলে শিবুদা এমন বিশেষ কিছুই করেনি যার ফলে কেদার-বাবু অভিভূত হয়েছেন, কিন্তু শিবুদা যেন কেদার-বাবুকে একটু অন্যরকম ভাবেই নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে।


আজ অফিসে সাফাই কর্মচারীদের জন্য বিশেষ এক স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল।  বলা বাহুল্য সমস্ত আয়োজনের ভারটা পড়ল কেদার-বাবুর উপর।  মনে মনে বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছিলেন কেদার-বাবু।  কেদার-বাবু বেশ খুশিতে গদগদ হয়ে মনে মনে ভাবলেন আজ তিনি সমাজের জন্য বিশেষ কিছু একটা করতে চলেছেন।  সেই মত আয়োজনও করলেন বেশ জোর কদমে।  আয়োজন এতটাই ব্যাপক হল যে স্বাস্থ্য শিবির শুধুমাত্র সাফাই কর্মচারীদের ঊর্ধ্বে উঠে অফিসের সর্বসাধারণের জন্য হয়ে উঠল।  সময় যত অগ্রসর হতে লাগল কেদার বাবু যেন সকলের চোখের দৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে নিজের প্রশংসা খুঁজে বেড়াতে লাগলেন, হাজার হোক সবই যখন তাঁরই পরিচালনায় হচ্ছে তখন তাঁর প্রশংসা হবে নাই বা কেন।  সারাজীবন তিনি কতই না ভালো ভালো কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।  আজ না হয় তাদেরই সাথে নতুন একটা প্রশংসার সংজোজন হল।  কেদার বাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সব আয়োজনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।  পান থেকে চুন খসা তাঁর একদম পছন্দ নয়।   


আয়োজন যখন বেশ মধ্য গগণে এসে পৌঁছল, তখন কেদার-বাবু লক্ষ্য করলেন যে শিবুদা তার পরিবারকে সাথে এনে স্বাস্থ্য শিবিরে অপেক্ষারত।  অনেক মানুষের সমাগমে বেশ ভিড় হয়েছে।  তবুও শিবুদা ঠিক খুঁজে খুঁজে কেদার-বাবুকে দেখে ব্যস্ত হয়ে কোথা থেকে ছুটে এসে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী আর মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।  শিবুদা বেশ আনুগত্যের সাথে কেদার বাবুকে বলল, ‘স্যার, এই হল আমার স্ত্রী আর এই হল আমার একমাত্র মেয়ে।“  শিবুদার স্ত্রী কেদার বাবুর দিকে হাত জোর করে প্রণাম করল।   ঘটনার আকস্মিকতায় কেদার-বাবু কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লেও আনুষ্ঠানিক হাত জোর করে প্রণাম জানিয়ে আবার অন্যত্র কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।  আসলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বললে ভুল হবে, যেন ব্যস্ত হওয়ার অভিনয় করতে থাকলেন। 


কেদার-বাবু লক্ষ্য করলেন শিবুদার মধ্যেও যেন বেশ একটা আত্মতুষ্টি আজ কাজ করছে।  আর যাই হোক, এত বড় একটা অফিসের সাফাই কর্মচারী, হোক না অস্থায়ী কর্মী, অফিসটা তো বেশ বড়।  তার উপর অফিসের ঝকঝকে রিসেপশনে আজ অন্যরকম ব্যস্ততা।  পরনের পোশাক মলিন হলেও মুখে একরাশ তৃপ্তির হাসি নিয়ে নিজের ছোট্ট পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এত বড় অফিসে যে কত দায়িত্ব সে পালন করে সেটা যেন আজ পরোক্ষ ভাবে তার স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিতে চায়। 


এমনিতেই তো বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা।  স্ত্রীর ভালোবাসার পাশাপাশি অভাব জিনিসটা বড়ই বেমানান, এই দুয়ের সহাবস্থান বোধ হয় কেবল গল্প বা উপন্যাসেই সম্ভব হয়।  শিবুদার জীবনটা তো আর গল্প নয় ; এ যেন অভাবের বাস্তব চলচ্চিত্র যার নায়ক শিবুদা হলেও নায়িকা অভাবের তাড়নায় যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। নায়িকার চোখে শুধু এক রাশ চাওয়া ও না পাওয়ার হিসেবের খতিয়ান যেন কেদার বাবু স্পষ্ট লক্ষ্য করলেন।


তবে আজ কিন্তু শিবুদার নিজেকে যেন একটু অন্যরকম বলে মনে হল।  তার স্ত্রীকে সে আজ পরোক্ষে ভাবে বুঝিয়ে দিতে চায় যে, এই অফিসে তার গুরুত্ব ঠিক কতটা গুরুত্ব পূর্ণ।  এই যে এত বড় ঝাঁ চকচকে অফিস – একে চকচকে রাখা কি আর চাট্টিখানি কথা!  দিনরাত কত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করলে তবে না এত চকচকে রাখা যায়!  সেটাকি তার স্ত্রী বুঝতে পারছে না!  তার স্ত্রী কি বুঝতে পারছে না আসলে যে লোকটাকে সে জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিক ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না, তারও একটা বিশেষ গুরুত্ব এই সমাজে আছে।  আজ যেন শিবুদার মনের অবদমিত বেদনা আর হাহাকার সকলকে বুক ফাটা আর্তনাদ করে বলতে চায় – আমি যে একেবারেই ব্রাত্য নই! আমারও এই পৃথিবীতে কিছুমাত্র অস্তিত্ব আছে, আমারও কিছু স্বপ্ন আছে, আছে কিছু চাওয়া ও না পাওয়ার গল্প,  আছে কিছু অভাব ও অভিযোগের ভাষা – হয়তো সে ভাষা সারা জীবনই রয়ে যাবে মুক হয়ে এ বধির অন্তরে।


মানুষ হয়তো নিজেকে খুশি করবার থেকে অন্য কাউকে খুশী করতেই বেশী ভালবাসে।  আর তার ফলে যদি অন্য ব্যক্তিটির মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতে পাওয়া যায়, তাহলে তো আর কোনও কথাই নেই।  নিজের প্রশংসা অন্যের মুখে শুনতে কে না ভালোবাসে, তার উপর যদি সেই ব্যক্তি তার নিজের স্ত্রী হয়, তার থেকে বড় পুরষ্কার ইহজগতে আর বোধ হয় আর কিছুই নেই। 


কেদার-বাবু আর বেশী বাক্যব্যয় না করে অবিলম্বে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে ভিড় থেকে একটু দূরে গিয়ে সমস্ত ব্যাপারটাকে বেশ আবেগ গদগদ চোকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।  বলা-বাহুল্য তাঁরও মনে হল যদি সমস্ত ব্যাপারটা তাঁর স্ত্রীর চোখের সামনে ঘটত, তাহলে হয়তো তাঁর প্রতি তাঁর স্ত্রীর যে বদ্ধমূল ধারণা যে কেদার বাবু একটি অকর্মণ্য ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই নন, সে ধারণার বোধ হয় আজ অবসান করা যেতে পারত।  কেদার বাবুর মনে আরও কি সব হাবিজাবি ভাবনা এসে ভর করতে থাকল। ভাবনার কি আর শেষ আছে!  একের পর এক ভাবনা পরস্পর সাজানো থাকে।  কষ্ট করে ভাববার প্রয়োজন হয় না।  কেদার বাবুর মনে হয়, কিছু না ভেবে থাকাটাই হল কঠিন এক কাজ।  একেই বোধ হয় সাধনা বলে, যেখানে ভাবনার শেষ হয়, সেখান থেকেই বোধ হয় সাধনার শুরু হয়।  সাধনা কথাটা মনে আসতেই কেদার বাবুর মনে পড়ল তাঁর স্ত্রীর কথা।  তাঁর স্ত্রীর নাম সাধনা।


 স্ত্রীর কথা ভাবতে শুরু করলে কেদার বাবু আর নিজের মনকে অন্য দিকে চালিত করতে পারেন না।  একের পর এক ঘটনা তাঁর মনে ছায়াছবির মত ভেসে উঠতে থাকে।


কেদার বাবু লক্ষ্য করলেন, শিবুদা তার ছোট্ট পরিবারকে নিয়ে অপেক্ষারত লাইনের একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বেশ তৃপ্তির হাসি নিয়ে চোখের দৃষ্টি পরীক্ষার মেশিনটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।  কেদার-বাবু বুঝলেন, শিবুদার বোধ হয় মনে মনে চোখের দৃষ্টি পরীক্ষার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছে। 


শিবুদা বেশ কিছুদিন ধরে অনুভব করছে, বহু বছরের জমে থাকা ধুলোবালি আর বয়সের ভারে তার চোখের দৃষ্টি আজকাল কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে আসে।  যেন চেনা মানুষগুলোকেও কেমন অচেনা লাগে মাঝে মাঝে।  যদিও তা নিয়ে কখনই তার কোনও অভিযোগ ছিল না।  একটু কম দেখলেও চোখের পলকটা একটু ছোট করে নিলে দিব্য দেখা যায়।  তবে আজ যখন শিবুদা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষায় পারদর্শী মেশিনের সম্মুখীন হয়েছে, তখন একবার চোখটা পরীক্ষা করে নিলে ক্ষতিই বা কি!  আর যাই হোক দেখাতে গিয়ে পকেট থেকে টাকা খরচ তো করতে হচ্ছে না।


কেদার-বাবু লক্ষ করলেন, শিবুদা বেশ খুশিতে গদ গদ হয়ে মেশিনটার সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে মেশিনটা পর্যবেক্ষণ করে ডাক্তারের আদেশ মত তার থুননীটাকে মেশিনের সামনের দিকে, মানে যাকে ইংরেজিতে বলে ফোরহেড রেস্ট অ্যান্ড ব্রো প্যাড, রেখে মেশিনটার স্বচ্ছ কাঁচের ভিতরের দিকে কি একটা ছবি দেখা যাচ্ছে সেটাকে গভীর মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করতে থাকল। 


মেশিনে পরীক্ষা হয়ে গেলে শিবুদা চোখে নানা রকমের লেন্স পালটে বেশ মনোযোগ সহকারে উলটে পালটে সামনের প্লেটের গায়ে লেখাগুলোকে যথাসম্ভব সোজা করে পড়বার চেষ্টা করতে লাগল।  অবশ্য মাঝে মাঝে তাঁর স্ত্রীর দিকেও আড় চোখে দেখতে ভুলল না;  শিবুদা যেন লেন্সের চমকের আড়াল থেকে তার স্ত্রীর মুখের মলিনতার ছাপ আরও বেশী করে লক্ষ্য করতে থাকল।  ভাবল, যেন কতদিন সে তার স্ত্রীর মুখের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে দেখেনি;  এতদিন কেন সে লক্ষ্য করেনি তার স্ত্রীর মুখের চিন্তার বলিরেখা, কেন লক্ষ্য করেনি চোখের কোণে আঁকা দীর্ঘদিনের অভাবের কাহিনী।  চকচকে লেন্সের আড়াল থেকে শিবুদার চোখের সামনে যেন তার জীবনের বাস্তবের চিত্রটা আরও বেশী করে ফুটে উঠল।  তার মনে হল, এর থেকে তো ভালো ছিল তার ক্ষীণ দৃষ্টি;  আর যাই হোক বাস্তবটাও অন্তত কিছুটা ধুসর হয়ে ধরা দিত তার চোখে।  


বেশ কিছুক্ষণ পরে চোখের পরীক্ষা শেষ হলে শিবুদা তার গুগগুলে চোখে দেখতে থাকল ডাক্তারবাবু  খস খস করে প্রেসক্রিপশনের উপর কি সব সাঙ্কেতিক  ভাষার প্রয়োগ করে লিখতে লাগলেন;  সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শিবুদা। 


কিন্তু পরক্ষণেই শিবুদা যখন ডাক্তারের কাছ থেকে সেই সাঙ্কেতিক ভাষার মর্ম উদ্ধার করে জানতে পারলো যে তার চোখের পাওয়ার ঠিক কতটা আর সেই অনুযায়ী চশমা তৈরি করতে যে কি পরিমাণ খরচ হতে পারে, শিবুদার সেই অনাবিল হাসির রোদে নিমেষেই যেন এক বিষণ্ণ মেঘের ছায়া নেমে এলো।  কেদার-বাবু লক্ষ্য করলেন প্রেসক্রিপশনটা হাতে নেওয়ার পরে শিবুদার হাতটাও যেন একটু কেঁপে উঠল।  দিন এনে দিন খাওয়া এই শরীরে নতুন একটা চশমা বানানোর খরচ মানে তো পুরো মাসের চাল-ডালের সংস্থানে টান পড়া!  শিবুদার চারপাশে বড় বড় অফিসারেরা যখন দামি ব্র্যান্ডের ফ্রেম পছন্দ করছে, তখন তাদের গায়ের পারফিউমে সুবাসিত জাঁকজমকের মাঝে শিবুদার সেই করুণ, অসহায় দৃষ্টির গভীরতা মাপার মতো ফুরসৎ কারও ছিল না।  তবে সবার অলক্ষ্যে কেদার-বাবু কিন্তু ঘটনাটি গোড়া থেকেই লক্ষ্য করছিলেন।  প্রেসক্রিপশন হাতে ধরে থাকা শিবুদার কাঁপা কাঁপা আঙুল আর চোখের কোণে জমে ওঠা সেই জল দেখে কেদার-বাবুর বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় মুচড়ে উঠল।  আচমকা অনুভূতির এক তীব্র আলোড়নের ঢেউ যেন বিদ্যুতের মত বয়ে গেল কেদার বাবুর শিরায় শিরায়।  কেদার-বাবু নিজের অজান্তেই যেন চমকে উঠলেন।  মানুষের এমন অনুভূতি যে হৃদয়কে দুমড়ে মুচড়ে এভাবে আলোড়িত করতে পারে, কেদার-বাবু যেন কিছুতেই সে অনুভূতির সত্যতা বিশ্বাস করতে পারলেন না। 


কিন্তু পরক্ষনেই কেদার বাবুর মনে এক আত্মকেন্দ্রিক দ্বিধা এসে তাঁর মনটাকে যেন জাপটে ধরল।  কেদার বাবুর মনে হল, ‘কেন, আমিই কেন, আমি কেন দিতে যাবো?  আমার কিসের এত দায়?  আমি তো আমার কর্তব্য করছি মাত্র।  কেদার-বাবু জোর করে তাঁর দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নিলেন।  এমন ভাব দেখালেন যেন তিনি শিবুদাকে লক্ষই করেননি।   কিন্তু তাঁর মনের ভিতরে যে একটা অবরুদ্ধ যন্ত্রণা তোলপাড় করছিল যেন তাকে বার বার বলছিল একটি মানুষের চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসা পৃথিবীর আলো ফিরিয়ে দেওয়া কি সত্যিই এত কঠিন কাজ?  কেদার বাবু একবার তাঁর পকেটে ওয়ালেটের দিকে হাত বাড়ালেন, কিন্তু আবার কিছু একটা ভেবে হাতটা গুটিয়ে নিলেন।


দিনশেষে যখন ক্যাম্প গুটিয়ে নেবার সময় ঘনিয়ে এলো, তখন শিবুদা কেদার-বাবুর হাতে এক পেয়ালা গরম চা ধরিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলল, “স্যার গরম আছে, খেয়ে নিন, আপনি তো চা খেতে ভালোবাসেন, তাই সবার আগে আপনাকেই দিলাম, খেয়ে বলবেন কেমন হয়েছে, আজ আপনার জন্য স্পেশাল তৈরি করেছি।  আজ কত দায়িত্ব আপনার,  একটা স্পেশাল চা না হলে কি চলে!“


কেদার-বাবু চায়ের পেয়ালাটা হাতে ধরে শিবুদার মুখের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।  কেদার-বাবুর চশমার দামি ফ্রেমে আঁটা দামি কাঁচও যেন আজ ঝাপসা হয়ে উঠে তাঁর সামনে ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিবুদা কে  ঝাপসা করে তুলল। 


বাড়ি যাবার পথে মেঘের বুক ফাটা আর্তনাদের আড়াল থেকে বাঁধ ভাঙা বারিধারা কেদার বাবুর সমস্ত শরীরের মলিনতাকে ধুয়ে মুছে মুক্ত করলেও, তাঁর হৃদয়ের মলিনতাকে ছুঁতে পারলনা কিছুতেই।  বৃষ্টির জলে কেদার বাবুর চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে উঠেছে।  কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না।  চশমাটাকে চোখ থেকে খুলে তিনি পকেটের মধ্যে রাখলেন।  চোখের পলকটাকে ছোট করে তিনি যতটা সম্ভব সামনের দিকে দেখতে লাগলেন।  ঠিকমত দেখতে না পেয়ে কয়েকবার এবড়ো খেবড়ো পাথরে হোঁচটও খেলেন।  তবুও এগিয়ে চললেন আন্দাজ মত পা ফেলে। 




এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Classics