ভবিষ্যতের কলকাতা
ভবিষ্যতের কলকাতা
সাল ২০৭৫।
কলকাতাকে আর আগের মতো চিনতে পারা যায় না।
আকাশের অনেক ওপরে ভাসছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাম।
হাওড়ার ওপর দিয়ে চলছে নীরব ম্যাগলেভ ট্রেন।
গঙ্গার জল পরিষ্কার, নদীর বুকের ওপর ভাসছে সৌরশক্তিচালিত বাগান।
রাস্তার ধারে আর ট্রাফিক সিগন্যাল নেই।
গাড়িগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলে।
মানুষ শুধু গন্তব্য বলে দেয়—
“কলকাতা মেডিক্যাল সেন্টার।”
গাড়ি নিজেই রাস্তা বেছে নেয়।
কিন্তু এই অত্যাধুনিক শহরের মাঝেও একটা জায়গা বদলায়নি।
কলেজ স্ট্রিট।
পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো এখনও আছে।
তবে এখন বই কাগজে নয়—বেশিরভাগই স্মৃতি-চিপে।
সেই কলেজ স্ট্রিটেই একদিন দাঁড়িয়ে ছিল ৩২ বছরের অয়ন।
সে পেশায় Memory Architect।
মানুষের পুরোনো স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনর্গঠন করাই তার কাজ।
সেদিন বিকেলে সে একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকল।
দোকানের বৃদ্ধ মালিক তাকে দেখে বললেন,
“আপনি অয়ন?”
অয়ন অবাক।
“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন?”
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু কাউন্টারের নিচ থেকে একটি পুরোনো বই বের করে দিলেন।
বইটির মলাটে লেখা—
কলকাতা : ২০২৬
অয়ন বইটি হাতে নিয়ে হেসে বলল,
“এটা তো প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো!”
বৃদ্ধ বললেন,
“বইটা আপনার জন্যই রেখে গিয়েছিলাম।”
“কে?”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“আপনিই।”
অয়ন হেসে উঠল।
“আমি?”
বৃদ্ধ এবার বইটি খুলে একটি পাতায় আঙুল রাখলেন।
সেখানে হাতে লেখা—
“২৮ অক্টোবর ২০২৬।
যদি তুমি এই লেখাটা পড়ো, তাহলে বুঝবে কলকাতা বেঁচে গেছে।”
অয়নের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কিন্তু… এটা কীভাবে সম্ভব?”
বৃদ্ধ বললেন,
“পাতাটা শেষ পর্যন্ত পড়ুন।”
অয়ন পড়তে শুরু করল।
---
“কলকাতাকে বাঁচাতে হলে শহরের স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে।”
অয়ন থমকে গেল।
পরের লাইন—
“মানুষ যদি তার পুরোনো কলকাতাকে মনে রাখে, তাহলে ২০৭৫-এর কলকাতা তৈরি হবে না।”
তারপর একটি নাম—
অয়ন সেন।
অয়ন বইটা বন্ধ করে দিল।
“এটা আমার নাম!”
বৃদ্ধ এবার জানালার বাইরে তাকালেন।
“কারণ আপনিই সেই কাজটা করেছিলেন।”
“কী কাজ?”
“কলকাতার মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোনো শহরটাকে মুছে দিয়েছিলেন।”
অয়ন স্তব্ধ।
হঠাৎ তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলো।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল—
হলুদ ট্যাক্সি।
ট্রামের ঘণ্টা।
বৃষ্টিভেজা কলেজ স্ট্রিট।
ফুটপাথে চায়ের ভাঁড়।
গঙ্গার ধারে সন্ধ্যার আলো।
দুর্গাপুজোর ঢাক।
আর—
একটি ছোট ছেলে।
ছেলেটি তার হাত ধরে বলছে,
“বাবা, কলকাতাটা এমন কেন?”
অয়ন চোখ খুলে ফেলল।
“আমার ছেলে?”
বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।
“আমার তো কোনো ছেলে নেই!”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“ছিল।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
“কোথায় সে?”
“২০২৬-এ।”
অয়ন বুঝতে পারল না।
“কীভাবে?”
বৃদ্ধ বললেন,
“কারণ ২০৭৫-এর কলকাতা তৈরি হওয়ার জন্য ২০২৬-এর কলকাতাকে মুছে ফেলতে হয়েছিল।”
অয়ন কাঁপা গলায় বলল,
“আমি কেন সেটা করলাম?”
বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকালেন।
“কারণ সেই কলকাতাতেই আপনার ছেলে মারা গিয়েছিল।”
নীরবতা।
অয়নের মাথায় আবার সেই দৃশ্য।
বৃষ্টি।
গঙ্গার ঘাট।
একটি দুর্ঘটনা।
ছোট ছেলেটির হাত তার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে।
তারপর অন্ধকার।
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
“আমি কি তাই সবকিছু মুছে দিয়েছিলাম?”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
“শুধু আপনার স্মৃতি নয়।”
“তাহলে?”
“পুরো কলকাতার।”
ঠিক তখনই দোকানের সব আলো নিভে গেল।
একটি স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
MEMORY RESTORATION AVAILABLE
তার নিচে—
RESTORE KOLKATA — YES / NO
অয়ন স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
বৃদ্ধ বললেন,
“আপনি যদি YES চাপেন, ২০৭৫-এর কলকাতা আর থাকবে না।”
“আর NO?”
“সবাই তাদের পুরোনো কলকাতাকে ভুলেই থাকবে।”
অয়ন অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।
YES.
স্ক্রিন কেঁপে উঠল।
সারা কলকাতা জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করল।
কেউ হঠাৎ ট্রামের ঘণ্টা শুনতে পেল।
কেউ পুরোনো বাড়ির বারান্দা দেখতে পেল।
কেউ মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ পেল।
কেউ প্রথম প্রেমকে মনে করল।
আর কোথাও একজন বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“আমি আমার কলকাতাকে ফিরে পেয়েছি।”
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
তারপর হঠাৎ একটি শিশুর কণ্ঠ শুনতে পেল—
“বাবা!”
অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট ছেলেটি।
যাকে সে পঞ্চাশ বছর ধরে ভুলে ছিল।
অয়ন ছুটে গেল।
ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরল।
“তুই… বেঁচে আছিস?”
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো কখনও মরিনি, বাবা।”
অয়ন থমকে গেল।
“তাহলে?”
ছেলেটি তার হাত ধরে বলল,
“তুমি শুধু আমাকে মনে রাখা বন্ধ করে দিয়েছিলে।”
ঠিক তখনই বাইরে সাইরেন বেজে উঠল।
দোকানের সব স্ক্রিনে একসঙ্গে একটি বার্তা ফুটে উঠল—
YEAR: 2026
অয়ন অবাক হয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
হাওড়ার সেতু।
হলুদ ট্যাক্সি।
ট্রাম।
গঙ্গা।
সবকিছু আগের মতো।
কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেছে।
দোকানের বৃদ্ধ আর সেখানে নেই।
কাউন্টারের ওপর পড়ে আছে শুধু সেই পুরোনো বইটি।
অয়ন বইটি খুলল।
শেষ পাতায় নতুন একটি বাক্য লেখা—
“ভবিষ্যতের কলকাতা তৈরি হয়নি, অয়ন।
তুমি শুধু আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছ—কলকাতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি তার স্মৃতি।”
অয়ন জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
দূরে ট্রামের ঘণ্টা বাজল।
টিং… টিং…
আর সেই শব্দের সঙ্গে যেন কলকাতা বলল—
“আমি এখনও আছি।”
সমাপ্ত।
