সিপাহী বিদ্রোহের রাত
সিপাহী বিদ্রোহের রাত
১৮৫৭, মীরাট।
রাত তখন গভীর। মীরাট সেনানিবাসের আকাশে চাঁদ নেই, বাতাসে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠছে, আর মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে ঘোড়ার খুরের শব্দ।
সিপাহী রঘুনাথ সিং তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। গত কয়েক দিন ধরে সেনানিবাসে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহারের অভিযোগে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরাই ক্ষুব্ধ।
কিন্তু রঘুনাথের মনে শুধু কার্তুজের প্রশ্ন ছিল না। তার মনে জমে ছিল বহু বছরের অপমান, বেতনবৈষম্য আর পরাধীনতার যন্ত্রণা।
হঠাৎ তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ঢুকল তার সহযোদ্ধা করিম।
—“সময় হয়ে এসেছে। সবাই অপেক্ষা করছে।”
রঘুনাথ চাপা গলায় বলল, —“আজ যদি ব্যর্থ হই?”
করিম তার কাঁধে হাত রাখল। —“তাহলে ইতিহাস আমাদের মনে রাখবে না। কিন্তু অন্তত আমরা নিজেদের কাছে ছোট হব না।”
সেই রাতেই সেনানিবাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। বন্দি সিপাহিদের মুক্ত করার চেষ্টা, অস্ত্রাগারের দিকে ছুটে চলা সৈন্যদল, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহের আগুন।
কেউ চিৎকার করছিল, “মারো ফিরঙ্গি!”
কেউ আবার বলছিল, “দিল্লি চলো!”
রঘুনাথের হাতে তখন একটি ছোট চিঠি। দিল্লির উদ্দেশে পাঠানো গোপন বার্তা। কিন্তু চিঠিটি পৌঁছনোর আগেই সে বুঝতে পারল, তাদের পরিকল্পনার খবর শত্রুর কাছে পৌঁছে গেছে।
তাঁবুর পেছন থেকে বেরিয়ে এল এক পরিচিত মুখ—সুবেদার মেজর হরদয়াল।
—“চিঠিটা আমার হাতে দাও, রঘুনাথ!”
রঘুনাথ স্তব্ধ। এই মানুষটিকেই সে এতদিন নিজের অভিভাবক বলে মনে করেছে।
—“আপনি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন?”
হরদয়াল ঠান্ডা গলায় বললেন, —“আমি শুধু নিজের জীবন বাঁচাতে চাই।”
ঠিক তখনই দূরে গুলির শব্দ হলো। করিম দৌড়ে এসে চিৎকার করল, “রঘুনাথ! পালাও!”
রঘুনাথ চিঠিটা আগুনে ছুড়ে দিল। কিন্তু আগুনে পুড়ে যাওয়ার আগে সে শেষবারের মতো একটি বাক্য পড়ে ফেলেছিল—
“দিল্লিতে সম্রাটের দরবারে পৌঁছনোর আগেই বিদ্রোহীদের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতককে খুঁজে বের করতে হবে।”
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কারণ চিঠির নিচে যে নামটি লেখা ছিল, সেটি হরদয়ালের নয়।
সেটি ছিল—করিমের!
রঘুনাথ ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।
করিম তখন তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। মুখে অদ্ভুত হাসি।
—“চিঠিটা পুড়িয়ে দিলে কেন, বন্ধু? ওতে তো তোমার নামটাও লেখা ছিল!”
সেই রাতে মীরাটের আকাশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছিল। কিন্তু রঘুনাথের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল—
দেশের স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই শুরু হয়েছে, তার প্রথম বিশ্বাসঘাতক কি শত্রুর শিবিরে, নাকি তার নিজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে?
