রাজকীয় চক্রান্ত
রাজকীয় চক্রান্ত
সন ১৭৮৬।
মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে সেদিন রাতটা অস্বাভাবিক নীরব।
প্রাসাদের চারদিকে প্রহরী।
দরজায় দ্বিগুণ পাহারা।
অন্দরমহলে মশালের আলো।
তবু রাজদরবারের প্রধান কক্ষে বসে থাকা মহারাজ কৃষ্ণনারায়ণের মনে হচ্ছিল—
কেউ একজন তাঁকে দেখছে।
তিন দিন ধরে একই ঘটনা ঘটছে।
প্রতিদিন গভীর রাতে তাঁর শোবার ঘরের দরজার নিচ দিয়ে একটি করে চিঠি ঢুকছে।
চিঠিতে কোনো নাম নেই।
শুধু একটি বাক্য—
“রাজা, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটিই আপনার মৃত্যুর কারণ হবে।”
প্রথম দিন তিনি গুরুত্ব দেননি।
দ্বিতীয় দিন চিঠিটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।
তৃতীয় দিন থেকে তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
সেই রাতেই প্রধান সেনাপতি রুদ্রপ্রতাপ এসে জানালেন,
“মহারাজ, রাজপ্রাসাদের উত্তর ফটকের পাহারায় আজ নতুন লোক রাখা হয়েছে।”
রাজা তাকালেন।
“নতুন লোক?”
“জি।”
“কে আদেশ দিয়েছে?”
সেনাপতি একটু থামলেন।
“রাজকুমার।”
রাজা চুপ করে গেলেন।
রাজকুমার দেবেন্দ্রই তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী।
আর চিঠিগুলোতে যে সতর্কবার্তা আসছে—
তার প্রতিটি কথাই যেন রাজকুমারকে সন্দেহ করার কারণ তৈরি করছে।
রাত আরও গভীর হলো।
হঠাৎ রাজপ্রাসাদের ঘণ্টা বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
তারপর বাইরে থেকে চিৎকার—
“প্রাসাদে আগুন!”
সৈন্যরা ছুটে গেল।
রাজা উঠে দাঁড়াতেই তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছুটে এসে বলল,
“মহারাজ, আপনাকে এখনই গোপন পথে নিয়ে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“নিরাপদ জায়গায়।”
রাজা দেহরক্ষীর সঙ্গে অন্ধকার করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেলেন।
কিন্তু কয়েক পা যেতেই তিনি থেমে গেলেন।
দেয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো আয়নার দিকে তাঁর চোখ পড়েছে।
আয়নায় দেহরক্ষীর প্রতিবিম্ব নেই।
রাজা ধীরে ধীরে পিছিয়ে এলেন।
“তুমি কে?”
দেহরক্ষী আর উত্তর দিল না।
তার কোমর থেকে ছুরি বেরিয়ে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার থেকে একটি তলোয়ার ঝলসে উঠল।
দেহরক্ষী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে রাজকুমার দেবেন্দ্র।
“বাবা!”
রাজা স্তম্ভিত।
“তুমি?”
রাজকুমার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আপনাকে মারতে এসেছে ওরা।”
“কারা?”
“যারা গত এক মাস ধরে প্রাসাদের ভিতরে লোক ঢুকিয়েছে।”
রাজা তাকিয়ে রইলেন।
“তাহলে চিঠিগুলো?”
রাজকুমার মাথা নত করল।
“আমি পাঠিয়েছিলাম।”
“তুমি?”
“আপনাকে সতর্ক করার জন্য।”
রাজা যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই রাজকুমারের পিছনে এসে দাঁড়ালেন সেনাপতি রুদ্রপ্রতাপ।
তাঁর হাতে তলোয়ার।
“দেবেন্দ্র, এবার সময় হয়েছে।”
রাজকুমার ঘুরে দাঁড়াল।
“আপনি!”
সেনাপতি মৃদু হাসলেন।
“রাজ্য বাঁচাতে হলে একজন রাজাকে সরাতেই হয়।”
রাজা বুঝলেন—
এটাই সেই চক্রান্ত।
কিন্তু পরের মুহূর্তে সেনাপতি তলোয়ার নামানোর আগেই প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
চারদিক থেকে সৈন্যরা বেরিয়ে এল।
সেনাপতি বন্দি হলেন।
রাজা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।
“তুমি সব জানতেও আমাকে বলোনি?”
দেবেন্দ্র বলল,
“কারণ প্রাসাদের ভিতরে কে আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, সেটা আমি জানতাম না।”
রাজা ধীরে বললেন,
“তাহলে আজ রাতে এই নাটক কে সাজাল?”
রাজকুমার কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই অন্ধকার বারান্দা থেকে এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল—
“আমি।”
সবাই ঘুরে তাকাল।
রানী মৃণালিনী দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে।
রাজা বিস্ময়ে বললেন,
“তুমি?”
রানী ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
রানী রাজসিংহাসনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কারণ এই রাজ্যকে বাঁচাতে হলে আপনাকে মরতে হবে।”
রাজা স্তব্ধ।
“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”
রানী শান্ত গলায় বললেন,
“না। আপনি শুধু জানেন না—আপনার মৃত্যুর খবর ইতিমধ্যেই পাশের রাজ্যে পৌঁছে গেছে।”
“কিন্তু আমি তো জীবিত!”
রানী মৃদু হাসলেন।
“সেটাই সমস্যা।”
রাজা কিছু বুঝতে পারলেন না।
রানী তাঁর হাতে একটি চিঠি দিলেন।
চিঠিতে লেখা—
“মহারাজ কৃষ্ণনারায়ণ আজ রাতে মৃত্যুবরণ করেছেন।”
তারিখ—
তিন দিন আগের।
রাজা কাঁপা হাতে চিঠিটি নামিয়ে ফেললেন।
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
রানী বললেন,
“কারণ তিন দিন আগে যে মানুষটি মারা গিয়েছিল…”
তিনি ধীরে ধীরে রাজার দিকে তাকালেন।
“সে আপনি ছিলেন না।”
রাজা স্তব্ধ।
“তাহলে কে?”
রানী উত্তর দিলেন না।
শুধু রাজসিংহাসনের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“মহারাজ, এতদিন আপনি ভেবেছিলেন আপনি এই রাজ্যের রাজা।
আসলে আপনি ছিলেন সেই রাজা, যাকে রাজ্য বাঁচানোর জন্য প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।”
ঘরের সবাই নিস্তব্ধ।
রাজা নিজের মুখে হাত রাখলেন।
তারপর আয়নার দিকে তাকালেন।
এই প্রথম তিনি দেখলেন—
আয়নায় তাঁর মুখ নেই।
শুধু সিংহাসনের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন।
হুবহু তাঁর মতো।
সে ধীরে ধীরে হাসল।
আর বলল—
“এবার আসল রাজাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে।”
মশালের আলো নিভে গেল।
সমাপ্ত… নাকি রাজকীয় চক্রান্তের শুরু?
