কেয়া রায়

Tragedy


3  

কেয়া রায়

Tragedy


অনুশোচনা

অনুশোচনা

5 mins 478 5 mins 478


              (প্রথম পর্ব)


১৫ই মার্চ, ২০১৪, সন্ধ্যে ৭টা :


- "মাম্মা, মাম্মা, আমার পার্স থেকে ক্রেডিট কার্ডটা গেল কোথায়? খুঁজে পাচ্ছিনা কেন?"

- "লিসেন তানভি, ওটা তুমি এখন পাবে না। অলরেডি তুমি ত্রিশ হাজারের ওপরে খরচ করে ফেলেছ। তাই তোমার মাম্মামের ওপর ভরসা না করে আমিই তোমার ক্রেডিট কার্ডটা সরিয়ে রেখেছি", এক নি:শ্বাসে বলে থামলেন মিস্টার দাশগুপ্ত। এ তিলোত্তমা নগরীর নামী প্রোমোটারদের মধ্যে একজন হলেন তিনি। অর্থ-সম্পত্তি-যশের প্রাচুর্যে হাবুডুবু খাওয়ার মতোই অবস্থা। তাঁর স্ত্রী মিসেস দাশগুপ্ত সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে আজ অবধি পিছপা হননি। আর তাদের একমাত্র মেয়ে, মিস তানভি দাশগুপ্ত। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের স্টুডেন্ট, স্লিম ফিগারে রূপ তার ঝরে পরসছে যেন। ফেসবুকের দুনিয়া কি আর সত্যিকারের দুনিয়াই বা কি - সবেতেই তার ফ্যান-ফলোয়ার্সের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়। সে জানে ভালো করেই বাবার সমস্ত অর্থ-সম্পত্তির মালিক হবে একমাত্র সে-ই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া এই মেয়ে মদ-সিগারেট-ড্রাগ, বার-ডিস্কের বিষাক্ত ঘেরাটোপেই মত্ত। এদিকে মিসেস দাশগুপ্ত টাকার বিনিময়ে শরীরি সুখ কিনতে ও নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনও মূল্যে সমস্তকিছু উজাড় করতে প্রস্তুত। 


       বিরক্ত হয়ে মিসেস দাশগুপ্ত চুলে চিরুনি দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, "ওহো তুমি মেয়ের লাইফে এত বেশি ইন্টারফেয়ার করো না তো। শি ইজ নাও অ্যাডাল্ট। ওর ক্রেডিট কার্ডটা ওকে দিয়ে দাও তুমি এক্ষুণি।"


      তানভি গদগদ হয়ে মা'কে জড়িয়ে ধরে বলল, "ও মাম্মা, ইউ আর সো সুইট। থ্যাঙ্ক ইউ মাম্মা। আজ আমার ফিরতে লেট হবে। ডোন্ট ওয়েট ফর মি। ওকে", কথা শেষ হতেই নিজেকে মায়ের কাছ থেকে ছাড়িয়ে তানভি ওর পার্সটা হাতে নিল আর বাবার হাত থেকে ক্রেডিট কার্ডটা ছোঁ মেরে নিয়ে বেড়িয়ে গেল মূহুর্তের মধ্যে। মিস্টার দাশগুপ্ত গুম মেরে কিছুক্ষণ সোফায় বসে রইলেন মেয়ে আর মায়ের কাণ্ডকারখানা দেখে।।


           (দ্বিতীয় পর্ব)


১৫ই মার্চ, ২০১৪, রাত ১১:৩০টা :


- "ইউ স্কাউণ্ড্রল, ডোন্ট টাচ মি। ছাড়ো আমাকে। মাম্মা...", কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তানভি। কালো রঙের হণ্ডা সিটি গাড়িতে তোলার পর ওরা তানভির শরীরে ইঞ্জেকশন ঢুকিয়ে ড্রাগ ছড়িয়ে দেয় যাতে ও নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা। এরপর পার্কস্ট্রীট আর শোভাবাজারের প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় অন্ধকার ঘুপচির মধ্যে একটি ছোট্ট কুঠুরিতে ওরা তানভিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখে, ওপরমহল থেকে হুকুম না আসা পর্যন্ত।


        এদিকে রাত প্রায় ২টো বাজতে চলল ঘড়ির কাঁটায়। মিস্টার দাশগুপ্ত ঘরে ফিরে পায়চারি করতে লাগলেন মেয়ের চিন্তায়। মিসেস দাশগুপ্ত পার্টি সেরে ঘরে ফিরতেই স্বামীর উদ্বিগ্নতা দেখে প্রশ্ন করলেন, "ইজ এভরিথিং অলরাইট?"... মিস্টার দাশগুপ্তের ততক্ষণে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। নিজেকে কোনওরকমে সামলে নিয়ে বললেন, "আমাদের মেয়ে কিন্তু এখনও ঘরে ফেরেনি। তুমি মা হয়ে একবারও খোঁজ পর্যন্ত নাওনি?"...মিসেস দাশগুপ্ত তাচ্ছিল্যভরে শুধু বললেন, "ওহ কাম অন, তানভি এখন আর বাচ্চা মেয়ে নয় যে ওকে আমার দেখে রাখতে হবে। ওর একটা প্রাইভেসি বলেও তো কিছু আছে নাকি? গ্রোন আপ মিস্টার" - কথা শেষ হতে না হতেই বেডরুমে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন মিসেস দাশগুপ্ত। মিস্টার দাশগুপ্ত তখনও তানভির মোবাইলে কল করে যাচ্ছেন, কিন্তু ওপার থেকে বারংবারই ভেসে আসছে, "দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়ালড ইজ আউট অফ রেঞ্জ। প্লিজ ট্রাই এগেইন আফটার সামটাইম"। সোফায় বসে অপেক্ষা করতে করতে একসময় তাঁর চোখে তন্দ্রাভাব দেখা দিল। কিন্তু তাই বলে সময়ের গতি যে রুদ্ধ হয়ে থাকে না !!


           (তৃতীয় পর্ব)


৩০শে মার্চ, ২০১৪, দুপুর ২টো :


।। এই নিয়ে দিন পনেরো অতিক্রান্ত। থানা-বাড়ি-অফিস করতে করতে আজ মিস্টার দাশগুপ্তের চিন্তার পারদ যেন ঊর্দ্ধমুখী। মেয়েটা এখন কি অবস্থায় আছে, আদৌ মেয়েটা অক্ষত আছে কি না সেটাই বা কে জানে?? নিজের সমস্ত অর্থ-উপার্জন ঢেলে দিয়ে যাচ্ছেন একমাত্র সম্বলটুকুকে ফিরে পাওয়ার তাগিদে। ফলে এই কারণে স্ত্রীর সাথে প্রতি মূহুর্তে ভুল বোঝাবুঝি লেগেই আছে মিস্টার দাশগুপ্তের। দু'জনেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছেন। সংবাদপত্রের রিপোর্টারদের ছোঁড়া প্রশ্ন আর তার সাথে খবরের চ্যানেলগুলোতে একই খবর রাত-দিন শুনতে শুনতে জেরবার হয়ে পড়েছেন। যে মিসেস দাশগুপ্ত টাকা-পয়সা আর নিজের বিলাস জীবনযাপন ছাড়া কিছুই বোঝেন না, আজ তিনিও তার স্বামীর কাছে যেকোনও শর্তের বিনিময়ে নিজের সন্তানকে ভিক্ষে চাইছেন। কিন্তু এহেন জটিল অঙ্কের সমাধান কারোর কাছেই যে নেই। 


       এদিকে তানভিকে আজ কোলকাতার সবচেয়ে নামকরা রেড লাইট জোন থেকে মুম্বাই-এ পাচার করা হচ্ছে। সেখানকার কোনও এক ব্যবসায়ীর হাতে ওকে তুলে দেওয়া হবে। কারণ, দু'দিন আগেই হওয়া নিলামে ৩৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তানভির শরীর বিক্রী হয়ে যায় অনায়াসেই। তবে যাওয়ার আগে আজকের এই সন্ধ্যায় কোলকাতার এই পাচারকারী দলের হেড তথা তানভির গত দেড় বছরের বার কাম ডিস্কে যাওয়ার একমাত্র সঙ্গী দেবরাজ চায় তানভির মতো মেয়ের শরীরের প্রত্যেকটা অংশের স্বাদটুকু নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যথাস্থানে। সত্যিই তো, এমন নিটৌল স্তন আর নাভি থেকে যোনিদেশ পর্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ খাঁজযুক্ত সুন্দরী তন্বীকে কাহাতকই বা ফেলে রাখা যায়??


            (চতুর্থ পর্ব)


১লা জানুয়ারি, ২০১৬, রাত ১টা :


মালয়েশিয়া। একটি নামিদামি হোটেলের ১০নং ফ্লোরের এক বদ্ধ কামরার ভেতর বিছানায় দুটো উন্মুক্ত শরীর। একজনের মধ্যে প্রবল যৌন উন্মাদনা আর একজনের মধ্যে তখন চলছে অন্ধকারে নিমজ্জিত অস্তিত্বের টানাপোড়েন - ঘন ঘন পড়ছে দীর্ঘশ্বাস।


       এদিকে মিস্টার আর মিসেস দাশগুপ্ত তাদের মেয়েকে ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশাটুকু এখনও তিলে তিলে বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজেদের ভেতর। পুলিশ-প্রশাসন তাদের তদন্ত এখনো চালিয়ে যাচ্ছে সমস্ত রকমের শক্তি কাজে লাগিয়ে। আজ হয়তো নিজের আত্মজাকে সঠিক পথে চালনা করতে না পারার অনুশোচনায় ভরপুর মায়ের মন প্রতি মূহুর্তে ভগবানের কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করছেন সকলের অলক্ষ্যে। কারণ, আজ সমাজের চোখে সেই মেয়েটি যত না দোষী, তার চাইতেও বহুগুণে দোষী-সাব্যস্ত হয়েছেন তার মা এবং তার দেওয়া সংস্কার।


       অন্যদিকে নতুন বছরের শুরুতে সারা দুনিয়া যখন আনন্দের ফোয়ারায় মাতোয়ারা, তখন মালয়েশিয়ার এক দামী হোটেল থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বান্ডিল হাতে তানভি বেরোচ্ছে। সে আজ উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন এস্কট, ভালো বাংলায় যাদের "বেশ্যা" বলা হয়ে থাকে। প্রথম প্রথম অবশ্য তানভির বড্ড অনুশোচনা হত নিজের পরিস্থিতির ওপর। ওর প্রতি ওর বাবার কর্তৃক গৃহীত আগেকার শাসনগুলোর অর্থ আজ ও যে প্রতিটা মূহুর্তে বুঝতে পারে - ঠিক সেই মূহুর্তে মায়ের অন্যায় প্রশ্রয়গুলোকে আর ক্ষমা করতে পারে না। এখন ওর গা সওয়া হয়ে গিয়েছে সবই, এখন শুধুমাত্র টাকার বিনিময়েই নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না ।।


            (সমাপ্ত)


Rate this content
Log in