নক্ষত্রের আলিঙ্গন~~~~
নক্ষত্রের আলিঙ্গন~~~~
পর্ব: ০২
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। বাস এসে থেমেছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সানজিয়া নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নেমে পড়ে। চারপাশে মানুষের ভিড়। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় পরিচিত মুখ নজরে আসে না। হঠাৎ চোখের উপর ঠান্ডা কিছু অনুভূত হয়। কেউ তার চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।
" শাফাত ভাই চোখটা ছাড়ো। ব্যথা লাগছে তো।"
" এই সুখ! তুই কিভাবে বুঝলি এটা আমি?"
“এই একটাই ট্রিক দিয়ে তুমি বার বার চালিয়ে যাও। এখন তো এটা পুরোপুরি তোমার সিগনেচার ট্রিক।”
" তাই বুঝি দাদি-আম্মা। চল অনেক ক্লান্ত লাগছে। তাড়াতাড়ি চল।"
" এতদূর বাসে বসে আসলাম আমি আর ক্লান্ত লাগছে তোমার? আজকে তো অফিস ও ছিল না। তবে? বুঝেছি আইফা আপুনি তোমাকে দিয়ে বাসার সব কাজ করিয়েছে তাই না?"
" তোর বোন আমাকে দিয়ে কাজ করাবে?সে তো আমার কথায় উঠে আর বসে। আর এই দশা তো দুই বাঁদর শাফিন আর সাদমান করেছে।"
" বুঝি, সবই বুঝি। কে করেছে এই হাল।"
" হইছে আপনার আর বুঝতে হবে না মুরুব্বি। চল....।"
শাফাত। পুরো নাম সাদমান শাফাত খান। সানজিয়ার বড় মামার একমাত্র ছেলে। একজন সফল ব্যবসায়ী। অল্প বয়সে তার ভালো নাম ডাক। আর আইফা নাদিয়া, সানজিয়ার ফুফাতো বোন আবার শাফাতের স্ত্রী। তাদেরই ঘরের দুই জোনাকি শাফিন আর সাদমান।
_____________
পুরো রেস্টুরেন্ট জুড়ে পিনপতন নীরবতা। কফির কাপ নামানোর শব্দটাও যেন বেমানান লাগছিল। সামনাসামনি চেয়ারে বসা শহরের সবথেকে ইয়ং বিজনেস ম্যান সাদ সালমি নাওবি মির্জা আর তার প্রাক্তন স্ত্রী রাইনা। যে কিনা এখন তার সব থেকে বড় বিজনেস রাইভেল জাইফ চৌধুরীর রক্ষিতা। নীরবতা ভেঙে রাইনা নাওবির দিকে ঝুঁকে বলল...
" কেমন আছো নাওবি darling?"
" ভালো থাকলে নিশ্চয়ই তোমার মতো মেয়ের সামনে নাওবি মির্জা বসতো না সেটা তুমি খুব ভালো করে জানো।"
" তা কি এমন জিনিস যা the great নাওবি মির্জাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না। যার কারণে রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তের পরিবর্তে ego ভরা নাওবি তার প্রাক্তন স্ত্রী আর শত্রুর গার্লফ্রেন্ডকে এতো জরুরি তলব করেছে।"
" সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। নিজের দুধের ছেলেকে একা শত্রুর মুখে ফেলে যেতে তোমার বাঁধল না? কেমন মা তুমি? ছিঃ! রাস্তার পাগল ও তোমার থেকে ঢের ভালো।"
" ঐ বাচ্চাকে তো আমি রাখতে চায়নি darling. তুমিই জোর করে রেখেছিলে সুতরাং ওর দায়িত্ব তো তোমার।"
" আমি তোমাদের মতো পশু নই যে নিজের স্বার্থে একটা নিষ্পাপ বাচ্চাকে হত্যা করব।"
“It’s your matter, babe. Not mine.
বেশি সমস্যা হলে ওরে এতিম খানায় দিয়ে এসো নয়তো ফেলে দাও রাস্তায়।"
" Just shame on you. শেষ একবার শুধু ওর অবুঝ মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার সামনে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি তো...ভাবতেও লজ্জা লাগে। একদম নিজের বাবার মতো হয়েছো।"
" Mind your language Mr. Naobi. আমার বাবাকে এর মধ্যে টানবে না। আর কখনো এসব ছোট খাটো বিষয়ে আমাকে ডাকবে না।"
" Rascal. Just get out from my eyesight.
এতদিন নিজের জন্য লড়েছি। এবার নিষ্পাপ শিশুর হয়ে লড়বো। তোদের শেষ আমার হাতেই হবে মিলিয়ে নিস।"
" Whatever! Just go to hell with your baby darling."
বড় বড় পা দিয়ে বেরিয়ে গেল রাইনা। নাওবির সারা শরীর রাগে কাঁপছে। ঘারের রগগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান। যে নাওবি মীর্জা কারো কাছে মাথা নত করে নি আজকে তার এমন একজন মানুষের সামনে অনুনয় করতে হয়েছে যাকে সে সব থেকে বেশি ঘৃণা করে। রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। হাতে থাকা কফির কাপ ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে একটা ফোন দিতে দিতে হনহন করে রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে যায় নাওবি।
_______________________
অন্ধকার রুমের নীল রঙের মৃদু আলো জ্বলছে। আর সেই আলোতে দেয়ালে টাঙানো সুন্দরী রমণীর ছবিটা স্পষ্ট প্রতীয়মান। বয়স তাঁর ২১-২২ এর বেশি নয়। তার সৌন্দর্যের কাছে যেনো চাঁদের আলো ও হার মানে। আর সেই দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাওবি। তার রক্তিম চোখই বলে দিচ্ছে তার অন্তর জ্বালার তীব্রতা।
" আমার প্রিয় নক্ষত্র। আমার অন্ধকার জীবনের আলো। আমি যে বহুকাল ধরে তোমার আলিঙ্গনের জন্য তৃষ্ণার্ত। এক মাত্র এই একটা ঔষধ আমাকে ঠিক করতে পারে।"
একটু থামলো। চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে টেবিলের উপর থেকে গিটার হাতে নিলো।
" জানো আমি না ক্লান্ত হয়ে গেছি এই প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলা খেলতে খেলতে। আমিও ভালো থাকতে চাই। ভালোবাসতে চাই। তোমার সাথে সুখে থাকতে চাই। কিন্তু উপায় কোথায়? সব দিক দিয়েই বাঁধা। চাইলেই সব বাঁধা আর নিয়ম ভেঙে তোমাকে আপন করতে পারি। কিন্তু আমার এই ছন্নছাড়া জীবনের সাথে জড়িয়ে তোমার গোছানো জীবনটাকে শেষ করতে চাই না পাখি। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে স্বার্থপর হতে কিন্তু পারি না। বিশ্বাস করো ভীষণ ভালোবাসি তোমায়।( একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিটারে টুং টাং শব্দ তুলে)
Bahut pyaar karte hain tumko sanam
Bahut pyaar karte hain tumko sanam
Kasam chaahe le lo
Kasam chaahe le lo khuda ki kasam
Bahut pyaar karte hain tumko sanam
Bahut pyaar karte hain tumko sanam
Hamein har ghadi aarzu hai tumhari
Hoti hai kaisi sanam bekarari
Milenge jo tumko to
Milenge jo tumko to batayenge hum
Bahut pyaar karte hain tumko sanam...."
ফোনের শব্দে ঘোর কাটে নাওবির। ওপাশের কথা শুনে তার মুখে বাকা হাসি ফুটে ওঠে। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বুকের বাঁ পাশে হাত রাখে। তারপর দেয়ালে টাঙানো ছবির রমণীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
“See you soon, পাখি… অপেক্ষার প্রহর অবশেষে শেষ হতে চলেছে।”
ঠোট কামরে হাসলো কতক্ষণ। তারপর চেয়ারের উপরে রাখা ব্লেজারটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

