STORYMIRROR

Fardin Ansari

Tragedy Classics Inspirational

4  

Fardin Ansari

Tragedy Classics Inspirational

না-বলা ভালোবাসা

না-বলা ভালোবাসা

7 mins
0


না-বলা ভালোবাসা : স্মৃতির গভীরে

সেই দিনগুলো আর ফিরে আসে না,
তবু বিকেলের আলো নামলেই
স্কুলের করিডোরটা হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
চকের ধুলো ভেসে ওঠে বাতাসে,
কাঠের বেঞ্চে জমে থাকা আঁচড়ের মতো
হৃদয়ে জমে থাকে তার নাম—
যা কোনোদিন উচ্চারণ করা হয়নি।

সে বসত জানালার ধারে,
চুলে রোদ পড়লে মনে হতো
আকাশটা একটু নুয়ে এসেছে পৃথিবীতে।
আমি দূরে বসে খাতার পাতায়
অর্থহীন অঙ্ক কষতাম,
কিন্তু প্রতিটি অঙ্কের শেষে
তার চোখের দিকেই গিয়ে আটকে যেত কলম।

কথা বলিনি কখনো,
কারণ তখন ভালোবাসা মানেই ছিল ভয়।
যদি বন্ধুত্ব ভেঙে যায়,
যদি হাসিটা আর না থাকে—
এই “যদি”-গুলোই
আমাদের মাঝখানে সবচেয়ে বড় দেয়াল ছিল।

টিফিনের সময় সবাই হাসত,
চিপসের শব্দে ভরে যেত ক্লাসরুম,
আর আমাদের নীরবতা
কোনো অদৃশ্য ভাষায় কথা বলত।
একবার সে তাকালে
আমি চোখ নামাতাম,
আবার চোখ নামালেই
মনটা ছুটে যেত তার দিকেই।

ডায়েরির পাতায় লিখেছিলাম—
“আজ বলব”
তারপর তারিখ বদলাত,
লাইনটা বদলাত না।
এইভাবেই দিন কেটে যেত,
অসমাপ্ত বাক্যের মতো।

বর্ষায় স্কুলের মাঠ ভিজে যেত,
ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম,
হয়তো এক ঝলক দেখা যাবে—
এই আশায়।
সে পাশ দিয়ে চলে গেলে
বৃষ্টি আরও জোরে নামত,
আর আমার বুকের ভেতর
কিছু একটা নিঃশব্দে ভেঙে পড়ত।

শীতে তার কান লাল হয়ে যেত,
আমি তাকিয়ে থাকতাম চুপচাপ।
বসন্তে কৃষ্ণচূড়া ফুটত,
কিন্তু আমাদের মাঝখানে
কখনো বসন্ত আসেনি।
কারণ সাহস আসেনি।

শেষ দিনের ছবি তোলার সময়,
সবাই হাসছিল,
আর আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম
একই ফ্রেমে—
তবু আলাদা দুই জীবনে।
সেদিনও কিছু বলা হলো না,
শুধু সময়টা হঠাৎ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল।

আজ এত বছর পরে,
অন্য শহর, অন্য মানুষ,
অন্য জীবন।
তবু সন্ধ্যার আলো নামলেই
হঠাৎ মনে হয়—
যদি সেদিন বলা হতো?

কিন্তু জানো,
এই না-বলা ভালোবাসাটাই
আমার সবচেয়ে পবিত্র স্মৃতি।
কারণ যা হারিয়ে যায়নি,
তা কখনো পুরোপুরি শেষও হয় না।


অংশ দুই — স্কুলের পর, হঠাৎ শূন্যতা

স্কুল শেষ হয়ে গেল একদিন,
কেউ খুব একটা টেরও পেল না।
শেষ ঘণ্টার শব্দটা
যেন আলাদা করে কানে বাজেনি,
কিন্তু তারপর—
সব শব্দ থেমে গেল।

পরদিন আর দেখা হলো না,
করিডোর ফাঁকা,
বেঞ্চগুলো হঠাৎ অচেনা।
যে জানালার ধারে সে বসত,
সেখানে শুধু রোদ পড়ে থাকত,
কিন্তু কেউ আর তাকাত না।

বন্ধুরা বলল—
“এখন কলেজ, নতুন জীবন।”
আমি মাথা নাড়লাম,
কিন্তু বুকের ভেতর
কিছু একটা পড়ে রইল
পুরোনো স্কুলব্যাগের মতো—
ভারী, অথচ অমূল্য।

প্রথম কয়েকদিন
তার নামটা নিজেকে বলতেই ভয় লাগত।
যেন উচ্চারণ করলেই
সব স্মৃতি ভেঙে পড়বে।
তাই নামটা না বলে
আমি তাকে ডাকতাম—
“সেই জানালার মেয়ে।”

মাঝে মাঝে মনে হতো,
হয়তো কোনোদিন রাস্তায় দেখা হবে।
আমি চিনে ফেলব,
সে একটু অবাক হবে,
তারপর বলবে—
“তুমি ভালো আছ তো?”

এই “হয়তো”গুলো নিয়েই
অনেক দিন বেঁচে ছিলাম।

অংশ তিন — কলেজ, নতুন মুখ, পুরোনো শূন্যতা

কলেজের ক্লাসরুম বড় ছিল,
মানুষ বেশি,
কথা বেশি।
তবু কোথাও
একটা চুপচাপ কোণ খালি থাকত,
যেখানে সে বসতে পারত—
কিন্তু বসেনি।

নতুন বন্ধুত্ব এল,
নতুন হাসি,
নতুন গল্প।
কিন্তু কোনো হাসিই
পুরোনো স্কুলের বিকেলের মতো
মনের ভেতর আলো জ্বালাতে পারল না।

কেউ ভালো লাগলে
আমি ভয় পেতাম।
কারণ আমি জানতাম—
ভালোবাসা মানেই
সবসময় বলা যায় না,
আর না বলতে পারলেই
তা চিরদিনের হয়ে যায়।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে
হঠাৎ মনে পড়ত তার মুখ,
কোনো স্পষ্ট ছবি নয়—
শুধু একরাশ অনুভব।
আমি নিজেকেই প্রশ্ন করতাম,
“এত বছর পরেও কেন?”

কোনো উত্তর আসত না।
শুধু নীরবতা।

অংশ চার — বহু বছর পরে, এক ঝলক দেখা

একদিন হঠাৎ,
ভিড়ের মধ্যে
চেনা একটা হাঁটার ভঙ্গি।
হৃদয়টা এক মুহূর্ত থেমে গেল।

সে।

একটু বদলে গেছে,
চুলের স্টাইল,
চোখের গভীরতা।
কিন্তু হাসিটা—
ঠিক আগের মতোই।

আমরা মুখোমুখি দাঁড়ালাম।
দুজনেই চিনলাম,
দুজনেই অবাক।
তবু সেই পুরোনো অভ্যাস—
কেউ কিছু বললাম না প্রথমে।

তারপর সে বলল,
“অনেক দিন পরে!”

এই তিনটে শব্দে
সব বছর গলে গেল।

আর আমি বুঝলাম—
কিছু ভালোবাসা
সময়ের সাথে কমে না,
শুধু চুপচাপ বসে থাকে
মনের এক কোণে।


অংশ পাঁচ — দেখা শেষের পর

সেই হঠাৎ দেখা শেষ হয়ে গেল
কোনো নাটক ছাড়াই।
কেউ নম্বর চাইল না,
কেউ প্রতিশ্রুতি দিল না,
শুধু পুরোনো দিনের মতো
একটা ভদ্র হাসি রেখে
দুজনেই হাঁটা দিলাম
দু’দিকের রাস্তায়।

চলার সময় মনে হচ্ছিল,
এই বুঝি পেছন থেকে ডাকবে—
নাম ধরে,
স্কুলের মতো করে।
কিন্তু শহরটা বড়,
মানুষ বেশি,
আর আমরা দুজনেই
এখন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক।

সেদিন রাতে
ঘুম এল না অনেকক্ষণ।
মনে হচ্ছিল—
যেন কেউ পুরোনো একটা খাতা খুলে
হঠাৎ সব পাতা উল্টে দিল।
শব্দ নেই,
তবু চোখ ভিজে গেল।

আমি বুঝলাম,
কিছু অনুভব
দেখা হলেই শান্ত হয় না,
বরং আরও জেগে ওঠে।

অংশ ছয় — খবর

খবরটা এসেছিল
একদম সাধারণভাবে।
কেউ বলল—
“ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

এইটুকুই।

কোনো বজ্রপাত নয়,
কোনো নাটকীয় দৃশ্য নয়।
শুধু বুকের ভেতর
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ঠিক জায়গা খুঁজে পেল না।

আমি হাসলাম,
বললাম—
“ভালোই তো।”

আর সেই মুহূর্তে
নিজেকে প্রথমবার
খুব বড় মানুষ মনে হলো।
কারণ হিংসা ছিল না,
রাগ ছিল না,
ছিল শুধু
একটা শান্ত, গভীর দুঃখ—
যা কাঁদতে শেখায় না।

সেই রাতে
স্কুলের সেই করিডোরটা
স্বপ্নে এল।
সে জানালার ধারে বসে,
আমি দূরে।
আর মাঝখানে
অগণিত বছর।

অংশ সাত — মেনে নেওয়া

দিন চলে,
জীবন নিজের মতো করে এগোয়।
আমারও কাজ হলো,
হাসি হলো,
লোকজন হলো।

কিন্তু কোনো কোনো বিকেলে
হঠাৎ রোদটা ঠিক আগের মতো পড়লে
মনটা থেমে যেত।
ভাবতাম—
যদি সেদিন একটু সাহস হতো?

তারপর নিজেকেই বলতাম—
হয়তো না বলাটাই ঠিক ছিল।
কারণ কিছু ভালোবাসা
সম্পর্ক হয়ে উঠলে
ছোট হয়ে যায়।

আর এই ভালোবাসা
ছোট হওয়ার জন্য ছিল না।

অংশ আট — শেষ উপলব্ধি

এখন বুঝি,
অসফল প্রেম মানেই ব্যর্থতা নয়।
কিছু প্রেম
শুধু অনুভব হওয়ার জন্য আসে,
পাওয়ার জন্য নয়।

সে হয়তো আজ সুখী,
আমি নিজের মতো করে বেঁচে আছি।
আর মাঝখানে
রয়ে গেছে একটুকরো সময়—
যেখানে কোনো ভুল ছিল না,
শুধু নীরবতা ছিল।

এই না-বলা ভালোবাসাই
আমাকে শিখিয়েছে
আস্তে ভালোবাসতে,
সম্মান করতে,
আর ছেড়ে দিতে।

শেষ অংশ — স্মৃতির কাছে চিঠি

যদি কোনোদিন
স্কুলের সেই জানালার ধারে
আবার আলো পড়ে,
জেনে নিও—
কেউ একজন আজও
চুপচাপ মনে রাখে।

নাম ধরে ডাকে না,
অভিযোগ করে না,
শুধু বলে—
“তুমি ছিলে,
এইটুকুই যথেষ্ট।”

কারণ
কিছু মানুষ
জীবনে আসে
থাকার জন্য নয়,
স্মৃতি হয়ে থাকার জন্য।

আর সেই স্মৃতিই
আমার না-বলা,
অসফল,
সবচেয়ে সুন্দর
ভালোবাসা।


অংশ নয় — সময়ের সাথে বন্ধুত্ব

সময় এক অদ্ভুত জিনিস,
সে কষ্টকে মুছে ফেলে না,
শুধু তাকে
চেনা মুখ বানিয়ে দেয়।

আগে যে ব্যথা
হঠাৎ হঠাৎ কাঁদাত,
এখন সে এসে
চুপচাপ পাশে বসে।
কিছু বলে না,
শুধু মনে করিয়ে দেয়—
“আমি এখানেই আছি।”

এখন আর তার বিয়ের কথা ভাবলে
বুকটা ভেঙে পড়ে না।
বরং মনে হয়—
ভালোই হয়েছে।
কারণ যে মেয়েটি
এত সুন্দর নীরবতা বহন করতে পারত,
সে সুখ পাওয়ার যোগ্য ছিল।

আমি তাকে কখনো দোষ দিইনি,
নিজেকেও না।
কারণ তখন আমরা দুজনেই
ভয় পেয়েছিলাম—
ভালোবাসা হারিয়ে ফেলব বলে।

অংশ দশ — অন্য ভালোবাসা, অন্য জীবন

এরপর আমার জীবনেও
কেউ কেউ এলো।
কেউ কিছুদিন থাকল,
কেউ একটু বেশি।

তারা প্রশ্ন করত—
“তুমি হঠাৎ চুপ হয়ে যাও কেন?”
আমি উত্তর খুঁজে পেতাম না।
কীভাবে বলি—
আমার ভেতরে একটা স্কুলের করিডোর আছে,
যেখানে আজও
একজন জানালার ধারে বসে?

কেউ বুঝত না,
কারণ এই ভালোবাসার
কোনো ছবি নেই,
কোনো প্রমাণ নেই।
শুধু একটা অনুভব—
যা কাগজে লেখা যায় না।

অংশ এগারো — স্মৃতির ছোট ছোট মুহূর্ত

কখনো পুরোনো বইয়ের দোকানে
একই পাঠ্যবই দেখলে,
হঠাৎ তার নামটা মনে পড়ে যায়।

কখনো বাসের জানালায়
বিকেলের আলো পড়লে,
স্কুল ফেরার সেই পথটা
চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই
সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ তারা
হঠাৎ এসে বলে—
“দেখো, আমরা মরিনি।”

অংশ বারো — প্রশ্ন, যার উত্তর নেই

অনেক রাতে
নিজেকে প্রশ্ন করেছি—
যদি সেদিন বলতাম,
তাহলে কি সব আলাদা হতো?

হয়তো হতো।
হয়তো হতো না।

কিন্তু এখন বুঝি—
যে ভালোবাসা সাহসের অভাবে
থেমে গিয়েছিল,
সে আসলে ভেঙে যায়নি।
সে শুধু
অন্য রূপ নিয়েছে।

আজ সে স্মৃতি,
কাল সে শিক্ষা,
পরশু সে কবিতা।

অংশ তেরো — কবিতার জন্ম

এই কবিতাটা
আমি লিখিনি ইচ্ছে করে।
এটা লেখা হয়েছে
আমার জীবনের ফাঁকে ফাঁকে।

যখন ট্রেনে জানালার পাশে বসে
হঠাৎ মন ভারী হয়ে এসেছে,
যখন কোনো হাসি
পুরোনো কিছু মনে করিয়ে দিয়েছে—
তখনই
এই লাইনগুলো জন্ম নিয়েছে।

তুমি জানো,
সব কবিতার জন্ম
কলম থেকে হয় না।
কিছু কবিতা জন্মায়
না-বলা কথার চাপে।

অংশ চৌদ্দ — শেষ নয়, শুধু থামা

আমি আর চাই না
সময় পিছিয়ে যাক।
আমি আর চাই না
কিছু বদলাক।

আমি শুধু চাই—
এই স্মৃতিটা থাকুক।
কারণ এটা আমাকে
খারাপ মানুষ বানায়নি,
বরং শিখিয়েছে
নরম হতে।

কিছু ভালোবাসা
সম্পর্কে রূপ নেয় না,
তবু তারা
মানুষকে পূর্ণ করে।



শেষ অংশ — থেমে থাকা আলো

সময় এখন ধীরে হাঁটে,
চুলে ধরা পড়েছে নীরব রোদ্দুর।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি নিজের চোখেই দেখি—
একটা কিশোর আজও রয়ে গেছে,
যে সাহস সঞ্চয় করছিল
একটা বাক্যের জন্য।

কখনো সন্ধ্যার হাওয়ায়
স্কুলঘণ্টার মতো শব্দ এলে,
হৃদয়টা অকারণে থেমে যায়।
আমি জানি—
এটা ডাক নয়,
এটা স্মৃতির পায়ের শব্দ।

বারান্দায় বসে চা ঠান্ডা হলে
মনে পড়ে—
সে জানালার ধারে বসত,
রোদে ভিজে।
আমি দূরে,
তবু ঠিক পাশেই ছিলাম—
এমনটাই ভেবেছিলাম তখন।

জীবন শিখিয়েছে—
সব ভালোবাসা পেতে হয় না,
কিছু ভালোবাসা
মানুষকে মানুষ করে তুলতে আসে।
আমারটা তেমনই ছিল—
শান্ত, লাজুক, অপ্রকাশিত।

আমি এখন আর প্রশ্ন করি না—
“যদি সেদিন বলা হতো?”
কারণ বুঝেছি,
কিছু গল্প
না বলাই থাকলে
সবচেয়ে সত্য হয়।

হয়তো সে কখনো জানবে না
এই কবিতার কথা,
এই নীরব বছরগুলোর কথা।
তবু এতে কোনো আক্ষেপ নেই—
কারণ ভালোবাসা
স্বীকৃতির অপেক্ষায় ছিল না।

শেষবারের মতো
নিজের কিশোর সত্তাকে বলি—
“ভয় পেয়েছিলে ঠিকই,
কিন্তু অনুভব করেছিলে সত্যি।”
সে হেসে ওঠে,
চোখ নামায়—
পুরোনো অভ্যাস।

আর আমি বুঝে নিই—
এই না-বলা ভালোবাসাই
আমার জীবনের
সবচেয়ে দীর্ঘ,
সবচেয়ে নীরব,
সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।

শেষে কিছুই ফুরোয় না।
শুধু আলোটা
আস্তে করে
মনের ভেতর
থেমে থাকে।






Rate this content
Log in

Similar bengali poem from Tragedy