STORYMIRROR

Tanuchhaya Mukherjee

Inspirational

4  

Tanuchhaya Mukherjee

Inspirational

উপহার (প্রথম পর্ব)

উপহার (প্রথম পর্ব)

3 mins
294

অনিন্দিতার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল স্বামী সুজয়ের হঠাৎ মৃত্যুতে। মেয়ে বনি তখন সাত বছরের।হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক। সুযোগ দিল না। সুগার, প্রেসার হয়ত বেড়েছিল সুজয়ের।শরীরের কোনো অসুবিধা বুঝতে পারেনি। হয়ত বুঝতে পেরেও অবহেলা করেছিল। তার ফলস্বরূপ অকালে তাকে চলে যেতে হল।


ওইটুকু বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে অনিন্দিতা জীবন সংগ্রামে নেমে পড়ল। চাকরি করত তাই অর্থের অসুবিধা না হলেও মাথার ছাদটা অনিন্দিতার চলে গিয়েছিল। শোকে দুঃখে হৃদয় ভেঙে দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তবুও তাকে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে হয়েছিল। বাঁচতে হয়েছিল সন্তানহারা এক মায়ের জন্য। সুজয়ের মা রেবতী দেবী একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেন। বুকে পাথর চাপিয়ে, শাশুড়ি মাকে সর্বদা বলত, মা, আমিতো আছি। আমিওতো তোমার সন্তান। আমার মুখ চেয়ে, তোমার নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে তোমাকে বাঁচতে হবে।মেয়ে, শাশুড়ি মায়ের মুখের দিকে চেয়ে স্বামীর জন্য শোক করবার সময় পেত না।


বনি আর রেবতী দেবীকে ভালো রাখার জন্য শুরু হল অনিন্দিতার লড়াই। নিজের কথা ভাববার সময়টুকু পেত না বা ভাববার ইচ্ছাও তার করত না। বাবার অভাব যাতে বনি কোনো দিনও অনুভব না করে অনিন্দিতা সেই দিকে সবসময় নজর দিত।

অফিসে যেটুকু সময় যেত, বাকি সময় মেয়েকে দিত। নিজের ব্যক্তিগত শখ, সাধ ইচ্ছাকে তুচ্ছ করে নিজেকে যেন সমর্পণ করেছিল। রেবতী দেবী আস্তে আস্তে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেন অনিন্দিতার ভালোবাসায়, নাতনীর জন্য। সন্তান শোক কখনও ভোলা যায় না। তাও তিনি বৌমার, নাতনীর মুখ চেয়ে ভোলবার চেষ্টা করতেন। দুজনকে আগলে রাখতেন ভালোবাসা দিয়ে।


বনি ওরফে রুবিনা আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো।বাবা নেই মাথার ওপর, মাকে দেখতে হবে ঠাম্মা কে দেখতে হবে এই ভাবনা নিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে লাগল। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পার করে খুব খেটে একটা ভালো চাকরি পেল। মা, ঠাম্মা ছাড়াও জীবনে তার আর একজন ভালোবাসার মানুষের আবির্ভাব ঘটল। এক বছর চাকরি করার পর অফিস কলিগ অর্কর সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হল। সাথে সাথে মাকে জানালো অর্কের কথা । মায়ের থেকে সে কিছু লুকোয় না। মা ছাড়াও সে যে তার বন্ধু।


অনিন্দিতার এখন চিন্তা, চাকরি থাকতে থাকতে মেয়েকে সুপাত্রের হাতে তুলে দিতে হবে। পাত্রতো মেয়ে নিজেই দেখে রেখেছে। পাত্র তাকে আর খুঁজতে হবে না।শুধু মেয়েকে বলল, কিরে বনি, এবার তো তোর বিয়ে দিতে হবে, এই দায়িত্বটা পূরণ করলে আমি একপ্রকার নিশ্চিন্ত হই। তোকে সুখী দেখতে পারলে আর কি চাই আমার ! অর্কর মা বাবার সাথে কবে কথা বলব?

এই কথা শুনে বনি বলল, মা, বাবা চলে যাবার পর তোমার জগৎ শুধু আমাকে ঘিরে ছিল।তোমার চাকরি যখন থাকবে না,আমিও যখন থাকব না তুমি কি নিয়ে থাকবে? তাই এখন বিয়ের কথা আমি ভাবছি না। অনিন্দিতা তখন বলেছিল মেয়েকে, সময়ের কাজ সময় করতে হবে। সময় কিন্তু থেমে থাকে না। তোর বিয়েটা হলে আমি যে নিশ্চিন্ত হই। মাঝে মাঝে আমার কাছে আসিস, তাতেই আমি ভালো থাকব। এই কথা বলতে বলতে একটা চাপা কান্না দলা পাকিয়ে আসছিল এই ভেবে, সত্যি আমি বনি কে ছেড়ে কি করে থাকব? পরক্ষণেই ভাবল, মানুষ অভ্যাসের দাস, একদিন ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে। ঈশ্বর আমার থেকে তুমি বনির বাবাকে অকালে কেড়ে নিয়েছ, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, মানিয়ে নিয়েছি সব মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে। বনি কে তুমি সুখী কর। একমাত্র ওর সুখেই আমার সুখ।



বনির বিয়ে হয়ে গেল অর্কর সাথে। সুখেই জীবন কাটাচ্ছে। কালের নিয়মে রেবতী দেবী নাত জামাই দেখে, নাতনীর সুখের জীবন দেখে পরপারে স্বামী, ছেলের কাছে চলে গেলেন।


পুরো বাড়িতে অনিন্দিতা এখন একা। অফিস থেকে এসে ভীষণ একা লাগে ওর। রান্নার, বাড়ির অন্যান্য কাজের লোক আছে। গল্পের বই পড়েও রাতে ঘুম আসতে চায় না। ফোনে ফেসবুক করতেও ভালো লাগে না। জীবনটাই যেন তার একঘেয়ে হয়ে গেছে। এত দিন কর্তব্য করতে করতে সময়টা কোথা দিয়ে যে কেটে গেল বুঝতে পারে নি। এখন সময় যেন কাটতে চায় না। দিনের বেলা কাজের মধ্য দিয়ে কেটে গেলেও রাতটা যেন কাটতে চায় না। বনি যখন তার কাছে আসে তখন কিছুদিন থাকে। সেই সময়টা সুন্দর ভাবে কাটে। কিন্তু বনি চলে গেলে আবার সেই এক অবস্থা। মেয়েকে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। কিন্তু উপায় নেই।


- ক্রমশ-


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Inspirational