STORYMIRROR

sanjoy sarkar

Tragedy Classics Others

4  

sanjoy sarkar

Tragedy Classics Others

স্মৃতির ট্রেনের শেষ হুইসেল

স্মৃতির ট্রেনের শেষ হুইসেল

3 mins
12

আজকাল সকালগুলো শুরু হয় অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে আর আঙুলের ডগায় স্ক্রল করা একরাশ যান্ত্রিক খবরে। অথচ আমাদের মনে পড়ে কি? একটা সময় ছিল যখন সকাল হতো রেডিওর নব ঘুরিয়ে ভেসে আসা মহালয়ার সেই গম্ভীর সুর অথবা সলিল চৌধুরীর গানের মূর্ছনায়। তখন পৃথিবীটা এত চওড়া ছিল না, কিন্তু মানুষের মন ছিল অনেক বেশি প্রশস্ত। পাড়ার রোয়াকে বসে দাদুদের চড়চড়িয়ে খবরের কাগজ পড়া, আর মায়েদের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেই চেনা মশলার গন্ধ—সেটাই ছিল আমাদের আসল পৃথিবী।


আমাদের শৈশবটা ছিল ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালি দিয়ে ঘেরা রবিবারের প্রতীক্ষায়। সেই দুপুরে টিভিতে ‘জঙ্গল বুক’ বা ‘শক্তিমান’ দেখার উন্মাদনা, আর জানলার ওপাশে চড়া রোদে ঘুঘুর ডাক। মায়ের হাতের মুরগির পাতলা ঝোল আর গরম ভাতের সেই যে গন্ধে গোটা দুপুরটা ম ম করত, সেই তৃপ্তি আজ দামী রেস্তোরাঁর এসি-র নিচে বসেও খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন লোডশেডিং হলে আমরা বিরক্ত হতাম না, বরং মোমবাতির আলোয় দেওয়ালে আঙুল দিয়ে ছায়ার খেলা দেখতাম। সেই অন্ধকারে দাদুর বলা ভূতের গল্পগুলো আজ এইচডি (HD) স্ক্রিনের থ্রিলার মুভির চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব ছিল।

স্কুলবেলার সেই দিনগুলো ছিল এক অদ্ভুত মায়ার বাঁধন। বন্ধুদের সাথে টিফিনে ভাগ করে নেওয়া চাটনি বা লজেন্স। ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে দেখা প্রথম প্রেম, চিঠির নীল কাগজে লেখা কয়েকটা কথা, আর উত্তরের জন্য সেই অনন্ত অপেক্ষা। তখন 'ব্লু টিক'-এর ভয় ছিল না, ছিল কেবল বুক ধড়ফড় করা এক অন্যরকম মাদকতা। কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার পথে বন্ধুর সাথে সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে হাত ছেড়ে চালানো আর অকারণে হাসাহাসি—সেই দিনগুলো ছিল নির্ভেজাল বন্ধুত্বের সোনার সময়।

উৎসব মানেই ছিল এক অন্যরকম আন্তরিকতা। পুজোর সেই আমেজ, নতুন জামার গন্ধ আর পাড়ার মণ্ডপে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকার আনন্দ। নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়া মানে ছিল কলার পাতায় খাওয়ার লাইন, আর বাড়ির বড়দের সাথে অহেতুক আড্ডা। তখন লোকেশন শেয়ার করার দরকার হতো না, কারণ হৃদয়ের টানগুলো ছিল খুব পোক্ত। কারও বাড়িতে বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠান থাকলে গোটা পাড়াটা যেন এক হয়ে যেত, সবাই মিলে ভাগ করে নিত আনন্দ-বেদনা।

আজ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে আমাদের হাতে দামী স্মার্টফোন, ৫জি নেটওয়ার্কে আমরা সেকেন্ডে পৃথিবীর ওপ্রান্তের ছবি দেখছি। কিন্তু সেই বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা ভাসানোর যে অনাড়ম্বর আনন্দ ছিল, সেটা আজ এই হাই-রেজোলিউশন স্ক্রিনে খুঁজে পাওয়া দায়। আমাদের চারপাশের পরিবেশ পাল্টে গেছে, সেই সবুজ মাঠগুলো এখন কংক্রিটের জঙ্গল। মানুষের আন্তরিকতা এখন স্মার্টফোনের ইমোজিতে বন্দী, আর বন্ধুত্বের আড্ডাগুলো এখন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের চ্যাটে সীমাবদ্ধ। এখনকার মানুষগুলো বড্ড বেশি ব্যস্ত, বড্ড বেশি একা।

ঘরের কোণে রোবট ভ্যাকুয়ামটা যান্ত্রিকভাবে ধুলো পরিষ্কার করছে নিখুঁতভাবে, কিন্তু সেই ধুলোর সাথে মিশে থাকা হাজারো স্মৃতি কি সে ঝাড়ু দিতে পারছে? আমরা হয়তো অনেক উন্নত হয়েছি, অনেক আধুনিক হয়েছি, কিন্তু সেই মন্থর জীবনের প্রতিটা মোড়, সেই রেডিওর গান, রবিবারের সেই দুপুর আর পাড়ার গলিগুলো আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মনে হয়, সেই দিনগুলো আর ফিরবে না, সেগুলো এখন কেবল আমাদের গভীরতম স্মৃতির কোঠায় এক ঝলক বেদনা হয়ে বেঁচে আছে।

আমরা এখন ৫জি-তে ছুটছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের অবচেতন মন আজও স্মৃতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে সেই নব্বইয়ের দশকের শেষ ট্রেনের জন্যই অপেক্ষা করে থাকে। সেই ট্রেন হয়তো কোনোদিন আসবে না, কিন্তু তার স্মৃতির ইঞ্জিন আজও আমাদের হৃদয়ে মৃদু শব্দ করে চলেছে, যা শুনে চোখ ভিজে ওঠে এক অচেনা শূন্যতায়।

"আপনার শৈশবের কোন স্মৃতিটা আজও আপনাকে কাঁদায়? কমেন্টে জানান।"...



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy