মেঘলা আকাশ
মেঘলা আকাশ
একটি জনবহুল রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ কারো জন্যে অপেক্ষা করা সত্যি খুব কষ্টকর অভিজ্ঞতা। তারপর যদি তার সাথে জড়িয়ে থাকে প্রিয় মানুষটার জন্য জমে থাকা এক গোছা দুশ্চিন্তা।
এখনকার যুব সমাজ এমনিতেই নানা পার্থিব চিন্তায় বিপর্যস্ত - তার উপর যদি ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হলে জীবনটা দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। তখন হতাশা যেন জীবনটাকে ঘিরে ধরে - তখন ভীষণ ক্লান্ত লাগে। অবশেষে শবরীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রায় ঘন্টা দু’য়েক অপেক্ষার শেষে প্রিয়া এলো। কুনাল রেগে প্রশ্ন করলো- এতো তাড়াতাড়ি এলে?
ঘর্মাক্ত প্রিয়া ওড়না দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বললো- তাড়াতাড়ি করে বের হতে গিয়ে মোবাইলটা বাড়িতে ভুল করে ফেলে রেখে এসেছি। বাসে চাপার কিছুক্ষণ পরেই প্রচণ্ড শব্দ করে বাসটার পেছনের বাম পাশের চাকাটা ফেটে গেলো। বাসটা কাত হয়ে রোডের ধারে একটা গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যাক বাসের মধ্যে সেরকম ভাবে কারুর কোনো কিছুই চোট লাগেনি।
কুনাল বললো- আমি দুই থেকে তিনবার তোমার মোবাইলে রিং করেছিলাম, সুইচ অফ বলছিলো। ভাবলাম বাড়ি থেকে বের হতে পারোনি, হয়তো সে কারনে লজ্জায় মোবাইলটা সুইচ অফ রেখে দিয়েছো?
প্রিয়া বললো- মোটেই না। বাড়িতে বাবা সকালবেলায় সব্জির বাজার করতে বেরিয়ে যেতেই- আমি সেই সুযোগে ঝটপট করে বেরিয়ে পড়লাম। মা ঠাকুর ঘরে বসে পুজো সারছিলো। কুনাল প্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বললো- আর বলতে হবে না, তারপর তুমি তোমার মাকে বললে- মা আমার বাড়ি ফিরতে একটু দেরী হবে, অনিতার বাড়িতে চললাম।
প্রিয়া রীতিমতো অবাক হয়ে বললো- হুমম ঠিক, অদ্ভুত তুমি কি করে জানলে?
কুনাল মুচকি হেসে বললো- কিছু কিছু ভাবনার অনুমান খুব সহজেই করা যায়, আবার কিছু কিছু অনুমান আকাশ -পাতাল ভাবিয়ে তোলে।
প্রিয়া বললো- কই আমি তো তোমার মতো ভাবনার গভীরে যেতে পারিনা? আমার ভাবনাগুলো ইদানিং শুধু তুমি আমিতেই সর্বদা সবসময় ঘোরাফেরা করে।
কুনাল বললো- জানি, বুঝতে পারি ভীষণ। হয়তো সে কারনেই এখনও তোমার অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে বাঁধা হয়ে থেকে গেছি।
প্রিয়া বললো- আমার আজকাল আর কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। বাড়িতে চার দেওয়ালের মাঝে কেমন যেন নিজেকে খাঁচা বন্দী পাখির মতো মনে হয়।
কুনাল মাটির দিকে মাথা নত করে বললো- আমার এখন এই মুহূর্তে কিছুই করার নেই - আসলে করার ক্ষমতা নেই। বাড়িতে অভাবের সংসারে আমি ভীষণভাবে দায়িত্ব, কর্তব্যেবোধে অদ্ভুতভাবে অসহায় জব্দ। একটা মোটা মাইনের কাজের খোঁজ পেয়েছি কিন্তু বাড়ি থেকে অনেক দুরে। আমি বাড়ি ছেড়ে, তোমাকে ছেড়ে দুরে থাকতে কিছুতেই পারবো না। কুনাল চিন্তার ভাঁজ পড়া প্রিয়ার মুখের দিকে চেয়ে রইলো- তারপর আকাশের পানে চেয়ে বললো- মেঘলা মেঘে ঢাকা আমার জীবন।চারিদিকে অদ্ভুত জমাট যেন আমাবস্যার রাতের মতো গভীর ঘন অন্ধকার। আমি সেই অন্ধকারে চড়াই উৎরাই পথে জীবন সংগ্রামে টালমাটাল হাঁসফাঁস করতে করতে সম্মুখপানে হাঁটতে হাঁটতে চলেছি। আমি পারবো না কিছুতেই আমার অন্ধকার জীবনে তোমাকে জোর করে নিয়ে আসতে।
প্রিয়া থমথমে গম্ভীর মুখে নির্বাক হয়ে কুনালের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খিল খিল করে হাসতে লাগলো। কুনাল হতবাক! হঠাৎ এভাবে প্রিয়াকে হাসতে দেখে বললো- এই কি হলো তোমার? একাকীত্বর বোবা কষ্টে মাথাটা একেবারেই গেছে।
প্রিয়া হাসি থামিয়ে বললো- না, মোটেই মাথা খারাপ হয়নি আমার। মাথাটা এখনও ঠিক আছে বলেই আমি তোমার প্রেমে জীবনে বেঁচে থাকার ছন্দ হারায়নি। বরং তোমার কাছে আমি অদ্ভুতভাবে ঋণগ্রস্থ ।আমি শিখেছি কিভাবে সমস্যা,কষ্ট, যন্ত্রণাগুলোকে পা দিয়ে মাড়িয়ে জীবনযুদ্ধে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে হয়। না না আমি ভন্ড প্রেমিকার মতো তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
কুনাল একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললো -প্রিয়া এটা কঠোর বাস্তব।এখানে প্রকৃত প্রেম চড়া দরে বিক্রি হয়ে যায় । মোটা মাইনের ছেলেরা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে যায়, -অসহায় দুর্বল প্রেমিকদের প্রেমিকাদের।
প্রিয়া বললো - কুনাল আমি আছি তোমার সাথে। তুমি দেখো একদিন ঠিক তোমার মেঘলা আকাশটা কেটে যাবে। পূর্ণিমার আলো হয়ে আমি তোমার সাথে জীবনের চড়াই উৎরাই পথে হাঁটবো।জীবনের ক্রমাগত কষ্ট,যন্ত্রণা, সমস্যাগুলোকে হাসতে হাসতে বলবো -আমাদের প্রকৃত প্রেমের কাছে তোমরা -তুচ্ছ, ভীষণ নগন্য তুচ্ছ।
কুনাল প্রিয়ার কথায় আবেগপ্রবন হয়ে নিজের বেরিয়ে আসা চোখের জল সামলে প্রিয়ার হাতটা শক্ত করে নুতন করে জীবনযুদ্ধের শপথ নিয়ে এগিয়ে চলল। ওদের দু চোখ থেকে বেরিয়ে আসা আত্মবিশ্বাসের আলো একদিন জীবনের মেঘলা আকাশ আলোতে ভরে দেবে।

