কাছ থেকে
কাছ থেকে
রমেনবাবু বেশ কিছুটা সময় ধরে , অফিস থেকে আসার সময় বাজার করে থাকেন। আসার সময় ছেলে রোহিত জন্যে , গরম জিলিপি অথবা তেলেভাজা নিয়ে যান। ছেলে স্কুল থেকে এসে , মুখে দুটো ভাত দিয়েই ঘড়ির দিকে চেয়ে থাকে, বিভাস স্যারের জন্যে। সত্যিই ওদের মধ্যে সম্পর্কটা ছাত্র শিক্ষকের মত এতটা গম্ভীর কিংবা মার্জিত একেবারেই নয় , এবং এটা ক্রমে প্রকাশ পেতে থাকে ওদের পারস্পরিক নানান আলোচনার মধ্য দিয়ে। রোহিত কিন্তু সমস্ত কথা বিভাস স্যার কে না বলে কিছুতেই পারেনা , বিভাস ও ক্ষুদ্র থেকে যতটুকু তার স্বঅধিকারে থেকে বলা যায় সবটাই বলে। সেদিন সকালে বিভাস জানিয়ে দেয়, সে আজ আর আসছে না , বাড়িতে জরুরী কিছু কাজ পড়ে যাওয়ায় তাকে আজ শহরের বাইরে যেতে হবে । সেদিন স্কুল থেকে বেশ একটা বিকেলেই ফেরে রোহিত । আজ আর বিভাসস্যার আসছে না বলে ,রোহিত বন্ধুদের সাথে , খুড়তুতো ভাইয়ের ধার করা করে মোটর বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পরে । রমেন বাবু রোজকার মত অফিস থেকে একেবারে বাজারে দিকে ঢুকে পড়লেন। ছেলে পেঁয়াজ কলি খেতে খুব ভালো পায়, আজ তাই মনে করে বাজারে খাস ওটার জন্যেই ঢোকা। রমেন বাবুর অবিশ্যি বাজার করার নিদৃষ্ট কিছু দোকান আছে , কেনাকাটা মোটের ওপর সেখান থেকেই তিনি করে থাকেন, বাকি পুরোটা বাজারই তিনি দরদাম করে আর আড্ডা দিয়ে সময় কাটিয়ে বেড়ান। লোক সেদিন খুব একটা ছিলনা বাজারে, হয়ত শীতের প্রকোপে বেকাবু হয়ে ঘরেই জড়োসড়ো হয়ে পড়েছিল সবাই। ফাঁকা গলিটা দিয়ে , ঢুকে পড়লেন রমেনবাবু সবজি বাজারের মধ্যে। খানিক কিছুটা সময় এদিক ওদিকে একটু ঘুরে পরিবেশ পরিস্থিতির খবরাখবর নিয়ে হরিলাল এর দোকান থেকে এক গ্লাস গরম চা খেয়ে গলাটা একটু সতেজ করে উঠে পড়লেন। এগিয়ে গেলেন আশীষ সেনের দোকানের দিকে, এ বাজারে সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং সতেজ সবজি ওনার কাছেই পাওয়া যায়, নিজের ক্ষেতের বলে বেশ একটা কাঙ্ক্ষিত আত্মগর্ব ও রয়েছে বটে ওনার। মাঝে বর্ষায় ক্ষেতের বেশ কিছুটা ক্ষতি হওয়ার ফলে, কপালে খানিকটা চিন্তার ভাঁজ পড়ে, বেবস্যা সে রকম জমে উঠে না এখন। তাছাড়া অভিজ্ঞতার থেকে প্রযুক্তির জোর এখন ঢের বলে লোক হয়ত খুব একটা ওদিক মারায় না, রমেন বাবুর মত নেহাত যারা এখন সেই সভ্যতাটা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তারাই কিছুটা এসে থাকেন। রমেনবাবু ফকেন সামনে এসে দেখলেন , আজ আশীষ বাবু আসেননি, তার জাগায় মত কাঠের গদিতে বসা একটা বছর ২০ র ছেলে, সে পেছন দিকে ফেরা, হয়ত আসতে আস্তে আশপাশটা গুছিয়ে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রমেন বাবু ডাক দিলেন, কিরে আজ আশীষ আসে নি ?
ছেলেটা পেছন ফেরে তাকাল, দুজনেই কথা আর বলতে পারলোনা, হতভাক হয়ে চেয়ে রইলেন দুজনেই। রমেন বাবু বললেন - তুমি এখানে ?
ছেলেটা মাথাটা লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে নীচু করে ফেলে।
- আজ তোমার ফোন এসেছিল, রোহিত বলছিল শহরের থাকবে না।
বিভাস ধীরে ধীরে স্বরটা খানিকটা নিম্নতার সঙ্গেই বলল - বাবা আজ আসতে পারেনি, এ শীতে আর ওনাকে কষ্ট দিলাম না তাছাড়া ক্ষেতের অতবড় ব্যাপারটা হওয়ার পর বাবা খুব ভেঙে গেছেন , এখন ঠিক আছেন , আর কিছু মনে করবেন না , মিথ্যে কেন বলেছি সেটা হয়ত আর আপনাকে খুলে বলতে হবেনা । আপনি আজ জেনে গেছেন , এরপর আপনার বাড়িতে এসে আপনার আত্ম গ্লানির কারণ হবো না ।
বেশ কিছুটা সময় একটা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ নিরবতায় কাটে।
কিছুটা সময় ধির হয়ে থাকবার পর , রমেন বাবু বললেন - দাও ৫০০ পেঁয়াজ কলি
বিভাস মেপে স্বযত্নে বেগে পুড়ে দিল সবটা ।
- এখনই গুছিয়ে ফেলছ সব প্রশ্ন করলেন রমেন বাবু
বিভাস একটা মৃদু হাসি দিয়ে , হাত ঘড়িটার দিকে চেয়ে বলল - অনেক দূর যেতে হবে , আর অটো এখন পাওয়া যায়না বললেই চলে । তার পর হেঁটে অনেকটা ঢুকতে হয়।
রমেন বাবু জিজ্ঞাস করলেন - একটা মোটর সাইকেল কিনলেই তো পরও, কাজে অনেক সুবিধে হয় তোমার।
বিভাস বলল - তা পারতাম কিন্তু , একটা ভয় জানেন , যদি ভুল করে কিছু ঈশ্বর না করুক দুর্ঘটনা ঘটে , বাবা আর মা একেবারে ভেঙে পড়বে, ছোটো বোঁনটা এখন মাত্র মাধ্যমিক দিল, পড়ার খরচ জুটে যাবে , সেটা চিন্তা নেই কিন্তু আমার কিছু হয়ে গেলে ,ওদের বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে । জানেন মনে ভয় কাজ করে একটা ।
মনে মনে কি একটা ভাবতে ভাবতে রমেন বাবু , বাড়ির যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন ।
যাওয়ার সময় বললেন - তুমি কাল থেকে সকালে আসতে পারবে ?
মুখে একটা হাসি ফুটলো বিভাসের বলে উঠল - পারব , কিন্তু রোহিত ?
গম্ভীর স্বরে রমেন বাবু বললেন - পারবে , তুমি ৭ টায় এসো এখন থেকে, রাত করে বাড়ি ফের না ।
আর হ্যা , সামনের মাসে , আমাদের অফিসে একটা ইন্টারভিউ বোর্ডে বসবে । কিত্নু রোহিত কে তোমাকে কিন্তু পড়িয়ে যেতেই হবে।
সত্যিই বিভাসের মুখের সেই সরল স্বচ্ছ হাসিটাও যেন তার চোখের কোনে আশা জলটাকে ছাপাতে পারেনি ।
