STORYMIRROR

SOURAV Chakraborty

Romance Tragedy Others

3  

SOURAV Chakraborty

Romance Tragedy Others

কিছু কথা

কিছু কথা

4 mins
16

সেদিন বিকালের দিকে বেশ একটা আনমনা হয়েই , আমাদের ধর্মশালার রুমের ঠিক ,হাতের বা পাশে লাগোয়া ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে ছিলাম।

হয়ত কিছুই ভাবছিলাম না , বা ভাবার কোনো প্রবৃতিও ছিল বলেও মনে নেই। নেহাতই এক অজ্ঞাত খামখেয়ালিপনায় নিজেকে খানিক এলিয়ে

দিই আসা যাওয়া পথচারীদের দিকে, বড়ো ইস্পাত বোঝাই করা ট্রাক গুলোর দিকে, পথের দুপাশে টুকরো টুকরো জমে থাকা সমাগমের দিকে,জানি এসব শহুরে দৃশ্য স্বাভাবিক, তবুও মাঝে মাঝে হয়ত চোখ ইচ্ছে করেই জানার পরিসীমার মধ্যেই নতুন অজানার সন্ধান করে থাকে। বেশ কিছুটা সময় এভাবেই ছিলাম ,ধীরে ধীরে দিন পুড়িয়ে , বেলা গড়াতে লাগে। না সেদিন আর কোনো জাগায় ঘুরতে যাওয়া হয়নি, কারণ অবিশ্যি একটাই, গোটা দিনের ট্রেন জার্নি করে, সবাই প্রায় হাঁপিয়ে উঠে।ঠিক হলো পরশু কামাখ্যা, ব্রহ্মপুত্র, বৈশিষ্ট্য আশ্রম ঘুরে আসার। আর পরের দিন শিলংয়ের জন্যে একটা টুরিস্ট বাস ঠিক করে নেওয়া হলো। লক্ষ্য করছিলাম একজন ভদ্রলোককে , পড়নে খানিক ছেড়া একটা ওভারকোট , আধভাঁজ করা একটা ধুলো মাখা প্যান্ট, মাথায় কোকড়ানো চুল, ক্লান্তি এবং একটা বিমর্ষতা যেন তার মলিন মুখের মাল্লিন্যতা আরো দ্বিগুণ করে তুলেছিল। সে এককোনে বসে ছিল, মাঝে কিছু মন্দিরের খুঁটিনাটি কাজ করে বেড়াচ্ছে। দুপুরে যখন খাওয়ার ঘরে ঢুকলাম, তখনও লক্ষ্য করছিলাম , ভদ্রলোক হাঁটু গেড়ে এক কোণে বসে , পাত থেকে ঠুক্রিয়ে ঠুক্রিয়ে, সবজি বেছে খাচ্ছিলেন। সাধারণত এনাঁড়া আমাদের দৃষ্টিগোচর থেকে খানিকটা দূরেই থাকেন।আমি খেয়ে দেয়ে উঠে মুখ ধুয়ে এসে, বাড়ির লোকেদের জন্যে খানিক অপেক্ষার দরুন পায়চারি করছিলাম , হঠাৎ আমাদেরি কেযেন বাড়ির একজন এসে , হাত রুমালে মুছতে মুছতে , ওই লোকটির দিকে চোখে ইঙ্গীদ করে,বলল - ওই লোকটা নাকি এখানকার নন, পরিবারের সাথে হয়ত তীর্থের জন্যেই এসেছিলেন, কিন্তু বিধির নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে, পরিবারের লোকেদের সাথে পথেই বিচ্ছেদ হয়, আর্থিক অবস্থা সেরকম স্বচ্ছল না হওয়াতে, খোঁজ করার উদ্যোগ নিতে পারছেন না। অনেক হাত পাঁ জুড়ে ,কিছু জায়গায় খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে , এখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে মন্দিরের এই ধর্মশালায় মাথা গোঁজার,আর দুবেলা দুমুঠো ভাতের বেবস্থা করতে পেরেছেন। মন্দিরের ঝাড় পোঁচ,আর বাজারের কাজ কর্ম করে, হাতে কিছু পয়সা জোগাড় করে দিন কাটে। এভাবেই প্রায় বহু বছর কাটছে। আমি গিয়ে একবার মন্দিরের লোকেদের জিজ্ঞাস করায়, ওনারাও কিছু কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না। 

সিঁড়ি বেয়ে উপরের উঠতে উঠেতে , আমাদের ঘরের সামনে লক্ষ্য করলাম, বেশ কিছু ছোটো খাটো পুটোলি ,একটা জলের বোতল,একটা চাটাই,সমেত কম্বল বিছানা। পাশে গিয়ে এগিয়ে দেখি একজন গেরুয়াবস্ত্র পড়নে সন্যাসী, জিজ্ঞাস করায় , বললেন , ওনারই এসব আয়োজন, মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেরান তিনি, যেখানেই থাকার বেবস্থা পান কিছুটা সময় কাটিয়ে , আবার বেরিয়ে পড়েন পথে। আমি জিজ্ঞাস করালাম , আপনার এখানে এই বারান্দায়, রোদে সমস্যা হবেনা। তিনি ব্যাপারটা খুব গুরুত্ব দিলেন না , শুধু মৃদু হেসে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেলেন। সত্যিই ভাবতে কি অবাক লাগে যখন , দেখি এরকম ও মানুষ থাকে এবং দিব্যি নিজেদের ঠিক সময়ের সাথে সাথে মানিয়ে চলেও আছেন,যারা নিজেদের সমস্ত লোকেদের হারিয়ে ,দুঃখ কে মনের এক নীরব ব্রাত্য কোণে রেখে জীবনের যুদ্ধে ব্রত হয়ে রয়েছেন। আবার এরকম লোকের ও সন্মুখীন হতে হয়, যিনি নিজের সমস্ত কিছু ত্যাগ করে ,নিজেদের অন্তরে বিরাজমান সেই অসীমের সন্ধানে বিলিয়ে দিয়েছেন। দুপুরে খাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম সন্যাসীর বা পায়ের শেষের আঙ্গুল দুটো কাঁটা পড়ে , একটা শুঁকনো ক্ষতের সৃষ্টি ফুটে উঠছে। আশ্রমের অন্যান্য সাধু মহারাজদের সাথে ওনার আলাদা একটা লৌকিক বেবস্থা করা হয়েছে। খেয়ে দেয়ে সেই সন্যাসী আমাদের ঘরের সামনের দিকের বারান্দায় ,একটা কম্বল পেতে , মাথার নিচে বেশ কিছু বোঝাই করা পুঁটলি আর কাপড় মুড়িয়ে চাপিয়ে একটা বালিশের আকার দিয়ে , মাথা পেতে কিছুটা বিশ্রাম করলেন। হয়ত কখন আবার পায়চারি করতে এসে দেখব তিনি নেই, গন্তব্যহীন কোনো এক পথে সঙ্গে প্রাণশক্তি ছাড়া আর অন্য কোনো 

পাথেয়ও হয়ত থাকবেনা। সন্যাসীর দেখা আর পেলাম না।  

ইতিমধ্যেই বাড়ির লোকেদের জোর গলার চেচামেচি শুনতে পেয়ে, গিয়ে দেখলাম , এক মস্ত কোন্দলের সূচনা হয়েছে। তার আদ্যপান্ত কি ছিল সেটা মোটের ওপর দাঁড়ায়, কথাকাটাকাটি এবং একজন সদস্যের অসাবধানতার জন্যে, সে কোন একটা জিনিস আনতে ভুলে যায়, যার দরুন এই বিবাদ তার চরম সীমায় একেবারে চৌদ্দপুরুষ পর্যন্ত ঘেঁটে আসে।বেশ কিছুটা সময় নিজেদের মধ্যে নানা রকম তিরষ্কার চলে, পড়ে একটা সময় এরকম ও কথা উঠে যেখানে কেউ কেউ বলে ফেলে, এখানে আশাই ভুল হয়েছে , ঘাট হয়েছে, আর নয়, এর পরের বার নিজের সবটা নিজে গুছিয়ে তার পড়ে, এভাবে অপমানিত হওয়ার কোনো মানেই হয়না। কেউ বলে , আনবেই তো , না আনলে একার আর কদ্দুর মুরোদ কিছু করার। মাঝে কথা আরো চলে, কেউ কেউ মধস্ততা করে ব্যাপারটাকে শামালের একটা তাগিদ দেখায়। পক্ষ বিপক্ষের দর্ কষাকষি, এবং তোষামোদও চলে বেশ কিছুটা। এভাবেই ব্যাপারটা শিথিল হয়, কিন্তু সেই উদ্দিপনা হয়ত কারোর মধ্যেই সেরকম ছিলনা, সবাই শুধুই এড়িয়ে যেতে চাইছিল। তার পরের দিন গুলো ঘোরাঘুরিতেই কাটে, ভুল হয়ত নিজেদের নিজেরা কিছুটা অনুভব করে এবং অনেকটা নিজেদের সাবলীল করে নেয়।

 তার পর খুব একটা সময় আশ্রমে কাটেনি। ওই লোকটি ও জানিনা কোথাও চলে গেলেন। আর আমরাও মান অভিমান সাথে বোঝাই করে, বাড়ি ফিরে এলাম।



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Romance