ভাবনার বাইরে
ভাবনার বাইরে
ভাবতেই কেরকম একটা বিষন্নতা গ্রাস করে। কলেজে থাকতে কতই না হৌহল্লুর করেছি,একসাথে ট্র্যাকিং, মিউজিক ব্যান্ড, কলেজ ফেস্ট, এরকম প্রাণবন্ত হাসিখুশি থাকা ছেলে যাকে খুব একটা যত বড় চিন্তাই হউক না কেন , মাথা ঘামিয়ে মুষড়ে পড়ে থাকতে দেখিনি। তার এরকম নির্মম গতি মাঝে ভাবায় যখন কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে জানালার ধারে বসে একা শুধু চেয়ে থাকি ডুবন্ত সূর্যের দিকে।
শেষের দিকে , অর্থাৎ কলেজ ডিগ্রী কমপ্লেশনের কিছুটা মাস আগের কথা বলছি।
তখন নিখিল কিছুদিনের জন্যে বাড়ি গিয়েছিল, ওর একজন নিকটাত্মীয়ের হঠাৎ মৃত্যুতে । সপ্তাহ খানেক পর যখন সে আসে, লক্ষ করি এক বিরাট পরিবর্তন। এ যেন সেই আগের নিখিল নয়, একজন অন্য মানুষ যার শরীরে প্রাণ তো ছিল, কিন্তু বেচে থাকার কোনো ইচ্ছে আর অবশিষ্ট পড়ে নেই, এক সময় যার মুখে হাজার প্রতিকূল পরিস্থিতির পরেও, দুচোখ বুজে একটা বিরাট দীর্ঘ্যশাস তারপর সেই সদাহাস্যমান উজ্জ্বল মুখটা ফুটে উঠত, তার সেই হাসি যেন এক অজানা অভিশাপের ফলে ক্ষয় হয়ে পড়েছিল।আগের মত দুম করে কোত্থেকে এসে পিঠে একটা চাপড় মেরে, সেই কোনো একটা ছোটো বিষয় নিয়েই হউক না কেন, সে আর নির্দ্ধিধায় কৌতুক করে হেসে পুরো ফ্লোর কে মাতিয়ে গমগম করে রাখেনা। সারাদিন নিজের রুমে বসে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে জানালার দিকে, মাঝে মাঝে খিলখিল করে হাসে।সে হাশিও ছিল একরকমের অনভিপ্রেত, মনে হতো এ হাসি নিখিলের হতে পারেনা, কারণ তার চেহারায় জৌলুসের কোনো ছাপ ছিল না সব কিছুই একটা যেন অবয়ক ।মাঝে মাঝে একা বসে রুমের এক কোণে অথবা কখনও টেরেসার স্টোর রুমের পাশে , হাঁটু গেড়ে বসে কার সাথে বির বির করে কথা বলে যেত, আর হাউমাউ করে চোখের জল ঝড়াত।
সত্যি বলতে কি প্রথমদিকে ভেবেছিলাম হয়ত , আকস্কিত মৃত্যু নিখিল কে ,একরকম মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিয়েছিল, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ কিছু দিন চলে। নিখিল পড়াশোনায় ছিল খুবই যাকে বলে obsessed , এমনিতে ছোটো বড় কথায় বোকামো ইয়ার্কি ঠাট্টা করলেও , লেখাপড়ার ব্যাপারে অহেতুক খুতখুতেমি ওর অনেকদিনের ,যেমন পরীক্ষার ৩-৪ সপ্তাহ খানেক আগেই,ওর তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত,কোন বই পড়তে হবে , আগের বছরের প্রশ্ন গুলো লাইব্রেরী তে গিয়ে , ঘেঁটে খোঁজা,আর কত কি, সাধারণত যা ইঞ্জিনিয়ারিং লাইফ এ একেবারে শুরু হয় পরীক্ষার দিন কয়েক আগে। কিন্তু সেই নিখিল এবার একে বারেই দমে গেল, শেষের দিকে আমি আর অরুন নিখিলের রুমে চলে আসি , বিকাশ ওর রুমমেট ছিল, একটা ইটাস্তাত ভাব করে ও ছেড়া দেয় রুম খানা । নিখিলের সাথে খুব একটা যেচে কেউ আর কথা বলে না , ওর ফুটবল টিম এখন আর রোজ গোল দিয়ে একেবারে opponent কে চিত করে আসেনা,এখন ক্যান্টিনে ক্লাসের শেষে গরম খাবারের সাথে শীতের দুপুরে জমাটি আড্ডাও বসেনা। ক্লাসে প্রফেসর একটানা পড়িয়ে চলে যান, মাঝে যেচে কেউ প্রশ্ন করেনা, মজার খিল্লি ওড়ায় না ।মাঝে মাঝে লক্ষ করতাম একেবারে ঠিক মধ্য রাতে আতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠতসে "তুমি চলে যাও"! এই , প্লীজ আমাকে ছেড়ে দাও " আমি তোমাকে চিনি না , আমাকে ছেড়ে দাও , মুক্তি দাও", আমি বাঁচতে চাই।
কখনও দেখতাম হাঁটু গেড়ে মাথা গুজীয়ে , দু হাত চেপে কাদত, শুরুর দিকে আমরা সবাই মিলে ওকে divert কিংবা ব্যাপারটা জানার অনেক বৃথা চেষ্টা করেছি। হ্যাঁ একটা জিনিস ও শেষের দিকে খুব বলত, কালো ছায়া, একদল কালো ছায়া ,ওকে নাকি তারা করে বেড়ায়, কানে কানে এসে মন্ত্র পড়ে, ওদের চোখ গুলো রক্তবর্ণ,বাকি সব ছিল একটা ছায়ার অনুরূপ। ঘটনাগুলুর বেখ্যা কিনবা কোনো সামঞ্জস্যতা খুঁজে না পেয়ে আমার ,পরেশ স্যার অর্থাৎ আমাদের , হোস্টেল ওয়ার্ডেন অন্যদিকে তিনি আমাদের কলেজ mental health counsellor ছিলেন, ওনাকে ঘটনাটা জানাই আমরা । উনি তখন নিজেই একা এসে নিখিলের সাথে সাধারণ ভাবে একটা যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন। হঠাৎ একটা বিকট আর্তনাদ কানে এলে আমরা নিখিলের রুমের দিকে ছুটে যাই, তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য করি পরেশ স্যারও একটা প্রবল উত্তেজনায় ওপাশ থেকে একটা আতঙ্কগ্রস্ত মুখে দরজা খুলে আমাদের হাক দিতে যাচ্ছেন। সবাই আমরা গিয়ে একটা বীভৎস দৃশ্যের সন্মুখীন হলাম, দেখলাম নিখিল খাটের ওপর বসে একঅমানুষিক ভাবে গর্জন করে চলেছে, দু হাত মুঠো করে চেপে মাথার চুলের উপর প্রাণপণে নিজের একটা কোনো জন্ত্রনা জাহির করবার চেষ্টা হয়ত করে চলছিল সে ।তার দু চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে,l একরকম অকস্মাৎ মানুষিক অশান্তির ফলে, শরীর উত্তেজিত হয়ে যে তাপ তৈরি করে , প্রবল রক্তচাপের মধ্যে তা প্রবাহিত হতে থাকে এবং সেটার স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠে নিখিলের রক্তবর্ন মুখের দিকে তাকালে।তখন সামনে ছোটো বড়য যাই পায়, তুলে আছাড় মারছিল, অন্ধকারে দিল ছোরার মত। বার বার সে একটা কথাই বলছিল, " আমাকে ছেড়ে দাও, আমি বাঁচতে চাই, তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি আর পারছিনা , আমাকে মুক্তি দাও" ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কখনও অকাতরে কেঁদে যাচ্ছিল, কখনও আঙুলের তাকে ইশারায়, এক অজানা অদৃশ্যে, প্রচণ্ড আর্তনাদের সঙ্গে প্রতিরোধ করেচলছিল, "আমার কাছে এসো না, আমাকে নিয়ে যেও না , আমি বাঁচতে চাই"। শেষ বার জ্ঞান হারানোর আগে হয়ত ঠোঁটের ফাঁকে কাপা কাপা স্বরে আমাদের উদ্দেশ্যে বলেছিল "বাঁচা ভাই,আমাকে ,আমি আর পারছিনা" তার পর ওর জ্ঞান আর ফেরেনি, পুরো ঘটনাটাই একটা রহস্যের ঘন কালো অন্ধকারে অবন্ধ থেকে চাপা পড়ে, কালের গর্ভে তার মতই নিকাশ হয়ে গেল। মাস খানেক পর, নিখিলের দাদা ফোন করে,একটা বক্সর ব্যাপারে খোঁজ নিতে,কালো রঙ,তাতে কিছু একটা খোদাই করা, ওনার কথায় যা বুঝলাম, ঠিক মানুষের মত দেখতে কিছু প্রাণীর, তাদের হাতে নানা রকম অস্ত্র , বাক্সের দুদিকে দুটো চোখ আঁকা,লালা রঙের, কিছু লেখাও রয়েছে কিত্নু তা একেবারে অপাঠ্য, কিত্নু বহু চেষ্টার পরও বাক্স খোলার উপক্রম নেই,এটা নাকি নিখিলের ব্যাগে পাওয়া গেছে । ওদের কথা অনুযায়ী, নিখিল যখন বাড়ি গিয়েছিল , তখন একবার ব্যাগ পরিষ্কার করার সময় এমন কিছুই মেলেনি, অর্থাৎ কলেজের কারোর জিনিস। আমি বিকাশ মোটের উপর সবাই খুব ঘাটি ব্যাপারটা নিয়ে , কিন্তু সেই বাক্স কোথা থেকে আসল আজও রহস্য। শেষে যদ্দুর শুনেছিলাম জাগ্রত মন্দিরের এক যোগী সেন্যাসীর পরামর্শে সেই বাক্সটি গঙ্গার জলে ফেলে এসেছে নিখিলদের বাড়ির লোকেরা।

