হলুদ খামের উপাখ্যান
হলুদ খামের উপাখ্যান
পুরোনো কাঠের কবাটটা খুলতেই শ্রীতমার নাকে এসে লাগল এক চেনা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। তার সঙ্গে মিশে আছে ন্যাপথলিন আর বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা কাঠের আলমারির পুরোনো গন্ধ।
বাবার মৃত্যুর পর আজ প্রায় ছয় মাস কেটে গেছে। এতদিনে সাহস করে সে এই বিশাল, প্রায় জরাজীর্ণ বনেদি বাড়িটা পরিষ্কার করতে হাত দিয়েছে। বাড়িটা তাদের পূর্বপুরুষদের। একসময় যেখানে সারাদিন মানুষের আনাগোনা, হাসি-আনন্দ আর উৎসব লেগেই থাকত, আজ সেখানে শুধু নীরবতা আর অতীতের স্মৃতি।
বাকি ভাই-বোনেরা যে যার কাজে ব্যস্ত। তাই পুরোনো বাড়িটা পরিষ্কার করার দায়িত্বটা একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল শ্রীতমা।
ধুলোয় ঢাকা আলমারি, পুরোনো আসবাব, বিবর্ণ ছবি—সবকিছু সরাতে সরাতে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে পরিবারের অতীতের একেকটা বন্ধ দরজা খুলছে।
হঠাৎ আলমারির একেবারে ওপরের তাকে তার চোখ আটকে গেল।
ঝুলকালির পুরু আস্তরণে ঢাকা পড়ে থাকা একটা ভারী, মরচে ধরা লোহার বাক্স।
কৌতূহলী হয়ে শ্রীতমা বাক্সটা নামাল। আশ্চর্যের বিষয়, তার পাশেই একটা ছোট পেতলের কৌটোর মধ্যে চাবিটা রাখা ছিল।
চাবিটা তালায় ঢোকাতেই কড়কড় শব্দ করে তালাটা খুলে গেল।
ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো দলিল, কয়েকটি রুপোর মুদ্রা আর নানা অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
কিন্তু একেবারে নিচে রাখা জিনিসটা দেখে শ্রীতমার হাত থেমে গেল।
একটা পুরোনো, হলদে হয়ে যাওয়া চারকোনা খাম।
খামের ওপর কোনো ডাকটিকিট নেই। শুধু কাঁপা-কাঁপা নীল কালিতে লেখা—
‘ইতি, তোমার সাহেত।’
শ্রীতমা কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সাহেত কে?
তাদের পরিবারে তো এই নামে কাউকে সে কখনও শোনেনি!
আর এত বছর ধরে এই চিঠিটাই বা এই অন্ধকার বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছিল কেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চিঠিটা যার পাওয়ার কথা ছিল, সে কি কোনোদিন এই চিঠিটা চোখে দেখেছিল?
কৌতূহল আর সামলাতে না পেরে শ্রীতমা তার বড় বোন দেবপ্রিয়া আর মেজো বোন স্নেহাকে ফোন করে বাড়িতে আসতে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই বোন এসে হাজির।
তিন বোন মিলে পুরোনো ঘরের মেঝেতে বসে সাবধানে খামটা খুলল।
চিঠিটা বের করতেই পুরোনো কাগজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে।
আর চিঠির প্রথম কয়েকটি লাইন পড়েই তিন বোনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
চিঠিটা লেখা হয়েছিল তাদেরই ঠাকুরদা—অভিজিতের উদ্দেশে।
কিন্তু কে এই সাহেত?
কেন তিনি অভিজিতকে চিঠি লিখেছিলেন?
আর কেন সেই চিঠি কোনোদিন অভিজিতের কাছে পৌঁছায়নি?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিন বোনের সঙ্গে এবার যোগ দিল তাদের একমাত্র দাদা সূর্য এবং ছোট বোন সায়ন্তিকা।
পাঁচ ভাই-বোন মিলে যেন নিজেদের পরিবারের এমন এক ইতিহাসের সামনে দাঁড়াল, যার কথা কেউ কখনও তাদের বলেনি।
বাড়ির বৃদ্ধ নায়েবমশাইকে ডেকে সাহেতের নামটি বলতেই বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“এই নামটা তোমরা কোথায় পেলে?”
সূর্য পকেট থেকে হলুদ খামটা বের করে তাঁর হাতে দিল।
বৃদ্ধ কাঁপা হাতে খামটা দেখলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এত বছর পর আবার এই চিঠি ফিরে এল!”
পাঁচ ভাই-বোন অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
নায়েবমশাই পুরোনো কাঠের একটা আলমারি খুলে সেখান থেকে কয়েকটা ডায়েরি বের করলেন।
“সব কথা আমি জানি না। তবে এই বাড়ির পুরোনো ডায়েরিগুলো হয়তো তোমাদের কিছু উত্তর দিতে পারবে।”
একটার পর একটা পাতা উল্টাতে উল্টাতে ধীরে ধীরে সামনে এল এক বিস্মৃত ইতিহাস।
সাহেত ছিলেন অভিজিতের সৎ ভাই।
একসময় দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল গভীর ভালোবাসা। তারা একে অপরকে ছাড়া ভাবতেই পারত না। ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা—সবকিছুতেই তারা ছিল একে অপরের সঙ্গী।
কিন্তু সেই সম্পর্ক বেশিদিন টিকল না।
পরিবারের কিছু লোভী মানুষ সম্পত্তির লোভে দুই ভাইয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে শুরু করল।
একদিন বাড়ির মূল্যবান কিছু জিনিস চুরি গেল।
আর সমস্ত অভিযোগ গিয়ে পড়ল সাহেতের ওপর।
প্রমাণ না থাকলেও পরিবারের অনেকেই তাকে চোর বলে বিশ্বাস করল।
সাহেত যতই নিজের নির্দোষিতা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেউ তাঁর কথা শুনল না।
পরিবারের সম্মান, সম্পত্তি আর লোকলজ্জার কথা তুলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল—অভিজিৎও তখন তাঁর ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করেননি।
ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকেই অবিশ্বাস পাওয়া সাহেতকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
তবুও তিনি অভিজিৎকে ঘৃণা করেননি।
বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন, একদিন হয়তো তাঁর দাদা সত্যিটা বুঝবেন।
সেই আশাতেই তিনি লিখেছিলেন সেই চিঠি।
কিন্তু চক্রান্তকারীরা চিঠিটা অভিজিতের হাতে পৌঁছাতেই দেয়নি।
অভিজিৎ আজীবন নিজের ভাইকে ভুল বুঝে ঘৃণা করেই মারা গেলেন।
আর সাহেত?
তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন তাঁর দাদার ক্ষমার জন্য।
এতক্ষণ পর্যন্ত গল্পটা ছিল কষ্টের। কিন্তু আসল রহস্য তখনও বাকি।
সূর্য চিঠির পাতাগুলো একবার করে উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ থেমে গেল।
চিঠির শেষ পাতাটা অন্য পাতাগুলোর তুলনায় কিছুটা ভাঁজ করা ছিল।
সে সেটাকে খুব সাবধানে খুলে আলোয় ধরল।
সেখানে শুধু অভিজিতের প্রতি সাহেতের ভালোবাসা আর আকুলতাই লেখা ছিল না।
ছিল এমন এক সত্য, যা তাদের বর্তমান জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
সাহেত লিখেছিলেন—পৈতৃক সম্পত্তির যে অংশ নিয়ে তাদের দুই পরিবারের মধ্যে আজও আদালতে মামলা চলছে, সেই সম্পত্তির আসল অধিকার তিনি নিজের নামে নেননি।
বরং অভিজিতের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি গোপনে সেই সম্পত্তি তাদের জন্য ট্রাস্ট করে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন।
আর সেই গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও উইলের নিরাপদ কপি লুকিয়ে রেখেছিলেন এই বাড়িরই একটি গোপন কুঠুরিতে।
কিন্তু সেই কুঠুরির সন্ধান পাওয়ার উপায়ও তিনি চিঠিতে লিখে গিয়েছিলেন।
বর্তমান প্রজন্মে এসে সেই সম্পত্তির মামলা তাদের পরিবারকে প্রায় দেউলিয়া করে দিয়েছিল।
আর আজ, এত বছর পর, একটা পুরোনো হলুদ খাম যেন হঠাৎ তাদের সামনে আশার দরজা খুলে দিল।
চিঠির শেষ দিকে ছিল একটি অস্পষ্ট সংকেত—
‘ঠাকুরঘরের ঠিক পেছনের দেওয়ালে যেখানে রাধাকৃষ্ণের পুরোনো তৈলচিত্রটা ঝোলানো আছে, তার ঠিক নিচেই আছে সেই অন্ধকার ইতিহাস।’
পাঁচ ভাই-বোন আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না।
সূর্যের হাতে একটা পুরোনো টর্চ।
আর শ্রীতমা পরম যত্নে বুকের কাছে ধরে রেখেছে সেই হলুদ খামটা।
দেবপ্রিয়া, স্নেহা আর সায়ন্তিকা ঘরের চারপাশের ধুলো আর ঝুল সরাতে সরাতে এগিয়ে চলল।
বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা ঠাকুরঘরটায় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
দেওয়ালে ঝুলতে থাকা রাধাকৃষ্ণের পুরোনো তৈলচিত্রটা ধুলো আর মাকড়সার জালে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সূর্য সাবধানে ছবিটা দেওয়াল থেকে নামাতেই দেখা গেল পেছনের চুনকাম খসে পড়া, নোনা ধরা একটা দেওয়াল।
স্নেহা হতাশ গলায় বলল,
“কোথায়, শ্রীতু? এখানে তো কিছুই নেই!”
শ্রীতমা আবার চিঠির পাতাটা পড়ল।
সেখানে আরও একটা সংকেত ছিল—
‘তিনবার টোকা দিও প্রদীপ রাখার খোপটায়।’
শ্রীতমা দেওয়ালের এক কোণে থাকা পাথরের তৈরি পুরোনো প্রদীপ রাখার কুলুঙ্গিটার কাছে গেল।
কাঁপা আঙুলে সে কুলুঙ্গির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেখল।
তারপর ঠিক তিনবার টোকা দিল।
টক।
একবার।
টক।
দুবার।
টক।
তিনবার।
পরের মুহূর্তেই ভেসে এল এক অদ্ভুত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ।
শত বছরের পুরোনো কোনো যন্ত্র যেন দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠল।
দেওয়ালের একটা অংশ সামান্য ভেতরে ঢুকে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে ডানদিকে সরে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক ঝাঁক চামচিকের ডানার শব্দ আর বহু বছরের বদ্ধ, স্যাঁতসেঁতে বাতাস।
সবাই কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
সূর্য টর্চটা ভেতরে ফেলল।
দেওয়ালের ওপারে ছিল একটা ছোট্ট গোপন কুঠুরি।
কুঠুরির ঠিক মাঝখানে একটা পুরোনো সেগুন কাঠের জলচৌকির ওপর মখমলের কাপড়ে ঢাকা ছিল একটি ছোট হাতির দাঁতের কারুকাজ করা বাক্স।
সূর্য ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল।
সায়ন্তিকার মুখ থেকে অজান্তেই একটা মৃদু চিৎকার বেরিয়ে এল।
তবে বাক্সের ভেতরে কোনো সোনা-দানা বা হিরে-জহরত ছিল না।
ছিল আরও মূল্যবান কিছু।
সেখানে সাজানো ছিল অভিজিৎ আর সাহেতের ছেলেবেলার কয়েকটি খেলনা।
একটা পুরোনো, ভাঙা মাউথ অর্গান।
আর তার ঠিক নিচে—
আদালতের সিলমোহর দেওয়া আসল উইল এবং দেবোত্তর সম্পত্তির গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
সাহেত নিজের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অভিজিতের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
চক্রান্তকারীরা তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু তাঁর ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারেনি।
দলিলটা হাতে নিয়ে সূর্যের হাত কাঁপছিল।
শ্রীতমার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
শত বছর আগের এক নির্দোষ মানুষের কান্না, ভালোবাসা আর অপেক্ষা—আজ যেন সেই অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুক্ত হয়ে আলোয় এসে দাঁড়াল।
বাড়িটার ভাঙা জানলা দিয়ে তখন বিকেলের নরম সোনাঝুরি রোদ এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে।
শ্রীতমা হলুদ খামটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল।
সূর্য, দেবপ্রিয়া, স্নেহা আর সায়ন্তিকার চোখেও জল।
কিন্তু সেই জলে কোনো হাহাকার নেই।
আছে এক অদ্ভুত শান্তি।
এতগুলো বছর ধরে ভুল বোঝাবুঝি, অপবাদ আর অভিমানের অন্ধকারে যে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক হারিয়ে গিয়েছিল, আজ যেন তারাই মুক্তি পেল।
সাহেত আর অভিজিৎ কেউই আজ এই পৃথিবীতে নেই।
তবুও তাদের ভালোবাসার শেষ সত্যিটা আজ ফিরে এসেছে।
আর সেই সত্যিই বাঁচিয়ে দিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে।
শ্রীতমা ধীরে ধীরে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে তখন বিশাল খোলা আকাশ।
তার মনে হলো, কিছু সম্পর্ক অসমাপ্ত থেকে গেলেও তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
তারা কখনও কোনো পুরোনো চিঠির পাতায়, কখনও কোনো ভুলে যাওয়া স্মৃতিতে, আবার কখনও আগামী প্রজন্মের হাত ধরে নতুন করে ফিরে আসে।
পাঁচ ভাই-বোন একে অপরের দিকে তাকাল।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।
শুধু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শান্ত, আশাবাদী হাসি।
আর ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা সেই পুরোনো হলুদ খামটা যেন নীরবে বলে উঠল—
ভালোবাসার সত্য কখনও সত্যিই হারিয়ে যায় না।
—সমাপ্ত—
