ভাঙাগড়ার এক রূপকথা
ভাঙাগড়ার এক রূপকথা
অত্রির বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। পৃথিবীটা তখনও তার কাছে খুব ছোট—একটা ছোট্ট বাড়ি, বাবার ব্যস্ত মুখ, মায়ের আঁচলের গন্ধ আর বিকেলবেলার ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার অভ্যাস। কিন্তু সেই ছোট্ট পৃথিবীটাও একদিন হঠাৎ ভেঙে গেল।
এক কঠিন রোগে ভুগে অত্রির মা চলে গেলেন। মা কী, মায়ের ভালোবাসা কতটা গভীর—এসব বোঝার মতো বয়স তখনও অত্রির হয়নি। শুধু এটুকু বুঝেছিল, যে মানুষটা প্রতিদিন তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়াতেন, যে কণ্ঠস্বরটা সকালে তাকে ডাকত, সেই মানুষটা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
মায়ের মৃত্যুর পর বাড়িটা যেন কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাবা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। অত্রির যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করলেও মায়ের শূন্যতা তো আর কেউ পূরণ করতে পারে না।
পাড়ার লোকজনও কম কথা বলত না।
কেউ আড়ালে বলত,
“মেয়েটার কপালটাই পোড়া। এত ছোট বয়সেই মাতৃহীন হলো।”
অত্রি কথাগুলোর অর্থ পুরোপুরি বুঝত না। কিন্তু “অভাগা”, “পোড়া কপাল”—এই শব্দগুলো ধীরে ধীরে তার ছোট্ট মনে গেঁথে যেতে শুরু করেছিল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অত্রি একটু চুপচাপ হয়ে গেল। অন্য বাচ্চারা যখন বিকেলে খেলত, সে অনেক সময় বাড়ির ছাদে একা দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।
একদিন বিকেলে টেলিভিশনে সে প্রথমবার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের জওয়ানদের প্যারেড দেখল। ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলোকে দেখে অত্রির চোখ বড় হয়ে গেল। দেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে তারা কীভাবে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে দেশকে রক্ষা করে—সেটা তার ছোট্ট মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলল।
সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অত্রি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“বাবা, যারা বর্ডারে দাঁড়িয়ে দেশকে পাহারা দেয়, তারা কি খুব সাহসী?”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
“হ্যাঁ মা। ওরা নিজেদের কথা না ভেবে দেশের কথা ভাবে।”
অত্রি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
“আমি বড় হয়ে এমন একজনকেই বিয়ে করব।”
বাবা হেসে ফেলেছিলেন।
“কেন?”
অত্রি খুব গম্ভীর মুখে বলেছিল,
“কারণ সে দেশকেও ভালোবাসবে, আমাকেও ভালোবাসবে।”
সেদিনের সেই শিশুসুলভ কথাটা অত্রির মনে আর কখনো মুছে যায়নি।
সময়ের সঙ্গে অত্রি বড় হতে লাগল। পড়াশোনায় সে বরাবরই ভালো ছিল। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু মনের এক কোণে সেই পুরোনো ইচ্ছেটাও রয়ে গিয়েছিল—একজন সাহসী মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া।
অবশেষে একদিন সেই স্বপ্ন সত্যি হলো।
অত্রির জীবনে এল সাহেত।
সাহেত ছিল সীমান্তে কর্মরত এক সৈনিক। চওড়া কাঁধ, পরিশ্রমে শক্ত হয়ে ওঠা শরীর, চোখে অদ্ভুত এক সততা আর মুখে সবসময় লেগে থাকা মৃদু হাসি—প্রথম দেখাতেই অত্রির মনে হয়েছিল, ছোটবেলায় দেখা সেই ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলোর মধ্যে যেন তার স্বপ্নের মানুষটাকেই সে খুঁজে পেয়েছে।
তাদের বিয়ে হলো।
বিয়ের পর অত্রি সাহেতের সঙ্গে সীমান্তের কাছাকাছি একটি ছোট কোয়ার্টারে এসে উঠল। বাড়িটা খুব বড় ছিল না। ছোট্ট দুটো ঘর, একটা রান্নাঘর, সামনে সামান্য জায়গা আর দূরে বিস্তৃত আকাশ।
কিন্তু অত্রির কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাড়ি।
কারণ সেখানে প্রথমবার তার মনে হয়েছিল—সে আর একা নয়।
সাহেতের ডিউটি থাকলে বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যেত। অত্রি নিজের পড়াশোনা করত, বই পড়ত, রান্না করত আর অপেক্ষা করত কখন সাহেত ফিরবে।
আর সাহেত যখন ফিরত, তখন সেই ছোট্ট ঘরটাই যেন প্রাণ ফিরে পেত।
কখনো বর্ডার থেকে ফেরার সময় সাহেত অত্রির জন্য সস্তা কাঁচের লাল-নীল চুড়ি নিয়ে আসত। কখনো রাস্তার ধারে ফুটে থাকা বুনো ফুল তুলে এনে অত্রির হাতে দিত।
একদিন ফুলগুলো দেখে অত্রি হেসে বলেছিল,
“এগুলো কোথা থেকে পেলে?”
সাহেত গম্ভীর মুখ করে বলেছিল,
“খুব বড় জায়গা থেকে।”
“কোথা থেকে?”
“বর্ডারের পাশের ঝোপ থেকে।”
অত্রি হেসে বলেছিল,
“এত গর্ব করে বলার কী আছে?”
সাহেত মুচকি হেসে বলেছিল,
“তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসতে পারলে ছোট জিনিস বলে কিছু হয় না।”
অত্রি তখন কিছু বলতে পারেনি। শুধু ফুলগুলো যত্ন করে একটা গ্লাসে সাজিয়ে রেখেছিল।
ওদের সংসারে বড় কোনো বিলাসিতা ছিল না। কিন্তু ছোট ছোট আনন্দের অভাবও ছিল না।
একদিন সন্ধ্যায় অত্রি রান্নাঘরে একমনে চা বানাচ্ছিল। সাহেত নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অত্রি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাহেত তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল।
অত্রি চমকে উঠে বলল,
“কী করছ সাহেত? হাত থেকে গরম চা পড়ে যাবে!”
সাহেত মৃদু হেসে বলল,
“বর্ডারের ওই রুক্ষ বালির মধ্যে যখন রাইফেলের ট্রিগারে হাত থাকে, তখন শুধু তোমার এই চায়ের গন্ধ আর তোমার মুখটাই মনে পড়ে, অত্রি।”
অত্রি হেসে বলেছিল,
“তুমি না একেবারে পাগল!”
সাহেত উত্তর দিয়েছিল,
“হ্যাঁ, তোমার জন্য একটু পাগল হওয়া যায়।”
ওদের অলস রবিবারগুলোও ছিল অন্যরকম।
অত্রি তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ার-এর পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করছিল। বই খুলে বসলে সাহেতও পাশে এসে বসত। কখনো তার পেন নিয়ে খাতার কোণায় আঁকিবুঁকি করত, কখনো অত্রির ভাঙাচোরা ছবি আঁকার চেষ্টা করত।
অত্রি বিরক্ত হয়ে বলত,
“তুমি বড্ড দুষ্টু হয়েছ! আমাকে পড়তে না দিলে এবার কিন্তু বাবার বাড়ি চলে যাব।”
সাহেত সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলত,
“তা তো হতেই দেওয়া যাবে না।”
“কেন?”
“বর্ডারের শত্রু সামলানো সহজ, কিন্তু তোমার অভিমান সামলানো বড্ড কঠিন জওয়ান সাহেতের পক্ষে।”
অত্রি হেসে ফেলত।
কখনো দুজনে এক থালায় বসে ভাত খেত। কখনো রাতের খাবার শেষ করে বারান্দায় বসে ভবিষ্যতের গল্প করত।
অত্রি বলত,
“আমি পড়াশোনা শেষ করে কলেজে পড়াতে চাই।”
সাহেত বলত,
“তাহলে আমি ছুটিতে এসে তোমার ছাত্র হয়ে যাব।”
“তোমাকে কে পড়াবে?”
“তুমিই।”
“তুমি তো পড়াশোনাই করবে না!”
“তাহলে তুমি আমাকে বকবে।”
“বকবই।”
“তাহলে ঠিক আছে। সংসারে একজন দেশ পাহারা দেবে, আর একজন ছাত্রদের ভবিষ্যৎ।”
অত্রি তখন হাসতে হাসতে বলত,
“আমাদের সংসারটা তাহলে খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে।”
সাহেত তার দিকে তাকিয়ে বলত,
“আমার কাছে তো তুই-ই আমার পুরো পৃথিবী।”
এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাদের জীবন।
বিয়ের পরের সেই এক বছর যেন সত্যিই ওদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বসন্ত হয়ে এসেছিল।
অত্রির মনে হতে শুরু করেছিল, হয়তো তার ছোটবেলার সব কষ্ট শেষ হয়েছে। হয়তো এবার জীবন তাকে একটু সুখ দিতে রাজি হয়েছে।
কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না।
সুখের দিনগুলো যে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, অত্রি তা স্বপ্নেও ভাবেনি।
সীমান্তে হঠাৎ উত্তেজনা বাড়তে শুরু করল। সাহেতের ছুটির সময় তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু একদিন হঠাৎ জরুরি বার্তা এল—তাকে তৎক্ষণাৎ ব্যাটালিয়নে যোগ দিতে হবে।
খবরটা শুনে অত্রির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
সাহেত ব্যাগ গোছাচ্ছিল। অত্রি চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
“আর কয়েকটা দিন থাকলে কি হতো না?” অত্রি খুব আস্তে বলেছিল।
সাহেত তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“ডিউটি ডাকলে সৈনিক কি আর থাকতে পারে?”
অত্রির চোখে জল এসে গেল।
সাহেত তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“কাঁদতে নেই। আমি দেশের সুরক্ষার ডিউটি সেরে ঠিক ফিরে আসব।”
অত্রি কিছু বলল না। শুধু সাহেতের হাতটা শক্ত করে ধরে রইল।
সেদিন বিদায়ের সময় সাহেত একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিল।
অত্রি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সাহেত হাত নাড়ল।
অত্রিও হাত নাড়ল।
তারপর সাহেত চলে গেল।
অত্রি তখনও জানত না, সেটাই হবে তাদের শেষ দেখা।
সেই রাতে সীমান্তে পরিস্থিতি হঠাৎ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শুরু হয় তীব্র গোলাগুলি। সাহেত এবং তার সহযোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান থেকে দেশকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু সেই সংঘর্ষেই সাহেত গুরুতরভাবে আহত হয়।
সহযোদ্ধারা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহেত আর ফিরে আসতে পারেনি।
যে মানুষটা কিছুদিন আগেও অত্রির হাতে কাঁচের চুড়ি তুলে দিয়েছিল, যে মানুষটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মানুষটাই আর কোনোদিন বাড়ি ফিরল না।
সাহেতের মরদেহ যখন জাতীয় পতাকায় আবৃত করে তাদের কোয়ার্টারে নিয়ে আসা হলো, তখন অত্রির চারপাশটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
যে মানুষটা বলেছিল, “আমি ঠিক ফিরে আসব”—সে কী করে আর ফিরবে না?
অত্রি সাহেতের মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ দিয়ে জলও যেন বেরোচ্ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, কেউ তার বুকের ভেতর থেকে পুরো পৃথিবীটা তুলে নিয়ে গেছে।
পাড়ার লোকেরা আবার ফিসফিস করতে শুরু করল,
“দেখলে তো? মেয়েটা জন্ম-অভাগা। ছোটবেলায় মা গেল, এবার স্বামীও গেল।”
এই কথাগুলো অত্রির কানে পৌঁছেছিল।
কিন্তু এবার সে আর ভেঙে পড়ল না।
সাহেত চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন অত্রির কাছে যেন অসহ্য ছিল। ঘরের প্রতিটা জিনিসে সাহেতের স্মৃতি।
চেয়ারটা দেখে মনে হতো সাহেত বুঝি একটু পরেই এসে বসবে।
টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বইটা দেখে মনে হতো, সে এসে আবার বলবে, “এত পড়ছ কেন?”
আলমারিতে রাখা সেই সস্তা কাঁচের চুড়িগুলো হাতে নিলে অত্রির বুকটা কেঁপে উঠত।
এক রাতে অত্রি সাহেতের ছবির সামনে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি তোমার ডিউটি শেষ করে চলে গেছ। এবার আমার পালা।”
সেদিনই অত্রি সিদ্ধান্ত নিল—সে আর কারও দয়ার ওপর জীবন কাটাবে না।
সাহেত দেশের বর্তমানকে রক্ষা করতে নিজের জীবন দিয়েছে। অত্রি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবে।
সে আবার পড়াশোনা শুরু করল।
আত্মীয়রা নানা কথা বলল।
“এখন আবার পড়াশোনা করে কী হবে?”
“স্বামী নেই, একা মেয়ে হয়ে এত কিছু করার দরকার কী?”
“যতটুকু পেনশন পাবে, তাতেই তো চলে যাবে।”
অত্রি কারও কথা শুনল না।
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সে পড়তে লাগল।
যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ত, তখনও তার ঘরের টেবিল ল্যাম্প জ্বলত।
বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে রাখতে কখনো তার চোখ ঝাপসা হয়ে যেত। কখনো অজান্তেই দু-এক ফোঁটা জল খাতার ওপর পড়ত।
তখন সে মাথা তুলে দেওয়ালে ঝোলানো সাহেতের ছবিটার দিকে তাকাত।
মনে হতো, সাহেত যেন ছবির ভেতর থেকে বলছে,
“হাল ছাড়িস না, অত্রি।”
অত্রি আবার বই খুলে বসত।
সে এম.এ পাস করল।
তারপর NET পরীক্ষার প্রস্তুতি নিল।
প্রথমবার পরীক্ষা দিতে যাওয়ার দিন সাহেতের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
“আজ তুমি থাকলে আমাকে নিশ্চয়ই বলতে—ভয় পেয়ো না।”
তারপর সে নিজের মনেই উত্তর দিয়েছিল,
“আমি ভয় পাব না।”
অবশেষে ফল প্রকাশের দিন এল।
অত্রি নিজের যোগ্যতায় প্রথমবারেই NET পরীক্ষায় সফল হলো।
সেদিন অনেকদিন পর তার মুখে সত্যিকারের হাসি ফুটেছিল।
সে সাহেতের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
“দেখলে? আমি পেরেছি।”
কয়েক বছর পর অত্রি একটি নামী সরকারি কলেজের লেকচারার হলো।
প্রথম দিন কলেজে যাওয়ার সময় শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
একসময়ের সেই ছোট্ট, মাতৃহীন, মানুষের কথায় “অভাগা” মেয়েটা আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে বই, চোখে আত্মবিশ্বাস।
কলেজের ক্লাসরুমে ঢোকার পর একঝাঁক ছাত্রছাত্রী শ্রদ্ধার চোখে তার দিকে তাকাল।
অত্রি বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ানো শুরু করল।
তার গলার স্বরে আজ কোনো দুর্বলতা নেই।
আছে দৃঢ়তা।
আছে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে উঠে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস।
সেদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে অত্রি টেবিলে বসে কফির কাপ হাতে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে।
ঘরের টেবিলের ওপর সাহেতের ছবিটা রাখা।
অত্রি ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুমি বর্ডারে তোমার ডিউটি খুব সততার সঙ্গে শেষ করেছ, সাহেত। এবার দেখো, আমি এখানে আমার ডিউটি কত ভালোভাবে পালন করছি।”
একটু থেমে সে আবার বলল,
“আমরা দুজনেই দেশের জন্য লড়ছি। তুমি সীমান্তে লড়েছিলে, আর আমি লড়ছি ক্লাসরুমে—একটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।”
জানলার বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নামছিল।
অত্রি জানত, তার জীবনের গল্পে অনেক ভাঙন ছিল।
মাকে হারানো, সাহেতকে হারানো, একাকীত্ব, মানুষের কটু কথা—সবকিছুই তাকে বহুবার ভেঙে দিয়েছিল।
কিন্তু প্রতিবারই সে নিজের ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে নিজেকেই নতুন করে গড়ে তুলেছিল।
কারণ কিছু মানুষ জীবনে আসে চিরদিন থাকার জন্য নয়—তারা আসে আমাদের জীবনের অর্থ বদলে দেওয়ার জন্য।
সাহেত অত্রির জীবনে এসেছিল ভালোবাসা হয়ে।
চলে গিয়েছিল স্মৃতি হয়ে।
আর অত্রি সেই ভালোবাসাকে বুকের মধ্যে রেখে নিজের জীবনটাকে একটা নতুন অর্থ দিয়েছিল।
ভাঙন তাকে শেষ করে দেয়নি।
ভাঙনই তাকে নতুন করে গড়ে তুলেছিল।
— সমাপ্ত —
