নব্বইয়ের দশকের মুম্বাই
নব্বইয়ের দশকের মুম্বাই
লোকাল ট্রেনের চাকার চেনা ছন্দ, প্ল্যাটফর্মের উপচে পড়া ভিড় আর মানুষের ব্যস্ত পায়ের শব্দ—এই নিয়েই সুমন আর জ্যোতির চেনা বোম্বে। ১৯৯৫ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল। ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস স্টেশনের বিশাল ছাদের নিচে তখন মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ অফিসে যাওয়ার তাড়ায় ছুটছে, কেউ হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরতে ব্যস্ত, আবার কেউ নতুন স্বপ্নের খোঁজে এই শহরে এসে চারপাশের দৃশ্য অবাক হয়ে দেখছে।
সেন্ট্রাল লাইনের ট্রেনটা স্টেশনে এসে থামতেই চারদিকে কোলাহল যেন আরও বেড়ে গেল। সুমন এক হাতে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাতে নিজের ছোট ব্যাগটা সামলে ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে নেমে এল। তার পিছু পিছু কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে নামল ছোট বোন জ্যোতি।
সুমনের বয়স তখন বাইশ। চোখে এই মায়ানগরীতে নিজের একটা পরিচয় তৈরি করার স্বপ্ন, আর পকেটে একটা ছোট ডায়েরি ও কলম। সেই ডায়েরির পাতায় সে প্রতিদিন লিখে রাখত নিজের ভাবনা, নতুন শহরে দেখা বিচিত্র মানুষদের কথা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নানা পরিকল্পনা। অন্যদিকে, জ্যোতি সবে কলেজে পা দিয়েছে। তার চোখে এই বিশাল শহরের প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা বাড়ি, এমনকি ব্যস্ত লোকাল ট্রেনটাও ছিল এক-একটা নতুন বিস্ময়।
পড়াশোনা আর কাজের সূত্রে মাত্র কয়েক মাস আগে তারা এই শহরে এসেছে। নিজেদের শহর, পরিচিত মানুষজন আর বাড়ির নিশ্চিন্ত পরিবেশ ছেড়ে এত বড় শহরে মানিয়ে নেওয়া যে সহজ হবে না, তা তারা আগেই বুঝেছিল। তবু বুকের মধ্যে একরাশ আশা নিয়ে তারা প্রতিদিন নতুন করে শুরু করত।
প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সুমনকে জ্যোতি বলল, “দাদা, একটু আস্তে হাঁটো! তোমার ওই সেন্ট্রাল লাইনের ট্রেনের গতির সঙ্গে আমি আর তাল মেলাতে পারছি না!”
ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কথাটা বলায় সুমন হেসে ফেলল।
“মুম্বাইয়ে টিকে থাকতে হলে এই ট্রেনের গতিতেই দৌড়তে শিখতে হবে, জ্যোতি। এই শহর কারও জন্য থেমে থাকে না। এখানে সুযোগও আছে, প্রতিযোগিতাও আছে। যে নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে, সে একদিন না একদিন ঠিকই এগিয়ে যায়।”
জ্যোতি মুখটা একটু গম্ভীর করে বলল, “তোমার কথা শুনলে মনে হয় সবকিছু খুব সহজ। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে আমরা যে কোথায় হারিয়ে যাব, সেটা ভেবেছ?”
সুমন এবার বোনের দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হাসল।
“হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে নতুন কিছু শুরু করা যায় না রে। চল, আজ বিকেলে তোকে একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে যাব। দেখবি, তোর মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
সারাদিনের কাজ আর পড়াশোনা শেষ করে বিকেলের দিকে দুই ভাই-বোন বেরিয়ে পড়ল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে তারা পৌঁছল মেরিন ড্রাইভে। তখন সূর্যটা ধীরে ধীরে আরব সাগরের বুকে নেমে যাচ্ছিল। আকাশের পশ্চিম দিকটা কমলা আর লাল রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের ঢেউ এসে পাথুরে পাড়ে আছড়ে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে গভীর জলের দিকে।
তারা দুজনে সমুদ্রের ধারে বসে পড়ল। চারপাশে কত রকম মানুষ! কেউ পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে এসেছে, কেউ বন্ধুদের নিয়ে গল্প করছে, আবার কেউ একা বসে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও এই জায়গাটায় যেন একটু শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়।
নব্বইয়ের দশকের বোম্বে তখনও আজকের মতো মোবাইল ফোনের আলোয় ভরে ওঠেনি। মানুষের হাতে হাতে থাকত না স্মার্টফোন, ছবি তোলার জন্য সবাইকে মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরা বের করতে দেখা যেত না। কারও পকেটে থাকত পেজার, আর জরুরি ফোন করার জন্য রাস্তার মোড়ে কিংবা বাজারের কাছে দেখা মিলত হলুদ রঙের পিসিও বুথের। খবর জানার জন্য মানুষ ভরসা করত খবরের কাগজ, রেডিও আর টেলিভিশনের ওপর।
রাস্তার পাশ থেকে ভেসে আসছিল ভেলপুরির টক-মিষ্টি গন্ধ। কোথাও গরম কাটিং চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লোকজন দিনের ক্লান্তি ভুলে গল্প করছিল। দূরের কোনও দোকান থেকে ভেসে আসা গানের সুর মিশে যাচ্ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে। সব মিলিয়ে বোম্বের সন্ধ্যাটা যেন নিজের মতো করে একখানা গল্প লিখছিল।
জ্যোতি অনেকক্ষণ চুপ করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “জানো দাদা, এই শহরটা কত বড়! প্রতিদিন কত মানুষ এখানে আসে ভাগ্য বদলানোর আশায়। কেউ কাজ খুঁজতে, কেউ পড়াশোনা করতে, কেউ আবার নিজের স্বপ্নকে সত্যি করতে। কিন্তু সবাই কি পারে? আমাদের মতো সাধারণ দুজন মানুষেরও কি এই শহরে একটা নিজস্ব পরিচয় তৈরি হবে?”
কথা শেষ করে সে একটু থামল। তার চোখে তখন আনন্দের পাশাপাশি লুকিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা।
“মাঝে মাঝে খুব ভয় করে, দাদা। বাড়িতে থাকলে অন্তত পরিচিত মানুষজন ছিল। এখানে কোনও সমস্যা হলে সবকিছু নিজেরাই সামলাতে হয়। কখনও মনে হয়, আমরা কি সত্যিই পারব?”
সুমন কিছুক্ষণ চুপ করে বোনের কথা শুনল। তারপর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, জ্যোতি। নতুন জায়গায় এসে সবাইকেই একসময় এই ভয়ের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু ভয় পেলেই যদি থেমে যাই, তাহলে স্বপ্নগুলো পূরণ হবে কীভাবে?”
সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু বাড়িগুলোর দিকে তাকাল।
“এই শহরটা বাইরে থেকে যতই কঠিন মনে হোক, এর মধ্যে অনেক মানুষের গল্প লুকিয়ে আছে। কেউ একসময় খালি হাতে এখানে এসেছিল, আজ সে নিজের পরিবারকে ভালো রাখছে। কেউ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। আবার কেউ হয়তো এখনও লড়াই করছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি। আমাদেরও নিজেদের মতো করে এগিয়ে যেতে হবে। হয়তো একদিনে কিছু হবে না, কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করলে একসময় ঠিকই পথ খুঁজে পাব।”
জ্যোতি মৃদু হেসে বলল, “তোমার নিজেরও তো অনেক স্বপ্ন আছে, তাই না?”
“আছে তো বটেই!” সুমন হেসে উত্তর দিল। “আমি চাই, একদিন এমন একটা কাজ করব, যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি। শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের পরিবারের জন্যও কিছু করতে চাই। আর তুই নিজের পড়াশোনা মন দিয়ে শেষ করবি। তোরও একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে।”
“আর যদি আমরা ব্যর্থ হই?”
সুমন এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “ব্যর্থ হওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং কোথায় ভুল হয়েছে, সেটা বুঝে আবার শুরু করার সুযোগ। মনে রাখিস, বড় শহরে শুধু দ্রুত হাঁটলেই হয় না, কখনও কখনও থেমে নিজের পথটাও চিনে নিতে হয়।”
দাদার কথাগুলো জ্যোতির মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। সে বুঝতে পারল, সুমনও যে সবসময় নিশ্চিন্ত থাকে, তা নয়। তার নিজের মনেও নিশ্চয়ই অনেক চিন্তা আর দুশ্চিন্তা রয়েছে। তবু সে সেগুলোকে পাশে সরিয়ে রেখে বোনকে সাহস জোগায়।
সন্ধ্যা আরও ঘনিয়ে এল। রাস্তার আলো একে একে জ্বলে উঠল। দূরে গাড়ির হর্ন, মানুষের কথাবার্তা আর সমুদ্রের ঢেউ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। জ্যোতি মনে মনে ঠিক করল, সে আর এত সহজে ভয় পাবে না। পড়াশোনা মন দিয়ে করবে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে এবং দাদার পাশে থেকে এই শহরকে আপন করে নেবে।
ফেরার পথে তারা একটি ছোট চায়ের দোকানে থামল। সুমন দুটো কাটিং চায়ের অর্ডার দিল। ছোট কাচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে জ্যোতি বলল, “দাদা, জানো, এখন আর শহরটাকে আগের মতো অচেনা লাগছে না।”
“তাই নাকি?” সুমন মজা করে বলল। “সকালে তো বলছিলি, এই শহরে হারিয়ে যাবি!”
জ্যোতি হেসে উঠল। “সকালে যা ভেবেছিলাম, এখন আর তা ভাবছি না। তবে একটা কথা বলো—একদিন যদি সত্যিই আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়, তখন কি আমরা এই মেরিন ড্রাইভে আবার আসব?”
সুমন এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “অবশ্যই আসব। সেদিন হয়তো আমাদের হাতে আজকের মতো ছোট ব্যাগ থাকবে না, মনে এত দুশ্চিন্তাও থাকবে না। কিন্তু এই সন্ধ্যাটা আমরা ভুলব না। কারণ, এই জায়গাতেই তো আমরা নিজেদের স্বপ্নের কথা আবার নতুন করে ভাবলাম।”
দুজনেই হাসল।
তারপর ধীরে ধীরে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল তারা। সামনে আবার সেই ব্যস্ত রাস্তা, সেই লোকাল ট্রেনের ভিড়, সেই চেনা ছুটে চলা মানুষের দল। কিন্তু জ্যোতির মনে এবার আর শুধু ভয় ছিল না। সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল নতুন এক সাহস।
১৯৯৫ সালের সেই শীতের সন্ধ্যায় সুমন আর জ্যোতি জানত না, আগামী দিনে তাদের জীবনে কী অপেক্ষা করছে। তারা জানত না, কত বাধা পেরোতে হবে, কতবার নতুন করে শুরু করতে হবে। শুধু এটুকু জানত—তারা একা নয়। তারা একে অপরের পাশে আছে, আর তাদের স্বপ্নগুলো এখনও বেঁচে আছে।
মুম্বাইয়ের আকাশে তখন রাত নেমে এসেছে। লোকাল ট্রেন আবার ছুটে চলেছে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে। হাজার হাজার মানুষের মতো সুমন আর জ্যোতিও সেই ছুটে চলা শহরের অংশ হয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।
তাদের গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ—একটি ছোট ব্যাগ, একটি ডায়েরি, কিছুটা অনিশ্চয়তা আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলোর শুরু হয় ঠিক এভাবেই।
কারণ, শহর শুধু মানুষের ঠিকানা দেয় না; কখনও কখনও সেই শহরই মানুষকে নিজের পরিচয় খুঁজে নিতে শেখায়।
সমাপ্ত।
