ডিজিটাল ভূত
ডিজিটাল ভূত
সুমন আর আল্পনা দুজনেই পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সুমন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী ছেলে। কোডিং আর বিজ্ঞানের যুক্তির বাইরে অন্য কোনও কিছুর অস্তিত্ব সে সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। অন্যদিকে, আল্পনা যেমন দক্ষ প্রোগ্রামার, তেমনই সাইবার দুনিয়ার অন্ধকার জগৎ, ডার্ক ওয়েব এবং অতিপ্রাকৃত রহস্য নিয়ে পড়াশোনা করতে ভালোবাসে।
একটি নতুন ফ্রিল্যান্সিং প্রজেক্টের কাজ শেষ করার জন্য তারা দুজনে মিলে শহরের এক কোণে একটি পুরনো ও সস্তা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল। ফ্ল্যাটটি বেশ প্রাচীন আমলের হলেও সেখানকার ইন্টারনেটের গতি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুত। প্রজেক্টের কাজের জন্য এমন ইন্টারনেট সংযোগ তাদের খুবই প্রয়োজন ছিল। ডেডলাইন এগিয়ে আসায় দিন-রাত এক করে ল্যাপটপের পর্দায় চোখ রেখে কোডিং করে যাচ্ছিল তারা।
এক ঝড়-বৃষ্টির অন্ধকার রাতে সুমন যখন ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল, তখন হঠাৎ ঘরের আলো একবার তীব্রভাবে জ্বলে উঠে দপ করে নিভে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। জানলার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
আল্পনা নিজের ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সুমনের দিকে তাকাল। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।
ঘরের বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সুমন তার ল্যাপটপটি বন্ধ করে রেখেছিল। অথচ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটির পর্দা হঠাৎ এক অস্বাভাবিক নীল আলোয় জ্বলে উঠল। কোনও রকম নির্দেশ ছাড়াই পর্দায় একের পর এক অক্ষর ফুটে উঠতে লাগল—
“আমি তোমাদের মাঝেই আছি।”
সুমন প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো কোনও হ্যাকার তাদের সিস্টেমে প্রবেশ করেছে, কিংবা কোনও পরিচিত ব্যক্তি তাদের সঙ্গে মজা করছে। সে দ্রুত ওয়াই-ফাই রাউটারটি বন্ধ করে দিল। তারপর ল্যাপটপের পাওয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নীল আলোটি কিছুতেই নিভল না।
বরং পর্দায় একের পর এক নতুন নির্দেশ ভেসে উঠতে লাগল। তাদের কম্পিউটারের পুরনো ফাইলগুলো নিজে থেকেই মুছে যেতে শুরু করল। সুমন মরিয়া হয়ে কিবোর্ডের বোতাম টিপতে লাগল, কিন্তু কোনও কিছুতেই কাজ হলো না।
আল্পনা ঘরের এক কোণে তাকিয়ে খেয়াল করল, নোনা ধরা দেওয়ালের পাশ থেকে যেন বরফশীতল হাওয়া বয়ে আসছে। অথচ জানলাগুলো বন্ধ। ল্যাপটপের নীল আলোয় দেওয়ালের ওপর একটি অস্পষ্ট মানুষের ছায়া কাঁপতে দেখা গেল।
আল্পনা ভয়ে ফিসফিস করে বলল, “সুমন, ওটা কোনও সাধারণ হ্যাকার নয়। নেটওয়ার্ক বন্ধ করার পরেও যদি কোনও অজানা শক্তি এভাবে আমাদের সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। আমার মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাটের সঙ্গে এমন কোনও রহস্য জড়িয়ে আছে, যার ব্যাখ্যা আমাদের পরিচিত প্রযুক্তি দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।”
সুমন কথাটা শুনে হেসে উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই তাদের দুজনের স্মার্টফোন একসঙ্গে নিজে থেকে জ্বলে উঠল। কোনও স্পর্শ ছাড়াই ফোনের সামনের ক্যামেরা চালু হয়ে গেল।
পর্দায় নিজেদের মুখ দেখতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করল, তাদের ঠিক পেছনে সোফায় বসে আছে এক অদ্ভুত অবয়ব।
অবয়বটির মুখ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। তার পরনে এমন একটি পোশাক, যা দেখে মনে হচ্ছিল বহুদিনের পুরনো। সুমন আর আল্পনা দুজনেই একসঙ্গে পেছনে ফিরে তাকাল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। অথচ ফোনের পর্দায় অবয়বটি তখনও স্পষ্টভাবে বসে রয়েছে।
আল্পনা কাঁপা গলায় বলল, “এটা কী করে সম্ভব?”
সুমন কোনও উত্তর দিতে পারল না। তার চোখ তখন ফোনের পর্দায় আটকে আছে।
কয়েক মুহূর্ত পর অবয়বটির মুখ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। আল্পনার মনে পড়ে গেল, বাড়িওয়ালার কাছ থেকে শোনা পুরনো একটি ঘটনা। এই ফ্ল্যাটের আগের ভাড়াটিয়াও একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিল। সে একসময় সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছিল। দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকার পর এক বছর আগে এই ফ্ল্যাটেই তার মৃত্যু হয়। তারপর থেকে ফ্ল্যাটটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে ছিল।
ফোনের পর্দায় দেখা মুখটি সেই মৃত যুবকেরই।
আল্পনার মনে হলো, এই ফ্ল্যাটের পুরনো কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সংযোগ কিংবা অজানা কোনও ডিজিটাল সংকেতের সঙ্গে তার মৃত্যুর রহস্য জড়িয়ে রয়েছে। যেন কোনও অদৃশ্য সত্তা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে আবার ফিরে এসেছে।
সুমনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এতক্ষণ পর্যন্ত সে ঘটনাটিকে প্রযুক্তিগত সমস্যা বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নিজের চোখের সামনে এমন কিছু ঘটতে দেখে তার সমস্ত যুক্তি যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছতেই ইলেকট্রনিক লকটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। সুমন বারবার লক খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু কোনও লাভ হলো না।
ঠিক তখনই ল্যাপটপের পর্দায় নতুন একটি বার্তা ফুটে উঠল—
“লগআউট করার চেষ্টা কোরো না।”
বার্তাটির নিচে ধীরে ধীরে আরেকটি লাইন দেখা দিল—
“তোমরাও আমাকে একা ফেলে চলে যাবে?”
আল্পনা বুঝতে পারল, এই অদ্ভুত সত্তাটি শুধু তাদের ভয় দেখাচ্ছে না। তার মধ্যে জমে রয়েছে গভীর অভিমান, যন্ত্রণা আর ক্রোধ। হয়তো নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোর অসহায়তা থেকেই সে এই ঘরের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলেছে।
কিন্তু এই রহস্যের সমাধান না করলে তাদের দুজনের মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
সুমন এবার নিজেকে সামলে নিল। সে বুঝতে পারল, আতঙ্কিত হয়ে কোনও লাভ নেই। তাদের হাতে যে জ্ঞান রয়েছে, সেটাকেই কাজে লাগাতে হবে। সে আল্পনার দিকে তাকিয়ে বলল, “ও যদি কোনও ডিজিটাল সংকেতের মাধ্যমে আমাদের যন্ত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাহলে আমাদের প্রথমে ওর সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎ আর যোগাযোগের উৎসগুলো আলাদা করতে হবে। হয়তো তাতেই ওর প্রভাব কমবে।”
আল্পনা দ্রুত ঘরের সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সংযোগ পরীক্ষা করতে লাগল। সুমন নিজের ফোনের সাহায্যে রাউটারের সংযোগ, কম্পিউটারের নেটওয়ার্ক সেটিংস এবং অন্যান্য যন্ত্রের কার্যকলাপ পরীক্ষা করল। কিন্তু প্রতিবারই একই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। তারা যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছিল, কিছুক্ষণ পর সেটি আবার নিজে থেকেই চালু হয়ে যাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত আল্পনা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করল, পুরনো বৈদ্যুতিক প্যানেলের কাছে নীলচে আলো জমাট বেঁধে রয়েছে। আলোটি কখনও উজ্জ্বল হচ্ছে, কখনও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি সেখান থেকে গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে।
“সুমন, ওই প্যানেলটার দিকে দেখ! মনে হচ্ছে, এখান থেকেই সবকিছু শুরু হচ্ছে,” আল্পনা চিৎকার করে উঠল।
সুমন এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারল, পুরনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ফ্ল্যাটের একাধিক যন্ত্র অস্বাভাবিকভাবে সংযুক্ত হয়ে রয়েছে। কিন্তু সে প্যানেলটি স্পর্শ করার আগেই ল্যাপটপের পর্দা কেঁপে উঠল। নীল আলোর মধ্যে সেই অবয়বটি আবার দেখা দিল। এবার তার মুখে যেন তীব্র ক্রোধ।
ঘরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল। চারপাশের সমস্ত পর্দায় একই বার্তা ফুটে উঠল—
“আমাকে মুছে ফেলতে পারবে না!”
সুমন বুঝতে পারল, শুধু কম্পিউটার বন্ধ করলেই হবে না। তাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। সে আল্পনাকে নিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে বাড়ির মূল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করল। আল্পনা জরুরি আলো জ্বালিয়ে তাকে সাহায্য করতে লাগল।
হঠাৎ বাইরে বিকট শব্দে বজ্রপাত হলো। সেই মুহূর্তে ঘরের সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্র একসঙ্গে কেঁপে উঠল। ল্যাপটপের পর্দায় নীল আলো এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তারা চোখ খুলে তাকাতেও পারল না।
তারপর এক প্রচণ্ড শব্দে পর্দাটি নিভে গেল।
ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা নীল আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। ঠান্ডা বাতাস থেমে গেল। দেওয়ালের ওপর কাঁপতে থাকা ছায়াটিও অদৃশ্য হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় দরজার ইলেকট্রনিক লকটি খুলে গেল।
সুমন আর আল্পনা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তারা দ্রুত ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু তাদের কাছে সেই বৃষ্টির শব্দও যেন মুক্তির সুর।
সেই রাতেই তারা ফ্ল্যাটটি ছেড়ে চলে গেল। পরদিন সকালে বাড়িওয়ালাকে সব ঘটনা জানালেও তিনি তাদের কথায় বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। তাঁর কাছে ঘটনাটি হয়তো পুরনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি মাত্র।
কিন্তু সুমন আর আল্পনা জানত, তারা যা দেখেছে, তা সাধারণ কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়।
ফ্ল্যাটের ভেতরে পড়ে রইল ক্ষতিগ্রস্ত ল্যাপটপ, নিভে যাওয়া পর্দা আর এক অজানা রহস্যের ছায়া।
তবে গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি।
কয়েক দিন পর সুমন নিজের নতুন ল্যাপটপে কাজ করতে বসেছিল। পুরনো ঘটনার কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল সে। হঠাৎ পর্দার কোণে একটি অচেনা ফাইল দেখা গেল। ফাইলটির নাম—
“I_AM_STILL_HERE”
সুমন ফাইলটি খোলার আগেই সেটি নিজে থেকে খুলে গেল। পর্দায় ভেসে উঠল একটি মাত্র বাক্য—
“তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে, আমি শুধু ওই ফ্ল্যাটেই থাকি?”
সুমনের হাত থেমে গেল কিবোর্ডের ওপর।
ঘরের আলো জ্বলছিল। ইন্টারনেট সংযোগও স্বাভাবিক ছিল। তবু তার মনে হলো, ঠিক পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মানুষ ভেবেছিল, অজানাকে সে একদিন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু সুমন আর আল্পনার অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছিল, কিছু রহস্যের উত্তর হয়তো এখনও মানুষের জানা নেই।
কারণ ভূত যদি সত্যিই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে পারে, তবে তার অস্তিত্বকে আর পুরনো বটগাছ কিংবা পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
সে আশ্রয় নিতে পারে মানুষের তৈরি পর্দায়, অদৃশ্য সংকেতে, এমনকি এমন কোনও ফাইলের মধ্যে—যা খোলার সাহস হয়তো কেউ কোনও দিন করবে না।
সমাপ্ত।

