সময় শেষের ওপারে
সময় শেষের ওপারে
কলকাতার নিউ টাউনের একটা পুরোনো, অন্ধকার গলির শেষ মাথায় সুমনের ল্যাবরেটরি। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সুমন গত পাঁচ বছর ধরে একটা গোপন প্রজেক্টে কাজ করছে—সময়কে জয় করার প্রজেক্ট। আর আজ রাতে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তটা এসেছে। তার সামনে জ্বলজ্বল করছে একটা অদ্ভুত ঘড়ি আর ব্যাকপ্যাকের মতো দেখতে টাইম মেশিন।
মেশিনটা চালু করতেই পুরো ঘরটা নীল আলোয় ভরে গেল। সুমন অতীতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনই ল্যাবের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল রূপসা। রূপসা সুমনের ছোটবেলার বন্ধু, যে সবসময় সুমনের এই পাগলামিকে আগলে রেখেছে।
"সুমন, তুই সত্যি সত্যি এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে নিজের জীবন বাজি রেখে অতীতে চলে যান? যদি আর ফিরে আসতে না পারিস?" রূপসার চোখে জল, গলায় স্পষ্ট আকুলতা।
সুমন রূপসার হাতটা ধরে হাসল। বলল, "রূপসা, তুই তো জানিস আমার বাবা-মায়ের সেই পথদুর্ঘটনাটা যদি আমি অতীতে গিয়ে আটকে দিতে পারি, তবে আমাদের বর্তমানটা বদলে যাবে। আমাকে যেতেই হবে।"
রূপসা আর বাধা দিল না। সুমনের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "তাহলে আমিও তোর সাথে যাব। তুই একা টাইম ট্রাভেলার হবি আর আমি এখানে বসে ছটফট করব, তা হতে পারে না।"
সুমন আর সময় নষ্ট করল না। মেশিনের লিভারটা টানতেই এক তীব্র ঘূর্ণি তাদের গ্রাস করে নিল। চারপাশের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।
যখন সুমন আর রূপসা চোখ খুলল, তারা দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু চারপাশের চেনা বহুতল ভবনগুলো উধাও! সামনে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ, আর দূরে গঙ্গার ঘাটে একটা কাঠের নৌকা বাঁধা। সেখানে একলা এক মাঝি দাঁড়িয়ে আছে।
সুমন নিজের হাতের ডিজিটাল ঘড়িটার দিকে তাকাল। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে—১৬ই অক্টোবর, ১৮২৬ সাল!
তারা তাদের নিজেদের অতীতে নয়, বরং দুশো বছর আগের এক অচেনা কলকাতায় এসে পৌঁছল। রূপসা সুমনের দিকে তাকিয়ে একটু ভয় পেলেও মৃদু হেসে বলল, "এবার কী করবি মিস্টার টাইম ট্রাভেলার? আমরা তো ভুল সময়ে চলে এসেছি।"
সুমন রূপসার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। নৌকার মাঝির দিকে তাকিয়ে বলল, "ভুল সময়ে এলেও, তোর সাথে থাকলে যেকোনো সময়ই পার করে দেওয়া যায়। চল, এই নতুন সময়ের গল্পটা আমরা দুজনে মিলেই নতুন করে লিখি।"
তারা যখন সেই কাঠের নৌকায় চড়ে বসল, ঠিক তখনই সুমনের পকেটে থাকা টাইম ট্রাভেল ডিভাইসটা লাল আলোয় কাঁপতে শুরু করল। স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল: "ক্রিটিক্যাল এরর! বর্তমান পৃথিবী ধ্বংসের মুখে।"
সুমন চমকে উঠল। ভুল সময়ে আসার কারণে টাইমলাইনের ভারসাম্য বিগড়ে গেছে। যদি তারা এখনই ফিরে না যায়, তবে তাদের আসল চেনা পৃথিবীটা চিরকালের জন্য মুছে যাবে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার একমাত্র চাবি—টাইম মেশিনের মূল ব্যাটারিটা তখন নৌকার পাটাতন গলে টুপ করে গভীর গঙ্গার জলে পড়ে গেল!
"এবার কী হবে সুমন?" রূপসা আতঙ্কে সুমনের হাতটা চেপে ধরল। চারপাশের ১৮২৬ সালের আকাশটা হঠাৎ করেই কালো হয়ে কাঁপতে শুরু করেছে, যেন একটা মায়াজাল ছিঁড়ে যাচ্ছে।
সুমন পকেট থেকে তার হাতঘড়িটা ব্যবহার করল। সে জানত, এই ঘড়ির ভেতরে একটা ছোট ব্যাক-আপ পাওয়ার সেল আছে, কিন্তু সেটা ব্যবহার করলে ঘড়িটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে—যা তাদের ফেরার একমাত্র পথ দেখাত। কিন্তু রূপসাকে বাঁচাতে সে যেকোনো ঝুঁকি নিতে তৈরি।
সুমন দাঁতে দাঁত চেপে ঘড়িটা ভেঙে ফেলল এবং তার ভেতরের তারগুলো ডিভাইসের সাথে জুড়ে দিল। গঙ্গার বুকে এক তীব্র বিদ্যুতের আলো চমকে উঠল। নৌকা, মাঝি আর দুশো বছর আগের কলকাতা মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেল।
পরের মুহূর্তে এক বিশাল ঝাঁকুনি দিয়ে সুমন আর রূপসা এসে আছড়ে পড়ল নিউ টাউনের সেই অন্ধকার ল্যাবরেটরির মেঝেতে। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
সুমন হাঁপাতে হাঁপাতে জানলার বাইরে তাকাল। দূরে আইটি সেক্টরের বহুতল বিল্ডিংগুলোর আলো জ্বলজ্বল করছে। তাদের বর্তমান পৃথিবী সুরক্ষিত।
রূপসা সুমনের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, "আমরা ফিরে এসেছি সুমন।"
সুমন রূপসাকে জড়িয়ে ধরে মুচকি হাসল। হাতের ভাঙা ডিজিটাল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল, সেটার সময় এখন চিরতরে থমকে গেছে। তারা টাইম ট্রাভেল হয়তো আর কোনোদিন করতে পারবে না, কিন্তু বর্তমানের এই চেনা পৃথিবীতে একে অপরের পাশে থাকার চেয়ে বড় কোনো সময় আর হয় না।
সমাপ্ত।

