STORYMIRROR

Sayantani Ghosh

Thriller Others

5  

Sayantani Ghosh

Thriller Others

ভবিষ্যতের কলকাতা

ভবিষ্যতের কলকাতা

12 mins
0

সালটা ২০৮৫। কলকাতার চেনা রূপটা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। উত্তর কলকাতার সেই পুরনো ল্যাম্পপোস্ট, টানা রিকশা কিংবা ট্রামের চেনা লাইনের জায়গা নিয়েছে শূন্যে ভাসমান নিয়ন আলোর ফ্লাইওভার আর উড়ন্ত স্বয়ংক্রিয় ক্যাব। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাথায় থাকা পরীটির জায়গায় এখন রয়েছে একটি বিশাল হলোগ্রাম প্রোজেকশন, যা রাতের আকাশে কলকাতার আবহাওয়ার তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পাওয়া নানা আপডেট জানায়। গঙ্গার ওপর দিয়ে এখন আর শুধু ফেরি চলে না, বরং জলের ওপর ভাসমান বিশাল কাঠামোর মধ্যে তৈরি হাইপারলুপ টানেল দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।

শহরের রাস্তায় আর যানজট দেখা যায় না। প্রতিটি গাড়ি চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্দেশে। বাড়ির জানলায় লাগানো বিশেষ পর্দা সূর্যের আলো অনুযায়ী ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে গেলে মানুষের বদলে রোবট বিক্রেতারা জিনিসপত্র তুলে দেয়। এমনকি হাসপাতালেও অধিকাংশ কাজ সামলায় উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র। মানুষের জীবন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই অত্যাধুনিক শহরের কোথাও যেন হারিয়ে গেছে পুরনো কলকাতার সেই চেনা প্রাণ।

এই আধুনিক ও যান্ত্রিক শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত সেন্ট্রাল সায়েন্টিফিক ল্যাবে একসঙ্গে কাজ করে সুমন আর প্রকৃতি।

সুমন একজন দক্ষ রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ার। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার আর বিজ্ঞানের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ। কোনও যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তার ভেতরে কী ধরনের প্রযুক্তি রয়েছে, কিংবা তাকে আরও উন্নত করা যায় কীভাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তার দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যায়। তার স্বপ্ন, এমন এক প্রজন্মের রোবট তৈরি করা, যারা মানুষের দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি মানুষের আবেগও বুঝতে পারবে।

অন্যদিকে, প্রকৃতি একজন পরিবেশবিজ্ঞানী। প্রযুক্তির উন্নতিতে তার আপত্তি নেই, কিন্তু সে বিশ্বাস করে, প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কোনও উন্নয়নই সম্পূর্ণ হতে পারে না। তার মতে, একটি শহরের উন্নতি শুধু উঁচু বাড়ি, দ্রুতগামী গাড়ি কিংবা উন্নত যন্ত্র দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহরে কতটা সবুজ রয়েছে, নদী কতটা নির্মল, আর মানুষ নিজের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে কতটা সম্পর্ক বজায় রেখেছে—সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতি প্রায়ই সুমনকে বলত, “তুমি যন্ত্রকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে চাইছ, সেটা খুব ভালো কথা। কিন্তু মানুষ যদি নিজের চারপাশের প্রকৃতিকেই ভুলে যায়, তাহলে সেই বুদ্ধিমত্তার মূল্য কোথায়?”

সুমন অবশ্য হেসে বলত, “প্রযুক্তি দিয়েই তো আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারব, প্রকৃতি। একদিন এমন ব্যবস্থা তৈরি হবে, যেখানে দূষণ থাকবে না, গাছের অভাব থাকবে না, এমনকি নদীর জলও প্রযুক্তির সাহায্যে বিশুদ্ধ রাখা যাবে।”

প্রকৃতি তার কথায় তর্ক করত না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকত। কারণ সে জানত, প্রকৃতিকে রক্ষা করার প্রযুক্তি তৈরি করা আর প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখা—দুটো এক বিষয় নয়।

এদিকে দুর্গাপুজো আসতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। কলকাতার আকাশে উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। অসংখ্য ড্রোন নিয়ন আলো ছড়িয়ে পুজোর বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় যানবাহনগুলো বিশেষ উৎসবের নকশায় সাজানো হয়েছে। বড় বড় পুজোমণ্ডপে মানুষের বদলে রোবট কর্মীরা আলোর ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের পথ দেখানোর কাজ করছে।

সবকিছুই নিখুঁত, সবকিছুই পরিকল্পিত। তবু প্রকৃতির মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন একটা অভাব রয়ে গেছে। ছোটবেলায় পুজোর সময় সে যে ঢাকের শব্দ শুনত, পাড়ার গলিতে শিউলি ফুলের গন্ধ পেত, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নতুন জামা পরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াত, সেই অনুভূতিগুলো এখন আর আগের মতো নেই। মানুষের হাতে সময় কমে গেছে, আর অধিকাংশ আনন্দই বন্দি হয়ে পড়েছে ডিজিটাল পর্দার মধ্যে।

ঠিক এই সময়েই সুমনের তৈরি করা সবচেয়ে উন্নত হিউম্যানয়েড রোবট ‘রুদ্র’-র সিস্টেমে এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিল।

রুদ্র ছিল সুমনের বহু বছরের পরিশ্রমের ফল। তার ধাতব শরীরের ভেতরে বসানো হয়েছিল অত্যাধুনিক প্রসেসর, উন্নত সেন্সর এবং মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালির অনুকরণে তৈরি একটি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক। তাকে শুধু নির্দেশ পালন করার জন্য তৈরি করা হয়নি। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের আবেগ বুঝতে শেখানো হয়েছিল তাকে।

সুমন রুদ্রর স্মৃতিতে কলকাতার শত বছরের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গান, উৎসব এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল, রুদ্র যেন শুধু একটি যন্ত্র হয়ে না থাকে; বরং কলকাতার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে ভবিষ্যতের মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু পুজোর ঠিক আগের দিন হঠাৎ রুদ্রর মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিল।

প্রথমে সে একটি সাধারণ নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করল। তারপর তার সমস্ত কার্যক্রম ধীরে ধীরে থেমে গেল। সুমন কম্পিউটারে তার সিস্টেম পরীক্ষা করতে বসে দেখল, রুদ্রর প্রসেসর অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে উঠছে। তার কৃত্রিম চোখের কোণ দিয়ে জলের বিন্দুর মতো স্বচ্ছ তরল গড়িয়ে পড়ছে।

সুমন অবাক হয়ে গেল। কারণ রুদ্রর চোখে ব্যবহৃত বিশেষ কুল্যান্ট ব্যবস্থা ছাড়া এমন তরল বেরিয়ে আসার কোনও কারণ থাকার কথা নয়। অথচ পরীক্ষায় দেখা গেল, তার হার্ডওয়্যারে কোনও বড় ত্রুটি নেই।

সুমন দ্রুত প্রকৃতিকে ডেকে বলল, “প্রকৃতি, একবার এদিকে এসো। রুদ্রর সিস্টেমে একটা অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওর হার্ডওয়্যার ঠিক আছে, সেন্সরগুলোও কাজ করছে, কিন্তু ওর এআই কোর বারবার নিজের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করছে। আমি বুঝতেই পারছি না, সমস্যাটা কোথায়।”

প্রকৃতি কাছে এসে রুদ্রর সামনে বসল। সে ধীরে ধীরে রুদ্রর ধাতব হাতটি স্পর্শ করল। তারপর ল্যাবের বিশাল কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।

দূরে কলকাতার আকাশে উৎসবের ড্রোনগুলো রঙিন আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠছে পুজোর শুভেচ্ছা। শহরের প্রতিটি কোণে প্রযুক্তির জয়গান। কিন্তু সেই দৃশ্যের মাঝেও প্রকৃতি যেন দেখতে পেল এক অদ্ভুত শূন্যতা। কংক্রিট, ধাতু আর সিলিকনের তৈরি এই শহরে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

হঠাৎ রুদ্রর মাথার ভেতরে থাকা ছোট্ট ডিসপ্লেটি জ্বলে উঠল। সেখানে একের পর এক পুরনো ছবি ভেসে উঠতে লাগল। ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছিল বহু বছর আগের কলকাতা—ট্রামের লাইন, রাস্তার ধারে মাটির ভাঁড়ে চা বিক্রি করা দোকান, পাড়ার মাঠে খেলতে থাকা শিশু, দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মানুষের ভিড়, আর গাছের ছায়ায় বসে গল্প করতে থাকা কয়েকজন বৃদ্ধ।

একটি ছবিতে দেখা গেল, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। তাদের মুখে কোনও ডিজিটাল পর্দার আলো নেই, বরং একে অপরের সঙ্গে কথা বলার আনন্দ রয়েছে।

প্রকৃতি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সুমনকে বলল, “তুমি রুদ্রর মেমোরিতে কলকাতার শত বছরের ইতিহাস, সাহিত্য আর সংস্কৃতির সব তথ্য ঢুকিয়েছিলে, তাই না?”

সুমন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কী হয়েছে?”

প্রকৃতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার মনে হচ্ছে, রুদ্র শুধু তথ্য বিশ্লেষণ করছে না। ও সেই তথ্যের মধ্যে থাকা জীবনটাকেও বুঝতে চেষ্টা করছে। ওর কাছে কলকাতা মানে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি, উড়ন্ত গাড়ি আর বিশাল অট্টালিকা নয়। ওর স্মৃতিতে থাকা পুরনো কলকাতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো এই শহরের বর্তমান রূপ আর অতীতের স্মৃতির মধ্যে ও একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব খুঁজে পেয়েছে।”

সুমন একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “কিন্তু একটা রোবট কীভাবে এমন অনুভব করতে পারে? ওর তো আবেগ থাকার কথা নয়। ও শুধু তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়।”

প্রকৃতি শান্ত গলায় উত্তর দিল, “মানুষও তো নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর চারপাশের পরিবেশ থেকে অনেক কিছু শেখে। তুমি রুদ্রকে মানুষের আবেগ বুঝতে শিখিয়েছ। ওকে শিখিয়েছ মানুষের মুখের অভিব্যক্তি চিনতে, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বুঝতে, দুঃখ আর আনন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে। তাহলে ওর শেখার প্রক্রিয়ায় এমন কিছু তৈরি হলে তুমি অবাক হচ্ছ কেন?”

সুমন কোনও উত্তর দিল না।

সে আবার কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকাল। সেখানে রুদ্রর মেমোরি লগের মধ্যে একটি পুরনো ডেটা ফাইল নিজে থেকেই খুলে গেছে। ফাইলটির নাম—‘স্মৃতি’।

ফাইলের ভেতরে লেখা ছিল কয়েকটি প্রশ্ন।

‘একটি শহর কি শুধু তার রাস্তাঘাট আর বাড়িঘর দিয়ে তৈরি হয়?’

‘মানুষ যদি নিজের অতীতকে ভুলে যায়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কতটা পূর্ণ হতে পারে?’

‘প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেললে উন্নয়ন কি সত্যিই উন্নয়ন থাকে?’

সুমন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রশ্নগুলো সে রুদ্রকে কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশ হিসেবে দেয়নি। তাহলে রুদ্র নিজে থেকেই এমন প্রশ্ন তৈরি করল কীভাবে?

প্রকৃতি ধীরে ধীরে বলল, “হয়তো রুদ্র আমাদের এমন একটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেটা আমরা এত দিন এড়িয়ে গিয়েছি। আমরা প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি, প্রযুক্তির উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে ভালো করা। যদি সেই উন্নয়নের মধ্যেই মানুষের আনন্দ, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির মূল্য হারিয়ে যায়, তাহলে আমাদের সাফল্যের অর্থ কী?”

রুদ্রর চোখের নীল আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল। তার মাথার ডিসপ্লেতে এবার ফুটে উঠল একটি ছোট্ট বাক্য—

‘আমি কলকাতাকে বুঝতে চাই।’

সুমন দীর্ঘক্ষণ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল, রুদ্রকে তৈরি করার সময় সে কতবার বলেছিল, মানুষের জীবনকে সহজ করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই মানুষগুলোর জীবন থেকে কী কী হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে সে কখনও বিশেষভাবে ভাবেনি।

সে ধীরে ধীরে রুদ্রর পাশে এসে দাঁড়াল।

“রুদ্র, তুমি ঠিক কী খুঁজছ?” সুমন নরম গলায় প্রশ্ন করল।

কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর রুদ্রর কৃত্রিম কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“আমি সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। অতীতের কলকাতায় মানুষের জীবনযাত্রা অনেক বেশি কষ্টকর ছিল। যানজট ছিল, দূষণ ছিল, যোগাযোগের সমস্যা ছিল। বর্তমান কলকাতায় সেই সমস্যাগুলোর অনেকটাই সমাধান হয়েছে। তবু পুরনো কলকাতার মানুষের স্মৃতিতে আনন্দ, সম্পর্ক এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের যে বর্ণনা রয়েছে, বর্তমান তথ্যের মধ্যে তার উপস্থিতি কম। আমি বুঝতে পারছি না, উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে মানুষের এই দূরত্ব কেন বেড়েছে।”

রুদ্রর কথা শুনে প্রকৃতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কারণ উন্নত জীবনযাত্রা আর সুখী জীবন সব সময় এক জিনিস নয়, রুদ্র। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের হয়ে ভালোবাসতে পারে না। একটা গাছের ছায়ায় বসে থাকা, বৃষ্টির গন্ধ নেওয়া, কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে গল্প করা—এই অনুভূতিগুলোকে শুধু তথ্য দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। এগুলোকে অনুভব করার জন্য মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দরকার।”

রুদ্র কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর তার ডিসপ্লেতে পুরনো কলকাতার একটি ছবি ফুটে উঠল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি ছোট্ট মেয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা শিউলি ফুল কুড়িয়ে তার মায়ের হাতে তুলে দিচ্ছে। মায়ের মুখে হাসি।

রুদ্র ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই দৃশ্যটির কোনও ব্যবহারিক প্রয়োজন নেই। ফুলগুলো দিয়ে কোনও যন্ত্র তৈরি করা যাবে না, কোনও যানবাহনের গতি বাড়ানো যাবে না, কোনও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণও দ্রুত হবে না। তবু ছবিটির সঙ্গে মানুষের আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে। আমি কি এই সম্পর্কটাকে বুঝতে পারি?”

প্রকৃতি মৃদু হেসে বলল, “তুই চেষ্টা করতে পারিস, রুদ্র। তবে শুধু পর্দার মধ্যে থেকে নয়। চল, একদিন বাইরে গিয়ে শহরটাকে দেখি।”

পরদিন সকালে সুমন, প্রকৃতি আর রুদ্র ল্যাব থেকে বেরিয়ে পড়ল। দুর্গাপুজোর আগের দিন শহর তখন উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আকাশে ড্রোন উড়ছে, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ছুটে চলেছে, আর বিশাল হলোগ্রামগুলো মানুষের সামনে নানা রকম তথ্য তুলে ধরছে।

তারা প্রথমে গঙ্গার ধারে গেল। সেখানে জলের ওপর দিয়ে দ্রুতগতির যান চলাচল করছে। নদীর দুই পাশে উঁচু ভবন আর প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনকেন্দ্র। কিন্তু এক কোণে এখনও কয়েকটি পুরনো গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের ছায়ায় বসে এক বৃদ্ধ মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন।

রুদ্র বৃদ্ধটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন কেন? আপনার হাতে থাকা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পাত্রটি ব্যবহার করলে চা আরও বেশি সময় গরম থাকবে।”

বৃদ্ধ হেসে বললেন, “তা থাকবে। কিন্তু মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়ার আলাদা একটা আনন্দ আছে, বাবা। এই ভাঁড়ের গন্ধ, চায়ের গরম ধোঁয়া আর নদীর হাওয়া—সব মিলিয়ে একটা অনুভূতি তৈরি হয়। সব কিছুর হিসাব যন্ত্রে মাপা যায় না।”

রুদ্র কথাগুলো নিজের মেমোরিতে সংরক্ষণ করল।

তারপর তারা একটি পুরনো পাড়ার দিকে গেল। সেখানে কয়েকজন মানুষ নিজের উদ্যোগে ছোট্ট একটি পুজোমণ্ডপ তৈরি করছেন। মণ্ডপে আধুনিক আলো ছিল ঠিকই, কিন্তু সাজসজ্জার বড় অংশ তৈরি হয়েছিল হাতে। কয়েকজন শিশু শিউলি ফুল দিয়ে সাজাচ্ছিল মণ্ডপের প্রবেশপথ। দূরে ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

রুদ্র থমকে দাঁড়াল। সে দেখল, মানুষ নিজের হাতে কাজ করছে, একে অপরকে সাহায্য করছে, হাসছে, গল্প করছে। কেউ কোনও নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে না, কোনও যন্ত্র তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করছে না। তবু কাজ এগিয়ে চলেছে।

একটি ছোট্ট ছেলে রুদ্রর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি সত্যিই রোবট?”

রুদ্র মাথা নাড়ল।

ছেলেটি হাসতে হাসতে বলল, “তাহলে তুমি কি আমাদের সঙ্গে পুজো দেখতে যাবে?”

প্রশ্নটা শুনে রুদ্র কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমার সিস্টেমে পুজো সম্পর্কে প্রচুর তথ্য রয়েছে। কিন্তু সরাসরি পুজো দেখার অভিজ্ঞতা আমার নেই।”

ছেলেটি তার হাত ধরে বলল, “তাহলে এবার দেখে নাও!”

প্রকৃতি আর সুমন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। রুদ্র প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, কোনও অভিজ্ঞতার অর্থ শুধু তার সম্পর্কে তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও কখনও সেই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠাও গুরুত্বপূর্ণ।

পুজোমণ্ডপে পৌঁছে রুদ্র দেখল, মানুষ দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছে। কেউ নিজের পরিবারের মঙ্গল কামনা করছে, কেউ প্রিয়জনের সুস্থতা চাইছে, আবার কেউ শুধু কিছুক্ষণের জন্য নিজের ব্যস্ত জীবন থেকে শান্তি খুঁজে নিচ্ছে।

ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, মানুষের হাসি আর চারপাশের উৎসবের আবহ—সবকিছু তার সেন্সরে ধরা পড়ছিল। কিন্তু এবার সে শুধু তথ্য সংগ্রহ করছিল না। প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে মানুষের আচরণের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছিল।

হঠাৎ তার ডিসপ্লেতে একটি নতুন বার্তা ফুটে উঠল—

‘কলকাতার আত্মা শুধু তার ভবিষ্যতে নয়, তার স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের সম্পর্কের মধ্যেও বেঁচে আছে।’

সুমন বার্তাটি পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এত দিন সে রুদ্রকে ভবিষ্যতের যন্ত্র হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিল। আজ সে বুঝতে পারল, ভবিষ্যৎকে সত্যিকারের উন্নত করতে হলে অতীতের মূল্যও বুঝতে হবে।

প্রকৃতি বলল, “আমরা যদি চাই, এই শহরকে আবার সবুজ করে তুলতে পারি। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দূষণ কমাতে পারি, নদীকে পরিষ্কার রাখতে পারি, আর শহরের ফাঁকা জায়গাগুলোতে গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু তার পাশাপাশি মানুষকেও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।”

সুমন মাথা নাড়ল। “তুমি ঠিক বলেছ। এত দিন আমি ভেবেছি, প্রযুক্তিই সব সমস্যার সমাধান। এখন বুঝতে পারছি, প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কোন পথে এগোব, সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।”

রুদ্র তাদের কথোপকথন শুনছিল। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “আমি কি এই উদ্যোগে সাহায্য করতে পারি? আমার কাছে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, দূষণের মাত্রা, মাটির গুণমান এবং গাছের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের তথ্য রয়েছে। এই তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কী ধরনের গাছ লাগানো উচিত, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।”

প্রকৃতি আনন্দে বলে উঠল, “অবশ্যই পারবে, রুদ্র! তোমার প্রযুক্তিগত জ্ঞান আর আমাদের পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে অনেক কিছু করা সম্ভব।”

সুমনও এবার নতুন উদ্যমে এগিয়ে এল। তারা ঠিক করল, রুদ্রর কোড মুছে ফেলে তাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। বরং তার অস্বাভাবিক আচরণের কারণ আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা হবে। মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার শেখার প্রক্রিয়াকে নিরাপদভাবে আরও উন্নত করা হবে।

একই সঙ্গে তারা কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে গাছ লাগানোর একটি নতুন প্রকল্প শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল। রুদ্র তার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখাবে কোথায় গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রা কমবে, কোথায় জলাভূমি সংরক্ষণ করা জরুরি, আর কোন অঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করবে, আর সুমন প্রযুক্তির সাহায্যে সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করবে। তাদের উদ্যোগে যোগ দেবে আরও অনেক মানুষ, যারা বুঝতে পারবে যে উন্নয়ন আর প্রকৃতি একে অপরের শত্রু নয়। সঠিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

কয়েক মাসের মধ্যেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সবুজ অঞ্চল তৈরি হতে শুরু করল। পরিত্যক্ত ছাদে গড়ে উঠল বাগান, নদীর ধারে নতুন গাছ লাগানো হলো, আর কিছু পুরনো পুকুর ও জলাভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলো। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও এই প্রকল্পে অংশ নিল। রুদ্র তাদের গাছের যত্ন নেওয়া, জল সংরক্ষণ এবং দূষণ সম্পর্কে নানা তথ্য বুঝিয়ে দিত।

একদিন প্রকৃতি দেখল, রুদ্র একটি ছোট্ট চারাগাছের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার ধাতব হাতের সাহায্যে সে গাছটির গোড়ায় জল দিচ্ছে। চারাগাছটির পাতায় সকালের আলো পড়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকটি শিশু আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।

প্রকৃতি কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “কী ভাবছ, রুদ্র?”

রুদ্র কিছুক্ষণ চারাগাছটির দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল, “এই গাছটি এখন ছোট। কিন্তু একদিন বড় হবে, তার ডালে পাখি বসবে, তার ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নেবে। আমি ভবিষ্যতের অনেক হিসাব করতে পারি, কিন্তু এই গাছের ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে তোলার জন্য আমাকে আজই কাজ করতে হবে।”

প্রকৃতি মৃদু হেসে বলল, “এটাই তো আসল কথা। ভবিষ্যৎ শুধু অপেক্ষা করে পাওয়া যায় না, তাকে নিজের হাতে গড়ে তুলতে হয়।”

সুমনও তাদের পাশে এসে দাঁড়াল। দূরে কলকাতার আকাশে তখনও উড়ন্ত গাড়ি চলছিল, বিশাল হলোগ্রাম আলো ছড়াচ্ছিল, আর প্রযুক্তির অগ্রগতি থেমে ছিল না। কিন্তু সেই আধুনিকতার মাঝেই ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল সবুজের ছোঁয়া, মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা আর পুরনো কলকাতার কিছু হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি।

সেদিন সুমন বুঝতে পারল, তার তৈরি রুদ্র কোনও ব্যর্থ যন্ত্র নয়। বরং রুদ্র তাকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছে, যা কোনও প্রোগ্রামিং ভাষা কিংবা প্রযুক্তিগত নির্দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

প্রকৃতি বুঝতে পারল, পরিবেশকে রক্ষা করার লড়াইয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে।

আর রুদ্র শিখল, কলকাতাকে বোঝার অর্থ শুধু তার অতীতের তথ্য সংরক্ষণ করা কিংবা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ব্যবহার করা নয়। কলকাতাকে বোঝার অর্থ তার মানুষকে বোঝা, তার সংস্কৃতিকে সম্মান করা এবং তার প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করা।

২০৮৫ সালের সেই ভবিষ্যতের কলকাতায় তাই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। প্রযুক্তি আর প্রকৃতি পাশাপাশি চলতে শুরু করল। শহরটি আরও আধুনিক হওয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে ফিরে পেতে লাগল তার হারিয়ে যাওয়া সবুজ আর মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা।

কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ শুধু দ্রুত এগিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে।

কলকাতার ভবিষ্যৎ তাই শুধু যন্ত্রের হাতে নয়, মানুষের বিবেক, ভালোবাসা আর প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধের হাতেও গড়ে উঠবে।

                          সমাপ্ত।


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Thriller