STORYMIRROR

Sayantani Ghosh

Drama

4  

Sayantani Ghosh

Drama

শূন্য থেকে বসন্ত

শূন্য থেকে বসন্ত

7 mins
4

দশ বছর আগের কথা। তখন আমি কলেজে পড়তাম। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পর কিছুই ভালো লাগছিল না। তাই গঙ্গার ধারে গিয়ে বসেছিলাম। সেখানকার স্নিগ্ধ বাতাস অনুভব করছিলাম। গঙ্গার বুকে তখন সন্ধ্যার আলো-ছায়ার খেলা। একে একে সব নৌকা ঘাটে ফিরে আসছিল, কিন্তু আমার জীবনের নৌকাটা যেন কোনো এক অজানা ঝড়ের মুখে পড়ে দিক হারিয়ে ফেলেছিল। চোখের জল গাল বেয়ে গঙ্গার জলে মিশে যাচ্ছিল। দেখার কেউ ছিল না।
হঠাৎ আমার ছোট বোন ছুটতে ছুটতে এসে বলল, "দিদি, চল! বাবার বুকে খুব ব্যথা করছিল, তাই সুমনদাদা বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। তুই তাড়াতাড়ি চল!"
বোনের কথা শুনে আমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না। তারপর কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
কিন্তু আমার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ডাক্তারবাবু এসে বললেন, "আই অ্যাম সরি। আমাদের আর কিছু করার ছিল না।"
বাবার ঠান্ডা হাত দুটো ধরে আমি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলাম। যে মানুষটা সুমনের মতো একটা অনাথ ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছিলেন, সেই মানুষটাই আজ আমাদের চিরকালের মতো অনাথ করে চলে গেলেন।
আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। শুধু কাঁদছিলাম আর বলছিলাম, "মা তো আমাদের ছেড়ে কবেই চলে গেছে, এবার তুমিও চলে গেলে? এখন আমরা কী করব? আমি আর বোন দুজনে দুজনকে দেখে রাখব, কিন্তু তুমি যে সুমনকে অনাথ আশ্রম থেকে এনেছিলে, ওর কী হবে?"
তখন বোন আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, "দিদি, কাঁদিস না। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব। সুমনদাদাকে আমরা দুজনেই দেখে রাখব।"
বাবার চলে যাওয়ার পর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। আমি আর সুমন দুজনে মিলে অনেক পরিশ্রম করে একটা কসমেটিকসের কোম্পানি খুললাম। কোম্পানির নাম রাখলাম ‘গাঙ্গুলী গ্রুপ অফ কোম্পানিজ’। আমি হলাম সেই কোম্পানির সিইও (CEO), আর সুমন হলো আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমার ছোট বোন তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ছিল।
একদিন সকালে আমি, বোন আর সুমন একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করার পর বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলাম। তখন বোনকে বললাম, "চল, আমরা তোকে কোম্পানিতে যাওয়ার পথে কলেজে নামিয়ে দিয়ে যাব।"
বোন হেসে বলল, "না, তোরা আজ চলে যা। আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গেই চলে যাব। অন্যদিন তোরা আমাকে দিয়ে আসিস।"
বোন কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো, আর আমি ও সুমন কোম্পানিতে চলে গেলাম।
সেদিন অফিসে আমি এক বড় সাপ্লায়ারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঠিক তখনই সুমন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে কেঁদে ফেলল।
"ঋতশ্রী, বোনের অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে! তুই তাড়াতাড়ি নার্সিংহোমে চল!"
আমি কিছু না ভেবেই পাগলের মতো বোনের কাছে ছুটে গেলাম। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! ঠিক আগেরবারের মতোই ডাক্তারবাবু এসে বললেন, "আই অ্যাম ভেরি ভেরি সরি, মিস গাঙ্গুলী। ওর মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছিল, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। আমরা ঋতুকে বাঁচাতে পারলাম না।"
এক নিমেষে আমার হাসিখুশি পৃথিবীটা শ্মশান হয়ে গেল। যে বোনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দিনরাত এক করে লড়াই করছিলাম, সেই বোনটাই আজ আমাকে একা ফেলে চলে গেল।
ডাক্তারবাবুর কথা শুনে আমার আর কিছু বলার শক্তি ছিল না। মা, বাবা, বোন—সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এখন এই বিশাল পৃথিবীতে আমি একেবারে একাকী।
আমি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলাম, "সুমন, বল তো, এবার আমি কী করব? আমার আর কে রইল?"
এই প্রথম আমি সুমনের চোখেও জল দেখলাম। সে আমার মাথায় হাত রেখে বলল, "ঋতশ্রী, আমি তো আছি। আমি আর তুই ঠিক ভালো থাকব।"
পরের কয়েকটা মাস কীভাবে কেটেছিল, তা আমার মনে নেই। সকাল হতো, অফিসে যেতাম, রোবটের মতো কাজ করতাম আর বাড়ি ফিরতাম। শূন্য ঘরটায় বোনটার গলার আওয়াজ আর শুনতে পেতাম না। সুমন ছায়ার মতো আমার পাশে না থাকলে হয়তো আমি একেবারেই ভেঙে পড়তাম।
এভাবেই একের পর এক দিন কেটে যাচ্ছিল। তারপর একদিন আমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমার পুরো জীবনটাকে বদলে দিল।
সেদিন সন্ধেবেলা গঙ্গার ধারে একা বসেছিলাম। কিছুই ভালো লাগছিল না। মনের ভেতর শুধু বোনের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছিল। গঙ্গার বুকে তখন সন্ধ্যার আলো-ছায়ার খেলা। একে একে সব নৌকা ঘাটে ফিরে আসছিল, কিন্তু আমার জীবনের নৌকাটা যেন কোনো এক অজানা ঝড়ের মুখে পড়ে দিক হারিয়ে ফেলেছিল। চোখের জল গাল বেয়ে গঙ্গার জলে মিশে যাচ্ছিল। দেখার কেউ ছিল না।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা ছেলে এসে খুব ভদ্রভাবে বলল, "আপনার মনটা মনে হয় খুব খারাপ। আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?"
আমি পিছন ফিরে দেখলাম, আমারই সমবয়সি একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, "হ্যাঁ, বসতে পারেন। তবে আপনাকে কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।"
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল, "হ্যাঁ, দেখতেই পারেন।"
আমি ছেলেটির দিকে সরাসরি না তাকিয়েই বললাম, "আপনি হঠাৎ করে এসে আমার পাশে বসলেন। আপনার নামটা কি জানতে পারি?"
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, "হ্যাঁ, ম্যাডাম, অবশ্যই জানতে পারেন। আমার নাম সাহেত ব্যানার্জি। আমি ব্যানার্জি গ্রুপ অফ কোম্পানিজের সিইও।"
কথাটা শুনে আমি চমকে উঠে দাঁড়ালাম এবং সঙ্গে সঙ্গে বললাম, "সরি, আমি আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনি।"
সাহেত বলল, "ঠিক আছে। এবার আপনি বলুন, আপনার নাম কী?"
আমি বললাম, "আমার নাম ঋতশ্রী গাঙ্গুলী। আমি গাঙ্গুলী গ্রুপ অফ কোম্পানিজের সিইও।"
আমার কথা শুনে সাহেত চোখ বড় বড় করে বলল, "ওহ! আপনিই তাহলে সেই লেজেন্ড মহিলা, যিনি নিজের ক্ষমতায় এত বড় গাঙ্গুলী কোম্পানি গড়ে তুলেছেন!"
আমি সঙ্গে সঙ্গে লজ্জা পেয়ে বললাম, "আপনার কি ট্যালেন্ট কম? আপনি তো আমার চেয়েও অনেক বড় কোম্পানির মালিক এবং সিইও।"
সাহেত তখন বলল, "আমি তো এটা বংশপরম্পরায় পেয়েছি, কিন্তু আপনি নিজের ক্ষমতায় একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।"
সাহেতের মুখে ‘লেজেন্ড’ শব্দটা শুনে আমার চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে উঠেছিল। এত বছর ধরে শুধু লড়াই করে গেছি। কেউ কখনো এত আন্তরিকভাবে আমার কাজের মূল্যায়ন করেনি। সেদিনই প্রথম আমার মনে হয়েছিল, এই মানুষটার পাশে সারাজীবন নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
সাহেতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বুঝলাম, ও শুধু বড় ব্যবসায়ীই নয়, ওর মনটাও খুব উদার। ও যেন আমার ভেতরের ক্ষতগুলোকে একে একে সারিয়ে তুলছিল। কর্পোরেট দুনিয়ার মুখোশ খুলে ওর সামনে আমি মন খুলে হাসতে পারতাম।
এভাবেই আমাদের পরিচয় হলো, আর আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠলাম। প্রায়ই অফিসের পর আমরা দুজনে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে গল্প করতাম, নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা বলতাম। তারপর কীভাবে যে আমাদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল, তা আমরা নিজেরাও জানি না।
আমরা প্রায়ই দুজনে ঘুরতে যেতাম—কখনো পার্কে, কখনো শপিং মলে, আবার কখনো কোনো নিরিবিলি জায়গায়, যেখানে আমাদের বিরক্ত করার মতো কেউ থাকত না।
তারপর সেই বিশেষ দিনটি এল, যা আমার জীবনের আরেকটি সুন্দর দিন হয়ে রইল।
সেদিন আমার অফিসের কাজ একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি গঙ্গার ধারের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসেছিলাম। কয়েক মিনিট পর সাহেত সেখানে এল। সে আচমকা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ঋতশ্রী, আমি তোমার অতীতের সব কষ্ট মুছিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু তোমার ভবিষ্যতের প্রতিটি দিন ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমি নিতে চাই। Will you marry me?"
আমি এক মুহূর্তও না ভেবে মায়াবী কণ্ঠে বলেছিলাম, "হ্যাঁ।"
এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর সাহেতের বাবা-মা ও বোন আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে দেখে গেলেন। তারপর আমাদের বিয়ের তারিখ পাকা হলো।
১০ ফাল্গুন আমাদের ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর গাঙ্গুলী কোম্পানি ও ব্যানার্জি কোম্পানি এক হয়ে গেল। নতুন কোম্পানির নাম হলো ‘ব্যানার্জি গাঙ্গুলী কোম্পানি’।
কোম্পানি এক হয়ে যাওয়ার পর আমি সংসারে মন দিলাম। তখন সুমনের দিকে তাকিয়ে আমার চোখটা ভিজে এসেছিল। অনাথ আশ্রম থেকে আসা সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ শুধু আমার কোম্পানির স্তম্ভ নয়, আমার ভাইয়ের চেয়েও বেশি কিছু। ও না থাকলে হয়তো আমি আজকের এই ঋতশ্রী হতে পারতাম না।
বিয়ের পর আমি কোম্পানিতে যাওয়া একটু কমিয়ে দিলাম। সাহেতই এখন কোম্পানির সব কাজ সামলায়।
আমাদের বিয়ের এক বছর পর সুমনের সঙ্গে সাহেতের বোন দেবপ্রিয়ার বিয়ে হলো। তার পরের বছরই আমার আর সাহেতের কোলে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান এল। আমরা তার নাম রাখলাম ‘সূর্য’।
ছেলে সূর্যের মুখে যখন প্রথম হাসি দেখেছিলাম, তখন মনের কোণে একটা তীব্র মোচড় দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আজ যদি আমার বোন ঋতু বেঁচে থাকত, তবে মাসি হওয়ার আনন্দে পুরো বাড়ি মাথায় তুলত। ওপর থেকে ও নিশ্চয়ই আমাদের এই সুখ দেখে হাসছে।
সুমন ও দেবপ্রিয়ার যমজ সন্তান হলো—একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলেটার নাম রাখা হলো ‘সান’ আর মেয়েটির নাম ‘স্নেহা’।
অনাথ আশ্রম থেকে আসা যে ছেলেটা একদিন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, আজ তাকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নতুন সংসার শুরু করতে দেখে আমার বুকটা গর্বে ভরে গেল। মনে হলো, মা-বাবা আজ বেঁচে থাকলে ঠিক এই আনন্দটাই পেতেন। ওর নিজের একটা সুন্দর সংসার গড়ে উঠতে দেখে মনে হলো, আমার জীবনের একটা বড় ঋণ অন্তত কিছুটা শোধ হলো।
আজ আমাদের ছোট্ট পরিবারটি সম্পূর্ণ এবং আনন্দে ভরপুর। পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, গঙ্গার সেই স্নিগ্ধ বাতাস সেদিন শুধু আমার ক্লান্তিই জুড়িয়ে দেয়নি, আমার শূন্য জীবনে সাহেতকে এনে এক নতুন বসন্তের খোঁজও দিয়েছিল।
জীবন হয়তো অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু ধৈর্য রাখলে তার চেয়েও সুন্দর কিছু ফিরিয়ে দেয়।
বর্তমানে আমি, সাহেত, সুমন ও দেবপ্রিয়া আমাদের সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে থাকি। আমরা চারজনে মিলে ব্যানার্জি গাঙ্গুলী কোম্পানিকে আরও বড় করে তুলেছি।
                       
                             — সমাপ্ত —


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Drama