কোলাহল
কোলাহল
লেখকের বক্তব্য:
এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সমাজের চলমান কিছু বাস্তব সমস্যাকে পটভূমি করে এটি কেবলই সাহিত্যিক উদ্দেশ্যে রচিত। গল্পের কোনো চরিত্র, নাম, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা ঘটনার সঙ্গে বাস্তব কোনো ব্যক্তি, দল বা ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক আদর্শকে আঘাত বা ছোট করার উদ্দেশ্যে এটি লেখেননি।
---
সকাল হতেই শহরের চেনা আকাশটা কেমন যেন এক অদ্ভুত কালচে কুয়াশায় ঢেকে যায়। এটা কোনো ভোরের স্নিগ্ধ কুয়াশা নয়, বরং হাজারো কলকারখানা, গাড়ির কালো ধোঁয়া আর মানুষের তৈরি দূষণে দম আটকে যাওয়া এক গুমোট পরিবেশ।
আবহাওয়া অফিস প্রতিদিন টিভিতে আর মোবাইলের স্ক্রিনে সতর্কবার্তা দেয়—অসময়ের ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ আর পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা এখন আর কোনো স্বাভাবিক দুর্যোগ বলে মনে হয় না, বরং প্রকৃতির বুক চিরে মানুষের প্রতিনিয়ত তৈরি করা ক্ষতেরই যেন প্রতিচ্ছবি।
উত্তর ভারতের দিকে যখন হঠাৎ মেঘভাঙা বৃষ্টিতে নদীগুলো ক্ষেপে ওঠে, তখন এই কংক্রিটের মফস্বল শহরেও তার আঁচ এসে পড়ে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা শোনার বা পরিবেশ নিয়ে ভাবার সময় এ শহরের কারও নেই।
শহরের মোড়ে মোড়ে এখন বড় বড় ব্যানারে রাজনৈতিক নেতাদের চওড়া হাসি। সেই হাসির আড়ালে সমাজজুড়ে চলে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ আর জাতপাতের নোংরা রাজনীতি। ভোটব্যাংক গোছানোর জন্য সাধারণ মানুষের মগজে প্রতিদিন বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বন্ধু চিনতে এখন মানুষ মানুষের ব্যবহার দেখে না, আগে দেখে তার ধর্ম কী।
একদল উগ্রপন্থী আর পর্দার আড়ালে থাকা জঙ্গি হামলার চক্রান্তে সাধারণ শান্ত পাড়াগুলোও রাতারাতি বারুদের স্তূপ হয়ে উঠছে। মানুষ প্রতিদিন এক অজানা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়—আজ আবার কোথায় বোমা ফাটবে, কিংবা কোথায় ধর্মের নামে রক্তগঙ্গা বইবে, তা কেউ জানে না।
এই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যেই প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী চোখে চশমা আর পিঠে বিশাল বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ছুটছে নামী-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে।
কিন্তু এই শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক চরম ব্যবসায়িক প্রহসনে পরিণত হয়েছে। মুখস্থবিদ্যা আর জিপিএ-ফাইভ পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে পিষে যাচ্ছে তাদের শৈশব ও কৈশোর।
মা-বাবারা ঘটিবাটি বেচে, লাখ লাখ টাকা ঋণ করে সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে যখন সেই ছেলেমেয়েরা ডিগ্রির বড় বড় সার্টিফিকেট হাতে বের হচ্ছে, তখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে এক বিশাল শূন্যতা।
চাকরির বাজার পুরো ফাঁকা।
বছরের পর বছর হন্যে হয়ে ইন্টারভিউ দিয়েও একটা সাধারণ চাকরি জোটে না। এই বেকারত্বের চরম হতাশা থেকেই জন্ম নিচ্ছে আধুনিক সমাজের আরেক অন্ধকার দিক—সাইবার অপরাধ আর হ্যাকিং।
সাধারণ মানুষের সারাজীবনের জমানো ব্যাংক ব্যালেন্স এক ক্লিকে ওধাও করে দেওয়া, ভুয়ো প্রোফাইল বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা কিংবা অনলাইন প্রতারণার ফাঁদ পাতা এখন এক শ্রেণির যুবকের একমাত্র রোজগারের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেধা যেখানে সমাজ গড়ার কাজে লাগার কথা ছিল, তা আজ সমাজ ধ্বংসের মারণাস্ত্র হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় ভাঙনটা ধরেছে মানুষের সম্পর্কে, মানুষের মনের ভেতরে।
প্রযুক্তির স্ক্রিনে বন্দি হয়ে চারকোনা ঘরের ভেতর মানুষ আজ ভীষণ একাকী। চারপাশের এই যান্ত্রিক কোলাহলে আর সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম লাইক-কমেন্টের ভিড়ে খাঁটি ‘ভালোবাসা’ শব্দটা যেন ডিকশনারি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে।
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে ভালোবেসে সব বাধা পেরিয়ে হাত ধরে এক ছাদের তলায় সংসার পাতার সাহস পায় না কেউ। বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির জায়গাটা দখল করেছে পারস্পরিক স্বার্থ আর সন্দেহ।
এককালের সেই নিখাদ রোমান্টিক প্রেম আজ রূপান্তরিত হয়েছে একতরফা ভালোবাসার এক মানসিক ব্যাধিতে।
আর এই সর্বগ্রাসী বাস্তবতার জীবন্ত উদাহরণ হলো সূর্য আর দেবপ্রিয়া।
সূর্য ছিল সাহেতেরই কলেজজীবনের বন্ধু। অসম্ভব প্রতিভাবান আইটি ইঞ্জিনিয়ার হয়েও যখন দিনের পর দিন বেকারত্বের লাঞ্ছনা আর অভাবের সংসারে বাবার ওষুধের টাকা জোগাড় করতে পারছিল না, তখন সে বেছে নেয় অন্ধকার এক অপরাধের জগৎ।
সূর্য আজ এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। কম্পিউটারের সামনে বসে তার মেধা আর দক্ষতার অপব্যবহারে নিমেষে মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতছাড়া হয়ে যায়।
কিন্তু এত টাকা, এত ক্ষমতার ওপারে সূর্যের বুকে বাস করে এক তীব্র, বিষাক্ত একতরফা প্রেম।
সে ভালোবেসেছিল তাদেরই সহপাঠী দেবপ্রিয়াকে।
দেবপ্রিয়া ছিল এক মুক্তমনা, প্রতিবাদী মেয়ে, যে বর্তমান সমাজের এই পচনশীল রূপটার বিরুদ্ধে একা লড়াই করার স্বপ্ন দেখে।
দেবপ্রিয়া কোনোদিন সূর্যকে সেই চোখে দেখেনি। কিন্তু সূর্যের প্রেম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর মানসিক ব্যাধি আর জেদে রূপ নিয়েছে।
সে দূর থেকে দেবপ্রিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে নজর রাখে, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে অনধিকার প্রবেশ করে তার ওপর নজরদারি চালায়। দেবপ্রিয়া যখনই অন্য কারও সঙ্গে কথা বলে, সূর্যের অন্ধকার জগত যেন আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
সে দেবপ্রিয়াকে না পাওয়ার তীব্র হতাশা থেকে এখন সাইবার বুলিং আর ভার্চুয়াল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আশ্রয় নিচ্ছে, যা দেবপ্রিয়াকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা মফস্বল শহরের এক চিলতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল সাহেত।
সাহেতের পকেটে রয়েছে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্সের একটা উজ্জ্বল ফার্স্ট ক্লাস সার্টিফিকেট, যা আসলে এই সমাজে এখন কেবলই একটা মূল্যহীন কাগজের টুকরো।
ওর সস্তা ল্যাপটপের স্ক্রিনজুড়ে তখন ভাসছিল একের পর এক নামী কোম্পানি থেকে আসা রিজেকশন ই-মেইল।
ঠিক তখনই সাহেতের ফোনটা ভাইব্রেট করে কেঁপে উঠল।
ওপারে সূর্য।
সূর্য কুটিল হেসে সাহেতকে বলল,
— “কী রে সাহেত, আর কতদিন এই সততার ভেক ধরে বেকার ঘুরে বেড়াবি? সমাজ তোকে কী দিল? আমাদের দলে চলে আয়। একটা ব্যাংক হ্যাক করবি, কাল থেকে তুই কোটিপতি। তোর এই মেধাটাকে এভাবে নষ্ট করিস না।”
সাহেত ফোনের ওপারে থাকা সূর্যের প্রলোভন শুনছিল। কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল দেবপ্রিয়ার মুখটা।
দেবপ্রিয়া যে আজ সূর্যের এই একতরফা প্রেমের সাইবার অত্যাচারের শিকার, তা সাহেত জেনে গেছে।
সাহেত বুক ভরে দম নিল। তারপর সূর্যের অন্ধকার অর্থের প্রলোভনকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
— “না সূর্য। তুই যে অন্ধকার দুনিয়ায় গেছিস, সেখানে আলো নেই। তুই সমাজকেও ধ্বংস করছিস, আর ভালোবাসার নামে দেবপ্রিয়ার জীবনটাকেও নরক বানাচ্ছিস। আমি এই নোংরামির অংশ হব না। আমি এই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ব, সমাজের সাধারণ মানুষের অধিকার আর দেবপ্রিয়ার সম্মান আমি ফিরিয়ে আনবই।”
ফোনটা কেটে দেওয়ার পরেই দেবপ্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে সাহেতের ঘরে এসে ঢুকল।
ওর ফোনটা সূর্যের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো লক হয়ে গেছে। স্ক্রিনে ভাসছে কিছু বিকৃত করা ছবি এবং চড়া অঙ্কের টাকা দাবি করার হুমকি।
দেবপ্রিয়াকে মানসিকভাবে শেষ করে দেওয়ার সমস্ত ছক কষে ফেলেছিল সূর্য।
সাহেত দেবপ্রিয়ার মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,
— “ভয় পেও না দেবপ্রিয়া। ও যদি অন্ধকার জগতের মানুষ হয়, তবে আমি ভুলে যাইনি যে প্রযুক্তি আর সাইবার সিকিউরিটির মূল বিষয়গুলো আমরা একসঙ্গেই শিখেছিলাম। এবার ওকে থামানোর সময় এসেছে।”
সাহেত সিদ্ধান্ত নিল, পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্তকারীদের হাতে তুলে দিতে হবে। সূর্য যেন আর কোনোভাবে প্রমাণ নষ্ট করে পালাতে না পারে, সেটাই এখন তার প্রধান চিন্তা।
সাহেত তার পুরনো সেকেন্ড-হ্যান্ড ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ল।
নিজের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ব্যবহার করে সে সূর্যের অপরাধী নেটওয়ার্কের গতিবিধি শনাক্ত করার জন্য একটি কৌশল তৈরি করল। উদ্দেশ্য একটাই—সূর্যের অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া।
সাহেত এমন একটি ছদ্মবেশী ফাইল তৈরি করল, যেটি সূর্যকে তার অপরাধী মানসিকতার সুযোগ নিয়ে ফাঁদে ফেলতে পারে।
সে সূর্যকে মেসেজ পাঠাল,
— “আমি তোর দলে যোগ দিতে রাজি সূর্য। এই দেখ, একটা বড় ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটা সমস্যা আমি খুঁজে পেয়েছি।”
সূর্যের লোভ এবং অহংকার তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। সে ভাবল, সাহেত অবশেষে হার মেনেছে।
কিন্তু ফাইলটি খোলার পরই সাহেতের পরিকল্পনা অনুযায়ী সূর্যের অপরাধী নেটওয়ার্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অবস্থান শনাক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে একের পর এক তথ্য ভেসে উঠতে লাগল।
বাইরে তখন মেঘের ডাক আরও তীব্র হচ্ছে। অসময়ের মারণ ঝড় জানলায় এসে ধাক্কা মারছে, আর ঘরের ভেতরে সাহেতের কিবোর্ডের খটখট শব্দ যেন এক ডিজিটাল যুদ্ধের সাইরেন বাজিয়ে চলেছে।
সূর্য যখন বুঝতে পারল সে ফাঁদে পড়েছে, তখন সে সাহেতের সিস্টেমে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে তার ল্যাপটপ অচল করার চেষ্টা করল।
ল্যাপটপটা অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
কিন্তু সাহেত থামল না।
সে দেবপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “দেবপ্রিয়া, সূর্যের অপরাধী নেটওয়ার্কের মূল অবস্থানটা আমি পেয়ে গেছি। এবার শেষ ধাক্কা।”
সাহেত দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করে তা সাইবার ক্রাইম বিভাগের কাছে পাঠিয়ে দিল।
সূর্যের অপরাধের প্রমাণ, তার অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য এবং অবস্থান—সবকিছু তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছে গেল।
সাহেত শুধু দেবপ্রিয়াকে রক্ষা করার চেষ্টা করল না, বরং সূর্যের অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খুলে দিল।
পরদিন সকালে ঝড় থেমেছে, কিন্তু প্রকৃতিতে রয়ে গেছে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ।
খবরের কাগজে বড় বড় করে হেডলাইন এলো—আন্তর্জাতিক এক বড় সাইবার অপরাধী এবং ব্ল্যাকমেইলারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
দেবপ্রিয়ার ফোন থেকে সূর্যের সমস্ত নোংরা ফাইল আর হুমকির হাত থেকে সে মুক্তি পেল।
সে আজ মুক্ত। তার চোখের জল শুকিয়ে সেখানে আজ স্বস্তির হাসি।
সাহেত বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
দূরে এখনো রাজনৈতিক নেতাদের ব্যানার ঝুলছে। সমাজ এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। কিন্তু সাহেত আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে মেধা অপকর্মে নয়, সততার লড়াইয়ে ব্যবহার করলে সমাজকে বাঁচানোর পথ তৈরি করা সম্ভব।
দেবপ্রিয়া সাহেতের পাশে এসে দাঁড়াল।
তাদের মধ্যে হয়তো কোনো সামাজিক বিয়ের চুক্তি হয়নি, কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপ আর কোলাহলের মাঝেও তাদের মধ্যকার বিশ্বাস আর ভালোবাসা আজ এক নতুন ভোরের আলো দেখাল।
কিন্তু সেই ভোরের আলোও শহরের অন্য প্রান্তে জমে থাকা অন্ধকারের গভীরতাকে পুরোপুরি মুছতে পারল না।
সূর্যের গ্রেফতারির পর সাহেত আর দেবপ্রিয়া যখন ভাবল তারা একটা জয় পেয়েছে, সমাজ তাদের সামনে ছুড়ে দিল আরও এক নির্মম বাস্তবতা।
কদিন পরেই সাহেতের মফস্বলের বাড়ি থেকে খবর এলো, সরকারি চাকরির নিয়োগে এক বিরাট কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে।
যে পরীক্ষার জন্য সাহেতের বাবা নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ঘুষ দিয়েছিলেন, সেই পরীক্ষাটাই দুর্নীতির অভিযোগে বাতিল হয়ে গেছে।
এই চরম অপমান আর ক্ষোভে সাহেতের বৃদ্ধ বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন।
সাহেত যখন হাসপাতালে ছুটল, তখন দেখল চিকিৎসাব্যবস্থাও আজ এক নির্মম বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। টাকার অভাবে সাধারণ রোগীদের কীভাবে বারান্দায় ফেলে রাখা হচ্ছে, আর বিত্তশালীদের জন্য আইসিইউর দরজাগুলো কীভাবে সহজে খুলে যাচ্ছে—তার নির্মম ছবি তার চোখের সামনে ফুটে উঠল।
এরই মাঝে দেবপ্রিয়া লক্ষ্য করল সমাজের নতুন এক মারণব্যাধি—ভার্চুয়াল আসক্তি আর সস্তা প্রচারের মোহ।
রিলস আর শর্টস ভিডিও বানিয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার নেশায় মত্ত এই প্রজন্ম বই-খাতা ছেড়ে অদ্ভুত সব কুরুচিকর অঙ্গভঙ্গি করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে।
ইন্টারনেটের সস্তা ডেটা মানুষের চিন্তাভাবনাকে অগভীর করে দিয়েছে। মানুষের ধৈর্য হারিয়ে গেছে। কেউ আর লাইব্রেরিতে গিয়ে মোটা বই পড়তে চায় না, সবাই খোঁজে কয়েক সেকেন্ডের বিনোদন।
সম্পর্কের গভীরতা হারিয়ে গেছে এই স্ক্রিনের টাচপ্যাডে।
এরই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া গেল যখন সাহেতের এক আত্মীয় তাদের বৃদ্ধা মাকে শহরের এক নামী বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে দিয়ে গেলেন। কারণ নতুন ফ্ল্যাটে নাকি মায়ের থাকার মতো জায়গা বা সময়—কোনোটাই তাদের আধুনিক জীবনে নেই।
যে সমাজ একসময় যৌথ পরিবারের গল্প বলত, তা আজ ক্ষুদ্র স্বার্থপরতার ইট-পাথরে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতিও যেন মানুষের এই নিষ্ঠুরতার বদলা নিতে শুরু করল।
মফস্বল শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা পুরোপুরি প্লাস্টিকের আবর্জনায় বুজে গিয়েছিল। প্রোমোটারদের লোভে পুকুর আর জলাশয়গুলো বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল বড় বড় বহুতল।
ফলে মৌসুমি বায়ুর সামান্য অতিরিক্ত বৃষ্টিতেই গোটা শহরটা এক নরককুণ্ডে পরিণত হলো।
নর্দমার নোংরা জল মানুষের শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল।
হড়পা বানের মতো জল যখন চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তখন রাজনৈতিক নেতারা ত্রাণ বিলির ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক কুড়াতে ব্যস্ত।
সমাজটা যেন ওপর থেকে চকচকে, কিন্তু ভেতর থেকে পুরো পচে গেছে।
সমাজটা আজ বাইরে থেকে দেখতে ভীষণ ঝাঁ-চকচকে আর আধুনিক, কিন্তু তার ভেতরটা যে কতটা পচা আর দুর্গন্ধময়, তা সাহেত আর দেবপ্রিয়া প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছিল।
এই কৃত্রিম জাঁকজমকের আড়ালে যে কত বড় বড় অপরাধের জাল বিছানো, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।
ওদের বিশ্বাস আর ভালোবাসার এক নতুন ভোরের আলো ফুটল বটে, কিন্তু সেই আলোর বাইরে যে সুবিশাল সমাজটা পড়ে ছিল, তা প্রতিদিন আরও নতুন নতুন পচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
সাহেত আর দেবপ্রিয়া বুঝতে পেরেছিল, শুধু একটা সাইবার অপরাধীকে ধরলেই এই সমাজের সামগ্রিক ক্ষত নিরাময় করা সম্ভব নয়।
কারণ, এই মেগাসিটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে আরও অনেক অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্র।
সূর্যের পতনের পর সাহেত যখন দেবপ্রিয়ার চিকিৎসার জন্য শহরের একটা বড় সরকারি হাসপাতালে গেল, তখন তার সামনে উন্মোচিত হলো এই সমাজের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ—মেডিকেল মাফিয়া আর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দালালি।
যে হাসপাতালের দেওয়ালে লেখা ‘বিনামূল্যে চিকিৎসা’, তার প্রতিটি কোণে দাঁড়িয়ে আছে এজেন্টের দল।
সাধারণ গরিব মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে জমি-জায়গা বন্ধক রেখে চিকিৎসা করাতে এসে দালালদের খপ্পরে পড়ছে।
হাসপাতালের ভেতরে সরকারি ল্যাবে বিনামূল্যে যে পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা, ডাক্তার আর কর্মচারীদের একাংশের যোগসাজশে সেগুলোকে ‘মেশিন খারাপ’ বলে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্বিগুণ খরচে করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
জীবনদায়ী ওষুধগুলো সরকারি স্টোর থেকে গায়েব করে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালের মেঝেতে ছটফট করতে করতে মানুষ মারা যাচ্ছে, আর সেই লাশের ওপর দাঁড়িয়েও এক শ্রেণির মানুষ টাকার হিসাব কষছে।
সাহেত নিজের ফার্স্ট ক্লাস ডিগ্রির অসহায়ত্ব নিয়ে দেখল, এ সমাজে মানুষের জীবনের চেয়ে কাগজের নোটের দাম অনেক বেশি।
ঠিক এই হাসপাতালের পাশেই গড়ে উঠেছে শহরের এক অভিজাত এলাকা, যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঝাঁ-চকচকে সব বহুতল ভবন।
কিন্তু সেই অট্টালিকাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক নিঃসঙ্গতা।
আধুনিকতার নামে বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের ক্যারিয়ার আর গ্ল্যামারের পেছনে ছুটতে ছুটতে ভুলে গেছে নিজের জন্মদাতা মা-বাবাকে।
মফস্বলের পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করে দিয়ে সেই বৃদ্ধ মা-বাবাদের এনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে শহরের ‘লাক্সারি ওল্ড এজ হোম’ বা বৃদ্ধাশ্রমে।
চড়া টাকার বিনিময়ে সেখানে এসি ঘর, সময়মতো খাবার হয়তো মিলছে, কিন্তু যে নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব তাদের ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, তার কোনো ওষুধ এই যান্ত্রিক সভ্যতার কাছে নেই।
বছরের পর বছর কেটে যায়। উৎসব-পার্বণেও সন্তানদের একটা ফোন আসে না।
সমাজ আজ এমন এক আত্মকেন্দ্রিক রূপ নিয়েছে, যেখানে নিজের রক্তের সম্পর্কগুলোকেও মানুষ স্রেফ একটা দায় বা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের মতো দূরে সরিয়ে রাখছে।
অথচ এই চরম একাকীত্ব আর বিষাদকে ঢাকতেই যেন তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ এক অদ্ভুত মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে।
চারপাশের বাস্তব সমস্যা, বেকারত্ব বা পড়াশোনার চাপ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে তারা মেতে উঠেছে সস্তার সোশ্যাল মিডিয়া রিলস আর শর্ট ভিডিও বানানোর এক সর্বনাশা ইঁদুরদৌড়ে।
রাস্তার মোড়ে, চলন্ত ট্রেনের দরজায়, এমনকি কারখানার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়েও স্রেফ কয়েকটা লাইক আর ভিউজের আশায় জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে আজকের যুবসমাজ।
রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার আর সহজে টাকা উপার্জনের এই নেশা তাদের নৈতিকতা আর চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বইয়ের পাতা ছেড়ে তারা দিন-রাত স্ক্রিনের আলোয় বুঁদ হয়ে থাকছে, যেখানে কোনো বাস্তব জ্ঞান নেই, আছে শুধু এক কৃত্রিম অলীক দুনিয়ার হাতছানি।
যে মেধা দেশের অর্থনীতি কিংবা সমাজ সংস্কারে লাগতে পারত, তা আজ সস্তা বিনোদনের ডিজিটাল আবর্জনায় পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নেমে এসেছে এই প্রকৃতির বুকে, যা মানুষের এই সীমাহীন লোভের চূড়ান্ত মাশুল গুনছে।
প্রোমোটার আর রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থে শহরের ফুসফুস বলে পরিচিত শতবর্ষী গাছগুলোকে রাতারাতি কেটে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে।
জলাশয়গুলো বুজিয়ে দিয়ে তৈরি হচ্ছে শপিং মল।
যার ফলে অসময়ের খামখেয়ালি বৃষ্টির পর যখনই একটু খরা দেখা দিচ্ছে, অমনি মাটির তলার জলের স্তর কয়েকশো ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে।
মফস্বল থেকে শুরু করে শহরের বস্তি এলাকা—সবখানেই এখন এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য মানুষের হাহাকার আর কলহ নিত্যদিনের চেনা ছবি।
জলের ট্যাঙ্ক এলে মানুষ মানুষের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।
প্রকৃতি তার আপন নিয়মে যখন রুষ্ট হচ্ছে, তখন কখনো তীব্র দাবদাহে পিচ গলে যাচ্ছে রাস্তাঘাটের, আবার কখনো হঠাৎ ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে হাজারো গরিবের মাথা গোঁজার ঠাঁই।
সাহেত আর দেবপ্রিয়া এই শহরের এক জনাকীর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে চারদিকের এই কোলাহল দেখছিল।
একদিকে তীব্র জলের লাইনে মানুষের মারামারি, অন্যদিকে দামি গাড়ির ভেতর এসি চালিয়ে রিলস বানাতে ব্যস্ত কোনো ধনী তরুণ।
একটু দূরেই হাসপাতালের সামনে এক অসহায় বাবার কান্না, যার পকেটে ওষুধ কেনার টাকা নেই।
সাহেত দেবপ্রিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
— “আমরা শুধু একটা সাইবার ক্রাইম রুখেছি দেবপ্রিয়া, কিন্তু এই সমাজটার প্রতিটা কোণ যে আজ ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত। কেউ ধর্মের নামে লড়ছে, কেউ টাকার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে, আর প্রকৃতি আমাদের ধ্বংসের শেষ সীমানায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।”
দেবপ্রিয়া সাহেতের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— “লড়াইটা অনেক কঠিন সাহেত, কিন্তু আমরা যদি চুপ করে যাই, তবে এই অন্ধকার সমাজ আমাদের গ্রাস করে নেবে। আমাদের এই লেখনী, আমাদের এই মেধা দিয়েই আমাদের এই পচনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত আওয়াজ তুলে যেতে হবে।”
আকাশের এক কোণে তখন জলহীন মেঘের দল ডানা মেলছিল।
আর এই দুই তরুণ প্রাণ এক বুক আশা নিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এক নতুন সমাজ গড়ার শপথ নিচ্ছিল।
— সমাপ্ত —
