STORYMIRROR

Sayantani Ghosh

Drama

5  

Sayantani Ghosh

Drama

অভেদ

অভেদ

7 mins
6

লেখকের বক্তব্য:
এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। গল্পের চরিত্র, ঘটনা ও পরিস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ধর্ম, সম্প্রদায় বা বাস্তব ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করে না। গল্পে ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বিভেদের প্রসঙ্গ শুধুমাত্র কাহিনির প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মান, আঘাত বা ছোট করা এই গল্পের উদ্দেশ্য নয়। বরং গল্পটির মূল বক্তব্য হলো—মানুষের পরিচয় তার ধর্মের চেয়ে বড়, এবং ভালোবাসা, মানবতা ও যোগ্যতার কোনো ধর্মীয় বিভেদ নেই। পাঠকের কাছে অনুরোধ, গল্পটিকে একটি কল্পকাহিনি ও মানবিক বার্তা হিসেবে গ্রহণ করবেন।


---

বিকেলের হালকা সোনাঝরা আলো এসে পড়েছিল লাইব্রেরির কোণের টেবিলটায়। সাহেতের সামনে খোলা ছিল কিছু কোডিংয়ের জটিল বই, আর জিবা বখতিয়ার আব্বাসীর হাতে ছিল ইতিহাসের মোটা খাতা।

সাহেত ছিল শান্ত। ওর চোখের দৃষ্টিতে সবসময় একটা গভীরতা কাজ করত। আর জিবা ছিল ঠিক তার উল্টো—প্রাণবন্ত, চঞ্চল আর স্পষ্টভাষী।

দুই ধর্মের দুটি মন কখন যে একে অপরের খুব কাছে চলে এসেছিল, তারা নিজেরাও টের পায়নি। কিন্তু লাইব্রেরির সেই শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশের বাইরে যে সমাজটা দাঁড়িয়ে ছিল, তা ছিল ভীষণ বিষাক্ত।

বর্তমান সময়ের হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতি তখন সাধারণ মানুষের মগজে এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যে, মানুষ মানুষের পরিচয় শুধু ধর্ম দিয়েই খুঁজত। ভালোবাসার চেয়ে চারপাশের মানুষের কাছে তখন বড় হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ফায়দা আর ধর্মের উগ্রতা। তারা ভুলে গিয়েছিল যে ধর্ম মানুষকে জুড়তে শেখায়, ভাঙতে নয়।

যখন সাহেত আর জিবার এই পবিত্র সম্পর্কের কথা দুই পরিবার জানতে পারল, তখন যেন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল।

সাহেতের বাবা ড্রয়িংরুমের টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে বললেন,

— “বংশমর্যাদা বলে একটা কথা আছে সাহেত! ওই মুসলিম বাড়ির মেয়ে যদি এই চণ্ডীমণ্ডপে পা রাখে, তবে আমি বিষ খেয়ে মরব, তাও এই বিয়ে মেনে নেব না।”

অন্যদিকে জিবার ভাই ও বাবার রূপ ছিল আরও ভয়ঙ্কর। তারা জিবাকে ঘরের ভেতর বন্দি করে স্পষ্ট জানিয়ে দিল,

— “বখতিয়ার আব্বাসী পরিবারের মেয়ে কোনো হিন্দুর হাত ধরে বের হলে এই সমাজে আমাদের মুখ দেখানোর আর কোনো জায়গা থাকবে না। প্রয়োজনে তোকে আমরা শেষ করে দেব।”

জিবা ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলত আর ভাবত, যে ধর্মে ভালোবাসার কথা বলা আছে, সেই ধর্মের নাম নিয়েই কেন মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে?

পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে আত্মীয়দের বৈঠকখানা—সবখানেই তখন একটাই নিচু আলোচনা। ভালোবাসার চেয়েও মানুষের কাছে তখন অনেক বড় হয়ে উঠল ধর্মের তৈরি করা অদৃশ্য এক হিংস্র পাঁচিল।

সমাজ আর পরিবার যত বেশি চাপ দিচ্ছিল, সাহেত আর জিবার ভেতরের বন্ধন যেন তত বেশি শক্ত হচ্ছিল। তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল, এই অন্ধ সমাজ সহজে তাদের একসঙ্গে বাঁচতে দেবে না।

তাই এক ঘোর অমাবস্যার বৃষ্টির রাতে, সমস্ত পিছুটান এবং মায়া ছিন্ন করে তারা শহরের রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আইনি উপায়ে বিয়েটা সেরে নেয়।

কিন্তু বিয়ের পরের সকালটা কোনো রূপকথার মতো মধুর ছিল না।

দুই পরিবারই তাদের চূড়ান্তভাবে ত্যাগ করল।

সাহেতের মা কেঁদে বললেন,

— “তুই আমাদের জন্য আজ থেকে মরে গেছিস।”

আর জিবার বাবা ফতোয়া দিলেন,

— “ওই কালনাগিনীর মুখ আমরা আর কোনোদিন এই জন্মে দেখব না।”

চেনা মানুষগুলো রাতারাতি পরম শত্রু হয়ে গেল।

ধর্ম আলাদা শুনে প্রথম প্রথম কেউ তাদের একটা ছোট ঘর পর্যন্ত ভাড়া দিতে চাইত না। লোকেরা তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিত, যেন তারা কোনো বড় অপরাধ করে ফেলেছে।

সমাজ এমন এক অদ্ভুত বিচারসভা বসাল, যেখানে অপরাধীকে নয়, দুটো পবিত্র মনের ভালোবাসাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে জুটত শুধু লাঞ্ছনা আর নোংরা কটূক্তি।

ধর্মের এই চরম বিভাজন আর অপমান সহ্য করতে না পেরে, এক বুক কষ্ট আর চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে সাহেত আর জিবা গভীর রাতে এক চলন্ত ট্রেনে চেপে বসল।

তারা চিরতরে পাড়ি জমাল এক অচেনা, নতুন মেগাসিটিতে।

নতুন শহরে এসে শুরু হলো তাদের বেঁচে থাকার এক অন্য কঠিন যুদ্ধ।

পকেটে গোনা মাত্র কয়েকটা টাকা নিয়ে তারা শহরের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে ঘর ভাড়া নিল। ঘরের চারপাশের দেয়ালগুলো নোনা ধরা ছিল, আর মেঝেটা সবসময় স্যাঁতসেঁতে হয়ে থাকত।

কিন্তু সেই অস্বাস্থ্যকর ঘরের পরিবেশও তাদের মনের ভেতরের ভালোবাসার উষ্ণতাকে কমাতে পারেনি।

রাতের বেলা যখন ভাঙা টিনের চাল চুয়ে বৃষ্টির জল মেঝেতে পড়ত এবং মাটির স্যাঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত ঘরে, তখন সাহেত জিবাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলত,

— “আজ আমাদের কিছু নেই জিবা, কিন্তু একদিন আমাদের এই সততাই আমাদের সবচেয়ে বড় রাজপ্রাসাদ এনে দেবে।”

সাহেত একটা ছোট আইটি ফার্মে সামান্য বেতনে দিন-রাত কাজ শুরু করে, আর জিবা ঘরের খরচ চালাতে ছোট ছোট বাচ্চাদের টিউশনি নেওয়া শুরু করে।

নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসার ছিল তাদের, কিন্তু সেই অভাবের ঘরের ভেতর কোনো ধর্মের দেয়াল ছিল না। সেখানে ছিল শুধু অফুরন্ত ভালোবাসা, বিশ্বাস আর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক তীব্র জেদ।

সাহেত প্রায়ই রাতে ক্লান্ত শরীরে জিবার কোলে মাথা রেখে বলত,

— “জিবা, যারা আজ আমাদের জাত আর ধর্মের নামে কুকুর-বেড়ালের মতো তাড়িয়ে দিল, তাদের ভুলটা আমি একদিন ভাঙতে চাই। আমি এত বড় হব যে সমাজ আমাদের যোগ্যতা দিয়ে চিনবে, ধর্ম দিয়ে নয়।”

জিবা তখন সাহেতের হাতটা শক্ত করে ধরে ভরসা দিয়ে বলত,

— “আমি তোমার পাশে আছি সাহেত। আমরা একসঙ্গে এই লড়াইয়ে জিতবই।”

কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং জিবার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় সাহেত চাকরি ছেড়ে নিজের একটা ছোট স্টার্ট-আপ কোম্পানি খোলে।

দিন-রাত এক করে তারা দুজনে রক্ত জল করা খাটুনি খাটতে থাকে।

শুরুর দিকে অনেক ক্লায়েন্ট তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল, অনেক বড় বড় কোম্পানি তাদের ছোট করে দেখেছিল। কিন্তু সাহেতের টেকনিক্যাল মেধা আর জিবার কঠোর ব্যবসায়িক জেদের সামনে কোনো বাধাই টিকতে পারেনি।

যে সমাজ তাদের অচ্ছুত বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই সমাজকেই তারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে জবাব দিতে শুরু করল।

প্রতিটি কঠিন দিন এবং প্রতিটি নির্ঘুম রাত তাদের সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে উঠছিল।

সাহেতের মেধা আর জিবার সূক্ষ্ম ম্যানেজমেন্ট স্কিল—দুটোর মেলবন্ধনে মাত্র দশ বছরের মধ্যে সেই ছোট কোম্পানিটি দেশের অন্যতম বড় একটি মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনে পরিণত হয়।

সাহেত আর জিবা এখন শহরের প্রথম সারির সফল নামকরা ব্যবসায়ী। কোটি কোটি টাকার প্রতিপত্তি তাদের চারদিকে।

সময় বড্ড অদ্ভুত জিনিস। এটি অহংকারী মানুষকেও একদিন মাটিতে নামিয়ে আনে।

এদিকে সাহেত আর জিবার সেই পুরনো মফস্বল শহরে তখন চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে ঘরে বসে থাকা যুবকেরা বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ঠিক সেই সময় খবরের কাগজে আর টেলিভিশনে বড় বড় অক্ষরে হেডলাইন হলো—দেশসেরা কর্পোরেট জায়ান্ট ‘এস.জেড গ্লোবাল’ তাদের নতুন মেগা প্রোজেক্টের শাখা খুলছে ওই মফস্বল শহরেই, যেখানে হাজারো তরুণ-তরুণীর চাকরির সুযোগ হবে।

শহরের সবাই খুব ভালো করেই জানত, এই বিশাল কোম্পানির আসল মালিক আর কেউ নয়, স্বয়ং সাহেত আর জিবা।

কিন্তু পেটের খিদের সামনে তখন দীর্ঘদিনের লালিত ধর্মের সেই অহংকার ফিকে হতে শুরু করেছে। কারণ পেটের খিদে যখন দরজায় এসে কড়া নাড়ে, তখন জাত-পাতের অহংকার জানলা দিয়ে পালিয়ে যায়।

ক্ষুধার্ত পেটের কাছে তখন কোনো ধর্মের বিভাজন বড় ছিল না; বড় ছিল একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা। গীতা হোক বা কোরআন—ধর্মের মূল শিক্ষা তো মানুষকে ভালোবাসতেই শেখায়, কিন্তু মানুষ যখন সেই শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে ধর্মের নামে মানুষকে মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সেই বিভেদের চেয়ে একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তাই বড় হয়ে ওঠে।

একদিন সাহেত আর জিবার বিলাসবহুল হেড অফিসের বাইরে একদল বয়স্ক মানুষ এসে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন।

সেক্রেটারি এসে ইন্টারভিউ ফাইলের সঙ্গে একটা চিরকুট জমা দিয়ে বলল,

— “স্যার, আপনাদের সেই পুরনো মফস্বল শহর থেকে কয়েকজন ভদ্রলোক এসেছেন। উনাদের ছেলেমেয়েদের ইন্টারভিউ প্যানেলে একটু সুযোগ দেওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করছেন।”

সাহেত আর জিবা কেবিন থেকে বের হয়ে কনফারেন্স রুমে এলো।

সামনে বসা মানুষগুলোকে দেখে তারা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

এরা আর কেউ নয়—সাহেতের সেই আপন জ্যাঠামশাই, যিনি একসময় জাত যাওয়ার ভয়ে কাঁপছিলেন, এবং জিবার সেই প্রতিবেশী কাকা, যিনি সাহেতকে মারার জন্য গুন্ডা পাঠিয়েছিলেন।

আজ তাদের চোখে কোনো হিংসা নেই, কোনো আভিজাত্যের অহংকার নেই। আছে শুধু চরম অসহায়ত্ব।

যে হাতগুলো একসময় তাদের দিকে পাথর ছুড়েছিল, আজ সেই হাতগুলোই প্রার্থনার মতো জোড় হয়ে তাদের সামনে কাঁপছিল।

জিবার কাকা কাঁচুমাচু হয়ে হাত জোড় করে কেঁদে ফেলে বললেন,

— “মা জিবা... পুরনো পাপের কথা মনে রেখো না মা। আমার ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে দু-বছর ধরে ঘরে বেকার বসে আছে। তোমরা যদি একটু দয়া করো, ওর একটা গতি হয়।”

সাহেতের জ্যাঠামশাইও মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বললেন,

— “সাহেত বাবা, আমরা বড় ভুল করেছিলাম। ধর্মের নামে যে পাপ আমরা করেছিলাম, আজ হাতেনাতে তার সাজা পাচ্ছি। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের যদি তোমার কোম্পানিতে একটা রুটি-রুজির কাজ দাও, তবে আমরা পরিবারগুলো বেঁচে যাই।”

তারা আজ ভুলে গেছেন কে হিন্দু আর কে মুসলিম। আজ তাদের চোখের সামনে শুধু দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকার এক সর্বশক্তিমান কোম্পানি, যার করুণা না পেলে তাদের সংসার ভেসে যাবে।

যারা একসময় হিন্দু-মুসলিম আলাদা বলে তাদের সমাজচ্যুত করেছিল, আজ পেটের ভাতের জন্য, নিজেদের সন্তানদের জীবনের তাগিদে তারা সেই হিন্দু-মুসলিম জুটির সামনেই হাত পেতে নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জিবা আর সাহেত একে অপরের দিকে তাকাল।

তাদের চোখে কোনো প্রতিশোধের আগুন ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শান্ত জয়ের আনন্দ।

সাহেত মৃদু হেসে চেয়ার টেনে বসে বলল,

— “আপনারা শান্ত হোন। আমাদের কোম্পানিতে জাত বা ধর্ম দেখে কাউকে বিচার করা হয় না, এখানে শুধু মানুষের যোগ্যতা দেখা হয়। ইন্টারভিউ বোর্ডে যদি আপনার ছেলেমেয়েরা পাস করতে পারে, তবে অবশ্যই তারা কাজ পাবে। মানুষের পেটের খিদের কোনো ধর্ম হয় না জ্যাঠামশাই।”

সেদিন কনফারেন্স রুমের দেয়ালগুলি যেন নীরব সাক্ষী রইল এক চরম সত্যের—যে ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে খুন করতে যায়, দিনশেষে সফলতার আলো আর পেটের খিদের সামনে সেই ধর্মের তৈরি করা সব কৃত্রিম পাঁচিল ধুলোয় মিশে যায়।

ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম এই পৃথিবীতে আর তৈরি হয়নি।

                         — সমাপ্ত —


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Drama