STORYMIRROR

তিতাস .

Tragedy Others

3  

তিতাস .

Tragedy Others

* ঘাতক*

* ঘাতক*

4 mins
219

 ভোর পাঁচটা বাজতে আর পঁচিশ এই সময় কতটুকু? ২১ বছরের এই ছেলেটা যে মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আতঙ্কবাদী ৷ ভোর পাঁচটায় ওর ফাঁসির সাজা কার্যকর হবে ৷ তাই এখন থেকে ওকে বধ্যভূমিতে টেনে নিয়ে যাওয়া থেকে মুসলিম রীতিতে গোর দেওয়ার দায়িত্ব তো সিরাজুলের ৷ দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বক্সার জেলে এই দায়িত্বই পালন করে চলেছে সিরাজুল | মৃত্যুর হাতছানি পাওয়া ফ্যাকাসে মুখগুলো যেন ৩৫ বছর আগের স্মৃতিভ্রষ্ট সিরাজুলের মনের দুয়ারে পাল্লা টেনে তালা দিয়ে দিয়েছে ৷ মানবিকতা ভুলে কর্তব্য পালন করে সে ৷ যেমন এই মিনিট দুই আগেই সিরাজুল চুলের মুঠি ধরে হেঁচড়ে টেনে এনেছে ২১ বছরের ছেলেটাকে ৷ এনেছে বধ্যভূমিতে ৷ কী সুন্দর মায়াবী মুখ ছেলেটার ৷ ছিপছিপে শ্যামলা গড়ন ৷ কোঁকড়া চুল ৷ চোখের তলায় অনেকটা কালশিটে ৷ বছর চারেক কম অত্যচার তো সহ্য করলনা !কে যে ওকে ভুলভাল বুঝিয়ে 'জিহাদী ' হবার মন্ত্র দিয়েছিল কে জানে ! আর ভাগ্য ? বছরদুই না যেতেই স্থান হল লক্-আপে ৷ বছর তিনেক বন্দি থাকার পর আজ মৃত্যুর দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ তবে এই তিনবছরে সত্যিই সংশোধন হয়েছে ছেলেটার ৷ নইলে আজ স্নানের পর তিনবার ভূমি স্পর্শ করে ' ভারত মাতা কী জয় ' বলতে পারত না ও ৷ সে জেল সুপারের আদেশ স্বত্তেও না ৷ তবে হ্যাঁ ! স্নানের পর আর একটা কথাও বলেছিল ছেলেটা ৷ সিরাজুল ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে দেবার আগে ও বলেছিল , " আব্বাজান !" | ডাকটা কেমন দীর্ঘশ্বাসের মত শুনেছিল ৷ কানে গেছিল সিরাজুলেরও | প্রথমে অবাক হয়েছিল সে ৷ পরক্ষনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল সে ৷ হাত- পা গুলো প্রচন্ড শক্ত করে বেঁধে হিসহিসে গলায় ডেকেছিল ওকে , " আও বেটা ৷ ইধারমে আও " বলেই দেখিয়েছিল বধ্যভূমিতে যাবার পথ ৷ সিরাজুলের বিদ্রুপ চাবুক মারছিল ছেলেটাকে ৷ ওর স্বচ্ছ চোখদুটো শেষবারের জন্য জ্বলে উঠেছিল ৷ তারপরেই তাতে ঝরে পড়েছিল অনুনয় - ভোরের সূর্যের এতটুকু সোনালি আলো দেখবার আকুলতা ৷ চোখের তারায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়েও যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না মৃত্যু এত কাছে ৷


কিন্তু না ৷ ভোরের আলো দেখবার সুযোগ পায়নি ও | সিরাজুলের হাতের কালো টুপিটা ৫ টা বাজবার পাঁচ মিনিট আগেই ছেলেটার চোখের ওপর নিকষ কালো আস্তরণ ফেলে দিয়েছে ৷ মৃত্যুর রং ও বোধহয় কালো ই ৷ মাথাটা ঢুকতে না চাইলেও তাকে জোর করে ঢোকানো হয়েছে বিনুনির মত প্যাঁচালো , নরম মোম লাগানো , মোটা দড়িটার ফাঁসের মধ্যে ৷ বধ্যভূমিতে মত্যুর অপেক্ষায় ছেলেটা ৷ সীমানার পাশে লিভারে হাত রাখা সিরাজুল ৷ সামনে রয়েছেন কারা কর্তৃপক্ষ , সিভিল সার্জেন্ট , ম্যাজিস্ট্রেট ও DCDD | DCDD র ইঙ্গিত মাত্র লিভারটা সরে যাবে ডান দিকে ৷ নিস্তব্ধতার মাঝে একটা শব্দ | বন্দীর পায়ের তলার পাটাতন সরে যাবে ৷ ঝুলন্ত দেহটা ছটফট করবে একটু - শুধু একটু শ্বাস নেবার জন্য ৷ এদৃশ্য সিরাজুলের ভীষণ চেনা ৷ বন্দীর সেই নিষ্ফল ছটফটানি পাশবিক উন্মাদনা তৈরী করে তার বুকের ভেতর৷ কিন্তু আজ ? আজ কোথায় তার সেই উন্মাদনা ? কেন বারবার শোনা যায় ' আব্বুজান ' ডাকের সেই দীর্ঘশ্বাস ? কেন ? সময় শেষ ৷ DCDD র হাতের লাল রুমালটা ৫ টা বাজবার সাথে সাথে নাড়তে থাকে ৷ কর্তব্যে অটল সিরাজুল হাতে ধরে থাকা লিভারটা ডান দিকে ঠেলে দেয় ৷ নিস্তব্ধতা ভেদ করে ' ঘর্ঘর' শব্দে সরে যায় পাটাতনটি ৷ শব্দটা কি নিজের মাথার মধ্যেও শুনতে পেল সিরাজুল ? বিদ্যুৎ ঝলকের মত মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের একটা রাতের কথা ৷ ' তালাক ' এর পর দুঃখিনী ফতিমা কাঁদতে কাঁদতে ৮ বছরের সিন্নুকে নিয়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল ৷ সিন্নানূর রহমান ৷ ৮ বছরের সেই ছেলেটা বড় হয়ে গিয়েছে ৷ তবু গোঁফ - দাড়ির রোঁয়াগুলো বাদ দিলে মুখখানি সেই একই রকম মায়াবী ৷ মনে পড়ল অনেক বছর আগেকার সেই দূর্ঘটনা - যা ধ্বংস করে দিয়েছিল সমস্ত স্মৃতি ৷ আজ সমস্ত মনে পড়েছে তার ৷ বুকের ভেতরটা যন্ত্রনায় মোচড় দিল সিরাজুলের ৷ এতদিন যাবৎ যতজনকে সে হত্যা করেছে তাদের করুন মুখগুলো সিন্নুর সেই শ্যামলা মুখকে কেন্দ্র করে যেন আবর্তন করতে লাগল ৷কানে বাজতে লাগল করুন সুরের সেই 'আব্বুজান ' ডাকটা ৷ হায় ! একি করল সে ! নিজের একমাত্র ছেলে - বংশের শেষ প্রদীপকে নিভিয়ে দিল নিজের হাতে ! কে দেবে তার এই ভুলের মাসুল ? একটু - শুধু একটুখানি শ্বাসের জন্য ছটফট করছে সিন্নু ৷ ২১ বছরের সেই ছেলেটার নড়তে থাকা পা - দুটো এঁফোড় - ওফোঁড় করে দিল সিরাজুলের বুকটা ৷ একসময় স্থির হয়ে গেল পা দুটো ৷ একই সঙ্গে স্থির হয়ে গেল সিরাজুলও ৷ লিভারটা সে ধরেই রেখেছিল দু - হাত দিয়ে ৷ লিভারটার ওপর থেঁতলানো মাথা ৷ মুখ থেকে উঠে আসা টাটকা রক্ত যেন তার পাশবিকতার মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে ভেতরের মানুষটাকে - এক সন্তানহারা পিতাকে বাইরে দাঁড় করাতে চেয়েছে ৷ নাঃ ৷ সিন্নুকে আর কবর দেয়নি তার আব্বুজান ৷ কবরের মাটি প্রায় একইসঙ্গে যে তাকেও ঢেকে দিয়েছিল ৷ ৷ - - -


Rate this content
Log in

More bengali story from তিতাস .

Similar bengali story from Tragedy