STORYMIRROR

nusrat jahan

Tragedy Classics Inspirational

4.5  

nusrat jahan

Tragedy Classics Inspirational

চুপ থাকা চিৎকার

চুপ থাকা চিৎকার

4 mins
15

#চুপ থাকা চিৎকার
#নুসরাত জাহান
পর্ব ১
দুচালা টিনের ঘর,বাইরে বাতাসে টিনের চাল কেঁপে কেঁপে উঠছে। সামনের রুম থেকে ভেসে আসছে একজন মধ্য বয়স্ক নারীর গোঙ্গানির শব্দ এবং একজন বলিষ্ঠ পুরুষের চিৎকার।

ঘরের কোনে, পাশের ছোট ঘরে মেঝেতে বসে আছে সুমাইয়া।তাঁর কোলে গুটিশুটি হয়ে জড়িয়ে  আছে ছোট্ট আয়েশা।ভয়ে তার শরীর কাঁপছে।চোখ দুটো ফোলা,কান্না আটকে রাখতে রাখতে লাল হয়ে গেছে।চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে কতটা ভীত।

হঠাৎ আয়েশা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল -

আয়েশা: " বুবু... আব্বা আম্মারে মারে কেন? আম্মার তো খুব কষ্ট  হয়..."
সুমাইয়া কোনো উত্তর দিতে পারলোনা। যেন বহুদিন ধরে সে একই প্রশ্নের উত্তর খুচ্ছে।
কিছুক্ষণ আগের কথা.... ….
টলতে টলতে ঘরে ঢুকলো রহিম ভুঁইয়া। মদের তীব্র গন্ধে ছোট্ট ঘরটা যেন ভারী হয়ে উঠলো। চোখ দুটো রক্তবর্ণ, দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত হিংস্রতা।শিল্পী বেগম যানেন কেন এই হিংস্রতা।রহিম ভুঁইয়া কখনো স্বাভাবিক কারণে বাড়ি ফিরে না।

গত কয়েক মাস ধরে সে শিল্পী কে একটাই কথা  বলে আসছে -"টাকা দে"

আজকে ঘরে ঢুকেই....
রহিম ভুঁইয়া দরজায় লাথি মারলো।
রহিম : "শিল্পী! কই টাকা?"
শিল্পী কাঁদতে কাঁদতে বললো..
শিল্পী :আজ কয়দিন থাইকা কাম পাই নাই।আমরাই দুবেলা খাওন খাইতে পারতেছিনা। মাইয়াডারে বিয়া...
কথাটা বলা শেষ করার আাগেই চুলের গোচায় টান পড়ে শিল্পী বেগমের।চালা কাঠ দিয়ে মারতে মারতে রহিম বলে..
রহিম :"মিথ্যা কস!"মিথ্যা কস তুই আমারে।  (শা**) তোর একদিন কি আমার একদিন..

কিন্তু টাকা টা আসবে কোথা থেকে?
""এলাকার মানুষের কাছ থেকে নানান কথা শুনা যায় রহিম ভুঁইয়া কে নিয়ে। কেউ বলে সে নাকি একাধিক বিয়ে করেছে।মাসের পর মাস কোথাও যেন উধাও হয়ে যায়। আবার অনেকেই বলে সে নাকি জুয়ায় আসক্ত -সারাদিন নেশা আর জুয়া খেলে সময় কাটায়।""
আর যখন টাকার প্রয়োজন পড়ে তখন বাড়িতে এসে তান্ডবলীলা চালায়। আজকের দিনটাও  সেরকমই একটা দিন ছিল...

রহিম ভুঁইয়া ও শিল্পী বেগমের চার সন্তানের পরিবার।

কিন্তু "সংসার" শব্দটা এখানে যেন শুধু কাগজে কলমেই।কারণ এই সংসারের দায়িত্ব, কর্তব্য কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ- এসবের কোনোটাই রহিম ভুঁইয়ার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
এই ভাঙ্গা চোরা পরিবার টা টিকে আছে শিল্পী বেগমের হাত ধরে।
"মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কাজ করা,ধানের মৌসুমে খেতের কাজ, কখনো খড় কাটা,কখনো অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ--যা পায় তা দিয়েই সংসারের চাকা স্বচল রাখার চেষ্টা করেন তিনি। "

তাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের বোঝা শেষ। এখনো আরো দুইটা  আছে।
হয়তো আপনারা ভাবছেন - আজবতো বোঝা কেন বলছেন?আপনাদের সভ্য সমাজে মেয়ে মানে বোঝা এটা অস্বাভাবিক শুনালেও শিল্পীদের পরিবারের মতো পরিবারে এটাই যুক্তিসংগত।
থাক না হয় এসব কথা।
বড় মেয়েটি হওয়ার বছর খানেক পর তাদের কোল আলো করে আসছিল একটা ফুটফুটে ছেলে। সেই সময়টাতে অবশ্য কিছুদিন রহমান ভালো ব্যবহার করতো শিল্পীর সাথে।
'সেই ছেলেটিই এখন মায়ের সাথে সংসারের হাল ধরেছে।মাঝে মাঝে নদী-খালে মাছ ধরে, কখনো দিনমজুরের কাজ করে।' নাহিদ (২৭) বছর এর একজন তাগড়া যুবক।পড়াশোনা ইন্টার পর্যন্ত করেছে।ছাত্র হিসেবে ভালো হওয়া সত্বেও অভাবের তাড়নায় এখানেই পড়াশোনার ইতি টেনেছে। নিতান্তই ভদ্র ছেলে সে।

সেঝো মেয়ে সুমাইয়া  (১৬) তে পা দিয়েছে।গায়ের রং ময়লা হওয়ায় এখনো বিয়ে হয়নি।তারও পড়াশুনা বন্ধ কিছুদিন হয়েছে । অবশ্য তারও ইচ্ছা নাই আর পড়ার।সুমাইয়া কিছুটা শান্ত স্বভাবের, বয়সের তুলনায় অদ্ভুত পরিপক্বতার প্রমান মিলে তার কার্যকলাপে।সেও এখন মনে প্রানে চায় তার মায়ের একটা বোঝা কমাতে।তার মা টাও যে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভীষণ কষ্ট করতেছে।
কিন্তু  শিল্পী বেগমের ছোটো মেয়েটা তার অননান্য সন্তানের থেকে একটু আলাদা।নাম তার আয়েশা,(১২)। সে ছিল প্রাণ চঞ্চল স্বভাবের।
সংসারের অভাব, প্রতিদিনের অশান্তি,বাবা-মায়ের ঝগড়া -এসব যেন এখনো পুরোপুরি ছুঁতে পারেনি তাকে।
সে ভীষণ দুষ্ট ও ডানপিঠে স্বভাবের।সারাদিন এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে বেড়ানো,সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা করা, কখনো গাছে উঠে  কাঁচা আম পেড়ে খাওয়া-এসব নিয়েই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবী।

সংসারের অভাব-অনটন,মায়ের চোখের নিচে জমে থাকা ক্লান্তি কিংবা বাবার নেশাগ্রস্ত  উন্মত্ততা এসবের গভীরতা বোঝার বয়স তখনো হয়নি।

ছোট্ট মেয়েটা (মাশাল্লাহ) যেন আকাশ থেকে নামা হূর-পরী।
"আয়েশাকে দেখলে মনে হয় যেন সৃষ্টিকর্তা তাকে খুব যত্ন করে গড়েছেন।"
তার শরীরের গড়ন ছিপছিপে, কোমল আর বয়সের তুলনায় অদ্ভুত ভাবে পরিপূর্ণ। হাটলে মনে হয় কচি লতার মতো দুলে দুলে এগিয়ে যাচ্ছে।
মুখটা এতটাই মায়াবী যে একবার দেখলে চোখ সরানো কঠিন।যেন নিখুঁত তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। "
চোখে মুখে লেগে থাকা সরলতা আর নিষ্পাপ ভাব তাকে অন্য সবার থেকে তাকে আলাদা করে।

গ্রামের অনেকেই বলতো-
" মাইয়াডারে আল্লাহ বুঝি খুব সময় নিয়ে বানাইছে,মাইয়াডা চাঁদের লাগান সুন্দর। "

--কিন্তু কে জানতো এই অপরুপ সৌন্দর্য একদিন তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিশাপ হয়ে উঠবে........



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy