STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational Others

3  

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational Others

চুনি কোটাল

চুনি কোটাল

5 mins
182

'নারী চেতনা'শব্দটি যত কম অক্ষরের, বিষয়ের বিস্তার কিন্তু ততটাই বেশি। সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নারীরা বঞ্চনার শিকার। সেই কারণেই অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে কাজ করে চলেছেন। কবি-লেখকরাও তাঁদের কলমের মাধ্যমে লড়াই করেচলেছেন, যে অঞ্চলে আলো পড়েনি সেইখানে বিশেষভাবে আলোকপাতের চেষ্টা করে চলেছেন। এই লড়াইয়ে মহাশ্বেতা দেবীর ভূমিকা অগ্রগণ্য বলা যেতে পারে।


তাঁর লেখক সত্ত্বার পাশাপাশি তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের কথা আমরা জানি। মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্পে

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতন, ডোম, লোধা- শবর বিভিন্ন জনজাতির কথা।তিনি জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাদের সঙ্গে অতিবাহিত করেছেন। তাদের পরিবেশ, পরিস্থিতি,যাপনচিত্র তাঁর কলমে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বাক্ষর রেখেছে। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে তাদের সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সমাজে চেতনার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করেছেন। বিশেষত আদিবাসী নারীচরিত্রেরা তাঁর কলমে অনন্য হয়ে উঠেছে, বুদ্ধিতে সাহসে প্রেমে ও প্রতিবাদে তারা একের পর এক নির্মিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর রচনায়। উপজাতিদের, বিশেষত নারীদের বঞ্চনা ও বিপন্নতার কথাই প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর ছোট গল্পগুলিতে। 

শুধুমাত্র সাহিত্য নয়, সমাজতত্ত্বেরও নিদর্শন রয়েছে তাঁর সেই সব রচনায়। বিষয়-বৈচিত্র্যে, হৃদয়- অনুভবে এবং শিল্প-কুশলতায় সেই সব রচনা যুগ সাহিত্য বা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষের বেদনা উপলব্ধি করেছেন এবং সেই উপলব্ধ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে সমাজে বার্তা দিয়েছেন। আদিবাসী জনজাতিদের সঙ্গে থেকে তাদের জন্যে সংগ্রাম করে তাদের স্ব-বিকাশে গাইডের ভূমিকা নিয়েছেন।


আগেই বলেছি মহাশ্বেতাদেবীর কলমে নারীচরিত্ররা বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। শুধুমাত্র নারীদের মানসিক

বিশ্লেষণ নয়, তাদের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন তিনি। এই সব চরিত্র-নির্মাণে মহাশ্বেতা দেবী অদ্বিতীয়। আদিবাসী জনজাতির সূক্ষ সূক্ষ সমস্যা তাঁর প্রতিবাদী কলমে বারবার উঠে এসেছে। অনুভবের বিভিন্ন স্তরের নিবিড় বিস্তারও তাঁর প্রতিটি রচনার মধ্যে বিরাজমান।


পশ্চিমবঙ্গের আদিমতম অধিবাসীগুলির মধ্যে অন্যতম হল লোধা সম্প্রদায়; যারা বর্তমানে ঝাড়গ্রাম জেলার অন্তর্গত অধিকাংশ অঞ্চলগুলিতে বহুকাল ধরে বসবাস করছেন । ১৯৫২ সাল পর্যন্ত লোধারা অপরাধপ্রবন উপজাতি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীকালে এদের এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করে 'তপশিলী' স্বীকৃতি প্রদান করা হয় । ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর ২ , নয়াগ্রাম ব্লক, গোপীবল্লভপুরের আশেপাশের কিছুগ্রামগুলিতে, মোহনপুর অঞ্চলে লোধাদের আধিক্য দেখা যায়; এবং এই সংখ্যা আনুমানিক ১১৩৯ জনের কাছাকাছি । প্রধানত জনকোলাহল থেকে দুরে জঙ্গলের কাছাকাছি নীরব নির্জন পরিবেশে লোধারা তাদের সমাজগড়ে তুলেছে । কয়েক বছর আগেও লোধাশুলির পাশ দিয়ে এগোলেই দেখা যেত লোধাদের বসতি । লোধা সম্প্রদায়েরবসতিগুলোতে দেখা যায় ছোটো ছোটো ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ডালপালা দিয়ে তৈরী মাটির বাড়ি । এই বাড়িগুলিতে জানালা প্রায় থাকেই না , থাকে শুধু একটা প্রবেশপথ । লোধা উপজাতির জীবনযাপন প্রণালী অত্যন্ত অনুন্নত । শিকার আর সংগ্রহের উপর তাদের জীবিকা নির্বাহ নির্ভর করে । এরা জঙ্গল থেকে সাপ,খরগোশ , ইঁদুর সংগ্রহ করে বা খালে মাছ ধরে খায় । অনেক সময় ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের দেখা যায় গুলতিমেরে পাখি , গিরগিটি শিকার করতে | অনেক দিন ধরে রেখে দেওয়া পচানো ভাত থেকে হাড়িয়া খায় ও আনন্দে মেতে ওঠে ।

সামাজিক দিক দিয়ে লোধা সমাজ অন্যান্য সমাজের মতন পুরুষতান্ত্রিক ।

প্রত্যেক গোত্রের আবার নির্দিষ্ট দেবতা রয়েছেন । লোধারাও প্রাচীন রীতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহে বিশ্বাসী । লোধা সমাজে ভালোবেসে বিয়ে করলে বলা হয় গান্ধর্ব্য বিবাহ । পুরুষেরা এক টুকরো কাপড় পরে কোমরে আর নারীরা এক কাপড়েই সারাবছর লজ্জা নিবারণ করে । লোধা পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় গ্রামের প্রধান 'মুখিয়া',পুরোহিত 'তেহরি', চিকিৎসক 'সুন্নি' নামে পরিচিত । লোধারাও বিভিন্ন আলৌলিকতায় বিশ্বাসী ,ধর্মদেবতা বসুমাতা,শীতলা,চন্ডী,বরাম প্রভৃতি দেবদেবীরা রুষ্ট হলে মানুষের ক্ষতি করে বলে তারা বিশ্বাসী ।

অপরাধপ্রবন উপজাতি হিসেবে সমাজ থেকে বহু সময় দুরে থাকার কারণে পর্যাপ্ত শিক্ষার আলো লোধাদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি । তবে বর্তমানে সরকার ও নানা N.G.O-এর সহায়তায় লোধারাও শিক্ষাগ্রহনে এগিয়ে এসেছে । এই সমাজের চুনী কোটালের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য । ইনি লোধা সমাজের মধ্যে প্রথম মহিলা যিনি প্রচুর সামাজিক ও অর্থনৈতিক লড়াই করে ১৯৮৫ সালে স্নাতক হন । কিন্তু লড়াই আরো বেড়ে যায় যখন তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় যান । তথাকথিত উঁচু গোত্রের লোকজন এনাকে ২ বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করতে শুরু করেন । যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ডিগ্রি দেওয়া হয় না । এই সামাজিক প্রবঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে অবশেষে তিনি আত্মহত্যা করেন । এতে সমাজের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে ।


চুনি কোটাল (১৯৬৫ - ১৪ আগস্ট ১৯৯২) একজন দলিত আদিবাসী মহিলা ছিলেন, যিনি ১৯৮৫ সালে লোধা শবর সম্প্রদায়ের প্রথম মহিলা স্নাতক হন। বছরের পর বছর অফিসের কর্মকর্তাদের দ্বারা হয়রানির ফলে ১৯৯২ সালের ১৬ আগস্ট তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। এবং এর ফলে লোধ শবর সম্প্রদায় তাদের অধিকার এবং বিচারের জন্য একত্রিত হয়। এমনকি ভারতের উল্লেখযোগ্য লেখক-এক্টিভিস্ট মহাশ্বেতা দেবী তার বিয়াধথান্দা (১৯৯৪), (দি বুক অব দি হান্টার (২০০২)) নামক বাংলা গ্রন্থে চুনি কোটালের আত্মহত্যার বিষয়টি আলোকপাত করেন।


চুনি ১৯৬৫ সালে পশ্চিম বঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোহালদহি গ্রামের লোধা সম্প্রদায়ের একটি গরিব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কাটে চরম দারিদ্রের মধ্যে এবং তিনিই ছিলেন লোধা সম্প্রদায়ের প্রথম মহিলা যিনি মাধ্যমিকে পড়ালেখা শেষ করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি ঝাড়গ্রাম আইটিডিটি অফিসে লোধা সামাজিক কর্মী হিসেবে তার প্রথম চাকরি পান। তার দায়িত্ব ছিল তার নিজ গ্রাম সমীক্ষণ করা।


১৯৮৫ সালে তিনি বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। স্নাতক ডিগ্রী লাভের দুই বছর পর, তিনি মেদিনীপুরের 'রানি শিরোমনি এসসি এন্ড এসটি গার্লস' হোস্টেলের হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে নিযুক্ত পান, এখানেও তিনি সাম্প্রদায়িক হয়রানির সম্মুখীন হন।


চুনি কোটালের সত্যিকারের সমস্যা শুরু হয় যখন তিনি স্থানীয় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স কোর্সে (এমএসসি) যোগ দেন। এখানে তিনি ধারাবাহিকভাবে তার উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ অধ্যাপক (যেমন অধ্যাপক ফাল্গুনী চক্রবর্তী এবং অন্যান্যরা) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকদের দ্বারা বৈষম্যমূলক আচরণ এবং প্রতিনিয়ত অপমানিত হতে থাকেন, যারা তাকে প্রয়োজনীয় পাস গ্রেড দিতে অস্বীকৃতি জানায় যদিও তিনি তার সকল ধরনের মানদণ্ড পূর্ণ করেছিলেন। অপমানিত ও হতাশ চুনি ১৯৯২ সালের ১৬ আগস্ট আত্মহত্যা করেন।


শুভব্রত বসুর হার না মানা হার উপন্যাস চুনি কোটালের জীবন অবলম্বনে লেখা।


প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষাক্ষেত্র ও সামাজিক ক্ষেত্রে জাতিগত ভেদাভেদের বিরুদ্ধে, প্রশ্ন উঠেছে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের সর্বোময় কাঠামোর বিরুদ্ধেও। শিক্ষাক্ষেত্রে (বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রে তো বটেই) উপস্থিত জাতিগত বঞ্চনার যে ‘পরম্পরা’ নাম না জানা হাজারো রোহিত-চুনী-সেন্থিলদের প্রতিদিন ধীরে ধীরে খুন করে চলে, সোচ্চার হবার আশু প্রয়োজন তার বিরুদ্ধে, যে আর্থ সামাজিক কাঠামো প্রতিনিয়ত জাতিভেদ প্রথাকে জিইয়ে রাখে,লড়াই গড়ার আশু প্রয়োজন তার বিরুদ্ধেও আর সাম্প্রতিক অতীতের টুকরোটাকরা লড়াইগুলি বৃহত্তর অর্থে সে সর্বাঙ্গীণ লড়াইয়ের প্রাথমিক ধাপ বলা চলে। এ লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায় বর্তায় আমাদের উপর, জাতিভেদ প্রথা আর তাকে প্রতিদিন নতুনভাবে জন্ম দেয় যে সমাজব্যবস্থা তাকে উৎখাত করার দায় বর্তায় আজকের সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির উপর-


  ‘  No annihilation of caste without revolution, no revolution without annihilation of caste’


তবু আমরা আশা করি লোধা জনজাতির ছেলে মেয়েরা সমাজের মুলস্রোতে নিজেদের অবদান রেখে তাদের জেলাকে গৌরবান্বিত করে তুলবেন |



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational