Sandip Das

Inspirational

5.0  

Sandip Das

Inspirational

ভারত, নারী, সমাজ এবং...

ভারত, নারী, সমাজ এবং...

7 mins
1.8K


বই -১ 


ভারতীয় ইতিহাস বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাসের মধ্যে অন্যতম । সিন্ধু সভ্যতার হাত ধরে যে ইতিহাসের ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল তা আজও অক্ষত। তবে সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় সমাজে পুরুষতন্ত্রের যে প্রাধান্য দেখা গেছে তা ভারতের ইতিহাস থেকে অনেকটাই ভিন্ন। যে দেশ লক্ষ্মী , সরস্বতী , দুর্গা , কালি , দশমহাবিদ্যার উপাসনা করে থাকে , সেই দেশেই আজ কন্যারা সর্বাধিক বিপদে। রাস্তার অন্ধকারে ধর্ষণ আজ প্রতি দিনের ঘটনা। কন্যা ভ্রূণ হত্যার ফলে লিঙ্গ অনুপাত হ্রাস পেয়েছে এই সমাজে। অথচ এই দেশের গৌরবান্বিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , নারীদের স্থান এই সমাজে কত উন্নত ছিল। 

আজ এই ইতিহাসের দিকেই আপনাদের দৃষ্টি ফেলতেই আমার এই প্রচেষ্টা :- 


আর্য সমাজ :- আর্যদের যুগে মহিলাদের দেবী হিসাবে স্থান দেওয়া হয়। গার্গী , মৈত্রী , লোপামুদ্রা , খনার নাম আজ জগৎ খ্যাত। পুরুষদের পাশাপাশি এই সমস্ত নারীরাও ভারতের ইতিহাসে যে অবদান রেখে গেছে তা সত্যই প্রশংসনীয় । 

“Nijabhujadanda nipatitakhanda

Vipatitamunda bhataadhipate

Jaya Jaya he Mahisasuramardini ramya

Kapardini shailasute " .....

মা দুর্গার ওপর রচিত এই শ্লোকে তার বীরত্ব আমরা দেখতে পাই যেখানে তিনি একাই শত শত যোদ্ধাকে নাশ করছেন । নারীদের দক্ষতার এরকম হাজার হাজার লক্ষ্য করা গেছে সে যুগের লেখাতে। বাস্তবেও নারীদের হাতেই তাই সমস্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল তখন। 

দুর্গা বা কালি ছেড়ে এবার রামায়ন ও মহাভারতে ফিরে আসা যাক। সেখানে আমরা বেশ কিছু নারী চরিত্র দেখতে পাই যাদের বাদ দিয়ে মহাকাব্য দুটি কল্পনাও করা যায় না। তাদের বীরত্ব পাঠকের চোখে এক অন্য সম্মানীয় স্থান দখল করে রেখেছে। 

লঙ্কিনী ও শৃখন্ডি চরিত্র দুটির কথা মনে পড়ে। যদিও দুজনেই ছিল পার্শ্ব চরিত্র তবু তাদের যুদ্ধ নিপুনতা বিষয়ে সকলের মনে বাহবা ছাড়া আর কোন শব্দ আসতে পারে না। কন্নড় ভাষায় রচিত জামিনী ভারতম গ্রন্থে অর্জুনকে এক অচেনা দেশে আবির্ভূত হতে দেখতে পাই আমরা। সে দেশ অনেকটা গ্রিক আমাজনের মত, যেখানে প্রতিটি মহিলার মধ্যেই এক যুদ্ধং দেহি মনোভাব। কাহিনী অনুসারে এখানের রাজকুমারী প্রমীলা, অর্জুনের অশ্বমেধের ঘোড়াটিকে বন্দি করে রেখেছিল এবং তারই জন্য অর্জুন সেই দেশে উপস্থিত হন। পরবর্তীতে অর্জুন প্রমিলাকে বিবাহ করতেও বাধ্য হন। ভেবে দেখুন , অনুভব করুন এই দেশের লাজুক নারীদের সাহসিকতা। এই দেশ ও সেখানকার নারীদের সাহসিকতার বর্ণনা আমরা গুরু মৎসেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথের গল্পেও পেয়ে থাকি। 


সুতরাং, একটা কথা পরিষ্কার যে আর্য সভ্যতা ও প্রাক আর্য সভ্যতায় নারীদের সফলতা এবং সমাজে তাদের উন্নতির ছবি আমরা রন্দ্রে রন্দ্রে অনুভব করতেই পারি। আর এটা শুধু আর্য কাহিনীতেই নয়, ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়ের মধ্যেই এই বীরত্ব আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে পাই। বর্তমান সমাজ হয়তো নিজ দেশের সেই গৌরবান্বিত নারী ইতিহাস ভুলে গেছে। 


মৌর্য সাম্রাজ্য ও তার পরবর্তী ইতিহাস :- মৌর্য সাম্রাজ্যে মহিলা দেহরক্ষী রাখা হতো, সেকথা ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই জানা যায়। সেই সমস্ত মহিলারা সুসাস্থ সম্পন্ন, কর্মঠ, নির্ভীক এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। শুধু তাই নয়, সে যুগে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বেশি বিশ্বস্ত বলেও মনে করা হত আর তাই মহারাজ মহিলাদেরই এই বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে থাকতেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে মহিলারা সেবা ধর্ম যেমন নিপুণ কৌশলে সামলাতেন, ঠিক তেমনই প্রয়োজনে সরাসরি মাঠে নেমে যুদ্ধ করে থাকতেন আর এ জন্য তাদের ছোট বেলা থেকেই যুদ্ধ কৌশল শেখানো হতো। 

মধ্য যুগ থেকে সমাজ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পিতৃ তান্ত্রিক আকার ধারন করলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের সুযোগ কমে যেতে থাকে। তবে এসবের মধ্যেও যোগ্যতা নিজের পথ সব সময় তৈরি করে নিয়েছিল। একাদশ শতাব্দীতে ওয়ারঙ্গেলের মহারানী রুদ্রমা দেবী ছিলেন একজন শক্তিশালী যোদ্ধা। তিনি একটি শক্তিশালী সৈন্যদল নির্মাণ করেন এবং প্রতিটি সৈন্যকে মার্শাল আর্ট এর শিক্ষা প্রদান করেন। এর ফলে তার সাম্রাজ্য দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসাবে পরিচয় লাভ করেছিল। আজ আমরা মার্শাল আর্ট বলতে চীনকে চিনি, অথচ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে আমাদেরই দেশে এই বিদ্যার প্রচলনের ইতিহাস। শুধু মার্শাল আর্ট নয়, রুদ্রমা দেবী মল্ল যুদ্ধ ও তরবারি ব্যবহারেও নিপুণ ছিলেন। তার এই শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কাছে গঙ্গা বংশ এবং যাদব বংশ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। শুধু রুদ্রমা নন, এই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ ভারত বেশ কিছু শক্তিশালী রানীর উত্থান দেখেছিল -- যেমন মহারাণী আববাক্কা, যার শক্তির কাছে পর্তুগিজ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল; মহারাণী কেলাডি চেননামমা, যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। মারাঠারা পর্যন্ত তার শক্তি এবং সাহসিকতায় মুগদ্ধ হয়; মহারাণী কিততুর চেননামমা, যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করে গেছিলেন। 

এরকম অসংখ্য বীর নারীদের দেশ আমার ভারত। তবু আজও নারী নির্যাতন ঘরে ঘরে, আজও মহিলা জন্ম মানেই অশুচি মনে করা, মহিলা মানেই ভ্রূণ হত্যা, মহিলা মানেই গৃহবন্দি জীবন। এখানেই এ ইতিহাস শেষ নয়। সারা ভারত খুঁজে দেখবো, কথা দিলাম। যতটা ইতিহাস তুলে আনা যায়, আনবো। যদি কিছুটা উপশম হয় কোনদিন। 


উত্তর ভারতীয় সমাজ :- দক্ষিণ থেকে ফিরে আসা যাক ভারতের অন্য প্রান্তে । রাজপুত সম্প্রদায়ের বীরত্বের ইতিহাস আমরা কে না জানি। তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য হলো রাজপুত সমাজের মহিলাদের ইতিহাস। ভারতের সমগ্র জাতির মধ্যে রাজপুত মহিলারাই মাথা উঁচু করে বাঁচার কথা আমাদের শিখিয়েছিল বারবার। গোন্ডওয়ানার মহারানী বাজ বাহাদুর কে পরাস্ত করেছিল এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর একক শক্তি নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অবশ্য শেষ রক্ষা হয় নি এবং একটি তীর চোখ বিদ্ধ করার ফলে মৃত্যু হয় তার। 

রাজপুত মহারানী পদ্মিনির বীরত্বের কাহিনী আমরা কে না জানি। আলাউদ্দিন খলজির হাত থেকে তার স্বামী রাওয়াল রতন সিং কে মুক্ত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। 


গারওয়ালের নাক কাটি রানীর বীরত্বের কাহিনীও কারুর অজানা নয়। সেখানের রানী কর্ণাবতী শত্রুদের নাক কেটে দিত বলে জানা যায়। সুনিপুন অস্ত্র কৌশল না জানলে এটা কোনদিন সম্ভব নয়। দুন উপত্যকায় তিনি মুঘল বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণ একাই প্রতিহত করেছিলেন। বাঙলার রানী ভবশংকরি তার বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ভুরসূত অঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য তিনি একাই পাঠানদের প্রতিহত করেছিলেন । পশ্চিমের তারাবাই এর সাম্রাজ্য মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছে অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল। তিনি বহুবার তার সাম্রাজ্যে মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করেন, এমনকি ঔরঙ্গজেবের বহু অঞ্চলে তার বিজয় পতাকার বীজ বপন করেছিলেন। 

ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাসে মহিলা বীরত্বের অবদান কোনদিন কোনভাবেই খন্ডন করা যায় না। ১৮৫৭ র যুদ্ধের শহীদ লক্ষ্মীবাই ও ঝলকারী বাই, মেদিনীপুরের মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদেদার হলো সেই সমস্ত মহিলা যারা সম্মুখ সমরে শুধুমাত্র দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিল। ইতিহাসের পাতায় এই তালিকা সুদীর্ঘ। আস্তে আস্তে সবই আলোচিত হবে এখানে। 


ভারতীয় মুসলিম সমাজ :- ভারতীয় মুসলমান সমাজে পর্দা প্রথার মত অভিশাপ যেমন সত্য ছিল, ঠিক তেমনই সেই সমাজের মহিলাদের বীরত্ব এক অন্যতম সত্য বলে জানা যায়। সুলতানা রাজিয়ার নাম কে না জানে। ইলতুতমিস কন্যা রাজিয়া বেগম একজন দক্ষ ঘোড়সোয়ার ছিলেন এবং তার পাশাপাশি একজন সুদক্ষ যোদ্ধাও ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি দিল্লির মসনদে বসেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব সামলেছিলেন। 

জাহাঙ্গীর স্ত্রী নূর জাহান ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী রমণী। সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জাহাঙ্গীর যেমন তার সাথে পরামর্শ করে থাকতেন তেমনই প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি রণ ক্ষেত্রে তার স্বামীর প্রাণ রক্ষাও করেছিলেন। 

আহমেদনগর সাম্রাজ্যের চাঁদ বিবির বীরত্বের কথা ইতিহাস আজও মনে রেখেছে। মুঘলদের সাথে যুদ্ধে তিনি নিজে রণক্ষেত্রে নেমে আসেন। যদিও সে যাত্রায় শেষ রক্ষা হয়নি। 

ঊনবিংশ শতকেও আমরা দেখতে পাই ভারতীয় মুসলমান মহিলারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বেগম হজরত মহল, আজিজুন বাঈ প্রভৃতি। 

শুধু রাজ পরিবার অথবা সম্ভ্রান্ত পরিবারে নয়, ভারতীয় সাধারণ মহিলাদের শক্তির কাহিনী ইতিহাসের পাতায় পাতায় ভরে আছে। আমরা আসলে ইতিহাস পড়ে গেছি চিরকাল, জানতে চাইনি কোনদিন। হামপি গুহাচিত্র এবং বেলুর গুহাচিত্রে মহিলাদের মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহনের ছবি পাওয়া গেছে। এর থেকে পরিষ্কার যে ভারতীয় মহিলারা নানা রকম আত্মরক্ষা কৌশল জানতো এবং মার্শাল আর্টসের বিভিন্ন কলাকৌশল যেমন সিলাবাম ( লাঠিখেলা ), কুস্তি, কলারি প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান ছিল। তবে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে -- তারা কি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল কোনদিন। তার উত্তর অবশ্যই সদর্থক। আগামী পর্বে ভারতীয় সাধারণ মহিলাদেরই বীরত্বের ছবি তুলে ধরবো আপনাদের সামনে। 


ভারতীয় সাধারণ মহিলা সমাজ :- আগেই বলে এসেছি ভারতীয় মহারানী শুধু নয় সাধারণ ঘরের মহিলাদের বীরত্বের গল্প এদেশের পাতায় পাতায় রয়েছে অমর হয়ে। আমরা হয়তো সেসব জানার চেষ্টা করি নি, অথবা এই সমাজ সেসব জানতে দেয়নি। ওনাকে ওববাভা হায়দার আলীর সাথে লড়াই করে তার প্রায় একশত সৈন্য একাই হত্যা করেছিলেন। মল্ল যুদ্ধে বহু ভারতীয় মহিলা ভারতীয় মহারাজদের কুপোকাত করেছেন এমন নিদর্শন বহু শিলালেখ থেকে আমরা জানতে পেরে থাকি। 

বর্তমানে আমরা উন্নতির দিকে যত এগিয়েছি তত মহিলা সুরক্ষা নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। তবু প্রশ্ন থেকে যায় আজ সত্যিই মহিলারা সুরক্ষিত তো? প্রশ্ন থেকেই যায় আজও গভীর রাতে নারীরা পথে ঘাটে নিরাপদ তো ? নারীদের নিরাপত্তা যদি সত্যিই বেড়েছে তবে তাদের সংরক্ষণের দাবি ওঠে কেন? রাজস্থানের এমন একটি জায়গা আছে যেখানে এখনো সহমরন প্রথা চালু আছে। গ্রামের দিকে, নারী জন্ম আজও কতটা অশুচি। আজও মাসিক হলে মেয়েদের পুজোর ঘরে ঢোকা নিষেধ। আর সবশেষে নিজের মাকে প্রশ্ন করে দেখুন বিয়ের মণ্ডপে বাবার পাশে তার বসার অধিকার আছে কি না ?

আসলে ছেলেদের পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। তারা আসলে যাই করুক তাই ঠিক, মেয়েরা নয়। পুরান থেকে বর্তমান -- এই নিয়মেই বাঁধা। এ নিয়ে একদিন লিখবো। সেদিন হয়তো পুরুষদের চক্ষু শূল হবো। তবু লিখবো। পুরুষ সমাজ যে কত বড় অপরাধী তা না বললে অন্যায় হবে।


তথ্যসূত্র : - গুগুল, ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং লোকমুখে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সামাজিক কাহিনী।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational