STORYMIRROR

Zillur Rahman

Tragedy Others

3  

Zillur Rahman

Tragedy Others

বদলি

বদলি

4 mins
241


যদিও চাকরি মানে বদলি হতে হবে ইচ্ছায় অথবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তবুও এই স্কুল থেকে অন্য কোনো স্কুলে যেতে হবে এটা অনামিকা কোনোভাবে মেনে নিতে পারছে না। ক্লাস রুম, অফিস রুম, স্কুলের মাঠের সবুজ ঘাস, মাঠের এক কোণায় লাল টকটকে ফুলওয়ালা শিমুল গাছ সবকিছু যেন অনামিকার খুব আপন। এই শিমুল গাছটার সঙ্গে অনামিকা তার জীবনের মিল খুঁজে পায়, গাছে যখন ফুল থাকে তখন লাল টকটকে দেখায়, এ যেন অনামিকার ভরা যৌবনের প্রতিচ্ছবি আবার যখন পুষ্পহীন, পত্রবিহীন গাছটা দাঁড়িয়ে থাকে তখন অনামিকার মনে হয় সেও যেন গাছটার মতো প্রাণহীনভাবে বেঁচে আছে। জীবনের গতি কখনো গতিময়, কখনো শ্লথ।

স্কুলের প্রতিটি ছেলেমেয়ে অনামিকার নিজের শিশুর মতো। অনামিকা যখন প্রথম স্কুলে জয়েন করল তখনো তার বিয়ে হয়নি। এই ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে অনামিকার হৃদয়ে যেন মাতৃত্ববোধ জেগেছে, প্রতিটি বাচ্চাকে যেন সে মাতৃস্নেহ দিয়ে লেখাপড়া শিখিয়েছে। বিয়ের কয়েকবছর হওয়ার পরও যখন অনামিকার বাচ্চা হচ্ছিল না তখন সে স্কুলের বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। এখন অনামিকা এক পুত্র সন্তানের জননী, ছেলে অন্তরের বয়স পাঁচ বছর। অনামিকা মাঝে মাঝে অন্তরকেও স্কুলে নিয়ে আসে, একবার অন্তরের মুখের দিকে আরেকবার স্কুলের বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

শিমু ক্লাস থ্রিতে পড়ে। দরিদ্র পরিবারের মেধাবী মেয়ে, বাবা ক্ষেতমজুর, মা কাজের ঝি, অনেক কষ্ট করে শিমুকে তারা লেখাপড়া করায়, একবার একটানা কয়েকদিন শিমু স্কুলে এলো না। অনামিকা তার সহপাঠী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে জানতে পারল শিমুর বাবা-মা ওকে আর লেখাপড়া শিখাবে না, শহরে এক বাড়িতে কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দিবে। কথাটা শুনে অনামিকার মন বেদনায় ভরে গেল। এত সুন্দর মেয়েটা মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করবে, শিমু ক্লাসের ফার্স্ট মেয়ে সে লেখাপড়া করলে একদিন অনেক বড় হতে পারবে, শিমু যেন এক না ফোটা কুঁড়ি, যে একদিন অনেক বড় হয়ে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো পুরো জাতিকে বিকশিত করতে পারবে, দেশ ও দশের সেবা করতে পারবে।

সেদিন স্কুল শেষে অনামিকা শিমুদের বাড়িতে গেল। রাস্তার পাশে একটা কাঁচা ঘরে কোনোভাবে শিমুর বাবা-মা, দুই ভাই আর শিমু থাকে। অনামিকাকে দেখে শিমুর মা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ল, উঠানে একটা পাটিয়ে বিছিয়ে দিতে দিতে বলল, হারা গরীব মানুষ আপা, তোমাক যে কুন্ঠে বসিবা দিই।

অনামিকা অভয় দিল, ব্যস্ত হবেন না, আমি আপনাদেরই মেয়ে, কয়েকদিন থেকে সুমাইয়াকে না দেখে এলাম, মেয়েটার কোনো অসুখ-বিসুখ হয়নি তো?

শিমুর পুরো নাম সুমাইয়া আক্তার, শিমুল ফুলের মতো গায়ের রংটা লাল টকটকে বলে অনামিকা তাকে শিমু শিমু বলে ডাকতে ডাকতে এখন তার শিমু নামটাই সবার মুখে মুখে হয়ে গেছে। শিমুর মা লজ্জায় মাথা নত করে আমতা আমতা করে বলল, না আপা কুনো ব্যারাম হয়নি, তোমরা তো জানেন আপা হামার দু’জনের হাতের ওপর এতগুলো মুখ হা করে থাকে, তয় শিমু যুদি কুনো কাজ করিবা পারলি হয় তাহেলে...

অনামিকা কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, ভুল করছেন আপা, শিমু খুব ভালো ছাত্রী, ক্লাসের ফার্স্ট, ও লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হতে পারবে।

কিন্তু হারা লেখাপড়া করিবার টাকা কুণ্ঠে পামো আপা, বেশিদূর তো আর পড়বা পারিবে নাহি, হুদায় স্কুলত পাঠাই কী লাভ।

অনামিকা কিছুটা শাসনের সুরে বলল, একদম বাজে কথা বলবেন না। প্রাইমারি স্কুলে তো কোনো বেতন দিতে হয় না, হাইস্কুলেও সরকার উপবৃত্তি দেয়, আজকাল লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। তারপরও যদি কোনো সমস্যা হয় তবে আমি শিমুর পাশে থাকবো। আজ থেকে সুমাইয়ার নাম আমি রাখলাম শিমু।

সেদিন থেকে অনামিকা শিমুকে কাপড়-চোপড় কিনে দেয়, কাগজ-কলম কিনে দেয় প্রয়োজনে হাতে দুয়েক’শ টাকাও দেয়। শিমু অনামিকাকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে, অনামিকাও শিমুকে অন্তরের মতোই স্নেহ করে।

অনামিকার বদলির খবরে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা পুরো স্কুলটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনামিকা জানতো যেতে ইচ্ছা না হলেও এই স্কুল থেকে তাকে খুব শীঘ্রই চলে যেতে হবে। প্রায় এক মাস আগে সাইদ অনামিকাকে চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দিয়েছে হয় বদলির দরখাস্ত করতে হবে নইলে সংসার ছাড়তে হবে।

সাইদ চাকরি করে, চাকরির জন্য তাকে সবসময় থাকতে হয়, ঢাকা, কুমিল্লা কিংবা চট্টগ্রাম। বছরে দু চারবার আসে আর সেসময় অনামিকা তার বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যায়। সাইদের ছুটি শেষ হলে অনামিকাও আবার বাবার বাড়িতে চলে আসে, তার স্কুলটাও বাবার বাড়ি থেকে কয়েক মিনিটের পথ।

বিয়ের আগে সাইদ বলেছিল যতদিন সে চাকরি করবে অনামিকা ততদিন তার বাবার বাড়ি থেকেই স্কুল করবে, সাইদ চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করলে অনামিকা বদলি হয়ে তার শ্বশুরবাড়ির কাছের কোনো স্কুলে চলে যাবে। প্রথম প্রথম সাইদ তার কথা ঠিকই রেখেছিল, সাইদ ভেবেছিল বাবার বাড়িতে থাকলেও অনামিকা তার বেতনের টাকা তার হাতে তুলে দিবে কিন্তু অনামিকা যুক্তি দেখাল বাবার বাড়িতে থাকলে বাবার হাতে কিছু টাকা দিতে হবে, ভাইবোনদের হাতে দিতে হবে, স্কুল যাতায়াত, শহরে যাতায়াত তার পকেট খরচ এসব দেয়ার পর তার কাছে যা টাকা থাকবে তা জমিয়ে সে শহরে বাড়ির জন্য জমি কিনবে কিন্তু নতুন চাকরিতে অনামিকার বেতনের থেকে সঞ্চিত টাকা দিয়ে বাড়ির জন্য জমি কেনা দুঃসাধ্যও বটে, তাও সম্ভব হতো যদি মাঝে মাঝে সাইদ তার কাছ থেকে টাকা না নিতো।

অনামিকার কাছ থেকে মাঝে মাঝে টাকা নিয়েও যেন সাইদের চলছিল না, সে চাইছিল অনামিকার পুরো বেতনের টাকা, তা যখন সম্ভব হলো না, তখন সে অনামিকাকে চাপ দিল বদলি হয়ে তার বাবার বাড়ির কাছের স্কুলে যেতে। এনিয়ে কয়েকবছর যাবৎ চলছে মনোমালিন্য, গতমাসে সাইদ ছুটিতে এসে একরকম জোর করে অনামিকার কাছে বদলির দরখাস্ত স্বাক্ষর করে নিয়েছে। তারই ফলশ্রুতিতে অনামিকার বদলি।

অনামিকার বদলির খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে অনেকেই আফসোস করল, ছাত্র-ছাত্রীরা মনমরা হয়ে পড়ল। খবরটা শুনে শিমুও এলো অনামিকার কাছে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, আপা আপনি নাকি চলে যাবেন?

অনামিকা শিমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিল, শিমুর থুতনি উঁচু করে চোখে চোখ রেখে কিছু বলতে গিয়েও যেন তার কণ্ঠস্বর বুজে এলো, সে মাথা উঁচু-নিচু করে সায় দিল।

সমাপ্ত।



Rate this content
Log in

More bengali story from Zillur Rahman

Similar bengali story from Tragedy