অষ্টমীর রাত
অষ্টমীর রাত
অষ্টমীর রাত।
পাড়ার পুজোমণ্ডপ তখন আলোয় ঝলমল করছে। ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর মানুষের ভিড়ে চারদিক যেন অন্য এক পৃথিবী।
অনির্বাণ বহু বছর পর কলকাতার পুরনো পাড়ায় ফিরেছে।
মায়ের মৃত্যুর পর এই পাড়ায় আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। অথচ অষ্টমীর রাত এলেই তার মনে পড়ত—মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরোনোর কথা।
সেই রাতেও সে একা মণ্ডপের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি পরিচিত গলা—
— “এত বছর পরেও অষ্টমীর রাতে একা দাঁড়িয়ে থাকিস?”
অনির্বাণ ঘুরে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে মেঘলা।
শৈশবের বন্ধু।
যাকে শেষবার দেখেছিল প্রায় পনেরো বছর আগে।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মেঘলা হেসে বলল,
— “মনে আছে? অষ্টমীর রাতে আমরা দু’জনে ঠিক করেছিলাম, বড় হয়ে যেখানেই থাকি, এই পুজোয় একদিন এখানে ফিরব।”
অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল,
— “মনে আছে। কিন্তু জীবন তো সব প্রতিশ্রুতি মনে রাখে না।”
মেঘলা উত্তর দিল,
— “মানুষ না রাখলেও জায়গাগুলো রাখে।”
দূরে তখন সন্ধিপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
অনির্বাণ হঠাৎ লক্ষ্য করল, মেঘলার হাতে সেই পুরনো লাল সুতো।
ছোটবেলায় পুজোর দিন দু’জনে একসঙ্গে বেঁধেছিল।
— “এটা এখনও রেখেছিস?”
মেঘলা বলল,
— “কিছু জিনিস ফেলে দেওয়া যায় না।”
ঢাকের শব্দ আরও জোরে উঠল।
আকাশে তখন পূর্ণিমার আলো।
অনির্বাণ মনে মনে ভাবল—
মা নেই। শৈশব নেই। সেই দিনগুলোও নেই।
তবু অষ্টমীর রাত যেন কোথাও গিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল।
কিছু মানুষ চলে যায়,
কিছু সময় চলে যায়,
কিন্তু কিছু অনুভূতি—
ঠিক অষ্টমীর রাতের মতোই ফিরে আসে।
সেদিন দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিল।
কেউ কাউকে কিছু বলল না।
হয়তো এত বছর পর বলার মতো কিছু বাকি ছিল না।
শুধু মণ্ডপের আলোয় দু’জনের ছায়া পাশাপাশি পড়েছিল।
অনির্বাণ তাকিয়ে দেখল।
দুটি আলাদা ছায়া।
কিন্তু পথটা—
একই দিকে।
