STORYMIRROR

Rifay Amin

Romance Tragedy

4.5  

Rifay Amin

Romance Tragedy

অসমাপ্ত চিঠির দাস্তান

অসমাপ্ত চিঠির দাস্তান

3 mins
11

পুরোনো ঢাকার এক সরু গলির শেষে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বাড়ি। সময়ের ধুলোয় তার রং মুছে গেছে, বারান্দার প্লাস্টার খসে পড়ে ইটগুলো উন্মুক্ত হয়ে আছে। জানালার কাঁচে জমে থাকা ধুলোর স্তর দেখে মনে হয়—বহুদিন কেউ এই বাড়ির দিকে গভীরভাবে তাকায়নি।


সেই বাড়িতেই একা থাকেন আনিস সাহেব।


ঘরভর্তি তার বই, পুরোনো পত্রিকা, আর বিবর্ণ ডায়েরির স্তূপ। দিনগুলো তার কাটে জানালার পাশে বসে। নিচের রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা—রিকশার ঘণ্টা, হকারের ডাক, ছুটে চলা পায়ের শব্দ—সব তিনি নীরবে দেখেন। মনে হয়, তিনি মানুষগুলোকে নয়, সময়কে যেতে দেখছেন।


কিন্তু রাত নামলেই তার জীবনের আরেকটি দরজা খুলে যায়।


বিছানার নিচ থেকে তিনি বের করেন একটি ছোট মরচে ধরা টিনের বাক্স। বাক্সটির ঢাকনা খুললেই বেরিয়ে আসে পুরোনো কাগজের এক অদ্ভুত গন্ধ—সময়ের গন্ধ, বিস্মৃতির গন্ধ।


ভেতরে আছে কয়েকটি হলদেটে কাগজ। প্রতিটি কাগজের উপরে একই অক্ষরে লেখা—“প্রিয়তমা রেণু।”


পঞ্চাশ বছর আগে, আনিস তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এক নিস্তব্ধ দুপুরে লাইব্রেরিতে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রেণুর।


রেণু বই পড়ত এক অদ্ভুত নিমগ্নতায়। তার চোখে ছিল কৌতূহল, কথায় ছিল কবিতার কোমলতা। কবিতা ছিল তার প্রিয় আশ্রয়। আর আনিস ধীরে ধীরে বুঝেছিলেন—রেণু নিজেই যেন এক কবিতা।


পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে নীরব প্রেম। তাদের ভালোবাসা কখনো উচ্চস্বরে প্রকাশ পায়নি। চিঠির পাতায় পাতায় ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল এক গোপন জগত।


রেণু লিখত—“তোমার লেখা পড়লে মনে হয় শব্দগুলো ফুল হয়ে ঝরে পড়ে।” আর আনিস লিখতেন—“তোমাকে ভাবলেই পৃথিবীটা আমার কাছে একটু বেশি আলোয় ভরা মনে হয়।”


এইভাবেই সময় বয়ে যাচ্ছিল।


তারপর এল ১৯৭১ সালের মার্চ।


শহরের বাতাসে তখন অস্থিরতার ভার। মানুষের চোখে উদ্বেগ, রাস্তায় উত্তেজনা, চারদিকে এক অদৃশ্য ঝড়ের পূর্বাভাস।


সেই সময় আনিস সিদ্ধান্ত নিলেন—তিনি যুদ্ধে যাবেন।


যাওয়ার আগের রাতে তিনি রেণুকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখতে বসেন।


“রেণু,

হয়তো এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, আমি তখন অনেক দূরে। চারদিকে যুদ্ধের দামামা বাজছে, কিন্তু আশ্চর্য—আমার কানে কেবল তোমার নুপুরের শব্দই বাজে।

আমি ফিরব কি না জানি না।

তবে যদি না ফিরি…”


কলমটি ঠিক সেখানেই থেমে যায়।


হঠাৎ বাইরে সাইরেন বাজে। মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে আসে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। চিঠিটা টেবিলেই পড়ে থাকে। আনিস দ্রুত ঘর ছেড়ে চলে যান।


তারপর শুরু হয় নয় মাসের যুদ্ধ। রক্ত, ধ্বংস আর অগণিত অশ্রুর ভিতর দিয়ে একদিন আসে বিজয়ের সকাল।


আনিস ফিরে আসেন। কিন্তু রেণু আর ফেরেনি। দাঙ্গার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল রেণুদের পাড়া। কেউ বলতে পারেনি—রেণু কোথায় হারিয়ে গেল।


সময়ের দীর্ঘ নদী বয়ে গেছে।


আজ আনিস সাহেব বৃদ্ধ। তার চুলে রূপালি সময়ের ধুলো, চোখে দীর্ঘ জীবনের নীরবতা।


তবু প্রতিদিন রাতে তিনি সেই টিনের বাক্স খুলে বসেন। অসমাপ্ত চিঠিটা বের করেন। কলম হাতে নেন। শেষ লাইনটা লিখবেন বলে। কিন্তু প্রতিবারই তার হাত কেঁপে ওঠে। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা আবার ভাঁজ করে রেখে দেন।


কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—চিঠিটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেণু বেঁচে আছে।


যে মুহূর্তে তিনি চিঠির শেষে “ইতি” লিখে দেবেন, সেই মুহূর্তেই হয়তো রেণুর সঙ্গে তার অদৃশ্য বন্ধনটি চিরতরে ভেঙে যাবে। তাই এই চিঠি আর শেষ হয় না। বছরের পর বছর ধরে গল্পটি অসমাপ্তই থেকে যায়।


এক রাতে, বহু বছরের দ্বিধা ভেঙে, আনিস সাহেব আবার কলম তুলে নিলেন।


তিনি লিখলেন—

“রেণু,

যদি সত্যিই না ফিরি, তবে জেনে রেখো—এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয় ছিল তোমার নাম।

ইতি

তোমার আনিস।”


কলম থেমে গেল।


ঘর নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আনিস সাহেবের মনে হলো—কেউ যেন খুব আস্তে করে হাসল। হয়তো বাতাস। হয়তো স্মৃতি। হয়তো রেণু।


তিনি চোখ বন্ধ করলেন।


অনেক বছর পরে তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো।


কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন—কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকলে বেদনা হয়, কিন্তু কখনো কখনো সমাপ্তিই তাদের মুক্তি দেয়।


আর সেই রাতে, বহু বছরের অসমাপ্ত গল্পটি শেষ হলেও—রেণু যেন প্রথমবারের মতো সত্যিই ফিরে এল তার কাছে।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance