STORYMIRROR

Fardin Ansari

Tragedy Classics Inspirational

4.5  

Fardin Ansari

Tragedy Classics Inspirational

অপূর্ণতার মিলন

অপূর্ণতার মিলন

3 mins
5

কলেজের প্রথম দিনটায় শরতের রোদটা ছিল একটু বেশি উজ্জ্বল। পুরনো লাল ইটের ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি—এই জায়গাটা তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। হাতে নতুন খাতা, চোখে অদ্ভুত এক স্বপ্ন। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে সে প্রথম দেখেছিল মৈত্রেয়ীকে।

মৈত্রেয়ীর হাঁটার ভঙ্গিটা ছিল ধীর, কিন্তু চোখে ছিল অদম্য আত্মবিশ্বাস। সাদা সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে নীল ওড়না। সে অনির্বাণের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ হোঁচট খেল, আর অনির্বাণ স্বভাবসিদ্ধ ভদ্রতায় হাত বাড়িয়ে দিল। দু’জনের চোখের দেখা—ঠিক সেই মুহূর্তে সময় যেন খানিক থমকে গিয়েছিল।

“থ্যাংক ইউ,” মৈত্রেয়ী বলেছিল, হালকা হাসি দিয়ে।
অনির্বাণ কিছু বলতে পারেনি, শুধু মাথা নেড়েছিল।

এরপর থেকে কলেজটা আর শুধু কলেজ থাকেনি—তা হয়ে উঠেছিল দেখা হওয়ার জায়গা। ক্যান্টিনের কোণে বসে চা খাওয়া, লাইব্রেরির নিরিবিলি টেবিলে পড়াশোনার অজুহাতে গল্প, পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তার ভাগাভাগি—সবকিছুতেই তারা একে অপরের অংশ হয়ে উঠেছিল।

অনির্বাণ ছিল দর্শনের ছাত্র। ভাবুক, একটু বেশি সংবেদনশীল। মৈত্রেয়ী পড়ত সমাজবিদ্যা—বাস্তববাদী, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অসম্ভব কোমল। অনির্বাণ যখন অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতা, জীবন-মৃত্যু নিয়ে কথা বলত, মৈত্রেয়ী তখন হাসতে হাসতে বলত,
“জীবনটা এত কঠিন করে ভাবিস কেন? সহজ করে বাঁচাও তো।”

এই সহজ করে বাঁচার কথাটাই অনির্বাণের জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাদের সম্পর্ক আর লুকোনো থাকেনি। বন্ধুদের চোখ এড়িয়ে নয়, বরং সবার সামনেই তারা ছিল একসঙ্গে। কিন্তু ভালোবাসার গল্পগুলো সবসময় পাঠ্যবইয়ের মতো সাজানো হয় না। মৈত্রেয়ীর পরিবার ছিল রক্ষণশীল। বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। অনির্বাণ তখনও নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি—লেখালেখি করে, টিউশন করে কোনও রকমে চলে।

“তুই কি কখনও ভেবেছিস, পাঁচ বছর পরে কোথায় থাকবি?” একদিন কলেজের পুকুরপাড়ে বসে মৈত্রেয়ী প্রশ্ন করেছিল।

অনির্বাণ চুপ করেছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
“আমি জানি না ঠিক কোথায় থাকব। কিন্তু তোর পাশে থাকতে চাই।”

মৈত্রেয়ী সেই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ভালোবাসা তার ছিল, কিন্তু বাস্তবতার ভয়ও কম ছিল না।

তারপর এল সেই দিনটা—যেদিন সবকিছু ভেঙে পড়ল।

মৈত্রেয়ীর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সংসারের দায়িত্ব, ঋণ, ভবিষ্যতের চাপ—সব একসঙ্গে এসে পড়ল। সেই সময়েই এক আত্মীয়ের মাধ্যমে একটি সম্বন্ধ এল। ছেলেটি প্রতিষ্ঠিত, চাকরি করে, পরিবার ভালো। মৈত্রেয়ীর মা কান্নাভেজা চোখে বললেন,
“তোর বাবার এই অবস্থায় আমরা আর ঝুঁকি নিতে পারছি না মা।”

মৈত্রেয়ী অনির্বাণকে সবটা বলেছিল। অনির্বাণ সেদিন প্রথমবার নিজেকে ভীষণ ছোট মনে করেছিল। সে কিছু বলতে পারেনি, কিছু করতে পারেনি। শুধু বলেছিল,
“তুই যদি যেতে চাস, আমি আটকাব না। কিন্তু জানিস, তোর জন্য আমি সারাজীবন অপেক্ষা করব।”

মৈত্রেয়ী কাঁদছিল। সে জানত, এই অপেক্ষা অনির্বাণের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে উঠতে পারে।

বিয়ের দিন অনির্বাণ যায়নি। সে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ছোট একটা পত্রিকার চাকরি নিয়েছিল মফস্বলে। লেখার মধ্যে ডুবে থাকতে চেয়েছিল, যাতে মনে পড়ার সময় না থাকে। কিন্তু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলোকে ভুলতে গেলে আরও গভীরে ঢুকে যায়।

বছরের পর বছর কেটে গেল।

মৈত্রেয়ী সংসারী হলো। তার স্বামী—রাহুল—ভালো মানুষ। যত্নশীল, দায়িত্ববান। ধীরে ধীরে মৈত্রেয়ী বুঝতে শিখল, ভালোবাসা শুধু উথালপাথাল আবেগ নয়, অনেক সময় তা নিশ্চুপ নিরাপত্তাও। তবু মাঝেমধ্যে কলেজের দিনগুলো মনে পড়ত। পুকুরপাড়, ক্যান্টিন, অনির্বাণের সেই অনিশ্চিত কিন্তু সৎ চোখ।

অনির্বাণ meanwhile একা থেকেছে। কিছু বই লিখেছে, কিছু পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সে আর কাউকে ঢুকতে দেয়নি। বন্ধুরা বলত,
“এবার তো বিয়ে কর।”
সে হেসে বলত,
“আমি তো এখনও একটা অসম্পূর্ণ গল্প লিখে চলেছি।”

দশ বছর পর কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হলো।

অনির্বাণ যেতে চায়নি প্রথমে। কিন্তু কোথাও একটা টান তাকে নিয়ে গেল। সেই পুরনো লাল ইটের ভবন, সেই ক্যান্টিন—সবকিছু ছোট হয়ে গেছে, শুধু স্মৃতিগুলো বড়।

আর তখনই সে দেখল মৈত্রেয়ীকে।

হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। পাশে একটি ছোট মেয়ে—তাদের সন্তান। মৈত্রেয়ীর চোখে পরিণতির ছাপ, কিন্তু হাসিটা সেই আগের মতোই।

দু’জনের চোখাচোখি হলো।

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর মৈত্রেয়ী এগিয়ে এল।
“কেমন আছিস?”
“ভালো,” অনির্বাণ বলল। “তুই?”

“ভালোই আছি,” মৈত্রেয়ী উত্তর দিল। “জীবনটা… অন্যরকম হয়েছে।”

তারা একটু আলাদা করে বসল। অতীতের কথা এলো, এল না—দুটোই একসঙ্গে। অনির্বাণ বলল,
“জানিস, আমি কখনও তোকে দোষ দিইনি। হয়তো আমাদের গল্পটা এমনই হওয়ার ছিল।”

মৈত্রেয়ীর চোখ ভিজে উঠল।
“আর আমি জানি, তুইই ছিলি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।”

ওটাই ছিল তাদের মিলন।

কোনও প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন নয়, বরং দু’জন পরিণত মানুষের—যারা বুঝে গেছে, ভালোবাসা সবসময় পাওয়ার নাম নয়। কখনও কখনও ছেড়ে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

অনুষ্ঠান শেষে তারা বিদায় নিল। মৈত্রেয়ী তার স্বামীর কাছে ফিরে গেল, অনির্বাণ একা হাঁটতে লাগল কলেজ ক্যাম্পাসে। কিন্তু তার বুকের ভেতর আর সেই পুরনো ভারটা ছিল না।

সে বুঝেছিল—কিছু ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থাকলেই পূর্ণ হয়।

আর সেই অপূর্ণতার মধ্যেই, তারা দু’জন চিরকালের জন্য মিলিত হয়ে রইল।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy