যে মানুষটি পালিয়ে গিয়েছিল
যে মানুষটি পালিয়ে গিয়েছিল
স্টেশন থেকে শেষ ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার পরও অরুণ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ।
আর পকেটে মাত্র কয়েক হাজার টাকা।
শহরটা সে ছেড়ে যাচ্ছে।
কাউকে কিছু না বলে।
কারণ গত কয়েক মাসে তার জীবনে এত কিছু ঘটেছিল যে, কারও মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার আর ছিল না।
অফিসে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে। কোম্পানির বড় ক্ষতি হয়েছিল। সহকর্মীদের কেউ তাকে ক্ষমা করেনি। বাড়িতে বাবার সঙ্গে তীব্র ঝগড়া হয়েছিল।
সবশেষে মায়ের মুখটাও সে এড়িয়ে গিয়েছিল।
সেদিন মা শুধু বলেছিলেন,
— “ভুল করেছিস?”
অরুণ মাথা নিচু করে বলেছিল,
— “হ্যাঁ।”
মা বলেছিলেন,
— “তাহলে পালিয়ে যাচ্ছিস কেন?”
অরুণ কোনো উত্তর দেয়নি।
সেই রাতেই সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।
নতুন শহরে এসে সে অন্য নামে একটি ছোট চাকরি নিল।
দিন কাটতে লাগল।
কেউ তার অতীত জানত না।
কেউ জানত না সে কোথা থেকে এসেছে।
কেউ জানত না কেন মাঝে মাঝে ফোন হাতে নিয়ে একটি নম্বর ডায়াল করে আবার কেটে দেয়।
সে ভেবেছিল, পরিচয় বদলালেই জীবন বদলে যায়।
কিন্তু কিছু জিনিসের কাছ থেকে পালানো যায় না।
রাতে ঘুমোতে গেলে বাবার সঙ্গে শেষ কথোপকথন মনে পড়ত।
মায়ের মুখ মনে পড়ত।
আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত সেই একটি প্রশ্ন—
“ভুল করেছিস? তাহলে পালিয়ে যাচ্ছিস কেন?”
একদিন অফিসে তার বস একটি ভুল করলেন।
ভুলটি বড়।
সবাই বসকে দোষ দিতে শুরু করল।
অরুণ চুপ করে বসে ছিল।
তার হঠাৎ নিজের পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ল।
সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— “স্যার, ভুলটা আপনার একার নয়। আমি তখনও একটা অংশে দায়ী ছিলাম।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
বস অবাক হয়ে বললেন,
— “তুমি তো তখন এখানে ছিলে না।”
অরুণ মৃদু হেসে বলল,
— “সব ভুলের সাক্ষী কাগজে থাকে না।”
সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের পুরোনো নম্বরে ফোন করল।
অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর ফোন ধরলেন মা।
ওপাশে কোনো কথা নেই।
অরুণও চুপ।
তারপর মায়ের কণ্ঠ—
— “খেয়েছিস?”
এই দুটি শব্দ শুনেই অরুণের চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করল।
সে শুধু বলল,
— “মা…”
মা বললেন,
— “কোথায় আছিস?”
অরুণ উত্তর দিল না।
মা আবার বললেন,
— “ফিরবি?”
অরুণ চোখ বন্ধ করে বলল,
— “হ্যাঁ।”
ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর মা বললেন,
— “তাহলে আর কিছু বলার নেই।”
পরদিন সকালে অরুণ ট্রেনে উঠল।
ফিরে যাওয়ার ট্রেন।
কেউ তাকে গ্রেপ্তার করতে আসেনি।
কোনো আদালত তাকে ডাকেনি।
কিন্তু সে বুঝেছিল—
মানুষ কখনও কখনও আইনের কাছে নয়, নিজের বিবেকের কাছেই পলাতক হয়ে থাকে।
আর সেই পলায়নের শেষ হয় তখনই, যখন সে নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে শেখে।
বাড়ির দরজার সামনে এসে অরুণ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
দরজা খুললেন মা।
তিনি কিছু বললেন না।
শুধু ছেলের ব্যাগটা নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।
অরুণ বুঝল—
কিছু বাড়ির দরজা কাঠের হয় না।
ক্ষমার হয়।
