যে মানুষটি সরে দাঁড়িয়েছিল
যে মানুষটি সরে দাঁড়িয়েছিল
অর্ণব আর নীলার সম্পর্কটা খুব সাধারণ ছিল না।
তারা দুজনেই জানত—একসঙ্গে থাকলে জীবনটা সুন্দর হতে পারত।
কিন্তু জীবনের সব সুন্দর সম্ভাবনার শেষ পরিণতি একসঙ্গে থাকা নয়।
নীলার একটি বড় স্বপ্ন ছিল। বিদেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিল সে। বহু বছরের পরিশ্রমের ফল। কিন্তু সেই সময়েই অর্ণবের জীবনে এল এক কঠিন পারিবারিক দায়িত্ব।
নীলা বলেছিল,
— “তুমি চাইলে আমি যাব না।”
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
— “তুমি যাবে।”
— “আর তুমি?”
— “আমি থাকব।”
নীলা তার হাত ধরে বলেছিল,
— “তাহলে আমাদের?”
অর্ণব মৃদু হেসেছিল।
— “আমাদের ভালোবাসা কি শুধু একই শহরে থাকলেই থাকবে?”
নীলার চোখে জল এসেছিল।
— “তুমি এত সহজে বলছ?”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— “সহজ নয়। খুব কঠিন। কিন্তু তোমাকে আমার জন্য থামিয়ে দিলে, একদিন হয়তো তুমি আমাকে ভালোবাসবে, কিন্তু নিজের জীবনকে ক্ষমা করতে পারবে না।”
নীলা চলে গেল।
তারপর শুরু হলো দূরত্ব।
প্রথম কয়েক মাস প্রতিদিন কথা হতো। তারপর সপ্তাহে কয়েকবার। তারপর ব্যস্ততা বাড়ল।
অর্ণব কখনও অভিযোগ করেনি।
নীলা একদিন ফোনে বলেছিল,
— “তুমি চাইলে আমাকে আটকে রাখতে পারতে।”
অর্ণব বলেছিল,
— “ভালোবাসি বলেই তো পারিনি।”
বছর পাঁচেক পরে নীলা দেশে ফিরল।
সে এখন প্রতিষ্ঠিত। নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছে।
এক সন্ধ্যায় পুরোনো শহরের সেই নদীর ধারে তাদের দেখা হলো।
নীলা বলল,
— “তুমি জানো, তোমার জন্য আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়নি। কষ্ট হয়েছে এই ভেবে যে তুমি আমাকে থামাওনি।”
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— “থামালে তুমি হয়তো আমার কাছে থাকতে। কিন্তু তোমার নিজের কাছে?”
নীলা কিছু বলল না।
অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— “তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো?”
অর্ণব একটু সময় নিয়ে বলল,
— “ভালোবাসা সবসময় মানুষকে পাওয়ার ইচ্ছা নয়। কখনও কখনও তার ভালো থাকাটাকেই নিজের প্রাপ্তি বলে মেনে নেওয়া।”
নীলার চোখ ভিজে উঠল।
— “তাহলে তুমি কী পেলে?”
অর্ণব নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমাকে হারিয়েছি। কিন্তু তোমার স্বপ্নটাকে হারাতে দিইনি।”
নীলা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “তুমি জানো, তোমার এই ত্যাগের মূল্য আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— “ত্যাগের মূল্য শোধ করতে হয় না। শুধু একদিন বুঝতে হয়—কেউ তোমার জন্য নিজের কিছু ছেড়েছিল।”
সেদিন তারা আলাদা পথে চলে গেল।
কোনো প্রতিশ্রুতি হলো না।
কোনো ফিরে আসাও হলো না।
তবু দুজনেই জানল—
কিছু ভালোবাসা জীবনে থাকার জন্য আসে না।
কিছু ভালোবাসা আসে আমাদের ভেতরটা একটু বড় করে দিয়ে চলে যেতে।
আর অর্ণবের ত্যাগ?
সেটি ছিল পরাজয় নয়।
সে নীলাকে হারিয়ে নিজের ভালোবাসার কাছে জয়ী হয়েছিল।

