Debanjoly Chakraborti Chakraborti

Romance


3.7  

Debanjoly Chakraborti Chakraborti

Romance


❤তোমায় ভেবে❤

❤তোমায় ভেবে❤

3 mins 468 3 mins 468

রাতুল আজ পাঁচ বছর পর বাড়িতে ফিরছে। সাথে বাবার বন্ধু সমর কাকুর মেয়ে টিনা। ওদের বাড়িতে থেকেই ডাক্তারি টা পাশ করেছে রাতুল।

সেই যে ডাক্তারিতে চান্স পেয়ে গ্রাম ছেড়েছিল সে আর এতো বছরে রাতুলের বাবা বাড়ি আসার পারমিশন দেয় নি তাই বাড়ি ফেরা হয় নি রাতুলের।

প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো মনে হতো সব ছেড়ে বাড়ি চলে যায় আস্ত আস্তে সেই ইচ্ছেটা মরে গিয়ে বাড়ির প্রতি গ্রামের প্রতি তীব্র অনিহা এসেছিল।

যেখানে তার জন্য কারও মাথা ব্যথা নেই সেখানে ওর কেন থাকবে?

সে না হয় বাবা রাতুলের ডাক্তার হওয়া নিয়ে জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিতে পারে তা বলে মা ও।

ও তো একটি মাত্র ছেলে তার মায়ের।আর একজন,,,,

না না আর কোন চিন্তা করবে না রাতুল সবাই তো ভালোই আছে তাঁকে ছাড়া রাতুলও তো ভালোই ছিলো। তবে আজ কেন এই চেনা পথ, চার মাথার বট গাছ, দত্ত বাড়ির শান বাঁধানো পুকুরে ফোটা পদ্ম, খেজুর গাছ এদের দেখে বুকটা ফাঁকা লাগছে। কাউকে দেখার আনন্দো কেনো অনুভূত হচ্চে?

এতো বছর পরে আমার মতো তারও কি খুশি অজান্ত খেলে যাচ্ছে মনে? না ভুল ভাবছি আমি। এতো বছরে কতবারই তো মা বাবা গেছে দেখা করতে কই সে তো আসে নি।

ভাবনার সুতো ছিন্ন হলো টিনার ডাকে।

ঃঃঃঃ রাতুল আর কত দূর। আই এম টায়ার্ড ম্যন।

ঃঃঃঃ এই তো সামনেই,,আর একটু।

ঃঃঃঃ তুমি পাঁচ বছর পর বাড়িতে যাচ্ছ,,,ইউ আর ফিলিং এক্সাইটেড,,, তাই না।

ঃঃঃঃ নট এক্চুয়ালি। চার মাস পর লন্ডন যাব তাই হয়তো বাবা ভেবেছেন আসা দরকার না হলে আসতাম না।

ঃঃঃঃ ও মাই গড তোমার বাবা!!! আমি তো ওনাকে দেখেই ভয় পাই। আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হাউ বাপি ইজ হিজ বি এফ। টু অপোজিট ক্যারেক্টর।

আর কথা বলতে ভালো লাগছিল না রাতুলের তাই চুপ থেকে জানালা দিয়ে চেয়ে রইলো একমনে। বাবার বিষয়ে বরাবরই জবাবহীন রাতুল। এতো কিছুর পরও বাবার নামে কোন কথা শুনতে ভালো লাগে না রাতুলের। টিনাও জানে তাই সে ও আর কথা বাড়ালো না।

অবশেষে বাড়ি,,,

ঃঃঃঃ রাতুল ইউ হ্যাভ এ প্যালেস!!! ইটস আমেইজিং।তাহলে তো তুমি রাজকুমার???এই এতো লোকজন কেনো তোমাদের বাড়িতে?

রাতুলের পৈত্রিক বাড়ি ও লোকজন দেখে অবাক টিনা।

ঃঃঃঃ না না এসব কিছুই নয় এটা আমার পূর্ব পুরুষের বাড়ি। আর গ্রামের লোকজন মনে হয় আমায় দেখতে এসেছে।

ঃঃঃঃ ওয়াও,,,,

রাতুল নামতেই সবাই রাতুলকে অবাক চোখে দেখতে লাগলো। কিন্তু রাতুল? সে না চাইতেও তার দুচোখও খুজে চলছে কাউকে। না চাইতেও তার কান সতর্ক কারও কন্ঠের জন্য। ভীষণ তৃষ্ণা হচ্ছে বুকে তবে এই তৃষ্ণা জলের নয় কাউকে দেখার তৃষ্ণা।অনেক অনেক দিন পর হ্নদয়ের বন্ধ গোপন কুঠরী হতে লাভা হয়ে উঠে আসা অনুভূতির তৃষ্ণা। 

আসতে বাড়িতে ঢুকে সোফায় বসে রাতুল ও টিনা।

ঃঃঃঃ দাদা সরবত নাও

চিন্তার জগৎ ছেড়ে চমকে উঠে রাতুল। দেখে তার সামনে বছর পনেরোর একটি কিশোরী দারিয়ে আছে।হাতে সরবতের গ্লাস।

ঃঃঃ তুই কৃষ্ণা না,,,,কত বড় হয়েছিস রে!!

ঃঃঃঃ তুমি আমাকে চিনেছো রাতুলদা। ফুলদি বললো তুমি নাকি চিনতেই পারবে না।

ফুলদি কথাটা বার বার কানে যেন বাজতে লাগলো রাতুলের।একটু সামলে নিয়ে,,,

ঃঃঃঃ তা আর কি কি বলে তোর ফুলদি।

কৃষ্ণা একটু ভয় পেয়ে

ঃঃঃঃ না আর কিছু বলে নি।তুমি ফুলদিকে বকো না।আগে তো কত ঝগড়া করতে এখন তো বড় হয়েছো তাও ঝগড়া করবে??

অভিমানী স্বরে

ঃঃঃঃ করবোনা মানে অবশ্যই করবো। কিন্তু সেই মানুষ টা কোথায় বলতো?

ঃঃঃঃ ফুলদি তো কোন সকাল থেকে তোমার জন্য রান্না করছে। জেঠিমাকেও রান্না ঘরে ডুকতে দেয় নি।

ঃঃঃঃ ওরে বাবা এতো সব। তা তোর ফুলদিকে গিয়ে বল মানুষ এসেছি গরু নয় যে শুধু খাবো।

ঃঃঃঃ যা!! তুমি যে কি বল রাতুলদা।ওই যে জেঠিমা আসছে ওনাকে বলো।

ঃঃঃঃ(জরিয়ে ধরে) রাতুল কেমন আছিস বাবা?

ঃঃঃঃ (মা কে প্রনাম করে) ভালো আছি মা।

টিনার দিকে তাকিয়ে মৃণালিনী দেবী

ঃঃঃঃ টিনা আসতে বুঝি খুব কষ্ট হয়েছে মা?

ঃঃঃঃ না না আন্টি,,, সেরকম কিছু না

ঃঃঃঃ,,, এই কৃষ্ণা টিনামাকে ওর জন্য যে ঘরটা পরিস্কার করে রেখেছি সেটাতে নিয়ে যা।রাতুল তোর ঘর কোথায় তা কি মনে আছে না নিয়ে যাব?

ঃঃঃঃ না আমার কিছুই মনে নেই,,,রেগে গজগজ করতে করতে,,,ওর রুমে চলে গেলো

************

নিজের রুমে এসে ধরাম করে দরজা লাগিয়ে দেয় রাতুল,,,,,

এতো দিন পরে ফিরে এলাম কই কারও তো আমায় নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। আমি কালই চলে যাব। (একাই কথা বলতে বলতে ব্যগ খুলে কাপর নিয়ে বার্থরুমে চলে যায়)

কিছুক্ষণ পর,,,,মহীধর নামের প্রায় পঞ্চশ উদ্ধো একজন কাজের লোক রাতুলকে ডাকে,,,

মহীধরঃঃঃ রাতুল বাবা আসবো??

রাতুলঃঃঃআবেগ মিশ্রিত কন্ঠে,, মহিকাকা!!! ,,,হ্যা ভতরে আসো,,

মহীধর কুন্ঠিত পায়ে ভিতরে ডুকলো।

রাতুল তার মহিকাকার দু হাত ধরে বললো কেমন আছো কাকা?? কত বছর পর তোমাকে দেখলাম।

রাতুলকে পাঁচ বছর পর দেখে তার মহিকাকার মুখের কথার বদলে দুচোখে জল চলে আসে। সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পরে যখন রাতুল যে কোন জিনিসের জন্য তার মহি কাকার জামার কোন টেনে ধরতো। রাতুল মহিকাকার পিঠে চরে ঘোড়া ঘোড়া খেলতো, কাঁধে চড়ে নদীর চরে ঘুরে বেড়াতো, কালির মেলায় যেতো।

আস্তে আস্তে যখন একটু বড় হলো তখন তার সকল দুষ্টুমিকে ঢাকার জন্য মহিকাকার চেয়ে আপন জন আর কাউকে পায় নি রাতুল। দুপুরে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে যাওয়া, রাত্রে নিঃশব্দে বের হয়ে বন্ধু দের সাথে আড্ডা দেয়া এই সবকিছু সম্ভব হয়েছিল মহিকাকার জন্য।

মহিধরের জীবনে আর একজন অবশ্য ছিল সবসময়। আজো আছে। তাকে দেখেই তো শৈশব থেকে মাতৃ স্নেহে বঞ্চিত মহিধরের সকল অতৃপ্তি কেটে গেছে। সে তো কাছেই ছিল। আর ছোটবাবু তো সেই যে চলে গেলো আর পাঁচ পাঁচটি বছর পেরিয়ে আজ এলো।

এতো গুলো বছরে তার সেই ননীর পুতুল,অতি আদরের ছোটবাবুর অনুপস্থিতি এতো বড় বাড়িটাতে এতো মানুষের মধ্যেও মাঝে মাঝে দুচোখ ভরিয়ে দিত। অকৃতদার মহিধরের ব্যপ্তিহীন জীবনে তার ছোট বাবুর অভাব তাকে আনমোনা করে দিত । 

(মহিধরের চোখের জল মুছেদিয়ে,,)

রাতুলঃঃঃ মহি কাকা কি হলো কথা বলবে না আমার সাথে। খুব মনে পড়তো তোমার কথা জান।

প্রথম প্রথম তো ঠিক মতো ক্লাসেই যেতে পারিনি।ঘুমের মধ্যে মনে হতো সময় হলে তুমি ঠিক ডাকবে। আবার কত দিন রাত্রে খাওয়াও হতো না পড়তে পড়তে ঘুমাতাম, বাড়িতে তো তুমি ডেকে খাওয়াতে কিন্তু ওখানে তো তুমি ছিলে না। কি যে বদ অভ্যাস করে দিয়েছিলে। তোমাকে ছাড়া জীবন চালাতে আমাকে রীতিমতো নাকানি চুবানি খেতে হয়েছে।

রাতুলের কথায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে মহিধরের তার ছোটবাবুর কষ্টের দিনগুলোকে কল্পনা করে এক তীব্র ব্যথা বুক থেকে গলা বেয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

"ভালো করেন নি বড়বাবু অতোটুকু মানুষকে অতো যন্তণার মধ্যে ঠেলে দিয়ে। "মহিধরের অভিমানী মন বলে উঠলো।

রাতুলঃঃঃ( অবাক হওয়ার ভান করে)মহিকাকা তুমি কথা বলছোনা কেন?বোবা হয়ে যাওনি তো??দেখি দেখি মুখটা খোলো। জানই তো আমি এখন ডাক্তার। চিন্তা করোনা এক বার ঔষধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। মুখটা খোল জ্বিহ্বাটা বের করোতো।

চিন্তার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এসে রাতুলের কথায় হেসে ফেললো মহিধর।.....

ঃঃঃ তুমি এক্কেবারে আগের মতোই আছো ছোটবাবু।

ঃঃঃ আমি তো আগের মতোই আছি কিন্তু তোমরা পাল্টে গেছো। আর আগের মতো ভালোবাসো না আমাকে।

কতক্ষণ হলো এসেছি কারও কি আমার কথা মনে পরে? ক্ষুধায় যে জীবন গেলো আমার কে বোঝে?

আগে তো কত বলতো রাতুলদা এটা কর সেটা কর এটা খাও সেটা খাও। আর এখন এতোক্ষণ যে হলো এসেছি তার কোন পাত্তা আছে? তাই থাকো তোমরা আমি কালই চলে যাব।

মহিধর জানে রাতুল অনুরাধার কথা মানে সবার প্রিয় ফুলদির কথা বলছে। মেয়েটা সেই কোন ভোরে উঠে রান্না শুরু করেছে, রান্না শেষ করে, তারপর নাট মন্দিরে পুজো দিতে গেছে। বোধ হয় ছোটবাবুর জন্য মানত ছিল।

ঃঃঃ অনু মা তো নাট মন্দিরে গেছে পুজো দিতে, এই কিছুক্ষন হলো।

ঃঃঃঃ তাহলে তোমার অনু মা এখনো ঠাকুরঘরে দিন কাটায়। ওই মাটির মূর্তির সামনে বসে বসে একা একা কথা বলে?? কি বল,,,,

ঃঃঃ হ্যা,,, যেমন তুমি এখনো ঠাকুর দেবতাকে বিশ্বাস কর না।

ঃঃঃ যা নেই তাকে বোকারা বিশ্বাস করে।

ঃঃঃ এই,,,,,এই শুরু করলে তো। এসেই শুরু হলো তোমার ঠাকুরের নামে নিন্দে বন্দনা। আমি তোমার কথার কোন উত্তর দিব না। সে তুমি অনু মাকে জিজ্ঞেস করোগে।

ঃঃঃ আসলে তো অবশ্যই করবো। তার তো টিকিটিরও দেখা নেই

দরজার কড়ার আঘাত,,,সুমিষ্ট কন্ঠ কেউ একজন বললো

ঃঃঃ ভেতরে আসবো।

ঃঃঃ কাংখিত কন্ঠখানিকে চিনে নিতে এক সেকেন্ড ও দেরি হয় নয় রাতুলের। আর এই এক সেকেন্ডে "ভেতরে আসবো "কথাটি কয়েকশ বার অনুরণিত হতে লাগলো মনে।

ঃঃঃঃ কে ফুল? এসো মা এসো আমি তো এখানেই আছি। ( রাতুলের বিহ্বলতা দেখে মহিধর বলে উঠলো)

অনুরাধা ঃঃঃ আস্তে করে ভিতরে এসে নত মস্তকে সসংকোচে বলে উঠলো না মানে পুজোর আর্শিবাদী ফুল এনেছিলাম, মাথায় ছোঁয়াতে হবে আর একটু প্রসাদ নিতে হবে।তুমি একটু ছুয়ে দাও না কাকা।

অনুরাধাকে দেখে স্তব্ধ রাতুল।পাঁচ বছর আগের সেই পনেরো বছরের কিশোরী মেয়েটি আজ কুড়ি বছরের সদ্য যৌবনা। সোনার রং , মাথা ভত্তি ভেজা চুল, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, প্রসাধন হীন মুখ, হালকা গয়না আর চোখে কাজল তাতে মনে হচ্ছে একটি পদ্ম সদ্যই তার পাপড়ি খুলেছে।

মহিধরঃঃঃ তা কি করে হয়। আমি কেন দিব? সেই সকাল থেকে তুমি উপোস আছো। ছোট বাবুর জন্য তুমি পুজো দিয়েছো। আর আমি এই কাপরে আর্শিবাদি ফুল ছোঁয়াতে পারবো না।

আর আমার অনেক কাজ বাপু বরং তুমিই দাও আমি যাই।

মহিধর রাতুল ও অনুর শৈশবের সাক্ষী, কৈশোরেরও সাক্ষী। সে তো জানে তাদের প্রানের বাঁধন যা তিল তিল করে তৈরি হয়েছিল সবার অলক্ষে শুধু মহিধরের সামনে।

সেই সে বার যখন ছোট বাবুর এক বান্ধবী সবার আড়ালে নিয়ে গিয়ে কি না কি অসভ্যতামী করেছিল। অনু মায়ের সে কি কান্না। পরে ছোট বাবু কত চেষ্টা করে রাগ ভাঙ্গিয়েছিল।

আবার ছোট বাবুও তো কম যেতো না। অনু মাকে রাস্তায় কোন ছেলে কিছু বললে মেরে একেবারে রক্ত বের করে ছাড়তো।

আজ এতো দিন পর একটু থাক ওরা নিজের মতো।

( অনুরাধা রাতুলের চোখে চোখ রেখে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে আর্শিবাদি ফুলটা হাতে নিয়ে। রাতুল হঠাৎ করে ঘুরে দ্বারায়,,,,,,,,,, )

রাতুলঃঃঃ এতোক্ষণে মহারানীর সময় হলো??

অনুঃঃঃ আগে আর্শীবাদি ফুলটা নেও। তার পর যত পার বকো। ঘুরে দারাও তো,,,

রাতুলঃঃঃ না ঘুরবো না। কতক্ষণ হলো এসেছি ,,, আর তুই কোথায় না তোর ঠাকুরের কাছে। এতো দিন তো তাকে নিয়েই ছিলিস। তাই বলে আজো?

অনু ঃঃঃ হ্যা আজো,,

 

রাতুলঃঃঃ যা তবে এখানে আসার কি ছিল। ঠাকুর ঘরেই থাক গিয়ে।

অনুঃঃঃঃ তাই বুঝি,,,,, বলেন এগিয়ে এসে রাতুলের মুখে প্রসাদ খাইয়ে দিলো।

হাসতে হাসতে বললো,,,

-----তুমি তো দেখি আগের মতোই আছো।

অনুকে এতো কাছে দেখে রাতুল নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়,,,

ঝট করে অনুর হাতটা ধরে,,,,একদম বুকের কাছে নিয়ে এসে ,,,,

রাতুলঃঃঃ আমি তো একই আছি,,,, (গভীর ভাবে চোখের দিকে তাকিয়ে) কিন্তু বাকি সবাই কি আগের মতো আছে?

রাতুলের দৃষ্টি হঠাৎই বড় কঠিন মনে হয় অনুর।

তবে পাঁচ বছর পর কাংখিত ছোঁয়ায় এক অনাবিল আনন্দো ছেয়ে গেলো অনুর মনে, অদ্ভূত শিহরণ খেলে গেলো সম্পূর্ণ শরীরে।সেই চোখ, সেই অধিকার, সেই দাপট, সেই ছোঁয়া কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যায় অনুরাধা। অনুভব করতে থাকে রাতুলের বেড়ে চলা নিশ্বাসের শব্দ। দুটি হৃদয়ের স্পন্দনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা।

খানিক পরে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে হাতটা ছারিয়ে নিয়ে অনুরাধা ,,,,,

অনুঃঃঃ; যাচাই করার মনটা যদি একই থাকে তাহলে আশা করি মুখে বলতে হবে না।

রাতুল শুধু একটা বড় দীর্ঘশ্বাসে চাপা কষ্ট কে লুকাতে মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত করলো।

কত কথা জমে আছে মনের মাঝে কিন্তু ও চোখের দিকে তাকিয়ে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

এ অনু যে তার এতো দিনের কল্পনার থেকে হাজার গুণ সুন্দর।

ওই চোখের গভীরতা মাপার মতো আর সাহস পাচ্ছে না রাতুল।

শুধু মনে হচ্ছে তার অনুর আগুন রাঙ্গা রুপ, সাগরের মতো গভীর চোখ তাকে পুরিয়ে ফেলবে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

তবু এক খন্ড কালো মেঘের মতো বুকের গভীরে লুকানো ভয়, কারও তীব্র ব্যঙ্গাত্বক স্বর, মোবাইলের স্কিনে অনু আর শুভর ক্লোজ ফটো দেখা, আর সেসব কে ভুল ভাববার আপ্রান প্রচেষ্টা সব মনে পরে যায় রাতুলের।

এতো লড়াই করেও আজ অনুকে দেখে কোথাও চেপে রাখা যন্ত্রণা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে।

অনুঃঃঃ নিচে চলো,,,৷

রাতুলঃঃঃ যা আমি আসছি,,

অনু সামনে এসে,, মৃদুস্বরে বলে উঠলো,,,

ঃঃঃঃকি হলো এসেই মন খারাপ নাকি?? খেতে হবে না?

অনুর চোখের দিকে চেয়ে শুধু একটি কথাই বললো

,,,,,হুম,,,,,

অনু ঃঃঃতোমার শহরের বান্ধবী মনে হয় ক্ষুধায় পাগল হয়ে গেলো।

রাতুলঃঃঃঃসম্বিত ফিরে,,,,,আচ্ছা আচ্ছা চল নিচে,,,,বাবা কোথায়? বাড়ি এসেছে?

------ না,,, জ্যেঠামসাই উত্তর পাড়ার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে গেছে, ঝামেলা হয়েছে শুনলাম।

আজ তো যাওয়ার কথাই ছিলো না কিন্তু,,,,,,

---- থাক,,, তোকে অতো সাফাই দিতে হবে না,,,,,

চুপ করে যায় অনু,,,,বুঝতে পারে রাতুলের বড় অভিমানের জায়গা এটা,,,,,, তা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো,,,

দড়জার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল অনু।

অনুর যাওয়ার দিকে লক্ষ করে রাতুল অভিমানি কন্ঠে হঠাৎ বলে উঠলো,,,,,

রাতুলঃঃঃ শুনেছি আজকাল শুভর সাথে তুই খুব ডেটে যাচ্ছিস।

স্তব্ধ অনু এ কি শুনছে সে? আর এ কথার কি উত্তর দিবে সে??

কি প্রমান আছে তার কাছে যে এই পাঁচটি বছর শুধু রাতুলকে ভেবেই কাটিয়েছে।

পাওয়া না পাওয়ার হিসেব ভুলে প্রত্যেকটা মিনিট, প্রত্যেকটা সেকেন্ড, দিন,রাত,বছরের প্রতিটা মূহুর্ত রাতুলে অস্তিত্বের অভাব অনুকে কত যন্ত্রণা দিয়েছে।

কি পরিমান শূন্যতা গ্রাস করেছিল তাকে।

আজ এই খুসির দিনে রাতুলের এই একটি কথাই অনুর জমানো সমস্ত শক্তি,সপ্নকে একমূহুর্তে উরিয়ে নিয়ে গেলো।

যেন হোমের পবিত্র আগুনের উপর আকর্ষিক বর্ষনে সমস্ত যজ্ঞ পন্ড করে দিলো ।

দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাড়িয়ে,,নিজেকে একটু ধাতস্ত করে,,,,,,

অনুঃঃঃও,,,, তাই জানো বুঝি? তবে আমি আর কি বলি বলো,,,

বলেই আগত অশ্রু ধারাকে লুকোতে তারাতাড়ি চলে গেলো অনু,,,,

অনুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে রাতুল,,,

নিজের মনেই বলে উঠে,,,,,

রাতুলঃঃঃঃ সিট,,,, হোয়াট হ্যাব আই ডান,,,

নিজের এ দুস্কর্মে নিজেই লজ্জিত হলো রাতুল। অনুর ছলছল চোখ বুক থেকে বেড়িয়ে আসা কান্নার রেস, ধরা গলা কোন কিছুই তো অচেনা নয় রাতুলের। তবে কি অকারণেই তার অনুকে আঘাত করলো সে? শুধু সন্দেহের বসে অন্যের কথায় এ কি করলো সে?

তার এ মূর্খের মতো আচরনে মেয়েটা কত কষ্ট পেলো। খানিক পরে এ ভেবেই ঘর থেকে বাইরে যেতে উদ্দত হল রাতুল। এমন সময় মহিধর দরজায় এসে,,,,

মহিধর ঃঃঃ ছোট বাবু,,,, বড় বাবু তোমার জন্য খাওয়ার টেবিলে অপেক্ষা করছে।

রাতুলঃঃঃ ভ্রু কুচকিয়ে,,,, তাই!!!!

,,,,ওকে চলো।

একটু দাড়িয়ে,, রাতুল ব্যগ্র কন্ঠে মহিধরকে জিজ্ঞাসা করল,,

রাতুল ঃঃঃমহিকাকা,,,, অনু কোথায়?

মহিধর ঃঃঃ ফুলমা তো টেবিলে সবাই কে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।

রাতুল চিন্তিত স্বরে,,,

ঃঃ; ও,,

রাতুলের বাবার নাম রথিন মুখার্জি তিনি ইংল্যান্ড থেকে ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে আসলেও বিশেষ কারণে তিনি এখন কয়েকটা গার্মেন্টস এর মালিক। তার চার পাশের লোকজন ও গামেন্টসের দায়িত্ব এটাই তার জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।

রাতুলের দাদু রমাপ্রসাদ মুখার্জি তিনি ইংরেজদের আমলে প্রভাবশালী তরুন বিপ্লবি জমিদার ছিলেন। আর রাতুলের পূর্বপুরুষরা দীর্ঘ দিন এই গঙ্গাছড়া উপশহরটির একছত্র জমিদার হিসেবে তাদের জীবন অতিবাহিত করেছেন।

বর্তমানে রাতুলেরা তিনতলা বিশিষ্ট বিশাল এই পূর্ব পুরুষদের দ্বারা নির্মিত অট্টালিকায় থাকে। রাতুলের পরিবার শুধু নিচতলা আর দ্বিতীয় তলার কয়েকটা ঘর ব্যবহার করে উপরের দিকটা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এতোবড় বাড়িতে রাতুল থাকে দোতলার দক্ষিণ দিকে সবচেয়ে বড় ঘরটাতে। আধুনিকতা ও সাবেকিয়ানার মেল বন্ধন সমস্ত বাড়ির ইনটেরিয়ার ডেকোরেশন যে কারও চোখে পড়বার মতো ।

রাতুলের ঘরের সাথে আছে ধবদবে সাদা টাইলস লাগানো বেলকোনি তার কিছুটা জুরে সবুজ প্লাস্টিক গ্রাস কার্পেট আর উপরে ঝুলোনো রাতুলের পছন্দমত কিছু ফুল গাছ। এই জায়গাটি ওর সবচেয়ে পছন্দের।এতো দিনেও তার ঘরের বিন্দুমাত্র পরির্বতন হয়নি। কেউ যেন ফেলে আসা সময়কে তার সর্বস্ব দিয়ে আটকে রেখেছে।

তার দুটো ঘর পেরিয়ে একটা রুমে টিনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছারা দোতলার পূর্বদিকের একটা ঘরে রথিন বাবু আর মৃণালিনী দেবী থাকেন। নিচের তলায় কিচেন, ডাইনিং, আর সুসজ্জিত লাউঞ্জ। তার পাশেই দেশি বিদেশি বইয়ে ভর্ত্তি লাইব্রেরি, তারপর রাতুলের আশি উদ্ধ দাদু রমাপ্রসাদ বাবুর ঘর, তার পাশের রথিন বাবুর অতি আদরের, সকলের অতি স্নেহের অনুরাধার ছোট্ট রুম ।

আর বাড়ির পিছনের দিকে সার্ভেন্টস কোয়াটার তো আছেই।

বাড়ির চারদিকে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুরে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও ফলের বাগান। সাথেই কৃষ্ণের প্রাচীন মন্দির ও বিশাল পুকুর।

                     ******************

রাতুল --মহিকাকা টিনা টেবিলে গিয়েছে?

মহি---আমি টিনা মা মনিকে ডেকে তোমার কাছে এসেছি। বললো দেরী হবে।

রাতুল--- ওহ,,,,, তুমি যাও আমি টিনাকে নিয়ে আসছি। টিনা কোন রুমে আছে?

মহিধর ----,,,,,,ওই যে ওই রুমে।

সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে।

রাতুল টিনার দরজা কাছে গিয়ে হালকা নক করে,,,

রাতুল ---- টিনা, নিচে চলো খাবে।

টিনা --- উম,,,রাতুল আসছি।( কারণ রাতুলকে কোন ভাবেই অপেক্ষা করাতে চায় না টিনা। এই পাঁচটা বছর টিনাদের বাড়িতে থাকলেও রাতুল ওর কাছে' পাজেল ম্যান' এই নামেই ডাকে টিনা মনেমনে রাতুলকে।

হয়তো রাতুলকে জানতে চায় বলেই টিনার সবসময় রাতুলের সাথে থাকতে ভালো লাগে। আর রাতুলের সব কিছুতে থেকেও এবসেন্ট মাইন্ডটার খোঁজ করতে ইচ্ছা করে ।

রাতুল--- হারি আপ টিনা,,,,,,

টিনা তার স্বভাব মতো তারাহুরো করতে গিয়ে একেবারে রাতুলের বুকে উপর আছরে পরলো আর পরিনাম স্বরুপ তার লিপস্টিকের হালকা দাগ রাতুলের সাদা শার্টের বুকের বা পাশে অংকিত হলো দুজনের অলক্ষে।

টিনা --- সরি,,,, সরি বলেই কান দুটো ধরলো।

রাতুল টিনার হাত কান থেকে নামিয়ে,,, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো,,,,

রাতুল----,,,,ইসট ওকে,,,,,লেটস গো,,,

এবার রাতুল টিনার হাত ধরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো।

আর দূর থেকে কালো মেঘে ডাকা, সদ্য অশ্রুতে ধোয়া দুটি চোখ রাতুলের টিনার প্রতি কেয়ারিং দেখে তার প্রতি সন্দেহের আসল কারণ খুঁজে পেলো। আর মনে মনে বললো

""এই তো হওয়ার ছিল। ভালো থেকো তোমরা।""

টেবিলে রাতুলের মা, বাবা ,দাদু বসে আছে খাবার পরিবেশন করছে অনুরাধা আর তাকে হেল্প করছে মহিধর।

রাতুল একটা চেয়ার টেনে টিনাকে বসতে দিয়ে আর একটা চেয়ার টেনে নিজে বসলো। তার এ অভুতপূর্ব কর্মে অবাক টিনা নিজেও। তবে রাতুলের এই সামান্য কেয়ারও টিনার মনের কোনে বসন্তের হাওয়া বইয়ে দিতে লাগলো। আর এক তপস্যিনির তপস্যা ব্যর্থতার গ্লানিতে ভরিয়ে দিতে লাগলো।

রথিনবাবু--- রাতুল কেমন আছো??

রাতুল----ভালো আছি?

রথিন বাবু ---- টিনা তুমি কেমন আছো? রাস্তায় কোন সমস্যা হয় নি তো?

টিনা --- আ'ম গুড আঙ্কেল। না কোন অসুবিধা হয় নি।

রথিন বাবু ---- রাতুল তোমার স্কলারশিপ টা কি কনফার্ম?? খোঁজ নিয়েছো?

রাতুল --- হ্যা,,,, চার মাস লাগবে ফরমালিটিস শেষ করতে।

রথিন বাবু---- আশা করি তুমি জানো তোমাকে ডাক্তারি পড়ানোর জন্য আমার আসল উদ্দেশ্য? 

রাতুল---- নিশ্চুপ,,,,,,

রথিন বাবু ---- কাল তুমি আমাদের গ্রাম গুলো ঘুরে দেখবে এবং বুঝতে চেষ্টা করবে সাধারণ মানুষের জীবন। তবে পাঁচ বছর আগের রাতুল হয়ে নয়, একজন দায়িত্বশীল ডাক্তার হিসেবে। আমি চাই তুমি তোমার পূর্বজদের মতো এই গঙ্গাছরা উপশহরটিতে সাধারণ মানুষ গুলোর পাশে দ্বারাবে।

তবে আমার চাওয়াই সব নয় তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে স্বাধীন। আমি শুধু সাধারণ মানুষের পক্ষো থেকে তোমাকে আমার মতামতটা জানাতে পারি,,, বাকিটা তোমার উপর।

রাতুল---- ঠিক আছে আমি ভেবে দেখবো।

রমাপ্রসাদ বাবু--- রথিন,,, ছেলেটা এতোদিন পরে আজ বাড়ি এসেছে, তোর কি এই মুহুর্তে এই কথাগুলো না বললেই নয়।

রথিন বাবু---- সরি বাবা,,,, কিন্তু আমার কাছে অতটা সময় নেই।

রমাপ্রসাদ বাবু---- হয়েছে, হয়েছে, আমার ফুলদির রান্না,,,,, সামনে নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তোদের এই কথার জন্য,,,,, ধুর,,,, এই ফুল দি ভাই তুই আমার খাবারটা দে তো জিহ্বায় একে বারে জল চলে আসলো।

 আহা বুঝলে রাতুল এ তো রান্না নয় যেন অমৃত।

[ ] রমাপ্রসাদের অমৃত বলার ধরনে সবাই হেসে উঠলো।
[ ]
[ ] মৃণালিনী ---- বাবা আজ তো অনু প্রায় তিরিশ পদের রান্না করেছে। কিন্তু আপনি বেশি খাবেন না যেনো। না হলে আবার আপনার হজমের সমস্যা।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ --- আজ আর তোমার কথা শুনবো না বৌমা। ফুলদিদির হাতের খাবার খেয়ে আমি হাসপাতালে যেতেও রাজি। ওই ফুলদিদি ভাই কই তারাতাড়ি দে না।
[ ] অনু রমাপ্রসাদ বাবুর সহ সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে লাগলো।
[ ] রাতুল লক্ষ্য করলো অনু তাকে খাবার সার্ভ করলেও কখনোও তার দিকে তাকাচ্ছে না। রাতুল অনেক বার চেষ্টা করেছে কথা বলার কিন্তু অনু এরিয়ে যাচ্ছে খুব সতর্কতার সাথে।
[ ]
[ ]   রাতুল--- এতো খাবার!!!! আমি সত্যি এতো খেতে পারবো না। অনু,,,,তুই এতো রান্না না করলেও পারতিস।
[ ]
[ ] রথিন--- মানে???  মেয়েটা সকাল থেকে তোমার পছন্দের এতো সব রান্না করলো আর তুমি খাবে না।
[ ]
[ ] রাতুন ---- না মানে এখন তো অভ্যাস নেই। আর তাছাড়া এতো দুর গাড়ি চালিয়ে এসে খেতে ইচ্ছে করছে না।
[ ]
[ ] মৃনালিনী--- তুমি জোর করো না। ও যতটুকু পাবে ততটুকুই খাক। দেখোনা মুখটা শুকনো লাগছে।
[ ]
[ ] রথিন বাবু  --- কি রে মা তুই একদম চুপ যে? কি হয়েছে?
[ ]
[ ] অনু---- কই,,,,কিছু না জ্যেঠা মসাই।
[ ]
[ ] টিনা---- রান্নাটা কিন্তু সো ডিলিসিয়াস,,,,ইয়ামি,,,,,কি যেনো তোমার নাম,,,
[ ]
[ ] রাতুল ----টিনা ও অনু আমার ছোটবেলার বেষ্ট ফ্রেন্ড।
[ ]
[ ] টিনা---- ওকে,,, অনু খুব সুন্দর তোমার রান্না। আমার যদি কখনে রান্না শেখার দরকার হয় তুমি আমাকে শেখাবে।
[ ]
[ ] অনু---- তুমি একটু বাড়িয়েই বললে,,, তবুও তুমি চাইলে আমি কেন শেখাবো না। অবশ্যই শেখাবো।
[ ]
[ ] এদিকে কিছুক্ষণ পর প্লেটের উপরে রাখা খাবার রাতুল মোটামুটি চেটে পুটে সাফ করেছে । তা দেখে রামপ্রসাদ বাবু বললে ""মুখে যতই না না কর দাদুভাই আমার রাধা রানীর রান্নাকে এরিয়ে যাবে এমন সাদ্ধ তোমারও নেই।""
[ ]
[ ] দাদুর কথায় প্লেটের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে রাতুল। অনুর হাতের রান্না তাকে ফেলে আসা দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল,,,,,,
[ ]
[ ] রাতুল মনে মনে"" ইস কোথায় ভাবলাম অনুটাকে ক্ষেপানোর জন্য একটু আধটু খাব তা না সবটা কখন খেয়ে ফেললাম নিজেই বুঝি নি। এতো ভালো রান্না হয়েছে যে ইচ্ছে করেও ছাড়তে পারি নি। কবে শিখলো এতো রান্না পাগলিটা। এদিকে উনি আমার আমার দিকে তাকাচ্ছে না,,,,মনে হচ্ছে আগের মতো চুলটা টেনে সাজগোজটা একেবারে ঘেটে দেই।""
[ ]
[ ] রথিনবাবু---- রাতুলকে উদ্দেশ্য করে,,,কাল তুমি বাইরে যাওয়ার সময় টিনাকে সাথে নিয়ো ওর ও গ্রাম দেখা হবে। আর মা অনু রাতুল অনেকদিন পর গ্রামে এলো তুই সাথে থাকিস।
[ ]
[ ] অনু---- জ্যেঠা মসাই কাল যে অফিসে আমার জরুরি কাজ ছিলো। পরের কন্টাক্টের ফাইলটা আমার কাছে ওটাতে ডিজাইনটা নিয়ে কথা বলতে হবে সবার সাথে।
[ ]
[ ] রথিনবাবু---- ও তোর ডিজাইন গুলো,,,?  তাহলে তো তোকেই লাগবে। তুই বরং সকালে একবার অফিস থেকে ঘুরে আসিস।
[ ]
[ ] রাতুল অবাক হয়ে,,, অনু অফিসে জয়েন করেছে মানে,,,(মনে মনে।)
[ ]
[ ] রতিন বাবু রাতুলের বিস্মিত মুখ দেখে বুঝতে পেরে,,,
[ ]
[ ] রথিনবাবু---- অনুমা এখন আমাদের কোম্পানির হেড ডিজাইনার।  অনুমার ডিজাইন করা পোষাক আমাদের কোম্পানির সুনাম আরও বৃদ্ধি করেছে।
[ ]
[ ] রাতুল---- ও,,, ( আমি এতোদিন পরে এলাম আর উনি অফিস যাবেন। যা তোর যেখানে খুশি যা, আমার কি? আমি টিনাকে নিয়ে বের হবো,,, তখন দেখিস কেমন লাগে,,,,মনেমনে)
[ ] বাবা অনুর যদি সময় না থাকে তবে ও যাক অফিসে । আমি আর টিনা ঘুরতে যাব। আর পাঁচ বছরে এমন কোন পরিবর্তন হয় নি এ এলাকার যে আমি চিনতে পারবো না।
[ ]
[ ] রথিনবাবু---- সে তোমরাই ঠিক করো কে কে যাবে।
[ ] অনুমা আমি বের হবো তুই,,,,,
[ ]
[ ] অনু ----- বের হবে মানে কেবলই তো এলে। সেই সকালে বেরিয়েছো।
[ ]
[ ] রথিনবাবু---- একটু থানায় যাব। যেতেই হবে,,, তুই এ বেলা আর আটকাস না আমায়।
[ ]
[ ] অনু ---- মুখটা গোমরা করে,,, ঠিক আাছে যাও। তারাতাড়ি ফিরবে কিন্তু।
[ ]
[ ] অনুর ছোট মানুষের মতো জেদ করা দেখে রাতুলের ঠিক আগের মতো গালটা টেনে দিতে ইচ্ছে করছে। এরকম কত রুপ তার অনুর আছে, আর কতদিন সেগুলো দেখা হয় না। বড্ড ফাকা লাগছে বুকটা রাতুলের। আজ মনে হচ্ছে আবার পাঁচটা বছর অনুকে বুকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে কাটিয়ে দেই,,,,,শোধ হোক সকল শূন্যতা,,,,
[ ]
[ ] আজ, 
[ ] পাঁচ বছর পর জেগে উঠেছে মনটা
[ ] পাঁচ বছর পর, দৃষ্টি মেলেছে আখিঁ।
[ ] পাঁচটা বসন্ত হারিয়ে গিয়েছে জীবনের
[ ] পাঁচটা বসন্ত, নিজেকে দিয়েছি ফাঁকি।
[ ]
[ ]
[ ] রাতুলের এই এক দৃষ্টিতে অনুর দিকে চেয়ে থাকা, আর অনুর  রাতুলকে ইচ্ছে করে এরিয়ে চলার চেষ্টা সবকিছুই খুব বিচক্ষণতার সাথে খেয়াল করে টিনা। সব চেয়ে অবাক হলো বাকি সবার ব্যবহারে , সবার সামনে হচ্ছে  সবকিছু কিন্তু কেউই কিচ্ছুটি বলছে না।
[ ] এই মেয়েটার রুপ, তার গুন, সবার তার প্রতি ভালোবাসা, ওর সবার প্রতি ভালোবাসা সব কিছুই অসহ্য লাগছে টিনার। রাতুলের চোখে অনুর জন্য যে গভীর ভালোবাসার ডেউ উছলে উঠছে মিনিটে মিনিটে তা লুকানোর সাধ্য হয়তো রাতুলেও নেই।
[ ] তাহলে কি এই মেয়েটির চিন্তাতেই রাতুল সবসময় গুটিয়ে থাকতো। আর আঙ্কেল কি তবে এই মেয়েটি জন্যই রাতুলকে বাড়ি আসতে দেয়নি এই পাঁচ বছর? তাই যদি সত্যি হতো তাহলে এই মেয়েকে নিশ্চয়ই বাড়িতে রাখতো না। আর এতো আদরেও রাখতো না। কি পরিচয় এই মেয়ের? মনের ভিতরের লুকানো আশার বাস্তবে অসম্ভব বুঝতে পেরে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে টিনা।
[ ]
[ ] রাতুল ---- টিনা চলো,,,
[ ]
[ ] টিনা---- ইয়েস লেটস গো। আ' ম টায়ার্ড,,,, আমি একটু রেস্ট নেব রাতুল।
[ ] বলেই রুমে চলে যেতে লাগলো।
[ ]
[ ] রাতুল---- ওকে,,,।
[ ]
[ ] মৃণালিনী ---- রাতুল তুইও একটু বিশ্রাম নে গিয়ে।এতোটা রাস্তা এসেছিস,,,বলতে বলতে উনিও চলে গেলো।
[ ]
[ ] রাতুল---- যাব মা,,,দাদু,,, তোমার সাথে কথা আছে আমার। তোমার রুমে চলো।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ---- রাতুলের কানে কানে জানি জানি অভিসারে তো,,,,,
[ ]
[ ] রাতুল---- দাদু!!!! 
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ----- আরে দিন তো আমাদেরও ছিল। সেটা ভুললে চলবে কেন?? নাতি আমার,,,,
[ ]
[ ] রাতুল---- দাদু আস্তে,,,,অনু জেনে যাবে।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ---- আরে না না এখন জানানো যাবে না। জানিস কি দাদুভাই ওই যে প্রপোজ করার আগের যে সময়টা যখন তোর মনে হবে তুই কাউকে ভালোবাসিস আর তাকে বলতে পারছিস না এই অনুভূতিটা এটাকেই মুলত প্রেম বলে। বাদ বাকি জীবনটা সহ্যের আর ধৈর্যের পরিক্ষা মাত্র।
[ ]
[ ] রাতুল---- তুমি কিন্তু রীতিমতো ভয় দেখাচ্ছো।
[ ]
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ---- তা ভয় পেলেই যে তুই এ পথ থেকে সরে যাবি না তা আমি আমার দিব্য দৃষ্টি দিয়ে বলতে পারি। তুমি কেন কেউই পারে না এটাইতো প্রেমের জোর রে।
[ ]
[ ] রাতুল ---- দাদু চলো এবার। তোমার খাওয়া শেষ।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ----  ও,,,,হ্যা হ্যা চল।
[ ]
[ ]
[ ] [পাঠক বন্ধুগণ কেমন লাগছে জানালে উপকৃত হতাম ]
[ ]
[ ] রাতুল দাদুর ঘরে গিয়ে সাবেকি আমলের কাঠের কারুকার্য খচিত ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। কাল বিকেল থেকে একটানা গাড়ি চালাতে চালাতে সারা শরীরে ব্যথা হয়ে আছে। সমর কাকু অবশ্য বলেছিল ট্রেনে আসতে কিন্তু সদ্য কেনা নতুন মডেলের অডি গাড়িটিকে ফেলে আসতে মোটেও ইচ্ছা করে নি রাতুলের। রাত্রে যদিও একটা হোটেলে ছিল ভোরে আবার রওনা দিয়েছে। এই এতোটা পথের ক্লান্তিও যেন, অনুকে দেখা ওর সাথে মান অভিমানের লুকোচুরির যে আনন্দ, তার সামনে কিছুই না।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ বাবুর দুপুরের খাবারের পর ভাতঘুমটা না দিলে বিকেলে গা টা কেমন ম্যজম্যজ করে। তাই অভ্যাস বসত তিনি তার বিশাল রাজকীয় পালঙ্কের সাদা ধবধবে বিছানার একদিকে- তার মেদযুক্ত ছ'ফিটের শরীরটাকে টানটান করে রাতুলের দিকে মুখ করলেন।কিন্তু তিনি রাতুলের মুখে ক্লান্তিতে অবসন্ন,  চিন্তায় বিষন্ন, হঠাৎ পাওয়ায় আনন্দিত, ভালোবাসায় প্রসন্ন এরকম সব অনুভূতি মিলিয়ে মুখের যে অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সেই দিকে চেয়ে নিজেই কনফিউজড হয়ে গেলেন। আর বুঝতে পারলেন ফেলে আশা দিনগুলোতে কি যন্ত্রনাই সহ্য করতে হয়েছে তাকে যে আজ সে নিজেকে কোন আবেগেই স্থির রাখতে পাছে না। কিন্তু সেদিন- কিচ্ছুটি করতে পারেননি তিনিও; যা হয়েছে তার পর রাতুলকে বাইরে পাঠানোই ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। আর রমেনের বিচার যে, কোন কালেই ভুল হয় না; এ বিষয়ে বাবা হয়ে নিজেও গর্ব অনুভব করেন রমাপ্রসাদ বাবু।
[ ] রমাপ্রসাদ --- তারপর দাদুভাই,,,, কেমন কাটলো এই দিন গুলো তোর?
[ ]
[ ] রাতুল---- দাদুর দিকে একটা ব্যঙ্গাত্বক হাসি ছুঁড়ে  বললো,,,,  ভালোই তো সেই জন্যই তো আমাকে পাঠিয়েছিলে তোমরা।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ----- দেখ দাদু ভাই তখন কার অবস্থায় এর থেকে ভালো আর কি হতো বলতো?
[ ]
[ ] রাতুল---- দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,, হ্যা তাই তো,,, তাই আমিও সব মেনে নিয়েছিলাম। ভালোই ছিলাম আমিও- লেখাপড়া আর শুধু লেখা পড়ায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলাম। না কোন বন্ধু হয়েছে না বান্ধবী। ওই ভদ্র সমাজে থাকতে বা চলতে গেলে যেটুকু না করলে বা বললে মানুষ  অভদ্র ভাবে সেটুকুই রক্ষা করে চলেছি। নিজের অজান্তেই মন বারবার শঙ্কিত হয়েছে ; আবার যদি কোন ভুল করি তাহলে আর কোন দিন বাড়ি আসা হবে না। তোমাদের কারও দেখা পাব না।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ---- বুঝি, দাদুভাই বুঝি, তোমার কষ্ট গুলো; কিন্তু তোমার ভবিষৎ এর কথা ভেবে আমরাও তো নিজেদের শক্ত করে রেখেছিলাম। যাক সেসব কথা,,,,টিনা মেয়েটিকে দেখতে কিন্তু ভালোই লাগলো,, দাদুভাই। সমরের মেয়ে তাই না? তোর সাথে পড়ে বুঝি?
[ ]
[ ] রাতুল---- হ্যা,,, সমর কাকুর একমাত্র মেয়ে। আমরা এক সাথেই মেডিকেলে পড়েছি ওরও আমার সাথে লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ --- তাই!!! তা বেশ, বেশ। কিন্তু এর বেশি কিছু হলে জানিও আর একজনকেও তো বোঝাতে হবে।
[ ]
[ ] রাতুল---- তাই বুঝি?
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ ---- দাদুভাই, ফুলদি ভাইয়ের মুখ খানি এতো শুকনো লাগলো কেনো রে?? সকাল পর্যন্ত মেয়েটা সারা বাড়িকে শাসিয়ে রেখেছিল, তুই আসবি বলে কত আয়োজন। কিন্তু এ বেলায় কেমন জানি মনমরা লাগলো। এসেই কি লাগলো নাকি তোদের??
[ ]
[ ] রাতুল---- অপরাধীর মতো চোখ সরিয়ে নিয়ে;; ---অনেক কথাই তো হলো দাদু এর মধ্যে তেমার ফুলদি ভাইয়ের কোনটা খারাপ লাগলো কি করে বলবো?
[ ]
[ ] রমাপ্রসাদ -----দেখ দাদুভাই মেয়েটাকে তুই কতটুকু চিনিস আমি জানি না, তবে বড়ই অভিমানি ও একদম ওর মায়ের মতো। তাই ওকে একটু সাবধানে সামলাস।( অনুর চোখের জল যে রমাপ্রসাদ বাবু দেখেছিনেন সে কথা এরিয়ে গেলেন)।
[ ]
[ ] রাতুল নিশ্চুপ,,,,,
[ ]
[ ] ভুল তো হয়েছে কিন্তু সেটা শোধরাবার জন্যও তো স্বশরীরে মানুষটাকে চাই। কখন থেকেতো বসে আছি কই তার তো দেখা নেই। মানলাম আমার একটা ভুল হয়েছে কিন্তু,,,,,,,না আর ভাবতে পারল না রাতুল,,, তারও অভিমানের পাহাড় জমেছে মনে।
[ ] লেখকরা হয়তো ঠিকই বলেন " অধিক ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয় "।  সে জন্যই হয়তো দুটি অতৃপ্ত মন, এক হওয়ার বাসনায় এতদিন অপেক্ষা করেও- আজ দুজন দু'দিকের বাঁকে বেঁকে যেতে চাচ্ছে।
[ ] রাতুল দাদুর দিকে তাকাতেই দেখলো এরমধ্যে রমাপ্রসাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। আলতো পায়ে তার ঘরের দিকে চললো সে। সিঁড়ির ধারে মহিধরকে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,,,,,,
[ ]
[ ] মহিকাকা কি হয়েছে??
[ ]
[ ] মহিধর ---- তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম ছোটবাবু। ফুলমা তো কিছুই খেলো না সেই সকাল থেকে না খেয়ে আছে। মুখখানা কি রকম থমথমে ছিল। এতো বার খেতে বললাম কিন্তু না শুনে বাইরে বেড়িয়ে গেলো। এসময় বড় বাবু থাকলে তেনাকেই বলতাম, কিন্তু তিনিও তো নেই,,,,,
[ ]
[ ] মহিধরকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে,,,
[ ]
[ ] কখন গেলো??
[ ]
[ ] তোমরা সবাই টেবিল থেকে যাওয়ার পর পরই,,,,
[ ]
[ ] হন্তদন্ত হয়ে রাতুল ছুটলো নাট মন্দিরের দিকে,,,মন খারাপ হলে তো ওর কৃষ্ণের কাছেই যায় মেয়েটা। ওই মাটির ত্রিভঙ্গমুরারি যে একেবারেই জীবন্ত অনুর কাছে।
[ ]
[ ]
[ ] শ্রী কৃষ্ণের মন্দিরের সামনে বিশাল পুকুর,;তার শান বাঁধানো ঘাটে, পরিস্কার জলের ধারে, পা ডুবিয়ে একমনে জলের দিকে চেয়ে আছে অনুরাধা। মাঝে মাঝে তার চোখ দিয়ে দু'এক ফোটা নোনাজল তা যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে মিষ্টি জলের রাশিকে।
[ ]
[ ] সত্যি জীবন বড়ই অদ্ভুত; প্রথমে মা তারপর বাবাকে হারিয়ে অনুরাধা বড় হয়ে ওঠে এই বিশাল বাড়িতে জ্যেঠা মসাইয়ের ভালোবাসায়। জ্যেঠি মা অতোটা কাছাকাছি না থাকলেও অবহেলা করে নি কোন দিন।দাদু, মহিকাকা, মালীকাকা,মালীকাকার নাতনি কৃষ্ণা, এই ঠাকুরঘর, এ বাড়িতে সাহায্য প্রার্থী মানুষ আর সবচেয়ে কাছের রাতুলদা, এই নিয়ে তো জীবন চলছিল। হঠাৎই একটা অপরাধ, তারপর বিরাট ঝড়, সেই ঝড়ে লন্ডভন্ড সবার জীবন।এতো বছর ঝড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে নিয়ে কেটে গেছে।  কিন্তু আজ রাতুলের মুখে মিথ্যে অভিযোগ, টিনা আর রাতুলকে এতোখানি কাছে দেখা। টিনার প্রতি রাতুলের কেয়ার এসব দেখে নিজেকে খুবই ছোট মনে হচ্ছে। এতো বছর পর আজ বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে ভীষন ভাবে। মায়ের কোলে মাথা দিয়ে একটু খানি চোখের জল ফেললে হয়তো বুকের ভিতরের আগুনটাকে নেভানো যেতো। বড্ড কষ্ট দিচ্ছে আগুনটা; সমস্ত শরীরটাকে পুড়ে ফেলছে, আর তার ধোঁয়া গুলো অশ্রুহয়ে ঝরছে দুচোখ বেয়ে। কি জানি বাবা মা বেঁচে থাকলে হয়তো অন্যরকম হতো জীবনটা। হঠাৎ খুব চেনা একটা গন্ধ, খুব চেনা,,,,  তবে কি সে এলো কাছে? না কি অন্যদিনের মতো কল্পনায় তার আবির্ভাব,,,,
[ ]
[ ] রাতুল---- কি রে,,,,একা এখানে কি করছিস?
[ ]
[ ] ** কি রে,,,  একা এখানে কি করছিস??
[ ]
[ ] অনু----( সচকিত হয়ে আড়ালে চোখের জল মুছে) এমনি বসে আছি,,, তুমি এখানে?
[ ]
[ ] রাতুল অনুর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে যে এতোক্ষণ এদের উপর দিয়ে ভয়ঙ্কর  সুনামি হয়ে গিয়েছে।
[ ]
[ ] রাতুল---- থামলি কেন? সুনামিটা চালিয়ে যা।
[ ]
[ ] (অনু অবাক হয়ে,,,)সুনামি মানে!কি,,, কি বলছো এসব?
[ ]
[ ] রাতুল---- ও বুঝতে পারছিস না আমি সুনামি কাকে বলি। একদম ঢং করবি না।হোক পাঁচ বছর আগের কথা, তাই বলে ভুলে যাবি?
[ ] ( অনুর জানে রাতুল চোখের জলকে সুনামি বলে ও ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়ার নাটক করেছে )
[ ]
[ ] অনু----- না মানে,,,, আমি কাঁদিনি।
[ ]
[ ] রাতুল---- অনু!!তুই তো মিথ্যেও বলা শিখেছিস। কই আগে তো বলতিস না। বরং আমি যদি কখন কোন মিথ্যে বললে আমার সাথেই ঝগড়া করতিস। তুই অনেক পাল্টে গেছিস অনু।
[ ] হ্যা যাবি নাই বা কেন!! তুই তো এখন মুখার্জি গার্মেন্টস এর হেড ডিজাইনার ; এরকম কত কাজ করতে হয় তোকে। কত মিথ্যাও হয়তো বলতে হয়। তাই না রে??
[ ]
[ ] অনু---- (অনু প্রথমে রাতুলের দিকে তাকায় নি কিন্তু এবার সে রাতুলের দিকে ঘুরে ওর চোখে চোখ রেখে রেগে গিয়ে বললো)  তখন থেকে কি আজেবাজে বকে যাচ্ছ বলো তো? আমি মিথ্যে এখনো বলি না,,,, বুঝেছো?
[ ]
[ ] রাতুল---- তাহলে কেন বললি এমনি বসে আছিস?
[ ]
[ ] অনু---- এমনি তো বসে আছি। তুমি কি চোখে দেখো না?
[ ]
[ ] রাতুল ---- চোখে দেখি না! মানে আমি কানা!! এ্ই,,,,  তুই আমায় কানা বললি!! তুই তো সত্যি কাঁদছিলি, এখন বলছিস আমি চোখে দেখি না ; আমি বুঝি বোকা?
[ ]
[ ] অনু---- হ্যা,,,,,হ্যা,,, কাঁদছিলাম ;তোমার জন্যই তো কাঁদছিলাম। তুমি কেন বললে ওই শুভর কথা যে আমি,,,,
[ ] এটুকু বলেই হুস ফেরে অনুর"" এ কি করতে যাচ্ছিলাম আমি। রাতুলদা কি ইচ্ছে করে আমাকে উত্তেজিত করে সব জানতে চাইছে? রাতুলদা তো জানে যে আমি রাগ হলে সব বলে ফেলি, না আমি আর কোন কথা বলবো না।"
[ ] এটা ভেবেই উঠে যাচ্ছিল অনুরাধা। কিন্তু বাঁধা পায় সে; দেখে তার বা হাতের কব্জি রাতুলের হাতের মুঠোবন্দি। শিহরিত হয় অনু এক অনাবিল ভালো লাগায়; কিন্তু রাতুলের শার্টে লেগে থাকা লিপস্টিকের দাগ মাথার রাগ টা দপ করে জ্বালিয়ে দেয়, জোর করে ছাড়িয়ে নিতে চায় হাতটা।"" ছাড়ো আমায়""।
[ ]
[ ] রাতুল ---- একটু দাড়া,,
[ ]
[ ] রাতুল তার ফোন গ্যলারী থেকে একটি ফটো সিলেক্ট করে তা অনুরাধার সামনে তুলে ধরে ; যেখানে সাদা শাড়ী পরিহিত অনু, শুভর বুকে মাথা দিয়ে সেলফি তুলছে।
[ ] বিস্মিত হয় অনুও এটা তো গত বছরের সরস্বতী পুজোর ছবি। এটা রাতুলের কাছে কিভাবে?
[ ]
[ ] অনু----এই ছবি তো গতবছর সরস্বতী পূজোয় তোলা এটা তোমাকে কে দিল?
[ ]
[ ] রাতুল----  নিশান দিয়েছে। ও আরও বলেছে তোর আর শুভর নাকি প্রেম চলছে।[রাতুল এবার এক অন্তরভেদী দৃষ্টি হানে অনুরাধার চোখে; যেন এক পলকে পড়ে নিচ্ছে অনুর মনের কথা]
[ ]
[ ] অনু---- এ বিষয়ে কোন সাফাই,  তোমায় আমি দিব না। তবু শুভ আর আমার পবিত্র সম্পর্কটাকে এভাবে যারা কালি মাখিয়েছে তাদের একটা শাস্তির নিশ্চই প্রার্থনা করবো। ভাই বলে মানি আমি শুভকে, তুমি অবশ্যই এর কিছুটা হলেও জানো। ওকে তো এবছরেও আমি ভাই ফোঁটা দিয়েছি। তার পরও তোমার মনে এ রকম চিন্তা আসছে কি কারণে আমি তা ভালো করে বুঝতে পারছি। নিশ্চিন্ত থাকতে পার তোমার পথের কাঁটা আমি কোন কালেই হব না। তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আমি না আগে কিছু করেছি, না আজ করবো। তুমি যার সাথে খুশি, যেখানে খুশি থাকতে পার আমার তাতে কিছু আসে যায় না। (এ কথা গুলো বলতে অনুরাধার বুকটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে, কিন্তু ওকে যে বলতে হবে,,,ওর রাতুলদার ভালোর জন্যেই বলতে হবে। রাতুল যদি ওই টিনার সাথে ভালো থাকে, তবে তাই হোক, রাতুলের সুখের জন্য সব করতে পারে এই অনু।) 
[ ]
[ ] অনুরাধার কথায় অবাক হয়ে যায় রাতুল; মনেমনে ভাবে"" কি বলছে এই পাগলিটা, এতটুকু সময়ে কত কি ভেবে নিয়েছে সে। বুঝলাম রাগ ভাঙ্গাতে হবে এই পাগলির, নয়তো অনর্থ ঘটাবে।""
[ ] অনুরাধার হাতটা তখনও রাতুলের হাতে ধরা এবার অনুর অন্য হাতটা ধরে জোর করে পাশে বসায় রাতুল। অনুর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,,,,,
[ ]
[ ] রাতুল---- তুই বিশ্বাস করিস আমি এ জীবনে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারি?
[ ]
[ ] অনুু---- রাতুলের চোখে যেন পাঁচ বছর আগের পাগলামি, কেয়ার, অধিকার, ঠিক তেমন ভাবেই দেখতে পেলো অনু। নিমিষেই সকল রাগ অভিমানের কারণ যেন উবে গেলো, মনের উপরের কাল মেঘ উধাও হয়ে রৌদ্র ঝলমল করে উঠলো, সেই আনন্দে দু চোখের জল নির্দিধায় ধেয়ে আসতে লাগলো, আর মুখে বললো,,,,তুমি যদি আমায় নিয়ে এরকম ভাবতে পার তবে আমি কেন নয়?


রাতুল---- না তুই পারিস না। তুই তো প্রথম থেকেই জানিস, তোকে নিয়ে আমি কতটা পজেসিভ। তোর ব্যপারে সামান্যও কথাও যে আমাকে কতটা ধ্বংসাত্মক করতে পারে, তা হয়তো আমি নিজেও জানি না। এই পাঁচটা বছর এজন্যই তো একে অন্যের কাছ থেকে দুরে  কাটালাম। (অনুর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে) আর কাঁদিস না, আমাদের অপেক্ষার দিন শেষ হয়েছে। এবার নিশ্চই আর কারও আপত্তি থাকবে না? আর থাকলেও মানবো না আমি এই বলেদিলাম।
অনুর দুচোখে রাতুল গভীর ভাবে নিজের ঠোঁট ছুইয়ে দিল। নিজেও দুচোখ বন্ধ করে এই মূর্হুতের ছোঁয়াটুকু কে অনুভব করতে লাগলো যেন হাজার বছরের পিপাসার্ত কোন পথিক জলের সন্ধান পেয়েছে। আজ আকন্ঠ জলের স্বাদে ভরিয়ে নিতে চায় নিজের তৃষ্ণা ও হৃদয়কে।

একে অপরের দিকে অপলক চেয়ে থাকে দুজোড়া চোখ। তৃপ্ত হয় দীর্ঘ বিরহে দগ্ধীভূত দুটো নির্মল হৃদয়। কথা হারিয়ে গেছে তাদের মাঝে; একদিন যে প্রেমের সাক্ষী ছিল এই মন্দির, এই পুকুর,  প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ, আকাশ, বাতাস ; এতোদিন পর, আজও আছে তারা আগের মতোই নিঃশব্দে। তাই আজ যেন মিলনের সুরে প্রকৃতি নেচে ওঠে প্রকৃতির নিজেস্ব লয়ে। কথার আস্তরণ পেরিয়ে নিঃশব্দই এখন সঙ্গি হয়ে আছে তাদের মাঝে।

""নিঃশব্দের ভাষা আছে, আবেগ বেঝে সে ভাষা
তাই নিঃশব্দে নিঃসৃত হয়, মনের কত কথা।
নিঃশব্দে ঝরা চোখের জলে আজো ভেজে মন
মাঝে-মাঝে নিঃশব্দেরও, অনেক বেশি প্রয়োজন।""


টিনার ঘরের বেলকোনি দিয়ে পুকুর ঘাট স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। এতোক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাতুল ও অনুরাধার এরকম কার্যকলাপে সে বিহ্ববল হয়ে গেলো । পাঁচটি বছর রাতুলের সাথে মিশে রাতুলকে কতখানি ভালোবেসেছে, তা সে আজ উপলব্ধি করতে পারছে। আজ রাতুল অন্য কারও হবে! এটা ভাবতেই তার সমস্ত পৃথিবীটা শূন্য মনে হচ্ছে। ব্যর্থ মনে হচ্ছে রাতুলহীন এ জীবন। আজ রাতুলকে হারানো নিশ্চিত জেনেও রাতুলকে পাবার এক তীব্র,  অতি তীব্র  বাসনায় মন উদ্ভ্রান্ত হতে চাইছে। জোড় করে!!! হ্যা জোড় করে হলেও রাতুলকে অন্যকরও হতে দেবে না টিনা। এ এক কঠিন সংকল্পে নিজেকে স্থির করলো টিনা। তার ভালোবাসা পাওয়ার লড়াইয়ে অনেক কঠিন পথকে অতিক্রম করতে হবে তাকে। শক্ত; আরও শক্ত হতে হবে তাকে। ভেঙে পরলে যে, রাতুলকে সে আর পাবে না। তার প্রথম ভালোবাসা অপূর্নই থেকে যাবে, সেটা টিনা এই গাঙ্গুলী কোন ভাবেই মেনে নেবে না।
তৎক্ষনাৎ কারও কথা মনে পরে টিনার  মুখে একটা বাঁকা হাসির রেখা খেলে গেলো। রুমের ভিতর থেকে মুঠোফোন টা নিয়ে এসে আবার দাড়ায় বেলকোনিতে। পুকুর পারে প্রকৃতির মাঝে অধিষ্ঠিত প্রমিক যুগলের দিকে চেয়ে ডায়েল করে একটি চেনা নম্বরে,,,,

টিনা---- হ্যালো,,,, অরিন্দম কেমন আছিস? তোর জন্য একটা দারুন খবর আছে। তুই অনেকদিন থেকেই চাইছিলি না, গ্রামের কোন ভিউ। আমি এখন একটা গ্রামে। এই জায়গাটা আশা করি তোর খুব পছন্দ হবে। খুব সুন্দর এ জায়গাটা,,,,,

অরিন্দম ---,,,,,,,,,

টিনা---- আমি এড্রেস মেসেজ করে দিচ্ছি।  ওয়েল কাম ডিউড,,,এন্ড আই হ্যাব এ সারপ্রাইজ ফর ইউ,,,,,ওকে,,,,,,বায়,,,,,,,


************** ক্রমশ*********
কি ঘটতে চলেছে পরবর্তীতে??? 🤔🤔🤔

ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন প্লিজ। ঘরে থাকুন,বাবুজি আজ বহুত দেড় হো গ্যায়া, ছোটি মেমসাহাব আজ হামে ফিরচে ডাটেং গি। আনে কি ওয়াক্ত হামে বারবার কেহে রেহে থি কে জলদি আপকো ঘর লে আউ। আপনে বহুত দের করদি।( ভয়ে মুখটা কাচুমাচু করে কথাটি রথিন বাবুকে বললো, রাম সিং)

রথিন বাবু----  ভয় কি তোর একার লাগছে রে,,, আমারও লাগছে। ব্লাড প্রেসার আর ডায়বেটিস টা ধরা পরার পর থেকে অনু মা এমন হিটলারি নিয়ম চালু করেছে, যে একটু এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই। তাহলেই মুখটা গোমরা করে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেবে। আমার অনুমা যদি আমার সাথে কথা না বলে তাহলে কেমন লাগে বলতো? এদিকে অসুখের পর আমার উপর যাতে চাপ না পরে, সে জন্য পড়াশুনার মাঝে অফিসে গিয়েও কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। প্রথমে না চাইলেও এমন এমন সব ডিজাইন করে দিচ্ছে, যে আমাকে বাধ্য হয়ে ওকে হেট ডিজাইনার করতে হলো। অথচ যে ফ্যাসন ডিজাইনের উপর পড়াশুনা করছে তা কমপ্লিট করতে এখনো এক বছর বাকি। এদিকে আমার বাড়ি বল আর অফিস অনু মা ছাড়া সব কি রকম ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

রাম সিং---- ছোটি মেমসাহেবকো আপ ইতনি পেয়ার করতি হ্যয়, কে মুঝেতো লাগতি হ্যয় উনকি সাগি পিতাভি উনসে ইতনি পেয়ার নেহি করতে।

রথিন বাবু---- কেন রে ব্যেটা, অনুমা কি আমার মেয়ে নয়? (একটু রেগে)

রাম সিং ---- নেহি, নেহি মেরা মতলব বো নেহি থা,,,,

রথিন বাবু---- বকবক না করে গাড়িটা তারাতারি চালা। আরো দেরি করলে, অনুমা এবার তোর চাকরিটাই না খেয়ে ফেলে।

রাম সিং----জি,,,, জি সাহাব,,,,

রাম সিংয়ের কথা কতটা সত্য, তা জানার কোন ইচ্ছা নেই রথিন বাবুর। অনুর বাবা শিবেন বেঁচে থাকলে কতটা কি করতো তারও কোন মুল্য নেই তার কাছে।রথিনবাবু শুধু জানে অনু অমলার মেয়ে। অমলার শেষ চিহ্ন। অমলার মেয়েকে কি করে অবহেলা করতে পারে অমলার রথিদা। আর অমলার মেয়ে যে অমলারই প্রতিচ্ছবি।

রথিনবাবুর অতীত ভাবনা
কাহিনীটা পয়তিরিশ বছর পুরাতন হলেও চরিত্র গুলো যেন মঞ্চস্থ হচ্ছে আবার নতুন করে", হিস্ট্রি রিপিট ইটসেলফ "বলে যে কথাটা আছে রথিনবাবুর জীবন দিয়ে তা উপলব্ধি করতে পারছে। আজ রাতুলের চোখে যতখানি ভালোবাসা অনুর জন্য দেখা যায়; সেদিন সদ্য কৈশোর পেরোনো রথিনের চোখেও ছিল অমলার জন্য আর অবুঝ অমলারও। তাই তো ইন্জিনিয়ারিং পরতে লন্ডনে যাওয়ার সময়, মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোরী অমলা কার ও কথা শুনে ছুটে এসে কেঁদে কেঁদে  বলেছিল"" রথিদা তুমি মেম বিয়ে করে নিয়ে আসবে না তো? সবাই বলছে তুমি বিলেত থেকে মেম নিয়ে আসবে, যারা ওখানে যায় তারা সবাই নাকি মেম নিয়ে আসে। ""

পাঁচ ফুট উচ্চতার, একডাল কালো সাপের মতো উরন্ত চুলে, থমথমে মুখে, জলভরা চোখে অমলার আকুতিপূর্ন চাহুনিতে, মুহুমুহ কেঁপে ওঠা ওষ্ঠে , অগোছালো অপোক্ত শাড়ীতে যে অমলা দাড়িয়ে ছিল, সে যে কোন হৃদয়েই কাপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। রথিনবাবু প্রথমে আবেগের ধারায় বয়ে গেলেও, নিজেকে সামলে, আলতো হাতে অমলার চোখের জল মুছে একটু গম্ভীর মুখ করে  বলেছিল " সে যদি কেউ আসতে চায় তাহলে নিষেধ কি করে করবো বল? তাও আবার মেম বলে কথা। "

অমলা তার দুটি ডাগর চোখ দুহাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে বলেছিল"" হ্যা আনবেই তো,,,তবে তখন কিন্তু আমি তোমার বাড়িতে আর আসবো না। তোমার কাছে পড়বো ও না; অনেক দুরে চলে যাব; ডাকলেও আমাকে পাবে না, খুঁজলেও না। তখন দেখবো তোমার ওই এতো- এতো বই কে গুছিয়ে দেয়, তোমার আদরের টিয়েকে কে খাওয়ায়, দুপুরবেলা কে তোমায় লুকিয়ে আচার খাওয়ায়, বড় বাবুর ঘরের চুরুট লুকিয়ে কে এনে দেয় আর,,,,।""

রথিন -----(অমলার মুখ হাত দিয়ে ঢেকে) এই চুপ কর, চুপ কর কেউ শুনে ফেলবে।

অমলা---- শুনুক সবাই,,, তুমি মেম আনবে সে বেলায় কিছু নেই।  আমি আজ জোর গলায় বলবো, সব বলবো,,,,আগে বলো তুমি মেম আনবে না?

রথিন ---- আচ্ছা অমলা, আমি মেম আনলে তোর কি? তুই এতো রেগে যাচ্ছিস কেন বলতো? এইটুকু মেয়ে তুই মেম বিয়ের কি বুঝিস?

অমলা---- (নিজেও নিশ্চুপ,,, অমু যখন বোঝার চেষ্টা করলো ওর এই হঠাৎ রাগের কারন; ওর অপরিনত মন কোন উপযুক্ত যুতসই কারনই খুঁজে পেল না।)
সহসা রথিন অমলার হাতদুখানি নিজের কাছে নিয়ে বললো"" আমি জানি তুই নিজেও এখনো জানিস না এ কথাগুলো কেন বলছিস। আমি চার বছরের জন্য বিদেশে যাচ্ছি, এর মধ্যে সব কথা নিজের কাছ থেকে জেনে নিবি; তাহলেই আমাদের মাঝে কোন মেম কেন? কখন কেউই আসতে পারবেনা না, কথা দিলাম।""
অমলা রথিনের কথা কতোখানি বুঝলো সে হয়তো নিজেও জানে  না তবুও তার স্বর্নপ্রভা সমান রং লজ্জায় লাল হয়ে গেলো, ধীর পায়ে চলে যেতে লাগলো।
অমলার এ চলে যাওয় রথিনের বুক আসন্য বিরহে ব্যকুল করে তুলতে লাগলো। তাই পেছন থেকে অমলাকে বললো"" অমু একবার এদিকে আয় তো। "
মাথাটা নিচু করেই গুটিগুটি পায়ে রথিনের সামনে এসে দাঁড়ালো অমলা। রথিন তার  হাত দিয়ে অমলার চিবুকখানি ধরে মুখটা উপরে তুলে ধরলো। আসন্ন বিরহে, সুখ স্মৃতির লোভে, কিশোরী অমলার আবেশে কেঁপে ওঠা অধর দুটিকে প্রথম বারের মতো নিজের করে নিল। সাথে সাথে মিলে মিশে গেলো চোখ দিয়ে গরিয়ে পড়া জল, দুটি অপরিনত হৃদয়ের দিকে ধেয়ে আসা বিচ্ছেদের কষ্ট,আর প্রথম চুম্বনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
কতদিন সেই চুম্বনের স্মৃতি হানা দিয়েছে রথিনের পৌরুষের দরজায়। কতদিন সেই স্মৃতিকে আবার নিজের করে পাবার জন্য, মনে হয়েছে সব ছেড়ে একছুটে চলে আসে তার অমলার কাছে। আরো আদরে আদরে ভিজিয়ে দেয় ওই কমল ওষ্ঠধর।

কিন্তু ভাগ্যদেবতা হয়তো অলক্ষ্যে ই হাসতে ছিলেন, অমলার বাবা অমলবানু রথিনদের স্টেটের ম্যনেজার ছিলো। রথিন লন্ডন যাওয়ার তিন বছর পর, তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।বারবার শত অনুরোধেও,তিনি তার সতের বছরের আইবুরো মেয়ের; আর কোন কথা শুনতে চান নি । অবশেষে মাতৃহীনা অমলা লাজ লজ্জা বিসর্জন দিয়ে জানালো তার ভালোবাসার কথা, অপেক্ষার কথা, কিন্তু তাতে আগুনে ঘি দান হলো। মালিকের বিদেশ ফেরত ইন্জিনিয়ার ছেলের সাথে তার অল্প শিক্ষিতা মেয়ের প্রনয় কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারেন নি তিনি। এ যে অমলার বাবার কাছে অন্যায়।
বেঁচে থাকতে এত বড় অপরাধ, মালিকের সাথে এমন অন্যায় কি করে করবেন তিনি? তাই রথিন ফিরবার আগেই শহর থেকে সদ্য বি এ পাশ করে ফেরা, স্টেটের নতুন চাকুরে শিবেনের হাতে তুলে দেন অমলাকে। বিয়ের সকল খরচ মহা আনন্দে বহন করে রমাপ্রসাদ।  ঘুনাক্ষরেও যদি জানতেন এ জন্য তার ছেলের জীবনে কি ক্ষতি হতে চলছে। তবে হয়তো উন্নত মানসিকতার রমাপ্রসাদ নিজ হাতে ছেলে ভালোবাসাকে নষ্ট হতে দিতেন না।

কন্যা বিদায়ের বেলা অমলার আত্ন চিৎকার শুধু ঠিকানা বদলের ছিলো না, এ যে ভালোবাসার মানুষকে চিরতরে হারানোর ব্যথাও ছিল।

       *****
রাম সিং----- সাহাব হাম ঘর আ গেয়ে। ক্যয়া আপ ঠিক হো??কব সে পুকার রাহা হু আপকো।

রথিনবাবু---- (অতীতের দিন থেকে ফিরে) হ্যা হ্যা এইতো। যাচ্ছি আমি।আমি ঠিক আছি বলে একটু টলতে, টলতে চলে গেলো। এখন অতীত টা দগদগে ঘা এর মতো যন্ত্রণা দেয় রথিনবাবুকে। দরজা পার হতেই দেখে, অনু তার গাড়ির আওয়াজ শুনে ঠিক দরজায় দাড়িয়ে আছে, মুখ ভার করে।

অনু---- এই তোমার আসার সময় হলো বুঝি। রাত আটটা হতে চললো।

রথিনবাবু---- এই সবে কাজ মিটলো রে মা।( ক্লান্ত মুখে)
অনু---- তোমার শরীর ভালো আছে?  কি হয়েছে?(শঙ্কিত মুখে)

রথিনবাবু----- শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে। আমি একটু ফ্রেস হয়ে নেই। রাতুল কোথায় মা।

অনু--- ও তো ঘুমচ্ছে,,,,

রথিনবাবু---- ওও (বলতে বলতে উপর নিজের ঘরের দিকে গেলেন।)

রাত সারে নয়টার দিকে অনু মহিধরকে বললো "মহিকাকা টেবিলে খাবার দিয়েছি তুমি সবাইকে ডেকে দাও তো।

মহিধর ----- আমি এইমাত্র ডেকে এলাম ফুলমা।রাতুল বাবা এখন ঘুমচ্ছে তাই আমি ডাকি নি।

অনু---- এখনো ঘুমচ্ছে?? আচ্ছা তুমি এদিকটা একটু দেখো আমি ওকে ডেকে নিয়ে আসছি।

অনু রাতুলের ঘরে
ঘরে ডুকেই রাতুলের ঘুমন্ত মায়াময় মুখটা চোখে পরে অনুর। কাছে গিয়ে চুপিচুপি আলতো করে ঠোঁট একে দেয় রাতুলের কপালে,,,,, তারপর মৃদুস্বরে ডাকতে লাগলো " রাতুলদা ওঠো খাবে না, অনেক রাত হয়ে গেলো।,,,, এভাবে পরপর কয়েকবার ডেকেও যখন রাতুলের কোন হেলদোল হলো না ; তখন গ্লাস থেকে ফোটায় ফোটায় জল রাতুলের চোখের উপর দিতে লাগলো।ঘুমের মাঝে জলের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠলো রাতুল কি ব্যপার তা বোঝার আগে অনুর হাসির কলতানে মুগ্ধ হয়ে গেলো তার শ্রবন ইন্দ্রিয় তবুও মুখে বিরক্তির পর্দা গলিয়ে ;রাগের মেকাপ চরিয়ে; অনুর দিকে চাইলো রাতুল । ঘুম থেকে উঠে অনুর হাস্য উজ্জ্বল মুখটা দেখতে পেয়ে রাগের মেকাপ ধুয়ে গেলো,  আর মেকি বিরক্তি হারিয়ে গেলো। এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো অনুর মুখের দিকে। কতদিন পর সে অনুর হাসি মুখটা দেখতে পাচ্ছে। 

অনু ---- ডিনার করবে চলো।

রাতুল---- না,,, করবো না। আমি ঘুমবো।(বলেই আবার শুয়ে পরলো রাতুল)

অনু----- কি!!!  এতোক্ষণ ঘুমানোর পর আবার না খেয়ে ঘুমাতে চাও। কখনো না ওঠো শিগগির।

রাতুল-----  (রাতুল বেডের কাছে দাড়িয়ে থাকা অনুর হাত ধরে জোর করে বিছানায় আধশোয়া করে জরিয়ে ধরে ) উঠতে পারি এক শর্তে।

অনু----- ( অনু ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে) শর্ত!!! কি শর্ত?

রাতুল ----- আমাকে খাইয়ে দিতে হবে,,,,

অনু----(অবাক হয়ে) তুমি কি বাচ্চা যে খাইয়ে দেব।

রাতুল---- দিবি না তো,,,, তাহলে তুই ও আমার সাথে শুয়ে থাক।

অনু---- ছাড় আমি যাব,,,

রাতুল---- না ছাড়বো না,,,

দুজনে সময়, স্থান, ভুলে পাঁচ বছর আগের মতো ঝগড়ায় নিজেদের ব্যস্ত করে তুললো।

টিনাকে মহিধর ডিনারের জন্য অনেকক্ষন আগেই ডেকে গিয়েছিল। ও ভাবছিল রাতুল হয়তো দুপুরের মতো ওকে অনেক যত্ন করে নিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও যখন রাতুল এলো না তখন নিজেই কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে রাতুলের রুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, দেখলো দরজা খোলা আর রাতুলের বুকে লেপ্টে আছে অনু। কপট রাগে অনু রাতুলের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করছে আর তাতে রাতুল ওকে আরও গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরছে। এ দৃশ্য দেখে টিনার বুকের ভেতরে একটা ঝড় বয়ে গেলো। এই সুন্দর দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য ওর মনে পাহাড় সমান হিংসা তৈরি করছে। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু এক অদৃশ্য আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। দুচোখের জলকে মুছে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়নটিনা। মনে মনে অনুকে বলে " একদিন রাতুলের বুকে শুধু আমার অধিকার থাকবে সেই তখন তুমি এভাবেই চেয়ে দেখব,,,মিস অনু।"

❤❤ক্রমশ❤❤

সকাল সাতটা। ঘুম ঘুম চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে ওঠে অনুরাধা। বিছানা থেকে উঠে বিছানা গোছাতে গোছাতে রাতুলেট কথা মনে করে মনটা আনন্দে ভরে উঠছে অনুর,,,
"" ইস,,পাগল কেথাকার সারারাত ফোনে কথা বলে বলে আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল সাথে নিজেরও। কত দিন এভাবে কথা বলা হয় নি।" রাতের প্রতিটা কথা যেন এখন অনুর কানে বাজছে। কত কথাই হলো আজ, কত অজানা আবেগের দেয়া নেয়ার পর্ব চললো সারা রাত।  "
এ বাবা কত দেরী হয়ে গেলো!!" বলেই এসি টা অফ করে জামাকাপর নিয়ে তারাতাড়ি এটাস্ট বাথরুমে ডুকে গেলো অনুরাধা।

এ বাড়িতে অনুকে কাজ করতে বলে না কেউ।  তবে জ্যেঠা মশায়, জেঠীমা, দাদু আর সকলের জন্য রান্না করতে ওর ভীষণ পছন্দ। যদিও রান্না করাটা সবসময় হয়ে ওঠে না তবুও সময় পেলে রান্না ঘরে যাওয়াটা কোন ভাবেই মিস করে না অনু।
এত্তো বড় বাড়িতে অনুর সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ঠাকুর দালান। ওখানকার সব কাজ নিজ হাতে না করলে শান্তি পায় না সে। ঠাকুর মসাই সকাল বেলাই আসে তাই প্রতিদিন ছয় টায় উঠে মাধবীদির সাথে আগে ঠাকুর দালানের কাজটা, পুজোর সজটা কমপ্লিট  করে অনুরাধা। সেখানে আজ সাতটা বাজলো উঠতেই।

অনুরাধা ঠাকুর দালানে পৌঁছে দেখে পুরোহিত মসাই আসে নি। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো যেন অনু। মাধবী বাড়ির কাজের মেয়ে হলেও অনুর খুব কাছের।

অনু--- মাধবীদি,, ঠাকুর মশাই আসেনি দেখছি তুমি মন্দির টা ধুয়ে মুছে নাও আমি ফুল তুলে আনি। ঠিক আছে দিদিমনি তুমি আসতে আসতে আমার এদিক কার কাজ হয়ে যাবে। অনু ফুলের সাজিটা হাতে নিয়ে ফুলের বাগানের দিকে গেলো।
মাধবির বছর সাতেক হলো বিয়ে হয়েছে, বিয়ের এক বছর পর ওর বরের অসুস্থতা ধরা পরে ; হার্টের ভাল্ববে ফুটো থাকায় কোন শক্তির কাজ করতে পারে না। কত জায়গায় যে সাহায্যের জন্য হাত পেতেছে তার কোন হিসেব নেই। এমনি  একদিন রাস্তা থেকে তুলে এ বাড়িতে নিয়ে আসে অনু, আর রথিন বাবুকে বলে মাধবির বর নিতাই কে বাড়ির সব্জি বাগান দেখাশোনার কাজে লাগিয়েছে,  আর মাধবীকে বাড়ির কাজে। এখন বেশ ভালো আছে ওরা।

অনুর থেকে বছর দশেকের বড় হবে মাধবী কিন্তু ওর সাথে মাধবীর যেন একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে। মাধবীও খুব ভালোবাসে অনুরাধাকে। এ-ই তো সে, যে মাধবি আর নিতাইকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল আর নিতাইর চিকিৎসাও করিয়ে ছিলো। এমন কোমল মনের মানুষকে কি কেউ ভালো না বেসে থাকতে পারে। নিজের অজান্তেই তৃপ্তির একটা হাসি ফুটে ওঠে মাধবীর মুখে।

অনুরাধা ফুল তুলতে তুলতে প্রতিদিনের মতো ভজন শুরু করলো,,,

অরুনওকান্তি কে গো, যোগি ভিখারি।
নিরবে এসে দাড়াইলে হেসে
প্রখর তেজ, তব নিহারিতে নারি,,,
অরুন ও কান্তি কে গো যোগি ভিখারি,,,,
রাস ও বিলাসিনি আমি আহিরীনি,,,,
,,,,,,,,,,,,,,,,,

অনুর গনের সুর ঘুমের মধ্যেও যেন ভিজিয়ে দিয়ে  যাচ্ছে রাতুলের মনকে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেরে বেলকোনিতে দাড়িয়ে সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যেতে লাগলো । ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও ভজন শোনার পর, মনের মধ্যে যে তীব্র এক পবিত্রতার স্বাদ জেগে ওঠে, তা থেকে অন্য সবার মতো রাতুলও নিজেকে আলাদা করতে পারে না। আজ অনুর কন্ঠে নজরুলের এই গানটির নির্ভূল সুর, সকালের স্নিগ্ধতায় আরও সতেজতা এনে দিয়েছে যেন।

ভজন শেষে, ফুল তোলা হয়ে গেলে, অনু ঘুরে দাড়াতেই দেখলো তার খুব কাছে দাড়িয়ে আছে একজন অপরিচিত লোক। ভয়ে ছিটকে সরে এলো অনু।
কাম ডাউন, কাম ডাউন,,,,আম নট আ মনস্টার,,,,আই এম এ ম্যন,,,,,সো ডোন্ট ওরি,,,,বি কুল---- (আগন্তুক)

অনু ভালো করে দেখলো ওয়েস্টার্ন ছেঁড়া- ফাটা সেডেড জিন্স,,,ব্রান্ডেড লেদার জ্যকেট, সাদা সার্টে একটি বছর পঁচিশেকের ছেলে দাড়িয়ে আছে,,, ছেলেটি প্রায় ছ'ফুট লম্বা দুদিকের চুল ছোট করে মাঝখানের চুল গুলো ঝুটি বাঁধা, পিঠে বিশাল একটা ব্যাগ আর হাতে অ্যপেল কোম্পানির একটি আই ফোন।
অনুর সব চেয়ে অবাক লাগলো ছেলেটির চোখ,,,,ছেলেটির চোখ গুলো যেন কোন শিল্পির নিখুঁত  আঁকা কোন শিল্প। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব লক্ষ্য করতে লাগলো অনু।

আগন্তুক ---- (অপলক দৃষ্টি তে অনুর দিকে চয়ে) আমাকে সত্যি করে বলুন তো, আপনি সোজা ইন্দ্রসভা থেকে পালিয়ে আসেন নি তো?

অনু----(রেগে,) মানে?? আর কে আপনি?? এভাবে বাড়ির ভিতরে ডুকে পরছেন। দরোয়ান কাকা ; দারোয়ান কাকা,,,,,

আগন্তুক----হেই বিউটিফুল লেডি স্টপ সাউটিং,,,,,,

অনুর চিৎকার শুনে বেলকোনিতে চোখ বন্ধ করে ধ্যানস্থ রাতুল বাস্তবে ফিরে এলো। তৎক্ষনাৎ সে নিচে তাকিয়ে দেখলো অনুর সামনে একজন অপরিচিত লোক দাড়িয়ে আছে। মুহুর্তেই বাগানের দিকে ছুটে চলে রাতুল। রাতুল যখন আগন্তুকের সামনে পৌঁছে ততক্ষণে টিনাও বেড়িয়ে এসেছে এবং আগন্তুকের সামনে দাড়িয়েছে।

টিনা---- হেই,,,,অরি,,,, ওয়েলকাম ব্রো,,,,আই এম হ্যপি টু সি ইউ,,,,

অনু-----( একটু আসস্থ হয়ে) ওহ,,,টিনাদি ভাই তুমি এনাকে চেনো?

টিনা----( একটা বাঁকা হাসি হেঁসে) ইয়েস অনু।  তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেই,,,,এ হলো আমার বন্ধু প্লাস কাজিন অরিন্দম। একজন বিখ্যাত পেইন্টার। আর অরি এ হলো অনু,,,,রাতুলের বন্ধু আর মেই বি এ বাড়ির আশ্রিতা।

রাতুল এতোক্ষণ একটু দুরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনলেও টিনার শেষ কথাটা রাতুলের বুকে শেলের মতো আঘাত হানে। এ বাড়ির কেউই কখন অনুকে আশ্রিতা ভাববার কারণ খুঁজে পায় নি। তখন আজ এক জন বাইরের মেয়ের মুখে এই কথাটি অনুর মনে কি পরিমাণ কষ্ট দিতে পারে তা অন্তত রাতুলের অজানা নয়। রাতুল সামনে এগিয়ে এসে অনুর পাশে দাঁড়ায় লজ্জায়, অপমানে অনু ততক্ষণে মুখটা নামিয়ে নিয়েছে।

রাতুল অনুর হাতটা একটু আলগা করে চেপে ধরে।সে টিনাকে উচিত জবাব দেয়ার জন্য মুখটা তোলে। কিন্তু ততক্ষণে অরিন্দম বলে ওঠে,,,,

অরিন্দম ---- ডোন্ট বি সো মিন টিনা। জাস্ট লুক এ্যট হার। সি ইজ আ এঞ্জেল। তোর কি মনে হয় এ কারও আশ্রিতা হতে পারে?

রাতুল---- (কঠিন দৃষ্টিতে টিনার দিকে তাকিয়ে)  টিনা আজ পর্যন্ত এ বাড়ির কেউই অনুকে এ ধরনের কথা বলতে সাহস পায় নি। তোমার এ কথা বলার কোন কারন তো খুঁজে পেলাম না।

টিনা---- রাতুলের উপস্থিতি প্রথমে না বুঝেই এ রকম কথা বলেছে। রাতুল থাকলে হয়তো বলতো না। এখন এই পরিস্থিতিতে ও শুধু অনুর দিকে তাকিয়ে বললো- "সরি অনু,, আমি বুঝতে পারিনি যে সত্যটা তোমাকে কেউ কখন বলে নি।"

রাতুল টিনার এ কথায় আরও রেগে যাচ্ছে বুঝে অনু সবটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলো---
"" না না টিনা দিভাই আসলে জ্যেঠা মশাই কখন এ রকম বুঝতেই দেয় নি তো তাই।  আর তা ছাড়া রক্তের সম্পর্কের চেয়ে স্নেহের সম্পর্ক সব সময় বড় হয় তা তো তুমি জানোই। এই দেখো না যেমন জ্যেঠা মশায় রাতুলদার থেকে আমাকে বেশি ভালোবাসে।"' বলেই তার নির্মল চোখ দুটোতে কষ্ট চেপে রাতুলের দিকে চাইলো।
অনুরাধার এ দৃষ্টি রাতুলের বুকের ভিতরের ঝড়টাকে উসকে দিল যেন। সে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো ---

হাই,,,অরিন্দম মিট মাই লাইফ, মাই হার্ট অনুরাধা। উই আর অল রেডি হাফ মে,,,,,
অনুরাধা থামিয়ে দেয় রাতুলকে।" তোমরা কি এখানেই দাড়িয়ে থাকবে না ভিতরে যাবে। অরিন্দমবাবু কোন সকালে এসেছেন তার থাকার ঘর ঠিক করতে হবে। টিনাদিভাই ওনাকে নিয়ে ভিতরে চলো।

অরিন্দম ----( ইম্প্রেসিভ,,,, তুমি যতটা সুন্দর ঠিক ততটাই বুদ্ধিমতি, মিস অনুরাধা। রাতুল ইজ ভেরি লাকি। কিন্তু রাতুল আর ওর কথা শুনে আমার খারাপ লাগছে কেন? -- মনে মনে)

টিনা ছলছল চোখে অরিন্দমকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলো। রাতুলও রেগে হনহন করে চলে গেলো। অনুরাধা কাজের লোককে ডেকে অরিন্দমের জন্য টিনার পাশের ঘরটা পরিস্কার করে দিতে এবং ব্রেকফাস্ট দেওয়ার কথা বললো।

মন্দিরে পুজো সেরে অনু যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে  লাইব্রেরীর সামনে হঠাৎ ই কেউ তার হাত টেনে ভিতরে নিয়ে গেলো। অনু এ তাৎক্ষনিকতায় ভয় পেয়ে চিৎকার করতে গেলে তার মুখও চেপে ধরে। চোখ বন্ধ করে নেয় অনু। কিন্তু একটা চেনা স্পর্শ,  চেনা গন্ধ তার মনের সমস্ত ভয়কে মিলিয়ে দিল। হাতটা আস্তে আস্তে অনুর পিঠে খেলে বেড়াতে লাগলো। গরম নিঃস্বাসের আঁচ ধীরে -ধীরে গাঢ় হতে লাগলো। দুটি ঠোঁট সযত্নে নেমে এলো বাঁ দিকের কাঁধে আদরে আদরে সিক্ত করতে লাগলো কপল, কপাল, কন্ঠ, কাঁধ এ এক আদরের ভেলায় ভেসে যেতে লাগলো অনু। এবার রাতুল দুহাতে অনুর মুখটা ধরে,,,,

রাতুল---- চোখ খুলবি না।

অনুর চোখে তখন আনন্দের ধারা বয়ে চলেছে,,,,

রাতুল অনুর মেদ হীন শরীরটাকে নিজের সাথে মিশিয়ে  নিয়ে  কানের কাছে"" চোখ খোল সোনা"

অনু---(- মাথা নাড়িয়ে)  না,,,, আ,,,,আমার লজ্জা করছে।

রাতুল আলতো করে কামড় দেয় অনুর গলায়,,,"এবার তো খোল। "

এবার চোখ খোলে অনু,,,, রাতুল অপলক ঘোর লাগা চোখে চেয়ে আছে অনুর দিকে। একই দৃষ্টিতে হারিয়ে যাচ্ছে অনুও। দুটি অবুঝ হৃদয় আবার ডুবে যাচ্ছে ভালোবাসার নেশায়। এক জোড়া ঠোঁট খুঁজে নিচ্ছে আর এক জোড়া ঠোঁটের ঠিকানা। এক হচ্ছে দুটি মনের কিছু না বলা কথার সাথে কিছু পাগল করা স্পর্শ।  যে স্পর্শে লোভ নেই, পাওয়া নেই, আছে শুধু ভালো লাগা আর ভালোবাসা। নিজেকে হারিয়ে কাউকে পাওয়া।


রাতুল---- তখন বলতে দিলি না কেন,,, যে আমরা অর্ধেক বিবাহিত। সিঁদুর দান পাঁচ বছর চার মাস আগে হয়ে গিয়েছে। তুই এ বাড়ির বৌ।(আরও শক্ত করে জড়িয়ে),,,, বল?

অনু---- অর্ধেক বিয়ের কথা কেউ বলে বুঝি?

রাতুল---- অরিন্দম তোকে যে ভাবে দেখছিল আমার একদম ভালোলাগে নি।

অনু---- তাই? আবার শুরু হলো তোমার পাগলামি।

রাতুল ---- আমি তোর জন্য সব সময় পাগল।


❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

অনু----- এই যে মিস্টার পাগল, আমাকে ছাড়ুন। আমি অফিসে যাব।

রাতুল---- না তুই কোথাও যাবি না। আজ সারাদিন আমার বুকে চুপটি করে শুয়ে থাকবি, আর আমি তোকে আদর করবো।

অনু---- কি,,,!!!! রয় এন্ড রয় ফ্যাশান কোম্পানির সাথে ফাইনাল কনট্রাক্টের কাল প্রেজেন্টেশন ।  সব রেডি হলেও আমার কো-ডিজাইনার প্লাস এম্পলয়িদের সাথে মিটিং আজ করতেই হবে। নইলে এ কনট্রাক্ট টা পাওয়া যাবে না, খুব বড় লস হয়ে যাবে আমাদের।

রাতুল অবাক হয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে আছে। এ কয়েক বছরে কত বড় হয়েছে অনু, তার মুখে লাভ, লস,  মিটিং আরও কত কি। এ অনু কেমন অচেনা রাতুলের কাছে।"" আগের অনু তো রাতুলকে পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যেত। রাতুলের ছোট ছোট পছন্দের জন্য নিজে সব কষ্ট সহ্য করতে পারতো। তবে আজ এতো দিন পর রাতুল পাশে থাকার পরও; কেমন করে অফিস যেতে পারে সে? তবে কি অনু রাতুলকে আগের মতো ভালোবাসে না!!"" এমনি হাজারো চিন্তা রাতুলের মাথায় ভর করে।

রাতুলের মনের কথা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে অনু। সারাজীবনের অনুর প্রতি তার চরম অধিকারবোধ। এর এক চুল পরিবর্তনও সহ্য করে না সে। মনেমনে একটু অবাকই হলো অনু এই পাঁচ বছর পরও রাতুল যেন ঠিক সেখানেই দাড়িয়ে আছে যেখান থেকে শেষ হয়েছিল।"

রাতুল অনুকে ছেড়ে দিয়ে,,, সন্দেহের স্বরে,,,অনু তুই কি এখনো আমায় আগের মতোই ভালোবাসিস?

অনু জানে এখন রাতুলের মনে অনেক অবাঞ্ছিত ভাবনার উদয় হয়েছে। তাকে ঠিক আগের মতোই সামলাতে হবে। আগে অনুও অবুঝ ছিল। প্রথম প্রথম রাতুলের এই পাগলামি গুলোকে ভয় পেত, তবুও কোন অজানা কারণে এগুলোকেই ভালোবাসতো আর ঠিক সামলে নিত সবসময় । এখনও ভালোবাসে, আর এই পাগলামি গুলোকেই হয়তো এ কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি মিস করেছে অনু। মুখে বললো,,,
"" না আগের মতো ভালোবাসি না তোমাকে""

অনুর কথায় রাতুলের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে। করুন চোখে তাকায় অনুর দিকে।

অনু হেসে রাতুলের মুখ খানি ধরে বললো"" আগের থেকেও বেশি, অনেক বেশি ভালোবাসি আমার এই পাগলটা কে। তবে আমার ডাক্তার বরের জন্য তো মোটামুটি যোগ্য বৌ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে, নইলে লোকে আমার বরকেই বোকা বলবে।""

রাতুল একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনুকে জড়িয়ে, ওর কাঁধে মাথা রেখে ,,," যাবিই যখন, তবে চল আমিও যাব তোর সাথে।"

অনু অবাক হয়ে ""তুমি,,"

রাতুল---- হ্যা,,, কেন যেতে পারি না?

অনু--- না না আমি তা বলছি না।  তুমি না কাল বললে টিনা দিকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে।

রাতুল---- হ্যা যেতামই তো। কিন্তু আজ তোকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। আমি প্রতিটা সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা তোকে নিয়ে তোর সাথে থাকতে চাই।

অনু---- এই যে কদিন পর ইংল্যান্ড চলে যাবে,,, সে বেলায়? তখন কি থাকবো আমি? সেই তো আমাকে রেখেই চলে যাবে।

রাতুল---- জানি না কি হবে। এবার তোর থেকে আলাদা হলে হয়তো মরেই যাব আমি।

অনু রাতুলের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে,,," কি সব আজেবাজে বকছো।" (রাতুলকে শক্ত করে জরিয়ে বুকে মাথা রেখে) কিচ্ছু হবে না তোমার। আমাদের ভালোবাসা সব পরীক্ষায় সফল ভাবে উত্তীর্ণ হবে দেখো তুমি। এবার জ্যেঠা মশাইও কোন আপত্তি করবে না। তিনিও আমাদের ভালোবাসাকে মন থেকে মেনে নেবে।

রাতুল---- না নিলেও আর কে মানবে? তোকে নিয়ে চলে যাব আমি।

অনু---- (  চিন্তিত মুখে) হুম,,, দেরী হয়ে যাচ্ছে চল যাবে যখন রেডি হয়ে নাও।

টিনার ঘরে অরিন্দম ও টিনা

টিনা মন খারাপ করে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে,,,,,অরিন্দম  সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে অনুর সরল মুখ, তেজোদিপ্ত চোখ, নিখুঁত দেহ পল্লবি কে কোন ভাবেই মনের আড়াল করতে না পেরে , মনের সাথে যুদ্ধ করা বন্ধ করে ; কিছুক্ষণ আগের সময় টুকুকে বার বার রিপিট করতে লাগলো মনে মনে।
এ বাড়ির সদর দরজায় অরিন্দম এর প্রথম প্রবেশ, ভজনের সুমধুর সুর, গাইকাকে দেখার কৌতুহল,  অবশেষে একজন অসামান্য মেয়ের দিব্য রুপের প্রকাশ। তার বুদ্ধি, তাৎক্ষনিকতা, সব মিলিয়ে অরিন্দমের ঘোর কোন ভাবেই যেন কাটছে না।

এই মুহুর্তেই ছবি আঁকতে হবে তাকে। হাতটা নিসপিস করছে। কিন্তু ওই চোখ জোড়া যেন এখনো তাকিয়ে আছে রাতুলের তৃতীয় নয়নের দিকে, তার দৃষ্টি থেকে যেন এক চুলও নড়ার শক্তি নেই। ও চোখ গুলোর এতো জ্যোতি রাতুলের নিজেকে বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে।

অরিন্দম,,,, এই অরিন্দম কি হলো?  তুই ঠিক আছিস তো।---- টিনা

অরিন্দম চমকে উঠে,,,, ""কে,,,,কে,,,""একটু শান্ত হয়ে,,,"""ও তুই"'

টিনা---- কি হয়েছে?

অরি---- ক্লিন বোল্ট,,,

টিনা---- মানে,,,,,

অরি----- আর মানে খুঁজিস না কারণ আমি নিজেও জানি না। 
থ্যাংকস এতো সুন্দর একটা জায়গা দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। এবার আসল কথাটা বলে ফেলো তো, মাই ডিয়ার সিস।

টিনা কুয়াশা ঘেরা ধুসর দৃষ্টিতে অরিন্দম এর দিকে তাকিয়ে,,,, তুই কি সত্যি বিশ্বাস করিস যে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষ কে ভালোবাসার জন্য সব কষ্ট কে স্বীকার করে নিতে পারে??

অরি---- পারেই তো,,, তুই এতোদিন নভেল, গল্পে কি পড়েছিস? না কি ডাক্তার হবি বলে সাহিত্যের ধারের কাছেই যাস নি।

টিনা---- পড়েছিলাম রে তবে বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম সব কেতাবী কথা। আমার সাথে যখন অনুপম এর সম্পর্ক ছিল, আর যখন ভেঙে গেলো তার মধ্যে সেরকম কোন পার্থক্য খুঁজে পাই নি। তার পর তুই তো সবই জানিস মৃণাল,  পঙ্কজ, রাহুল এদের সবার সাথে এক এক করে সর্বোচ্চ মাসখানেক করে টিকেছিল লাভ স্টোরি, ও সরি, আই ক্যন কল দেম গেম স্টোরি। এক একটা সম্পর্ক যখন ভেঙে যেত নিজেকে মনে হতো সদ্য বন্ধন মুক্ত পাখি। যেখানে খুশি উড়ে যেতে কোন বাঁধা নেই। মনে হতো সত্যি কারের স্বাধীন। এই স্বাদটাকে অনুভব করার জন্যই যখন যাকে ভালো লাগতো কিংবা যার আমাকে ভালো লাগতো সবার সাথেই সম্পর্কে জরিয়েছি আমি। আর ঠিক ততটাই দ্রুত সম্পর্ক ভেঙেছি।
তবে আজ যখন রাতুল আর অনু নামের ঐ মেয়েটির মধ্যে ভালোবাসার আসল রুপ দেখছি তখন নিজেও মনেমনে ওদের মতো ভালোবাসার পরিপূর্ণ রুপ দেখার জন্য,অনুভব করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছি। অনু আর রাতুলকে যতই এক সাথে দেখছি, ততই আমার মনেও রাতুলের প্রতি তেমনি আবেগ লক্ষ্য করছি।

অরি---- ইউ মিন টু সে,,, তুই রাতুলকে ভালোবাসিস?

টিনা---- জানি না, আমি ঠিক জানি না। তবে রাতুল যখন প্রথম আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল, তখন আমার খুব রাগ হয়েছিল। ভেবেছিলাম কোন গরীব লোকের ছেলে টাকার অভাবে পড়তে পাচ্ছে না, তাই বাপি আমাদের বাড়িতে এনে রেখেছে।
রাতুলের চেহারায় বা আচরণে  গরীব সূলভ কোন ব্যবহার দেখতে না পেয়ে এক প্রকার রাগেই, একদিন আমি রাতুলের সাথে খুব রুড বিহেব করি; সেই দিন বাপি আমাকে থামায়, ওর সম্পর্কে সব কথা বলে। এও বলে যে বাপি আজ এতোবড় প্রতিষ্ঠ বিজনেস ম্যন হয়েছে শুধু রাতুলের দাদুর কৃপায়। আর ওরা ইচ্ছে করলে  আমাদের মত কয়েক শো বিজনেস ম্যন কে কিনে নিতে পারেন।
বাপির কথা শুনে আমার রাতুলের প্রতি কৌতুহল সৃষ্টি হয়। আমি তখন রাতুলের সাথে এক প্রকার জোর করেই বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করি কিন্তু সব কিছুতেই ওর অমনোযোগীতা, শূন্য দৃষ্টি,  আমার প্রতি অনাগ্রহ সব মিলিয়ে ও আমার কাছে দুর্বোদ্ধ হয়ে ওঠে। আমি রাতুলের নাম দেই পাজল ম্যন। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল জানিস।

অরি---- (চিন্তিত মুখে একটু নড়ে বসে) তারপর কি সমস্যা হলো?

টিনা---- (একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে,,,) রাতুল যখন বাড়ি আসবে তখন ওর আলোকোজ্জ্বল মুখ দেখে আমিও খুশি হয়েছিলাম।  রাতুলকে বললাম আমিও আসবো।রাতুল রাজি ও হলো।
এখানে এসে রাতুলের আমূল-পরিবর্তিত রুপ আমাকে ওর দিকে আরও কঠিন ভাবে টানতে লাগলো। তারপর অনু মেয়েটার সাথে পরিচয় হলো।
তখন বুঝতে পারলাম যে রাতুলের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে সে তো একটা শরীর মাত্র। রাতুলের আত্না যে এ বাড়িতেই রেখে গেছে। ততদিনে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে রাতুলকে ভালোবেসেছি। এবার তুই বল আমি কিভাবে রাতুল ছাড়া বেঁচে থাকবো। রাতুলকে পাব না এ কথা ভাবতেই আমার সমস্ত পৃথিবীটা শূন্য মনে হয়, জীবনটা অর্থহীন মনে হয়।

অরি ----( টিনার মাথায় হাত দিয়ে চিন্তিত স্বরে) এ কি করেছিস তুই? সকালে যতোটুকু দেখলাম তাতে রাতুলকে তোর পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

টিনা---- এ কথা বলিস না তুই।  তুই আমার একমাত্র আশা। তুই তো মূহুর্তের মধ্যেই যে কোন মেয়েকে পটিয়ে নিস। ঠিক সেই ভাবে এই অনুকে পটিয়ে নে না। জানি তুই এক মেয়েকে নিয়ে দু- তিন মাসের বেশি কাটাতে পছন্দ করিস না।  তাতেই চলবে। শুধু একবার রাতুলের সামনে অনুকে দুশ্চরিত্রা প্রমান করলেই আমার রাস্তা ফাঁকা।

অরি---- টিনা ওই মেয়েটার সাথে এতোবড় অন্যায় করাটা কি ঠিক হবে? ওর তো কোন দোষ নেই।

টিনা---- ওর দোষ আছে। ওর সবচেয়ে বড় দোষ একজন আশ্রিতা হয়ে বাড়ির ছেলের দিকে হাত বাড়ানো,,,,,

❤❤❤ক্রমশ❤❤❤

কি ভাবছেন, কি হতে পারে অনুর ভাগ্যে,,,আপনাদের কি মনে হয়, টিনার প্রস্তাব মেনে নেবে অরিন্দম?? না কি অন্য কিছু হবে,,,,,,মতামত জানাতে ভুলবেন না।

রাতুল সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ওর চোখ অনুতে আর অনুর চোখ রাতুলে মিলিত হয়েছে।
অনুকে দেখে রাতুল মনে মনে বলে ওঠে,,,

ও গো নীল বসনা,
আকাশকে নিঃস্ব করে
ও রুপ দিয়েছে কে তোমায়
আঁচল ভরিয়া?

চাঁদ কি আজ ক্লান্ত?
তাই তোমায় দিয়েছে আলো।
স্নিগ্ধ চন্দ্রিকায় মুগ্ধ হয়ে
তাই মন হারালো এই পান্থ।

এই যে এতো কি ভাবছো শুনি,,,,,(হাত নেড়ে রাতুলকে বাস্তবে নিয়ে এলো অনুরাধা)
একটা হালকা নীল রংয়ের শাড়ী, গাঢ় নীল রং য়ের ব্লাউজ,  সরু চেনের সাথে নীল রঙের পাথরের পেনডেন্ট, বা হাতে নীল চুরি,  ডান হাতে একটা কালো ঘড়ি। হলকা মেকাপ, চোখে হালকা কাজল, আর লাল - মেরুনের কম্বিনেশনে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। সব মিলিয়ে অনুকে কোন অপ্সরার থেকে কম লাগছে না। অনুর এ ভুবন মোহিনী রুপ; রাতুলের মনে যতটা আনন্দ দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি হারানোর ভয় পাচ্ছে।

ভালোবাসাকে হারানোর ভয় হয়তো সবচেয়ে বড় ভয়।  এটা তার কাছে বড়ই প্রকট, যে একবার তার প্রানের সাথী কে হারিয়ে ফিরে পেয়েছে । রাতুলের ও আজ একই অবস্থা। ওর হারিয়ে পাওয়া হৃদয়েশ্বরী কে, সে আর হারাতে চায় না। 

অনু আজ রাতুলের জন্য মেচিং ড্রেস বের করে দিয়েছে। রাতুল আজ সাদা সার্ট, নীল ব্লেজার ও নীল প্যন্ট পরেছে তার দিব্য কান্তি রুপ যে কোন দেবতা কেও লজ্জিত করে দিতে পারে। রাতুলের প্রত্যেকটি অঙ্গ ভঙ্গি সয়ং কামদেবের দারা নিয়ন্ত্রিত মনে হচ্ছে, তবুও তার অবুঝ মন নিজের দিকে না তাকিয়ে, শুধু অনুতে কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে।

অনু রাতুলের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরে কয়েকটা বিট হয়তো মিস করে ফেললো। এবার সে রাতুলের কাছে এসে নিজের চোখ থেকে একটু কাজল নিয়ে রাতুলের কানের পিছনে লাগিয়ে দিল।

রাতুল---- এটা কি হলো?

অনু---- তোমাকে দেখে যাতে কোন পেত্নী নজর দিতে না পারে তাই কালো টিকা লাগিয়ে দিলাম।

রাতুল---- আমার তো হলো এবার তোর দিকে যদি কোন ভূত তাকায় তার কি হবে?

অনু----- আমার দিকে!!! আজ প্রায় ডের বছর হলো অফিসে যাচ্ছি কেউই  কোন দিন তাকিয়েছে বলে মনে হয় না।

রাতুল ----আজ তাকাবে। তাই তোকেও ভূত তাড়ানোর জন্য প্রটেকশন নিতে হবে।

অনু ----তাই!!! তো কি সেটা?

রাতুল গটগট করে চললো অনুর ঘরের দিকে, অনুও অবাক হয়ে চললো পিছনে পিছনে। ঘরে পৌঁছে ড্রেসিং টেবিলের উপরে কিছু খুঁজতে লাগলো।

অনু--- কি খুঁজছো বলোতো?

রাতুন তৎক্ষনাৎ অনুর হাতটা ধরে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে হেসে বলে ,,,"" খুজছিলাম,,, একটু নির্জনতা""

অনু লজ্জায় লাল হয়ে,,,আধো চোখে রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে,,,তুমি একটা,,,, তুমি একটা,,,,,

রাতুল---- আমি কি?

অনু ---- একটা পাজি।

রাতুল---- হলাম নাহয় পাজি,,,তোর জন্যই তো । কেন এরকম সাজগোজ করলি?
অনু---- আমি!! আমি তো,,,
(আর কোন কিছু বলার আগেই রাতুল অনুর ঠোঁট আক্রমণ করলো,,,, অনুর স্টবেরী নির্জাসের লিপস্টিক মাখা নরম ঠোঁট, মমের মতো মিলিয়ে যেতে লাগলো রাতুনের মুখে। জিভের ঈষৎ ঘর্ষণ, দুটি শরীরের ধৈর্যের বাঁধকে বার বার প্রবল ধাক্কায় ছিন্ন করতে চাইলো। ভাসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো আজ শরীরের সুখ সাগরে। একই তালে নেচে ওঠছিলো দুইটি মন। নিঃসংকোচে একে অন্যের শরীরে খুজতে শুরু করেছিল অদৃশ্য রত্ন ভান্ডার। কিন্তু দরজায় একটি আওয়াজ!! এই উন্মত্ততায় লাগাম দিল। শরীরের সুখ নিতে, হারিয়ে যাওয়া দুটি হৃদয় বাস্তবতায় ফিরে এলো।

"ছোটি মেম সাহাব হাম রেডি হ্যয়, আপ কেহে রাহি থি কি আপকো জলদি যানা হে, "---- রাম সিং

রাতুলের এলোপাথারি চুম্বনে সিক্ত শরীরে আর দারিয়ে থাকতে পারলোনা অনু।  রেশম কাপরের মতো লুটিয়ে পরলো বিছানায়। ধাতস্থ হতে সময় লাগবে তার।
রাতুলও নিজেকে ছরিয়ে দিল সোফায়। একটু দুর থেকে অনুকে দেখতে লাগলো ও। কিছুক্ষণ আগের কথা ভেবে ভেবে মনেমনে খুশি হলো। আজ অনু তার ছোঁয়ায় সারা দিয়েছে।  অন্য দিনের মতো নিজেই শুধু আদর নেয় নি, ফিরিয়েও দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। আর অনুকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে  না তার।

অনু--- রাম সিং, তুমি যাও আমি আসছি।

রাম সিং ---- জি,,, মেম সাহাব।

অনু উঠে নিজের কাপড় ঠিক করতে করতে লজ্জায় লাল হওয়া মুখে, আদরে ক্ষত মাখা ঠোঁটে, বলে উঠলো "" চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে। "

রাতুল অনুর রক্তিম আভা যুক্ত মুখ দেখে আবার চুম্বকের মতো অনুর দিকে ধাবিত হলো।
অনু রাতুলের মনোভাব বুঝতে পেরে, রাতুল ওর কাছে আসার আগেই ঘর থেকে দৌরে চলে গেলো।
অনুর এ অবস্থা দেখে রাতুল জোরে জোরে হাসতে লাগলো।

মৃনালিনী দেবী নিচের ড্রইংরুমে বসে আছেন। হাতে সকালের খবরের কাগজ। সকালে রাতুল বলেছিল ও ওর বাবার অফিস যাবে। তাই ছেলের এ রুপ তিনি একবার দুচোখ ভরে দেখতে চান।
রাতুল কে যেদিন ওর বাবা শহরের কলেজে পড়তে পাঠায় সে দিন তার তেমন কোন কষ্ট হয় নি। কিন্তু যখন শুনলেন যে অনুর কাছ থেকে দুরে থাকার জন্য তাকে পড়াশুনার মধ্যে বাড়িতে নিয়ে আসবেন না। তখন খুব খারাপ লাগে । তবুও অনুকে কিছুই বলতে পারেন নি তিনি। অনুযে অমলা ঠাকুরঝির মেয়ে।

বিয়ের প্রথম দিনই রথিনের ব্যবহারে প্রকাশ পায় এ বিয়েতে তার মোটেও সম্মতি নেই। রমাপ্রসাদ বাবু হয়তো জোর করেই তার বন্ধুর মেয়েকে ছেলের ঘাড়ে ঝুলিয়েছেন। বিয়ের কত নিয়ম যে বাদ দিতে হয়েছে রথিনের জেদের জন্য। রথিন তখন সদ্য বিদেশ ফেরত ইন্জিনিয়ার। কলকাতায় কত বড় বড় চাকুরির অফার।
কিন্তু মৃনালিনী দেবির যে রথিনের সাথে বিয়ে হয়েছিলো, তার এতে কোন ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। সে দিন রাত মদে ডুবে নিজেকে শেষ করার চেষ্টায় রত।
বাসর রাতে নেশায় চুর হয়ে নতুন বৌকে সিনেমার ডায়লগ এর মতো বলেছিলেন"" যখন  বড় বাড়ির বৌ হওয়ার সখ হয়েছে, তাই থেকো, আমার কাছাকাছি যেন না দেখি। আর হ্যা,,, আমি আমার ঘরে শোব, তুমি এ ঘরেই শোবে।""অবাক হয়ছিলেন মৃনালিনী একুশ বছরের ছোট্ট জীবনে এরকম কত গল্প পড়েছেন তিনি বইয়ের পাতায়। আজ সেই গল্প নিজের জীবনে ঘটতে দেখছেন তিনি। 
এর কি প্রতিকার? তার কি দোষ? এরকম কিছুই বলতে পারেন নি তিনি। শুধু হাজারও প্রশ্ন নিয়ে চোখ দুটো স্থির করেছিনের রথিন বাবুর নেশায় জড়ানো আধ বোজা চোখের দিকে। মুহুর্তেই ছিটকে ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল রথিন।

এবাবেই কেটে গিয়েছিল কয়েকটা মাস। তারপর একদিন মৃন্ময়ির অন্ধকার  জীবনে আলোর দূতের মতো আগমন ঘটেছিলো অমলার। একদিন এ বাড়িতে তার অগাধ বিচরণ থাকলেও, আজ সে কারও ঘরের গৃহিণী।  কি তেজোদৃপ্ত  তার চেহারা। এ যেন মা লক্ষীর মানুষি রুপ।
রথিনও তাকিয়ে ছিল নির্নিমেষে, অমলাকে দেখে যেনো তার বাহ্যিক জ্ঞান লুপ্ত হয়েছে। তৃষ্ণাত্বর মতো কাতর নয়নে অমলাকে এক দৃষ্টিতে পান করছিলেন তিনি।

""এ মা,,,এ আমাদের বৌমনি বুঝি? কি সুন্দর গো তুমি? আমি তোমার এক ননদ আর আজ থেকে সইও।"" অমলা এসে হাতখানি ধরেছিল মৃনালিনীর।

মৃনালিনী বাড়িতে সজ্জাশায়ী শাশুড়ী মায়ের কাছে শুনেছিলেন অমলা আর রথিন বাবুর কথা। আজ অমলাকে সামনে দেখে সত্যই রথিন বাবুর জন্য করুনা হতে লাগলো তার। এ অন্যন্যা রমনিকে সহধর্মিণী না করতে পারার ব্যথা সত্যিই অসহনীয়।

তবে অমলা ও রথিন স্বযত্নেই একে অন্যকে এরিয়ে যাচ্ছিল। কখন সামনা সামনি হলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল একে অন্যর দিক থেকে। এ যে কতটা জোর করে, কতটা অনিচ্ছায় তাদের মুখের আকুলতা তা প্রকাশ করতো।

ধীরে ধীরে মৃনালিনীর সাথে গভীর সখ্যতা হয় অমলার। আর মৃনালিনী ও রথিনের সম্পর্কের সত্যতাও সামনে আসে। নিজেকে অপরাধীর আসনে আবিস্কার করে অমলা। সে ও তো এখনো ভালোবাসে রথিন কে, তবে সে ভালোবাসা ভগবানের সাথে ভক্তের, মেঘের সাথে চাতকের। সেই জন্য কি তার ভগবান এত বড় পাপ করছে?  শুধু তার জন্য কেন হবে একটি ফুলের মতো মেয়ের জীবন নষ্ট? সেদিন মৃনালিনীকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন অমলা। বলছিল " আমায় একটু সময় দাও বৌমনি সব ঠিক করে দিব। ""

রাত্রে বৌ সাজিয়ে নিজেই রথিনের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল মৃনালিনীকে অমলা । রথিনকে বজ্রকন্ঠে বলে ছিল।
"" রথিদা ভালোবেসে ছিলাম তোমাকে, আমাদের ভালোবাসা ছিলে শিশুর মতো সুদ্ধ, ছিলো নিষ্কলুষ। আজ এই মেয়েটার সাথে তুমি যা করে চলেছো তাতে তুমি আমার ভালোবাসাকে কলঙ্কিত করছো। যদি এক দিন ও আমায় মন থেকে ভালোবেসে থাকো তবে বৌমনির চোখ থেকে জল যেন না পরে।
এর অনথা হলে আমি আত্মঘাতী হব এই বলে দিলাম তোমাকে।""
শশব্দে একটা চর পড়েছিলো অমলার গালে। তারপর হাত ধরে হিরহির করে বাইরে বেড় করে দিয়ে দরজা আটকিয়ে দিয়েছিল রথিন। মৃনালিনী কে জরিয়ে ধরে শিশুর মতো কেঁদেছিলেন।

পরদিন অমলা চলে গিয়েছিল, আর রথিন বাবুর সাথে মৃনালিনী দেবীর সম্পর্ক আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়েছিল। জন্ম হয়েছিল রাতুলের।
তবুও মৃনালিনীর মনে কোথাও অমলার অতৃপ্ত আশার প্রতিধ্বনি, রথিনের মনে  অমলাকে ভুলতে না চাওয়ার দৃঢ়তা, এসব কুঁড়ে, কুঁড়ে খায়।কখন ভুলতে পারে না তার সংসার অমলার করুনা মাত্র।  এ সব কিছুই ভুলতে তার স্বইচ্ছায় ঘর বন্দি। বইয়ের রাজ্যে নিজের মনের অবাধ বিচরণ।

অমলার মেয়ে অনু যেন অমলারই প্রতিচ্ছবি। অমলার মৃত্যুর তিনমাস আগে ওর বর শিবেনের মৃত্যু হয়, একটা এক্সিডেন্টে। অনুকে প্রসব করতে গিয়ে মারা যায় অমলাও। হাসপাতালে রথিনের হাতে তুলে দেয় তার সদ্যজাত মেয়ে কে। সেই থেকে অনু এ বাড়ির একজন। অনু বড় হতে হতে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব  ইচ্ছা করে তুলে দেয় অনুর হাতে। অমলার বড় সাধ ছিল এ বাড়ির গিন্নি হওয়ার, তবে সে না হলেও তার মেয়ে হোক এ সংসারের লক্ষী। রাতুলটাও ছোট থেকে অনুরাধা কে চোখে হারায়, ঠিক ওর বাবা যতটা ভালোবাসতো অমলাকে।

অনু ওর ঘরের দিক থেকে দৌরে এসে মৃনালিনী দেবীর সামনে এসে দাড়ায়।

মৃনালিনী ---- কি রে এমন ছোটাছুটি করছিস কেন?

❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤
রাতুল আর অনু দুজনে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলো। বেলকোনিতে দারিয়ে অরিন্দমের ওদের পারফেক্ট কাপল লুক একদৃষ্টিতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন মেড ফর ইচ আদার। কিন্তু টিনা যেভাবে এদের মধ্যে ডুকতে চাইছে তাতে এরা কি শেষ পর্যন্ত এভাবে থাকতে পারে? এ রকমই অনেক কথা মনে হচ্ছে রাতুলের।
সকালে অনু কে দেখার পর যে ঘোর লেগেছিল, এখন যেন তাই করুনায় পরিনত হয়েছে। ওই মেয়েটার সাথে এতোবড় অন্যায় করতে বিবেকে বাধছে অরিন্দমের।
  ছবিটা আঁকবে অরিন্দম ,  সকালের মুহুর্ত টাকে সারাজীবন ধরে রাখতে, ছবিটা আঁকবে ।
ক্লিপ বোর্ড, ক্যনভাস, পেন্সিল, রং সব এক এক করে ওর বিশাল সাইজের ব্যগটা থেকে বেড় করলো তার পর শুরু করলো ছবি আঁকা।

অরিন্দমের জন্ম কলকাতায় হলেও সে বড় হয় আমেরিকায়। বাবা-মায়ের দুই সন্তান এর মধ্যে ছোট ছেলে অরিন্দম। ছোট বেলা থেকেই আঁকার প্রতি নেশা অরিন্দমের। বড় হয়ে আমেরিকার বিখ্যাত কলেজে আঁকার উপরই পড়াশোনা করে। অরিন্দমের বর্তমানে এক অন্যরকম আঁকার প্রতি ঝোক হয়েছে। নগ্ন নারী শরীর, তার সাথে তাদের মানসিক অবস্থা। এ জন্যই সে প্রয়োজনে কোঠিতে যেতেও দ্বিধা করে না। কিংবা পাফ গুলোতে মদের নেশায় উন্মত্ত স্বল্প বসনা কখন প্রায় বস্ত্রহীন,  মেয়ে গুলোর অতি আবেগে উচ্ছাস ;কখনো প্রেমে ব্যর্থতার কান্নায় ভেঙে পরে অচেনা কারও বুকে নিজেকে নিংড়ে দিয়ে আশ্রয় খোঁজা, এসবই ফুটিয়ে তোলে তার শিল্পকর্মে।
প্রতিটা নারী, তার আবেগ, একই উপাদানে হয়ে ওঠে সতন্ত্র।  নারী শরীর শুধু আবেগের ভিন্নতায় যে কত বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠতে পরে সেটাই তার আঁকার বিষয়।
তবে আজ অনুর ছবি আঁকবে সে, কি আঁকবে তা নিজেও ঠিক করতে পারছে না। কয়েক বার অনুর চোখ আঁকতে গেলে বাস্তবের আলোক উজ্জ্বল চোখের সাথে কোন মিল খুজে পেলো না তার আঁকা চোখের। হাসিটাও যেন ঠিক ঠাক ফুটছে না। অনেক বার চেষ্টা করার পরও যখন বারবার তার চেষ্টা ব্যর্থতার ঘরে এসে থামলো, তখন চরম বিরক্ত হলো অরিন্দম। পেপার টা ছিড়ে ফেলে রংগুলো ছরিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। 

গাড়ীতে বসে আছে রাতুল ও অনু। সকালের ঘটনার পর অনু ইচ্ছে করে রাতুলের দিকে তাকাচ্ছে না। তবে মুখটা বাইরের দিকে করে রাখলেও আঁড় চোখে তাকিয়ে আছে রাতুলের দিকে। রাতুল সেটা বুঝতে পেরে চোখ বন্ধ করে, গাড়ির সিটে মাথা দিয়ে, চুপ করে থাকলো। আর চলে গেলো অতীতের একটি স্মরনীয় দিনে।  যা আজও ওদের স্মৃতির পটে অমলিন। সেই প্রথম স্পর্শ, প্রথম নিজের ভেতর অনুর স্থানের প্রকাশ।

দিনটা ছিল পাঁচই ডিসেম্বর।  রাতুল তখন পড়ে একাদশ শ্রেণীতে আর অনু নবম শ্রেণীতে। একদিন পর ফাইনাল এক্সাম শুরু তাই প্রচন্ড ঠান্ডা আর অসময়ে মেঘের গুরগুর শব্দকে অগ্রাহ্য করে বাকী সবার মতো দুজনে কোচিং-এ গিয়েছে। ওদের বাড়িতে ওদের জন্য গাড়ি থাকলেও ওরা সাইকেলেই স্কুলে যাতায়ত করে। মাত্র ডের কিলোমিটার স্কুলের পথ, এর মধ্যে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া ;  রাতুলের কাছে সব চেয়ে পছন্দের। এই দিন ওদের ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে এসেছিল। ওরা বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই শুরু হয়েছিলো প্রচন্ড বৃষ্টি।  একেই ডিসেম্বরের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার উপর বরফের জলের মতো ঠান্ডা বৃষ্টি। সামান্য সময়ে কাক ভেজা হয়ে দুজনে আশ্রয় নিল দত্ত বাড়ির পদ্ম পুকুরের ধারের টালির ছাউনিতে।
বৃষ্টিতে রাতুলের গায়ে লেদার জ্যকেট থাকার ফলে ও সেরকম ভিজে যায় নি তবে অনুর উলের সেয়েটার ভিজে জবজবে অবস্থা । একেই বৃষ্টির জল তার উপর ঠান্ডা হাওয়ায় অনু কাঁপতে লাগলো।

রাতুল---- তুই সোয়েটার টা খুলে নে, নয়তো ঠান্ডা লাগবে।

অনু---- হ্যা,,, কিন্তু তখন যে আরও ঠান্ডা (বলতে বলতে সোয়েটার খুলে সাইকেলের উপর রাখলো অনু)

দুজনে ঠান্ডায় জরসর হয়ে শান বাঁধানো ব্রেঞ্চে, বসার জায়গা বসে শুধু বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পরে রাতুল লক্ষ্য করলো অনুর কেমন জানি কাঁপছে।
"" কি হয়েছে অনু?? "" বলেই অনুর হাত ধরতেই রাতুল দেখলো অনুর হাত বরফের মতো ঠান্ডা। মুখের দিকে চেয়ে দেখলো গোলাপি ঠোঁট দুটো নীল বর্ণ ধারন করেছে আর কাঁপছে মেয়েটা।
অনুর মুখের দিকে তাকিয়ে রাতুলের বুকের ভিতরটা মুহুর্তে কষ্টে, আতঙ্কে মোচর দিয়ে উঠলো। তারাতাড়ি  নিজের জ্যকেটটা খুলে অনুকে পরাতে গেলে, অনু হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো,,,,

"" এবার যে ঠান্ডায় তুমিও অসুস্থ হয়ে পরবে। দুজনে অসুস্থ হলে কে কাকে ধরে বাড়ি নিয়ে যাবে? এর চেয়ে বরং তুমি সুস্থ থাকো বৃষ্টি কমলে আমায় নিয়ে যেও।""

অনুর কথায় প্রথমে রেগে মাথা গরম হয়ে গেলো রাতুলের; তারপর একটা বাঁকা হাসি অনুর দিকে ছুড়ে দিয়ে জ্যকেটটা পড়তে লাগলো। চেনটা আটকানোর আগে অনুকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরে রাতুল। ঘটনার আকর্ষীকতায় অনু হকচকিয়ে যায়। কি হচ্ছে তা বোঝার আগে রাতুল অনুকে বুকে নিয়ে জ্যকেটের চেনটা তুলে দেয়। একটা জ্যকেটের ভিতর বন্দি হয় এক জোড়া কিশোর কিশোরী। তাদের কৈশোর চিন্তা ভাবনা ও কৈশোরের অনুভুতি।

""***ভালোবাসা কি?  সেটা বোঝার আগেই  বুঝেছিল, ওরা একে অন্যের ভালোথাকার কারণ।
ভালোবাসা কেমন? তা চেনার আগেই ওরা চিনেছিল, একে অন্যের চোখে বিশ্বাসের দৃঢ় বন্ধন।
ভালোবাসা কোথায়? তা খোঁজার আগেই খুঁজে পেয়েছিল একে অন্যের চোখে, ভালোবাসার জগৎ।
ভালোবাসা কিভাবে? তা বোঝার আগেই তাদের মন বলেছিল "মানুষ বাঁচে যেভাবে ঠিক সেভাবে"।

অনু ঠান্ডা হাত দুটো জরো করে ওর বুকের ভেতর জড়িয়ে রেখেছে। আর মাথা রাতুলের বুকের বা দিকে রেখে হৃদপিণ্ডের ধ্বনি ক্রমাগত নিজের প্রতিটা শিরা উপশিরায় অনুভব করতে পাচ্ছে; খুব অযৌক্তিক ভাবে।অনু  নিজের অবস্থান টা আর একবার নিশ্চিত করার জন্য মুখটা তুলে তাকালো বুকের মালিকের মুখের দিকে। দেখলো বুকের মালিক নিশ্চিন্তমনে,হাসির আভা মুখে ছড়িয়ে ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

রাতুল অনুকে বুকে জরিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছে। যেন এতোদিন পর মনের গোপন কোনে লুকোনো কোন অব্যক্ত আশা আজ পুরন হলো। অনু যখন তার ভাবনার দাপাদাপিতে আরক্তমুখ খানি তুলে  রাতুলের পানে চাইলো, তখন নিজের অজান্তেই ওর ঠান্ডায় নীল হয়ে আসা ঠোঁট খানির গোলাপি রং ফেরত দিতে, রাতুল অতি সন্তর্পণে, অনভিজ্ঞ ঠোঁটে, সময়কে ছুটি দিয়ে, লোভাতুর ভাবে চুসে নিংড়ে নিতে লাগলো সমস্ত ঠান্ডাকে।
সম্বিত  যখন ফিরলো ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে।  এক জোড়া নতুন কপোত কপোত-কপোতী প্রনয় সুধা আকন্ঠ পান করে সন্তুষ্ট চিত্তে বাড়ির পথে রওনা হয়।

সেদিনও অনু আজকের মতোই লজ্জা পাচ্ছিল। তারপর কতদিন যে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে নি তার হিসেব নেই। রাতুলের কাছে অনুর নির্জন স্পর্শের ভালো লাগার থেকে ওর এভাবে গুটিয়ে থাকা অসহ্য লাগছিলো। প্রায় একমাস লেগেছিল অনুর স্বাভাবিক হতে।


❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

সরি,,,বন্ধুরা কয়েক দিন থেকে এতোই অসুস্থ ছিলাম যে মেবাইলের দিকেও ঠিক ভাবে তাকাতে পারছিলাম না। তাই দেরি হয়ে গেলো। এরপর থেকে সপ্তাহে তিনটা পার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো। কেমন লাগছে গল্পটা প্লিজ কমেন্ট করতে ভুলবেন না। ভালো থাকবেন😍😍

অনু---- (রাতুলের হাতে হাত রেখে সামান্য ঝাঁকিয়ে।) আমরা এসে গিয়েছি। এবার উঠো।

রাতুল---- হুম চল,,,

দুজনে একসাথে হেটে দশতলা একটা বিল্ডিংয়ের লিফটের ভিতর ঢুকলো। অনু সাত তলার বাটন চাপলো সাথে সাথে লিফট স্টাট হলো। রাতুল আবার অনুকে টেনে জড়িয়ে ধরলো। অনু মুখটা তুলে রাতুলের কপালে একটা আলতো ছোঁয়া দিয়ে লজ্জা লজ্জা মুখে বললো,,,

অনু---- কি চিন্তা করছো বলোতো?  মুখটা অন্ধকার করে রেখেছো।

রাতুল---- (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তোকে এক মুহুর্তের জন্যও ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। বাবাকে বল না আমাদের বিয়েটা দিয়ে তোকে আমার সাথে নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দিতে।

অনু---- (আবাক চোখে) আমি!! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? কি বলবো জ্যেঠা মসাইকে যে "" আমাকে তোমার ছেলের সাথে বিয়ে দাও। ""

রাতুল---- হ্যা কেন,,, বলতে পারবি না? ছোট বেলায় তো সবার সামনেই বলতিস ""আমি রাতুলদার বৌ, আমি রাতুলদার বৌ,,,""। এখন যখন সত্যি বলার সময় তখন পারবি না। কেমন তুই বল? (জোরে কোমরটা চেপে ধরে।)

অনু---- ইস,,,লাগছে ছাড়ো (ছাড়াতে ছাড়াতে),,,কেন??  তখন তো তুমি রেগে গিয়ে আমাকে কত বকতে। বলতে"" আমি কখনই তোকে বিয়ে করবো না""।  সে বেলায়,,,

রাতুল ---- (হাত দুটো দিয়ে অনুকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে) পরে তো বিয়েটা আমি করেছি না কি?

অনু---- (শান্ত হয়ে,,) তাহলে তোমার বিয়ে করা বৌকে আবার বিয়ে করার জন্য পারমিশন নিতে এতো সমস্যা কেনো?

সময় জ্ঞান তো দুজনেই হারিয়েছে।  ওদের কথা আর ঝগড়ার মাঝখানে লিফট কখন খুলেছে তাতে ওদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এ-সময় হঠাৎ একটি মেয়ে এসে রাতুলকে দেখে উত্তেজনা ঝড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো
""" রাতুল!!,,,,, তুমি??  কবে এলে""??

সম্বিত ফেরে ভালোবাসার অতল সাগরে স্নান রত দুজন প্রেমিক - প্রেমিকার। একটু সরে এসে আগন্তুক কে দেখে অনুর মুখটা বিষাদে ভরে ওঠে। রাতুল ব্যপারটা লক্ষ্য করে ও মনে মনে হেসে ওঠে।তবে ওদের এই অতি সিরিয়াস টপিকের মধ্যে আগন্তুকের  এমন আচরণ রাতুলকেও বিরক্ত করে। তবুও সৌজন্যের হাসিটা মুখে চাপিয়ে উত্তর দেয়,,,

রাতুল---- আরে লাবনি যে,,কেমন আছিস? তুই আমাদের অফিসে?

অনু ---( লাবনি কে উদেশ্য করে) লাবনিদি আমি মিটিংয়ের রুমে গেলাম। তোমাদের কথা হলে মিটিং রুমে চলে এসো।

লাবনি---- ওকে,,,,হ্যা আমি তো এখানে এক বছর হলো আছি। তারপর তুমি কেমন আছো বলো?

রাতুল অনুর হাতটা টেনে ধরে,,",ভালো আছি,,, তোর সাথে পরে কথা বলছি, আগে মিটিংটা এ্যটেন্ড করি।"

লাবনি একটা কৃত্রিম হাসি টেনে বললো,,, "ওকে,,, তবে তুমি ওখানে কি করবে? যাই হোক,,, ওয়েলকাম টু ইওর অফিস।"

রাতুল---- থ্যংক ইউ,,,

অনু আর অপেক্ষা না করে চলে যেতে লাগলো। রাতুল ও পেছন পেছন যেতে লাগলো।
লাবনির একই দৃষ্টিতে রাতুলের যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো। এখোনো রাতুল কে ততটাই ভালোবাসে যতটা আগে বাসতো; কি জানি লোকে হয়তো ঠিকই বলে প্রথম ভালোবাসা কেউই ভুলতে পারে না। কিন্তু সে ভালোবাসা অনুরাধার ভালোবাসার সামনে তখন কিছুই ছিল না আজ তো কোন প্রশ্ন ও নেই। খুব ভাগ্যবতী মেয়েটা,,, হ্যা রাতুল ও। কারণ অনুর মতো এরকম মেয়েও সচরাচর হয় না। জানি অনু এখনো মন থেকে আমাকে ক্ষমা করতে পারে নি। এতো কিছুর পরও ও আমার জন্য যা করেছে তা হয়তো ওর জায়গায় আমি হলে, কখনো করতাম না। ভালোথেকো তোমরা ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।


রাতুল অনুর পিছন পিছন আসতে আসতে এটা ফাঁকা জায়গা দেখে অনুকে কাছে টেনে বললো "" তুই এখনো রেগে আছিস,, মেয়েটার উপর। তাহলে তোর অফিসে চাকুরী দিলি কেন? হু,,, তুই দিয়েছিস আমি জানি, কারণ বাবা ওকে কোন দিনও আমাদের ত্রিসীমানায় আসতে দিতো না।"

অনু---- (ইতস্তোত করতে করতে) হ্যা,,,,, আমি দিয়েছি,,, যে-দিন দেখলাম লাবনিদির বয়ফ্রেন্ড ওকে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় বিয়ে না করে পালিয়ে যায় ;ওর বাবা মা ওকে সমাজের ভয়ে অস্বীকার করে ; সেদিন শুভদার কাছে শুনেছিলাম ওর দুরাবস্থার কথা। তাই আমি পাশে দাড়িয়ে ছিলাম। জ্যেঠা মসাই প্রথমে নিষেধ করলেও পরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলো ও কতটা অনুতপ্ত ছিল।তারপর অনেক লড়াই করেছি আমরা। কিন্তু যার জন্য এতো লড়াই সেই বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারি নি।

রাতুল---- এতো কিছু ঘটে গেছে!! ও আমার সাথে যা করেছে তা কোনো দিন ভুলতে না পারলেও আজ লাবনির কথা শুনে সত্যি খারাপ লাগছে।

অনু---- হ্যা,,,,,জানি এটার প্রয়োজন ছিল। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় ভগবান হয়তো একটু বেশিই শাস্তি দিয়েছেন।

এর মধ্যে ওরা অফিস এর স্টাফ রুমে এসে পৌঁছায়। অনু বেশ রাশ ভারি কন্ঠে বলে উঠলো,,,,
" লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান মিট,,,,রাতুল মুখার্জি ইওর ফিউচার বস।""

সবাইকে অনু আগে থেকে জানাতে পারে নি। তবু এটুকু সময়ে অফিসের সবাই রাতুলের কাছে এসে সৌহাদ্য পূর্ণ ব্যবহার করে। অফিসের ইয়াং মেয়েরা রাতুলকে দেখে রীতিমতো ক্রাস খায়।
তবে অফিস জুরে অনুর রুপের প্রসংসায় ছেয়ে যায়।
এতোদিন অনু অফিসে আসতো শুধু সাদা নয়তো কালো চুরিদারে। সব সময় আভরণ হীন। আজ  হঠাৎ অনুকে মনে হচ্ছে, একটা রেশম পোকা কোকুন এর ভেতর থেকে নীল রংয়ের প্রজাতির হয়ে বের হয়েছে । তার রুপকে আরও বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে রাতুলের বিহ্বল দৃষ্টি, আর অগাধ ভালোবাসা । এ যেন একই বৃন্তে ফোঁটা দুটি ফুল।

পরিচয় পর্ব শেষে অনু রাতুলকে নিয়ে মিটিংয়ের রুমে গেলো। মিটিং শুরু হয়ে শেষও হয়ে গেলো। রাতুল সারাটা ক্ষন অনুর মুখের দিকে কখনো সোজা, কখনো বক্র, কখনো চুপিচুপি বিভিন্ন ভঙ্গিতে দেখতে লাগলো। রাতুলের এই লুকোচুরি অফিসের সবার চোখে ধরা পড়লো। এবং তাদের এই মাত্রা ছারানো ভালোবাসা ক্ষনিকেই সবাই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। স্বভাবতই এই গোটা সপ্তাহের গসিপের উপাদান পেয়ে গেছে অফিস কর্মীরা।


টিনা সকালে দুই দুই বার রাতুলের ঘর থেকে ঘুরে এসেছে। আজ তো ওদের বেড়াতে যাওয়ার কথা, কি জানি রাতুলের কোন পাত্তাই নেই। ""কাল তো বললো যে শুধু আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। আজ সকাল থেকে কোথায় রাতুল?""
চকিতে টিনা দেখে মহিধর ওর রুমের পাস দিয়ে যাচ্ছে।

টিনা---- হ্যলো মহি কাকা,,,,, এই যে শুনছেন??

মহিধর টিনার রুমের পাশ দিয়ে রাতুলের রুমের দিকে যাচ্ছিলেন পরিস্কার করানোর জন্য,,,টিনার ডাক শুনে সামনে এসে বললো,,, "" মা তুমি আমাকে ডাকছো?

বাড়ির কাজের লোকের কাছে তুমিটা কিরকম বেখাপ্পা শোনায়। মুখটা একটু ভেংচিয়ে,,,
"" রাতুল কোথায় বলতে পারেন?"" কাজের লোককে আপনি বলতে কিরকম অদ্ভুত ফিলিংস হয় টিনার।

টিনার ব্যবহারে অভিজ্ঞ মহিধরের বুঝতে কষ্ট হলো না ওর মানসিকতা। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে,,,,"" ছোট বাবু তো সকালে অনুমায়ের সাথে অফিসে গেছে।

টিনা---- কি!!!! কখন?? কই আমাকে তো বললো না।

মহিধর ---- বোধ হয় তাড়াহুড়ো তে বলতে ভুলে গেছে। ( টিনার করুন মুখ খানির দিকে তাকিয়ে বললো) আপনি একবার একটা ফোনও করতে পারেন।

"" হ্যা ঠিক আছে"" বলেই দরজাটা বন্ধ করে দিয়েই বুক বেয়ে একটা নিদারুণ যন্ত্রণা গলা বেয়ে কান্না হয়ে ঝরতে লাগলো। টিনা জানে এ অশ্রুর কোন দাম নেই, অশ্রু মোছানোর কারও তাগিদ নেই, তাই বার বার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে পাগলের মতো চোখের জল মুছতে লাগলো। তবুও অবুঝ মন আর অবুঝ চোখ কবে কার কথা শুনেছে।
মনের গভীর কোন থেকে যেন কেউ উচ্চ হাসিতে  টিনাকে বলতে লাগলো"" এটুকুতেই এতো জল টিনা? যে পথে তুই যাওয়ার চিন্তা করছিস তাতে যতটা অন্যকে কাঁদাবি তার থেকে বেশি তুই কাঁদবি। যতটা অন্যকে কষ্ট দিবি তার থেকেও বেশি তুই কষ্ট পাবি। সহ্য শক্তি বৃদ্ধি কর সামনে যে তোর মেকি ভালোবাসার পরিক্ষা। "" আবার তীব্র হাসি।
নিজের অবস্থা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে টিনা। ও তো একজন সাইকোলজির ডাক্তার।  রাতুলকে নিয়ে নিজের অবসেশন, পজেসিবনেস এগুলো যে কত ভয়ঙ্কর রুপ নিতে পারে তা ভালো করে আন্দজ করতে পারছে।  তবুও কি এক অদৃশ্য শক্তিতে নিজের মনকে কোন ভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে পারছে না। পিকুলিয়ার সব যুক্তি দার করাচ্ছে মন।



❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

অরিন্দম এখন গ্রামের পথে হেটে চলছে। যদিও মেঠো পথে হাটার খুব ইচ্ছা তার কিন্তু এ উন্নয়নের যুগে মেঠো পথ পাওয়া সত্যি দুস্কর।
এই গঙ্গাছড়া জায়গাটায় পরিকল্পিত ভাবেই সব কিছু নির্মান করা হয়েছে। লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেলো স্কুল কলেজে গুলো সব এক এলাকায় করা হয়েছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক, প্যথোলজিক্যাল ল্যাব গুলো একদিকে, সরকারি সকল অফিস ও অফিসার দের থাকার ব্যবস্থা একদিকে। আর মাঝখানে রয়েছে বিশাল বড় কয়েকটা গার্মেন্টস এর বিল্ডিং। তাছাড়া বাজার, শপিংমল, সাধারণ মানুষের বাড়ি ঘর সব কিছুই কেমন একটা সুসজ্জিত।
আর আছে নদী,তিস্তা নদী তাকে ঘিরে, সমস্ত গ্রামের সৌন্দর্য, আর সকল লড়াইয়ের কাহিনির আবর্তন ও অবঘাতন।

অরিন্দম বসে আছে একটা রোড সাইড চায়ের দোকানে। মাইন্ড সেটআপ করার জন্য সে সব সময়, একটু ব্যতিক্রম পরিবেশে থাকতে ভালোবাসে। তাই চায়ের দোকানের মালিকের সাথে গল্পে মেতে গেছে। এই গ্রামের ইতিহাস জানতে দোকানের মালিককে রীতিমতো বিরক্ত করেছে সে।

এতো কিছুর পর যেটা জানা গেলো সেটার সারমর্ম হলো---  আগে তিস্তা নামক নদীটি দুরে থাকলেও তার ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মেতে ক্রমেই এই গঙ্গাছড়া এলাকা টির দিকে ধাবিত হয়। তার পর এক এক করে বাস্তুহারা করে হাজার হাজার মানুষকে। তখন রথিন বাবু  সদ্য ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে মানসিক চাপ সামলে চাকুরির চিন্তা করছেন। বড় বড় কোম্পানি থেকে অফারও আসছে। এমন সময় তার গ্রামের দিকে ছুটে আসা অন্নহীন, বস্ত্রহীন মানুষের কষ্টে জর্জরিত মুখগুলের পানে তাকিয়ে নিজেকে আটকে রাখতে পারেন নি। প্রাণপন লড়াই করে সরকারের কাছ থেকে বাঁধ মেরামতের জন্য তহবিল জোগার করেন।  তারপর নিজের দক্ষতা ও সরকারি সহযোগিতায় স্থায়ী ভাবে নদীকে সভ্য হতে বাধ্য করেন। 
কিন্তু ততদিনে হাজার হাজার মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাতে চোর, ডাকাতির খাতায় নাম লিখিয়েছে। এবার এদের পুনর্বাসনে রথিন বাবু তার জমিদারির প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ এদের নামে লিখে দেন ও সাধারণ মানুষদের সুশৃঙ্খল ভাবে বন্টন করে দেন। এতো লোকের জীবন চালনের জন্য জীবিকা প্রদান এমন একটি সাধারণ গ্রামে অসম্ভব। কেউ কেউ শহরের চলে গেলেও কয়েক মাস পরে প্রায় মানুষই রুগ্ন, নিঃস্বো হয়ে ঘরে ফিরছিলেন।
এবার রথিন বাবু এদের কর্ম সংস্থানের লক্ষ্যে তার বিদেশি বন্ধুর সহযোগিতায় শুরু করলেন গার্মেন্টস এর ব্যবসা। এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি এই ব্যবসায় উত্তর উত্তর সাফল্য লাভ করে সাধারণ মানুষের দারিদ্র দুর করেন। এবং এই গ্রামটিকে একটি মডেলে রুপান্তর করেন, এভাবেই তিনি  নিশব্দে এখানকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটান, অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ শ্রমিকে রুপান্তর করেন সাধারণ মানুষদের, গ্রাম হয়ে শহরের থেকেও আত্মনির্ভরশীল ও সুন্দর । তাই গ্রামের মানুষ রমাপ্রসাদ বাবু কিংবা রথিন বাবু এদেরকে দেবতা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করে।
আজ অরিন্দমের মনটা অদ্ভুত এক শক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মানুষ এতোটা নিঃস্বার্থ হয় কিভাবে?? সেটা হয়তো এখানে না এলে তার অজানা থেকে যেতো।

অরিন্দমের ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে কলার আই ডিতে টিনার নাম।ফোনটা রিসিভ করে,,,,

অরি---- বল,,,,, কি খবর?

টিনা---- অরি,,, আই সুড লিভ দ্যা ভিলেজ।

অরি---- এতো তাড়াতাড়ি?  কি হয়েছে,,,,এনিথিং সিরিয়াস??

টিনা---- আমার মনে হয় আমি মানসিক ভাবে ইমব্যলেন্স হয়ে পরছি।

অরি---- কি!!! ডোন্ট প্যনিক,,জাস্ট চিল।আই আম কামিং ইন্টু মিনিটস,,,। উই উইল সল্ট আউট দ্যা প্রবলেম।

টিনা---- দেরি করিস না। তাড়াতাড়ি আয়।

অরি---- ওকে বাই,,,

টিনা---- বাই,,,

অরিন্দম  হাটতে হাটতে একটু দুরেই এসে গেছে। টিনার মানসিক অবস্থার এরকম পরিবর্তনের কোন আশংঙ্কাই আজ পর্যন্ত করে নি অরি। চিরদিন ছেলেদের রেগিং করা, ভালোবাসা নিয়ে ছেলেখেলা করা, শক্তমনের বোনটার হঠাৎ সামান্য কারণে এতো  এতো বড় সমস্যা হবে তা হয়তো আশাও করে নি। যদিও রাতুলের বিষয়ে টিনার সিরিয়াসনেস আজ সকালে বেশ ভালোই বুঝতে তবুও এতো তাড়াতাড়ি এতো খানি অস্থিরতা অরিন্দমের চিন্তার বাইরে। বেশ জোরেই চললো রাতুলের বাড়ির দিকে।

*********


""রাতুলদা ড্রাইভার রাম সিং কোথায়? তুমি ড্রাইভারের সিটে কেনো?"" ব্যস্ত গলায় অনুরাধা প্রশ্ন করলো রাতুলকে।

রাতুল---- রাম সিংকে আমি ছুটি দিয়েছি। কেন আমি কি গাড়ী চালাতে পারি না? সামনের দরজা খোলা আছে, তুই গাড়িতে ওঠ।

অনু আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠলো। রাতুল গাড়ি স্টাট দিলো। গাড়ি চললো তাদের ফেলে আসা দিন গুলোর সাক্ষীদের কাছে। অনুর মনও পাঁচ বছর পর সেই জায়গা গুলোতে দুজনে আবার হারিয়ে যাওয়ার নেশায় মাতাল অভিব্যক্তিকে কোন ভাবে চাপা দিতে পারছে না। রাতুল বুঝতে পারে সে কথা তাই দত্ত বাড়ির পদ্মপুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় টালির ঘরটার সামনে দাড় করায় গাড়ি। অনুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,,,

রাতুল---- আমি এখনো প্রতি মুহুর্তে আমাদের প্রথম ছোঁয়াকে অনুভব করি।

অনু স্ব লজ্জায় মাথা নিচু করে চুপটি করে বসে আছে।
রাতুল সিটবেল্টটা আস্তে খুলে অনুর দিকে হেলে দু হাতে অনুর লজ্জায় রাঙা মুখ খানি তুলে চোখে চোখ রেখে বললো,,,

"তোর মনে পড়ে না?"

অনু আস্তে আস্তে মাথাটা নেরে স্মিত হেসে সম্মতি জানালো শুধু। রাতুল ঠোঁট আলতো করে ছোঁয়ালো অনুর ঠোঁটের  তারপর আবার গাড়ি চালাতে শুরু করলো। আর বাঁকা চোখে অনুর আরক্ত মুখের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলো।
যেতে যেতে হঠাৎ ই রাতুলের লাবন্যর কথা মনে পরলো। আজ অনেকদিন পর ওকে দেখলো। স্কুলে, কলেজে মেয়েটা একটু বেশিই হুল্লরবাজ আর ডেসপারেট ছিল। সুন্দরী ছিল বলে ক্লাসের কত ছেলের ড্রিম গার্ল ছিল তার কোন হিসেব নেই। তবে লাবন্য কাউকেই পাত্তা দিতো না। তারপর সেই দিন। সে দিনের কথা মনে করলে আজও মাথা গরম হয়ে যায় রাতুলের।

পাঁচ বছর আগে, দিনটি ছিল দশই জুন। রাতুলের সতেরো তম জন্মদিন। সকাল থেকে বাড়িতে গরীব মানুষের ঢল খাওয়ার পর্ব চলছে । প্রতি বছরের মতো রাতুল সকলের আশীর্বাদ এ পূর্ণ ।
সন্ধ্যার পর রাতুলের বন্ধু বান্ধব দের নিয়ে পার্টি প্লাস জন্মদিনের কেক কাটা শুরু।

প্রথমে লাবন্যকে ইনভাইট করবে না করবে না মনে করেও ইনভাইট করে রাতুল।কারণ রাতুল কয়েকদিন যাবত লক্ষ্য করে লাবন্য কেমন অকারণে ওর দিকে ফ্যলফ্যল করে তাকিয়ে থাকে , অকারণে রাতুলের সাথে কথা বলতে চায়,কথায় কথায় কেমন জানি ইচ্ছে করে গায়ে ঢলে পরে। রাতুল সতর্কতার সাথে এগুলো এরিয়ে চলে।
তখনও রাতুলের স্কুলের কেউই জানতো না অনু ও রাতুলের কথা।
এরমধ্যে একদিন লাবন্য রাতুলকে প্রপোজ করেই ফেলে । তবে রাতুল খুব ভদ্রতার সাথে তা প্রত্যাখান করে। লাবন্য ব্যথিত চিত্তে, ছলছল করুন চোখে রাতুলের দিকে তাকিয়ে থাকে, রাতুল "সরি" বলে চলে যায়।
এ কথা মুহুর্তেই ছরিয়ে পরে স্কুলে, কোচিং-এ,  ওদের বন্ধু মহলে। এবার যারা এতোদিন লাবন্যকে প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলো, তারাই এ বিষয় নিয়ে লাবন্যকে হেনস্তা করতে শুরু করে। এটা রাতুল জানতো তাই ইনভাইটেশনের ব্যপারে এরকম হেজিটেশন করছিলো।

এদিকে লাবন্যর একেই তো রাতুলের ভালোবাসা না পাওয়ার শোক, অন্যদিকে স্কুলে কোচিং-এ  সবার এরকম ব্যবহার ওর ভালোবাসাকে হিংসায় পরিনত করে। আর জন্মদিনের ওই আনন্দঘন পরিবেশকে করে কলুষিত।

জন্মদিনে রাতুলের সকল বন্ধু বান্ধবীদের নিমন্ত্রণ ছিল রাতুলদের রাড়িতে। এমনিতেই এই বয়সে কিশোরদের অদম্য আকর্ষণ নিষিদ্ধ পানীয়, তাই এবারে তাদের শর্ত ছিল রাতুলের জন্মদিনে রাতুলকে একবোতল করে হুইস্কির ব্যবস্থা করতে হবে। সম্মতি দেয় রাতুলও তাই সে চুপিচুপি মালী দাদুর নেশাখোর ছেলেকে দিয়ে তার ব্যবস্থাও করে। সন্ধ্যায় কেক কাটার পর ডিনার করে মোটামুটি সকলে বিদায় নেয়। রাতুল শুধু কয়েকজন বন্ধু মিলে থেকে যায় তাদের প্রাসাদের বিশাল ছাদে। কয়েক মিনিটে এক একজন একটা করে বোতল নিঃশেষ করে।  প্রথমে একটু কড়াস্বাদ, গন্ধযুক্ত মনে হলেও চরম কৌতুহলে নাক মুখ বন্ধ করে গলায় ঢেলে দেয় ঔষুধ এর মতো।তার পর আস্তে আস্তে একটা ভালোলাগায় ভরে ওঠে বুক।

মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে,
শরীর শিহরিত হয় বার বার,
দৃষ্টি স্ফিত ও চনচল হয়ে ওঠে,
অকারন আনন্দে মন হয় উথাল-পাতাল।
অসীম সাহসে ভরে যায় বুক,
সারা শরীরে উত্তেজনা টানটান
মাথা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়
তাই অভিভাবক হীন শরীরের
যথেচ্ছা ব্যবহার।

সেরকমই নিয়ন্ত্রণহীন শরীরে এক এক জন প্রচন্ড লাউড মিউজিকে উন্মত্তের মতো অঙ্গভঙ্গি করে নাচতে লাগলো এবং ঘন্টা তিনেকের মধ্যে নিজেদের ক্লান্ত,অবসন্ন করে ফেলে যেখানে ইচ্ছা সেখানে গড়িয়ে পড়লো।

সারাদিনের ব্যস্ততায় ক্লান্ত রথিন বাবু ও মৃনালিনী দেবী তখন শ্রান্ত দেহে ঘুমের কোলে। তাদের অজান্তেই তাদের সুপুত্র যে এতো বড় কাজ করতে পারে তা হয়তো তারা ঘুনাক্ষরে ও ভাবতে পারে নি।

অবিন্ন্যাস্ত কিশোররা যখন মতাল হয়ে পড়ে আছে এখানে সেখানে আরাল থেকে বেড়িয়ে এলো লাবন্য।
রাতুল তখন ছাদের উত্তর দিকে ছাদের এক কোনে একা পড়ে আছে। হাতে আধখাওয়া হুইস্কির বোতল। লাবন্য ধীর পায়ে রাতুলের কাছে এগিয়ে যায়। আস্তে আস্তে রাতুলের পাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরে রাতুলকে। গভীর চুম্বনে উত্তেজিত করতে চেষ্টা করে রাতুলকে। রাতুলও প্রথম প্রথম লাবন্যকে সংঙ্গ দিলেও একটু পরই ঝিমিয়ে পড়ে। লাবন্য তার পোশাকটা খানিক এলোমেলো করে শুয়ে পড়ে রাতুলের পাশে।

সকাল বেলা রাতুলের ঘুম ভাঙে কারও চাঁপা কান্নার আওয়াজে। চোখ খুলতে গিয়ে আবারও বন্ধ করে নেয়, মাথাটাতে প্রচন্ড ভার অনুভব করে। তারপর সময় নিয়ে চোখ খুলে দেখে লাবন্য প্রায় বিবস্ত্র হয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।
"কি হয়েছে লাবন্য" জিজ্ঞেস করতেই লাবন্যর কান্নার বেগ বেড়ে গেলো। এবার জেগে উঠতে শুরু করলো উৎপল, শুভ, সহ এক এক করে সবাই। তারপর যখন কারনটা সবার সামনে এলো মাথায় বাজ পরলো সবারই।
লাবন্যর কথা অনুযায়ী রাতুল কাল রাতে লাবন্যকে রেপ করেছে। কাল ডিনারের পর ও যখন রাতুলের কাছে আসে বিদায় নেয়ার জন্য মাতাল রাতুল তখন হিংস্র জানোয়ারের মতো তার শরীরটাকে ভোগ করে।

যদিও সে রকম কোন চিহ্নই লাবন্যর শরীরে নেই। রাতুলেও তো কিছুই মনে নেই। তবে কি সত্যি এমন কিছু করেছে সে? হতবিহ্বল হয়ে পরে রাতুল। কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। দু হাতে মাথা চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে এই পরিস্থিতি থেকে প্রানপনে মুক্তি চাচ্ছে সে।

কিন্তু কথা ক্রমেই রথিন বাবুর কান পর্যন্ত পৌছায়। সেটা কিভাবে তাও রাতুলের অজানা। রাতুলের সে মুহুর্তে শুধু অনুর মুখটা মনে পরেছে। গতরাতে কি হয়েছে তা সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না, কিন্তু এসব শুনে অনু কি ভাববে সে চিন্তায় তার বুকটা শুকিয়ে আসছে। রথিন বাবু ছাদে এসেই বসে পড়েন। ছেলের এরকম কাজ তিনি কিভাবে মেনে নেবেন তাও ভাবতে পরছে না রাতুল, সে লজ্জায়, ভয়ে কুন্ঠিত হয়ে পড়ে।
রাতুলের সকল বন্ধুদের রথিন বাবু নিচে যেতে বলেন এবং রাতুল ও লাবন্যকে ডেকে কাছে বসান তিনি।

রথিনবাবু----( আচমকা বলে ওঠে)লাবন্য তুমি যে কারনেই এ রকম লজ্জা জনক কাজ কর না কেন ;তুমি নিজের সাথেই অন্যায় করেছো।

রাতুল ও লাবন্য অবাক চোখে চেয়ে থাকে। এবার লাবন্য ভয়ে কেঁপে ওঠে। সত্যিকারের কান্না পায় অপরাধ বোধ এর কান্না। অপমানের কান্না।

রথিন বাবু একটি মোবাইল তুলে দেয় রাতুলের হাতে এবং দুজনকেই দেখতে বলে। রাতুল দেখলো এটা অনুর মেবাইল এবং তাতে কাল রাতের আসল ঘটনা। রাতুলের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।আর ঘৃনার দৃষ্টি হানে লাবন্যর দিকে।

রথিনবাবু---- কাল রাতে অনুমা রাতুলকে দেখতে এসে, লাবন্য,, তোমাকে দেখে তার সন্দেহ হয় তাই তোমাদের ভিডিও করে রাখে।
আর লাবন্য আমি জানি না, তুমি এতটুকু বয়সে কি করে এরকম জঘন্য কাজ করেছো। তবে আমি চাই না তুমি ভবিষ্যৎ এ রাতুলের আসে পাসে থাকো। আমি চাইলে তোমার বাবা মা কে জানাতে পারতাম, জানাইনি করণ আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। আশা করি এই সুযোগের সদ ব্যবহার করবে তুমি।

এরপর লাবন্য মাথা নিচু করে কোন বাক্য ব্যয় না করে চলে যায়। আর রাতুল বাবার কাছে শপথ করে আর কেন দিন নেশার দ্রব্যকে ছোঁবে না। ছেলের কথায় সন্তুষ্ট রথিন বাবু ছেলেকে নিয়ে নীচে নেমে আসে।

নিচে নেমে রাতুলে চোখ খুজতে থাকে অনুকে। রথিন বাবু বুঝতে পেরে বলে,,,,
"" কাল থেকে মেয়েটা ঘুমায় নি দেখ মনে হয় রুমেই আছে" রাতুল বড় বড় চোখ করে তাকায় তার বাবার দিকে, রথিন বাবু মুচকি হেসে তার রুমে চলে যান।

তারপর রাতুল ছুটে যায় অনুর কাছে অভিমানি অনু খাটের কোনায় নিশব্দে বসে। কত সাধ্য সাধনা করে সেদিন অনুর মান ভাঙায় রাতুল।

অনু---- এই যে মিস্টার ভাবুক আমরা চলে এসেছি। ( দুহাত রাতুলের চোখের সামনে নারাতে থাকে অনু)

রাতুল অনুর  দিকে তাকিয়ে, সামান্য হেসে,  সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলে" ভাবনায় তলিয়ে তাকলেও বাস্তব আমায় ছাড়ে না। তাই তো তোর প্রিয় জায়গায় নিয়ে এলাম কোলাহল মুক্ত, এই সময়টা একান্তই আমাদের। বলেই অনুকে আচমকা ওর শক্ত হাতে তুলে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়। আর ডুব দেয় অনুর জেসমিন ও লেভেন্ডার পারফিউম মাখানো শরীরে। প্রতিটি ইঞ্চিতে ছোঁয়াতে থাকে উষ্ণ ঠোঁট । সকালের অপূর্ণ মিলন পরিপূর্ণ করতে চায় তাদের স্মৃতি বিজরিত এই নির্জন প্রান্তরে।
তৃষিত অনুও সারা দেয় রাতুলের ছোঁয়ায়। রন্ধে রন্ধে তাদের উন্মত্ততা আছন্ন করে রাখে। অদেখা বৃষ্টিতে ভিজতে আকুল দুটি প্রানের মিলন ঘটে নদীর পবিত্র পরিবেশে।

❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

নদী সংলগ্ন ছোট্ট একটি পার্কে, গাছে ঘেরা চারদিক ; শান্ত প্রকৃতি, দুপুরের কড়া রোদ, আর বড় বট গাছের নীচে একটি লেটেস্ট মডেলের অডি গাড়ীর ভেতরে দুজন উন্মত্ত প্রমিক যুগল। সময়ের সাথে সাথে ভালেবাসার ছোঁয়া যখন গভীর থেকে গভীর হতে লাগলো হঠাৎ অনু প্রচন্ড অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। রাতুলের প্রত্যকটি টাচ কে ভয় করতে, সংকুচিত হয়ে সে নিজেকে গুটিয়ে নিল।

কামুখ চোখে আবেগে উত্তেজিত রাতুল অনুর এ রকম আচরনে অবাক হয়ে যায়। জরানো কন্ঠে ব্যস্ত ঠোঁট দুটোকে বুকের বিভাজিকা থেকে তুলে বললো "" কি হলো সোনা এরকম থেমে গেলি কেন? "" কিন্তু মুখটা তুলেই অনুর কান্না জড়ানো চোখ দেখে ভয় পেয়ে যায়; নিজেকে কন্ট্রোল করতে চোখ বন্ধ করে সিটে মাথা এলিয়ে দেয় একটু সময়। 
আর তার মনে পড়ে যায়,  এ তো তাদের দুজনেরই প্রথম মিলন!!এএভাবে অনু কেন? কোন মেয়েই মেনে নিতে পারবে না।
ও একজন ডাক্তার তাই ফিজিক্যল রিলেশন সম্পর্কে প্রাকটিক্যাল  জ্ঞান না থাকলেও ভেরি সার্পলি হ্যভ দ্যা কনসেপ্ট হাউ টু ডু ইট। কিন্তু অনু!! ওকে তো সময় দিতে হবে।

রাতুল---- সরি সোনা,,,,আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি তোর কথা সত্যি এভাবে ভাবিনি । ( মুখটা ধরে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে কপালে আলতো করে চুমু দেয় রাতুল) সরি রে  আমি আর কখনো এ রকম করবো না কথা দিচ্ছি।  প্লিস ডোন্ট ক্রাই।

অনু কাঁদতে কাঁদতে বললো "" আই এ্যম সরি টু,,,,আসলে আমার খুব ভয় লাগছে। তুমি মন খারাপ করলে না তো??""

রাতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুর মাথাটা বুকে চেপে ধরে বললো "" কোন দিন কিছু না হলেও মন খারাপ করবো না।"

অনু রাতুলের বুকে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে কান্না কান্না চেখেও দুষ্টমির হাসি একে বলে ""ঠিক আছে মনে থাকে যেন।""

রাতুল--- এবার যতোদিন না আমার পাগলি রানিটা বলছে যে ""আমায় একটু আদর করো"" ততদিন আমি নিজের থেকে এগুবো না বলে দিলাম।

অনু রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে"" খুব মন খারাপ করেছো? আসলে এভাবে এতো কাছে আসাটা ঠিক হবে কি না এটা বুঝতে পারছি না । তাছাড়া আমার এখানে খুব অকওয়ার্ড লাগছে,,, সেটা ভেবেই,,,,

রাতুল----আচ্ছা ঠিক আছে,, তোর এই এতটুকু মাথায় এত চাপ নিতে হবে না। আর ভাবতে হবে না, চল খুব ক্ষুধা পেয়েছে তাড়াতাড়ি বাড়িতে যাই।

অনু---- আমারও খুব ক্ষুধা লেগেছে,,, চলো।

রাতুল---- বিকেলে কোন দিকটাতে যাওয়া যায় বলতো?

অনু---- যদি সাধারণ মানুষের জীবন দেখতে চাও তবে কামার পাড়া, কুলি পাড়া, আর জেলে পাড়ার ওদিক থেকে ঘুরে এসো।

রাতিল---- আমি যাব মানে তুই যাবি না।

অনু---- না আসলে বিকেলে জ্যেঠার সাথে কোম্পানির কালকের ডিলের ব্যপারে কয়েটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

রাতুল---- এই তো এখনি কি সব মিটিং করলি। আর আবার কি বলবি।

অনু প্রথমে চোখ নামিয়ে নিয়ে আবার রাতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো "" চোখ কান অকাজে ব্যস্ত না রেখে মিটিং এর দিকে মন দিলে বুঝতে পারতে।""

রাতুল---- তুই তোর এই মার কাটারি ফিগার আর আগুনের মতো রুপ নিয়ে আমার সামনে থাকলে, নিঃশ্বাস নিতেই না কবে ভুলে যাই,,,,আর তোর ব্যবসা।

অনু---- ইস কথার কি শ্রী বড় শহরে বুঝি সবাই এ রকম ভাষায় কথা বলে!!,,,,, আর আবোল তাবোল না বকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।

রাতুল---- (অনুর গালে চটাস করে একটা কিস দিয়ে) তোর মতো বউ থাকলেই বলে।( তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে) বাড়ি তো যাব তার আগে আমার কোল থেকে নাম, নিজেকে একটু গুছিয়ে নে। নয়তো পরে লজ্জায় পরবি আর বলবি আমি বলি নি।

অনু তারাতাড়ি পাশের সিটটাতে বসতে গিয়ে নিজের পরিধেয় বস্ত্রের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যায়।ব্রা য়ের হুক খোলা, ব্লাউজের কয়েটা বোতামও। শাড়ির কুচি খোলা আচল নিচে পরে আছে। সায়াটাও থাইয়ের উপর উঠে আছে ফর্সা পাদুটোয় রাতুলের লোভাতুর দৃষ্টি নির্বন্ধিত।

অনু----জংলি একটা, এটুকু সময়ে কি অবস্থা করেছো!!,,, আমার হুকটা লাগিয়ে দাও আর গাড়ির মধ্যে আমি শাড়ি ঠিক করবো কি করে?

রাতুল----( হুক টা লাগাতে লাগাতে অনুর মখমলের মতো স্কিন থেকে হাতটা জোর করে সরিয়ে নিয়ে) কি আর করবি,  এই জংলি বলেই তো তুই ভালোবাসিস আমাকে। এবার কি,,, আমি পড়িয়ে দেব শাড়ি?

অনু---- এই আর দুষ্টমি করো না দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।

রাতুল---- ঠিক আছে তোকে পাঁচ মিনিট সময় দিলাম।

অনু---- কি!!

রাতুল---- হ্যা জাস্ট পাঁচ মিনিট। আর কোন কথা শুনবো না। ইওর টাইম স্টার্টস নাউ,,,,,

***************

টিনা মৃনালিনী দেবীর ঘরে, দক্ষিনের জানালার ধারে, সাদা ধবধবে সোফায়, শিরদাঁড়া টানটান করে বসে আছে। চোখে তার ঘোর, মুখে বিস্ময়ের চুইয়ে পড়া আভা। মুখ দেখলে বোঝা যাচ্ছে খুব বড়সর সত্য উন্মীলিত হয়েছে আচমকাই তার সামনে।
জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে মৃনালিনী দেবী। চোখের পাতা তার আদ্র। একটা দুঃখ চাপাদেয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে টিনার পাশে এসে বসে।

মৃনালিনী দেবী ---- তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে টিনা।

টিনার যদিও এই ভর দুপুরে চা কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই তবু আজ কফিটা খুব দরকার ওর। মাথাটাকে নূন্যতম সচল করার জন্য। এটা পুরো হ্যং হয়ে গেছে। কফিতে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে একটা প্রশ্ন মনে আসে টিনার,,,,,

টিনা---- আন্টি তোমার কখনো মনে হয় না, যে বাড়িতে তুমি অস্তিত্বহীন।( বলার পরই নিজের ব্যবহার কৃত শব্দের অভদ্রতায় নিজেই কুন্ঠিত হয়ে পরলো।)
স,,,,সরি আন্টি,,  আই মিন,,

মৃনালিনী, ----- ডোন্ট প্যনিক,,,,হ্যা মনে হয় সব সময় মনে হয়। নিজের জীবনের ব্যর্থতা, দুর্ভাগ্য, পরগাছা হওয়ার অপমান প্রতিটি ক্ষনে কুরে কুরে খায় আমাকে। আগে মাঝে মাঝেই মনে হতো আচ্ছা মরে গেলে কি কারও কোন ক্ষতি হবে?  কেউ কি দুফোটা চোখের জল ফেলবে? নিজের মানুষের বড় অভাব আমার জীবনে। পরের সাজানো ঘরে নিজের সংসার করার ব্যর্থ চেষ্টা আমার জীবনকে মূল্য হীন করে দিয়েছে। আর আমায় করেছে অস্তিত্বহীন।
তাই তো আজ যখন শুনলাম, বুঝলাম তুমিও আমার মতো একটা সুন্দর সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে তাদের ও নিজের জন্য চরম দুঃখ বয়ে আনতে চলেছো, আগের থেকেই আমি সাবধান করলাম।
আমার জীবনের সকল ভালো খারাপ গুলো আমার হাতে ছিলনা, সেগুলো আমার আপন মানুষ গুলো আমাকে উপহার দিয়েছে। এতে তাদের দোষও আমি দেব না। সোনা আমার হাতে এসে যদি ছাই হয়ে যায় এতে তাদেরই বা কি করার আছে। তবে একজন মেয়ে হয়ে,  রাতুলের মা হয়ে আমি তোমাকে বলছি অনু - রাতুলের মাঝে এসো না। ওরা একে অন্যকে ছাড়া ইনকমপ্লিট, আত্মাহীন,  সৌন্দর্যহীন শুধু কায়া মাত্র।

টিনা---- আমি সরে যাব আন্টি,,, কিন্তু আমিও রাতুলকে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছি। এতো সহজে আমার সে ভালোবাসাকে ছোট আমি ভাববো না। অনুর ভালোবাসা যদি আমার ভালোবাসার থেকে শক্তিশালী হয় তবে তা পরিক্ষার জন্য প্রস্তুত হোক। দেখি কার ভালেবাসার শক্তি বেশি।
রাতুল পাঁচ বছর পর অনুকে দেখে একটু অবাক হয়েছে তাই হয়তো অনুর দিকে একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে ঝুকে পরেছে। তবে সেটা ক্ষনিকের জন্য নয় তার কি প্রমান আছে। এতোদিন তো রাতুল আমাদের বাড়িতে ছিল কই এক বারের জন্যও তো অনুর কথা মনে পরে নি তখন। এসেই ওর এই মোহকে ভালোবাসা বলবো না আমি আর এই মোহোর জন্যে আমার ভালোবাসাকে ছোট করে দেখবো না আমি। আমি রাতুলকে ভালোবাসি আন্টি অনুর থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। তাই ভালোবাসার জন্য শেষ পর্যন্ত আমি চেষ্টা করবো। তোমার মতো অন্যর অনুগ্রহে জীবন চালাবো না আমি। আমার যা কিছু আমি যে কোন মুল্যে তা আমার করেই ছারবো। যা নয় তার দিকে ভুলেও ফিরে তাকাবো না।

মৃনালিনী দেবী বুঝতে পারলেন নিজের বুদ্ধি জ্ঞান এর বাইরে টিনা অযৌক্তিক যুক্তি দাড় করাচ্ছে শুধু আত্ন শান্তির জন্য। সবটা তার চোখের সামনে থাকা সত্বও সে চোখ বন্ধ করে নিজের মতো ভেবে নিচ্ছে সব। রথিন, অমলা,আর তার জীবনের এই ট্রাজেডি ও তাকে এক চুল পরিবর্তন করতে পারে নি। মোহ আর ভালোবাসার পার্থক্য তো টিনা নিজেই বুঝবে একদিন দুঃখের বিষয় ততদিনে সময় না পার হয়ে যায়। আর ভালোবাসা যে জোর করে হয় না তাও বুঝবে একদিন।
যে রাতুলের জন্য ও এতো সব আয়োজন করতে চাইছে, অনুর উপর নিক্ষিপ্ত প্রত্যকটা আঘাত আগে তাকেই আঘাত করবে। আর প্রতি উত্তর ও রাতুই দিবে। অনু এখানে দর্শক ও সমব্যাথী মাত্র।

টিনা---- জানি আমি আপনার কাছে ক্ষমার ও অযোগ্য এখোন। তবুও সরি আন্টি আমার বেঁচে থাকার জন্য, আমার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আমাকে এটুকু করতে দিন।

মৃনালিনী ----- ঠিক আছে,,, তবে তুমিও কথা দাও তোমার পরাজয় হলে তুমি রাতুলের জীবনে আর কোন ঝামেলা করবে না।

টিনা---- কথা দিলাম আন্টি এ পরিক্ষার ফলাফল আমার অনুকুলে না এলে, আমি রাতুলের জীবন থেকে চিরতরের জন্য চলে যাব। তবুও মনে মনে এটুকু শান্তনা তো পাব যে যাকে ভালেবেসেছি তার জন্য আমি লড়াই করেছি।  এমনি অন্যকারও ভালোবাসার প্রতি মিথ্যে সম্মানে নিজের ভালোবাসাকে ছোট করি নি আমি। আমি রাতুলকে জানাব আমার মনের কথা যাতে আজ থেকে পচিঁশ তিরিশ বছর পর আমার মনে কোন অনুতাপ জন্ম না নেয়, যে আমি বললে হয়তো আমার ভালোবাসাকে কাছে রাখতে পারতাম।
এর পরে যাই হোক না কেন তার দায়ী আমি নিজে হব। কাউকে সে দায় ভার বহন করতে দেব না।
অনেকের কাছে জীবন একটা জার্নি,  আবার কেউ বলে এটা পথ, আমার কাছে জীবন আজ, এখন, এই মুহুর্ত। অতীতে কি হয়েছে মিনিংলেস আমার কাছে, ভবিষ্যতে কি হবে তা কেয়ালেস,  শুধু বর্তমানে বিশ্বাসী আমি। আমার বর্তমান রাতুল, রাতুলের সাথে থাকা মুহুর্ত। তাই আমি রাতুলের জন্য আমার বর্তমান টাকে যুদ্ধে পরিনত করলাম।
ভালোবাসা পাওয়ার যুদ্ধ।



❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤
প্লিজ,,,, প্লিজ গল্পটা কেমন লাগছে জানাতে ভুলবেন না। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায়,,,,

রাতুল অনুরাধাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে দুপুর  গড়িয়ে যায় প্রায়। প্রাসাদের দরজায় গাড়ি থামিয়েই অনু তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে দেখে দরজা লক। আর রাতুলের মুখে বাঁকা হাসি। অনু রাতুলের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে বলে উঠলো,,

অনু---- দরজা খোলো এমনিতেই কত দেরী হয়ে গেলো।

রাতুল---- তুই কি আমায় তোর ড্রাইভার ভেবেছিস? যে এসেই বলবো,,, ম্যডাম এসে গেছি এবার নামুন।

অনু--- তো!!!

রাতুল---- তো আবার কি,,, আমি তোর ড্রাইভার নই বুঝেছিস,,,এখন তা প্রমান কর।

অনু---- আর সেটা কিভাবে?

রাতুল---- আমি কি জানি?  তুই ভেবে বেড় কর।

অণু---- এবার সত্যি দেরী হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি কখন এসেছে,,,, আর আমি ভেতরে যাই নি, এবার দেখবে মহিকাকা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসবে।

রাতুল----(অনুর মুখের কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে হালকা ঠোঁট টা মুছে) তোর এতো কথা, কে শুনতে চেয়েছে। আমার পাওনা দিয়ে দে তারপর,,, তুই চলে যা।

অনু---- তোমার আবার কি পাওনা!!!,,,,,,,,,ইস!! শুধু মাথা ভতি শয়তানী।

রাতুল---- বুঝতে পেরেছিস যখন তখন কিন্তু তুই দেরী করছিস।

অনু নিরুপায় হয়ে রাতুলের গালে একটা দীর্ঘ চুম্বন একে দিলো।

রাতুল----এই,, তুই কি ভাবিস আমি ছোট বাচ্চা তুই আমার গালে কিস দিবি।

অনু---- কেন? হয় নি?

রাতুল---- ঠিকঠাক জায়গায় দে। নইলে,,,,

অনু---- এই শোনো না বলছি কি,,,,

রাতুল---- তোর যত কথা পরে শুনবো আগে আমার পাওনা দে,,,,

অনু বুঝলো এখন রাতুলের মাথার ফাজলামো অন্য কোন ভাবেই সরানো সম্ভব নয় তাই,,, বেশ জোরে এক হাতে রাতুলের কলার ধরে অন্য হাতে মাথার পিছনের চুলগুলো আলতে করে ধরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো রাতুলের ঠোঁটে। রাতুলও দুহাতে অনুর বাঁকা শরীরটাকে আলতো করে জরিয়ে ধরে তৃপ্ত হতে লাগলো।  কিছুক্ষণ পরে অনু ছাড়তে চাইলেও রাতুল যখন কোন ভাবেই অনুর ঠোঁট দুটোকে স্বাধীন করতে চাইছিল না , অনু একটা ছোট্টো কামর বসালো রাতুলের ঠোঁটে। রাতুল "" উফ"" শব্দে এবার ছাড়িয়ে নিলো।

রাতুল---- এটা কি করলি?

অনু ---- তা কি করবো?এখানে কি সারাদিন থাকতে চাও নাকি। চলো, ভেতরে চলো।

রাতুল---- (কপট রাগে)পরে বুঝবি এর মজা।( বলতে বলতে লক খুলে)

অনু---- আমাকে আর নাগালে পেলে তো,,,( বলেই ছুট)
রাতুল হাসতে হাসতে চলে গেলো।

**********
বিকেলে রাতুল গ্রাম গুলে ঘুরে দেখতে যাবে। অনু যেতে পারবে না তা বলে দিয়েছে। তবে কোথায় কোথায় যাবে তা বুঝিয়ে দিয়েছে। অরিন্দম আর টিনার যাওয়ার কথা থাকলেও অরিন্দম পিছিয়ে গিয়েছে ছবি আঁকার বাহানা দিয়ে। তাই শুধু টিনা আর রাতুল ঘুরতে যাচ্ছে।
টিনা যখন বুঝতে পারলো শুধু রাতুল আর ও যাবে বেড়াতে তখন আনন্দে আত্নহারা হয়ে গেলো।

গাড়িতে পাশাপাশি বসে আছে রাতুল ও টিনা।

টিনা---- রাতুল তুমি গ্রাম খুব ভালোবাসো, তাই না?

রাতুল----আমি,,!!!,এ বিষয়ে কি বলি বলো তো? ছোট বেলা থেকে এখানেই বেড়ে উঠেছি তাই এ গ্রাম, এ পরিবেশকে আলাদা করে ভালেবাসি কি-না এটা ভেবেই দেখি নি। তবে এখানকার আকাশ, বাতাস,  গাছ পালা মানুষজন কে দেখলে, এদের সংস্পর্শে এলে মনে হয় সত্যিকারের বেঁচে আছি। এরা ছাড়া যেন নিজের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাই না।

টিনা---- (অবাক দৃষ্টিতে রাতুলের দিকে চেয়ে) তুমি এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারও কই আগে জানতাম নাতো।

রাতুল---- তুমি এতোদিন যে রাতুলকে দেখেছো সে ছিল কর্তব্যের বেড়াজালে,  শপথের শৃঙ্খলে বন্দি। আজ আমি মুক্ত তাই আমার শব্দও আমার মতো মুক্ত। তাছাড়া আরও একটা কারণ আছে সেটা আর একদিন বলবো।

টিনা---- কোন শপথ, কর্তব্যের কথা বলছো।

রাতুল---- বাবা আমাকে শপথ করিয়ে ছিলো যে আমি  আর কোন কিছু না ভেবে শুধুই মনোযোগ দিয়ে ডাক্তারি পরবো। আর বাবার কথা শোনা আমার কর্তব্য ছিলো।

টিনা---- ও এজন্যই তুমি সবসময় চুপচাপ থাকতে।

রাতুল---- না আর-ও কারণ ছিল। ( অনুর থেকে দুরে থাকলে আমি হাসি কিভাবে,,,,, মনে মনে) বাদ দাও এসব কথা,,চলো ওই জেলে পাড়ার ওখানে যাই। যাবে?

টিনা---- (উৎসাহের সাথে)  হ্যা হ্যা চলো।

টিনার কোন অভিজ্ঞতাই নেই এতো নিম্নস্তরের মানুষের জীবন সমন্ধে। টিভিতে এক আধ দিন গ্রাম বা জেলেদের দেখলেও বাস্তবে এর রুপ বেঝা আসলেই ওদের মতো এসি ঘরে বাস করা, দামী গাড়িতে চড়া মানুষ গুলোর জন্য অসম্ভব।  সেজন্যই টিনা প্রথম প্রথম জেলেপাড়া শব্দটিকে কোন পার্কের সাথে বা শহরের বিশেষ কোন জায়গার সাথে কল্পনা করে আনন্দে আত্নহারা হয়ে গেলো।
রাতুল একটু পরে একটা গলির মাথায় গাড়ি থামিয়ে টিনার উদ্দেশ্যে বললো"" চলো এখান থেকে হেটে ভেতরে যেতে হবে।""
টিনা বেশ উৎফুল্ল মনে রাতুলের সাথে হেটে চললো। অচেনা জায়গা, গ্রামের পথ, সাথে ভালোবাসার মানুষ টিনার মন যেনো গেয়ে উঠলো,,,,
"" এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলোতো,, যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলোতো।"""
নিজের ব্যবহারেই অবাক টিনা এইতো দুদিন আগেই  রাতুলের সাথে পাড়ি দিয়েছে কয়েকশো মাইল পথ,,, কই তখনতো এরকম অনুভূতি হয় নি বরং তখন মনে হয়েছে কখন শেষ হবে এ পথ আর আজ,,,, সত্যি এ এক অন্যরকম ফিলিং। "ইস যদি সত্যি সত্যি এই সময়টা অনন্তকাল ধরে চলতো।" মনে মনে ভাবে টিনা।

দুজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ চলে এলো এবার টিনার ফ্যনটাসি দুনিয়াটা ফ্যেকাশে হওয়া শুরু হয়েছে। ওর হাইহিলের হিল রাস্তার জমা জলে সৃষ্ট কাঁদায় খানিকটা ডুবে যাচ্ছিল, চারদিকে অর্ধ উলঙ্গ ছোট, ছোট বাচ্ছাটা তার হাটু পর্যন্ত টপস এর পরে যে দুধের মতো ফর্সা, কোমল ত্বক সমৃদ্ধ পা বের হয়ে আছে সেদিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আবার কেউ টিনার বারবি ডলের মতো সুন্দর চেহারার পানে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে আছে।
টিনা হয়তো এগুলোকেও ইগনোর করতো কিন্তু রাতুল টিনার কোন পরোয়া না করে শুধু লুঙ্গি পরা, রোদে পোড়া চামরার খালি গায়ের লোকেদের সাথে এমন ভাবে মিশতে লাগলো যেন এরা এদের কত কালের বন্ধু। কোন কোন মানুষকে দেখে টিনার গা গুলিয়ে এলো কিন্তু রাতুলের কোনো সমস্যা দেখা গেলো না বরং সে আনন্দের সাথে তাকেই বুকে জরিয়ে ধরছে ; কাউকে বলছে" এবার আর ভয় করো না আমি তোমার ইচ্ছা পুরোন করেছি,,, ডাক্তার হয়েছি আমি"" সবাই দু হাত রাতুলের মাথায় রেখে আশীর্বাদ করতে লাগলো।
টিনার কাছে এগুলো একটু বেশি বেশি আর অসহ্য লাগতে লাগলো।"" এসব লোকদের এতো আদিখ্যেতা করার কি আছে। টাকা পয়সা দিলেই তো ওরাও খুশি আর আমরাও ভালো থাকি। তবে এ লোক গুলোও রাতুলের সাথে এমন আচরণ করছে যেনো তাদের কত আপন জন ওদের মাঝে ফিরে এসেছে, এগুলো অন্য কিছু না সব টাকা হাতানোর পায়তারা।"'" মনে মনে ভাবছে টিনা।

একটু পরেই টিনার নাকে মাছ পঁচার আঁশটে গন্ধ লাগতে লাগলো কিন্তু রাতুল নির্বিকার। আস্তে আস্তে ওরা যতই সামনে এগুতে লাগলো গন্ধটা ততই প্রবল আকার ধারন করতে লাগলো। শেষমেশ টিনা রাতুলের হাত চেপে বলেই ফেললো "" রাতুল প্লিজ টেক মি আউট অফ দ্যা স্মেল,,আই কান্ট ব্রেথ।"
রাতুল তাড়াতাড়ি টিনার হাত ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। টিনাও কোন রকম পা মিলিয়ে গাড়ির গাড়ির কাছে চলে এতো। এবার টিনার ফ্যন্টাসী ওয়াল্ডটা সত্যি সত্যি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।

রাতুল---- টিনা তুমি এখন ঠিক আছো?

টিনা---- সরি রাতুল আমার জন্য তোমাকে এভাবে আসতে হলো।

রাতুল---- ইটস ওকে আসলে তুমি তো কখনো জেলেদের মাছধরা দেখো নি,, দেখলে বুঝতে ওদের কত কষ্ট কত সমস্যা। বাবা আগে প্রাই আসতো এদের খবর নিতো, আমি আর অনু মাঝে মাঝেই আসতাম বাবার সাথে। তারপর আমি ও অনু এদের সমস্ত ভালো মন্দের দেখাশুনা করতাম। আজ জানলাম অনু প্রায় প্রতি সপ্তাহে এনাদের খবরাখবর নিয়ে থাকে।

রাতুলের মুখে অনুর কথা শুনতে ভালো লাগে না টিনার তাই বললো,,, ""  চলো বাড়ি যাবো আমার আর ভালো লাগছে না।""

রাতুল ---- ঠিক আছে চলো।
********

খাওয়া দাওয়া শেষে রাতুল ও টিনা বেরিয়ে গেলে রমা প্রসাদ বাবু ,,, রথিন ও মৃনালিনী,  সবাই সবার রুমে চলে গেলে,,,হঠাৎ অরিন্দম অনুর সামনে গিয়ে বলে,,,,মিস অনু ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড কেন উই টক ? আসলে আমি এখন একা তো।

অনু---- হ্যা অবশ্যই বসুন না।

অরি---- (অনুর চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক দৃষ্টিতে)  ইউ হ্যব মোস্ট বিউটিফুল আইজ আই ইভার স'।

অনু---- (লজ্জা পেয়ে) তাই বুঝি,,, ধন্যবাদ। তা কেমন লাগছে আমাদের গ্রাম।

অরি---- দুপুরে একটু বেড়িয়ে ছিলাম,,, বেশ ভালোই লাগলো। আচ্ছা এখানে দেখার মতো আর কি কি আছে?

অনু---- এখানে নদীর ধারে ছোট ছোট পার্ক আছে, সাজানো কতগুলো গ্রাম আছে, আর আছে সংগ্রামী মানুষের জীবন যাত্রা।

অরি---- আপনি কি আমাকে আপনাদের এই গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবেন?

অনু---- আজকে গেলেই তো পারতেন। রাতুলদা আর টিনা দিদি গেলো।

অরি---- না কাবাব মে হাড্ডি হয়ে কোন মজা নেই। আমি আপনার সাথেই যাব।

অনু---- কাবাব মে হাড্ডি মানে?

অরি---- (মনেমনে,,,আমাকে ক্ষমা করো অনুরাধা)  মানে দুজন প্রেমিক প্রেমিকার মাঝখানে থাকা উচিত নয়।তারপর যখন মেয়েটি আমার বোন। বড় বোনের রোমান্স ছোট ভাই দেখা ঠিক না।

অনুর হঠাৎই ফেকাসে হওয়া মুখখানি দেখে অরিন্দম এর বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো। মনে হতে লাগলো ঠিক তত পরিমান ব্যথা যেন অরিন্দম এর বুকেও হচ্ছে। অনুর চোখের অবাধ্য জল যেন অরিন্দমের বুকের রক্তের সাথে বের হচ্ছে।
আচ্ছা একদিনের পরিচিত একটা মেয়ের জন্য এতোটা অনুভূতি কি সম্ভব? এক মুহুর্তে কারও সাথে এ রকম ভাবে জরিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?

ধীরেধীরে চলে যাচ্ছে অনু। যেন বলশূন্য, পা দুটো, মুখে নিদারুণ কষ্টের ছাপ।

অরিন্দমের মনে হচ্ছে এক ছুটে অনুর সমস্ত দুঃখ কে সরিয়ে দিয়ে বুকের মাঝে জরিয়ে রাখতে,,, কিন্তু হায় ভাগ্য,,,,অরিন্দমই তো সবচেয়ে রড় কষ্ট দিলো মেয়েটিকে।
"" অনু ভালো থাকবে তো??"" বার বার এই একটি প্রশ্নই প্রতিধ্বনি হতে লাগলো অরিন্দমের মনে।


❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

রাতুল ও টিনা সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ বাড়ি ফিরলো। রাতুল গাড়ি করে ওদের ছোট্ট আধা শহর খানি বেশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়ে দিলো টিনাকে। টিনাও বেশ উৎফুল্লতার সাথে ঘুরে খুশি খুশি মুখ নিয়ে বাড়িতে এলো।
রতুল বাড়িতে এসে সোজা ঘরে গিয়ে একটা লম্বা স্নান নিয়ে একদম ফ্রেস হয়ে ঘরে অনুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। ও জানে অনু অবশ্যই আসবে কি কি হলো তা জানতে। আর তাতে টিনা সাথে ছিলো একটু জেলাসি ও মেশানো থাকবে প্রশ্নে, আর সেই টুকু রাতুল বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবে।
কিন্তু রাতুল বাড়ি আসার একঘন্টা পরও যখন অনু রাতুলের ঘরে এলো না, এবার রাতুলেরই বিরোক্ত লাগতে উঠলো । তাই মহিকাকা সন্ধ্যা বেলায় কফি দিতে এলে বলেই ফেললো,,,

রাতুল---- মহিকাকা অনু কোথায় বলো তো?

মহিধর---- ফুল মা তো সেই দুপুরের পর নিজের ঘরে বসে আছে। কত করে ডাকলাম,  একবারও ঘর থেকে বের হলো না।  জানি না কি হয়েছে।

রাতুল---- হঠাৎ,,,,কি হলো আবার? ( চিন্তার ভাজ কপালে একে)যাই তো দেখি একবার,,,

************

অনু সেই তখন থেকে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে নিস্তেজ প্রায়।
একবার তার মনে হচ্ছে রাতুল কখনো অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে না। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে,,, কেন বাসতে পারে না? টিনা সুন্দরী, আধুনিকা,  রাতুলর যোগ্য, আর আমি তো শুধু ওর ছোটবেলার বন্ধু আর একটা আশ্রিতা মাত্র।

""আচ্ছা রাতুল কি ভুলে গিয়েছে ঐ কৃষ্ণ মন্দিরে ও আমাকে সিঁদুর পরিয়েছিল? না কি ও যেমন ঈশ্বরে অবিশ্বাস করে তেমন ভাবে এই সিঁদুরকেও অবিশ্বাস করবে।

ও যদি আমাকে ভালো নাই বাসবে তবে বার বার আমার কাছে আসার এমন পাগলামি, আমায় আদোরে আদোরে ভাসানো এ সব, এ সব তাহলে কি?
না কি এসব ওর ফেলে আশা কৈশোরের অভ্যাস শুধু।

আমি যে রাতুলদার চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখি,  এক সমুদ্র ভালেবাসা, সে সব কি মিথ্যা?
না কি সে ভালোবাসা শুধুই টিনাদির জন্য। আমি সেখানে অবাঞ্ছিত অথবা দর্শক মাত্র।"" এভাবেই নিজের মনেই হাজারো যুক্তি দাঁড় করিয়ে আবার নিজেই সেটা খন্ডন করছে অবিরত।

রাতুল অনুর ঘরে ঢুকেই দেখে, অনু ঘর অন্ধকার করে রেখেছে। অন্ধকার ঘর দেখেই রাতুলের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। অনু তো অন্ধকার একে বারেই পছন্দ করে না,  তবে আজ কি এমন হলো? তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালালো রাতুল। আলো জ্বালাতেই দেখতে পায়,,,

অনু খাটের কাছে মেঝেতে এলোমেলো ভাবে বসে আছে, মাথাটা তার খাটের কাঠে ঠেকানো, চুল গুলো খোলা, চোখ দুটো বন্ধ বিধ্বস্ততার ছাপ সম্পূর্ণ চেহারায়। চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া জলে দাগ। অনুর এ অবস্থা দেখে বুকটা কেঁপে ওঠে রাতুলের। প্রায় ছুটে গিয়ে অনুর সামনে বসে অনু মুখ খানি তুলে বলে
""এই,,, অনু কি হয়েছে তোর এভাবে বসে আছিস কেনো,,,,,, কি রে কি হয়েছে!! বল?""
অনুকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে রাতুল ওকে শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো"" কি হয়েছে,,, বলবি না আমাকে? ""

রাতুলের শক্ত বাহু বন্ধনে আবদ্ধ অনু ধীরে ধীরে চোখ খুললো, আবার অশ্রু ধারা; অনুর শত বাঁধা অমান্য করে বয়ে যেতে লাগলো।রাতুল ধীরে ধীরে অনুকে প্রায় তার কোলে বসিয়ে নিয়ে পিঠে হাত বোলাতে লাগলো। এ তে কান্নার বেগ যেনো আরও বেড়ে গেলো।

অনুর এরকম নিরবতা ও কান্নায় ভেঙে পরা রাতুলের পক্ষে সহ্য করা যে কত কষ্টের তা যদি রাতুন অনুকে বোঝাতে পারতো,তবে হয়তো এতো সমস্যার সৃষ্টিই হতো না।

রাতুলের চেষ্টা, ও পরে অনেক অনুনয়-বিনয় করেও যখন অনু একটা কথাও উচ্চারণ করলো না বরং কান্নার বেগ বাড়াতে লাগলো রাতুলের নিজেকে দিশেহারা মনে হলো। ""এই তো দুপুরে ভালো ছিলো এতোটুকু সময়ে এমন কি হলো, যে অনুর এ অবস্থা হয়ে গেলো""" তা ভাবতে ভাবতেই একটা পুরনো কথা মনে পড়লো ও সেটাই এপ্লাই করলো।

"" আমি তোকে আমার দিব্যি দিলাম, (ধরা গলায়)ভালো চাস তো বল এবার,,, নইলে তুই জানিস তো আমি,,,, মরেও,,,,

অনু রাতুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে নিজেকে একটু সংবরণ করে বলে উঠলো,,,""  তুমি কি শুরু করেছো বলোতো আমি,,,,আমি এমনি কাঁদছিলাম। ""

রাতুল---- তুই কখনই এমনি কাঁদিস না অনু,,, আমার কাছে অন্তত এই স্পাইন লেস কারণ গুলো দেখাস না। কি হয়েছে ভালো করে বল।

অনু---- তুমি আমাকে ভুল জানো,,,আমি এখন কারণ ছাড়াই কাঁদি। (বলতে বলতে রাতুলের কোল থেকে উঠে গেলো অনু, রাতুল ও বাঁধা দিলো না।)

রাতুল---- তুই কি সত্যিটা বলবি না কি আমার দিব্যিটাই সঠিক হবে।

নিশ্চুপ অনু,,,

রাতুল---- তুই তাহলে আমার কাছ থেকে, কথা লুকানো শিখেছিস। আচ্ছা বলবি না যখন আমি জোর করবো না। তবে তুইও আমার মতো আজকাল দিব্যি টিব্যি মানিস না জেনে ভালো লাগলো।
বলেই দরজার কাছে চলে গেলো রাতুল,,,

অনু---- অরিন্দম দা বললো তুমি না কি টিনাদিকে, আর টিনাদি তোমাকে ভালোবাসে। (চোখ বন্ধ করে কথাটা ছুরে দিলো রাতুলকে)

রাতুল তখন দরজা পার হয়ে গিয়েছিলো প্রায়,  এবার সে আবার অনুর দিকে বেশ রাগী রাগী ভাব নিয়ে এগিয়ে গেলো। 
চোখ খুলে ভয় ভয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগলো অনু। রাতুলের মুখে রাগ না কি আর কিছু ,তা বুঝতে পারছে না অনু।

রাতুল অনুর একেবারে কাছে এসে, রেগেমেগে  স্পষ্ট গলায় বললো"" আর তুই বিশ্বাস করে নিলি!! নিজের বরের প্রতি, নিজের ভালোবাসার প্রতি এতোটুকু বিশ্বাস করতে পারলি না।
কেন রে? বল আমায়,, যে যাই বলুক তুই তাতেই বিশ্বাস করবি,?কি হলো বল, এতোটুকু ভরসা করিস না আমায় তুই? ""

"" তোমাকে ভরসা করি কিন্তু নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করি না, নিজের যোগ্যতাকে ভরসা করি না আমি।  যতই হোক আমি তোমাদের আশ্রিতা, টিনাদির মতো অতোটাও মর্ডান নই আমি,  আর টিনাদি কি সুন্দর, তোমার সাথে মানায়ও দারুন তাই,,,

রাতুল---- চুপ, একদম চুপ এতো কথা চিন্তা করতে তেকে কে বলেছে? এ কথা সেদিনও বলেছি আজও বলছি, আমি ছাড়া যেমন তোর উপর আর কারও অধিকার নেই, তেমনি তুই ছাড়া আমার উপরও অন্য কারও অধিকার নেই। আমরা দুজন শুধু দুজনের বুঝেছিস?

অনু---- তুমি যে আমার থেকেও ভালো কাউকে ডির্জাভ কর রাতুলদা। আমি টিনাদির চোখে তোমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি। তাই,,,,,আমি আজ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে নিজেকে তোমাদের কাছ থেকে দুরে নিয়ে যাব।আর,,,

রাতুল---- চুপ,,,একদম চুপকর। আমিও অরিন্দমের চোখে তোর জন্য নেশা দেখেছি তাই বলে কি তোকে ছেড়ে দেব? তোর আসেপাশে কেউ এলে তাকে খুন করবো আমি; সে যেই হোক।
তবে আজ মনে হচ্ছে তুই আমাকে ততোটা ভালোবাসিস না অনু যতটা একদিন বাসতিস। শুধুমাত্র অরিন্দমের মতো অচেনা অজানা একটা ছেলের কথায় যখন তুই নিজের ভালোবাসাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারিস তবে যা আমি তোকে বাঁধা দেব না।
যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাবা,  মা, দাদু এদের কথাটাও একবার ভাবিস।

এ কথাগুলো বলেই প্রচন্ড রাগে হনহন করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো রাতুল।

রাতুল উপরে উঠে দেখে, ওর ঘরের বাইরে টিনা দাঁড়িয়ে আছে। ও টিনার সাথে কোন কথা না বলে  ঘরে ঢুকে "দড়াম" করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়, ""ওইতো সমস্ত সমস্যার মূলে, আমার অনুর কষ্টের কারণ ।"" টিনাকে দেখেই রাগটা যেনো কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। রুমে এসে বেলকোনিতে দাড়িয়ে অনুর নির্বুদ্ধিতার কথা বার বার মনে করতে থাকে রাতুল।

রাতুল মনে মনে ভাবে ""অনু কিভাবে ভাবতে পারে এমন কথা। টিনা অতি আধুনিক আর অনুভূতি হীন একটা মেয়ে। এক বছরে ও কাপর চেঞ্জের মতো নিজের বয়ফ্রেন্ড চেঞ্জ করে। হ্যা পড়াশুনার জন্য একজন বন্ধু অন্য বন্ধুর সাথে যতটুকু কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন, সময়ে ততটুকু অথবা তার থেকেও দুরত্ব রেখে চলেছি আমি। মাঝে টিনা নিজে এসে আমার সাথে যেচে কথা বলতো তবে সেটা যে শুধুই কৌতুহল তা আমি বুঝতাম। ওর গন্ডির বাকি ছেলেদের মতো আমার ব্যবহার ছিল না বলেই হয়তো এতোটা কৌতুহল ছিলো। তবে এখানে আসার পর থেকে ওর ব্যবহারের একটু পরিবর্তন ছিল কিন্তু তা ঠিক কতটা আর কি সেটাতো নিজেও বুঝতে পারছি না।
আর অরিন্দম!! ও একথা কেনো বলবে অনুকে! ওর এতে কি স্বার্থ? তবে কি এরা দুজন আমাদের আলাদা করতে চায়?উফফ,,,  মাথাটা চেপে ধরে রাতুল। এদের সাথে কাল সকালে কথা বলতেই হবে।

কতক্ষণ যে এভাবে বেলকোনিতে ছিল রাতুল তা ও নিজেও জানে না। এর মধ্যে মহিধর ডিনারের জন্য ডেকে গেলেও না করে দিলো। আজ এতো দুশ্চিন্তার মধ্যে খেতে ইচ্ছে করছে না। দেখতে দেখতে ড্রয়িংরুমের পেন্ডুলাম ঘড়িটায় ঢং ঢং করে রাত বারোটার জানান দিল। রাতুল তখনো উদাস চোখে দুরে বহুদুরের তারাদের পানে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বলছে "অনু কি কখনো বুঝবেনা ও ছাড়া আমি কতটা একা, আমি কতটা অসম্পূর্ণ? " একটা দীর্ঘশ্বাস বুক বেয়ে উঠে আসলো।

আচমকাই অনুর গায়ের গন্ধ, উপস্থিতি অনুভব হচ্ছে রাতুলের। তবে কি সে এলো, কিন্তু এতো রাতে, আবার কোন সমস্যা!!
চেনা, অতি প্রিয় দু'টি হাত হঠাৎই উঠে এলো কাঁধ বেয়ে,বুকের কাছে এসে থেমে গেলো। তারপর মুখটা কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললো "" আ'ম সরি,,,,আ'ম সরি,,,,,,আ'ম সরি,,,,রাগ করো না। অনেক ভাবলাম পৃথিবীর কোন কিছুর জন্য তোমাকে আমি হারাতে পারবো না। এক মুহুর্তের জন্যও না। কারও জন্যও না। অনেক পরীক্ষা দিয়েছি আমরা এতোগুলো বছরে, আর না। আমি শুধু তোমাকে চাই, শুধু তোমাকে।

চোখ বন্ধ করে আছে রাতুল, স্বপ্ন নয় তো!  আবেগি মেয়েটা সব দিধা কাটিয়ে নিজের মনকে বুঝতে পেড়েছে অবশেষে।  না কি সব কল্পনা।

অনু রাতুলের সামনে এসে ওর কোলে বসে কপালে গলায় ও রাতুলে সবচেয়ে পছন্দের কানে ঠোঁটের ছোঁয়ার সাথে আলতো কামর বসিয়ে দেয়। শিহরণ খেলে যায় রাতুলের সমস্ত শরীরে। চোখ খুলে দেখে অনু লাল শাড়িতে, লাল টিপে, সিঁথি ভত্তি সিঁদুরে  নব বধু রুপে বসে আছে রাতুলের কোলে।

অনুর এ মোহনীয় রুপে নিয়ন্ত্রণ হীন রাতুল।

রাতুল---- এই পাগলি,,,, তুই এভাবে সামনে এলে আমি যে পাগল হয়ে যাই তুই বুঝিস না। তোকে আদর করার লোভ আমি যে সামলাতেই পারছি না। ( অনুকে আর একটু টেনে কোলর উপর বুকের কাছে টেনে বসিয়ে ওর গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো রাতুল। হাত চলে যায় ব্লাউজের বাধা পেরিয়ে স্পর্শ কাতর জায়গায়, সুউচ্চ নিটোল পয়োধর নিয়ে এক কামার্ত খেলায় মেতে ওঠে রাতুলের হাত।

অনু----  কেঁপে ওঠে অনু আবেগে চোখ বন্ধ করে ,,,,মুখে বলে,,, "" আজ তোমার ভালোবাসা সারা গায়ে মাখবো বলেই তো তোমার বৌয়ের সাজে এলাম। আজও কি নিজেকে সামলে রাখতে চাও?

অনুর কথায় রাতুল মুখ তুলে চাইলো অনুর চোখের দিকে।ততক্ষণে অনুর ও চোখে আগুন, শুধু কামনার আগুন। রাতুলের ভালোবাসার বর্ষনে তৃপ্ত হওয়ার এক দুর্নিবার আবেদন। রাতুল আনন্দে আত্নহারা হয়ে, এক নিমিষেই তার শক্ত পেশিবহুল হাতদুটো দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নিলো তার অনুকে, আবেশে অনু চোখ বন্ধ করে নিল। ঘরে এসে অতি যত্নের সাথে অনুকে শুইয়ে দিলো বিছানায়। রাতুলের ঠোঁট দখন করে নিলো অনুর ঠোঁট, চার হাত ব্যস্ত একে অন্যের আবরণ উন্মোচনে। চুম্বন গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো আর শরীর আবরণ হীন। নিঃশ্বাসের দ্রুততার সাথে শরীরের চাহিদা বেড়ে উঠছিল। অনুর নিরাবরণ দেহ পল্লবী কে রাতুল প্রতক্ষ্য করলো অবাক দৃষ্টিতে। এতো নিখুঁত, অপূর্ব, কোমল এ কায়া এ বুঝি পৃথিবীর বুকে সব চেয়ে আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম । অনুর শরীরের কোনে কোনে রাতুল খুঁজে পেতে লাগলো তার আবেগকে শুষে নিতে লাগলো প্রাণ ভরে। যেন জনমের তৃষ্ণাত্ব আজ আকন্ঠ পান করছে। অনুও উন্মত্ত নদীর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো রাতুলকে।

রাতুলের ঠোঁট পান করতে লাগলো অনুর দেহের আবেগ, ভালোবাসার ছোঁয়ার আনন্দে ঘনঘন কেঁপে ওঠা দেহের কোনে কোনে এঁকে দিলো ভালোবাসার পরশ। অতুল আনন্দে অনুর নিশ্বাস শীৎকার ধ্বনি হয়ে রাতুলের মনে তীব্র থেকে তীব্রতর উত্তেজনার সৃষ্টি করছে । ঘনঘন নিশ্বাসের সাথে সুগঠিত বক্ষ যুগলের ওঠা নামায় কৌতুহলী হাত দুটো যেন উত্তেজনা সৃষ্টির খেলায় মেতেছে কখনো আদরে কখনো শাসনে তারা পিষ্ট হয়েও যেন আরও শাসনের দাবী করছে। অনভিজ্ঞ শরীরে রাতুল অনুর দেহে নিমজ্জিত হলো ; অনু ভালোলাগায়, যন্ত্রণায় দুহাতের নখের চিহ্ন এঁকে দিলো রাতুলের বুকে, পিঠে।
রাতুলের ভালোবাসাও লাভ বাইট হয়ে ছরিয়ে পরলো অনুর ঠোঁটে,  নরম বুকে, মখমলের মতো গলায়, কখনো পিঠে। প্রত্যকটা ছোঁয়া দুজনেই মন থেকে অনুভব করতে লাগলো। পাগলের মতো ভালেবাসায় আর আদরে আদরে সিক্ত হতে লাগলো। এক চরম মুহুর্তের পরে দুজনেই ভেঙে পরলো। এক জোড়া ক্লান্ত দেহ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তৃপ্তির হাসি মুখে টেনে ঘুমিয়ে পরলো।

আমার হাত তোর হাত ছুঁয়েছে আজ,
আগেও ছুয়েছে বহুবার।
এমন পরিতৃপ্তির অনুভূতি,
হয়নি যেন বহুকাল।

আমার মন তোর মন ছুঁয়েছে,
ধরা দেয়া, ধরা পরার খেলা
সাঙ্গ হয়েছে কবে।
আজ হতে সে বাঁধা পরেছে,
তোর আদরে কেঁপে ওঠা অধরে।

আমার শরীর তোর শরীর ছুঁয়েছে,
দেয়া নেয়ায় কেটেছে প্রতিটা ক্ষণ।
এতোদিন আমার মনটা ছিল তোর,
আজ  হতে আমার শরীরেও
তোর অবাঁধ বিচরন।


রাতুল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত অনুর দিকে। রাতুলের বুকের সাথে লেপ্টে আছে অনু, ওর উন্মুক্ত পিঠের উপর রাতুল আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রেশমের মতো চুলগুলো অগোছালো হয়ে বালিশের উপর ছরিয়ে আছে,কখনো হালকা বাতাসে ছুঁয়ে যাচ্ছে রাতুলের মুখ চোখ।  রাতুলের ঘুম নেই আজ, যেনো সব ঘুমেরা ছুটি নিয়েছে। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে অনুর দিকে।

"" পাগলিটার এতো সাহস এলো কোথা থেকে? তবে  আজ যা হলো এ নিয়ে আবার কষ্ট পাবে না তো!! তারাতাড়ি আমাদের সামাজিক বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কি জানি অনু ঘুম থেকে উঠে কি ভাবে""( রাতুলের কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিলো)

রাতুল আস্তে করে একটা চুমু এঁকে দেয় অনুর মাথায়। তাতেই ঘুম ভেঙে যায় অনুর। ঘুম থেকে উঠেই রাতুলের মুখটা দেখে খুশি হলেও নিজের বিবস্ত্র অবস্থা দেখে লজ্জায় পরে যায় অনু। রাতুল অনুর লজ্জা রাঙা মুখটা দেখে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বুকে । আলতো করে কপালে একটু আদর করে বলে,,,""কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো তোর,, হলে আমাকে বল। একদম লজ্জা করবি না।""

অনু রাতুলের প্রশস্ত বলিষ্ঠ বুকে তার নরম ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে বললো"" সব সময় ডাক্তারি করও না তো। আমি ভালো আছি। এবার ছাড় আমি ঘরে যাব। """

"" থাকনা আর একটু সময়,,, ---- রাতুল

অনু---- আর না ভোর হতে চললো।

রাতুল---- তবে বার্থরুমে চলে,,, বার্থটবে গরম জল রেখেছি তোর জন্য।

অনু---- লাগবে না,,,,,

রাতুল জোর করে অনুকে কোলে করে নিয়ে বার্থরুমে বার্থটবের একসাইডে বসালো।

অনু----( অবাক দৃষ্টিতে বড় বড় চোখ করে) আমি একাই স্নান করতে পারি,, ওকে,,,!!! তুমি এখানে কেনো?? যাও এখান থেকে।

রাতুল---- একদম চুপ থাক( বলে একটা মাসাজ অয়েল নিয়ে অনুর ঘারে মালিস করতে লাগলো।
রাতুলের হাত যখনি অনুর পুরো শরীরে বিচরণ করতে লাগলো অনু শিহরিত হলেও দেখলো রাতুলের চোখে কোন কামনার আগুন নেই বরং শুদ্ধ ভালোবাসার উপস্থিতি । রাতুল পরম যত্নে অনুর সারা শরীরের অস্বস্থি দুর করে দিলো।

অনু---- কলকাতায় কি ডাক্তারি পড়েছো না  মাসাজ পার্লারে ট্রেনিং নিয়েছো?? (হিহিহি)

রাতুল---- সবই শিখতে হয় দেখ আজ মাসাজটা কেমন কাজে লাগলো। কি এখন ভালো লাগছে না?

অনু---- হুম ফ্রেস লাগছে বেশ।

রাতুল ---- তারাতাড়ি চল গরম জলে স্নান করে নে।

অনু শুধু রাতুলের আদেশ অনুসরণ করলো জানে এর অন্যথা রাতুল মানবে না। রাতুল অনুকে স্নান করিয়ে, কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে অনুর ঘরে এলো। অনুকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে,,,,
"" আর একটু ঘুমিয়ে নে,,, তাহলে আরও ফ্রেস লাগবে""

অনু---- আমায় নিয়ে এতো চিন্তা করা বন্ধ করো তো। আমার একদম ভালো লাগছে না। আর আমার এমন কিছুই হয় নি।

রাতুল---- তাই!! 

অনু----( রাতুলের টিশার্টের কোন ধরে দারিয়ে থাকা রাতুলকে বিছানায় বসিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে)"" হ্যা,,,এই,,, জ্যেঠা মশায়কে বলো না আমাদের একসাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে।
আজ তোমার বুকে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।

রাতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে"" কি ভাবে যে বলবো তাই তো ভাবছি। 
তবে এখন আমি তোর পাশে শুচ্ছি তুই ঘুমোলে আমি চলে যাব।

অনু---- তুমি ঘুমাবে না।

রাতুল---- না আজ শুধু আমার বৌকে দেখবো আর তাকে নিয়ে ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে যাব।

রাতুল অনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অনু রাতুলের একটা হাত জরিয়ে ধরে ঘুমের কোলে হারিয়ে গেলো।

*-*-*-*-*-*-*-*-*

সকাল আট টা
রাতুল তাদের প্রাসাদের ছাদে বসে আছে কংক্রিটের তৈরি চেয়ারে,কংক্রিটের  টি টেবিলটার উপর একটা খালি চায়ের কাপ। মাথার উপর সিমেন্টের তৈরি ছাতার মতো সেড তাতে ছেয়ে আছে সাদা অর্কিড। বার বার দরজার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে রাতুলের। আজকের সকালের এই মনোরম পরিবেশে ও রাতুলের ভিতরের রাগকে কোন ভাবেই দমাতে পারছে না।
একটু পরই টিনা ও অরিন্দম এক এক করে ছাদের কারুকার্য অঙ্কিত দরজাটা বেয়ে ভিতরে এলো।
দুজন দুজনের দিকে ভীত ও কৌতুহল পূর্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। তা দেখে রাতুল বলে উঠলো,,,

রাতুল---- আরে,,, চিন্তা করো না।  তোমাদের দুজনকেই আমি ডেকেছি। এসো,,, বস,,,দেখো এখান থেকে পুরো এলাকার দৃশ্যগুলো কত সুন্দর লাগে।

তাকিয়ে দেখে টিনাও। প্রাসাদ ঘেরা সুসজ্জিত বাগান, মন্দির, বড় পুকুর,  ফলের বাগান তারপর প্রচীর। বড় রাস্তাটা মিশে গেছে অজানায় তার পাশে চলে গেছে দিগন্তজোরা ধানক্ষেত। সকালের রোদে ধানক্ষেতের বুকে শিশিরের বিন্দু নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হালকা বাতাসে কিশোরীর উচ্ছল হাসির মতো কেঁপে উঠছে সমস্ত ক্ষেত। ফাল্গুনের শেষ তাই কচি ধানের চারা গুলোর কচি সবুজ রং সমস্ত পরিবেশকে সবুজের চাদরে ঢাকার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্চে।
প্রকৃতির অপরুপ রুপে যখন টিনার দুচোখ বিস্ময়ের সপ্তম আকাশে মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই বের হয়,,,"
""" বিউটিফুল সো পিওর""

রাতুল---- বলেছিলাম না ভালে লাগবে। তা শিল্পি মসাই তোমার কি খবর ঘুরে ফিরে দেখেছো আমাদের এলাকা। কাল তো ছবি আঁকবে বলে থেকে গেলে।

অরি----(  অপরাধীর মতো চোখ নিচু করে) দেখেছি তোমাদের এলাকা ( নিমিষেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাতুলের দিকে চেয়ে) খুব সুন্দর গ্রাম একদম পরিকল্পিত, সাজানো তোমাদের পরিবারের কথা আঙ্কেলের কথা এলাকার লোকে বলতে শুরু করলে আর শেষই করতে চায় না ।

অরিন্দম এর কথায় তিনজনেই হেসে উঠলো। এর মধ্যে মহিধর তিন জনের জন্য ব্রেকফাস্ট ও চা নিয়ে এলো।

রাতুল---- প্রকৃতি দর্শন ছাড়াও তোমাদের সাথে আমার জরুরী কিছু কথা আছে। আগে ব্রেকফাস্ট করে নেই তার পর বলি।

রাতুলের কথা শুনে টিনা ও অরিন্দমের বুকটা "ধরাস" করে উঠলো।"" তবে কি অনু সব বলে দিয়েছে? বললে কি রাতুল এতোটা শান্ত থাকতো। তা না হলে আমাদের দুজনকে একসাথে কেন ডেকেছে?"" মনে মনে ভাবছে টিনা।
অরিন্দম মুখে হালকা হাসি টেনে মনে মনে ভাবতে লাগলো"" এটা তো হওয়ারই ছিল। অনু তো শুধু রাতুলের ভালোবাসা নয় যতদুর বুঝেছি ওর অস্তিত্বের অংশ অনু। তবে এটা ভেবে ভালো লাগছে রাতুল রেগে আমাদের কোন অপমান না করে বোঝানোর চেষ্টা করছে। এই বিষয়টাতে রাতুলের উপর আমার সম্মান বহুগুন বৃদ্ধি পেলো। সত্যি রাতুল তোমার জায়গায় আমি হলে কখনই এতোটা শান্ত থাকতে পারতাম না।""


ব্রেকফাস্ট শেষ করে টিনা ও অরিন্দম রাতুল নাম মাত্র কিছু মুখে দিয়ে চায়ের কাপটা হাতে রেলিং এর ধারে গিয়ে দাঁড়ায়,,,,

রাতুল---- তোমাদের আজ একটা গল্প বলবো,,,
শুনবে?

অরি---- অবশ্যই ব্রো,,,,,গল্পের মাঝেই জীবনের সত্যতা অনুভব করা যায়। নিজের চলার পথের দিশা পাওয়া যায়। তুমি বলো।

রাতুল---- শোন তবে,,,,,গল্পটি এক কিশোর ও এক কিশোরীর , তাদের চিন্তা ভাবনা ও তাদের জীবনের।

রাতুলের কথায় চমকে ওঠে টিনা তবে কি রাতুল ওর আর অনুর ভালোবাসার কাহিনী শোনাতে চায়?

টিনার মুখের দিকে তাকিয়ে রাতুল যেন সব বুঝতে পারে। টিনাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,,,"" তোমার ভিতরের সাইকোলজির ডাক্তারকে একটু বিশ্রাম দাও ও শুধু  টিনা হয়ে আমার কথা শোনো।""

অবাক টিনা রাতুলের দিকে তাকিয়ে"" রাতুল কি আজকাল টিনার মনের কথাও শুনে নিচ্ছে, তাহলে ও কেন শুনে না যে আমি ওকে কতটা ভালোবাসি?""

তোমার সব প্রশ্নের উত্তর পাবে টিনা এখন তুমি শুধু আমার গল্পটা শুনবে।

❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

গল্পটার শুরু কিভাবে হয়েছিলো তা আমি আজো জানি না, তবে যখন থেকে বুঝতে শিখেছি নিজের চোখে, নিজের অন্তর দিয়ে গল্পটার বিস্তৃতি দেখেছি।

গল্পটা যেমন দুটো শরীরের বেড়ে ওঠার গল্প, তেমনই ভালোবাসার শৈশব থেকে কৈশোর বেয়ে যৌবনে পৌঁছানোর গল্প।
এতক্ষণে তো মনে হয় তোমরা বুঝতেই পেরেছো, হ্যা গল্পটা আমার আর অনুর গল্প। এখন নিশ্চয়ই ভাবছো আমি কেনো তোমাদের এ গল্পটা বলছি?
তার কারণও আমি বলছি তোমাদের। আমার মনে হয় এই সুন্দর প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করার সাথে সাথে তোমাদের প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা আমাদের সম্পর্ককেও জানা দরকার।
অরি---- ইটস ওকে ব্রো,,,,আমার তো শুনতে ভালোই লাগবে। আর টিনারও, না কি বলিস তুই টিনা ?

টিনার খুব ইচ্ছে করছে এক ছুটে এখান থেকে চলে যেতে। তার ভালোবাসার মানুষের প্রেম কাহিনী অন্যকারো সাথে কি করে শুনবে সে? কিন্তু উঠতেও পারছে না সে, কারণ রাতুল আজ যেনো জোর করে হলেও ওদের তার প্রেমের গল্প শোনাবেই ।

রাতুল---- অনু যখন আমাদের বাড়িতে আসে আমি তখন মাত্র চার বছরের।  তাই ওর আমার বাড়িতে আসার কথা আমার মনে নেই। তবে যতই বড় হতে লাগলাম দেখতাম আমার মা ছোট্ট পুতুলের মতো একটা বাচ্চার যত্ন করছে, বাবা তার সমস্ত কাজের মাঝে আমার পাশাপাশি এই পুতুলটার ও খবর নিচ্ছে। মহিকাকা সহ কাজের সব লোকেদের যেন প্রাণ হয়ে উঠেছিলো অনু নামের মেয়েটা।

প্রথম প্রথম পিচ্চি আাধো কথা বলা, কখনো কয়েক পা হাটতে জানা অনুকে দেখে ভয় পেলেও আস্তে আস্তে আমি অনুর সাথে খেলতে শুরু করি।  (সামান্য হেসে) তবে কি জান,,,? ও কিন্তু আমার ভীষন বাধ্য ছিল যতই বড় হচ্ছিলো ততই আরও বাধ্য হচ্ছিলো । আমি যা বলতাম তাই করতো। আর আমিও অতটুকু বয়সে অনুর ভালো লাগা খারাপ লাগা সব কিছুই বুঝতে পারতাম যেন। আর ভয় পেতাম ওর চোখের জলকে ওর চোখের জল আমাকে খুব কষ্ট দিতো সেই ছোট বেলাতেও, এই জন্যই সবসময় আগলে রাখতাম ওকে। অনুকে অন্য কারও সাথে খেলতে দিতাম না।  ভয় পেতাম ও যদি আর আমার সাথে না খেলে! (রাতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) এই ভয়ই একদিন আমাদের কাল হয়ে দাড়ালো।

কিছুক্ষণের জন্য রাতুলের মুখের ভাষা যেন হারিয়ে গেলো,,,অরি ব্যগ্র কন্ঠে বললো"" তারপর""।

রাতুল আস্তে আস্তে রেলিং এর ধার থেকে অরিন্দম ও টিনার পাশে এসে বসলো। রাউন্ড টেবিলটার চারদিকে ছয়টি কংক্রিটের চেয়ার। রাতুল অরিন্দমের পাশে এসে বসলেও টিনার অপজিটে ছিলো তাই টিনা লক্ষ্য করলো রাতুল তাদের সামনে বসে থাকলেও তার দৃষ্টি সূদুর অতীতের দিনগুলোতে হারিয়ে গিয়েছে। তার চোখে একসাথে আনন্দ, দুঃখ, অভিমান ভীর করে আছে। নিজের অজান্তেই টিনা বলে উঠলো "" কি হলো বলো?""

রাতুল এবার সম্বিত ফিরে,,, একটু লজ্জাপেয়ে শুরু করলে----" অনুর সৌন্দর্য দেখে মালি কাকু ওর নাম দিয়ে ছিলো ফুল করণ ও ঠিক ফুলের মতোই সুন্দর ছিলো( অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে) আজো ঠিক তেমনটাই আছে। এভাবেই বেড়ে উঠছিলাম আমরা। রাগ, অভিমান, ঝগড়া সবকিছুকে চিনতে চিনতে জীবনের পথ চলছিলাম।

আমাদের বাড়িতে গন বিয়ের আয়োজন করা হতো।  অনেক আগে থেকেই এটা প্রচলিত ছিল। আমার দাদু এটির প্রচলন করেছিলেন। একদিনে প্রায় দুই তিন শত বিয়ে দেয়া হতো এ বাড়ির ঠাকুর দালান সংলগ্ন মাঠটিতে। আসলে গ্রামের অনেক মানুষ আছে যারা হয়তো টাকার অভাবে ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে পারেন না তাদের জন্য এ আয়োজন করা হতো। এখনো হয়, প্রতি বছরের বৈশাখ মাসের কোন এক ভালো দিনে পাঁজি দেখে এই গন বিয়ের দিন ঠিক করেন আমাদের মন্দিরের পুরোহিত মসাই। সেবার ও গন বিয়ে হচ্ছিল। আমাদের সারা বাগান কত মানুষে ভত্তি। অগন্তি কনে বরে চারপাশ ভরে গেছে। আমি আর অনু হাতে হাত ধরে চারদিকে ঘুরছিলাম আর দেখছিলাম। মালীদাদুর ছেলেরও সেদিন বিয়ে হচ্ছিল। সাত বছরের অনু অবাক চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখে আমাকে বলেছিলো,,,"" রাতুলদা চলো আমরাও বিয়ে করি।" আমার প্রথমে একটু সংকোচ হলেও ভাবলাম"" হলে হোক অনু বলেছে বলে কথা"  তাই বললাম "" চল তুই গিয়ে বাবাকে বল""(কেন জানি আমার একটু লজ্জা লাগছিলো।)

অনু সবার সামনে বাবার কোলে উঠে বলে উঠলো
""ও জ্যঠা আমিও বৌ হবো আজকে আমি ও রাতুলদাকে বিয়ে করবো "" এ কথায় প্রথমে সবাই অবাক হয়ে গেলো ও পরে হোহো করে হেসে ফেললো, বাবাও হেসে সেদিন, বলেছিলো "" তাই!! সে তো ভালো কথা,  আগে বড় হও তার পর আমি তোদের বিয়ে দেব। তুই ছাড়া তোর রাতুলদাকে আর কে বিয়ে করবে শুনি""
জানো তখনও আমরা জানতাম না বিয়ে কাকে বলে কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম আমার সাথে, আমার পাশে যে মেয়েটি বেড়ে উঠছে সে শুধু মাত্র একজন মেয়েই  নয়, আমার চিন্তা, আমার ভাবনা, আমার খেলার সাথি , আমার প্রত্যাহিক জীবনের অভ্যস, আমার জীবন। সেদিন বাবার মুখে "" তোদের বিয়ে দেবো" কথাটা খুব ভালো লেগেছিলো আমার, আবার মনও খারাপ হয়েছিলো বিয়েটা হলো না বলে।

কথাটা বলেই হেসে উঠলো রাতুল অরিন্দম আর টিনার দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে ওরা।

টিনা---- "" হোয়াট,,,,অতটুকু বয়সে তোমরা বিয়ে করতে চাইছিলে। হাউ ফানি,,,"

অরি---- তুই শুধু বিয়েটাকে দেখলি ওদের বন্ডিং টা দেখ।
( অরিন্দমের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হানে টিনা, তা দেখা অরিন্দম একটা অবজ্ঞার হাসি ছুঁড়ে দিয়ে রাতুলের দিকে তাকায় রাতুলও তা বুঝতে পারে। )

রাতুল---- তারপর আমাদের কাছে সবকিছু সহজ হয়ে যাওয়ার কথা ।  আমরা দুজনে যেহেতু জানতাম যে এভাবেই সারাজীবন একসাথে থাকবো কখনোই আলাদা হব না।  সয়ং বাবা মা আমাদের মেনে নিয়েছেন। তবুও আমার মনে অনুকে নিয়ে  একটা ইনসিকিউরিটি ছিলো তা আমি নিজেও জানতাম না।
দুজনে এক এক করে কেজি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে আসি। অনু যেহেতু আমার থেকে প্রায় সারে তিন বছরের ছোট ছিলো তাই আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি ও তখন আমার হাই স্কুলে আসে। অনেক দিন পর আমরা একসাথে স্কুলে যাচ্ছিলাম, আসছিলাম। ভালোই দিন কাটছিলো কিছুদিন আমাদের।

আস্তে আস্তে অনু বড় হতে লাগলো,ওর রূপ দিন দিন যেন বাঁধন হারা হতে লাগলো। আমার চারপাশের বন্ধু গুলোর চোখ যেন অনুতেই আটকে যেতে লাগলো। অনুর রূপের ছটা সবাইকে তার দিকে বয়ে যেতে বাধ্য করতে লাগলো।  আমার ক্লাসের ছেলেদের মাঝে অনুকে নিয়ে রীতিমতো কম্পিটিশন শুরু হলো।আর তাতেই আমি ভয় পেতে শুরু করি। অনুকে হারানোর ভয় আমাকে প্রায় উৎভ্রান্ত করতে থাকে। অনু কিন্তু একই রকম ছিলো।  ওর দুনিয়া আমাকে দিয়ে শুরু আমাকে দিয়েই শেষ ছিলো তখনও। শুধু আমার মনেই শান্তি ছিলো না। এভাবেই চলছিলো আমাদের ভাগ্য।

( টিনার দিকে তাকিয়ে " আসলে তখন বুঝিনি ভালোবাসা যদি খাঁটি হয় তবে তাকে হারানোর চিন্তা বৃথা। যে মানুষটার সর্বস্ব জুরে আমি তাকে আমার কাছ থেকে দুরে কেই বা করতে পারে? আর তেমনি যা আমার নয় তাকে পাওয়ার চিন্তাও বৃথা,  অন্যকারও ভালোবাসা দিয়ে আর যাই হোক জীবনে শান্তি আসতে পারে না।) 

এর পর আমাদের জীবনে এলো শুভ। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি তখন এলিভেন এ পরছি। আর অনুর সাথে সম্পর্ক টাও তখন প্রবল ভাবে চলছে মোটামুটি সারা স্কুলে ডজন খানিক অনুর প্রমিক আমার হাতে মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়েছে । আমার ভয়ে অনুর আশেপাশে ছেলে তো কি মেয়েরাও যেতে ভয় পেতো। অন্যকারও ছেলে হলে কয়েক শ বার গার্জিয়ান কল হয়ে যেতো কিন্তু আমি মুখার্জি বাড়ির সুপুত্র ছিলাম তাই তারা সহ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত দেখতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া ব্যপার গুলোতে অনু জড়িয়ে থাকায় ওরাও বাবার কাছে যেতে ভয় পেতো কারণ পুরো এলাকা জানতো বাবা অনুকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

এসময় শুভই একদিন আমাকে বললো আমি মেয়েটার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছি। ক্লাসে অনুর সাথে কেউই কথা বলতো না। সবাই আমার উপরের যত রাগ সব অনুর উপর দেখায়। এতো ঘটনার পরেও কিন্তু অনু আমাকে কিছুই বলে নি, শুভই আমাকে সব বোঝালো।আমি অবুঝের মতো শুভর কথাকে অগ্রাহ্য করলাম। কিছুদিন পর আমিও বুঝতে পারলাম শুভ ঠিক বলেছে। তখনও সমস্ত রাগ অনুর উপর দেখাতে লাগলাম। অনুকে সেজেগুজে স্কুলে যেতে দিতাম না, কারও সাথে মিশতে দিতাম না। সব সময় চোখে চোখে রাখতাম। এক রকম বন্দিই ছিলো অনু আমার ভালোবাসায়। তবুও আমার সব অপরাধ যেন ওর কাছে ভালোবাসার প্রকাশই ছিলো।

একাদশে ফাইনাল এক্সামের আগে আমি অনুকে প্রথম কিস করি। তার ফলে, সেই প্রথম অনু এক মাস আমাকে এরিয়ে চলে। যদিও আমাদের প্রথম কিসটা প্রয়োজনে হয়েছিলো, অনুকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তবুও অনু লজ্জায় প্রায় এক মাস আমার সাথে কথা বলে নি। এই এক মাস আমার জন্য মৃত্যু যন্ত্রণার মতো ছিলো।

অরি---- একটা কিস করার জন্য এক মাস বিচ্ছেদ,,!!

রাতুল---- এটা অনু ডিউড,,,,সি ইজ এ মিষ্ট্রি ইন হার সেলফ।

( অনুর চোখে নির্লিপ্ততা রাতুলের ভালোবাসার সামনে তার ভালোবাসা এতো ছোট মনে হচ্ছে যে নিজেকেই লজ্জা লাগছে)

রাতুল---- এক মাস যখন সবরকম চেষ্টা করেও অনুকে স্বাভাবিক করতে পারলাম না। তখন নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল, এক সন্ধ্যায় শেষ বারের মতো অনুর রুমে যাই,,, সেদিন ভেবেছিলাম আজ যদি অনু আমার সাথে কথা না বলে তবে নিজেকে শেষ করে দেবো আমি।

(টিনা ও অরি অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাতুলের দিকে,,,
অরি--- শুধু এতোটুকু কারনে সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নিলে!!)

রাতুল---- (দৃষ্টি প্রসারিত করে,) তোমাদের কাছে সামান্য মনে হচ্ছে তখন আমার কাছে যে কত বড় যন্ত্রণা ছিলো আজ তোমাদের সে কথা বলে বোঝাতে পারবো না। তাছাড়া বুঝতেই পারছো তো টিনএজ ছিল তখন এসব ভাববারই তো বয়স।

টিনা---- তারপর,,,,

রাতুল---- (হেসে) আমি অনুর ঘরে গেলাম, দেখলাম ও বিছানায় বসে ওর ল্যপটপে মুভি দেখছে। আগে সব মুভি আমরা এক সাথেই দেখতাম, সেদিন অনু একা মুভি দেখছে দেখে আমার রাগে দুঃখে চোখ দিয়ে প্রথম বারের মতো জল বইতে লাগলো। অনু তখনো আমার উপস্থিতি বুঝতে পারে নি। যখন বুঝলো আমার দুচোখের জল দেখে ও কেমন ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ সরিয়ে আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ও কেঁদে,,,, কেঁদে "কি হয়েছে "" জিজ্ঞেস করেছিলো। আমিও এক মাস পর অনুকে এতোটা কাছে পেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম,,, " তুই আমার সাথে কথা বলিস না কেনো? এবার কিন্তু এরকম করলে আমি তোর কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাব।"

এ কথায় অনু আমার সামনে মুখটা এনে কান্না থামিয়ে বলে ""আজ থেকে তুমি ইচ্ছে করলেও আমাকে ছে্রে যেতে পারবে না। "" বলেই ও আমার ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে সমস্ত অভিমান, কষ্ট,  যন্ত্রণাকে শুষে নেয়। সেই প্রথমবার আমরা একে অন্যর মনের খোঁজ পেয়েছিলাম এই ছোট্ট শারীরিক ছোঁয়ার মধ্যে। আস্তে আস্তে নির্জনতায় এই ছোঁয়া আমাদের অভ্যাসে পরিনত হলো। এর বাইরে আমরা কিছুই চাইতাম না। দরকারও হতো না।  দুজোড়া ঠোঁট মিলে গেলে যে অনুভুতিটা অনুভব করতাম তার বেশি কখনো কিছুই ভাবতাম না। তবে সারা দিনে দুজনে যেন উন্মুখ হয়ে থাকতাম এটুকুর জন্য। এতটুকু নির্জনতাও নষ্ট করতাম না, চুম্বকের মতো ধাবিত হতাম নতুন অভ্যাসের দিকে। মাঝে মাঝেই আমি আগ্রাসী হয়ে উঠতাম তবে সেটাও ঠিক সামলে নিতো অনু।


❤❤❤❤ক্রমশ❤❤❤❤

রাতুল---- আমাদের এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে মজার বিষয় কি বলতো?  ( একটু হেসে) আমরা দুজনে দুজনকে"" ভালোবাসি"" কথাটা কখনো বলিনি। কেন? কারন মুখে বলার প্রয়োজন তখনি পরে যখন হৃদয়ের কথা হৃদয় বোঝা না যায়।  আমরা তো নিজেদের নিশ্বাসের মধ্যে, বিশ্বাসের মধ্যে, সত্বার মধ্যে একে অন্যকে উপলব্ধি করতাম তাই এই অমূল্য শব্দটা আমাদের কাছে মূল্য হীন হয়ে ছিলো।
আমার তো সর্বস্ব জুরেই অনু ছিলো, আজও আছে। আমি আজ ডাক্তার কেন জানো? ওই পাগলিটার জন্য।

অরি---- অনুর জন্য? আমি তো শুনেছিলাম আঙ্কেল এর চায় যে তুমি ডাক্তার হও।
(প্রশ্ন চিহ্ন টিনার চোখেও।)

রাতুল---- হ্যা বাবারও ইচ্ছা। তবে সেই ইচ্ছার বীজ বপন করেছিলো অনু। ছোটবেলায় অনুর কিছু লোকাল খেলার সাথি ছিল।একেবারে নিম্নস্তরের মানুষের বাচ্চারা। তার মধ্যে ফুলিয়া নামের একটি মেয়ে ছিলো, বয়সে অনুর থেকে ছোট হলেও এ বাড়িতে ফুলিয়া অনুর সবসময় ছায়া সঙ্গি ছিল। আমিতো প্রথম প্রথম ফুলিয়াকে দেখলেই রেগে যেতাম ও যেন অনু ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না। ওর জন্যই আমাদের কত কিস যে অসমাপ্ত রয়ে গেছে তার হিসেব নেই।

( হাহাহা করে একাই হেসে উঠলো রাতুল। এবার অরিন্দম আর টিনার দিকে তাকিয়ে।)
সরি, সরি আফটার অল তোমার কাজিন, আমার তোমাদের সামনে এভাবে বলাটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না।

অরি---- ইটস ওকে ব্রো। টিনা কতবার ড্রিংক করে আমার সামনে ওর এক্সদের কিস করেছে তার হিসেব নেই তোমার তো স্টোরি শুনছি।

রাতুল---- ( নিশ্চিন্ত হয়ে) থ্যংক ইয়ু।

টিনা অরিন্দম এর কথায় প্রচন্ড অপমানিত বোধ করলো। ওর চোখ বেয়ে জল আসতে চাইছিল। """ হ্যা এরকম সম্পর্ক আছে অরির সাথে, তাই বলে রাতুলের সামনে এভাবে বলতে পারলো অরিন্দম। অরি কি টিনার বর্তমান অবস্থার কথা একটুও বুঝতে পারে নি। না কি আজ ওর কাছে রাতুল ও অনুর ভালোবাসাই সত্য। আমার ভালোবাসা একটা ঘোর মাত্র। তাই যদি হয় সেটা কি খুব ভুল হবে? এ পর্যন্ত যতটুকু আমি নিজের কানে শুনলাম বুঝলাম তাতে কি আমারও একই রকম অনুভূতি হয় নি? """

রাতুল---- সেবার প্রায় সাত দিন একটানা ফুলিয়া অনুর কাছে আসে নি। প্রথম ক'দিন স্বাভাবিক মনে হলেও পঞ্চম দিন অনু আমাকে রীতিমতো অতিষ্ঠ করে তুললো। ওকে ফুলিয়ার বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। আমি কোথায় ভাবছিলাম এবারে আমার অসমাপ্ত কিস গুলোকে সমাপ্ত করবো। কিন্তু অনুর নাছোড়বান্দা ফুলিয়ার বাড়িতে না নিয়ে গেলে বাকি তো কি? নগদের ঘরেও শূন্য। অবশেষে বাধ্যহয়ে চললাম ফুলিয়ার বাড়ির দিকে। মালি দাদুকে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে আমাদের বাড়ির পিছনে কামার পড়ার মধ্যে ফুলিয়ার বাড়ির পথে রওনা দিলাম। ওদের বাড়ি পৌঁছে দেখি খড়ের ঘরের বারান্দায় শীর্নকায় ফুলিয়া শুয়ে আছে। আধ বোজা চোখ, মুখদিয়ে ভুলভাল বকে যাচ্ছে যার প্রায় প্রতিটা কথা অনুকে কেন্দ্র করে। প্রায় দশ বছরের বোকা-সোকা মেয়েটা এই সাত দিনেই প্রায় কঙ্কাল সার হয়ে গেছে। ফুলিয়ার বাবার কাছে জানতে পারলাম কি সব কবিরাজি ঔষধ খাইয়েছে কিন্তু তাতে কোন ফল পাচ্ছে না। এদিকে অনু ফুলিয়াকে দেখে ওকে জরিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। কিন্তু মেয়েটার তখনও জ্ঞান নেই। আমি বাড়ি থেকে জীপটা নিয়ে অনুকে ও ফুলিয়ার বাবা মাকে সাথে করে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দেই। আমরা যতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছাই হাসপাতালের বড় ডাক্তার বাবু ততক্ষণে বেড়িয়ে গিয়েছেন কোলকাতার পথে। তিনি সপ্তাহে তিন দিন এখানকার হাসপাতালে বসতেন। বাবা অনেক তদবির করেও এর বেশি কিছু করতে পারেন নি। আসলে এরকম পাড়াগায়ে কোন ভালো ডাক্তার থাকতে চায় না।
অনেক চেষ্টা করেও ডাক্তার বাবুকে পাওয়া গেলো না। আমি গাড়ি ছুটিয়ে অনেকটা পথ প্রায় ছুটে গিয়ে ছিলাম, তবুও ডাক্তারের নাগাল পাই নি।  সেইদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মেয়েটা মারা যায় আমাদের সামনেই।

অনু কেঁদে ভেঙে পরেছিলেন আমার বুকে। অনেক কষ্টে ওকে সেদিন বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। তারপর ঘুম পারিয়ে আমি আমার ঘরে চলে এসেছিলাম।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনু ভয় পেয়ে একা আমার ঘরে আসে। দরজার শব্দে আমার ঘুম ভাঙলে দেখি অনু দরজায় দাড়িয়ে কাঁদছে। একছুটে ওর কাছে গিয়ে জরিয়ে ধরি। মেয়েটাও শক্তকরে জরিয়ে ধরে আমাকে। বুঝতেই পারছিলাম প্রচন্ড মানসিক চাপে ও নিজেকে স্থির করতে পারছে না।দুহাতে ওকে তুলে আস্তে করে আমার পাশে বসিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ও আমার বুকের মাঝে মাথা দিয়ে বলে ওঠে """ রাতুলদা তোমাকে ডাক্তার হতে হবে, গ্রামের এই ফুলিয়া গুলোর জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাকে ডাক্তার হতে হবে বলো পারবে না? ""

ঘরের হালকা গোলাপি আলোয় চোখের জলে ভেজা অধর, দৃষ্টির আকুতি,  তখন যদি ও আমাকে বলতো কাউকে খুন করতে হবে আমি মনে হয় পিছপা হতাম না। ডাক্তার তো কোন ছাড়।
কথা দিয়েছিলাম আমার অনুকে, চোখে চোখ রেখে কথা দিয়েছিলাম ও ঠিক যা চায় আমি তাই হব। শুধু তার বদলে বলেছিলাম আমার সামনে কাঁদতে পারবে না কোন দিন, মাথা দুলিয়ে স্বীকার করেছিল অনু।

সেদিন দুজনে দুজনকে খুব আদর করেছিলাম। ভবিষ্যতের আনন্দে নাকি বর্তমানের কঠিন বাস্তবকে ভুলতে তা আমি আজও জানি না। শুধু দুজনে হারিয়েছিলাম ভালোবাসার সাগরে। না সম্পূর্ন শারীরিক মিলনের মাঝে নয়, হারিয়েছিলাম অধরে, দৃষ্টিতে, স্পর্শে, নিশ্বাসে উপভোগ করেছিলাম সবটুকু।

টিনা---- এক্সকিউজ মি,,,,আই নিড টু গো টু ওয়াসরুম। সরি,,,,গাইজ,,!!!,ডোন্ট মাইন্ড রাতুল,,,কেরি অন,,,,আই উইল ব্যক,,আফটার সামটাইম।( বলেই টিনা কারও দিকে না তাকিয়ে হনহন করে উঠে চলে গেলো।)

রাতুল----( টিনার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে।)  অরিন্দম,,,,তুমি কি বলো?

অরি---- সরি,, ফর হার ব্রো!! আমি শেষ পর্যন্ত শুনতে চাই যদি তোমার কোন আপত্তি না থাকে।

রাতুল---- না আমার কোন আপত্তি নেই। তারপরদিন অনু বাবাকেও বলে আমার ডাক্তার হওয়ার কথা আর বাবাও তো এক কথায় রাজি হয়ে যায় আর আমাকে ডাক্তার করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

এবার আসি আমাদের সম্পর্কের টানা-পোড়নের গল্পে। জয়েন্টে ভালো রেজাল্ট করার পর আমার বাড়িতে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করে। এর মধ্যে আবার বৈশাখমাস ধুম পরে যায় গন বিয়ের প্রস্তুতির। সে বছর পুরোহিত মশাই আনন্দে গদগদ। এবার নাকি এমন এক তিথি তিনি পেয়েছেন, যে তিথিতে বিয়ে করলে আগামি সাত জন্ম এক সাথে থাকবে তার কোন অন্যথা হবে না। এ বছরে আমরা নিজেরা যেচে দায়িত্ব নিয়েছি। আমি ক্যেটারিং এর দায়িত্বে, আর অনু সকল বৌ সাজানোর দায়িত্বে।
খুব ভোরে আমি অনুর দরজায় নক করলাম, আগের দিন ও আমাকে ফোন করে জাগিয়ে দিতে বলেছিলো।  আমি ফোন না করে স্ব শরীরে ওর ঘুম ঘুম মুখটা দেখতে চলে গেলাম।বাড়ির সকলে তখন ঘুমিয়ে। ঘুমন্ত অনু আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে আধ জাগা হয়ে দরজা খুললো। ওর সেই রুপ আমাকে যেন মাতাল করে দিয়েছিল। একটানে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম খুব যত্নকরে ওর ঘুম ভাঙিয়ে ছিলাম।( তোমাকে বলতে পারছি না, সে দিন কতটা পাগল করেছিল অনু আমাকে,  হালকা নাইট গাউনে অনুর নব উত্থিত যৌবন, পাতলা কাপরে শরীরের চরাই-উতরাই এর স্পষ্ট ছাপ আমার হাতকে বাঁধন হারা করে দিয়ে ছিলো। আমার অতর্কিত আলিঙ্গনে, আদরের অতিসাহ্যে প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও মুহুর্তেই অনুও সারা দিতে শুরু করেছিলো। আমার ঠোঁট যখন অনুর ঠোঁটের নির্যাস নিয়ে আমার শাষনের অবাধ্য হয়ে আস্তে আস্তে নেমে গিয়েছিলো অনুর গলা বেয়ে কাঁধে অনুর দুহাত ও শক্তকরে মুঠি বদ্ধ করেছিল আমার চুল, কাঁধ। আমার হাত জায়গা করে দিচ্ছিলো ঠোঁট নামার, ঠোঁট নেমে যাচ্ছিলো অনুর অপুষ্ট স্তনে তখনি অনু নিজের দুহাত সামনে আড়াআড়ি করে নিয়েছিলো।  আমারও সম্বিত ফিরেছিলো, তাড়াতাড়ি করে অনুকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিলাম "" ডে,,,ডেকে দিতে বলেছিলি ভোর হয়ে গেছে,  আমিও তৈরি হই, নে তাড়াতাড়ি "" বলেই বেড়িয়ে গিয়েছিলাম।)

অরি---- ( রাতুলের নিরবতায় অধৈর্য হয়ে অরিন্দম বলে উঠলো) তারপর??

রাতুল---- তারপর শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।  এই দিনে প্রায় হাজার পাঁচেক লোক আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করে। সেবারও তাই, একশো জোড়া কনে-বর আর হাজার পাঁচেক লোকে জনারন্য আমাদের বাড়ি।
আমাকে সাহায্য করার জন্য আমার বন্ধু শুভ, নিশাদ, সৌম্য সবাই সকাল থেকে আমার সাথে ব্যস্ত ছিলো।
অনু ও তার কয়েক জন বান্ধবী মিলে একের পর এক নতুন বৌ সাজাচ্ছে, বেশ ভালোই চলছিলো অনুষ্ঠান।
এর মধ্যে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন এলাকার নতুন এস আই সহদেব রায় ও তার ছেলে সমীর। সমীর ছেলেটি কয়েকদিন হলো আমাদের কোচিংয়ে এসেছিলো। খুব চালাক আর বাকপটু ছিলো।
রাতুল---- থানার বড় বাবু, তাই তাদেরকে আপ্যায়নের দায়িত্ব পরে অনু ও আমার ঘাড়ে। ওনারা এসে জল খাবার খাওয়ার পর চারদিকে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো,  আর আমরা নিজেদের কাজের পাশাপাশি বড় বাবুর ভালো মন্দর দিকে খেয়াল করতে লাগলাম।

এর মধ্যে বড় বাবুর ছেলেটির ব্যবহার আমার রক্ত গরম করে তুলতে লাগলো, ছেলেটি পরিচিত হলেও ওর চালচলন আমার খুবই অসহ্য লাগছিল । সমীর যেন ইচ্ছে করে বার বার অনুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছিল। ইতিমধ্যে শুভ ও নিশাদ ওকে আমার আর অনুর ব্যপারে সামান্য বলে এলেও  ওর যেন এতে কিছুই আসে যায় না।
এদিকে অনু একবার আমার রক্তাক্ত চোখের দিকে তাকাচ্ছে আর সমীরকে নিজের সবটুকু ধৈর্য দিয়ে নিবৃত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, মানে ওর পক্ষে যতটা সম্ভব সমীরকে এরিয়ে যাচ্ছিল । এতে আমার রাগ আরও বেশি হচ্ছিল, রেগেমেগে কয়েকবার আমি এগোতে গেলেও নিশাদ ও শুভ আমাকে বাঁধা দেয় কারণ এটা আমার বাড়ি আর বাবা উপস্থিত। বেশি বাড়াবাড়ি হলেই আগের সব খবর সবার সামনে চলে আসবে।

সমীরের ব্যবহারে আমি আমার দায়িত্ব এর ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যথারীতি অনুকে পাহাড়া দেয়ায় লেগে গেলাম।

অরি----( দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) এতোটা possessiveness কি করে সহ্য করতো অনু, আমি তাই ভাবছি। তুমি তো একদম পাগলই ছিলে।

রাতুল---- ( সামান্য হেঁসে)  একটা সত্যি কথা বলি তোমাকে আমি অনুর জন্য আজও পাগল। তবে পাগলামির ধরন আলাদা হয়েছে। আগে কোন কাজ করার সময় একবারও ভাবতাম না।  এখন দু এক বার ভাবি এই যা।

অরি----( অরি স্থির দৃষ্টি রাতুলের চোখে ফেলে সত্যতা খুজতে লাগলো এবং বুঝলো রাতুলের কথা একদমই মিথ্যা নয়)
তারপর,,,,তারপর কি হলো? যতদূর বুঝলাম,  তুমি নিশ্চই সমীরকে পুলিশের ছেলে বলে ছেড়ে দাও নি??

রাতুল---- ও যেটা করেছিলো সেটা আমার পক্ষে ক্ষমা করা একেবারেই অসম্ভব ছিলো। আসলে সমীর আমাদের কোচিংয়ে কয়েকদিন হলো ভর্তি হয়েছিল। ও এসে থেকেই আমার উপর কেমন একটা বিদ্বেষ ভাব পোষণ করে। কারণ যতদুর বুঝেছিলাম, আমার প্রভাব। আসলে তুমি তো নিজেও বুঝতে পারছো এ এলাকায় আমাদের সবাই কতটা ভালোবাসে। কোচিংয়ের সকল ছেলেমেয়ে বা শিক্ষক গণও আমাকে বিশেষ নজরে দেখতো। সমীরের কাছে এটাই গাত্রদাহ হয়ে উঠেছিল। মাত্র কয়েকদিনেই ও বুঝে গিয়েছিলো এখানে আমার জায়গা ও কখনই নিতে পারবে না। তাই অনুকে টার্গেট করেছিল, কারণ ও এটাও জানতো আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনু। ওর উদ্দেশ্য ছিলো আমাদের বাড়িতে এসে একটা সিন ক্রিয়েট করে আমার ব্যপারটাকে সবার সামনে নিয়ে আসা। ও খোঁজ নিয়ে জেনেছিল যে আমার  মারপিটেই বিষয়গুলি বাড়িতে এখনো অজানা। তাই সমীর বাড়িতে এসে এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চাইছিল আর আমিও ওকে সুযোগ করে দিয়েছিলাম।

আসলে পুলিশের ছেলে ছিলো তো, যেখানেই যেতো সবসময় একটা লিডার লিডার ভাব নিয়ে থাকতো। কিন্তু এখানে তার ব্যতিক্রম পরিবেশ পেয়েছিলো তাই মানতে পারে নি।

অরি---- তুমি সুযোগ করে দিয়েছিলে!  কিভাবে?

রাতুল---- হ্যা আমি সেদিন ওর পরিকল্পনা মত কাজ করি।  আসলে আসার পর থেকেই ও অনুর সাথে কারণে অকারণে কথা বলতে চেষ্টা করছিল।  অনু যতবার এরিয়ে যেতে চাইছিল ও যেন আরও বেশি অনুর পাশাপাশি যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে যখন শেষ জোড়া বর কনে বিয়ের পিঁড়িতে বসে তখন অনু সেখানেই ছিলো। আমি একটু দুরে ওদের উপর নজর রেখেছিলাম। এমন সময় সমীর অনুর একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।  রাগে আমি আমার হাতের মুঠি বদ্ধ করি। এদিকে অনু পরিস্থিতির বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সেখানেও পিছু নেয় সমীর। অনু যখন জোরে জোরে পা ফেলে চলে যাচ্ছিল সমীরও একটা নির্জন জায়গা দেখে পিছন থেকে অনুর আঁচল টেনে ধরে। আমি আসলে ওদের পেছনেই ছিলাম হয়তো কতক সমীরও বুঝতে পেরেছিলো।

অনু যখন ভয়ে জরসর হয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে বলছিলো,,"" ভালো চাও তো ছেড়ে দাও, রাতুলদা দেখলে তোমার বিপদ আছে।""

সমীরের উত্তর দেয়ার আগেই আমি খপ করে ওর হাতটা ধরে অনুর আঁচল টা ছাড়িয়ে দেই। আমাকে এরকম ভাবে দেখে সমীর একটু ভয় পেলেও বলে, "" রাতুল আমি এই মেয়েটিকে ভালোবাসি আমি ওকে প্রপোজ করতে চাইছি, তুই প্লিজ একটু ওকে বোঝা।""

আমি বললাম" তুই জানিস না, আমি ছাড়া অনুকে আর কেউ ভালোবাসতে পারবে না?

সমীর বললো,"" এটা তোর ভুল ধারণা। দুদিন আমার সাথে ঘুরলেই তোকে এ জীবনের মতো ভুলে যাবে ( বলেই একটা বিশ্রি ঈঙ্গিত করলো আমার দিকে)

আমার ধর্যের বাঁধ ততক্ষণে ভেঙে গিয়েছে। ওর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি বেধরক মারতে লাগলাম ওকে। সমীরের প্রতিরোধ আমার কাছে এক সেকেন্ডও টিকলো না মারতে মারতে আমি ওর নাক মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিলাম,হাত ভেঙে দিয়েছিলাম, পা ও ফ্যাকচার হয়েছিলো। এতোখানি মারের কথা হয়তো সমীর চিন্তাও করতে পারে নি। সমীর বেশি চিৎকারও করতে পারছিলো না ওর মুখে আমি একটা পড়ে থাকা টিশার্ট ডুকিয়ে দিয়েছিলাম। আর ওর হাত ধরে ইচ্ছা মত পেটাচ্ছিলাম।

অনু সমীরের অবস্থা দেখে ভয়ে শুভ ও নিশাদকে ডাকে, ওরা এসে আমাকে জোর করে থামায়। তখন সমীরের রক্তারক্তি অবস্থা তবুও শুভরা যখন আমাকে থামায় সমীর উঠে আমাকে তেড়ে মারতে আসে এবং আমাকে বলে যে ও অনুকে যে করেই হোক আমার থেকে আলাদা করবে।
শুনে তো আমার মাথা আরও গরম হয়ে গেলো।  এবার আমি আবার সমীরকে পেটাতে থাকি ওর কথায় আমার সাথি হয় শুভও। 
কিন্তু আমার মনে ততক্ষণে আবার অনুকে হারানোর ভয় ডুকে গিয়েছিলো। তাই সমীরকে টেনে আমি কৃষ্ণ মন্দিরের ভেতরে নিয়ে আসতে বলি আমি অনুকে নিয়ে আসি ।  তারপর বিয়ের মঞ্চ থেকে একমুঠো সিঁদুর নিয়ে মন্দিরের ঠাকুরের সামনে ও সমীর সহ সকল বন্ধুদের সামনে অনুর সিঁথি রাঙিয়ে দেই। মালাও বদল করি।

অরি---- হোয়াট,,,,,,তুমি,,, এভাবে কাউকে সিঁদুর পরিয়ে দিলে, মালা বদল করলে!! হাউ ইট পসিবল?

রাতুল---- আসলে আমি নিজেও জানি না কি করে এটা পসিবল হয়েছিল। আমি ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করতাম না আগা গোড়াই, সেইদিন কেন জানি না মনে হলো এই ঠাকুরই আমার সবচেয়ে বড় সাক্ষী।  
তারপর মন্দিরের পুরোহিত মশাই এটা দেখে বাবাকে জানালেন, এদিকে বড়বাবু তার ছেলের এরকম অবস্থা দেখে প্রথমে ভীষণ চিৎকার, চেচামেচি করলেও সবটা শুনে আর কথা না বাড়িয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন।
বাবার আদেশে অনু সিঁদুর ধুয়ে, মালা খুলে বাবার পাশে এসে দাঁড়ালো। এবং আমি নিশ্চল হয়ে মাথা নিচুকরে বাবার সামনে দাড়িয়ে ছিলাম।  আমার মা শুধু আমার কর্মে লজ্জিত না হয়ে সাপোর্টক করে আমার পাশে দাড়িয়ে ছিলো।

রাগে তো বাবার গা কাঁপছিলো।  মা ই তখন বাবাকে বেঝালো একদিন তো এটা হওয়ারই ছিলো, আজ না হয় ওরা একটু তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে এতে এতো রাগ না করে যেনো মেনে নেয়। 
তবুও বাবা কিছুতে শান্ত হচ্ছিল না। অবশেষে অনুই অভিমানী কন্ঠে বলে উঠলো,"" ও জ্যেঠু আমি কি তোমার বৌমা হওয়ার যোগ্য নই, তাহলে তুমি এতো রাগ হচ্ছো কেন?""

এবার বাবা আস্তে আস্তে শান্ত হতে লাগলো। কিন্তু তিনি সাথে সাথে এটাও জানিয়ে দিলেন যে আগামি মাসের শেষে আমাকে ডাক্তারি পড়ার জন্য কলকাতা যেতে হবে কারণ ক্লাস শুরু হবে । এবং যতদিন না আমার ডাক্তারি পড়া শেষ না হচ্ছে আমি বাড়ি আসতে পারবো না। অনুর সাথে যোগাযোগ করতে পারবো না। যখন পড়া শেষে আমি ফিরবো তখন আবার ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে দিবেন বাবা স্বয়ং।

অরি---- কি সাংঘাতিক সব কান্ড কারখানা। এ তো কোন সিনেমা কেও হার মানায়। আর এই তুমি এলে পাঁচ বছর পর। ও মাই গড,,,,,আচ্ছা অনু কিছু বলে নি?

রাতুল---- না ও বা আমি, আমরা বাবার কথার বাইরে কখনই কিছু চিন্তা করি নি। তবে একটা সিক্রেট তোমায় বলি, সেই দিন থেকে অনু এক দিনের জন্যও সিঁদুর বাদ দেয় নি। সবার আড়ালে মাথায় ছুঁইয়ে রাখতো একটু সিঁদুর। কারন ও আর আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে আমরা বিবাহিত। আজও করি। অরিন্দম ---- রাতুল জীবনে অনেক লাভ স্টোরি শুনেছি বাট তেমারটা সবচেয়ে আলাদা। অনেক ভালো থেকো তোমরা, সবশেষে জাস্ট এটাই প্রার্থনা করি। এন্ড সরি,,,,আমিও তোমাদের জীবনের একটা কাঁটা হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভালোবাসা যেখানে নিখাদ, অনুভূতি যেখানে সমুদ্র সমান গভীর সেখানে আমার মতো ছোট কাঁটার কোন অস্তিত্বই নেই।

আমি জানি, সব জানার পরই তুমি তোমার জীবনের এই মূল্যবান,  আবেগময় অতীত আমাদের সামনে তুলে ধরলে।  তবে, হ্যটস অফ, আজ তোমার জায়গায় আমি হলে হয়তো এতোটা ভালো ব্যবহার করতে পারতাম না। সেই এংরি ছেলেটা আজ অগাধ ধৈর্য সম্পন্ন ডাক্তার হয়ে গেছে। তুমি আমার আইডল হয়ে গেলে।

রাতুল---- ( অরিন্দম এর কথা শুনে শব্দ করেই হেসে ফেলে রাতুল) ইটস ওকে!!! এসব তুমি কি বলছো  ব্রো,,,,আসলে বাইরে থেকে আসার পর এটুকু মান অভিমান না হলে ভালোবাসাকে ঠিকমতো উপলব্ধি হতো না। তোমার জন্যই হয়তো আমার ভালোবাসা পূর্ণ হলো। এ জন্য তোমাকেও ধন্যবাদ।

অরি কিছুক্ষণ মনেমনে ভাবলো, এই ভালোবাসার পূর্ণতা দানে, তার মতো একজন আউট সাইডারের কি অবদান থাকতে পারে? কিন্তু কিছুই খুজে পেলো না।

রাতুল---- মাথার উপর চাপ দিওনা ডিউড। সেই বিষয়টা এখন তোমার বোঝার বাইরে।

রাতুলের মুখের আত্নতৃপ্তির হাসি দেখে অরিন্দম আন্দাজ করতে পারলো ;কাল হয়তো এদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে।


অনু আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। চোখে মুখে তার প্রশান্তির ছাপ।  কাল রাতের কথা যেন কোন ভাবেই মাথাথেকে যাচ্ছে না। ভাবতে ভালো লাগছে সেই সময়টুকু। রাতুলের  ছোঁয়া যা সারা শরীরের ছরিয়ে ছিটিয়ে আছে, নিজের অজান্তেই হাত বারবার যেন পরিক্ষা করে নিচ্ছে, আর সকল দিনের মতো স্বপ্নে নয় তো? রাতুলের ঘামাক্ত উতপ্ত সিক্ত আদর সত্যি পেয়েছে রাতে?? সাথে সাথেই জমা হচ্ছে যত রাজ্যের লজ্জা।

সকাল থেকেই ইচ্ছে করেই রাতুলকে এরিয়ে চলছে অনু। কোথাও একটা লজ্জা যেন অনুকে রাতুলের কাছে যেতে দিচ্ছে না। রাতুলও সকাল থেকে অরি ও টিনাকে নিয়ে ছাদে গল্প করছে,অনু বার বার যেতে চেয়েও যেন লজ্জায় যেতে পারছে না। মনে মনে ভাবছে,,,
"" সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চললো তার যেনো কোন পাত্তাই নেই। সকালে মহিকাকার দাড়ায় ব্রেকফাস্ট পাঠালাম কোন রকম দু'এক বার খেয়ে ছেড়ে দিয়েছিলো। আবার এতো দেড়ি করছে এবার তো না গেলেই নয়। জ্যেঠামশাই তো তার ঘরে ডাকলো ওকে,,,ইস কিভাবে যে যাই "" ভাবতে ভাবতেই ছাদে চলে এলো অনুরাধা।

ছাদের দরজা পেরিয়ে অনু যখন তার কোমর অবধি চুলগুলোকে বাতাসের তালে এলোমেলো নৃত্য না করার জন্য হাত দিয়ে শাসন করতে করতে এগিয়ে আসছিল, আবার চোখ আটকে গিয়েছিলো রাতুলের। একটা হলুদ রংয়ের কুর্তি,সবুজ পাটিয়ালা, গলায় ঝোলানো সবুজ ওড়না, ঠোঁট প্রসাধনী হীন, হাতে একটা সোনার ব্রসলেট, গলায় সোনার ছোট্ট লকেট সহ চেন, কানে ছোট্ট সোনার দুল। এতেই অনুর সৌন্দর্য যেন বাঁধন হারিয়েছে। এই মোহনীয় রুপের বন্যায় এক জীবনে নয় হাজার জীবন ভেসে গেলেও আঁঁশ মিটবে না রাতুলের।

চোখ স্থির হলো অরিন্দম এর ও, এক জলন্ত রুপের আগ্নেয়আগ্নেয়গিরি যেন তার সামনে। এই আগুনের ছোঁয়ায় ভালোবাসা জাগে, বাঁধ ভাঙা আবেগ জাগে, জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা জাগে। অনুর চোখের দিকে তাকাতেই অরিন্দম বুঝতে পারে তা ডুবে আছে রাতুলের চোখে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ই কেমন ফাঁকা মনে হচ্ছে। কিন্তু কেন?  তার কোন জবাব পেলো না অরি। তবে কি সেই অসম্ভব টাই সম্ভব হলো অরিন্দম ও কাউকে ভালোবাসলো। এ ভালোবাসা তো পরিনতি নেই শুধুই কষ্ট। 
""না নিজের ভালোবাসাকে কষ্টে নাম দেবো না আমি। আমার ভালোবাসা হবে আমার অনুপ্রেরণা, অনুর মানসী রুপ আজ থেকে শুধুই আমার। আমি আর আমার ক্যনভাসের অনু হবে আমার বাকি জীবনের সাথি। সেটা থেকে রাতুলের ভালোবাসাও আমাকে দুর করতে পারবে না। ""

অরি---- ওকে রাতুল আই সুড লিভ। সি ইউ লেটার।

রাতুল জানে এখন ভদ্রতা বজায় রাখতে অরিকে বলতে হয়। " আরে কেন আর একটু বস।"" কিন্তু মন যেন সকল কথা হারিয়ে ফেলেছে। মুখ খুলেই বলবে"" অরি তুমি একটু নিচে যাবে?""

নিজের অদ্ভুত চিন্তায় নিজেই হেসে উঠলো রাতুল অরি ততক্ষণে দরজার কাছাকাছি চলে গেছে। রাতুল মুগ্ধ নয়ন অনুতে নিবন্ধ করে আস্তে আস্তে অনুর কাছে এগিয়ে যায়। বলে "" কি রে এখন ঠিক আছিস তো??""

রাতুলের এ কথায় যেন অনু আরও লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে যেতে উদ্যত হয়, কিন্তু এর মধ্যেই অনুর হাত রাতুলের মুঠো বন্দি। এগিয়ে গিয়ে অনুকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাতুল। হাত দিয়ে চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে একটা গভীর চুমু একে দেয় অনুর কাঁধে। শিউরে ওঠে অনু। বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পেটানো হচ্ছে।"" রাতুলদার ছোঁয়া গুলো এরকম পাগল করে কেন?  বার বার মনকে জিজ্ঞেস করছে আর এক অজানা ভালোলাগায় চোখ বন্ধ করে রেখেছে। রাতুলের নাক আস্তে আস্তে উঠে এলো অনুর চুলে। মন ভরে নিলো অনুর চুলের সুন্দর গন্ধ। রাতুলের হাত অনুক কোমড়ে, কু্র্তির দুি ছাইডের খোলা জায়গা দিয়ে অধিকার করে নিয়েছে অনুর নিচ পেট। হালকা স্লাইডেই বার বার কেঁপে উঠছে অনু।

রাতুল---- ""এই পাগলি তুই আমাকে এতো ভালোবাসিস কেন রে??"" অবাক হয়ে যায় অনু। এবার রাতুল অনুকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ রাখে।
"কি!! এতো অবাক হওয়ার কি আছে? তুই শুধু বল আমাকে ভালোবাসিস কেন।

অনু---- জানি না যাও। আর কে বললো আমি তোমাকে ভালোবাসি? আমার বয়েই গেছে। ( বলেই অনু হাত ছুটিয়ে যেতে চাইলো।)

রাতুল---- কি তুই আমাকে ভালোবাসিস না!! তবে রে (বলেই প্রায় হাত ফসকে যাওয়া অনুকে দুহাতে ধরে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।)  তারপর ধীরে অনুর নরম কোমল শরীরে রাতুলের হাত পিঠ বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। নিজের অজান্তেই অনুর হাত রাতুলের লোমশ বুকে স্থান খুঁজে নিলো। রাতুল অনুর গলায় হাত দিয়ে অনুর ঠোঁটকে নিজের দখলে নিয়ে নিলো। অনুও যেন ঠিক এরই অপেক্ষায় ছিলো। ওর হাত রাতুলের নরম সিল্কি চুলে কখন শক্ত করে ধরে কখন নরম আদরে খেলে বেড়াতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর রাতুল অনুর ঠোঁট কে ছেড়ে দিয়ে বলে উঠলো ""কি ভালোবাসিস না??""

প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া মেয়েটা একটু জোরে নিঃশ্বাস  নিয়ে বললো "" তুমি একটা আস্ত ডাকাত"'

রাতুল---- তুই ডাকাত রানী।

অনু----( একটু সহজ হয়ে) তুমি যতটা ততটা এবার হয়েছে।

রাতুল---- আমি কতটা?

অনু---- তা আমি কি করে জানবো?

রাতুল---- তাহলে শোন ঐ যে আকাশ দেখছিস, আকাশ যতটা ঠিক ততটা। ঐ অন্তহীন শূণ্যতা পূর্ণ করতে যতটা ভালোবাসা লাগে ততটা।

অনু----( ভালোলাগায় লজ্জা পেয়ে রাতুলের বুকে মুখ লুকিয়ে),,,, আসলে একটা পাগল তার পাগলামিকে যতটা ভালোবাসে ততটা,,,,হিহিহি।

রাতুল---- কি দাঁড়া!!  তোকে তো আজ আমি "" বলেই অনুর ঠোঁটে আবার আক্রমণ করতে চাইলো।  অনু রাতুলের ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বড় বড় চোখ করে,,,,ইস আমিতো একদম ভুলে গেছি।

রাতুল ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে কি??

অনু---- সেই কখন জ্যেঠামশাই তার ঘরে আমাদের ডেকেছেন।আমি তো ইস,,,,,,,তোমার মতো এরকম একজন দস্যু পাশে থাকলে কি, কিছু মনে থাকে?

রাতুল---- আসলে তো আদর খেতে খেতে নিজে ভুলে গেছিস, এখন আমার দোষ তাই না??

অনু---- আমি মোটেও সে জন্য ভুলি নি!"

রাতুল---- প্রমান কর।

অনু---- এই তুমি বার বার প্রমাণ কর, প্রমাণ কর কেন বল বলোতো? তুমি কি জর্জ আর এটা কি তোমার আদালত?

রাতুল---- যাহ!!! তা আমি কখন বললাম? তবে তুই তো বললি যে আদরে ভুলিস নি সেটা সত্য কি না তা বুঝবো কেমন করে।

অনু---- তা কি করতে হবে?

রাতুল---- আমায় কিস কর। তারপর তাড়াতাড়ি ছেড়ে দে। যদি ছেড়ে দিতে পারিস তবে তুই ঠিক না পারলে আমি।

অনু---- তোমার মাথায় তো এগুলোই থাকবে। আমার কোন প্রমাণ করা লাগবে না।  চলো তো জ্যেঠামশাই অপেক্ষা করছে।

রাতুল কোথায় ভাবলো এ সুযোগে অনুকে আর একটু কাছে পাওয়া যাবে কিন্তু তা আর হলো না দেখে, গেয়ে উঠলো"" হাত ধরে তুই নিয়ে চল সখি আমি যে পথো চিনি না""

অনু হাসতে হাসতে রাতুলের হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চললো।

রথিন বাবু বসে আছে তার ঘরে সাথে মৃনালিনী দেবী। আজ মৃনালিনী দেবী বই ছেড়ে খালি হাতে সোফায় রথিন বাবুর সাথে বসে আছেন। রথিন বাবু মৃনালিনী দেবীকে বললেন,," এতে তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি শুধু চাই সব ঠিক হয়ে যাক।""
মৃনালিনী ----- তুমি কি বলতে চাইছো বলতো? আমি এখন নতুন করে তোমাকে কোন সিদ্ধান্তের কথা বলবো? সেদিন যখন রাতুল অনুকে সিঁদুরে রাঙিয়ে দিয়ে ছিলো, শুধু আমিই বলেছিলাম তোমায় ওদের মেনে নিতে। তুমিই মেনে না নিয়ে ওদের আলাদা করে দিয়েছিলে। আজ যখন সেই ওদের বিয়ের দিন তুমি স্থির করতে চাও, আমার মনে হয় না যে তোমার আমার কাছে নতুন করে কোন পারমিশন নেয়ার আছে।

রথিনবাবু---- তুমি এখনো সেই রাগ পুষে রেখেছো মিনা? তুমি ভাবতো ওদের বয়সটা কি ছিল? সেই বয়সে ওদের যদি এক করে দিতাম তবে ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারতো। ছেলেমেয়েরা যত বড় হয়, তাদের বিচরন ক্ষেত্র যত প্রসারিত হয়, ততই ওদের মানসিক পরিবর্তন ঘটে। সেই সময় ওদের অপোক্ত মনের কৃত কর্ম, পরবর্তীতে যদি ভুল মনে হতো; তাহলে সারাজীবন নিজেরাই কষ্ট পেতো। তাই আমি চেয়েছি ওরা বড় হয়ে নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিক। আজ আমি বুঝতে পেরেছি এতো বাঁধা,  বিচ্ছেদ সত্যেও ওরা ঠিক একই রকম আছে।

মৃনালিনী ---- একটা সত্যি কথা বলবে আমায়। তুমি কাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলে রাতুল, না অনু?

রথিনবাবু---- তোমার মনে এ ধরনের প্রশ্ন কেন আসছে আমি তো সেটাই ভাবতে পারছি না। তবে এর উত্তর আমি না রাতুলই দিতে পারবে। তাই এসব অদ্ভুত আর তোমার মনের অলীক কল্পনার বিষয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো বলে আমি মনে করি।

মৃনালিনী ---- (শ্লেষাত্মক একটা হাসি হেসে)  আবার এরিয়ে যেতে চাইছো। সত্যের মুখোমুখি হতে এতো কিসের দ্বিধা তোমার?  কেন এখনো মেনে নাও না যে তুমি আজো অমলা ঠাকুঝিকেই ভালোবাসো, এখন তোমার চিন্তায়, কর্মে,  নিশ্বাসে অমলার উপস্থিতি অনুভব কর। আর অনুকে অমলা আর নিজের সন্তান মনে কর। আর রাতুলকে শুধুই আমার সন্তান। ( চিৎকার করে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দুহাতে মুখ ডাকলেন মৃনালিনী)

রথিনবাবু---- মিনা আজ এতো বছর পর তুমি এ কথাগুলো আমাকে বলতে পারলে। হ্যা মানছি আমি অমলাকে ভালোবেসে ছিলাম একদিন। তাই তোমাকে মেনে নিতে কষ্ট ও হয়েছিলো।  তবুও তো মেনে নিয়েছিলাম তোমাকে। এতো বছরের সংসার আমাদের,,,,,,

মৃনালিনী ----- সংসার!!! সংসার কাকে বলে জানো। সকাল থেকে রাত অবধি তোমার ব্যবসার কাজে, সমাজের কাজে নিজেকে ইচ্ছে করে ডুবিয়ে রেখে তুমি ককে ভুলতে চাইতে? তুমি কি ভাবো? বুঝিনি আমি। আজ তুমি আমাকে সংসার দেখাচ্ছো।

রথিনবাবু---- এসব কি বলছো মিনা?? এতোদিন এতো অভিমান মনের মধ্যে নিয়ে ছিলে, কই একদিনের জন্যেও তো বুঝতে দাওনি আমায়!!

মৃনালিনী ---- বুঝতে তুমি? তুমিযে সম্পূর্ণ ভাবে অমলা ঠাকুরঝির, আমি নিজেকে কোন দিনও তার জায়গায় পাই নি। যখনি আমি তোমার দুচোখে আমার জন্য আবেগ খুঁজেছি আমি ব্যর্থ হয়েছি। আর তখনি নিজের চোখে নিজেই ছোট হয়ে গেছি । তিলে তিলে তোমার অবহেলা আমাকে নিস্ব করে দিয়েছে।

রথিনবাবু---- তুমি ভুল দেখেছো মিনা। হ্যা আমি অমলাকে ভালোবাসতাম তাই বলে তোমার অমর্যাদা আমি কখনই করি নি।  তোমার অধিকার থেকে কখনই বঞ্চিত করি নি। তোমার প্রাপ্য সম্মান আমি সবসময় দিয়েছি।

মৃনালিনী ----- করুনা করেছো। তুমি শুধুই করুনা করেছো আমায়। তোমার অমলার কথায় শুধু মেনে নিয়েছো আমায়। মনে তুমি কোন দিন স্থান দাও নি।

রথিনবাবু---- করুনা!!! কি বলছো তুমি?

মৃনালিনী ---- হ্যা হ্যা করুনা, শুধু ই করুনা। আমার আজও মনে পরে ফুলসজ্জার রাতে তুমি বলেছিলে তোমার জীবনে আমার অধিকার কতটুকু। কি জানো তুমি? ফুলসজ্জার রাতে একটা সতেরো বছরের মেয়ে কত স্বপ্ন, আশা,ভয় নিয়ে বসে থাকে। তুমি এক মুহুর্তে সকল সপ্ন আশাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলে। সেই তুমি আমাকে মেনে নিলে অমলার কথায়। কেন?  তার আগে আমি কেন তোমায় চোখে পরি নি?

রথিনবাবু---- এর জন্য এর আগেও অনেক বার ক্ষমা চেয়েছি আমি। তখন মামসিক ভাবে একেবারে বিধস্ত ছিলাম আমি, কি করেছি, কেনো করেছি, তার কিছুই বুঝিনি। অমলা আমায় জানতো, বুঝতো সেদিন তোমাকে ও আমাকে দেখে এক মুহুর্তে বুঝতে পেরেছিলো যে আমার শাসন এর দরকার তাই সেদিন,,, কিন্তু তার পর থেকে তোমার আমার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিলো। আমাদের জীবনে রাতুল এসেছিল।

মৃনালিনী ----- জানি জানি তাই তো এই সংসার। তুমি কি বুঝতে, তোমার আদর ভালোবাসা সবকিছুতেই অমলার করুনার গন্ধ খুজে পাই আমি। তাই এরিয়ে চলতে শিখেছি আমি।

রথিনবাবু---- মিনা,,,( দৃঢ় কন্ঠে প্রায় চিৎকার করে ওঠে রথিন বাবু।)  আমি জানি এই ব্যবসা সামলিয়ে, সাধারণ না খেতে পাওয়া মানুষদের জীবন সামলে দিতে তোমাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারিনি আমি।  তাই বলে এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা যে তোমাকে ভালোবাসিনি আমি। হ্যা হয়তো বলা হয়ে ওঠেনি কারণ সব কিছুতে তোমার নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার স্বভাবকে আমি স্বাভাবিক ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম এভাবেই হয়তো ভালো থাকো তুমি। কিন্তু আজ বুঝলাম, এতোদিন ভুল জানতাম আমি। আর অমলার কথা বলছো? সে তো কবেই আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। তোমাকে তোমার উপযুক্ত জায়গায় বসিয়ে সে তো চলে গেছে। তাহলে আজ কেন ওই মৃত মানুষটাকে নিয়ে এতো অভিযোগ তোমার।

রথিনবাবুর কথায় অবাক মৃনালিনী।  রথিনবাবু কি বলছে ভালোবাসে তাকে,  কিন্তু অমলা!!

রথিনবাবু---- হ্যা আমি জানি কোন মেয়েই তার স্বামীর জীবনে অন্য কোন নারীর উপস্থিতি মেনে নিতে পারে না। কিন্তু অমলা আমার অতীত ছিল, ওর সাথে কাটানো সময়গুলো আমার শক্তি সারা জীবনের, আর তুমি আমার বর্তমান।  আমার সুখ দুঃখের সাথি। তোমার সহজ সরল জীবন, গভীর চোখ,  স্নিগ্ধ হাসি, মেনে নেয়ার অফুরন্ত প্রচেষ্টা আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। সেখানে কোন দিন অমলাকে অনুভব করি নি আমি। তুমি কেন বুঝতে পারনি এ জীবনে এখন অমলার চেয়ে তোমার গুরুত্ব অনেক বেশি?

চল্লিশ উদ্ধ মৃনালিনী নিজের এতোদিন ধরে পুষে রাখা অকারণ অভিমানের জন্য যে সময় বয়ে গেছে তার কথা ভেবে হাহাকার করে উঠলো। দু-চোখ বেয়ে জল পরতে লাগলো। দাড়িয়ে থাকার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। মৃনালিনী লুটিয়ে পরার আগেই ধরে ফেলে রথিন। আজ অনেকদিন পর রথিন বাবুর বুকে মাথা রেখে এক নাগারে কেঁদে যাচ্ছে মৃনালিনী।  এ কি করেছে সে,, নিজের মস্তিস্ক প্রসূত অবান্তর চিন্তায় কতদিন অগ্রহ্য করেছে রথিনের ডাককে। কতদিন রথিনের ভালোবাসা মাখা ছোঁয়া কে নিবৃত করেছে অসুস্থতার অজুহাতে। এই পরন্ত বয়সে পারবে কি সেসব দিন ফিরিয়ে দিতে। কি বোকা ছিল সে নিজে, পৃথিবীতে কেউ কারও জায়গা দখল করতে পারে না। সবার নিজের একটা জায়গা থাকে আর সেই জায়গায় দাড়িয়ে জীবন যুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে হয়। তবে সে কেন মরিয়া হয়ে অমলা হতে চেয়েছে, রথিন তো মৃনালিনীকেই আপন করে নিয়েছে। 

মৃনালিনী----- আমি খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোমায় তাই না? পারবে আমায় ক্ষমা করে দিতে? আবার আমায় একটা সুযোগ দিতে?

রথিনবাবু---- না গো আসলে দোষ আমার আমি তোমাকে বুঝতে পারি নি, বোঝাতেও পারিনি। আগে যদি জানতাম, নিরবে তুমি এতোখানি অভিমান জমা করে রেখেছো, তবে কবেই সব মিটে যেতো।

মৃনা-- -- তোমার কি দোষ?? আমিই তো তোমাকে বুঝতে দেই নি।

(রথিনবাবু দুহাতে মৃনালিনীর মুখখানি তুলে) তবে যাই হোক তুমি আজ থেকে এটুকু জেনে রেখো আমি এ জীবনে শুধুই তোমার। আর অভিমান পুষে রেখো না। ভাবছি একবার কোথা থেকে ঘুরে আসি তোমাকে নিয়ে,,, একটা সেলিব্রেশন তো চাই নাকি বলো? (হেসে রথিনবাবু)

মৃনালিনী দেবী দুহাতে শক্ত করে রথিন বাবুকে জরিয়ে ধরে,,,,, তুমি যা বলবে আজ থেকে আমি তাতেই রাজি।
রথিনবাবুর বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো।

ছাদ থেকে রথিনবাবুর ঘরের দরজায় দাড়িয়ে অনু আর রাতুল আধভেজা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরের ভেতরের দিকে তাকাতেই দেখলো মৃনালিনী ও রথিন বাবু দুজন দুজনকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে আছে। অনু নিজের চোখ বন্ধ করে দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দিলো।

রাতুল----,,""ফিসফিসিয়ে "" দেখ বাবা মা এ বয়সেও কত রোমান্টিক।  দেখেছিস,,,,আর তুই,,,

অনু---- হবেই তো নইলে তোমার মতো এমন ওভার ডোজের রোমান্টিক ছেলে আসবে কোথা থেকে?

রাতুল---- ওভার ডোজ না!! দাড়া দেখাচ্ছি ওভার ডোজ কাকে বলে!! ( বলেই অনুকে পাজ কোলা করে নিয়ে ওর রুমে ডুকে গেলো")

অনুকে বিছানায় বসিয়ে দরজা লক করে দিলো। ভয়ে অনু দুচোখ বন্ধ পাদু’টো গুটিয়ে জরসর হয়ে বিছানায় বসলো। ও জানে ছটফট করলে রাতুল আরও মধুর শাস্তি দিনে ওকে। এই ভর দুপুরে সে আদর সহ্য করার শক্তি নেই অনুর।
রাতুল দেখলো অনু বিছানায় জরসর হয়ে বসে আছে। রাতুল আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো বিছানার কাছাকাছি।  ওর চোখ আটকে গেলো অনুর পায়ে। লাল সাদার মিশ্রনে মসৃন পা জোড়া যেন কোন শিল্পির হাতে আঁকা নিখুত ছবি। বড্ড লোভ হলো পা দুটোকে আদর করতে। তাই অনুকে অবাক করে আস্তে আস্তে বিছানার নিচে বসে দুহাতে তুলে ধরলো অনুর পা জোড়া। এক করে গভীর চুম্বন একে দেয় তাতে। এতেই কেঁপে ওঠে অনু তাড়াতাড়ি রাতুলের হাত থেকে পাদুটো ছাড়াতে যায়,,,"" ইস বড্ড পাপ হচ্ছে"" কিন্তু রাতুল ততক্ষণে তার আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। মুখে বলছে "" দেহি পদ পল্লব মুদারকম"" বিহ্ববল অনু জোর করে নিজের পা ছাড়িয়ে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে তুমি কি এনাটমি, ফিজিওলজি ছেড়ে জয়দেবের গীতগবিন্দ পরছো নাকি?

রাতুল---- শুধু গীতগবিন্দ!! পরছি কালিদাসের মেঘদূত।  আকাশের মেঘগুলোকে চিঠি সাজিয়ে কাতর অনুনয় করেছি পাঁচ পাঁচটা বছর। আর তোকে কিভাবে আদর করে সন্তুষ্ট করবো সেজন্য পরেছি ""কুমারসম্ভব "" 

অনু---- কি এতোদিন এই সবই চিন্তা করেছো!! তবে এখোন ছাড়ো তোমার প্রেমের ঝাপি বন্ধ কর।  দুপুর বেলা এসব কিছুই চলবে না।

রাতুল ----- প্লিজ সোনা ;এখনকার মুডটা নষ্ট করিস না।

অনু---- কিছুতেই না এখন আমি বাইরে যাব। ছাড় আমায়।

রাতুলের মুখটা হঠাৎ শক্ত হয়ে যায়। অনুকে ছেরে দিয়ে বড় বড় পা ফেলে দরজার লক খুলে দরজা খুলে বলে "" যা এখুনি চলে যা"" বলেই এসে বিছানায় শুয়ে পরে।

অনু বুঝতে পারে রাতুল কষ্ট পেয়েছে তাই ও গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।  তারপর রাতিলের পাশে শুয়ে পরে কিন্তু রাতুলের কোন হেলদোল নেই, তাই

অনু---- এই,,,,রাতুল,,,,সরি।

রাতুল হালকা হেসে পাশ ফিরে শুতে চাইলে অনু
নিজেই উঠে বসে রাতুলের বুকে। রাতুলের হাত অধিকার করে নেয় অনুর শরীর।  তীব্র শীৎকার ভেসে আসে অনুর মুখ থেকে। ধীরে ধীরে আদিম খেলায় মেতে ওঠে ওরা। সীমাহীন ভালোবাসা যেন সীমাহীন শরীরি খেলায় নিজেকে উজার করে দিতে চায়। রাতদিনের পার্থক্য ও যেন মূল্যহীন। আজ শুধু ভেসে যাওয়া।  ক্ষনিক কুলে ফিরে আবারও ডুব দেয়া।

রাতুল ক্লান্ত অনুকে বুকের মধ্যে নিয়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে। ""তুই রাগ করলি? জানিস না তোকে কাছে না পেলে আমার কত কষ্ট হয়?"

অনু-----আজ যা হয়েছে হয়েছে, জ্যেঠা মশাই বিয়ের দিন ঠিক করলে কিন্তু আর এগুলো হবে না।

রাতুল অনুর মুখটা তুলে "" বলছিস বটে,,, তুই থাকতে পারবি তো?? ""

অনু খানিক চিন্তা করে রাতুলের বুকে মুখ লুকিয়ে বললো "" না তোমাকে ছাড়া আমার এক দিনও চলবে না""

রাতুল----( অনুর মাথায় একটা গভীর চুমু দিয়ে) এবার আমরা ইয়ে করে বিয়ে করবো??
বিকেলে রাতুল ও অনুরাধা ড্রইং রুমে রথিন বাবুর সামনে বসে আছে। দুজনেই জরসর হয়ে কখনো হালকা রথিন বাবুর চোখের দিকে কখনো নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখছে। আজ মৃনালিনী দেবী অন্যান্য দিনের মতো রথিন বাবুর সাথে দূরত্ব রেখে বসে থাকে নি। বরং প্রায় রথিন বাবুর বাহু লগ্না হয়ে মুখে সুমিষ্ট হাসি টেনে বসে আছে। 

ঘরের আর একটি ডিভানে শরীর ছরিয়ে দিয়ে বসে আছে রমাপ্রসাদ বাবু। আজ তার অভিজ্ঞ চোখে তার পুত্র ও পুত্রবধুর ব্যবহারের পরিবর্তন সুস্পষ্ট। এই পরিবর্তন ভালো লাগলো রমাপ্রসাদের। পচিঁশ বছর আগে ছেলেকে জোড় করে বিয়ে দেওয়ায় মৃনালিনীর প্রতি রথিনের কৃত অন্যায় তার মনকেও ভেঙে দিয়েছিলো। সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছিল সেই দিন যেদিন বুঝেছিল রথিন অমলাকে ভালোবেসেছিল আর অমলার বাবা রমাপ্রসাদের সম্মানের ভয়ে মেয়েকে জোর করে অন্যত্র বিয়ে দেয়, আর সেই বিয়ে কিনা রমাপ্রসাদের তত্বাবধানে সুসম্পন্ন হয়। নিজের হাতেই ছেলের ভালোবাসাকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। তারপর সেই কঠিন সময় যখন বিদেশ ফেরত ছেলে তিল তিল করে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। শতবার ক্ষমা প্রার্থনা, শাসন,  ধমক কিছুই কাজ করছিলো না । একদিন এই সব যন্ত্রণার হাত থেকে সাময়িক মুক্তির জন্য নিরুদেশ যাত্রা পথে রাজেন্দ্রের সাথে ট্রেনে দেখা। সাথে ছিলো মৃনালিনী।  সুন্দর নিটোল মুখ, টানাটানা দুটো চোখ, আর ছিপছিপে গড়নের মেয়েটাকে দেখেই ভালোলাগে রমাপ্রসাদের। তারপর রাজেন্দ্রর কাছে নিজের ছেলের জন্য ওনার মেয়েকে প্রার্থণা করে রথিনকে না জানিয়ে।

বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন খোদ বরের অলক্ষে। তারপর একদিন রথিনকে রমাপ্রসাদ তার নিজের ঘরে ডেকে রীতিমত ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে।  এ বিয়ে না করলে তিনি এই বাড়ি ঘর সব ছেড়ে বেড়িয়ে পরবেন পথে। তার পছন্দ মতো বিয়ে না করলে এ জীবনে তিনি রথিনের মুখো দর্শন করবেন না। প্রথমে তাও মেনে নেয় নি রথিন। কিন্তু একদিন ভোর বেলা রমাপ্রসাদ বাবু যখন তার তল্পিতল্পা নিয়ে বাড়ি থেকে হেঁটে বেড়িয়ে যাচ্ছিলেন তখন মহিধর রথিনের হাতে পায়ে ধরে তার সাহেবকে আটকানোর জন্য প্রর্থনা করে। রথিন তখন প্রায় নিরুপায় হয়ে রমাপ্রসাদ বাবুর কথা মেনে নেয়। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর রমাপ্রসাদ বাবু খেয়াল করেন মৃনালিনী শুকনো মুখে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করেন। তার কারণ হিসেবে জানতে পারেন রথিনের অভদ্রোচিত ব্যবহার। খুবই মর্মাহত হন তিনি।  কিন্তু তিনি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রেখেছিলেন তাই একদিন ঈশ্বরের দূতের মতো আবির্ভাব ঘটে অমলার, আর সব কিছু ঠিক করে দেয়। তবুও এদের মধ্যেকার বিবাহিত জীবনের সুর কোথাও ঠিক ভাবে বাজছিল না। কেথাও একটা তারের বেসুরো তাল বার বার সব সুরকে নষ্ট করে দিচ্ছিল।

আজ এতোদিন পর যেন সব তার একসাথে বেজে একটি রাগিনী তৈরি করেছে।  সেই রাগিনির সুরে আনন্দে ভেসে যাচ্ছে রমাপ্রসাদের মন। তবে রাতুল ও অনুর এই তরুন জুটি বড্ড বেশি পছন্দ রমাপ্রসাদের । এই তারুন্যের উন্মাদনা, ভালোবাসার উন্মত্ততা এ সব কিছু যেন রথিনের না পাওয়া স্বপ্নগুলো। তাই রথিন যেমন এদের ভালোবাসাকে প্রশ্রয় দেয় তেমনি রমাপ্রসাদ বাবুও তার ভুল কৃতকর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ হৃদয়, এদের দেখে শান্তি লাভ করে।

********

রথিনবাবু---- বাবা তুমি কি বলো? এ মাসেই তো ভালো তাই না কি? পুরোহিত মশাই তো বললেন ফাল্গুন মাসই বিয়ের জন্য উপযুক্ত সময়। তবে তারিখ শুধু একটাই ভালো ১৯ শে ফাল্গুন।

রমাপ্রসাদ ---- হ্যা হ্যা ওটাই ভালো। যত তারাতাড়ি হয় ততই ভালো। ( বলেই রাতুলের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি ছুরে দিলেন)

রাতুল---- বাবা,,,,তুমি কিছু মনে না করলে আমি একটা কথা বলতে চাই।

রথিনবাবু---- হ্যা বলো,,,,

রাতুল---- আসলে আমি চাইছিলাম বিয়েটা খুব সিম্পল হোক, আর তুমি বিয়ের জন্য যে টাকাটা ব্যয়ের চিন্তা করছো সেটা সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় হোক।

রথিনবাবু---- সাধারণ মানুষদের তো সারা জীবন সাহায্য করবি, তাই বলে মুখার্জি বাড়ির ছেলের বিয়ে হবে তা সমাজের কেউ জানবে না।

রাতুল----- তা তো অবশ্যই বাবা তুমি সমাজের মানুষকে জানাও তবে অতটা জাঁকজমক করে নয় যতটা তুমি ভাবছো । প্রতি বছর আমরা যেভাবে সাধারণ মানুষের বিয়ের আয়েজন করি এবার তোমার ছেলের বিয়ের আয়োজনও একই রকম হোক, যাতে সাধারণ মানুষের মনে এটা না আসতে পারে যে তুমি নিজের ছেলের বিয়েতে গন বিয়ের থেকে বেশি আয়োজন করেছো।

রথিনবাবু---- কি রে মা তুই চুপ করে আছিস যে? তোর কি মত, বললি না?

অনু---- তোমরা যা মনে করবে তাই হবে আমার কোন কিছুতেই আপত্তি  নেই জ্যেঠা।

রথিনবাবু---- আরে!! এখনো জ্যেঠা!!! এবার তো বাবা বলা প্রাকটিস কর।

রথিনের কথায় লজ্জায় ঘর থেকে এক দৌরে বের হয়ে গেলো অনু।

রাতুল---- বাবা , এ বিষয়ে আমার আর কোন বলার নেই তুমি যা ভালো বোঝ তাই হবে।

রথিনবাবু---- আমি ভাবছিলাম তোদের বিয়ের আগে আমি আর তোর মা একবার পুরি যাব জগন্নাথদেবের দর্শন করতে। তা আর তো কটা দিন হাতে কালই ভোরে বেড়িয়ে যাব আমরা। অনু অফিসের সবটা জানে আমি চাই এ কটা দিন তুমি অনুকে সাহায্য করবে ও একজন ভালো ইভেন্ট ম্যনেজার এর সাথে কথা বলবে। বিয়ে যেহেতু বাড়িতেই হবে তাই লোকাল হলেই হবে।

রাতুলের বাবা মায়ের এ সময়ে জগন্নাথ দেবের দর্শন বিষয়টা মাথায় না ডুকলেও এটুকু বুঝতে পরছে যে এতোদিন পর এই জুটি নিজেদের মতো একটু সময় কাটাতে চাইছে। বাবার কথায় রাতুল শুধু সম্মতি বাচক মাথা নাড়ালো।

রমাপ্রসাদ বাবু ----- দাদুভাই আমাকে একটু ঘরে পৌঁছে দাও তো। (ফিসফিসিয়ে)  তুমি তো ও দিকেই যাবে।

রাতুল হেঁসে দাদুকে ধরে" এসো"।

রাতুল রমাপ্রসাদ বাবুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখে মালীর নাতনি কৃষ্ণা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে।

রাতুল---- কি রে কৃষ্ণা তুই এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেনো?

কৃষ্ণা---- না মানে দাদু আমাকে বললো তোমার বিয়ের দিন কবে ঠিক হলো শুনে নিতে।

রাতুল---- আচ্ছা,,, মালীদাদুকে বল  ১৯ শে ফাল্গুন, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি।

তারিখ টা শুনেই কৃষ্ণার মুখে আনন্দের হাসি ফুটে ওঠে। দাদু দাদু চিৎকার করতে করতে সে বাড়ির বাইরে চলে যায়। রমাপ্রসাদকে নিজের রুমে নিয়ে এসে আরাম চেয়ারে বসিয়ে দেয় রাতুল। দাদুর কি প্রয়োজন তা দিয়ে চলে যায় অনুর ঘরে।

অনু তখন নিজের বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে মুখটা বালিশে ঢেকে রেখেছে। আনন্দে আত্নহারা যেনো সে।

রাতুল----( নিঃশব্দে অনুর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অনুর পাশে শুয়ে পরে।) কি রে খুব লজ্জা পাচ্ছিস।

অনু চমকালো না কারণ  রাতুলের শরীরের ঘ্রান তাকে আগেই ওর আগমন বার্তা দিয়ে দিয়েছে।

অনু ------আমাদের বিয়ের আর মাত্র পনের দিন বাকি। 

রাতুল---- আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেছে, এ বিয়ে শুধু সমাজের জন্য বুঝেছিস।

রাতুলের চোখে দৃঢ়তা, অনুর মনকে আলোড়িত করতে লাগলো। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রাতুলের টিশার্ট ধরে ওর মুখটা একেবারে কাছে নিয়ে এসে নিজের ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিলো রাতুলের ঠোঁটে। মুহূর্তে এক হয়ে যাচ্ছিল একে অন্যের প্রতি বিশ্বাসের মর্যাদা, প্রস্ফুটিত হচ্ছিল আরও কত আশা স্বপ্ন। শ্বাসহীন দীর্ঘচুম্বনের পর অনু নিজের শরীর এলিয়ে দেয় বিছানায়। রাতুল অনুর কু্র্তির সামনের দুটো হুক খুলে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অনুর বিভাজিকায়। এক নরম কোমল খেলায় ব্যস্ত তার অধর। আদরে বারে বারে কেঁপে ওঠা অনু দুহাতে আকড়ে ধরে রাতুলের চুল। আবেগে ভেসে যাওয়া অনুকে দেখে রাতুল বললো "" তোর এই শরীর কি শুধু আমাকে পাগল করার জন্যই তৈরি হয়েছে? কেন আমি নিজেকে আটকাতে পারছিনা আর? কেনো তুই কাছে আসলেই আমার সম্পূর্ণ শরীর উন্মত্ত হয়ে ওঠে, শুধু তোকে ছুঁতে চায়? এতো আদরেও কেন সিক্ত হচ্ছেনা আমার মন। তোকে দেখলেও কেন এতো তৃষ্ণা জাগছে,,  বলতো?

অনু চোখ বন্ধ করে একটা তৃপ্তির হাসি ছরিয়ে "" জানি না যাও""
রাতুল অনুর বুকে মাথা রেখে দুচোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। শুনতে লাগলো অনুর শরীরের স্পন্দন।

********
মৃনালিনী ----ছেলে মেয়েদের বিয়ের সময়ে এভাবে আমাদের বাইরে যাওয়াটা কি ভালো দেখায়।

রথিনবাবু---- আসলে আমি সত্যি ওদের নামে মানত করেছিলাম। যেতে তো হবেই। বিয়ের পর আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার কথা বললেই তুমি এরিয়ে যেতে এতো দিন এটা আমার কাছে স্বাভাবিক হলেও আজ নয়। আমি চাই জীবনের বাকি কটা দিন তুমি সবসময় আমার সাথে থাকো একদম ছায়া হয়ে,, থাকবে না?

মৃনালিনী ---- রথিনের বুকে মাথারেখে যতক্ষণ না তুমি আমাকে সরিয়ে দিচ্ছো। রথিনবাবু মৃনালিনীর কপালে গভীর একটা চুমু একে দেয়। এতেই মৃনালিনীর হাতের বাধন যেন শক্ত হয়ে যায়।
রথিন বাবু -----মিনা,, চলো আমাদের ঘরে চলো। আনেক গোছাতে হবে কাল ভোরেই আমাদের বেরোতে  হবে।

মৃনালিনী যেন কিছু আঁচ করতে পেলেন,,, সলজ্জে বলে উঠলেন "" চলো""।
মুখার্জি বাড়িতে সকাল ছয়টা। অনু পুরো বাড়ি মাথায় করে রেখেছে কখন রান্না ঘর কখনো দোতলায় রথিনের ঘর সকাল থেকে অবিরাম ছোটাছুটি করছে। ওর ব্যস্ত পদচারণা, ত্রস্ত স্বরে রাতুলও বিছানা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। রথিনবাবু মৃনালিনী দেবী তাদের ব্যগ গুছিয়ে মহিধরের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তাদের খাওয়া দাওয়া শেষ তবে অনু মহিধরের হাতে আরও একটা ব্যগ ধরিয়ে দিলো,,,আর রথিন বাবু কে বললো
----- একদম বাইরের খাবার খাবে না।এখানে কাল পর্যন্ত সকল খাবার আছে। সাথে কিছু শুকনো খাবার দিয়েছি। আর জ্যেঠীমা তুমি সময়মতো নিজের মেডিসিন ও জ্যেঠামশাইয়ের মেডিসিন এর দিকে লক্ষ্য রাখবে।

রথিনবাবু---- হয়েছে হয়েছে আর কত এই বুড়ো ছেলে মেয়ের জন্য চিন্তা করবি? এখন একটু জিরিয়ে নে দেখি। সেই সকাল থেকে ছোটাছুটি করছিস।

মৃনালিনী ---- তুমিও রাতুলকে দেখো।

অনু---- (লজ্জায় নিজের মাথা নামিয়ে নিল ও মাথা নাড়ালো শুধু)

মৃনালিনী ----- থাক আর লজ্জা পেতে হবে না তোকে। আর নিজের যত্ন নে। এ কয়দিনে তোর চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে যেন তোকে ভালো দেখি। এই যে মহিদা,,,, অনু খাওয়া দাওয়া না করলে আমাকে খবর দিও।

অনু এবার ছুটে গিয়ে মৃনালিনী কে জরিয়ে ধরে আস্তে আস্তে বললো,,, তারাতাড়ি এসো। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে আর তোমাদের সাথে দেখা হবে না।

মৃনালিনী ----( অনুর পিঠে হালকা চাপ দিয়ে) এই পাগলি কি বলছিস এসব!! তোদের মঙ্গলের জন্যই যাচ্ছি সব ঠিক হয়ে যাবে। মন খারাপ করিস না।

রথিনবাবু---- মা অনু,,,,কাল তোর দাদুর সাথে কথা হয়েছে আমার। পরশ দেশে ফিরেছে আজ হয়তো অফিসে আসবে। তোর নতুন ডিজাইন গুলো একবার দেখতে চায়।

অনু---- পরশ ফিরেছে,,!! কবে ?  আমাকে জানালো না। আজ হাতে পাই একবার ওর খুব বার হয়েছে। বিদেশে থেকে এতোদিনে একবারও ফোন করেনি।

রাতুল----পরশ!! পরশ কে??

রথিনবাবু---- পরশ অনুর বাবার কাকাতো ভাইয়ের ছেলে। খুব বড় ফ্যশান ডিজাইনার। ও আমাদের কোম্পানির আন্ডারে অনুর সাথে একটা প্রজেক্টে কাজ করছে।

রাতুল---- ও,,,,

অনু---- তোমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো? পরে কিন্তু ট্রেন মিস করবে।

মৃনালিনী ----- এই চলো,,,, এবার সত্যি দেরি হয়ে যাচ্ছে।

রথিনবাবু---- হ্যা হ্যা চলো। তোরা সাবধানে থাকিস। রাতুল মাথা গরম করিস না।

রাতুল ও অনু দুজনকে প্রণাম করলো। ও দূর্গা,দুর্গা  বলে বেড়িয়ে পরলো।

**************
ড্রইং রুমে রাতুল ও টিনা বসে আছে টিনা তার ব্যগটা মহিধরকে দিয়ে গাড়িতে তুলে দিতে বললো,,,

টিনা---- রাতুল,,, সরি ফর এভরিথিং। তোমাদের এখানে এসে আমি অনেক কিছু জানতে পেলাম। সবচেয়ে বেশি পেলাম ভালোবাসা কথাটার অর্থ। জানি না এই ভালোবাসা আমার জীবনে আসবে কি না, তবে আমি দুয়ার খুলে অপেক্ষা করবো।

রাতুল---- চিন্তা করোনা। সবার জীবনে ভালোবাসা তার রঙিন ডানা মেলে ধরে। শুধু সময় দাও তাকে আসার। ভালো থেকো।  আর কিছুদিনের মধ্যেই তোমার সাথে দেখা হচ্ছে। স্কলারশীপের খোঁজ রেখো।

টিনা---- ওকে বাই,,,,(হঠাৎ করে রাতুলকে জরিয়ে ধরে গালে একটা কিস করলো,,,, আমি খুব মিস করবো তোমাকে,,,)

রাতুল ঘটনার আকর্ষিকতায় আরোষ্ঠ হয়ে হলো। তারপর আস্তে আস্তে টিনাকে ছাড়িয়ে দিলো। টিনা নিজের ব্যবহারে লজ্জা না পেয়ে একদৃষ্টিতে রাতুলের দিকে চেয়ে রইলো,,,

********
অনু রান্নাঘরে সকালের রান্না করা খাবারের অবশিষ্ট খাবারগুলো একটা একটা করে প্যকেটে তুলে নিচ্ছে। পথে একটা অনাথ আশ্রম আছে তাতে দেওয়ার জন্য,,,এই সময় রান্না ঘরের দরজায় কারও অস্তিত্ব অনুভব করে চকিতে ঘুরে দেখে,,,, অরিন্দম দরজায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে।

অনু---- এ মা আপনি এখানে কিছু দরকার??

অরি---- হু দরকার খুব দরকার ,,, কিন্তু তা আপনি দিতে চাইবে না।

অনু---- অবাক হয়ে তাকিয়ে,,,,কেন? কি চাই,,, চা,,,কফি,,

অরি---- না,,,,বাদ দিন,,, এসব। এই নিন আপনার গিফ্ট। ( একটা মুড়ানো মোটা কাগজ অনুর হাতে ধরিয়ে দিলো। )

অনু---- গিফ্ট!! আমাকে কেন?

অরি---- কি জানি? মন বার বার বলছিলো আপনাকে একটা গিফ্ট দিতে তো আমি আঁকিয়ে মানুষ কি আর দেব তাই আমার আঁকাই দিলাম না হলে আবার মন অভিমান করতে পারে। বাঁধাই করতে পারি নি। আসলে এখানে কোথায় বাঁধাই করে জানি না তো। ভালো না লাগলেও উপায় নেই কারণ আর সময় নেই যে আর একটা তৈরি করে দেব।

অনু ধীরে ধীরে মোড়ানো পেইন্টিং টা খুলতে লাগলো। পেইন্টিং টার দিকে তাকিয়ে অনুর যেনো চোখ স্থির হয়ে গেলো।
""এ কি তার ছবি!!  নাকি প্রকৃতির মানস কন্যার অয়বর। ""অনু দেখতে পেলো কোন এক ঝরনার ধারে সাদা পাথরের উপর একটা মৃত গাছের গুড়ির উপর মাথা রেখে বসে আছে একটি মেয়ে, ঠিক অনুর মতো দেখতে। তার পরনে সাদা পাতলা শাড়ি, যার আঁচল বাতাসে হালকা উরছে। বুক থেকে আধো নেমে যাওয়া শাড়ির আঁচল মেয়েটা উদাস চোখে আলগা হাতে ধরে রেখেছে। তার সামনে পিছনে ডানে বায়ে রকমারি ফুল ফুটে আছে। পাহাড়ের গা ঘেঁসে চলে গেছে ঘন সবুজ বনের রেখা। মেয়েটার আর একটা হাতে একটা ফুলের মালা। সেই মালাটা কোলে নিয়ে খুব যত্ন করে ধরে রেখেছে। তার চোখ যেন হাজার হাজার বছর ধরে পথের দিকে চেয়ে আছে মনের মানুষের আশায়। তার ফুলের মালার প্রতিদিনের নতুন দেহ যেন ক্লান্ত করছে চোখকে, কিন্তু মন তার ক্লান্তি হীন। এই অপেক্ষায় তার সাথি বনের ফুল, পাহাড়ের ঝরনা, আর ওই ঘন জঙ্গলে। অখন্ড প্রতীক্ষায়, বাতাস ফুল থেকে নেওয়া মিষ্টি গন্ধে প্রতিদিন সুবাসিত করে চাতকিনীর শরীর। শিশির ধুয়ে দেয় তার কোমল ঠোঁট। রোদ্র ছরিয়ে দেয় তার আলো রূপের আলোয় তা প্রতিফলিত হয়ে তৈরি হয় এক জ্বলন্ত অগ্নি প্রভা। এভাবেই প্রকৃতি শৃঙ্গার করে তার।

পেইন্টিং এ মুগ্ধ দুটি চোখ যখন অনু তুলে ধরলো অরিন্দমের দিকে। অরিন্দমের বুকের ভতরের উত্তেজনাটা বন্ধ হয়ে গেলো, তার বদলে তৈরি হলো আরও আকাংক্ষা।  না অনুর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে এখনো মনে হচ্ছে ওই চোখের গভিরতা আঁকতে পারেনি সে নিজে এখনো। এখনো অনেক জানা বাকি, চেনা বাকি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,,"" কি কেমন লাগলো বললেন না""

অনু---- ভাষা তো তখনি আসে যখন তাতে মনের কথাকে প্রকাশ করা যায়,,, কিন্তু আপনার পেইন্টিং দেখে আমার কাছে পৃথিবীর সকল ভাষাকে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করছি আপনার এই অমূল্য পেইন্টিং এর উপাদান হতে পেরে।

অরি মনে মনে ""তুমি এর থেকেও সুন্দর, সেটা যদি একবার বোঝাতে পারতাম। এ তো আমার গুড লাক যে তোমার ছবি আঁকতে পারছি,,,লাভ ইউ,,,, লাভ ইউ  এ লট,,,,মাই লাইফ,,জানি আমি বলতে পারবো না কোন দিন। কারণ আমাকে দেয়ার মতো ভালোবাসা তোমার অবশিষ্ট নেই,,,,তবু আমি চাই তুমি ভালো থাকো কারণ রাতুলের থেকে বেশি আমিও তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না।,,, ""

হ্যলো,,,অরিন্দম বাবু,,,,কোথায় হারিয়ে গেলেন,,,,,এই যে অরিন্দম,,,, বাবুুবুবুবুবু,,,,।

অরি---- হকচকিয়ে উঠে,,,,হ্যা কি হলো,,,

অনু---- কোথায় হারিয়ে গেলেন,,,

অরি---- না ওই আর কি,,,আপনাকে একটা কথা বলবো,,,,( একটা কার্ড বের করে দিয়ে),,,  এতে আমার এখানকার ও আমেরিকার কন্টাক্ট নম্বর আছে, যদি কোন দিন কোন দরকার হয় শুধু একবার ফোন করলেই এই মানুষটাকে যেকোনো সময়,  যে কোন বিপদে পাশে পাবেন। প্লিস ডোন্ট হেজিটেট,,,,নাউ প্রমিস মি,,,দ্যাট ইউ উইল রিমেম্বার মি।

অনু অরির কথা শুনে অবাক হয়ে যায়।  কি বলতে চাইছে অরিন্দম।  সে কেন আমাকে ওর কার্ডদিবে আর প্রমিজ ই বা করতে হবে কেন? তবে কি,,,,রাতুলদাই ঠিক,,, অরিও আমায় ভালোবাসে??? মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় অনুর।

অরিন্দমের চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে না করতে পারলো না অনু। এতো আকুতি অগ্রাহ্য করার শক্তি মনে হয় ভগবানেরও নেই।

ওকে প্রমিজ,,,যদি কখনো কোন বিপদে পরি তবে আপনার কথা আমি সবার আগে মনে করবো।

খুশি হয় অরিন্দম,,,, এই সময় রাতুল অরির পিছনে এসে দাড়ায়,,,,

রাতুল---- অরি তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।

অরি---- চমকে উঠে,,,,তারাতাড়ি ওখান থেকে চলে যেতে যেতে বলে গেলো,,,,  হ্যা অনেক লেট হয়ে গেলো।

রাতুল---- অরিন্দমহ কি বলছিল রে??

অনু---- হাতে ধরা পেইন্টিংটা রাতুলকে দিয়ে বললো "" এটা দিতে এসেছিল"'

রাতুল পেইন্টিংটা খুলে দেখে  বিস্ময়ে পরিপূর্ণ চোখ নিয়ে৷  দেখতে দেখতে হঠাৎ ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। অনু বুঝতে পারে রাতুল কেন এমন করছে।

রাতুল---- আমার কাছে স্মৃতি ভোলানোর ইরেজার থাকলে অরির মাথার ভেতরটা ইরেজার দিয়ে মুছে দিতাম। ওর মাথায় সারা জীবনের জন্য তোর স্মৃতি আমি মানতে পারছি না।

অনু আস্তে করে রাতুলের হাতের উপর হাত রেখে বলে উঠলো,,,আর কত লড়াই করবে এবার ক্ষান্ত হও। আমি তো মনে শরীরে তোমার হয়েছি, তাহলে বেকার এদের কথা ভেবে কেনো কষ্ট পাচ্ছো। তাছাড়া উনি যদি আমায় পছন্দ করেন তবে উনি এটাও জানেন যে আমরা কতটা ভালোবাসি একে অপরকে।
এবার চলো তো রেডি হয়ে নাও, অফিস যেতে হবে না?

রাতুল---- একটু দাঁড়া তো,, সেই কোন ভোর থেকে ছোটাছুটি করছিস।  এদিকে আয়।
বলেই অনুর হাত ধরে রান্না ঘরের বাইরে নিয়ে এলো। দুজনে বাড়ির বাইরে এসে টিনা আর অরিন্দম কে বাই বলে অনুর ঘরের দিকে গেলো।

অনু----- তুমি এখন তোমার ঘরে যাও রেডি হও।

রাতুল---- তুই আমাকে তাড়াতে চাইছিস কেন?

অনু---- কারণ ঘরে ঢুকেই তুমি দুষ্টমি শুরু করবে।

রাতুল---- না কিচ্ছু করবো না। তোকে একটু সাহায্য করবো।

অনু---- বড় বড় চোখ করে,,, কি সাহায্য?

রাতুল---- অনুকে কোলে তুলে নিয়ে অনুর ঘরের বিছানায় নামিয়ে দেয়। তারপর ওর পা টাকে ম্যসেজ করতে থাকে।

অনু---- চিৎকার করে,,,,এ কি করছো?

রাতুল---- সকাল থেকে ছোটাছুটি করছিস,,, তাই এই পদ্মোর পাপরির মতো পাগুলো ব্যথা করে উঠছে,,, তাই না।

অনু---- একদম না। বলেই অনু ছুটে চলে গেলো।
অনু এক দৌরে ছাদে উঠে গেলো, রাতুলও পিছন পিছন ছাদে উঠে এলো। এসেই রাতুল অনুকে ধরে ফেললো। ছলনার দৌর প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে অনু মুখ ভার করে উল্টো দিকে মুখ করে থাকলো।
রাতুলের চোখ তখন স্থির অনুর ঘারে বিন্দু বিন্দু জমে থাকা ঘামে।
এক ঝটকায় অনুর পিঠকে নিজের সাথে বুকের সাথে লেপ্টে নেয় রারাতুল মুখ ডুবিয়ে দেয় ঘামক্ত গলায়। হাত চলে যায় অনুর নরম কোমল পেটে সেখানেও ঘামের উপস্থিতি অনুভূত হয়। কিন্তু এই কোমল শরীরের ঘাম যেন মাতাল করতে থাকে রাতুলকে। রাতুলের হাত ছুঁয়ে যেতে লাগলো অনুকে। আর ঠোঁট স্পর্শ করতে লাগলো কাঁধ, গলা, চুল আর ঠোঁট কেও। ধীরে ধীরে স্পর্শ আরও গভীর থেকে গভীর হতে লাগলো। দুজনের মন ভেসে যাচ্ছিল চাওয়া পাওয়ার এক তীব্র স্রোতে। যে স্রোত থেকে না তো ওরা বাঁচতে চায় না বাঁচাতে।  এ শুধু ডুবে যাওয়ার খেলা। আবেগে উদ্দাম অনু নিজেকে ঘুরিয়ে নিয়ে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় রাতুলের লোমশ বুকে।  রাতুল অনুকে কোলে তুলে নেয় ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দেয় অনুর গাল, গ্রীবা,আবরন যুক্ত বুকে, ঘামাক্ত গলায়, তারপর গভীর ভাবে ঠোঁট অনুর ঠোঁটের উপার রাজত্ব বিস্তার করে নেয়, জিহ্বা অধিকার করে আর একটি জিহ্বা। এক অস্পষ্ট শীৎকার বেড়িয়ে আসে অনুর মুখ থেকে। উত্তেজনায় পাগল রাতুল তাড়াতাড়ি দোতলায় নেমে নিজের রুমে ডুকে যায়। অনুকে দাঁড় করিয়ে একটানে খুলে নেয় ওর কুর্তিটা। চোখ বন্ধ করে অনু খামচে ধরে রাতুলের শার্ট। যত্নের সাথে খুলে নেয় ওর লেগিন্সটাও। তারপর শুধু অন্তবাস পরিহিতা অনুকে বুকে জরিয়ে ধীরে ধীরে বার্থরুমের দরজা খুলে দাড় করিয়ে দেয় শাওয়ারের নিচে। শাওয়ার অন করে দেয় রাতুল খুলে নেয় বাকি অন্তবাসটুকুও নিজের বস্ত্রকেও যেন যন্ত্রণা মনে হয়,তাই মুক্ত হয় সে যন্ত্রণা থেকে । শাওয়ারের জলে ধুয়ে যায় অনুর ঘামাক্ত শরীর ও রাতুলের কাম জর্জরিত অঙ্গ। অনুর শরীর ছুঁয়ে চুইয়ে পরা জল শুষে নেয় রাতুল প্রাণ ভরে। রাতুলের লোমশ বুকে আটকে থাকা জলও যেন লোভী করে তোলে অনুকে। হঠাৎই রাতুল বন্ধ করে দেয় জলের ধারা। দুজনেই যেন উন্মত্ত হয়ে যায়। অনুর শরীরের প্রতিটি জলকনা লেহন করে নেয় রাতুল। অনুও অনুকরণ করে উদভ্রান্ত করে তোলে রাতুলকে। ওদের মিলন যেন দিন দিন আরও উশৃংখল আরও নতুন আরও পরিতৃপ্ত দায়ক হয়ে ওঠে। বেড়ে ওঠে আরও আরও তৃষ্ণা।

দীর্ঘ জলকেলি শেষে ক্লান্ত দুটো শরীর একে অপরকে জরিয়ে বিছানায় ঢলে পরলো।
হঠাৎ অনুর ফোন বেজে উঠলো। অনু ক্লান্ত শরীরে ফোন রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সুমিষ্ট গলায় কেউ বলে উঠলো "" অনু তুই অফিসে আসিস নি কেন? তোকে কাকাবাবু বলে নি আমি আসবো?""

অনু---- পরশ!!!,,,,, তুই এতো সকালে!!

পরশ---- এতো সকাল মানে,,,কটা বাজে খেয়াল আছে? প্রায় বারোটা বাজতে চললো। তোর আজ কি হয়েছে বলতো,,,!! যাই হোক তুই আর এখানে আসিস না।  আমি তোদের বাসায় যাচ্ছি।

অনু---- ঠিক আছে চলে আয়। বাই,,,দেখা হচ্ছে।

পরশ---- বাই,,,

রাতুল----- কে বলতো এই পরশ।

অনু---- পরশ আমার মামার ছেলে যদিও শুনেছি ও মামার নিজের ছেলে নয় দত্তক নিয়েছে মামা।

রাতুল---- তোর কোনো মামা আছে কই আগেতো শুনিনি।

অনু---- আমিও তো জানতাম না। দাদুই বছর তিনেক আগে একদিন মামা মামি ও পরশকে নিয়ে এ বাড়িতে আসে এবং আমার সাথে পরিচয় করায়। এর আগে ওনারা দিল্লিতে ছিলো। পরশ ফ্যশন ডিজাইনিং নিয়ে পরেছিল,,, পরশই আমাকে এ বিষয় নিয়ে পড়ার সাজেশন দেয়। ও এখন খুব বড় ডিজাইনার সারা দেশের ফ্যশন ডিজাইনিং ইন্ডাস্ট্রিতে ওর খুব নাম। পরশ না হলে আমাদের অনেক ডিল হতোই না। ওর সাজেশন মতো কাজ করে এ বছর আমরা পাঁচটা অর্ডার পাই। যার বাজার মূল্য প্রায় তিরিশ কোটি টাকা। কাল একটা ডিল হওয়ার কথা তাই আজ পরশের সাথে আমার ডিজাইন গুলো নিয়ে বসা খুব ইম্পটেন্ট।

রাতুল---- পরশ কি আমাদের বাড়িতে থাকবে?

অনু---- হ্যা ও যতবার আসে এখানেই থাকে। দারাও কৃষ্ণাকে বলি পরশের ঘরটা পরিস্কার করতে।

রাতুল----কোন ঘর?

অনু---- ওর কথা আর বলো না,,,, ও আমার রুমের পাশের রুমটাতে থাকে। ওই ছোট্ট ঘরটাই নাকি ওর ভালো লাগে।

রাতুল---- হুম বুঝেছি,,,,, এখন তুই চুপ করে আমার বুকে শুয়ে থাক তো।

অনু---- দাড়াও কৃষ্ণাকে ফোনটা তো করি।
অনু কৃষ্ণার নাম্বার ডায়েল করে,,, কৃষ্ণা কল রিসিভ করে,,,হ্যলো কৃষ্ণা তুই পরশের ঘরটা পরিস্কার করে রাখ তো।  ও আজ আসছে।

কৃষ্ণা----- কখন!! কৃষ্ণার স্বরে বিস্ময়।

অনু---- এখুনি আসবে।

কৃষ্ণা----ঠিক আছে দিদি।

রাতুল---- বাড়িতে এতো মানুষ থাকতে তুই ওইটুকু মেয়েকে বললি কেন?

অনু ----ওই টুকু মেয়ে!! তুমি যদি সব জানতে তাহলে,,,বুঝতে ও কতটা বড়। তাছাড়া ও এবার সতেরো পেরিয়ে আঠারোয় পড়লো।

রাতুল---- কি বলছিস!" আমি তো ভেবেছি পনেরো কি ষোল।

অনু---- কি!! এই বুঝি তুমি ডাক্তার? কৃষ্ণা এবার এইচ এস পরিক্ষা দিয়েছে।

রাতুল---- ওরে বাবা এতোদুর। তা মালিদাদু পড়াচ্ছে না তার ফুলমা মেয়েটিকে পড়াচ্ছে। মালীদাদুতো কবেই কৃষ্ণার বিয়ে দিয়ে দিতো।

অনু -----সে সব কথা পরে হবে আগে আমায় ছারো। পরশ এক্ষুনি চলে আসবে। এসেই চিল চিৎকার শুরু করবে।

রাতুল---- কেন? সে আমার বৌকে ডাকবে কেন? আমি তাকে থাকার ঘর দিতে পারি, খাবার দিতে পারি,চাইলে টাকা পয়সাও দিতে পারি কিন্তু আমার বউকে এক মুহুর্তের জন্যেও ছারতে পারি না।

অনু---- একটা কথা বলবে??

রাতুল---- হাজারটা বল।

অনু---- তুমি আমাকে নিয়ে সবসময় এতো ভয়ে থাকো কেনো? কেন আমার মনে হয় তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না তাই আমার চারপাশের মানুষ গুলোকে তুমি তাড়িয়ে দাও।

রাতুল---- কই এই পাঁচটা বছর তো তুই নিজের মতো ছিলিস। না আমি ছিলাম না আমার শাসন। কিন্তু আমি তোকে সত্যই কারও সাথে সহ্য করতে পারি না। সে যে কেউই হোক না কেনো। তোকে অবিশ্বাস করি না, ভালোবাসি তাই  একটু পজেসিব,,,,জানি আমি সব কিন্তু এ নিয়ে প্লিজ আর কিছু বলিস না।

অনু---- একটু পজেসিব!!!!


রাতুল---- না অনেক খানি হয়েছে,,,( বলেই মুখ আবার ডুবিয়ে দিলো অনুর উন্মুক্ত শরীরে, যা এতোক্ষণ একই চাদরে ঢাকা ছিলো রাতুলের সাথে।

অনু---- আবেশে চোখ বন্ধ করে,,,,বাড়ির কাজের লোকেরাও আমাদের দেখে বেহায়া বলবে। দিন নেই রাত নেই শুধু দরজা বন্ধ করে দুজনে শরীরি খেলায় মেতে আছি।

রাতুল---- বলুক তাতে তোর কি? তুই শুধু আমায় আদর করবি আর আর নিবি। পাঁচ বছরের জমানো আদর শেষ হতে তো একটু সময় লাগবেই বল?

অনু---- ঠিক আছে আজ সারারাত মিস্টার রাতুল পাগলের নামে,,, হয়েছে?

রাতুল----- না হয়নি আমার সারা দিনও চাই তোকে।

অনু---- আমার বাকি কাজ,,,,,

রাতুল---- কোনো কাজ নেই।

অনু---- ইস,,,,ডাকাত একটা,,,
এবার আমি যাই।
বলেই অনু জোর করে নেমে কাপর পরে নিচে গেলো। আর রাতুল মৃদু হেসে তলিয়ে গেলো স্বপ্নের রাজ্যে যেখানে অনু চাইলেও অন্য কোথাও যেতে পারে না।

*************

কৃষ্ণা খুব সুন্দর করে পরিস্কার করে অনুর ঘরের পাশের ছোট্ট ঘরটা সাজিয়ে দিলো। বাগান থেকে এনে দিলো টাটকা কিছু লাল গোলাপ। পরশ গোলাপ খুব পছন্দ। অনু ঘরে ঢুকে সব একবার চেক করে নিল। দেখে খুশিও হলো যে মেয়েটা খুব যত্নের সাথে ঘর গুছিয়েছে।

কৃষ্ণা---- ও দিদি কি সব ঠিক আছে।

অনু---- হ্যা রে সব ঠিক আছে। তুই কিন্তু খুব সুন্দর কাজ করতে পারিস।

কৃষ্ণা---- ধুর দিদি কি যে বলো। তা কখন আসছে তোমার ভাই?

অনু---- কেন? তোকে বলবো কেনো? ( বলেই হেসে উঠলো অনু)

কৃষ্ণা---- আমার বয়েই গেছে,,,( বলেই দৌড় দিলো কৃষ্ণা)

অনু---- এই,,, থাম থাম,,, বলছি,,,এর পর কিন্তু দেখা করতেও দেব না,,, বলে দিলাম।

কৃষ্ণা----- ( দুর থেকে চেঁচিয়ে)  আমি চাই না।

অনু---- আচ্ছা দেখা যাবে।
মহিকাকা ও মহিকাকা,,,,

মহিধর ------ মা ডাকছো?

অনু---- তোমার গোপাল ঠাকুর এখুনি আসছে সে খবর রাখো।

মহিধর ----- হ্যা,,,, সে তো দেশে ফিরেই আমায় ফোন করে যত সব মাছের আবদার করে বসে আছে। সেটা আনতেই তো এতোখানি বেলা হলো।

অনু মহিধরের কথা শুনে রেগে গেলো "" কাকা তুমিও না ও মাছ খেতে চাইলো আর তুমি নিয়ে এলে ওই এতো পদের মাছ বাছতে আমি পারবো না বলে দিলাম।

এই সময়েই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো বছর চব্বিশের এক অতি সুদর্শন যুবক। লম্বায় প্রায় ছ ফিট, পিটানো শরীরের খাজ গুলো ফুটে উঠেছে টাইট শার্টের উপর দিয়ে। মুখ ক্লিন সেভ। আর মাঝারি আকারের দুটো নির্মল চোখে কপট অভিমান টেনে ছেলেটি বলে উঠলো,,,"" বুঝলে মহিকাকা আমাকে কেউ ভালোবাসে না। শুধু মাছ বেছে খেতে পারি না বলে কত কথা শুনতে হচ্ছে তুমি ভাবো। আজ থেকে আমি মাছই খাব না। হবে তো মহারানি,,,,

অনু---- তবে রে একে তো মাছ বাছতে বাছতে আমার হাত ব্যথা করে দেবে এ কয়দিনে,, তার উপর নাটক হচ্ছে,,,দাড়া আজ তোর হচ্ছে। ( বলেই পরশের পিছনে ছুটতে লাগলো,,,পরশ ও ড্রইং রুমের সোফার চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে কখন কুশন অনুর দিকে ছুরে মারতে লাগলো তো কখনো,,,অনুর মাথায় ছোট্ট করে চাটি মেরে দৌর দিতে লাগলো। এ যেন সদ্য কৈশোর প্রাপ্ত দুই ভাই বোনের খুনসুটি। অবশেষে অনু রনে ভঙ্গ দিয়ে মুখ গোমড়া করে সোফায় বসে পরলো। পরশ সুট বুট পরে অনুর পায়ের কাছে বসে হাত দুটো ধরে বললো,,,,"" তোকে না রাগালে আমার এতো বড় জার্নির ক্লান্তিটাই দুর হতো না। তুই আমার মন ক্লান্তি নাশের টনিক বুঝলি"

অনু মুখ ভেংচিয়ে পরশের চুল গুলো ঘেটে দিয়ে,,,বললো আর যাই বলিস,,, এবার তোকে নিজেই মাছ বেছে খেতে হবে। তাও আবার ইলিশ মাছ,,, আমি দিচ্ছি না।

পরশ----- না এই শোন না ,,, আজ ইলিশ মাছটা শুধু বেছে দিবি।  ( বলেই অনুর হাতটা জোর করে ধরে মুখটা ওর কোলে রাখলো) ও মহিকাকা তুমিই বলো না। তুমিতো জান অনু মাছ বেছে না দিলে আমি খেতে পারি না।

অনু---- না না না,,,কিছুতেই না, মহিকাকা তুমি আজ আমায় কিছুই বলবে না । ছাড় আমায় তুই।

পরশ----- ছারবো না আগে বল দিবি?

ওদের এই ভাই বোনের খুনসুটি সবার মুখে হাসি নিয়ে এলেও দোতলার বারান্দায় দাঁড়ানো রাতুলের মুখে কালো মেঘের জন্ম দিলো। দুহাতের মুঠি শক্ত করে মনে মনে বলে উঠলো,,,"" অনু অন্য একটি ছেলের সাথে কিভাবে এতো ক্লোজ হতে পারে! তাও আবার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয় এই ছেলেটি!!"
ঘড়ির কাঁটাটা ঢংঢং করে রাত বারটা জানান দিলো। প্রায় সারে দশটার সময় ডিনারের পরে অনু ও পরশ স্টাডি রুমে ডিজাইন নিয়ে কাজ করে চলেছে। রাতুল একটু সময়ের অনুকে জন্য পাশে পেয়েছিলো যখন রথিন বাবু আর মৃনালিনী দেবীর সাথে কথা বলেছিলো। ভালোয় ভালোয় হোটেলে পৌঁছে গেছে ওরা। রাতুলের থেকে অনুর সাথে কথা বলেছিল বেশি। আর তার পরই সেই যে বসেছে আর ওঠার নামও নেই।
"" অনু কি তবে ভুলে গেলো আজ আমাদের সারা রাত এক সাথে থাকার কথা!!"" অভিমানে বুকটা চিনচিন করে উঠলো যেন রাতুলের। অনু বরাবরই কাজ পাগল। ক্লাসে প্রতিবার তার ফার্স্ট হওয়া চাই আর রাতুল কেও ফাস্ট দেখতে চাই, ওর প্রেজেন্টেশন সবচেয়ে ভালো হওয়া চাই ;সেই নেশাটা ঠিক তেমনি আছে,  ওর সব কাজ ওর মতোই পারফেক্ট।

আরও একঘন্টা এপাস ওপাস করার পরও যখন রাতুল অনুর দেখা পেলো না তখন বাধ্য হয়ে ও স্টাডি রুমের দিকে হাটা দিলো।

পরশ ছেলেটা খারাপ নয়। বুদ্ধি দীপ্ত চেহারা, সরল কথোপকথন, সুন্দর ব্যবহার আর সবচেয়ে যেটা ভালোলাগে ওর তা হলো তা হলো কর্মে নিপুনতা। অনুর মুখে ওর কথা শুনে ও বাড়িতে অনুর সাথে পরশের ব্যবহার দেখে রাতুল নিজেই ইন্টারনেটে পরশের ব্যপারে খোঁজ খবর নিয়েছে। অনুটা পারফেকশনিস্ট হলেও বড্ড ছেলে মানুষ এখনও, তাই পরশের ব্যপারে একটু খোঁজ না নিলেই মনটা কেমন যেন খচখচ করছিলো। এজন্যই পরশের বায়োডাটাও জানা গেছে। ফেসবুকে তো ওর ফিওনসের  খবর আছে। একজন খুব বড় মডেল,,,নাম রমা। সব মিলিয়ে রাতুল একটু বেশিই নিশ্চিন্ত অনুকে নিয়ে।

রাতুল যখন স্টাডি রুমের বাইরে দাড়িয়ে রুমের ভিতর বেশ ভারী ফিসফিস আওয়াজ ওর মনে কৌতুহলের জন্ম দিলো।
""ওরা কি এমন কথা বলছে এতো নিচু স্বরে?" ভাবলো রাতুল,,

স্টাডি রুমে,,,,,

অনু---- না না পরশ এটা ঠিক নয়। তুই যা বলছিস এটা অন্যায়।

পরশ---- কিসের অন্যায়? আমি ভালোবেসেছি কোন পাপ তো করিনি।

অনু---- তোর ভালোবাসার যদি এতোই জোর তবে, এতোদিন তোর বাবা মাকে বলিস নি কেন? কেন নিজের মনের কথা মনেই রেখে দিয়েছিস?

পরশ---- আমি না বললেও তুই কি কিছুই বুঝিস নি?  আর কেউ না বুঝুক তুই তো এসবের প্রথম থেকে জানিস,,,কি অস্বীকার করতে পারবি? আজ যদি তুই এভাবে আমার হাতটা ছেড়ে দিস আমি তো পাগল হয়ে যাব অনু!! তুই প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা কর।

অনু---- আমি কি বুঝবো পরশ? ক দিন বাদেই আমার বিয়ে।  আর তার মধ্যে তুই এগুলো শুরু করলি। আজ এতোদিন পর তুই যদি আমাকে এই পরিস্থিতিতে ফেলবি আমি বুঝতেই পারি নি।

পরশ---- (অনুর হাত ধরে) আমি পালিয়ে যাব। দেখিস,,আমি পারবো না ও বিয়ে করতে।
ভালোবাসার মানুষ ছাড়া জীবন মৃত্যুর সমান। আমি আমার ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে বাঁচতে চাই।

অনু---- আমিও তো তাই চাই, কিন্তু এ ভালোবাসা যে তোকে অনেক লড়াই করে জিততে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে বিপুল। তোর সামনে আইনও দেওয়াল হয়ে দাঁড়াবে।

পরশ------ জানি জানি শুধু তুই আমার হাতটা ধরে থাকিস তাহলেই হবে। তুই তো আমার শক্তি বল?আর কেউ কি ভাবলো, সমাজ কি ভাবলো, আমি কিছুই বুঝতে চাই না। শুধু তুই পাশে থাকিস তাহলেই হবে । কথা দে থাকবি পাশে,,

অনু হালকা হেঁসে পরশের চুল গুলো ঘেটে দেয়। পরশ ও আলতো করে জড়িয়ে ধরে।

এতোক্ষন এই মঞ্চ নাটকের একমাত্র দর্শক তার হাতের মুঠি চেপে। রাগে দু চেখ লাল করে ফেলেছে। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা বোঝার শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। এ কি সত্যি অনু, আমার অনু!! কিন্তু এ কি করে সম্ভব।  নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতে পারতো না রাতুল। এখন অবিশ্বাস করেই বা কিভাবে?

বিধ্বস্ত রাতুল যখন স্টাডি রুমের দরজার কাছ থেকে বেড়িয়ে এলো তখন তার হাটার শক্তিটুকুও নেই। যেন এক মুহুর্তে মনের গভীর কোনে লুকোনো কোনও বিষের উৎগিরন হচ্ছে আর তাতেই সমস্ত বিশ্বাস,  ভালোবাসাকে পুড়িয়ে নিঃশ্বেস করে দিচ্ছে। কোন সবুজ শ্যমল বনে হঠাৎ করেই আগুন দাবানলে রুপান্তর হলো, পুড়িয়ে ছারখার করতে লাগলো সবকিছু।
ভালোবাসা কোন শিল্পির হাতে তৈরি চিত্র নয় যে যুগে যুগে অপরিবর্তিত রবে।
ভালোবাসা নদী,  ক্ষিপ্র তেজোদ্দীপ্ত নদী, যার কল্পিত অবয়ব প্রতি নিয়তো পরিবর্তন হবে।

ভালোবাসা কোন মন গড়ানো গল্প নয়, যার শেষটা তুমি নিজেই লিখবে।
ভালোবাসা বর্ষা ঋতুর মতো ইচ্ছে হলে  ভিজিয়ে দিবে, নয়তো তীব্র রোদে শুষে নিবে।

ভালোবাসা একগুচ্ছ ফুল নয়,  যে তোমার ঘরের ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখবে।
ভালোবাসা সেই কস্তুরি, মৃগনাভি যার গন্ধে মাতাল হয়ে ছুটতে ছুটতে নিঃশেষিত হবে।""
        ♥♠♥
**************
অনুরাধা যখন ঘরে পৌঁছালো ঘড়ির কাটা তখন রাত একটার বেড়া পার করে গেছে। রাতুলের রুমে এসেই বার্থরুম গিয়ে ফ্রেস হয়ে একটা স্লিভলেস গোলাপি নাইটি গায়ে গলিয়ে বাইরে এলো। হাতে পায়ে সামান্য প্রসাধনীর প্রলেপ দিয়ে রাতুলের কুইন সাইজের রাজকীয় ডিজাইনের খাটের দিকে তাকালো। রাতুল উপুর হয়ে উল্টো দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। তার পাঁচ ফিট আট ইঞ্চির শরীরটা টানটান করে শুয়ে আছে।

রাতুলকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে একটা হাসি খেলে যায় অনুর মুখে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় খাটের দিকে। রাতুলের শরীরের উপর সমস্ত ভার দিয়ে শুয়ে পরে রাতুলের পিঠের উপর।

অনু---- আমি জানি তুমি ঘুমাও নি। এবার চোখ খোলো আর ঢং করতে হবে না। ইস রাগে একেবারে মুখটা লাল হয়ে আছে,,,,
কিছুক্ষন  অপেক্ষা করেও যখন রাতুল এক বিন্দুও নড়াচড়া করলো না অনুর খুব অভিমান হলো। প্রায় কান্না কান্না গলায় বলে উঠলো,,,"" ঘুমাও নি তবুও উঠবে না তো থাকো তবে আমি চললাম।"
বলেই রাতুলের উপর থেকে উঠে তার ঘরের দিকে রওনা দিলো।

রাতুল নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত করে ফেলেছে। শরীর নুয়ে পরছে, মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। মন আর মস্তিষ্কের মধ্যে যে বিরামহীন যুক্তি প্রদর্শন চলছে তাতে রাতুলের আরও উদ্ভ্রান্ত লাগছে।
মন বলছে অনুর যদি পরশের সাথেই সম্পর্ক হতো তবে রাতুলকে ওর সর্বস্ব দিয়ে ভরিয়ে দিতো না। আর রাতুল কি তার ভালোবাসার উপর এটুকু বিশ্বাস করতে পারে না। ও কি এটা বুঝবে না এই কথপোকথনের খন্ড অংশ এ পর্যন্ত কত মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে। অনুর চোখে কি তার ভালোবাসার প্রকাশ দেখতে পায় না রাতুল?

একটা ব্যঙ্গের হাসি দিলো যেন মস্তিষ্ক। কোন যুগে বাস করছো হে তুমি যে এতো সতী পনার কথা ভাবছো। এই অনু যে সেই অনু নেই তার কত প্রমান চাও। আর অনুও রাতুলের সাথে উপভোগ করছে। বুঝতে পারনি সেদিন কিন্তু ও নিজেই এসে রাতুলের সাথে দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়েছে, তুমি কি ভাবছো রাতুলের জন্য?? না তার নিজের জন্য, শরীরের খিদে মেটানোর জন্য। রাতুলের এতো দিনের অনুপস্থিতি, অনু কেন যে কোন মেয়ে কেই অন্যকারও প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে এতে আমি অন্যায় দেখি না। বরং অনু এতোদিন রাতুলের নামজপ করবে এটারই কোন লজিক নেই। রাতুলের এতো ভেঙে না পরে সত্যটাকে মেনে নেয়া উচিত। ভালোবাসা, ভালোবাসা করে মরিচীকার পেছনে ছোটার কোন মানে নেই।

কি অদ্ভুত তোর যুক্তি,,,, বর্তমান সমাজ তোকে প্রাধান্য দেয় বলেই মানবিক, মানসিক সম্পর্ক গুলো ধ্বংসের পথে। তুই এটুকু বুঝলি না প্রথম মিলনের সময় অনুর শরীরের অবস্থা, এটুকু তো তুইও মানবি কারন আমিও একজন ডাক্তার,যে এর আগে অনুর কারও সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন হয় নি। আর তার শরীরে খিদে খুঁজছিস তুই!

রাতুল দুই হাত তার মাথায় চেপে ধরে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো ""আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাই না। তোমরা চুপ কর,,,আমায় একা থাকতে দাও।""
বলেই মাথা বালিশে দিয়ে উবুর হয়ে শক্তকরে চোখদুটোকে বন্ধ করে রেখেছে।
এই সময়ই অনু ঘরে এলো,,, অনুর শরীরের গন্ধ,পায়ের শব্দ  অনুভব করতে পারছিলো রাতুল কিন্তু অন্যদিনের মতো অনুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে না, কথা বলতে ভালো লাগছে না।  এ যেন অন্যকারও অনু অস্পৃশ্যা।
বার্থরুম থেকে বেড়িয়ে অনু যখন রাতুলের পিঠের উপর নিজের নরম, চুম্বকীয় শক্তি সম্পন্ন, সদ্য স্নানের পর লোশনের গন্ধে মাদকতাময় শরীরটা ছেড়ে দেয়। তখন রাতুলের বালির বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। মন মস্তিষ্কের সকল বাঁধা উপেক্ষা করে নিজের শক্তিতে রাতুলের ভালোবাসার অনুভূতি গুলোকে জাগাতে শুরু করেছে, কিন্তু এই সময়টুকুতেই অনুর অভিমানী মন রাতুলকে ডেকেও সাড়া না পেয়ে উঠে চলে যেতে লাগলো।

রাতুল এক ছুটে জড়িয়ে ধরলো অনুকে। মনে মনে বলতে লাগলো ""  আর কতটা ভালোবাসলে অনু আমাকে ছেড়ে যাবে না? আর কতটা আগলে রাখলে কারও ছায়া অনুর উপর পরবে না? ""
রাতুলের সমস্ত রাগ জল হয়ে ভিজিয়ে দিতে লাগলো অনুকে।  অনু কি করে পারে তার এই পাগলটির আদর অগ্রহ্য করতে?
সন্দেহ, ঘৃনা, কষ্টের আচ্ছাদন সরিয়ে মুক্ত হলো ভালোবাসার শক্তি।

***********
সকাল সাতটা অনুরাধা রাতুলের উন্মুক্ত বুকে নিজের মাথা রেখে দক্ষিনের জানালা দিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রুপ প্রত্যক্ষ করছে। পাখির কলতানে চারদিকে মিষ্টি শব্দ ভেসে আসছে, ফুলের গন্ধে পবিত্র, মন ভালো করা বাতাস ভেসে আসছে। নব বধুর লজ্জারাঙা মুখের মতো সকালের সূর্য লাল আলোর বিচ্ছুরন শুরু করেছে। আজ সকালে উঠবে না অনু কাল অমেক রাত পর্যন্ত কাজ করেছে সে কথা মহিকাকাকে বলে দিয়েছে। মহিকাকা ঠিক সামলে নেবে সবকিছু।

ফাল্গুনের হালকা কুয়াশায় মোড়া সকালটা দেখতেই জানালা খুলেছে সে। সকাল সকাল এই ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস রাতুলকে অনুর শরীরের ওম খুঁজতে বাধ্য করছে। তাই নিজের বুক থেকে অনুর মাথাটা যত্নের সাথে ধরে ব্লাংকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললে উঠলো "" বাইরে ঠান্ডা মুখটা ভিতরে রাখ,,,,অসুখ করবে""

হেসে উঠলো অনু,,, রাতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো এতো ভালোবাসো কেন তুমি,,??

রাতুল---- হু,,, চুপ কর এখন পরে বলবো। ঘুমতে দে,,,।

অনু----- তুমি আমায় একটা সত্য কথা বলবে?

রাতুল---- আবার ( বিরক্ত হয়ে) মিথ্যা তোকে আমি বলি??

অনু---- তুমি কাল রাতে স্টাডি রুমের বাইরে ছিলে,,,দাড়িয়ে তাহলে ভিতরে এলে না কেন?

অনুর কথায় এক ঝটকায় রাতুলের ঘুম ভেঙে গেলো। অনুর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি যেন অপরাধী বলে মনে হলো।

রাতুল---- তুই বুঝেতে পেরেছিলি!!

অনু---- তোমার উপস্থিতি বুঝতে বুঝি তোমাকে আমার সামনে থাকতে হয়? ( নখ দিয়ে বুকটা দেখিয়ে) এর শব্দ আমায় তোমার উপস্থিতি জানিয়ে দেয়।

রাতুল---- ( অনুকে শক্ত করে জড়িয়ে)আমায় ক্ষমা করে দে,,, আমি একটু সময়ের জন্য হলেও তোকে ভুল বুঝেছি।

অনু---- তাই!! তাহলে সঠিকটা কি?

রাতুল---- জানি না,,,আর জানতেও চাই না,,,শুধু জানি তুই শুধু আমার।  শুধুই আমার। ( অনুর মুখে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো রাতুল)।

অনু---- (হাত দিয়ে রাতুলের মুখটা স্থির করে)  তাই!!  তাহলে আমার এংরি ক্রেজি লাভার চেঞ্জ হয়ে শান্ত হয়ে গিয়েছে? সে তো এমন ছিলো না। কাল তো তার পরশকে পিটিয়ে ছাতু বানানোর কথা অন্তত একটা চড়। তাহলে কি তুমি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না?

রাতুল---- তার মানে!!! তুই জেনে শুনে এসব করেছিস!! কালকের সব কিছুই সাজানো?

অনু---- না সাজানো নয়। আসলে পরশের বিয়ে ঠিক হয় রমা নামের এক মডেলের সাথে, সে আবার পরশের থেকে বছর দুয়েকের বড়। পরশ আবার এবাড়িতে আসতে আসতে আমাদের কৃষ্ণাকে ভালেবাসে।

রাতুল---- হোয়াট কৃষ্ণা!! ওইটুকু মেয়েকে?

অনু---- ও,,,,তুমি ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েকে ভালোবেসে কিস করতে পারও আর পরশ আঠারো বছরে পড়া কোন মেয়েকে ভালোবাসতে পারে না?

রাতুল----( হেসে অনুর মুখটা দেখে বললো) ইস কেন গেলো সে দিন গুলো? আমি আজও সে দিন গুলোতে ফিরে যেতে চাই। (একটুপরে) তারপর?  তারপর বল।

অনু---- তাই এখন পরশ আমাদের সাহায্য চায়।
ল ধরে,,,,"" এভাবে"" বলেই  কৃষ্ণার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে কৃষ্ণাও পরশের ছোঁয়ায় সারা দিতে থাকে। পরশের হাত কৃষ্ণার কোমর অধিকার করে নেয়। কেঁপে ওঠে কৃষ্ণা। এই প্রথম পরশ কৃষ্ণার শরীরে এতোখানি অধিকার নিচ্ছে। আবেগে কৃষ্ণার ঠোঁট আগ্রাসী হয়ে উঠছে। পরশের হাত আজ যেন বাঁধন হারা। কৃষ্ণার শরীরের নাজুক অংশে তার কখন সদর্পে কখন আলতো বিচরণ। দুটি শরীরের মস্তিষ্ক তাদের সীমা অতিক্রম না করার জন্য সচেতন করলেও, মন যেন আজ কোন বাঁধা মানতে রাজি নয়।   পরশের ঠোঁট যখন নেমে এলো কৃষ্ণার বিভাজিকায় শিউরে উঠলো কৃষ্ণা। দুহাতে মুঠো করে ধরলো পরশের চুল। কৃষ্ণার মুখে উঠে আসা অস্পষ্ট শীৎকারে যেন বাস্তবে ফিরলো পরশ। তাড়াতাড়ি কৃষ্ণাকে ছেড়ে দিয়ে বুকে জরিয়ে নিলো। ততক্ষনে প্রায় উন্মত্ত কৃষ্ণা পরশের বুকে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে, সেই আদিম খেলায় প্রবৃত্ত হওয়ার আভাস দিলেও,,,অনেক কষ্ট করে পরশ নিজেকে সামলে নেয়। দুহাতে কৃষ্ণার মুখটা তুলে চোখে চোখ রেখে বলে,,,,"" আর বেশি এগুনো ঠিক হবে না,,,বাবু,,,,বাকিটা ফুলসজ্জার জন্য তোলা থাক।""

নিজের ভুল বুঝতে পেরে যেন লজ্জায় পরে যায় কৃষ্ণা। তা বুঝতে পেরে পরশ বলে "" ইস লজ্জায় তো লাল হয়ে যাচ্ছো দেখি। আমার কাছে তোমার কোন লজ্জা নেই।  বুঝেছো,, এবার শুধু তাড়াতাড়ি আমার এই ছোট্ট, সুন্দর পাগলিটাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন সার্থক। "" "

কৃষ্ণা---- তুমি বাড়িতে বলেছো?

পরশ---- না সে দায়িত্ব অনুকে দিয়েছি।

কৃষ্ণা---- ফুলদির কথা যদি মা, বাবা না মানে। আর তোমাকে ওই রমার সাথে বিয়েতে বাধ্য করে।

পরশ---- এতো কিছু এক বারে ভেবো না। অনুকে মা বাবা দুজনেই ভালোবাসে। আর তাছাড়া মানলে ভালো নয়তে,,,আমি, আমার ভালোবাসাকে কি ভাবে কাছে রাখা যায় তা জানি।

কৃষ্ণা---- না আমার একটা পরিবার চাই,,,একটা পারফেক্ট ফ্যমেলি।

পরশ---- হবে হবে ডিয়ার সব হবে,,,শুধু একটু সময় দাও।
পরশের কথার স্টাইলে দুজনেই হেসে উঠলো।

**************

অনু আজ খুব খুশি আজ রথিন বাবু ও মৃনালিনী দেবী বাড়ি ফিরছে আর তার কাকু কাকিমাও পরশ ও কৃষ্ণার বিষয়টা মেনে নিয়েছে।
পরশ তো আনন্দে আত্নহারা হয়ে অনুর সামনেই চকাস চকাস করে কৃষ্ণার গালে চুমু খেয়ে নিলো। আর অনু বেচারি পরশের এ কান্ড লজ্জা পেয়ে এক দৌড়ে রাতুলের ঘরে। রাতুল অনুর হাসফাস দেখে জিজ্ঞাসা করলো"" কিরে এমন হাঁপাচ্ছিস কেনো?""

অনু---- শোনো না জ্যেঠা মশায় আর জ্যেঠিমা আজ সন্ধ্যায় ফিরছে।

রাতুল---- ও তাতেই এতো আনন্দ?

অনু---- আরো শোনো না,,,কাকু পরশ আর কৃষ্ণার সম্পর্ক টা মেনে নিয়েছে।

রাতুল---- বাঃ এ তো আরও ভালো খবর। এ জন্যই বুঝি অনুর ফুলদির এতো লাফালাফি?

অনু---- আরও শোনো না,,পরশ সে কথা শুনে আমার সামনেই কৃষ্ণার গালে,,,,,ইস,,,,পরশ টা না,,,যা তা।

রাতুল----  পরশ তোর সামনে কি??

অনু---- আরও লজ্জা পেয়ে,,, আরে ঐ যে কিসসসস,,,,( রাতুলের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর মুখে একটা ফাজলামোর হাসি।  তা দেখে অনু রেগে গিয়ে বলে,,, কিছু না যাও,,,,)

রাতুল----( অনুর কোমর টা দু হাতে ধরে)  তা কোথায় কিস করেছে,,,,
(অনুর বা গালে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে,,,এ গালে?
ডান গালে ছুঁইয়ে,,, এ গালে?
কপালে একটু গভীর করে ছুঁইয়ে,,, এখানে?
ঠোঁটে আলতো করে ওর ঠোঁট ঠেকিয়ে,,,এখানে?
একটা বাঁকা হাসি মুখে খেলিয়ে,,,,আরে বলবি তো ঠিক কোথায় কিসটা দিয়েছে।

অনু এতোক্ষণ চোখ বন্ধ করে স্টাচুর মতো দাড়িয়ে ছিলো, রাতুলের ছোঁয়া গুলো সব সময় ওর কাছে প্রিয় আর উপভোগ্য।  কিন্তু চোখ খুলে যখন দেখলো রাতুল একটু দুরে দাড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে মিটমিট করে হাসছে ওর ভীষণ রাগ হয়।  রাতুলের দিকে তেড়ে আসে,,, বলে,,,"" আমায় বোকা বানিয়ে খুব মজা না,,,দাড়াও দেখাচ্ছি তোমায়।"

আবার শুরু দুজনের ছোটাছুটি,,,,

****************

রথিন বাবু ও মৃনালিনী দেবী এসেই বিয়ের সব দায়িত্ব বর বৌয়ের হাত থেকে নিয়ে নিজেরাই সামলাচ্ছেল। এদিকে অনু কয়েকদিন যাবত রাতুলের সাথে একটু দুরত্ব বজায় রেখেছে। কারন মাধবি বলেছে,,, ""ছেলেদের সব কথা সবসময় মেনে না নিতে, তাহলে ওরা নাকি মেয়েদের কোন দামই দেয় না"" তাই কয়েকদিন যাবত চোখে চোখে কথা হলেও শরীরে শরীরে ভাব বিনিময় হয় না। আর পরশ অনুর পাশের ঘরে আছে বলে রাতুলও রাতে চুপিচুপি অনুর ঘরে হানা দিতে যায় না।

এরই মধ্যে একদিন অনুর দাদু এসে বিয়ের বাকি পাঁচটা দিন অনুকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে আসে। কিন্তু কথাটা রথিন বাবুর সামনে উত্থাপনের আগে রাতুলকে বলেন তিনি। এতেই রাতুল দাদুকে ভালোভাবে বলে, "" ও দাদু আর বলার আছে বলো তোমার নাতনিকে এক দিনের জন্যও চোখের আড়াল করবো না। কোথাও যাবে না ও,,,,শেষে বিয়ের আগে আমাকে মারতে চাও না কি?""

শুধু হেসেছিলেন নব্বই পেরোনো বৃদ্ধ আর তার অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে দেখে নিয়েছিলেন নাতনির প্রতি রাতুলের অগাধ ভালোবাসা। তাদের সুখি ভবিষ্যৎ।

*************

অবশেষে বিয়ের দিন এসেই গেলো। রাতুলের গায়ে ছোঁয়ানো হলুদে রঙিন হলো অনুরাধা। একই বাড়িতে ছেলে মেয়ে দুজনের নিয়ম পালন করা হচ্ছে। হলো সাত জন এঁয়ো নিয়ে স্নান।
বিকেলে পার্লারের মেয়েরা অনুকে  ভিন্ন রুপে সাজিয়ে দিলেন। এ অনু যেন রংধনুর মতো চোখ ধাঁধানো রুপে সবাইকে মাতাল করতে পারে। অনুর শরীরে লাল বেনারসি তার মধ্যে গোন্ড এর জড়ির কাজ আর গা ভর্তি ভারী ভারী সোনার গয়না।
রাতুলের পরনে সাদা পাঞ্জাবি তার উপর গোল্ডেন জড়ির কাজ করা। আর সাদা ধুতি। দুজনকেই এতো সুন্দর লাগছে যে যেই দেখছে সেই যেন চোখ সরাতে ভুলে যাচ্ছে।
রাতুল অনুকে দেখার জন্য কয়েক বার ভিডিও কল দিলেও অনু রিসিভ করে নি শুধু টেক্সট করেছে,,,""একে বারে দেখা হবে ছাদনা তলায়,,,""
তাই রাতুল অধীর আগ্রহে সেই সময়ের জন্য অপেক্ষামান।

পুরোহিত মশায় যখন কনে কে নিয়ে আসার কথা বলছিলেন রাতুলের হার্ট যেন একটু জোরেই পাম্প করছিলো। ও যখন দাড়ালো আর অনুকে ঘুড়িয়ে ওর সামনে নিয়ে আসা হলো তখন ও ওর বুকের ধকধক শব্দটা এতো জোরে হচ্ছিল যেন পাশে থাকা মানুষ গুলো সবাই শুনতে পাচ্ছিল।
শুভ দৃষ্টিতে দুজনে দুজনের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো যেন কোন তৃষ্ণার্ত তার চোখের সামনে বিশাল সমুদ্র দেখতে পাচ্ছে। চোখ যেন আটকে গেছে একে অন্যতে। ধ্যান ভাঙলো ওদের পরশের কথায়। এভাবেই বিয়েটা হয়েই গেলো।

কাল রাত্রিতে রাতুল প্রায় চিৎকার চেঁচামেচি করে নিয়মের বিরুদ্ধে অবস্তান করলো কিন্তু মৃনালিনী দেবী তাকে বুঝিয়ে সামলে নিলেন সেটা কতটা লজ্জায়। মা বলছে বলে কথা।

পরদিন রাতুল তার অনুর ভাত কাপরের দায়িত্ব নিলো। আর অনু নিলো রাতুলের ভালো থাকার দায়িত্ব।
সারাদিন দুজনে মিলে এলাকার লোকজনের আশীর্বাদ নিলো। গ্রামের সকল লোক অনুর বৌভাতে উপস্থিত হলো।

আজ রাতুলের ফুলসজ্জা সারাদিন ওয়েডিং প্লানারের লোকজন লাল গোলাপ, সাদা অর্কিড, সহ অনেক সুগন্ধি ফুলে রাতুলের ঘর সাজিয়ে দিয়েছে। ঘর তো নয় যেন স্বর্গ মনে হচ্ছিল।
অবশেষে রাত এগারোটায় অনুকে সবাই বসিয়ে দিলো রাতুলের ঘরে।  কয়েকদিন যাবত রাতুলকে ইচ্ছে করেই দুরে সরিয়ে রেখেছিলো অনু তাই আজ ও কিরকম ব্যবহার করবে সেটা ভেবেই ওর একটু ভয় হতে লাগলো।
রাতুল সময় ব্যয় না করে দশমিনিট পরই ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। বিছানায় বসা মেরুন কালারের লেহেঙ্গায় অনুকে যেন রাতুল চিনতেই পারছিলো না। ওর মনে।জমানো অভিমান যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে অনুর কাছে এসে ওর হাতটা তুলে একটা আংটি পরিয়ে দিয়ে একটা গভীর চুমু একে দিলো অনুর হাতে। অনুর মুখটা হাতে নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে রাতুল।"" তোকে খুব সুন্দর লাগছে রে,,,, ঠিক যেমনটি আমি তোকে স্বপ্নে দেখি""
খিলখিল করে হেসে ওঠে অনু,,,রাতুল বুকে জরিয়ে নেয় অনুকে,,,,"" এভাবে হাসলে তোকে সারা রাত জেগে থাকতে হবে বলে দিলাম।""

অনু লজ্জায় লাল হয়ে গেলো মুখে বললো,,,"" তোমার পাগলামি আর যাবে না তাই না?""

রাতুল---- কেবল তো শুরু হলো আমার সোনা বৌ,,,

❤❤❤❤সমাপ্ত❤❤❤❤



   



Rate this content
Log in

More bengali story from Debanjoly Chakraborti Chakraborti

Similar bengali story from Romance