The Engineer
The Engineer
মুম্বাইয়ের আন্ধেরির এক অভিজাত এলাকায়, ৬ তলার ওপর এক আলিশান ৩-বিএইচকে ফ্ল্যাটে অভিরূপ আর সুচরিতার সাজানো সংসার। অভিরূপ নামী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, আর সুচরিতা একটি বড় স্কুলের শিক্ষিকা। তাদের ৫ বছরের ফুটফুটে ছেলে, রিয়ান। গ্যারেজে দামি এসইউভি, ব্যাঙ্কে পর্যাপ্ত টাকা—সব মিলিয়ে এক আদর্শ উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার। সুচরিতা বর্তমানে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তাই পরিবারে খুশির আমেজ ছিল দ্বিগুণ।
নভেম্বরের ৩ তারিখ রিয়ানের জন্মদিন। তার আগের দিন, অর্থাৎ ২রা নভেম্বর রাতে অভিরূপ বাড়িতে এক গেট-টুগেদারের আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিল অভিরূপের ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু অলোক এবং তার স্ত্রী অরুণিমা।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে পার্টির মেজাজ জমে ওঠে। কেক কাটার পর সবাই মিলে নাচ-গান, আর সাথে চলে দামি হুইস্কি আর ওয়াইন। রাত যখন প্রায় ১টা, তখন নেশার ঘোরে সবাই ঠিক করে, মেরিন ড্রাইভে গিয়ে মুম্বাইয়ের 'নাইট লাইফ' উপভোগ করবে। অভিরূপ নিজের গাড়ি বের করে। গাড়িতে তারা চারজন আর ছোট্ট রিয়ান।
মেরিন ড্রাইভে পৌঁছে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস আর কুইন্স নেকলেসের মায়াবী আলোয় তারা যেন সব ভুলে গিয়েছিল। অভিরূপ আর সুচরিতা একে অপরের হাত ধরে হাঁটছিল, মাঝে মাঝে চুম্বনও করছিল। তাদের পেছনেই ছিল অলোক আর অরুণিমা। রিয়ান তাদের আশেপাশেই দৌড়াদৌড়ি করছিল। আনন্দের আতিশয্যে তারা এতটাই মগ্ন ছিল যে, কখন তাদের ৫ বছরের ছেলেটি ভিড়, টেট্রাপড আর অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না।
হঠাৎ ঘোর কাটে সুচরিতার। "রিয়ান কোথায়?"—তার এই আর্তনাদে মেরিন ড্রাইভের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যায়। নেশা মুহূর্তেই উবে যায়। সবাই পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু রিয়ান কোথাও নেই।
তদন্ত ও শোকের ছায়া
মেরিন ড্রাইভ থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলো। সিনিয়র ইন্সপেক্টর রাণে তদন্তভার নিলেন। বহু বছর চাকরি শিখিয়েছে—প্রমাণ সবসময় কথা বলে না, মানুষ বলে। পুলিশ চারপাশের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ফুটপাতে শুয়ে থাকা গৃহহীন মানুষ থেকে শুরু করে রাতের পর্যটক—কাউকেই তারা বাদ দিল না। প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হলো, কেউ কোনো বাচ্চাকে একা দেখেছে কি না বা কোনো সন্দেহভাজন কাউকে লক্ষ্য করেছে কি না। কিন্তু আশ্চর্য, কেউই কাউকে কিছু দেখতে পায়নি। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বাচ্চাটি।
অনেকক্ষণ ধরে প্রশ্ন-উত্তরের পর পুলিশ অফিসার তাদের মেরিন ড্রাইভ থানায় গিয়ে অফিসিয়াল মিসিং ডায়েরি করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু ওই চারজনের কেউই সেই জায়গা ছেড়ে একচুলও নড়তে চাইছিল না। সুচরিতা পাগলপারা হয়ে খুঁজছিল, আর বাকিরা আশায় ছিল যদি রিয়ান এখনই ফিরে আসে। তবুও অনেক কষ্টে, অনেক বুঝিয়ে পুলিশ তাদের রাজি করিয়ে থানায় নিয়ে গেল।
সিনিয়র ইন্সপেক্টর দামোদর রাণে। তিনি প্রথমেই চারজনকে আলাদা আলাদা ঘরে বসালেন। তার অভিজ্ঞতা বলছে, অপহরণের প্রথম ৪৮ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১. সুচরিতা ও অরুণিমা: তারা শুধুই কাঁদছিল। তাদের বয়ান থেকে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না।
২. অভিরূপ: তাকে দেখে রাণে অবাক হলেন। একজন বাবা, যার ছেলে এইমাত্র হারিয়ে গেছে, সে এত গুছিয়ে কথা বলছে কী করে? অভিরূপ বলল, "অফিসার, আমার কোনো শত্রু নেই। তবে কনস্ট্রাকশন লাইনে টেন্ডার নিয়ে রেষারেষি থাকে। কিন্তু বাচ্চার ক্ষতি করার মতো কেউ নেই। আমার মনে হয় এটা র্যান্ডম কিডন্যাপিং।" অভিরূপের এই শান্ত ভাব রাণের মনে খটকা লাগাল, আবার একইসাথে প্রশংসাও জাগাল যে বিপদের সময় লোকটা মাথা ঠান্ডা রেখেছে।
৩. অলোক: সমস্যা হলো অলোককে নিয়ে। সে চেয়ারে বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার শরীর কাঁপছিল। ইন্সপেক্টর রাণে তাকে ধমক দিলেন, "মিস্টার অলোক! আপনি বাচ্চার বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড। আপনি কিছু তো বলুন! বাচ্চাটা যখন মিসিং হলো, আপনি কোন দিকে তাকিয়ে ছিলেন?"
অলোক কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু বিড়বিড় করে বলল, "আমার দোষ... সব আমার দোষ..."
পুলিশ ভাবল, বন্ধুর ছেলের দায়িত্ব নিতে না পারার অপরাধবোধে সে ট্র্রমায় চলে গেছে। কিন্তু রাণে তার ডায়েরিতে নোট করলেন—"The friend is hiding something. Shock or guilt?"
পরের তিন দিন পুলিশ মুম্বাই তোলপাড় করে ফেলল।
সিসিটিভি ফুটেজ: মেরিন ড্রাইভের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটি ছিল সিসিটিভির 'ব্লাইন্ড স্পট'। কিন্তু তার আগে ও পরের ফুটেজ চেক করে দেখা গেল, একটি কালো রঙের স্কর্পিও গাড়ি তীব্র গতিতে চার্চগেটের দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির নম্বর প্লেট কাদা দিয়ে ঢাকা। পেশাদার কাজ।
মোবাইল টাওয়ার ডাম্প: ওই সময়ে মেরিন ড্রাইভে অ্যাক্টিভ থাকা হাজার হাজার মোবাইল নম্বরের ডেটা স্ক্যান করা হলো। কিন্তু সন্দেহভাজন কিছুই পাওয়া গেল না। কিডন্যাপাররা সম্ভবত বার্নার ফোন (ফেলে দেওয়া যায় এমন ফোন) ব্যবহার করেছিল বা ফোনই ব্যবহার করেনি।
তৃতীয় দিনে খবর এল, ধারাভি বস্তিতে এক ভিক্ষুক গ্যাং নতুন একটি বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে। পুলিশ বিশাল ফোর্স নিয়ে রেড করল। সুচরিতার বুকে আশা জাগল। কিন্তু সেই বাচ্চাটি রিয়ান ছিল না। এই ব্যর্থতা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
রাণে চিন্তায় পড়ে গেলেন। কোনো মুক্তিপণের ফোন আসছে না কেন? সাধারণত কিডন্যাপিং হয় টাকার জন্য। ফোন না আসার অর্থ দুটো হতে পারে—এক, বাচ্চার ক্ষতি হয়ে গেছে। দুই, এটা ব্যক্তিগত আক্রোশ।
ঘটনার ১০ দিন পর। তদন্তে ভাটা পড়েছে। তখনই ফোন এল। ওরলি সি-ফেসের কাছে পাথরের ফাঁকে জোয়ারের জলে একটি বাচ্চার ফুলে যাওয়া দেহ ভেসে এসেছে।
মর্গে শনাক্তকরণের দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। সুচরিতা জ্ঞান হারাল। অভিরূপ পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর অলোক? সে মর্গেই ঢুকল না। বাইরে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল। পুলিশ ভাবল, বন্ধুর ছেলের পচা গলা লাশ দেখার সাহস তার নেই। অভিরূপ একাই সব সামলাল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হলো, অপহরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ কেসটি 'খুন ও অপহরণ' হিসেবে নথিভুক্ত করল। কিন্তু কোনো ক্লু, কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট, বা কোনো সাক্ষী না থাকায় ফাইলটি 'আনসলভড' হিসেবে জমা পড়ে রইল।
নতুন শুরু
রিয়ানের মৃত্যুর পর অলোক আর অভিরূপের মধ্যে যোগাযোগ কমে গেল। শোকের ছায়ায় তাদের আড্ডা আর আগের মতো জমল না। অলোক নিজেকে গুটিয়ে নিল, সে আর অভিরূপের বাড়িতে আসত না।, যেন রিয়ানের স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়াত। রিয়ানের মৃত্যুর পর বাইরের জগৎ শান্ত হলেও, অভিরূপের ৩-বিএইচকে ফ্ল্যাটের ভেতরটা যেন এক জীবন্ত শ্মশান হয়ে গেল।
সুচরিতা ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে আর কারোর সাথে কথা বলে না, ঠিকমতো খায় না, রাতে ঘুমায় না। ঘন্টার পর ঘন্টা সে ব্যালকনির গ্রিল ধরে বাইরের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। তার চোখের জল যেন শুকায় না। বাইরের কোলাহল, সমুদ্রের গর্জন—কিছুই তাকে স্পর্শ করে না।
মাঝে মাঝে সে পাগলের মতো রিহানের বন্ধ ঘরে ঢুকে পড়ে। রিহানের ধুলো জমা খেলনাগুলো—সেই রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, ব্যাট-বল, স্পাইডারম্যানের পুতুল—সেগুলো বুকে জড়িয়ে ধরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। অভিরূপ দরজার আড়াল থেকে এসব দেখে। সে সুচরিতাকে বোঝাতে যায়, সান্ত্বনা দিতে যায়, কিন্তু সুচরিতার ওই পাথুরে চোখের দিকে তাকিয়ে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। সে চুপ করে সরে আসে।
অভিরূপ সুচরিতাকে বড্ড ভালোবাসে। তার জীবনের সবটুকু জুড়ে এই নারী। সেই প্রিয় মানুষটার চোখের নিচে কালি, শীর্ণ শরীর আর চোখের জল দেখা তার পক্ষে অসহ্য হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল রাতগুলো। অভিরূপ যখন ক্লান্ত হয়ে একটু চোখ বোজে, তখন হঠাৎ সুচরিতা ধড়মড় করে উঠে বসে। দুঃস্বপ্ন দেখে সে চিৎকার করে ওঠে, "রিয়ান! রিয়ান! ও একা ভয় পাচ্ছে! ওকে ওরা মেরে ফেলবে!" তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে।
অভিরূপ তখন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সুচরিতা অভিরূপের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদে। অভিরূপের বুকের ভেতরটা তখন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে সুচরিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, কিন্তু তার নিজের চোখের কোণও ভিজে আসে।
রিয়ানের দেহ পাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ পরের ঘটনা।
ক্যালেন্ডারে তখন ৮ তারিখ। সকাল ৮টা।
অভিরূপ ড্রয়িং রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একমনে ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিচ্ছিল। সকালের রোদ এসে পড়েছে তার চোখেমুখে, কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির দূরের হাইওয়ের দিকে। সুচরিতা তখনো বিছানায়। ছেলের শোকে সে এখন অনেকটা সময় ঘুমের ওষুধ খেয়েই কাটিয়ে দেয়।
হঠাৎ অভিরূপের ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে সেই আওয়াজটা যেন একটু বেশিই জোরালো শোনাল।
অভিরূপ পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠছে—অরুণিমা। সে গলাটা পরিষ্কার করে নিল, যেন ঘুম থেকে সদ্য উঠেছে এমন একটা ভাব।
"হ্যালো? অরুণিমা? এত সকালে?"
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক তীব্র কান্নার আওয়াজ। গোঙানির মতো শব্দ। অরুণিমা কথা বলতে পারছে না, শুধুই কাঁদছে।
অভিরূপ এবার গলার স্বর পাল্টে ফেলল। একদম চিন্তিত, উদ্বিগ্ন বন্ধুর মতো। "হ্যালো! অরুণিমা! কী হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেন? প্লিজ শান্ত হও। বলো আমাকে কী হয়েছে?"
অরুণিমা ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনোমতে বলল, "দাদা... সব শেষ... সব শেষ হয়ে গেল..."
"কী শেষ? খুলে বলো!" অভিরূপের ধমকটা নিখুঁত।
"অলোক... অলোক..." অরুণিমার গলা বুজে আসছে। "আজ সকালে অফিসে যাওয়ার পথে... একটা ট্রাক..."
অভিরূপ শক্ত হয়ে দাঁড়াল। "অ্যাক্সিডেন্ট? অলোক কেমন আছে এখন? কোথায় ও?"
"অ্যাপোলো হসপিটালে... ওরা বলছে অবস্থা খুব খারাপ... প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে... আমি কিছু বুঝতে পারছি না দাদা, আমার হাত-পা কাঁপছে... আমি কী করব?" অরুণিমার আর্তনাদ ফোনের স্পিকার ফেটে বেরিয়ে আসছিল।
অভিরূপ শান্ত গলায় বলল, "তুমি একদম প্যানিক করো না। আমি এক্ষুনি বেরোচ্ছি। তুমিও সোজা হসপিটালে চলে এসো। আমি আছি, কিচ্ছু হবে না।"
ফোনটা কেটে অভিরূপ কফির মগটা টেবিলে রাখল। খুব সাবধানে, যাতে শব্দ না হয়। তারপর সে বেডরুমে উঁকি দিল। সুচরিতা গভীর ঘুমে। অভিরূপ নিঃশব্দে জামাকাপড় বদলে বেরিয়ে গেল।
অ্যাপোলো হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনের করিডোর। ওষুধের কটু গন্ধ আর মানুষের চাপা কান্না মিলেমিশে এক ভারী বাতাস। অরুণিমা ফ্লোরে বসে আছে, তার শাড়ি এলোমেলো, চোখদুটো ফুলে লাল। অভিরূপকে দেখেই সে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। "দাদা, ডাক্তাররা কিছু বলছে না... শুধু বলছে অপারেশন থিয়েটারে আছে... ও বাঁচবে তো?"
অভিরূপ পরম মায়াভরে অরুণিমার মাথায় হাত রাখল। "ভরসা রাখো। অলোক ফাইটার। ও ফিরে আসবে।"
ঠিক তখনই ওটি থেকে বেরিয়ে এলেন সিনিয়র অর্থোপেডিক সার্জন, ডাঃ মালহোত্রা। তার অ্যাপ্রনে রক্তের ছিটে। মুখ গম্ভীর।
অভিরূপ এগিয়ে গেল। "ডক্টর, আমি অলোকের বন্ধু। ও কেমন আছে?"
ডাঃ মালহোত্রা চশমাটা খুলে মুছতে মুছতে অরুণিমার দিকে তাকালেন, তারপর অভিরূপের দিকে। "মি. অলোক এখন স্টেবিল, কিন্তু ওনার ডান পা... ওটা গাড়ির ড্যাশবোর্ডের নিচে এমনভাবে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল যে হাড়গুলো গুঁড়ো হয়ে গেছে। টিস্যুগুলো সব নষ্ট। গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ার চান্স খুব বেশি।"
অরুণিমা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। "মানে? মানে কী?"
ডক্টর খুব নিচু গলায় বললেন, "সরি ম্যাম। ওনাকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই ওনার ডান পা-টা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই।" করিডোরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। অরুণিমা জ্ঞান হারানোর মতো টলতে শুরু করল। অভিরূপ তাকে ধরে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিল।
"ডক্টর, যা ভালো বোঝেন করুন। প্রাণটা আগে," অভিরূপের গলাটা ভাবলেশহীন, ইস্পাতের মতো শক্ত।
ঘণ্টা দুয়েক পর। অপারেশন সফল। অলোকের ডান পা এখন আর নেই।
অভিরূপ কাঁচের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। অলোক অঘোরে ঘুমাচ্ছে, ওষুধের প্রভাবে। তার শরীরের এক পাশ চাদরে ঢাকা, কিন্তু চাদরের নিচে যে কিছু নেই, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
অরুণিমা তখনো ফার্মেসিতে ওষুধের লাইনে দাঁড়িয়ে। করিডোরে অভিরূপ একা।
রাত তখন ১০টা। হাসপাতাল থেকে সব ফরম্যালিটি মিটিয়ে, অরুণিমাকে কিছুটা শান্ত করে বাড়ি ফিরল অভিরূপ। সুচরিতা তখন আর জেগে নেই, ঘুমের ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন। ফ্ল্যাট অন্ধকার। অভিরূপ সোজা ব্যালকনিতে চলে গেল। রাতের মুম্বাই শহরটা এখান থেকে মায়াবী দেখায়। সে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
সাত মাস কেটে গেল।
অভিরূপ আর সুচরিতার কোলে এল তাদের নতুন সন্তান। একটি কন্যা সন্তান। হসপিটালের কেবিনে শুয়ে সুচরিতা যখন বাচ্চাটিকে কোলে নিল, তার চোখে জল। সে অভিরূপের দিকে তাকিয়ে বলল, "ঈশ্বর আমাদের কোল আবার ভরিয়ে দিয়েছেন। ও একদম তোমার মতো দেখতে হয়েছে।"
অভিরূপ বাচ্চাটিকে কোলে নিল। আলতো করে তার কপালে চুমু খেল। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি হাসল।
(ফ্ল্যাশব্যাক)
জানলায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে অভিরূপের মনে পড়ে গেল ঠিক দুই বছর আগের সেই রাত। রিয়ানের তৃতীয় জন্মদিন।
সেদিনও পার্টি চলছিল। পার্টি শেষে সবাই ঘুমাতে চলে গেছে। মাস্টার বেডরুমে সুচরিতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পার্টির ধকল আর অ্যালকোহলের প্রভাবে সে বেহুঁশ। অভিরূপও পাশেই শুয়ে ছিল। রাত তখন প্রায় ৩টা।
হঠাৎ অভিরূপের ঘুম ভেঙে যায়। তলপেটে চাপ, টয়লেটে যাওয়া দরকার। সে ধড়মড় করে উঠে বসে। রুম অন্ধকার, শুধু এসি-র নীল আলো জ্বলছে। সে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
সুচরিতার সাইড টেবিলে তার ফোনটি রাখা ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনটি সাইলেন্টে ভাইব্রেট করে উঠল এবং স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। অভিরূপ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অভ্যাসবশতই সেদিকে তাকাল।
লক স্ক্রিনে ভেসে আছে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন। সেন্ডারের নাম—অলোক।
মেসেজটি খুব ছোট, মাত্র এক লাইনের:
"আজ ওকে দেখে বুঝলাম... ও পুরো আমার মতোই দেখতে হয়েছে।"
অভিরূপের পা থমকে গেল। সে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিল, কিন্তু তার হাত কাঁপছিল। সে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল, কিন্তু আর ঘুমাতে পারল না। অ্যালকোহলের নেশা কেটে গিয়ে এক তীব্র যন্ত্রণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। সারা রাত সে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন—এটা কি সত্যি? নাকি মাতাল অবস্থায় অলোকের প্রলাপ?
সেদিন রাতে সে কোনো প্ল্যান করেনি। সে শুধু সত্যটা জানতে চেয়েছিল।
পরের এক সপ্তাহ ধরে অভিরূপ এক অন্য মানুষ হয়ে গেল। সে গোপনে গোয়েন্দাগিরি শুরু করল। সুচরিতার পুরনো গুগল ড্রাইভের ব্যাকআপ চেক করল, পুরনো চ্যাট হিস্ট্রি রিকভার করার চেষ্টা করল। এবং শেষে, সে প্রমাণ পেল। কিছু ছবি, কিছু পুরনো ভয়েস নোট—যা প্রমাণ করে দিল রিয়ান তার সন্তান নয়।
সেদিন দুপুরে, নিজের কনস্ট্রাকশন সাইটের অফিসে বসে অভিরূপ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সে চিৎকার করে কেঁদেছিল, নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল সুচরিতাকে গিয়ে এখনই খুন করে ফেলে, বা অলোকের মুখোমুখি হয়। সে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু তারপর... সে নিজেকে শান্ত করল। সে আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকাল। সে সুচরিতাকে ভালোবাসে, সে তার সংসার ভালোবাসে। সে বুঝল, চেঁচামেচি করে ডিভোর্স নিলে সে শুধু লোকহাসানো পাত্র হবে, আর তার সাজানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
সে সিদ্ধান্ত নিল—সে চুপ থাকবে। সে কাউকে কিছু জানতে দেবে না। কিন্তু এই 'কাঁটা' সে রাখবে না। রিয়ান নামের এই জীবন্ত মিথ্যাটাকে তার সরাতে হবে।
ঠিক সেই সময়ই সুচরিতা জানাল সে আবার অন্তঃসত্ত্বা। অভিরূপের মাথায় তখন চূড়ান্ত প্ল্যানটি এল। সে জানত এই নতুন বাচ্চাটি তার নিজের। তাই সে ঠিক করল, মেরিন ড্রাইভের ভিড়ের মাঝেই সে তার অতীতকে মুছে ফেলবে। সে বুঝে গেল, এই ফাটল মেরামত করা সম্ভব নয়। এই ইমারত ভেঙে ফেলতে হবে। রিয়ান নামের এই 'ভুল' স্থাপত্যটিকে সরিয়ে ফেলতে হবে, তবেই তার সাজানো সংসার টিকবে।
সে তার ড্রয়ার থেকে একটি পুরনো ফোন বের করল এবং কিছু কন্টাক্টে চোখ বোলালো। কনস্ট্রাকশন সাইটের ঝামেলার কারণে কিছু অপরাধ জগতের মানুষের সাথে তার পরিচয় ছিল।
দুদিনপর অভিরূপ তার কনস্ট্রাকশন সাইটের এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত কিন্তু দাগী লেবার কন্ট্রাক্টরের সাথে দেখা করল। সে জানত পুলিশ তাকে ট্র্যাক করতে পারে, তাই সে নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করল না।
সে ওই কন্ট্রাক্টরের বেনামী অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ১১ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করল একটি বিশেষ নম্বরে। যাতে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চ হাজার চেষ্টা করেও অভিরূপের নাম খুঁজে না পায়।
টাকা ট্রান্সফার কনফার্ম হওয়ার সাথে সাথেই অভিরূপ তার পুরনো বার্নার ফোন থেকে কলটা করল।
ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো। কেউ হ্যালো বলল না। শুধু একটি যান্ত্রিক ও ঠান্ডা গলার স্বর ভেসে এল—
"পেমেন্ট রিসিভড। কাজটা হয়ে যাবে... নো ওরিজ।"
অভিরূপ বলল, "আরও একটা কাজ আছে, এটা সফল হোক তারপর বলছি।"
লাইনটা কেটে গেল। অভিরূপ সিম কার্ডটা ভেঙে ড্রেনে ফেলে দিল। তারপর সে সুচরিতার কাছে ফিরে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল, যেন কিছুই হয়নি।
তারপরের ঘটনা তো জানাই আছে।
৮ তারিখ অলোককে হাসপাতালে দেখে নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকার পরের ঘটনা
ফ্ল্যাটে ফিরে সে সুচরিতাকে ঘুমোতে দেখে কিচেনে গেল। এক কাপ গরম সুন্দর ঘন দুধওয়ালা চা বানিয়ে সে ব্যালকনিতে গেল এবং পকেট থেকে সে তার ব্যক্তিগত ফোনটি বের করল না। তার বদলে পকেটের একদম গভীরে লুকানো একটি পুরনো বাটন ফোন বের করল। ফোনটি সাইলেন্ট করা। ইনবক্সে একটা আনরিড মেসেজ জ্বলজ্বল করছে। মেসেজটা এসেছে দুপুর ১২টায়, ঠিক যখন অলোকের পা কাটার অপারেশন শুরু হয়েছিল। সেন্ডারের নাম নেই। শুধু একটা নম্বর। মেসেজ: "কাজ হয়ে গেছে। ডান পা। হাঁটুর নিচ থেকে। আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।"
অভিরূপ চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিল। গরম তরলটা গলা দিয়ে নামতেই এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল সে।
সে রিপ্লাই টাইপ করল:
"গুড জব। পেমেন্ট ডান।"
সেন্ড বাটন টিপে সে ফোনটার সিম কার্ডটা খুলে ফেলল। সিমটা টুকরো টুকরো করে ব্যালকনি থেকে নিচে অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দিল।
বাতাসে ভাসতে ভাসতে প্লাস্টিকের টুকরোগুলো কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ জানল না।
অভিরূপ মনে মনে হাসল। "আমার সংসারে ঢোকার চেষ্টা করার শাস্তি মৃত্যু নয় অলোক... শাস্তি হলো বেঁচে থেকে তিলে তিলে শেষ হওয়া। রিয়ান গেছে সমুদ্রের তলায়, আর তোর পা গেল ট্রাকের তলায়। পাপের প্রায়শ্চিত্ত এভাবেই করতে হয়।"
সে চায়ের কাপটা শেষ করে আকাশের দিকে তাকাল। আজ আকাশটা বড্ড পরিষ্কার লাগছে।
বর্তমান
হাসপাতালের জানলায় দাঁড়িয়ে অভিরূপের ঠোঁটে এক ক্রুর হাসি ফুটে উঠল।
অলোক আজ জীবিত থেকেও মৃত, অপরাধবোধে ধ্বংস হয়ে গেছে সাথে পা টাও গেছে। সুচরিতা আজ শুধুই অভিরূপের। আর রিয়ান? সে ছিল এক অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল, যা সমুদ্র ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে।
অভিরূপ ফিরে এসে সুচরিতার কপালে চুমু খেল।
"সব ঠিক হয়ে গেছে সুচরিতা। এখন আমরা শুধুই সুখী।"
কেউ জানল না। কেউ কোনোদিন জানবেও না। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অভিরূপ তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রজেক্টটা সফলভাবে শেষ করেছে। সে জিতল। কিন্তু আদৌ কি সে জিতল?
আজ এক মাস কেটে গেছে।
রাত গভীর। বেডরুমে সুচরিতা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু অভিরূপের চোখে ঘুম নেই। সে নিঃশব্দে উঠে ড্রয়িংরুমে এসেছে। আবছা আলোয় সোফায় বসে আছে সে, আর তার কোলে তোয়ালে জড়ানো তার সদ্যজাত সন্তান—তার নিজের রক্ত।
বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা প্রশ্ন অভিরূপের মাথায় বারবার হাতুড়ির মতো ঘা দিতে শুরু করল—
"কিন্তু আদৌ কি সে জিতল?"
অভিরূপ বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাল। ঠিক যেমনটা ছিল রিহানের।
হঠাৎ অভিরূপের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে জানে, সে একটা বিশাল বড় ভুল করে ফেলেছে। সে আজ আর শুধু একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার বা দায়িত্ববান স্বামী নয়, সে এখন একটা ঠান্ডা মাথার খুনি।
যতবার সে এই নতুন বাচ্চাটাকে কোলে নিচ্ছে, ততবার তার রিহানের কথা মনে পড়ছে। রিহান তো জানত না সে কার রক্ত, কার পাপের ফসল। রিহানের কাছে তো 'বাবা' বলতে এই অভিরূপই ছিল সব।
অভিরূপের চোখের সামনে ভেসে উঠল স্মৃতিগুলো—কিভাবে সে রিহানকে পিঠে চড়িয়ে সারা বাড়ি ঘুরত, অফিস থেকে ফেরার পথে রিহানের আবদার মেটাতে নতুন কমিক্স আর ক্যাডবেরি নিয়ে আসত। রিহান যখন আধো আধো গলায় বলত, "বাবা, একটা টফি দাও না!"—তখন তো অভিরূপের বুকটা গর্বে ভরে যেত।
রক্তের সম্পর্ক ছিল না ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্ক তো মিথ্যে ছিল না। সেই ৫ বছরের বিশ্বাস, সেই 'বাবা' ডাক—সব নিজের হাতে খুন করল সে? যে হাত দিয়ে রিহানকে খাইয়ে দিয়েছে, সেই হাত দিয়েই তার মৃত্যু পরোয়ানা সই করল?
অভিরূপের গাল বেয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়ল সদ্যজাত শিশুটির তোয়ালের ওপর। সে তো জিততে চেয়েছিল, কিন্তু নিজের অজান্তেই সে হেরে গেছে। সে তার নিজের মনুষ্যত্বকে মেরে ফেলেছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, এই যে কোলে শুয়ে থাকা তার নিজের ছেলে—এ যখন বড় হবে, যখন কথা বলতে শিখবে, তখন যদি কোনোদিন পুরনো অ্যালবাম দেখে জিজ্ঞেস করে, "বাবা, এই রিহান দাদা কোথায় গেল? ওর কী হয়েছিল?"
তখন কী জবাব দেবে অভিরূপ? এড়িয়ে যাবে? মিথ্যা বলবে? কতদিন?
অভিরূপের বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে এল, যেন এক বিশাল শূন্যতা তাকে গ্রাস করছে। সে ভুল করেছে। ক্ষণিকের জিদ আর ইগোর বশে সে এমন এক ভুল করেছে যা আর শোধরানো সম্ভব নয়। রিহান আর ফিরবে না। সমুদ্র তাকে আর ফেরত দেবে না।
কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। পেছনের সব দরজা সে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। তাকে এখন বাঁচতে হবে। সুচরিতার জন্য, এই নতুন বাচ্চাটার জন্য, আর এই সংসারের জন্য তাকে অভিনয়েই কাটিয়ে দিতে হবে বাকি জীবন।
অভিরূপ চোখের জল মুছল। বাইরে মুম্বাই শহরটা আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু তার বুকের ভেতর এখন শুধুই অন্ধকার।
সে আসলে সে হেরে গেলো এবং সারা জীবনের জন্য বুকের মধ্যে এক বিষাক্ত কাঁটা বিঁধিয়ে নিয়ে তাকে বাঁচতে হবে। এই যন্ত্রণাই হয়তো তার আসল শাস্তি।
