শূন্যায়ন
শূন্যায়ন
জীবন মানুষের কতটা অনৈতিক খেয়াল দিয়ে ভরে যায়, তার যদি কিঞ্চিৎ ধারণা আমাদের সামনের মানুষের থাকত!
গল্প লেখা আর নিজের প্রাক্তনের সম্পর্কে নিন্দা করার মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। এই যেমন আজকের গল্পে, তার সমস্ত পরিচয় গোপন রেখেই একটা সত্য ঘটনা তুলে ধরব। তবে তার আগে বলি, প্রাক্তনের ছবি বা কথা এল কোথা দিয়ে।
একান্ত প্রিয় মানুষ শ্রীতমার আবদারে নিজের প্রাক্তনের ছবি খুঁজছিলাম। ছবি যে পাইনি, সে মিথ্যে কথা আমি আপনাদের বলব না। তবে সেই প্রসঙ্গেই প্রশ্ন উঠেছিল— ভালোবাসা কি প্রকৃতই আছে?
তা নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ করতে দুটো গল্প আমি শ্রীকে বললাম।
প্রথমত, সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। প্রাক্তনের জুতো ছিঁড়ে দফারফা কাণ্ড। সবে অফিস থেকে ফিরেছি। কানে শুনেই দৌড়ে গেলাম উদ্ধারকার্যে অবতীর্ণ হতে। নিজের জুতো তার পায়ে দিয়ে, বৃষ্টি-ভেজা কাক হয়ে তার জুতো সারিয়ে আনলাম।
সে প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদের বিন্দুমাত্র বালাই না করে ইঙ্গিত করল একটি বিলাসবহুল গাড়ির দিকে। আমি, নিজের জীবনে সদ্য পিতৃহীন হওয়ায়, জানালাম— এ রকম বিলাসবহুল বিদেশি গাড়ি কেনার সামর্থ্য আমার নেই। তাই যা আমার আছে, তাতেই তাকে আপাতত সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
সে ভয়ঙ্কর মুখ করে একটি কথা বলল—
“তোকে বিয়ে করে রিকশায় কাঁদার থেকে, তোকে না বিয়ে করে BMW-তে কাঁদা অনেক ভালো।”
বক্তব্যটা আমাকে সহস্র দিন ধরে হৃদয়ের কোনো এক কাঁটার মতো বিঁধে ছিল। আমি এর বহিঃপ্রকাশ কখনও কারও সমক্ষে করতে সক্ষম হইনি।
এবার শ্রী আমাকে বলল,
— “তাহলে হয়তো সত্যিই ভালোবাসা নেই।”
জীবনে আরও কিছু দিন যাওয়ার পর প্রাক্তনের চাহিদা বাড়তেই থাকে। বাড়ির বাজার থেকে শুরু করে মেকআপ কিংবা ব্যাগ— সবই আমার পয়সা থেকে উদরপূর্তি করতে থাকেন। প্রয়োজনে আয়নার সামনে দাঁড়ালে, পয়সার থলি বা ATM কার্ড ছাড়া যেন আর কিছুই লাগত না।
আমি জানতাম, যেদিন আমি অক্ষম হব, সেদিন এই ভালোবাসাও ফুরিয়ে যাবে। কখনও বাড়ি, কখনও গাড়ি, আবার কখনও কারি কারি টাকা দাবি করে বসত। ছোটবেলার বন্ধু, আবার প্রেমিকা— এমন নিচু মানসিকতার হবে, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।
রাজার কোষাগার নিঃশেষ হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সে আমাকে শোষণ করে গেছে।
যাই হোক, সময়টা ২০২৫ সালের পুজোর। সে নিজের পথ নিজে দেখার কথা বলে। কারণ, তাকে স্কিলকোর্স করার টাকা দিতে আমি অসমর্থ হয়েছিলাম, আর তার বান্ধবীর প্রেমিক নাকি তাকে একটি দোকান উপহার দিয়েছিল।
শ্রীতমা জিজ্ঞেস করল,
— “তারপর কী হলো?”
আমি বলেছিলাম,
— “আমি পণ দিই না। আর বিয়ে করতে হলে এমনি করেই করো।”
তখন আমাদের অশান্তি চরমে ওঠে। পাশ থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে অত্যন্ত বিনীত গলায় বললেন,
— “তোমরা এখান থেকে যাও তো বাপু। এখানে উনি ঘুমাচ্ছেন। খুব অসুস্থ। সহজে ঘুম আসে না। বড় কষ্টে এই পুজোর সময় ঘুমিয়েছেন। শেষ হার্ট অ্যাটাকের পর কানে একদমই শুনতে পান না।”
আমি বললাম,
— “কানে তো শুনতে পান না। দু’মিনিট দিন, চলে যাচ্ছি।”
বৃদ্ধা বেশ রেগেই বললেন,
— “যদি একটু শুনতে পান? যদি ঘুমটা একবার ভেঙে যায়? দয়া করে এখান থেকে যাও।”
আমি বললাম,
— “চলে যাচ্ছি।”
শ্রীতমা বলল,
— “তাহলে ভালোবাসা আছে? তোমার কী মনে হয়?”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— “হয়তো আছে। কিন্তু পুরোটাই নির্ভর করে, আমরা কখন কাকে ভালোবাসছি।”
শ্রীতমা এবার অযাচিত দাবি করে বসল,
— “দেখি তোমার প্রাক্তনকে?”
আমার লুকোনো গ্যালারিভর্তি তার ছবি ছিল, যা একান্তই অনিচ্ছাকৃত। কারণ আমি আমার প্রাক্তনের মুখও দেখতে চাই না।
শ্রীতমা বড় মিষ্টি মেয়ে। আমি তাকে বড্ড ভালোবাসি। তাই তাকে একদমই দুঃখ দিতে চাই না। আমি বললাম,
— “আমার কাছে সত্যিই তার কোনো ছবি নেই।”
সে একজন শিশুর মতো বেশ খুশি হলো। বলল,
— “বাস্তবে না রাখাই ভালো।”
আর আমি একনিশ্বাসে সব মুছে দিলাম। নিমিষে নিশ্চিহ্ন করে দিলাম প্রাক্তনের সমস্ত স্মৃতি।

