অবশেষে, আমরা পুরুষ
অবশেষে, আমরা পুরুষ
আজ সকাল থেকেই পূজার শরীরটা খুব খারাপ। তাই সে আমাকে ছেড়ে নিজের বাড়ি গেছে। ফিরলে ডক্টর দেখাতে যাব। এবার আপনার মনে সন্দেহ হচ্ছে। এই পূজা মেয়েটি কে? ইনি হলেন আমার একমাত্র প্রেমিকা। শেষ ৬ মাস ধরে লিভিং করছি। ভবিষ্যতে বিয়ে করার আমাদের ইচ্ছে আছে। সম্পর্ক প্রায় সাড়ে ৪ বছরের। আর্থিক অবস্থা পূজার বাড়ির খুব একটা সচ্ছল নয়। তাই আমি কিছুটা সাহায্য করার চেষ্টা করি। পেশায় পূজা একজন মন্টেসরি স্কুলের শিক্ষিকা।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
যাই হোক, এই দেখ আপনাদের সাথে কথা বলতে বলতে কে যেন এসেছে?
দরজা খুলে দেখি, বড্ড মনমরা হয়ে পূজা দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বেশ হাসি খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
- ও, MY LOVE
- how was your day?
- তোমায় দেখে বড্ড মন মরা লাগছে।
- কেমন আছে শরীর? বাড়িতে সবাই ঠিক???
পূজা বলল - হ্যাঁ, সব ঠিক। আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে। আমার শরীরটা ঠিক ভালো নেই। খুব বমি পাচ্ছে।
সুজয়, আমি বুঝতে পারছি না কি করব?
আমি - চলো ডক্টর দেখিয়ে আসি। বিকেল ৬ টাতে ডক্টর বসেন।
পূজা - please শরীর খুব একটা ভালো নেই। একটু বসতে দাও। শরীর আর দিচ্ছে না।
আমি তখন পিঠের দিকে বালিশটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, রেস্ট নাও।
তারপর বিকেল হলো গাড়ি বের করলাম, নিয়ে গেলাম ডক্টর অঙ্কিতা মজুমদারের চেম্বারে।
ডক্টর কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর আমাকে জানালো - আমি বাবা হতে চলেছি।
আমি তো বিশাল খুশি। জীবনে প্রথম বাবা হওয়ার আনন্দ, একি ভোলা যায়। আমার শহরে যেন একশো প্রজাপতি এসে মেলা বসালো। আমি তখন মনে মনে ঠিক করতে লাগলাম, মেয়ে হলে কি নাম রাখব আর ছেলে হলে কি?
পূজার দেখলাম, তখনও মন বড্ড খারাপ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম - কি পূজা হালদার? মা হয়ে কি দায়িত্ব বেড়ে গেছে??? এত চিন্তিত কেন?
পূজা বলল - এই ভাবে বিয়ের আগের সন্তান, মানুষ কি বলবে? লোকে কি বলবে? সমাজ কি বলবে? আমি পারব না। আমি এ সন্তান রাখতে চাই না।
আমি বললাম - বিয়েইতো, দরকার পড়লে করে নেব। দরকার হয় আমি কাকিমার সাথে কথা বলে date fix করছি।
পূজা ইতস্তত হয়ে বললো - বিয়ে কেন? এত কম বয়সে? আর কেন? এইতো বেশ ভালো আছি। আর এই কটা দিন এক সাথে থাকলে আর শারীরিক সম্পর্ক করলেই, সেই মানুষটাকে বিয়ে করা যায় না।
আমি কাতরসুরে - কেন তুমি আমাকে ভালোবাস না??? এত দিনের সম্পর্ক, প্রেমের চিহ্ন তুমি শেষ করে দেবে নিমিষে?
পূজা হালকা জোর গলায় - আসলে মানুষ কখনও এত কম দিনে চেনা যায় না। আর জন্মটা তুমি দেবে না। আমি দেবো। এত কম বয়সে আর যাই হোক আমি আমার শরীর নষ্ট করতে পারছি না।
আমি - একটা মানুষ জন্ম দিলে তোমার শরীর নষ্ট হয়ে যাবে। ওটা আমাদের সন্তান, পূজা। আমার ওকে নিয়ে অনেক আশা, অনেক ভালোবাসা রয়েছে।
পূজা বেশ রেগে গিয়ে বললো - তুমিতো এই জানলে, আর তোমার এত ভালোবাসা কোথা দিয়ে আসছে??? আমরা শারীরিক চাহিদাতে শুয়ে পড়েছিলাম। তারই ফল।
আমি - তাই বলে খুন, তোমার মাতৃত্বে বাধে না? আমরা তো ইচ্ছা করে আনিনি সন্তানটাকে, আমি জানি। তবুতো আমাদের সন্তান।
পূজা - শোনো সন্তান নয়, এটা আমাদের জীবনের একটা ভুল, চলো ঠিক করেনি। তুমি abortion এর ব্যবস্থা করো।
আমি কেঁদে উঠে বললাম - আমি পারব না। আমি তোমাকেও ভালোবাসি, সাথে সন্তানটাকেও। আমার পিতৃত্বে আটকায় বড্ড।
পূজা বড্ড রেগে গেল। আমি পুরো রাস্তা বোঝাতে থাকলাম।
বাড়ি এসে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরে বললাম - আমরা দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক। দুজনের ইচ্ছাতেই একে অপরের কাছে আছি। তাহলে কেন?
পূজা বললো - তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আজকাল লোকেরা এক রাত্রি মজার জন্য নিজের বন্ধুর সাথে শুয়ে পড়ে। তাই বলে, কি বাচ্চা আসলে রাখতে হবে?
আমি বড্ড কাতর সুরে বললাম - আমরা তো বন্ধু নয়। একসাথে এতদিন আছি।
পূজা ঠান্ডা গলায় বলল - হ্যাঁ, কিন্তু এখন আমি মা হব না। ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে। আর এত কম দিন এক সাথে লিভিং করে কি করে আশা রাখো যে আমি তোমাকে বিয়ে করবো??? আমি আরো চিনি বুঝি - তার আগে কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
আমি রেগে গিয়ে বললাম - তুমিতো খুব বাজে মনের মানুষ। যে মা হয়ে, এই ধরনের মন্তব্য করতে পারবে, তাঁকে আর যাই হোক জীবনসঙ্গী করা যায় না।
পূজা তৎক্ষণাৎ নিজের সমস্ত জিনিস নিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমার জীবনের সব স্বপ্ন যেন ঠুনকো কাঁচের মত ভেঙে গেল।
তার প্রায় দেড় মাস পর ফোন এলো।
পূজা বললো - সুজয়, I am sorry, my love. আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই।
যথারীতি আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম, সঠিক জায়গায়। দেখলাম দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসছে, আমার প্রিয়তমা।
আমি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম, দিয়ে বললাম- কত বার চেষ্টা করেছি, তোমাকে ফোন করার তুমি রেগে ব্লক করে দিয়েছিলে। তুমি কেমন আছো? কাকিমা কেমন আছে? আর আমাদের সন্তান কেমন আছে? সোশ্যাল মিডিয়াতেও আমি তোমাকে কত মেসেজ করেছি, ইমেল সেন্ড করেছি। তুমিতো সাড়া দাওনি, দাওনি সাড়া। আর এই ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসে নৃত্য প্রদর্শন করছো। সন্তানের ক্ষতি হবে না বলো?
পূজা - শোনো একটা কথা …
আমি ওকে একপ্রকার থামিয়ে দিয়েই বললাম - একবার জাওয়ানি চলে গেলে আর আসবে না নাচটা অপূর্ব হয়েছে। তবে একটু সাবধানে।
পূজা বললো - শুধু আমি থাকবো তোমার সাথে, আর সে নেই।
আমি - কি করে???
পূজা বলল - আমি রাখিনি।
আমি - কিন্তু কেন?
পূজা - আমি মা হতে চাই না এই কম বয়সে, আমি বিয়েও করতে চাই না। আমার জীবন, আমার শরীর, আমার ইচ্ছা।
আমি বললাম - তোমাকেও আর থাকতে হবে না। তুমি শুধু তোমার সন্তানকে খুন করনি। সাথে খুন করেছ আমাদের ভালোবাসা, তোমার মাতৃত্ব, সব কিছুকে এক সাথে। তোমার মত মানুষকে দেখলে ঘেন্না হয়। আমি আর তোমার মতো নিষ্ঠুর একটা মানুষকে আর যাই হোক নিজের জীবনে রাখতে চাই না। যেখানেই থাকো, ভালো থাকো। আর কোন দিনও আমার চোখের সামনে আসবে না। আমি ঘেন্না করি তোমায়। আমি ঘেন্না করি তোমায়। ঘেন্না করি তোমায়।
এই বলে এক নিমিষে পুরো মদটাই খেয়ে নিলো সুজয়।
তখন, শুভ বেশ বেশ টলতে টলতে বিয়ার গ্লাস হাতে নিয়ে বললো - এই নারী জাতি বুঝলে, দাদা, ভারী ভয়ঙ্কর। এরাই ভালোবাসতে শেখায়, আর এরাই ঘৃণা করতেও।
বিয়ারটা শেষ করে বললো - এই দেখো দাদা, আমার মানুষটাকে আমি ভালোবাসলাম, যত্ন নিলাম। কি নিলাম, যত্ন, যত্ন।
আর আমাকে কি বললো - বড় গাড়ি, monthly ৫ লাখ টাকা ইনকাম না করলে নাকি বিয়ে করা যায় না।
প্রতিদিন ওর চোখে নিজেকে টাকার থলিতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেও হেরে গেছি।
তাই সে বলেছে - “ তোকে বিয়ে করে রিস্কশাতে বসে কাঁদার থেকে, তোকে বিয়ে না করে BMW তে বসে কাঁদা অনেক ভালো।”
আমরা পুরুষ মানুষ বুঝলে, দাদা, আমাদের টাকা না থাকলে, কেউ বোঝে না, বুঝলে???
কি বলেন সুজয় বাবু?
সমীরণ পাশ থেকে বলল - আমার এক্স gf এখনও সোশ্যাল মিডিয়াতে গাল দেয় ভিখারি বলে। ৫০ টাকার কানের কিনে দিতে পারিনি, আর ওর নতুন প্রেমিক ৯০০ টাকার ক্রিম দেয়। ছাড়োতো এদের কথা। আমাদের ভালোবাসা বলো, পিতৃত্ব বলো - সবই পয়সা দিয়ে মাপা হয়।
সুজয় নেশার ঘোরে টেবিলে লুটিয়ে পড়ে এক হাত তুলে সম্মতি দিয়ে বললো - ঠিক ঠিক। শুধু দোষ নেওয়ার জন্য আমরা আছি। সে সমাজের চোখে বা আইনের চোখে বা পরিচিত মানুষের চোখে।
ততক্ষণে শুভ বেয়ারাকে বিল দিয়ে যেতে বললো।
বিল আসার পর বিলের পিছনে কবি লিখল -
“ আমাদের ভালোবাসাটাও ঠিক Kauaʻi ʻōʻō-র গানের মতো…
শেষ সেই কবে গেয়েছিল কিন্তু আজ ব্যথা রয়েছে…
একাকীত্বের সেই বিরহ আজও প্রবল …
কিন্তু মন এতটাই ভঙ্গুর আর প্রেম বিমুখী যে … ভালোবাসতে আর মন চায় …
১৯৮৭ সালের সেই বিলুপ্ত পাখিটার গানের মতো হয়তো আমাদের গল্পও সংরক্ষিত থাকবে …
আর আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পুরুষ মানুষের ভালোবাসাও হবে বিলুপ্তপ্রায়…
বা হয়তো মধ্যবিত্ত বলে ঘর বাঁধবো না… সেই পেঙ্গুইন পাখিটার মতো …
সমাজ বিমুখ হয়ে চলবো পাহাড়ের পথে একাকীত্বকে ভালোবেসে।”
এরই মাঝে বেয়ারা কাব্যিক ছন্দের ভঙ্গি ভেঙ্গে জাস্ট বিলটাকে উল্টে বললো, “ বাবু, পেমেন্টটা কিসে করবেন? Cash নাকি কার্ড???”

