রঙিন গ্রহে অভিযান
রঙিন গ্রহে অভিযান
শহরে আজ রঙের মেলা বসেছে। কিন্তু বয়স যেহেতু ২৭ ছুঁইছুঁই, আমাদেরও এই সুযোগ হয় না যে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে চুটিয়ে রং খেলবো। কারণ বন্ধু আছে কই! আর যে ক’জন আছে, তাদের কেউ দূরে থাকে, আবার কারও ছুটি হয় না হোলি বা দোলে। আবার কারও সঙ্গে বছরে একবার দেখা হয়। আবার কয়েকজন তো দেখলেই ধার চায়। একবার ধার চাইলে আর যাই হোক, ইচ্ছে থাকলেও তাদের অন্তত ডাকা যায় না। কারণ ওই ২০০ টাকাও যদি ধার দিয়ে দিই, তাহলে ব্যাস—হয়ে গেল। যা আজকাল জিনিসপত্রের দাম, নিজেই কী কিনবো! ৮০% স্যালারিতে তো সংসার চলে। ২০% স্যালারির ১০% নিজের খরচ, আর ১০% তো জমানো। এর পর আর যাই হোক, মহান হয়ে বন্ধুকে ধার দেওয়া যায় না। কারণ ওই টাকা তো আর ফেরত পাবো না।
বন্ধু-প্রেম এমনিও নষ্ট হবে আর অমনিও। তার থেকে দেখা না করে, ধার না দিয়েই নষ্ট হওয়া ভালো।
যাই হোক, এই দোলে বড় কষ্টে দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম, ঘুরতে বেরোবো। নিজের চারচাকা নিয়ে কোনওরকমে বেরোলাম। কিন্তু চারচাকায় বসে কি আর হোলি খেলা যায়! তাই নর্থ কলকাতার কিছু জায়গায় কিছু ছবি তুলে সোজা বাড়ি। এদিকে ২টা ৩০-এর মধ্যে বাড়ি ঢুকতে হবে। কারণ ৩টে থেকে চন্দ্রগ্রহণ।
যাই হোক, আমি আর কিশানু গাড়ির পাশে রেখে ঠিক করলাম যে জীবনে লস্যি খাওয়া খুব দরকার। কারণ ঠান্ডা পানীয় খেলেই নাকি মধুমেহ রোগ হতে পারে! আর এই ৩০ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে একটু সামলে চলাই ভালো। তো তারপর আমরা এক লস্যির দোকানে গেলাম। আরামসে দু’গ্লাস কিনে সঙ্গে সঙ্গে পেটের ভেতরে। কিন্তু সবুজ রঙের লস্যি আমরা আগে কখনও দেখিনি। নতুন ধরনের লস্যি খাওয়ার ইচ্ছে জীবনকে এতটাই ইচ্ছুক করে তুলল যে দুটো গ্লাস খেতে আমরা দিধাবোধ করলাম না।
কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। খাওয়ার পর আমার ভেতরে এক অদ্ভুত স্রোত বয়ে গেল। আমি নিজে বাইক আস্তে আস্তে চালিয়ে কিশানুকে নিয়ে উড়ে গেলাম। চারদিকে কেউ নেই, কিছু নেই। হঠাৎ দেখি চারদিক দিয়ে নীল-লাল রঙের বৃষ্টি হচ্ছে। রোদে বৃষ্টি দেখে আমি নির্দ্বিধায় বুঝতে পারলাম যে উপরে ভগবানরাও হোলি খেলছে।
এবার নিজের যানবাহন থামিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি দু’টি হাতিমাটিম টিমের ছানা এসেছে। হাতে তাদের ভীষণ বন্দুক। তারাই এই রঙের বৃষ্টি করছে। হঠাৎ তারা আক্রমণ করলো আমাদের ওপর। গুলি চালাতে শুরু করলো। আমরা বাইকের নিচে লুকিয়ে পড়লাম। আরেকদিক দিয়ে সবুজ রঙের ছানাটা গুলি ছুড়ছে।
এই গুলি থেকে বাঁচতে বুঝলাম, এই নীল-লাল-হলুদ হাতিমাটিম টিমের ছানাদের সঙ্গে লড়াই করতেই হবে। আমরা কলকাতার ছেলে, আবার বাঙালি। এসব হাতিমাটিম টিমের ছানা আমাদের কাছে বাচ্চা। আমাদের কাছে মোক্ষম অস্ত্র আছে—অবিরাস্ত্র! আমাদের পাড়ার কাকুর মন্ত্রপূত আবির। সেটা বের করে দুই বন্ধু হাতে নিলাম।
যেই না ওদের বন্দুকের গুলি শেষ হলো, অমনি লাফিয়ে পড়ে ওদের গায়ে মাখিয়ে দিলাম ভালো করে। দেখি হাতিমাটিম টিমের ছানাগুলো ওই আবির মেখে পড়িমরি করে দৌড়। কিন্তু বিপদ হলো—উপর দিয়ে আক্রমণ হলো সোজা কিশানুর পেটে। কিছু গুলি খেয়ে কিশানুর মাথা ঘুরতে শুরু করলো।
আমি তখন দুই হাতে আবির নিয়ে সেটা জলে গুলে এক বালতি রং জল বানালাম। সেখান থেকে পিচকারি তুলে গুলি করে মুখে স্লোগান দিলাম—হ্যাপি হোলি! রাক্ষস বাবাজীবন ভয় পেয়ে সোজা বাড়ি ঢুকে গেল।
বন্ধু খুব আহত। আমার তখনও মাথা ঘোরেনি। এই দীর্ঘ লড়াই আমাকে শেখালো—এখানে বাঁচতে হলে লড়াই করে বাঁচতে হবে।
হঠাৎ মনে পড়লো ঘড়ি দেখি—কটা বাজে! তখন ২টা ১৬। সোজা বাড়ি আসবো। কিন্তু কিশানু বাড়ি যেতে পারছে না। তাই ওকে নিয়ে গেলাম আমার পরিচিত এক পার্কে। ও আহত অবস্থায় বললো, ওর ফোন দিয়ে কিছু ছবি তুলে দিতে। না হলে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারবে না। তাই নির্দ্বিধায় ওর কিছু ছবি তুলে দিলাম। কারণ বছরে একবারই তো রং মেখে ছবি তোলা যায়।
পাশ দিয়ে দুটো জঙ্গলি কুকুর আমাদের তাড়া করলো। এতটাই ভয়ানক যে আমাদের আবিরও ওদের ওপর কাজ করলো না। আর একটু হলেই কিশানুকে কামড়ে দেবে। আমি তখন “জয় বাজরংবলী” বলে বাইক স্টার্ট করে হর্নের সাউন্ড অ্যাটাক আর বড় হেডলাইট জ্বালালাম। মুখ দিয়ে বিশাল বকা দিলাম। কুকুরগুলো সাউন্ড অ্যাটাকে মুছে গেল।
আর কোনও বাধা নেই। তখন ২টা ২৫। আমি কিশানুকে বাইকের সঙ্গে বেঁধে নিলাম। আর নিয়ে চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দরজা খুললাম। কিশানুকে টেনে টেনে ঘরে তুললাম। কিশানু বমি করে ফেললো, আর রঙে সারা ঘর ভরে গেল।
আমার মমতাময়ী মা দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর আর কী—আমি দুপুরে চন্দ্রগ্রহণের আগে খাবার খেয়ে নিলাম। কিশানুকেও খেতে দিলাম, কিন্তু ও আহত ছিল—কিছু খেতে পারল না।
মা অনেক কিছু বলছিলেন… কিন্তু অন্য ভাষায়। হাসিও পাচ্ছিল। কিন্তু হাসিনি, কারণ জানি হাসলে মা রেগে যাবে। আসলে এটা আমার মায়ের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। মা ভালো শিখলেও আমি শিখতে পারিনি। শেখার সময় আমি বাড়ির জানলা খুলে চড়ুই পাখি দেখতাম। তাই কিছুই বুঝিনি।
একদিক দিয়ে ভালো—ওই হাতিমাটিম টিমের ছানাগুলোও বুঝবে না। আর আমি ঠিক সময়ে নিশ্চিন্তে ডিকোড করে নেবো। কোনও সমস্যা নেই।
তারপর ঘরের দরজা লাগিয়ে দরজার নিচে বসে পড়লাম। রকেট স্টার্ট করলাম, যাতে আমি পৃথিবীতে ফিরতে পারি। মাঝখানে কিশানু ওর ফেরত পাওয়া ১০০ টাকা নিয়ে দু’বার ধমক দিল। কিন্তু কী করবো—বন্ধু তো! পৃথিবীতেও তো ফিরতে হবে। একা একা তো ফেরা যায় না।
তবে ভেবেছি কলকাতায় ফিরে কিছু টাকা রকেটের জ্বালানির জন্য চাইবো। কারণ ওর চিকিৎসাতেও খরচ হয়েছে। যাই হোক, এখানে বিশাল গরমে গলে যাচ্ছি, কিন্তু রকেট চালিয়ে আমি পৃথিবীর উদ্দেশ্যে আসছি।
হঠাৎ নাসার কাস্টমার কেয়ার থেকে ফোন এলো। আমিও নির্দ্বিধায় দুটো কবিতা শুনিয়ে দিলাম। তারাও খুব স্বহৃদয় ব্যক্তি, বললো শুতে। কিন্তু আমি রকেট না চালালে রকেট তো ধাক্কা খাবে! তারা বললো—অটোপাইলট আছে, সমস্যা নেই।
তাই উঠে বিছানায় শুয়ে ভাবলাম—আমি কি ভালো লেখক? সুযোগ পাই না বলে প্রকাশও হয় না, আর লেখকও হওয়া হয় না। তারপর ভাবলাম—এতটা ক্রিয়েটিভিটি বাঙালিদের মধ্যে কয়েকজনেরই আছে। তাদের মধ্যেই আমি অন্যতম। ঠিক আছে, কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক।
তারপর ভাবলাম—আমি সর্বশক্তিমান। এইভাবে উড়ে বেড়াচ্ছি, চাইলে পৃথিবীর মানুষ বাঁচাতে পারি। কিন্তু আমার কাছে তো মুখোশ আর পোশাক নেই, তাই যতটা লুকিয়ে করতে হয়।
তারপর আমি গভীর ঘুমে নিমগ্ন হলাম।
তখন রাত ৭টা ৩০। কিশানুকে ডেকে বললাম—ভাই, নাগেরবাজারের বেস থেকে খবর এসেছে। তোকে বলেছে আজকের দিনটা এই সিন্ধি মোড়ের বেসেই থেকে যেতে। কিন্তু এত বলাতেও কথা শুনলো না। পাছে আবার তারা আক্রমণ করে, তাই ও বাইক নিয়ে চলে গেল মানুষ বাঁচাতে।
এভাবেই সমাজের নায়কেরা রাক্ষসদের বিরুদ্ধে লড়ে চলে। তাই হয়তো সাধারণ মানুষ আজও নির্ভয়ে হাঁটতে পারে।
কিন্তু এদের কথা কেউ জানে না…
