শেষ ট্রেন
শেষ ট্রেন
উপন্যাসের নাম :-শেষ ট্রেন
লেখক পরিচিতি
প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য।
এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের ,)
ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের ,
পূর্বতন প্রফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ।
একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ ।
এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন
রচনা তারিখ-:.২.০৯ .২০২৬
এডিট করা -: এখনও .হয়নি।
কপিরাইট। -:
সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফ ডাক্তার প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এর ও ফার্স্ট ডিগ্রি ব্লাড রিলেটিভ এর
Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and Direct blood relationship of prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( IPR copy Right act of WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned here ,Please Don't try ever to infringe the copyright of the any content ,idea, theme,plot, character of philosophy, dialogues events characters and scene of published manuscript in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and either by civil laws for compensation in few millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws and in criminal proceedings
লেখকের রেসিডেন্স এর ঠিকানা-:
মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪,
E mail profpkb@yahoo.co.in
সংক্ষেপ: শেষ ট্রেন উপন্যাস
প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে শেষ ট্রেন মিনি উপন্যাসটি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী J M. Coetzee (2003 সালে Nobel Prize in Literature পান এই disgrace বইটির ওপরেই ভিত্তি করে।) ভিত্তি করে লেখা হয়েছে বাংলা ভাষায়। “Disgrace “এর প্লট/ স্ট্রাকচারাল ও চরিত্র গুলো আর “শেষ ট্রেনের” প্স্ট্রাকচার ও চরিত্র গুলোর সঙ্গে মিল যেমন আছে তেমনি অমিল ও অনেক।
অরিন্দম মুখার্জী হলেন একজন বাঙালী
ও কলকাতার এক নামী কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, যিনি তাঁর সুনাম, চাকরি, মানসিক শান্তি, শৈল্পিক সাফল্যের স্বপ্ন এবং পরিশেষে নিজের মেয়ে মেঘলাকে রক্ষা করার ক্ষমতা—সবকিছুই হারান। বর্ণবৈষম্য ,শ্রেনী বৈষম্য, ক্যাপিটালিস্ট জগতের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য তৈরি-কলকাতার এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রোমান্টিক ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাস নেওয়া এবং 'comparative লিটারেচার কমিউনিকেশনস'-এর প্রফেসর ও হেড হিসেবে নিজের কাজ নিয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত গর্বিত। তিনি এক বারই বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন। এক ধনী ও ক্যাপিটালিস্ট ঘরের এক মহিলা ছিলেন তার প্রাক্তন স্ত্রী, যার কারণেই তাকে তার পিতৃভূমি ছেড়ে, প্রথমে বালিগঞ্জ এ তারপরে কলকাতার বিডন স্ট্রীটের বাড়িতে জীবন কাটাতে হয়েছিল একজন ঘরজামাই হিসেবেই । ওনার স্ত্রী ও ওনার শ্যালিকা, দুজনেই ছিলেন ধনী উচ্চবিত্ত জীবন যাত্রায় অভ্যস্ত ও ওনাদের এক মাত্র মেয়ে মেঘলাকেও মানুষ করেছিলেন, যে কারণে মেঘলা ছিলেন অত্যন্ত একগুঁয়ে, যেদি, কলোনিয়াল মানসিকতায় তৈরি হয়েছিল ও অরিন্দমের সোদ পুরের পৈতৃক পরিবারের প্রতি ঘৃণার মেকি আস্তরণও তৈরী করা হয়েছিল মেঘলার মনে।
অরিন্দমের যৌন ক্রিয়াকলাপগুলো সবসময় ছিল অত্যন্ত সামাজিক ভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার প্রথম যৌনো সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল যখন তার সবে ১৭ বছর বয়েস এবং সেটা হয়েছিল তারই স্কুলের এক বন্ধু অরূপের মায়ের সঙ্গে( রত্নাদেবীর ৩৭), যিনি নিম্নবিত্ত ও বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের রিফিউজি কলোনির এক রং মিস্ত্রির ঘরের গৃহিণী ছিলেন ,বয়েসেও তিনি ছিলেন অরিন্দমের মায়ের কাছাকাছি ও কিছুটা মেদবহুল মোটাসোটা এক মহিলা,এবং অরিন্দম এক দুপুরে এসে ফাঁকা বাড়ি পেয়ে একরকম জোর জবরদস্তি করেই সেই মহিলাকে তার সঙ্গে শৃঙারে ও সহবাসে লিপ্ত হতে এক রকম বাধ্যই করতেন । মহিলা রত্না দেবী অরিন্দমকে তার সঙ্গে এইরকম শারীরিক সম্পর্কে না যেতে অনেক উপদেশ দিয়েও, ধমক ধামক দিলেও প্রায় সময়ই থামাতে অক্ষম হতেন ও অরিন্দমের সঙ্গে বিছানায় শুয়ে যৌন খেলায় অংশ নিতেও বাধ্য হতেন। অরিন্দম মহিলাকে তীব্র যৌন তৃপ্তি/ সুখ দেবার চেষ্টা করলেও মহিলা তাদের এই অসম সম্পর্কের জন্য তীব্র অপরাধ বোধে প্রচণ্ড ভাবে ভুগতেন এবং সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতেন তিনি না সেই বয়সে অরিন্দম দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। সেই যৌন সম্পর্কের কারণেই তাঁর পতন হতে শুরু হয় এবং মহিলাও পরে তাকে নানা ভাবে expolit করতেন তাদের কিছু যৌনো মিলনের দৃশ্য ছবি করে ক্যামেরায় ধরে রেখে ও সবাইকে তার সম্বন্ধে বলে দেবেন বলে ভয় দেখিয়ে প্রতি মাসে টাকাও নিতেন।, রত্না দেবীর সঙ্গে প্রায় চার বছর ধরে এই শারীরিক সম্পর্কটা বজায় ছিলো অরিন্দমের বারাণসী ( বি এইচ উ) তে আসার আগে পর্যন্ত।
এরপর উচ্চতর ডিগ্রী ইংরেজি সাহিত্যেও কম্পারেটিভ লিটারেচার MA ও তারপরে phd নেবার সময় তিনি বেনারস এর রেড লাইট জগতের একজন খুব সুন্দরী ও উচ্চ বিত্ত ঘরের যৌনকর্মীর ( চন্দ্রিমার ) প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর পরিবারে আশ্রয় হিসেবে থাকা সত্ত্বেও তাঁর সাথে রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেন, যা সেই নারী তাকে প্রত্যাখ্যান করেন ভেবে দেখবেন বলে। কেননা অরিন্দমও ছিলেন রিফিউজি বাড়ির সন্তান এবং ওনার চোখে দরিদ্র। এরপর ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি করে তিনি বছর কয়েক বেকারত্ব সহ্য করার পরে এই অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেন ও বিবাহ করেন ও একটি মেয়ের জন্ম দেন যার নাম মেঘলা( বয়স ২৮)।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পারেটিভ লিটারেচার এক ডক্টরেট করা ছাত্রী কে ( রিয়া সেনকে) তার প্রতি প্রলুব্ধ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁকেও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন। তাঁর আসল "কলঙ্ক" বা "পতন" নেমে আসে যখন তিনি সোদপুরে পৈতৃক বাড়ি অপরাজিতায় ফিরে আসার পর তাঁরই প্রতিবেশী বিধবা ভেটেরিনারি ডাক্তার মাধবীকে(৪৫) তার প্রতি প্রলুব্ধ করেন; অ্যালকোহল খাইয়ে এবং অন্যান্য নানা ধরনের উপায়ে তাঁকেও একদিন বিছানায় যেতে বাধ্য করেন, যা নাকি একরকম ধর্ষণেরই নামান্তর ছিলো। পরবর্তীতে এর ফলে রিয়াসেন তাঁর phd এর জন্য টার্ম ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিলে তিনি তাঁর গ্রেড জাল করেন। রিয়ার তৎকালীন প্রেমিক অয়ন এবং তাঁর বাবা হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও রিয়ার সঙ্গে এই সম্পর্ক থামাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ঘটনাটি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজানি হলে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। রিয়ার বক্তব্য পড়তে, নিজেকে রক্ষা করতে বা আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে অরিন্দম অস্বীকার করেন, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডিপার্টমেন্টাল প্রধান পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এই সময়ে রিয়া সেন অরিন্দমের আন্ডারে ইতালীয় জীবনের শেষ ধাপে লর্ড বায়রনের জীবন নিয়ে একটি অপেরা লেখার কাজ করছিলেন, যা তাঁর নিজস্ব জীবনের সাথেই মিলে যায়—যেখানে কবি লর্ড বায়রন ভোগবিলাসিতায় জীবন কাটাচ্ছেন এবং এক বিবাহিত নারীর সাথে ( খুড়তুতো বোন) প্রেমে লিপ্ত।
শিক্ষকতা থেকে বরখাস্ত হয়ে অরিন্দম sodepur কিছু সময়ের জন্য নিজের পিতৃক বাসায় আসেন, মেয়ে মেঘলা( ২৯) তখন দিল্লিতে চাকরী নিয়ে চলে যায় এক খামারের দায়িত্বে যেটা মেঘলা ও অরিন্দম নিজেদের নামে কিনেছিল একসময় । খামারের প্রাকৃতিক জীবনধারা মেঘলার আগের বিশৃঙ্খল উচ্চবিত্ত বড়লোকি জীবনেও কিছুটা সামঞ্জস্য এনে দেয়; যেমন মেঘলা শাকসবজি বিক্রির হাটে যাওয়া এবং পেট্রাস নামে এক বিবাহিত কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানের সাথে কাজ করা, যিনি আবার মেঘলার কুকুরদের দেখাশোনারও কাজ করতেন।
কিন্তু ভারতবর্ষে তখন সরকারি ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছিল। নয়ডার তখনকার সময়ের(১৯৮০) গ্রামীণ জীবনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার পরপরই মেঘলা তাদের খামারে এক ভয়াবহ আক্রমণের মুখোমুখি হন, যখন অরিন্দম নিজে উপস্থিত ছিলেন নয়ডাতে। অসুস্থ আত্মীয়কে কল করার অজুহাতে তিনজন লোক খামারবাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। তারা মেঘলাকে ধর্ষণ করে এবং অরিন্দমকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে বাথরুমে। এছাড়া তারা খাঁচায় রাখা মেঘলার কুকুরগুলোকে গুলি করেও হত্যা করে—অরিন্দম পরে ভাবেন যে, দিল্লিতে কুকুরকে ক্ষমতা লোভী রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা ও বস্তিবাসীদের প্রতীক হিসেবে ভয় পেতে শেখানো হয়েছিল বলেই হয়তো তারা এটি করেছিল। অপরাধীরা অরিন্দমের দামি গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়, যা আর কখনো উদ্ধার হয়নি। অরিন্দমের জন্য স্বস্তির বিষয় এটাই ছিল যে, দিল্লির সংবাদপত্রগুলো তাঁর নাম ভুল বানানে ("অরবিন্দ হিসেবে") ছেপেছিল, ফলে তাঁর লজ্জিত একাডেমিক পরিচয়ের সাথে মেয়ের খামারে হামলার ঘটনাটির কোনো যোগসূত্র তৈরি হয়নি।
আক্রমণের পর ধর্ষিতা মেঘলা মানসিকভাব ভেঙে পড়েন এবং ঘরকুনো (অ্যাগোরাফোবিক) হয়ে পড়ে। অরিন্দম তাঁকে নয়ডা থানার পুলিশের কাছে পুরো ঘটনাটি জানানোর জন্য চাপ দেন, কিন্তু মেঘলা কিছুতেই তা করে না। এই ট্রমা থেকে দুজন দুইভাবে বের হওয়ার চেষ্টা করায় তাঁদের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। তারা সোদপুরে ফিরে আসে। অরিন্দম মেঘলা ডাক্তার মাধবীর-সাথে কাজ করা শুরু করেন, ডাক্তার মাধবী সোদপুরেই তার পুরোনো তিনতলার বাড়ির একতলায় একটি পশু আশ্রয়কেন্দ্র চালান এবং প্রাণীদের ইচ্ছামৃত্যু (ইউথানেসিয়া) দেন। ডাক্তার মাধবীকে( ৪৫) শারীরিকভাবে তেমন আকর্ষণীয় না মনে করা সত্ত্বেও অরিন্দম তাঁর সাথে এক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং সেটাও মাধবীর সম্মতি ও ইচ্ছাতেই ঘটে। এদিকে, মেঘলারও একদিন সন্দেহ হয় যে পেট্রাস ও ঈমন মন্ডল বলে ছেলেটি এই আক্রমণের ও ধর্ষণে এর সাথে জড়িত ছিলো। এই সন্দেহ আরও গভীর হয় যখন আক্রমণের অন্যতম অপরাধি ঈমন নামের এক যুবক পেট্রাসের সঙ্গে তাদের সোদ পুরের বাড়িতে আসে এবং পেট্রাসও তাকে নিজের আত্মীয় বলে দাবি করেন। ইমন মন্ডল পরিচয় দেয় নিজেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলে ও ওর পৃথিবী তে কেউই নেই। মেঘলা ঈমনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে অস্বীকার করেন। এতে মেয়ের সাথে সম্পর্ক আরও খারাপ হলে অরিন্দম আবার কলকাতা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কলকাতার বাড়িতে ফিরে অরিন্দম দেখেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে সোদপুরের অপরাজিতা বাড়িতে চুরি হয়েছে। তিনি রিয়ার লেখা ও অভিনীত একটি নাটক দেখতে যান, কিন্তু রিয়ার প্রেমিক অয়ন দ্বারা অপমানিত ও হয়রানির শিকার হয়ে চলে আসতে বাধ্য হন। তিনি রিয়ার বাবার কাছে নিজে গিয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করেন, যার ফলে রিয়ার ছোট বোনের সাথে এক অস্বস্তিকর সাক্ষাৎ হয়, যা সুপ্ত কামবাসনাকে আবার জাগিয়ে তোলে। অবশেষে রিয়ার বাবার সাথে দেখা হলে তিনি অরিন্দমকে জানান যে তাঁর ক্ষমা করাটা বড় কথা নয়; রিয়াকে নিজের পাপমোচনের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।
উপন্যাসের শেষের দিকে মেঘলা অরিন্দম ও মাধবী আবার দিল্লির নয়ডার খামারে ফিরে আসেন। ধর্ষকদের মধ্যে একজনের ঈমনের মাধ্যমে মেঘলা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, তবে অরিন্দমের মেঘলাকে গর্ভপাতের পরামর্শ মেঘলা বারে বারেই উপেক্ষা করেন। ঈমন একপর্যায়ে পেট্রাসের সাথে থাকতে শুরু করে এবং মেঘলার স্নানের নগ্ন দৃশ্য প্রায়ই চুরি করে দেখে। মেঘলা সেটা জানতে পারে অরিন্দম তাকে ধরে ফেললে। মেঘলা কিন্তু অরিন্দমকে কোনো প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত রাখেন। অরিন্দম অনুমান করেন যে শেষ পর্যন্ত মেঘলাকে ঈমন বিয়ে করবে এবং নিজেদের কেনা জমি ও পৈতৃক বাড়িতিও তাঁর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হতে হবে; মেঘলা ও যেন তার এই নিয়তিকে মেনে নিয়েছেন। অরিন্দম আবার ফিরে আসেন ও মাধবীর-এর সাথে কাজ করা শুরু করেন, যেখানে তিনি একটি অবাধ্য পথকুকুরকে এতদিন ইউথানেসিয়া থেকে বাঁচিয়ে আসছিলেন ও । উপন্যাসটি শেষ হয় যখন অরিন্দম শেষ পর্যন্ত সেই কুকুরটিকে মাধবীর-এর ইচ্ছামৃত্যুর হাতে সঁপে দেন।
মেঘলা পরে নার্সিং হোম এ একটি কন্যা সন্তান এর জন্ম দেয়।
মূল থিম
উপন্যাসটির কেন্দ্রে থাকবে প্রশ্নটি:
“একজন মানুষ যখন সমাজের চোখে একবার ‘দোষী’ হয়ে যায়, তখন কি তার নিজের কাছে নির্দোষ থাকার কোনো অর্থ থাকে?”
পটভূমি
সোদপুর এর পূর্বপল্লি এখানে শুধু পটভূমি নয়—একটি জীবন্ত চরিত্র। পুরনো একতলা বাড়ি, তিন তলা বাড়ি। কলোনি। নতুন হাই রাইস ফ্ল্যাট, রেললাইন,। পুকুর।, গলির চায়ের দোকান, রাজনৈতিক মঞ্চ, ক্লাব, মন্দির-মসজিদ, আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী, পুরনো উদ্বাস্তু পরিবার ও কলোনি এবং নতুন মধ্যবিত্ত—সব মিলিয়ে একটি গতিশীল পরিবর্তনশীল শহরতলি।
প্রধান চরিত্র
১. অরিন্দম মুখোপাধ্যায় — ৫৮
কলকাতার একটি নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি ও কম্পারেটিভ লিটারেচার সাহিত্যের নামকরা অধ্যাপক।একসময় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুর ওপর তাঁর বক্তৃতা শুনতে বাংলা ও ইংরেজি মাস্টার্স ক্লাসের ছাত্ররা ভিড় করত। এখন এই বয়সে তাঁর ক্লাসে ছাত্রদের আগ্রহ ক্রমশ কমছে।
অরিন্দম অত্যন্ত শিক্ষিত, ডক্টরেট, ও কলকাতা বিশ্ববি্যালয়ের ডিলিট ডিগ্রি ধারি লিটারেচারে। আত্মমগ্ন এবং নিজের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অসম্ভব অহংকারীও ছিলেন।
তার স্ত্রী বহু বছর আগে তাঁকে ডিভোর্স দিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। এখন একমাত্র মেয়ে—মেঘলা(২৮ বছর ) তাও সে দিল্লির একবারে প্রান্তিক গ্রামে নয়ডাতে চাকরী করে যেখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের গরিব শ্রেণির বাস করবার জন্য কলোনি ছিল( ১৯৮০ সালে) যারা দিল্লি শহরে গিয়ে নানা রকম কাজ করতো
২. মেঘলা মুখোপাধ্যায় — ২৮ দিল্লিতে নয়ডায় কাজ করে। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই শীতল। যদিও বাবাকে তার হিরো বলে মনে হয়। বিয়ে হয় নি বা করেনি আর করবার তেমন ইচ্ছে নেই ! মা বাবার তিক্ত সম্পর্ক দেখে দেখে সে বড় হয়েছে মা আর মাসীর আদর্শে। অরিন্দম মনে করেন মেঘলা তাঁকে বোঝে না। মেঘলা মনে করে— “বাবা তাদের ভালোবাসেন না, একমাত্র সোদপুরিয়ান লোকজনকেই বাবা ভালোবাসেন। আর মানুষকে শুধু পোস্ট মর্টেম আর ব্যাখ্যা করতেই ভালোবাসেন।”
৩. রিয়া সেন — ৩০
অরিন্দমের কলেজের ডক্টরেট ছাত্রী। খুব বুদ্ধিমতী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বালিগঞ্জের উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের এক মাত্র মেয়ে। সে কবিতা লেখে। নাটক লেখে । অরিন্দমও তার প্রতিভায় মুগ্ধ হন। তাদের সম্পর্ক শুরু হয় সাহিত্য আলোচনা দিয়ে। তারপর তাদের সীমারেখা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়। এর জন্য অবশ্যই রিয়া নিজে দায়ী। রিয়া জানে কী ভাবে একাডেমিক উচ্চতায় উঠতে হয় অন্যকে তেল দিয়ে অথবা ফাঁসিয়ে। নিজেই সে অরিন্দমের বিছানায় যায়।
এই সম্পর্কই উপন্যাসের প্রথম বড় বিস্ফোরণ
৪. ডাক্তার মাধবী পাল — ৪৫
সোদপুরেই পূর্বপল্লীর অরিন্দমের ভেটেরিনারি ডাক্তার প্রতিবেশী। ওনার স্বামী মারা গেছে। তার লিঙ্গ শিথিলতা ছিলো। মাধবী অনেক ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। কিচ্ছু হয় নি। একটিই মেয়ে মাধবীর ,তিস্তা(২২) । নিজের তিনতলা বাড়ির নিচতলায় একটি পোষা প্রাণীর চিকিৎসাকেন্দ্র ও পোশু আশ্রয়কেন্দ্র চালায়। খুব বাস্তববাদী নারী।অরিন্দমের মতো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মম্ভরিতা তার সহ্য হয় না।
তাদের মধ্যে প্রথমে প্রথমে তীব্র বিরোধ, পরে এক ধরনের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা তৈরি হয় মাধবীর ভেতরে ৫৮ -৫৯বছরের অরিন্দমের প্রতি।
৫. তিস্তা পাল — ২২
মাধবীর মেয়ে। কলেজে পড়ে, কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় একটি বাম পন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মায়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।অরিন্দমকে সে প্রথম থেকেই সন্দেহের চোখে দেখে।
৬. নীলয় দত্ত — ৫৮
সোদপুরের একটি ওষুধের দোকানের মালিক। হোলসেল ওষুধের বিজনেস ।অরিন্দমের স্কুল জীবনের আরেকজন পুরনো বন্ধু। সব খবর সে জানে। কে কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কার ছেলে চাকরি পায়নি, কোন জমি, বাড়ি বিক্রি হচ্ছে—সব।তার দোকানটি হয়ে ওঠে এলাকার অনানুষ্ঠানিক সংবাদকেন্দ্র।
৭. সুমিত ঘোষ — ৩৮
সোদপুরের স্থানীয় ক্লাবের সম্পাদক। দিনে একটি নির্মাণ সংস্থায় কাজ করে, রাতে নাকি এলাকার‘ সমাজসেবক’।তার কাছে নৈতিকতা মানে— “এলাকায় কী কথা উঠছে।” অরিন্দমকে সে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আগে সম্মান করত। পরে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
৮. ইমন — ২৫
এক সময় মাধবীর আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করা এক যুবক । বাবা নেই। মা অন্যত্র কাজ করে। অরিন্দমের সঙ্গে প্রথমে তার অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ইমন অরিন্দমকে অধ্যাপক হিসেবে নয়, একজন বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে।
৯. শেফালি দে — ৮৫
অরিন্দমের সোদপুরের বাড়ির পাশের পুরনো বাড়ির মালকিন। স্বামী মারা গেছে কয়েক বছর আগে।তার বাড়ির একটি অংশ প্রোমোটারকে দিয়ে ফ্ল্যাট বানানোর চাপ চলছে।তিনি সোদপুরের পুরনো সময়ের জীবন্ত স্মৃতি।
১০. রুদ্র পাল — ২৯
মাধবীর ভাইপো। বেকার, রাগী এবং অত্যন্ত প্রবল ভাবে রাজনৈতিক।অরিন্দমের অতীত সম্পর্কে খবর পাওয়ার পর সে ঘটনাটিকে নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে চায়।
—“শেষ ট্রেন” একটি অন্ধকার, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতামুখী উপন্যাস, যার মূল শক্তি কাহিনির ঘটনাগুলোর চেয়ে চরিত্রগুলোর ভেতরের ক্ষত, অপরাধবোধ, নিঃসঙ্গতা এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার মধ্যে।
যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে শক্তিশালী
১. অরিন্দম চরিত্রটি জটিল
অরিন্দমকে সরলভাবে নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে দেখা যায় না। অতীতের সম্পর্ক, সামাজিক অপমান, নিজের মেয়ের সঙ্গে দূরত্ব এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে তার সংকট—সব মিলিয়ে চরিত্রটি বহুস্তরীয়। পাণ্ডুলিপিতে তাকে “সমাজের চোখে একজন অপরাধী” এবং নিজের মেয়ের চোখে “এক অপ্রাসঙ্গিক অতীত” হিসেবে দেখানো হয়েছে। যদিও সেটা তিনি নন
২. “শেষ ট্রেন” একটি কার্যকর প্রতীক।
ট্রেনটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়। পাঠকের কাছে এটি ফিরে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়া, নির্বাসন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর প্রতীক হয়ে উঠেছে। কলকাতার ভিড়ের মধ্যেও অরিন্দমের অসহায় নিঃসঙ্গতার বর্ণনা এই প্রতীকটিকে আরও শক্তিশালী করে।
৩. “অপরাজিতা” ও সোদপুরের পরিবেশ কাহিনির আলাদা চরিত্রের মতো
সোদপুরের গলি, নর্দমা, পুরোনো বাড়ি, ১৯৭১-এর স্মৃতি এবং “অপরাজিতা”—এসব মিলে একটি বিষণ্ণ, ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে স্থানটি শুধু পটভূমি নয়; চরিত্রগুলোর অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
৪. মেঘলার কাহিনি উপন্যাসটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে
মেঘলার নয়ডা থেকে সরে এসে নতুন আশ্রয় তৈরি করা, তার মানসিক ভাঙন এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো উপন্যাসের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিককে গভীর করেছে। বিশেষ করে সহিংসতার পর তার নীরবতা ও ভয়কে কাহিনির কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
৫. প্রকৃতি, প্রাণী ও ইউথানাসিয়ার ব্যবহার অর্থবহ
প্রাণী, মৃত্যু, যন্ত্রণা এবং “জীবনের মূল্য”—এই বিষয়গুলো অরিন্দমের ব্যক্তিগত নৈতিক সংকটের সঙ্গে পাশাপাশি চলে। ফলে ইউথানাসিয়া-সংক্রান্ত অধ্যায়গুলোকে পাঠক উপন্যাসের দর্শনগত স্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখবে।
এগুলো কাহিনির প্রয়োজনীয় অংশ হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ঘটনাগুলোর পর চরিত্রের ভিতরে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন কীভাবে পরবর্তী কাহিনিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেই কারণেই আমার মতে, ঘটনার বর্ণনার চেয়ে তার মানসিক ও নৈতিক পরিণতিকে যত বেশি জায়গা দেওয়া যাবে, উপন্যাসটি তত গভীর হবে।
সামগ্রিক পাঠ
লেখকের কাছে “শেষ ট্রেন” মূলত কোনো অপরাধের গল্প নয়; এটি মানুষ কীভাবে নিজের অতীত, অপরাধবোধ, সামাজিক প্রত্যাখ্যান এবং একাকীত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে—তার গল্প।
“শেষ ট্রেন”, “অপরাজিতা”, কুয়াশা, পুরোনো বাড়ি, মেহগনি গাছ, পশুদের যন্ত্রণা—এই মোটিফগুলো একসঙ্গে একটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়:
“মানুষ কি তার অতীত থেকে সত্যিই পালাতে পারে, নাকি শেষ পর্যন্ত সেই অতীতের কাছেই ফিরে আসে? এই প্রশ্নটিই আমার মতে উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী সাহিত্যিক কেন্দ্র।”
শেষ ট্রেন (Sesh Train)
পর্ব ১: পতন ও কলকাতা (অধ্যায় ১ – ৮)
অধ্যায় ১: বক্তৃতামঞ্চ ও শূন্যতা
প্রথম অধ্যায়: বক্তৃতামঞ্চ ও শূন্যতা
চকটা মাঝখান থেকে দু’টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।
কালো শ্লেট-বোর্ডের ওপর খসখসে শব্দে ভেসে উঠেছে লর্ড বায়রনের ‘ডন জুয়ান’-এর একটি ছত্র: “And quiet nights, and overflowing glass...”
ভাঙা চকের বাকি অংশটা দুই আঙুলের চাপে গুঁড়ো হয়ে অরিন্দমের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে আর তর্জনীতে সাদা পাউডারের মতো সেঁটে ছিলো। বিকেল তখন তিনটে বাজে। কলেজের তিনতলার চার নম্বর শ্রেণীকক্ষের বিশাল খড়খড়িওয়ালা জানলা দিয়ে সেপ্টেম্বরের তির্যক রোদ এসে পড়েছে রিয়া সেনের ডান কাঁধে। রোদের ভেতর সূক্ষ্ম ধূলিকণাগুলো অলস গতিতে ভাসছে। যেন সময় এখানে স্থির হয়ে আছে, অথচ জানলার বাইরে, ৩০ নম্বর পার্ক স্ট্রিটের মাদার টেরেসা সরণির দিক থেকে ভেসে আসছে কোনো ছাত্রসংগঠনের মাইকের কর্কশ গর্জন—‘আমাদের দাবি, মানতে হবে... ডিনকে স্মারকলিপি...’
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানলার দিকে একবার তাকালেন। তারপর হাত থেকে চকের গুঁড়ো ঝেড়ে ফেলার জন্য পকেট থেকে একটা পুরনো, নীলচে রুমাল বার করলেন। তাঁর আঙুলের চামড়া খসখসে, নখে চকধূলির সাদা আঁচড়।
“বায়রনকে নিয়ে যখন তোমরা পড়বে,” অরিন্দম খুবই ধীর গলায় বললেন, তাঁর গলা খাঁকারি দেওয়ার প্রয়োজন হলো না, ঘরের সশব্দ নীরবতাই তাঁর কণ্ঠকে টেনে নিল, “....তখন খেয়াল রাখবে, তোমরা একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে পড়ছ না। তোমরা পড়ছ একটা আগুনকে নিয়ে, যে আগুনটা নিজেকে পোড়ানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। বায় রন...”তিনি নামটাকে দুটো খণ্ডে ভেঙে উচ্চারণ করলেন।
ক্লাস রুমের তৃতীয় সারিতে বসে থাকা রিয়া সেন হাতের কলমটা তার ডায়েরির ওপর আস্তে করে নামিয়ে রাখল। তার পরনে একটা হালকা জলপাই রঙের সুতির কুর্তি, চুলগুলো আলগা করে পেছনের দিকে বাঁধা। চোখের কোণে একটু ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টি স্থির অরিন্দমের দিকে।
“স্যার,” প্রথম সারির এক ছাত্র, যার নাম শুভদীপ, ঘড়ি দেখতে দেখতে বলল, “বায়রনের এই যে অতিরিক্ত ভোগবাদ... এটাকে কি তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে কোনো এক ধরনের বিদ্রোহ বলা যায়? নাকি স্রেফ ব্যক্তিগত নৈতিক বিচ্যুতি?”
অরিন্দম টেবিলের কাঠের ওপর হাতদুটো ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। পঞ্চাশ বছরের পুরনো শালকাঠের টেবিলটা একটু কঁকিয়ে উঠল।
“বিদ্রোহ আর বিচ্যুতির মাঝখানের দেয়ালটা কে তোলে শুভদীপ? সমাজ, নাকি যে বিচ্যুত হচ্ছে সে নিজে?” অরিন্দম একটু থামলেন। রিয়া সেনের চোখের দিকে তাঁর দৃষ্টি গেল, কিন্তু তিনি তা ধরে রাখলেন না, চোখ ফিরিয়ে নিলেন ছাদের বিশাল, ধুলোপড়া ব্লেডের সেকেলে(১৯৭০ সালের ) পাখাটার দিকে। “পাপ আর নন্দনতত্ত্বের মধ্যে ফারাকটা খুব সূক্ষ্ম। বায়রন কিন্তু সাধারণ পাপাচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী স্বাধীনতার একজন বন্দি। তিনি জানতেন তিনি ভাঙছেন, এবং সেই ভেঙে যাওয়ার আনন্দটাকেই তিনি কবিতা করে রেখে গেছেন।”
“কিন্তু স্বাধীনতার মূল্য যখন অন্য কাউকে দিতে হয়?” রিয়ার গলা পাওয়া গেল। স্পষ্ট, মৃদু, কিন্তু ঘরে উপস্থিত অন্য তেইশজন ছাত্রছাত্রীর খাতা উল্টোনোর শব্দের চেয়েও স্পষ্ট।
অরিন্দম রিয়াকে দেখলেন। রিয়ার ঠোঁটের কোণে কোনো হাসি নেই।
“স্বাধীনতারও নিজস্ব একটা হিংস্রতা থাকে, রিয়া,” অরিন্দম ডাস্টারটা হাতে তুলে নিলেন। কালো বোর্ডটার ওপর জমে থাকা বায়রনের পংক্তিগুলো এক ঝটকায় মুছে দিলেন। সাদা চকের ধোঁয়া ধোঁয়া গুঁড়ো হাওয়া ঘুরে ঘুরে তাঁর চশমার কাচে এসে জমল। “যে স্বাধীনতা কাউকে আঘাত করে না, তা আসলে স্বাধীনতা নয়, সেটা হলো সমঝোতা।”
বাইরের মিছিলের শব্দটা আরও কাছে চলে এসেছে। ড্রামের আওয়াজ হচ্ছে—ঠাঁ-ঠাঁ-ঠাঁ। শ্রেণীকক্ষের ছাদ থেকে ছোট একটু চুনকাম খসে পড়ল শেষ বেঞ্চের কাছে।
“আজকের মতো এটুকুই…,” অরিন্দম চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন। “আগামী সপ্তাহে আমরা ‘চাইল্ড হ্যারল্ড’ শুরু করব। টেক্সটটা অন্তত দু’বার পড়ে আসবে।”
ছাত্রছাত্রীরা বেঞ্চ ছেড়ে উঠতে শুরু করল। কাঠের চেয়ার পিছলে যাওয়ার ক্যাঁচকোঁচ শব্দ, ব্যাগ গুছোনোর জিপের আওয়াজ, আর বারান্দায় হাজারো জোড়া জুতোর খসখস।
রিয়া উঠল না। সে ডায়েরিটা ব্যাগে পুরল খুব ধীরে ধীরে। অরিন্দম যখন টেবিল থেকে নিজের পুরনো চামড়ার ব্যাগটা তুলে নিচ্ছেন, রিয়া ড্যাসের কাছে এগিয়ে এল।
“স্যার, আমার থিসিসের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ড্রাফটটা...”
“রেখে দাও ডেস্কে,” অরিন্দম ব্যাগের স্ট্র্যাপটা কাঁধে ঝোলালেন। “আমি বাড়ি যাওয়ার সময় গাড়িতে পড়ব।”
“আপনি কি আজ রাতে সোদপুর যাচ্ছেন?” রিয়া প্রশ্ন করল। তার গলায় কোনো বিশেষ কৌতূহল ছিল না, কেবল এক ধরণের যান্ত্রিক অধিকারের সুর।
“হ্যাঁ। শুক্রবারের ট্রাফিকে ট্রামে বাসে ওঠার চেয়ে শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরা সহজ।” অরিন্দম একবার রিয়ার হাতের দিকে তাকালেন। তার কবজিতে একটা পাতলা সোনার বালা, রোদ লেগে ঝিকমিক করে উঠল। “তোমার রিলকে-র ওপর চ্যাপ্টারটা কেমন দাঁড়াল?”
“রিলকে লিখেছেন, সৌন্দর্য হলো আতঙ্কের সূচনা মাত্র,” রিয়া অরিন্দমের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বলল। তাদের মধ্যে তখন মাত্র দু’ফুটের দূরত্ব। রিয়ার শরীর থেকে হালকা চন্দনের বা শ্যাম্পুর সুবাস আসছে, যা কলেজের এই ভেজা স্যাঁতসেঁতে নোনা-ধরা দেয়ালের গন্ধকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দেয়। “আপনি কি বিশ্বাস করেন সেটা, স্যার?”
অরিন্দম রিয়ার চোখের দিকে চাইলেন। এই প্রথম তিনি দৃষ্টি সরালেন না। রিয়ার চোখের মণিতে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যা এই বয়সের মেয়েদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।
“রিলকে কবি ছিলেন, রিয়া। কবিরা আতঙ্ককে সুন্দর করে তুলতে ভালোবাসেন, কারণ জীবনের আসল আতঙ্ক সহ্য করার ক্ষমতা তাদের থাকে না।” অরিন্দম ব্যাগটা ভালো করে আঁকড়ে ধরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। “আসছি।”
“আমি কী কাল দুপুরের দিকে আসব, স্যার? আপনার সোদপুরের বাড়িতে?”
অরিন্দমের পা দরজার কাছে গিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তিনি পেছনে ফিরলেন না।
“কাল শনিবার। মেঘলা দিল্লি থেকে ফোন করতে পারে। তুমি সোমবার বরঞ্চ কলেজেই এসো।”
“সোমবার অনেক দেরি হয়ে যাবে,” রিয়া খুব নিচু গলায় বলল, কিন্তু অরিন্দম ততক্ষণে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন।
বারান্দাটা বেশ লম্বা, যেন কোনো শেষ না হওয়া সুড়ঙ্গ। দু’পাশে উঁচু উঁচু থাম, যার গা থেকে চুনকাম খসে লাল ইট বেরিয়ে পড়েছে। বারান্দার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. বোস। বিভাগীয় প্রধান। পরনে ইস্ত্রি করা সুতির জামা, পকেটে দুটো বলপেন গোঁজা। হাতে এক তাড়া নোটিশ।
“অরিন্দমবাবু, এক মিনিট,” ড. বোস এগোনোর পথ আটকে দাঁড়ালেন।
অরিন্দম থামলেন। “বলুন, বোস সাহেব।”
“আপনি কি শুনছেন না বাইরে কী হচ্ছে?” ড. বোস জানলার দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। বাইরে মাঠে তখন ইউনিয়ন সভাপতি বক্তৃতা দিচ্ছে, সাউন্ডবক্সের চোঙাটা চার নম্বর ব্লকের দিকে ঘোড়ানো। “ইউনিয়ন আবার ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছে। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে গোলমাল পাকাবে।”
“ওদের গোলমাল করার অধিকার আছে তো, বোস মশাই। আমাদের পড়ানোর অধিকার যেমন আছে।” অরিন্দম পকেট থেকে নস্যির কৌটো বার করতে গিয়েও থেমে গেলেন।
“পড়ানোর অধিকার? মানে?”
ড. বোস হালকা হাসলেন, যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, কেবল প্রশাসনিক তিক্ততা। “আপনার সিলেবাসের কী খবর? বায়রন নিয়ে দেখছি তিন সপ্তাহ কাটাচ্ছেন। ফার্স্ট সেমিস্টারের ছেলেরা বলছে, ক্লাসিক্যাল সাহিত্য নাকি তাদের মাথার ওপর দিয়ে সা সা করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আর মার্কসবাদী নান্দনিকতা কবে ধরবেন?”
“মার্কসকে নিয়ে বলার জন্য কলেজে অনেক লোক আছেন, বোস মশাই। আমি বায়রনটা একটু বুঝি। সেটুকুই থাক।”
ড. বোস একটু এগিয়ে এলেন। তাঁর চশমার কাচ বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “আপনার বিষয়ে বেশ কিছু কথা শুনছি অরিন্দমবাবু। আমি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে বলছি, ব্যক্তিগত স্তরে নয় কিন্তু।”
অরিন্দমের বুকটা একবারের জন্য হিম হয়ে গেল, কিন্তু মুখের চামড়ায় তার কোনো ছাপ পড়তে দিলেন না তিনি। “কী কথা?”
“ওই মেয়েটি... রিয়া সেন। ও প্রায়ই আপনার ঘরে থাকছে। ছুটির পরেও। Phd এর রেজাল্ট আউটের মুখে এসব কিন্তু ভালো দেখায় না। কলেজের ভেতর এখন চারদিকে চোখ। স্টুডেন্ট ইউনিয়নও কিন্তু এসব সুযোগ খোঁজে।”
অরিন্দম ড. বোসের চোখের দিকে চাইলেন। একটা মাছি ড. বোসের কানের পাশে ভ্যানভ্যান করছে, কিন্তু ড. বোস হাত দিয়ে সরাচ্ছেন না।
“রিয়া একজন যোগ্য গবেষক, বোস মশাই। ও তুলনামূলক সাহিত্যটাকে ভালোই বোঝে। যদি কোনো ছাত্রী কাজের প্রয়োজনে আমার কাছে আসে, তাকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।”
“উপদেশ হিসেবে নেবেন না, অরিন্দমবাবু,” ড. বোসের গলা আরও নরম, প্রায় বিষাক্ত হয়ে এল। “সিলেবাস শেষ না হলে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ছেলেরা গোলমাল করবে। নন্দনতত্ত্ব বাদ দিয়ে মার্কসকে নিয়েও একটু ভাবুন। আর... ব্যক্তিগত জীবনটাকে একটু সাবধানে রাখুন। বয়স হচ্ছে আমাদের।”
ড. বোস আর দাঁড়ালেন না। হাত থেকে নোটিশের তাড়াটা নাড়াতে নাড়াতে করিডোর ধরে হেঁটে চলে গেলেন। তাঁর জুতোর মচমচ শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে করিডোরে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল।
অরিন্দম সিঁড়ির দিকে এগোলেন। পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ ট্যাক্সিগুলোর সারির ওপর রোদ লাল হয়ে আসছে। শিয়ালদহ স্টেশনে তিনি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন। পায়ের নিচে পিচ জমে শক্ত হয়ে আছে, হাজার হাজার মানুষের চাপ আর ট্রামের চাকার ঘষায় যা মসৃণ।
শিয়ালদহ স্টেশন তখন গমগম করছে। চারপাশের মানুষের ভিড়, বাসি চায়ের গন্ধ, হকারদের চিৎকার—সব যেন একটা বিরাট, চলমান ইঞ্জিনের ভেতরের আওয়াজ।
অরিন্দম প্ল্যাটফর্মের একটা পিলারের পাশে দাঁড়ালেন। ৫টা ৪২-এর শান্তিপুর লোকাল আসবে।
পিলারের গায়ে একটা পুরানো পোস্টার অর্ধেক ছেঁড়া অবস্থায় ঝুলছে—‘মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পান... অভিজ্ঞ জ্যোতিষী...’ পোস্টারের অর্ধেকটা ছিঁড়ে গিয়ে কেবল লেখা আছে: ‘...মুক্তি পান’।
অরিন্দম ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে আবার হাতটা মুছলেন। চকের গুঁড়ো সম্পূর্ণ যায়নি। আঙুলের ভাঁজে সাদা দাগগুলো রয়ে গেছে। তিনি ট্রেনটার দিকে তাকালেন, যা দূর থেকে একটা বিশাল কালো সাপের মতো ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।
লাল আলোটা সবুজ হলো।
ইঞ্জিনের হুইসেলটা যেন পুরো স্টেশনটাকে দু’ভাগে চিরে দিল। অরিন্দম ভিড়ের ধাক্কায় এগোতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, এই যে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনের দরজায় ওঠার জন্য কনুই দিয়ে একে অপরকে ঠেলছে, এদের কারো নিজস্ব কোনো গন্তব্য নেই। এরা কেবল একটা চাকার সঙ্গে বাঁধা পড়ে ঘুরছে।
তিনি কামড়ায় উঠলেন। হাতল ধরে দাঁড়ানোর পর তাঁর মনে হলো, রিয়া সেনের বালাটার ঝিকমিকানি এখনো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর ড. বোসের সেই কথাটা—“বয়স হচ্ছে আমাদের।”
অরিন্দম ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের আঁধার নেমে আসা কলকাতার দিকে চাইলেন। রেললাইনের পাশের বস্তিগুলোতে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। উনুনের ধোঁয়া কুয়াশার মতো হাওয়ায় ভাসছে।
তাঁর মনে হলো, তিনি একা নন। কিন্তু এই ট্রেনের ভেতরে, এই ভিড়ের গাদাগাদিতে দাঁড়িয়েও, তাঁর চেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ আর এই মুহূর্তে গোটা শহরে দ্বিতীয়টি নেই।
অধ্যায় ২: শৈশবের ছায়া ও প্রথম অপরাধ
বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলার ৩ নম্বর শ্রেণীকক্ষের খিলানযুক্ত কাঠের জানালাটি বহু বছরের পুরনো। তার সবুজ রং চটে গিয়ে নিচে লালচে নোনা ধরা কাঠ বেরিয়ে পড়েছে। বাইরের চত্বরে বৃষ্টি থামার পর কাছের মিউনিসিপ্যালিটির ডাস্টবিনের পাশে একটা হলদেটে, বুকের পাঁজর বের হওয়া নেড়ি কুকুর ভিজা হাড়ের ওপর দাঁত বসানোর নিষ্ফল চেষ্টা করছিল।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানালার রেলিঙে দু’টি হাত রেখে স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন। আঙুলের ফাঁকে ওনার জ্বলন্ত সিগারেটের ছাই জমে উঠেছিল। চকের গুঁড়ো আর পুরোনো কাগজের মিঠে আর্দ্র গন্ধ ভেসে আসছে পেছনের ফাঁকা ক্লাসঘর থেকে কিছুক্ষণ আগেই বায়রন এর কবিতা নিয়ে ক্লাস নিয়েছিলেন। নিচে, কাদার মধ্যে নোংরা জলের ওপর ভেসে থাকা আলোটায় কুকুরটির ছায়া পড়েছিল—অস্বাভাবিক দীর্ঘ, কৃশ এবং একদম একা।
অরিন্দমের মনে হলো, এই ছায়াটা তাঁর নিজস্ব। ৫০ ( ১৯৭১ সালের) বছর আগের একটা বিকেল হুট করে সেই স্যাঁতসেঁতে ডাস্টবিনের গন্ধ ধরে তাঁর নাকের ভেতর ঢুকে পড়ল।
একদিন বিকেলে, বাড়িতে অরূপের অনুপস্থিতিতে, রত্না দেবী অরিন্দমের হাত নিজের দুই হাতে চেপে ধরেছিলেন। কিন্তু এবার তাঁর চোখে কান্না ছিল না; ছিল এক হিংস্র, ভীতু মধ্যবিত্ত নারীর আত্মরক্ষার ছলনা। রোদ মরে আসছিল সোদপুরের ট্রেইন লাইনের পুবদিকে গোসালার কাছে কলোনির সরু গলিটায়। খোলা নর্দমার ওপর সার দিয়ে বসানো শ্যাওলাধরা সিমেন্টের স্ল্যাব। তার পাশ কাটিয়ে, ফুল প্যান্টের তলা কিছুটা গুটিয়ে, ১৭ বছরের অরিন্দম সেদিন উঠে এসেছিল অরূপদের আধো-অন্ধকার একতলা টিনের চালের ঘরটায়।
ঘরের ভেতর ঢুকতেই একধরনের থমথমে সোঁদা গন্ধ নাকে এসে লাগে। পচা সরিষার তেল, দেয়ালের আর্দ্র চুনকাম আর সস্তা স্নো-পাউডারের একটা ভ্যাপসা ট্রপিক্যাল ঘ্রাণ ঘুরে বেড়াতো বাতাসহীন ঘরে।
অরূপ সেদিন বাড়িতে ছিলো না। স্কুলের কে সি স্যারের কাছে বীজগণিত আর জ্যামিতি পড়তে গেছিল। অরূপের বাবা বাড়িতে বাড়িতে রং করার কাজ করতেন। ঘরে তখন কেবল অরূপের মা—রত্না দেবী। কম খরচের ছাপা সুতির শাড়িটা তাঁর, মেদবহুল ৩৬-৩৭ এর শরীরে কিছুতেই ঠিকমতো আঁটসাঁট হচ্ছিল না। পেটের বা দিকের ভাঁজে শাড়ির আঁচলটা ঢাকতে পারে নি। ওনার পিঠ ভর্তি কোকড়ানো চুলে খাঁটি নারকেল তেলের সোঁদা গন্ধ। ড্রেসিং টেবিলের একটা ঘোলাটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটা ভাঙা দাঁতের প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে নিজের কোকড়ানো লম্বা চুলে জট ছাড়াচ্ছিলেন। রিফিউজি হয়ে এসেছিলেন একসময় বাংলাদেশের খুলনা শহর থেকে সদেপুরে
অরিন্দম দরজার তোয়ালে-ঝোলানো কাঠের রডটার পাশে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার বুকের ভেতর সেদিন একটা, ভারী হাতুড়ি পিটছিল। কোনো দ্বিধা ছিল না, কোনো দ্বিধাবোধের অবকাশও ছিল না—ছিল কেবল এক উদ্দাম, কাঁচা বয়সের ক্ষুধা আর নারী শরীরকে জানার তীব্র কৌতূহল।
চিরুনির খসখস শব্দটা হঠাৎ থেমে গেছিলো। ড্রেসিং আয়নার ঘোলাটে কাচে অরিন্দমের ছায়া দেখতে পেয়ে রত্না দেবী ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।
"বাপ্পা? তুই? অরূপ তো তোদের কেসি স্যারের বাড়ি গেছে। বলেনি তোকে? তোর ও তো যাবার কথা সেখানে। যাস নি যে?" অরিন্দম কিছু বলল না। সে স্থির চোখে চেয়ে ছিলো রত্না দেবীর দিকে। রত্না দেবী হাতের চিরুনিটা আলমারির ওপর রাখতে রাখতে শাড়ির আঁচলটা ভালো করে টেনে গায়ে জড়ানোর এক অসম্পূর্ণ চেষ্টা করলেন। তাঁর দুই চোখে ছিল কলোনি পড়ার গৃহিণীদের চিরাচরিত বৈচিত্র্যহীন ক্লান্তি।
"তুই কী বসবি? অরূপের আসতে আসতে ওই পাঁচটা ছ’টা বাজবে। চা খাবি এক কাপ? নাকি কোনো খাতা বই নিতে এসেছিস?"
অরিন্দম দুই তিন পা এগিয়ে গেছিলো। জুতোর সোলে ঘরের মেঝের সস্তা লাল সিমেন্টের ওপর হালকা ঘর্ষণ হয়েছিল। তার নিঃশ্বাসের শব্দ ঘন হয়ে আসছিল।
"কী রে? কথা বলছিস না কেন? অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন আমার মুখের দিকে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি তোর? জ্বর-জ্বারি এলো নাকি আবার?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দেয় না। সে পেছন ফিরে কাঠের দরজার পুরোনো পিতলের ছিটকিনিটা এক টানে তুলে দিল। পিতলের ছিটকিনিটা দরজার খোপে ঢোকার সময় এক তীব্র ধাতব শব্দ করে উঠল—ঠাস!
রত্না দেবী এবার চমকে উঠলেন। হাতের চিরুনিটা টপ করে হাত থেকে খসে মেঝের ওপর গিয়ে পড়ল।
"বাপ্পা! কী করছিস তুই? দরজায় হঠাৎ খিল দিলি কেন? পাগল হলি নাকি রে?" রত্না দেবীর গলায় আতঙ্কের সাথে এক চরম বিস্ময় দানা বেঁধে উঠল। তিনি ঘরের এক কোণে সেলাই মেশিনের টেবিলটার দিকে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
অরিন্দম কথা বলল না। সে দুই পদক্ষেপে দূরত্বটা মুছে দিয়েছিলো। রত্না দেবীর মেদবহুল, নমনীয় দুটো হাত সে এক লাফে শক্ত মুঠোয় জাপটে ধরেছিল। তার কাঁচা, ক্ষুদিত আঙুলগুলো রত্না দেবীর হাতের শক্ত, শাঁখা-পরা চামড়ায় বসে গেছিল।
"ছাড়! বলছি ছাড় আমাকে! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? তুই না অরূপের বন্ধু... আমার ছেলের সমান! তোর মায়ের বয়সী আমি! লজ্জা করে না তোর এই সব করতে আমার সঙ্গে? ছিঃ ছিঃ ছাড় আমাকে বলছি! ছাড়! "
রত্না দেবী পুরো শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে অরিন্দমকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা ও কয়েকবার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রতিরোধের ধাক্কাতে কেমন যেন এক শিথিলতাও ছিল। সামাজিক শাসন আর নৈতিকতার চিৎকার তাঁর মুখে ফুটে উঠলেও, নিজের দীর্ঘদিনের অভাব, অবহেলা আর একঘেয়ে দৈনন্দিন অভাবের জীবনের অন্তরালে যেন এক অজানা আত্মসমর্পণের আকুলতাও জন্ম নিচ্ছিল ওনার ভেতরে ভেতরে।
অরিন্দম তাঁর কোনো কথাই শুনল না। সে তাঁর স্থূল, ভারী শরীরটাকে দেয়ালের চুনকাম-ঝরা দিকে ঠেলে দিয়েছিল। দেয়ালের শুকনো চুন ঝরে পড়ে ছড়িয়ে গেল রত্না দেবীর শাড়ির আঁচলে আর অরিন্দমের ইস্ত্রি করা সুতির জামায়।
"বাপ্পা... শোন... ভগবান তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না রে... তুইও শেষ হয়ে যাবি একদিন... তুই যে আমাকেও শেষ করে দিলি.. ওহ ভগবান ….. ন না না…তুই আমার ছেলের মত! হাতটা সরা ওখান থেকে …ঈশ ঈশ.আমি এসব পারবো না করতে তোর সঙ্গে…না না আমি যে তোর মায়ের মত…"
রত্না দেবীর গলার স্বর কান্নার তোড়ে ভাঙতে শুরু করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে, এক তীব্র বৈপরীত্যে, তাঁর শাখা চুড়ি পড়া হাতের মুঠো দুটো অরিন্দমের পিঠের ইস্তিরি করা জামাটাকেও খামচে খামচে ধরেছিল। অরিন্দম তাঁর ঘামে ভেজা খোলা দুই বুকের গভীর খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়েছিল। প্লিজ মাসীমা প্লিজ…চুমুর পর চুম সেখানে । খোলা বুকের চারধারে । কোনো স্বর্গীয় অনুভূতির স্থান সেখানে ছিল না ; সেখানে ছিল রক্ত মাংসের এক মধ্যবয়স্কা নারীকে দখলের উল্লাস, অপরাধবোধের অতলে ডুবে যাওয়ার এক তীব্র, অপবিত্র আনন্দ। রত্না দেবী ছটফট করেছিলেন কিছুক্ষণ ধরে , অরিন্দমের বাহুডোরের থেকে নিজেকে সরাতে। ধাক্কা দিয়ে সরাতে চেষ্টা করলেন অরিন্দমকে তার শরীর থেকে।তারপর ওনার ভারী শরীরটাও কেমন যেনো অবশ আর স্থির হয়ে এসেছিল। অরিন্দমও রত্না দেবীকে আরও আদর করছিল অনভিজ্ঞ এক পুরুষের মত এখানে সেখানে ওখানে। রত্না দেবী বোবা দুইচোখে তাকিয়ে ছিলেন ১৭ বছরের ছেলেটার মুখের দিকে। কী করছে সে তাকে নিয়ে। ওনার শরীরও জেগে উঠছিল যেনো শীতঘুম ভেংগে। ছেলেটার আঙুলের ডগায় যে কেনো এত সুখ ও আরাম ছিলো। কখন যেন রত্নাদেবীও তার মেদবহুল শরীরের ওপর বাপ্পা ডাক নামের ছেলেটার ফলানো অধিকার গুলোকে মেনে নিতে শুরু করেছিলেন, লজ্জা পেলেও। ।একসময় অরিন্দম কিছুটা জোর করেই রত্না দেবীর নগ্ন দুই জঙ্ঘা ও থাইয়ের মধ্যিখানে কালো ঘাস ভর্তি মাংসল জায়গায় নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইলে রত্না দেবী গুঙিয়ে উঠে দুই হাতে চাপা দিয়ে ফিস ফিস“ না বাপ্পা না আজকে নয় বাবা....আমিও তৈরী নয় আজকে” শোনেনি অরিন্দম সেই বারণ। রত্নাদেবী গুঙিয়ে উঠেছিলেন “ হায় ভগবান…এও কিনা লেখা ছিল আমার কপালে? উঃ লাগছে তো আমার বাপ্পা।.. আস্তে ”
একঘণ্টা পরের নীরবতাটা ছিল সত্যিই খুব ভারী। ঘরের সিলিং ফ্যানের পুরোনো ব্লেডটার ঘড়ঘড় শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। রত্না দেবী তার ঘরের চৌকির এক কোণে বসে হাত দিয়ে শাড়ির কুঁচি আর ব্লাউজ ঠিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। অরিন্দমের শরীরের থেকে নির্গত গলিত উষ্ণ লাভা রত্না দেবীর বস্তিদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল তার সায়াতে। তাঁর চোখের কোণে জল গড়িয়ে এসে নাকের পাশে সস্তা পাউডারের ওপর দাগ তৈরি করেছিলো। মুখে এক প্রচ্ছন্ন গ্লানি ও ভারী আতঙ্কের আর পাপ বোধের ছায়া। অরিন্দম চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে তার শার্টের ও প্যান্টের বোতামগুলো আঁটছিল।
"যা এখান থেকে। এখুনি বেরো।" রত্না দেবীর গলা কাঁপছিল। তিনি অরিন্দমের দিকে না তাকিয়েই মেঝের দিকে মুখ করে বললেন, "আর কোনোদিন এই বাড়ির ত্রি সীমানায় আসবি না তুই। অরূপ আসুক । আমি ওকে আজই সব বলব, তুই যা যা করেছিস আমার সঙ্গে। তোর বাবা মাকেও গিয়ে বলব।" অরিন্দম দরজার ছিটকিনিটা নামাল। কাঠের দরজাটা খোলার সময় হালকা মড়মড় শব্দ হলো। সে বাইরে পা রাখার আগে আরও একবার থামল।
"কাউকেই কিচ্ছু বলবেন না আপনি সেটা আমি ভালোই জানি। ,আপনিও আজকের ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করছেন" অরিন্দমের গলার স্বর অস্বাভাবিক শান্ত ও সমতল শোনালো, যা ১৭ বছরের কোনো কিশোরের গলায় মানায় না।
"মুখ সামলে কথা বল অরিন্দম! তুই আমাকে নষ্ট করে দিলি! আমি পুলিশের কাছেও যাব! ডায়রি লেখাবো তোর নামে" রত্না দেবী গলার স্বর নিচু রেখে ফিসফিস করে চিৎকার করে উঠলেন।
"যান, কে না করেছে যেতে আপনাকে? " অরিন্দম ঘুরে না তাকিয়েই বলল, "পুলিশকে বলবেন যে আপনার ছেলের বন্ধু এসে এই ঘরে... তখন অরূপ কী ভাববে? কাকাবাবুই বা কী করবেন আপনার সম্বন্ধে ? কলোনির লোকই বা কী বলবে? আপনার নামে? ছিঃ ছিঃ করবে…যান পাঁচ কান করুন এটা…. সকল কে গিয়ে বলুন…বসে রইলেন যে….বড়"
রত্না দেবী থমকে গেলেন। কথাগুলো তাঁর গলার কাছে এসে আটকে গেল। তিনি শাড়ির আঁচলটা গালে চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ছিঃ ছিঃ
অরিন্দম বাইরে বেরিয়ে এলো। বিকালের হলদেটে রোদ এসে পড়েছে গোসালার কাছে কলোনির খোলা নর্দমায়। সে নিজের হাতের তালুটার দিকে তাকাল—সেখানে অরূপের মা রত্না দেবীর গালের সস্তা পাউডার, নারকেল তেল আর ওনার ঘামের নোনা গন্ধ লেগে আছে। সে হাতটা পকেটে পুরে নিল। ধুলো উড়িয়ে হেঁটে চলল কলোনির গলি দিয়ে, মাথা নিচু করে, কিন্তু ভেতরটা এক অদ্ভুত, অনমনীয় শক্তিতে পূর্ণ। এই প্রথম সে নারী শরীর দেখেছে। সম্ভগ করেছে।
পরবর্তী কয়েক মাসে সেই ভয়ের দৃশ্যপট নতুন রূপ নিতে শুরু করেছিল।
নিজের ভেতরের, স্বামীকে আর ছেলে কে ঠকানোর অপরাধবোধ আর পাপ করবার ভীতি যখন রত্না দেবীকে রাতের পর রাত ঠিকমত ঘুমোতে দেয়নি, তখন আত্মরক্ষা ও বেঁচে থাকার এক নতুন কৌশল তাঁর ভেতরে জাগতে শুরু করেছিল। কলোনির তার অভাবের সংসার, স্বামীর সামান্য রোজগার বাড়ি ঘর রং করবার মিস্ত্রি হিসেবে, আর ছেলের ভবিষ্যতের টানাপোড়েন তাঁকেও শেখাল কীভাবে অপরাধকেও একটা অস্ত্রে পরিণত করা যেতে পারে। রত্নাদেবী এরপরে ও অরিন্দমকে বারে বারেই অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। একরকম বাধ্যই হতেন বাড়িতে কেউ না থাকলে আর অরিন্দম এই বাড়িতে আসলে, ঘরের দরজায় ভেতর থেকে সিটকানি তুলতে। অরিন্দম কিন্তু খুবই চেষ্টা করত ওনাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে। তখন খুবই অস্বস্তি হতো রত্নাদেবীর অরিন্দমের সেই শৃঙার , চুম্বন গ্রহণ করতে নিজের শরীরে কিন্তু ওনারও যে ওকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিলো না। অরিন্দম আদর করাও শিখে গেছিল নিজে থেকেই , বই পরে ।তাকে কিছু শেখাতে হয় নি।
সেদিনও আকাশ কিছুটা মেঘলা ছিল। কলোনির টিনের চালে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। অরূপ সেদিন স্কুলে হয়তো কোনো ফুটবল ম্যাচের কাজে আটকে গেছে, বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। অরিন্দম আসবে স্কুল পালিয়ে। রত্না দেবী ফোনে ডেকেছিলেন ওকে।
অরিন্দম দরজায় কড়া নাড়তেই রত্না দেবী দরজা খুলে দিলেন। তবে এবার তাঁর চোখে আগের মতো আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি ছিল না। তাঁর পরনে ছিলো একটি পরিষ্কার রঙিন সুতির শাড়ি, চুলে নতুন করে বাঁধন। সিঁথিতে অনেকতা সিদুর, গালে গলায় হালকা সস্তা পাউডার।
অরিন্দম ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিতে হাত দিতেই রত্না দেবী শক্ত গলায় বলে উঠলেন, "ছিটকিনি দিবি না। দিতে হবে না"
অরিন্দম হাত থামিয়ে তাকাল। "কেন?"
"যা বলছি শোন। দরজা ওরকমই ভেজানো থাক।" রত্না দেবী খাটের পাশে রাখা লোহার পুরোনো ট্রাঙ্কটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ট্রাঙ্কের ওপর একটা সস্তা কার্ডবোর্ডের চকোলেটের বাক্স রাখা ছিল।
"তুই ভাবিস একমাত্র তুই খুব চালাক, তাই না রে বাপ্পা?" রত্না দেবী ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে এখন ভীতি নয়, বরং এক হিসেবি মধ্যবিত্ত নারীর ধারালো চাউনি।
"কী বলতে চাইছেন?" অরিন্দম এগিয়ে এলো।
"তুই ভেবেছিস তুই যা খুশি করবি আমাকে নিয়ে , আর আমি মুখ বুজে সব সহ্য করব? তুই আমাকে ভয় দেখাবি অরূপের কথা বলে, অরূপের বাবার কথা বলে? কলোনির লোকের কথা বলে?" রত্না দেবী চকোলেটের বাক্সটার দিকে ইঙ্গিত করলেন। "ওটার ভেতরে কী আছে জানিস তো?"। অরিন্দম বাক্সের দিকে তাকাল, তারপর রত্না দেবীর চোখের দিকে। "কী আছে ওটাতে?"
"ছবি, তোর আর আমার কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের" রত্না দেবীর ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত, শুকনো হাসি ফুটে উঠল। "অরূপদের স্কুলের ক্যামেরার কথাটি মনে আছে? যেটা দিয়ে কালীতলার পিকনিকের ছবি তুলেছিলিস তুই ? সেই ক্যামেরাটা দিয়েই গত সপ্তাহে তোর অজান্তেই ছবিগুলো তুলে রেখেছি আমি। তোর আর আমার অসাবধান মুহূর্তের ছবি।
অরিন্দম এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল, কিন্তু সে মুখে তা প্রকাশ হতে দিল না। "আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।"
"মিথ্যে? একদমই নয়" রত্না দেবী একটু এগিয়ে এলেন। তাঁর গলার স্বর এখন ভারী, নিচু ও স্পষ্ট। "পরীক্ষা করে দেখবি? খুলে দেখেই নে তাহলে । এই ছবিগুলো যদি তোর বাবার হাতে গিয়ে পড়ে? যদি তোদের স্কুলের মাস্টারমশাই, হেডস্যার দেখেন? যদি এই কলোনির মোড়ে টাঙিয়ে দেওয়া হয়? তখন তোর পড়াশুনো, তোর স্কলারশিপের কী হবে অরিন্দম? তোর ওই বড় বড় পণ্ডিত হওয়ার স্বপ্নেরই বা কী হবে?"
অরিন্দম রত্না দেবীর মুখের প্রতিটি রেখা লক্ষ্য করল। ঘরের ভেতরের আর্দ্রতার মধ্যে রত্না দেবীর স্বর যেন আরো বেশি ধারালো শোনালো। সে বুঝতে পারল, রত্না দেবী সত্যি ছবি তুলেছেন কি না সেটা খুব একটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো—তিনি এই ফাঁদটা নিখুঁতভাবে কিন্তু পেতেছেন। শিকার আর শিকারির ভূমিকা এক মুহূর্তে উল্টে গেছে। "আপনি কী চান আমার কাছে ?" অরিন্দম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল।
রত্না দেবী একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চাউনি এবার একটু শিথিল হলেও নিষ্ঠুরতা কিন্তু কমলো না। তিনি খাট থেকে অরিন্দমের স্কুল ব্যাগ টা টেনে নিলেন। সেটির চেইন খুলে ভেতরে হাত পুরে দিলেন। "তোর বাবা তোকে তোদের টেস্ট পরীক্ষার বই আর টিউশন ফি দেওয়ার জন্য ১০০টা টাকা দিয়েছিল না কালকে? আমি কিন্তু সেটা জানি। তুই নিজে অরূপকে বলছিলিস কালকে।" রত্না দেবী খাতার ভেতর থেকে চকচকে নীল রঙের নোটটা টেনে বের করলেন। “এই যে….এটা আমার”
"ওটা আমার টিউশন ফি-র টাকা," অরিন্দম হাত বাড়াল। " জহর স্যারকে না দিলে স্যার ইংলিশ ক্লাসে বসতে দেবে না যে।"
"দেবে…দেবেরে," রত্না দেবী নোটটা নিজের শাড়ির আঁচলের খোঁটে শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, "তোর জহর স্যারকে বলবি টাকাটা তোর হারিয়ে গেছে। তোর বাবাও তোকে আবার টাকা দেবে। তোদের তো আর টাকার অত অভাব নেই। আয় আমার কাছে…তোকে এবারে আদর করে দেই…."
অরিন্দম হাত নামিয়ে নিল। সে স্থির চোখে রত্না দেবীর দিকে চেয়ে রইল।
"তুই আমাকে নষ্ট করেছিস বাপ্পা," রত্না দেবী খাটে গিয়ে বসলেন, তাঁর গলায় আবার পুরোনো সেই বিষণ্ণতার সুর ফিরে এলো, কিন্তু আঙুল দুটো টাকার খোঁটটাকে শক্ত করে চেপে ধরে ছিল। "আমাকে এই বয়েসে তোর জোর খাটিয়ে পাপের ভেতর টেনেও নামিয়েছিস। এখন এই সংসার চালাতে গিয়ে আমাকে হাজারটা হিসাব করতে হয়। অরূপের নতুন জামা নেই, ঘরে চাল থাকে না প্রায়ই... এই টাকাটাও আমার দরকার । আমাকে এখন থেকে তুই টাকা দিবি..আমিও খুব আদর করবো তোকে! কেমনতো । "এটা কিন্ত ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে মাসিমা," অরিন্দম ধীরস্বরে বলল।
"এটা ব্ল্যাকমেইল নয় রে বোকা," রত্না দেবী জানালার বাইরে নেমে আসা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন, "এটা শুধু তোর আর আমার মধ্যে একটা হিসাব। তুই আমার শরীর চাস,আমার করা আদর চাস তোর শরীরে। আর আমারও টাকা চাই। তুই যেমন আমাকে ব্যবহার করবি, আর আমিও তোকে ব্যরবহার করব। এতে তোর বাধা থাকার কথা নয় , তাই না?"
অরিন্দম কিছু সময় নীরব হয়ে রইল। মেঝের লাল সিমেন্টের ওপর জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছিল। সে বুঝতে পারল—রত্না দেবীও ওনার অপরাধবোধকে বেঁচে থাকার সুবিধায় রূপান্তর করে নিয়েছেন। এই ঘরে এখন আর কোনো নির্দোষ মানুষ নেই।
অরিন্দম এক ধাপ এগিয়ে এলো। রত্না দেবী কিন্তু এবার আর পিছিয়ে গেলেন না বা সোজা হয়ে বসলেন না। তিনি স্থির হয়ে বসে রইলেন, যেন এই চুক্তির মূল্য তিনি ইতিমধ্যেই আদায় করে নিয়েছেন। রত্না দেবীও মুখ তুলে অরিন্দমের ঠোঁটের নিচে নিজের ঠোঁট রেখে ফিসফিস করলেন” সোনা ছেলে তো তুই …. তাই না?…উমমমম….দুষ্টু…ছেলে। যাও আমার বুঝি লজ্জাটজ্জা থাকতে নেই? ”
"পরের সপ্তাহেও কি আবার টাকা আনতে হবে?" অরিন্দম জিজ্ঞেস করেছিল।
"হু যেদিন বলব, সেদিন আনবি," রত্না দেবী ওনার বুকের শাড়ির আঁচলটা নিজের কোলের ওপরে ফেলে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "আর অরূপের সামনে , অরূপের বাবার সামনে একদমই স্বাভাবিক থাকবি। ওরা যেন এসবের একটুও কিছু বুঝতে না পারে।..বুঝতে পেরেছিস তো? "
অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রত্না দেবীর মুখোমুখি দাঁড়াল। ঘরের ভেতর বৃষ্টি আর সস্তা পাউডারের গন্ধটা আবার ভারী হয়ে উঠল। কোন কথা না বলে, অরিন্দম নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। রত্না দেবী চোখ বুজে মাথাটা পেছনের দেয়ালটায় টিকিয়ে রাখলেন—চুনকামের সাদা গুঁড়ো আবার তাঁর চুলে এসে লাগল, কিন্তু এবার আর তিনি তা ঝেড়ে ফেলার কোনো চেষ্টা করলেন না। অরিন্দমের হাত রত্না দেবীর ব্লাউজের ভেতরে । চাপ । সেটা ছিল ব্ল্যাকমেইল, আবার একই সাথে পাপের বখরা ভাগ করে নেওয়া। রত্না দেবী তাকে শোষণ করছিলেন, আর অরিন্দম সেই শোষণের বিনিময়ে কিনে নিচ্ছিলেন তাঁর ভেতরের পশুর স্বাধীনতা। রত্না দেবী অরিন্দমের চিবুক নেড়ে বললেন “ একটা মোস কোথাকার। “সেদিনই অরিন্দম বুঝেছিল—এই পৃথিবীতে কেউ সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়। পাপ যখন লেনদেনে পরিণত হয়, তখন অপরাধবোধের তীব্রতা কমে গিয়ে জন্ম নেয় এক নিষ্ঠুর পারস্পরিক নির্ভরতা।
পরবর্তীকালেও, রত্না দেবীর এই দাবি কেবল ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছর তিন পর হবে অরিন্দম তখন ইংরেজি অনার্সে প্রেসিডেন্সি থেকে BA ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে, বসন্তের ছুটিতে অরূপদের পরিবারের সঙ্গে বাসন্তী ও সুন্দরবনের প্রান্তঘেঁষা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছিল অরিন্দম। অরিন্দম যে যাবে তাদের সঙ্গে সেটা কিন্তু রত্না দেবী মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু ওনার উপায়ও ছিলো না। ছেলে অরূপের বায়না আর জেদ ছিলো যে ওর স্কুলের বন্ধু অরিন্দমও তাদের সঙ্গে যাবে। অরূপের বাবার ও আপত্তি কিছু ছিলো না। বাধ্য হয়েই মেনেও নিতে হয়েছিল রত্না দেবীকে অরিন্দমের যাওয়া তাদের সঙ্গে বেড়াতে।
সেই ভ্রমণের প্রথম রাতেই, কাঠের এক পুরনো দোতলা ডাকবাংলোয় যখন রাতের ডিনার সেরে অরূপ ঘুমিয়ে পড়েছে সারাদিনের পথের ক্লান্তিতে, আর অরূপের বাবাও এক বোতল স্থানীয় তাড়ির নেশায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মধ্যেও নাক ডেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, রাত তখন দুটো আড়াইটে হবে হয়তো অরিন্দম তখন জানালার ফাঁক দিয়ে রত্না দেবীকে ফিসফিস করে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল। রত্নাদেবিও ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন বাপ্পাকে বারে বারেই ফিস ফিস করে অস্বীকার করে দরজা খুলতে ও ওর সঙ্গে যেতে।
“ না এলে কিন্তু আমি এখনই কাকাবাবুকে আর অরূপকে কালকেই বলব, আপনি এতদিন ধরে আমার কাছ থেকে কত টাকা ব্ল্যাকমেইল করে নিয়েছেন," অরিন্দমের হুমকি ছিল ধারালো ছুরির মতো। রত্নাও অস্বীকার করছিলেন বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে। রত্না দেবীর জানাই ছিল বাপ্পার চাওয়া কী হবে এতো রাতে।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে চাপা গলায় ফিস ফিস করে রিস্ক গুলো বোঝাবার পরও যখন বাপ্পা জানালা থেকে নড়ে নি, ,একরকম বাধ্য হয়েই দরজা খুলে-বাইরে এসে অন্ধকারে অরিন্দমের মুখোমুখি। এর পরও অরিন্দমকে বোঝাবার হাজারো আপ্রাণ ব্যর্থ চেষ্টা। এটাই তো ভয় পেয়েছিলেন রত্নাদেবী অরিন্দমকে তাদের সঙ্গে বেড়াতে নিয়ে আসতে। অরিন্দমও নাছোড়বান্দা । কী বা আর করতেন রত্না দেবী? পেছন পেছন রত্না দেবী ডাকবাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন ডাকবাংলোটার পাশেই নদীর ঘাটের দিকে। ঘাটের পারে আগেই একটা ছোট দেশি নৌকা ভাড়া করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল অরিন্দম। অন্ধকারের মধ্যে নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে রত্না দেবী নৌকায় উঠতে খুবই ভয় পাচ্ছিলেন জলে পরে যাবার। না না করছিলেন অনেক বার। নৌকোয় উঠতে গিয়ে জলে পরে যাবার ভয় পাচ্ছিলেন। শেষে অরিন্দম ওঁর হাত ধরে একরকম টেনেই তুলেছিল নৌকায়। নৌকার নোঙর তুলে প্রায় মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে লগি পুঁতে দেওয়া হলো। চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন সেই নদী, নদীর ওপরে আকাশে অজস্র তারা-ওঠা খোলা আকাশ, আর চারপাশে ম্যানগ্রোভের নিঝুম অন্ধকার। দোতলা ডাকবাংলোটা সেই অন্ধকারে অনেক দূরে ছায়ার মত দেখাচ্ছিল। নৌকার পাটাতনে রত্না দেবী হাঁটু মুড়ে বসে ভয়ে ভয়ে আর নদীর শীতের হাওয়ায় কাঁপছিলেন।
"বাপ্পা... এখানে হঠাৎ কেন নিয়ে এলি তুই আমাকে? কেউ দেখে ফেললে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে সেই বোধটা তোর আছে না নেই!" রত্না দেবীর গলার স্বর আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠছিল। অরিন্দম লগিটা কাঠের পাটাতনে শক্ত করে বেঁধে রেখে রত্না দেবীর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসেছিল। অন্ধকারের মধ্যেও তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল।
"কেউ দেখবে না,শুধু আমিই তো দেখব আপনাকে চাঁদের আর তারার আলোয়" অরিন্দম খুব নিচু গলায় বলেছিল "চারপাশে তো শুধু নদীর জল আর জঙ্গল। এখানে আপনি, আমি, আকাশ ভর্তি তারা জল, আর অন্ধকার ছাড়া কেউই নেই, কোনো সমাজও নেই, কোনো নীতি নেই, ভয়ও নেই। "
"তুই না সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস বাপ্পা আমাকে যেনো দেখিস নি তিন বছরে? কী আর বাকী রেখেছিস দেখার ? !" রত্না দেবী পিছিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু নৌকার কাঠের পাড় ওঁর পিঠে ঠেকল। "অরূপ ঘুমোচ্ছে ওপারে, তোর কাকা ঘুমোচ্ছে... তুই আমাকে এইখানে বেড়াতে এসেও ছারবিনা……. ?"
অরিন্দম কোনো জবাব না দিয়ে রত্না দেবীর বা কাঁধের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা ধীরেসুস্থে ফেলে দিল। রাতের নোনা বাতাস এসে লাগল রত্না দেবীর উন্মুক্ত ঘাড়ে ও পিঠে।
" দেখুন সামনে তাকিয়ে, আমাদের বাংলোটাকে ছায়ার মত লাগছে, ওই যে দূরে। চারধারে জল আর জল। ওপরে আকাশে চাঁদ আর কত তারা। চাঁদ টাকেও দেখুন " কখনও এই খোলা আকাশের নিচে ,তারাদের নিচে, কেউ আদর করেছে নাকি আপনাকে? আমি কিন্তু করবো আজকে। দেখি ব্লাউজটা খুলে দেই। “ “ছিঃ আমি পারবো নারে এই পাপ করতে।”
" ন্যাকামি করছেন কেনো? যে পাপের বিনিময়ে আপনি আমার কাছ থেকে প্রায় মাসেই একশো/দুশো টাকা নেন, সেটা বুঝি আজ আবার নীতি আর ভয়ের মুখোশ পরছে? আপনিও তো আমাকে ব্যবহার করতেই চেয়েছেন তাইনা?,। তাহলে আজ এই খোলা আকাশের নিচে পিছপা হচ্ছেন কেন? আসুন তো "
রত্না দেবী কয়েক মিনিটের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। রাতের অন্ধকারের মাঝেই উনি তাকালেন ২০ বছরের অরিন্দমের দিকে। চাঁদের আর তারার আলোয় অরিন্দমের সুগঠিত চওড়া বুক, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর অদম্য পৌরুষের এক উন্মাদ শক্তি যেনো প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। অরিন্দমের পৌরুষের তেজ তো ওনার জানা। গত তিন বছর ধরে অরিন্দম তাকে নিয়ে বিছানায় যায়।
অরিন্দমও হাত বাড়িয়ে রত্না দেবীর পরনের নতুন শাড়ির পেঁচগুলো ওনার কোমড় থেকে ধীরে ধীরে টেনে আলগা করতে শুরু করেছিল। রত্না দেবী প্রথমে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওঁর হাতের গ্রিপে কোনো জোর ছিল না। "বাপ্পা... না...রে…" রত্না দেবী শ্বাস ফেলে ফিসফিস করলেন, কিন্তু ওঁনার গলার স্বরে আর প্রতিবাদ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত সম্মোহন। অরিন্দম রত্না দেবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, "আপনি কী নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না, তাই না? কিন্তু এই নদীর জল সাক্ষী, আজ রাতের পর আপনার ভেতরে আর কোনো অপরাধবোধ থাকবে না।"
রত্না দেবীর চোখ জোড়া অরিন্দমের অবয়বে আচ্ছন্ন হয়ে রইল। ২০ বছরের তরুণ যুবকের শরীরের উত্তাপ, স্পষ্ট পেশির টান আর কোনো বাধা না মানা উদ্ধত ও টান টান পৌরুষের রূপের সামনে রত্না দেবীর মধ্যবয়সী, কামনার বাঁধগুলো যেন আস্তে আস্তে চুরমার হয়ে গেল। ওঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা সামাজিক ভয়, দারিদ্র্যের গ্লানি আর সংসারের ক্লান্তি হারিয়ে গেল মাঝ নদীর হাওয়ায়। রত্না দেবী নৌকার ছাউনির ভেতরে দ্রুত চলে যেতে চাইলেন। পরনে তখন ওনার শুধুই নতুন কেনা সাদা সায়া। আর সবই উন্মুক্ত
নৌকার ছাউনির ভেতরে রত্না দেবীর চাপা গলা উঠলো একসময় "তুই সত্যিই একটা রাক্ষসরে বাপ্পা..." রত্না দেবী একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শাখা পরা হাত দুটো দিয়ে অরিন্দমের গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজেই নিজেকে তুলে দিলেন অরিন্দমের হাতে। ওনার গলায় আর তখন কোনো কম্পন ছিল না, ছিল সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। "আমাকে শেষই করে দে বরঞ্চ তুই..আজকের রাতে.। তোকে নিয়ে আর পারিনা বাপু। সারাদিন কম ধকল যায় নি আমারও।"
তারা ভর্তি খোলা আকাশের নিচে, মাঝ নদীর অন্ধকারে, নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া নোনা জলের হাওয়ায় নৌকার কাঠের পাটাতন জোরে জোরে আর ছন্দে ছন্দে দুলতে লেগেছিল। সেখানে কোনো রকমের লোকলজ্জার আবরণ ছিল না, কোনো বাঁধাধরা গৃহস্থালির চার দেয়ালও ছিল না।কোনো বিছানাও ছিলো না । হঠাৎ কেউ এসে পড়বার ভয়ও ছিলো না। রত্নাদেবীও কী করতেন আর । নৌকার সেই দুলুনিতে জলে পড়ে যাবার খুউব ভয়ও হচ্ছিল ওনার। চোখ বুজে তাই অরিন্দমের বন্য শক্তির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । পরণের নতুন সাদা পেটিকোটের বাঁধন ও একসময় হঠাৎ আলগা হয়ে গোড়ালির কাছে পরে গেছিলো। সামান্য বাধা দিতে চাইলেও টেকেনি আর সেই বাধা। নৌকার প্রতিটি দুলনিতে, দুটি অসম বয়েসে দেহের সংঘাত নদীর নির্জন নীরবতাকে এক অদ্ভুত ও আদিম সুরঙ্গমা এনে দিয়েছিল। রত্না দেবী তার ঘরের ভেতরে যা কোনোদিন পারেননি তার গলা চিরে দিয়ে প্রথমবার রুদ্ধ ও ব্যাকুল সিৎকার হারিয়ে যেতে লাগল গভীর রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার কলতান আর নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ তরঙ্গে।
একবার নয় । তিন তিন বার। সেই প্রথম রত্নাদেবীর মধ্যে এর জন্য কোনো অপরাধ বোধ অনুভূত হয়নি নিজের মধ্যে যা প্রতিবারই আগে হতো সন্তানের বয়েসি বাপ্পার সঙ্গে মিলনে। খারাপও লাগে নি। খিল খিল করে খুবই হাসতে হাসতেই নৌকার পাটাতনের ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে পরে নিজের দুটো পা বাপ্পার চওড়া কাঁধে তুলে দিতে দিতে বলেছিলেন “পারিস ও কিন্তু বটে তুই বাপ্পা। সত্যি কারেরই মোষ একটা তুই। আমার বয়স হয়েছে তো! এই বুড়ো বয়েসে এসে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়লে নিবি তো সেটার দায়িত্ব? নাকি তখন ছেড়ে পালাবি আমাদের। তোর কথা কিন্তু অরূপ বা তার বাবা কেউই টের পায়নি আজ পর্যন্ত, গত তিনবছর ধরে একদিনের জন্যও।“ ওপরের আকাশে এতো যে তারা থাকে সেটা আগে কোনোদিন দেখেন নি রত্না দেবী। মনে মনে অরিন্দমের কাছে কৃতজ্ঞতাও বোধ করছিলেন উনি। “আমি বারাণসী চলে যাবো মাসীমা। রেজাল্ট বের হলে “ “কেনো রে? হঠাৎ এই কথা। আর পছন্দ হচ্ছে না বুঝি এই মোটা বুড়িকে। “ “ফার্স্ট ক্লাসটা পেলে, মাস্টার্স আর পি এইচ ডি করার জন্য ওখান থেকে। আমার বাবাও চাইছেন ওখান থেকেই করি” “আর কোনো টাকাও দিবিনা আমাকে সেটাইতো বলতে চাইছিস? “ “না। দেবো ! যেমন দিচ্ছিলাম। ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে নেবেন আপনার নামে। পাঠিয়ে দেবো স্কলার শিপের টাকা পেয়ে।”
“অরূপ টা পাশ দিয়ে একটা চাকরী পেলেই আর চাইবো না তোর কাছে। ও তো পরীক্ষা দিলো এবার । তোর জন্যেই দিতে পারলো। “
ও
স্মৃতির দ্বিতীয় তরঙ্গটা ভেসে এল বেনারস থেকে।অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানালার রেলিঙে সিগারেটের শেষ অংশটা চেপে নেভাল। ঠোঁটে ভেসে উঠল এক বিষাদময়, নীরব হাসি। স্মৃতিটা এবারে হাত বদলে চলে গেল বেনারসের ঘাটগুলোতে। সেটা আশির দশকের প্রথম দিকে। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে (BHU) তখন অরিন্দমের মাস্টার্স ও ডক্টরেটের জন্য গবেষণা চলছে। ১৯৪৭-এর দেশত্যাগী এক রিফিউজি কলোনির মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান অরিন্দমের পরনে থাকত ইস্তিরি করা সুতির পায়জামা আর দেশী সুতোর কুর্তা।
কাশী তে বি এইচ ইউ তে হোস্টেল এর খরচ চালানোর টাকা অরিন্দমের ছিল না । বেনারসের মদনপুরের গলিতে, এক অত্যন্ত বিত্তশালী ও অবিবাহিতা সুন্দরী নর্তকী-বারাঙ্গনা চন্দ্রিমা পান্ডে দেবী—যাঁকে নাকি সবাই রজনী পান্ডে বলে জানত—ওঁর তিন তলা অট্টালিকার নিচতলায় পুরনো কাগজপত্র ও নথি খোঁজার নাম করে থাকার জন্য আশ্রয় পেয়েছিল অরিন্দম। কিন্তু ওঁর মন পড়ে থাকত ওপর তলার ঝাড়বাতির আলোয়, যেখানে সন্ধে নামলেই তানপুরা ও ঘুঙুরের শব্দে এক নতুন নতুন মায়াবী পৃথিবী জেগে উঠত ওপরের তলায়।
বেনারসের মদনপুরের রাত তখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। অসি নদী আর বরুণা নদীর আর্দ্র হাওয়া গলিটার নোনাধরা ইটের খাঁজে খাঁজে একধরনের ভারী জলীয় বাষ্প তৈরি করেছিল। গলির মুখে মোষের তাজা গোবরের টক গন্ধ আর মঠ থেকে আসা মরা বেলফুলের বাসির ওপর চেপে বসেছিল এক চড়া, দমবন্ধ-করা আতরের সুবাস—‘শামামা’ আর ‘খাস’।
অরিন্দম তখন পঁচিশ বছরের পিএইচডি-র গবেষক। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক, চোখে তার মোটা কাচের চশমা, পরনে গোধারা রাস্তার থেকে কিনে আনা সুতির ঢিলেঢালা ইস্তরী করা পায়জামা আর একটা হলুদ রঙের কুর্তা, যার কনুইয়ের কাছে সূক্ষ্ম সুতোর তালি মারা। পকেটে গোনাগেঁতি কয়েকটা সিকি-আধুলি টাকা আর মাথার ভেতরে মাইকেল, হেমচন্দ্র আর বাইরন বব ডিলান এর পংক্তিমালা।
চন্দ্রাণী পান্ডের অট্টালিকার একদম নিচের তলায়, একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে তাঁর ঠাঁই হয়েছিল—১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের সময় বেনারসের কায়স্থ পরিবারের পুরনো কিছু দলিলাদি খুঁজে বের করার গবেষণার অজুহাতে। কিন্তু অরিন্দমের চোখ দলিলের চেয়েও বেশি আটকে থাকত ওপর তলার ঝাড়বাতির আলোয়, যেখানে সন্ধে নামলেই তবলার চাঁটি আর ঝুনঝুন ঘুঙুরের শব্দে এক মায়াবী, ভিনগ্রহের পৃথিবী জেগে উঠত।
মেহফিল তখন ভেঙে গেছে। শেঠ রামকিশোর আর তাঁর সঙ্গীরা সুগন্ধি পানের বাটা আর মেহেন্দির সুবাস পেছনে ফেলে নেমে গেছেন পাইপ দেওয়া সিঁড়ি দিয়ে। তবলিয়া বুড়ো মিরাজ খাঁ তানপুরাটা কাপড়ের খাপে পুরতে পুরতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলেন।
অরিন্দম সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেছিলেন। তাঁর পায়ের চটি দুটো সিঁড়িতে কোনো শব্দ তৈরি করছিল না; কিন্তু তাঁর বুকের ভেতরের ধুকপুকানি যেন নীরব অট্টালিকাটায় প্রতিধ্বনি তুলছিল।
চন্দ্রাণী পান্ডের কামরার খাসিয়াত কাঠের ভারী দরজাটা আধভেজানো ছিল। ভেতরে আতরের ধোঁয়া আর মোমের চর্বি পোড়ার গন্ধ একধরনের নিবিড়, ঝিমঝিম আবহাওয়া তৈরি করেছে। ঘরের মেঝেতে বিছানো ফারসি গালিচার ওপর আতর আর সুরার পাত্র উল্টে পড়ার মেটে দাগ।
ত্রিশ বছরের চন্দ্রাণী দেবী তখন মেহফিলের জাঁকজমক ঝেড়ে ফেলছিলেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের রূপোর থালা থেকে একটা একটা করে ভারী অলঙ্কার খুলে রাখছিলেন। তাঁর পরনে লাল আর সোনালি কাথিয়াওয়াড়ি বেনারসি শাড়ি, যার রেশমি তন্তুর খসখস শব্দে ঘরের বাতাস থরথর করে কাঁপছিল।
“কভি আপনে কামরে সে বাহার নিকলে হো, শায়র সাহেব?”
চন্দ্রাণী পান্ডে পেছনে ফেরেননি। বেলজিয়াম কাচের ঘোলাটে আয়নার প্রতিফলনেই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন্দমকে। চন্দ্রাণীর গলার স্বর ছিল পান-জর্দার রসে ভারী, অথচ অদ্ভুত এক নিরাসক্ত বিদ্রূপে ভরা।
অরিন্দম একপা একপা করে ভেতরে এলেন। তাঁর শুকনো জুতোর সোলে মেঝের সুতি গালিচায় একটু ধুলো ঝরল। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন চন্দ্রাণী দেবীর বিশাল কাঠ-খোদাই করা পালঙ্কের ঠিক নিচে, চন্দ্রাণীর মেহেন্দি-পরা খালি পায়ের কাছাকাছি।
“আমি... আমি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলাম, চন্দ্রাণী দিদি,” অরিন্দমের গলা কেঁপে গেল। তাঁর দুই হাত উরুর ওপর শক্ত হয়ে বসে রইল। “আজ শেঠজি যখন তোমাকে ওই শাড়িটা উপহার দিচ্ছিলেন... আর তুমি ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসছিলে... আমার মনে হচ্ছিল আমি শ্বাস নিতে পারছি না।”
চন্দ্রাণী পান্ডে হাতের ভারী মুক্তোর কানের দুলটা সাবধানে মখমলের বাক্সে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর পিঠের ওপর ছড়ানো কালো ঘন চুল, যার মধ্যে জুঁই ফুলের বাসি মালাটা তখনও একটু ম্লান সুবাস ছড়াচ্ছে।
“তুমি শ্বাস নিতে পারছ না, অরিন্দম?” চন্দ্রাণী নিচু হয়ে অরিন্দমের চশমার আড়ালের ব্যাকুল চোখের দিকে চাইলেন। তাঁর মুখে কোনো রাগ ছিল না, কেবল ছিল এক গভীর, অভিজ্ঞ নারীর করুণা। “কেন? শেঠজি তো ওঁর নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে শাড়ি কিনেছেন। আর তুমি তো আমার ঘরে আছ স্রেফ একটা পুরনো কাগজের নথি খোঁজার বাহানায়। তোমার তো এখানে শ্বাস আটকানোর কথা নয়।”
“তুমি কি কিছুই বোঝো না চন্দ্রাণী দিদি?” অরিন্দম সামনের দিকে ঝুঁক রাজনৈতিক ও সামাজিক সীমানা ভোলার এক কাঁচা ব্যাকুলতায়। তিনি চন্দ্রাণীর শাড়ির আঁচলের কোণটা কাঁপা হাতে স্পর্শ করলেন। “তুমি এই নরকে কেন আছ? এই লোভী, ভণ্ড পুরুষগুলো প্রতিদিন এসে তোমাকে কেনে... ওরা তোমার শরীরটাকে দেখে টাকার মেপে। আমি... আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাই।”
কথাটা ঘরের ঝিম ধরে থাকা শান্ত বাতাসে যেন একটা পাথর ছুঁড়ে দিল। চন্দ্রাণী পান্ডে হাসলেন না। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা বিষাদময় রেখা টেনে গেল মাত্র। তিনি এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন অরিন্দমের দিকে। অরিন্দমের চশমার কাচ, কাদার দাগ লাগা পায়জামার তলা আর তাঁর সেই সুতির কুর্তা—সবকিছুকে যেন চন্দ্রাণীর চোখ দুটো মেপে নিল এক মুহূর্তে।
তিনি হাত বাড়ালেন। লম্বা, সুন্দর মেহেন্দি-আাঁকা আঙুলগুলো দিয়ে অরিন্দমের চিবুকটা আলতো করে স্পর্শ করলেন—কোনো সোহাগ নয়, যেন কোনো দুর্লভ অথচ তুচ্ছ প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস পরীক্ষা করছেন।
“তুমি আমাকে উদ্ধার করবে, অরিন্দম?” চন্দ্রাণীর গলার স্বর ছিল গঙ্গার জলের মতো ঠাণ্ডা, ধীর এবং ধারালো। “কিস চিজ সে? প্যায়সে সে? ইয়া আপনে ইস ফকিরে রোমান্স সে?”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, চন্দ্রাণী!” অরিন্দমের গলায় একটা তীব্র, আর্ত চিৎকার ফুটে উঠল। তিনি চন্দ্রাণীর হাতটা নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরার চেষ্টা করলেন। “এই লোকগুলো তোমাকে স্রেফ নর্তকী ভাবে, শরীরের পণ্য ভাবে। আমি তোমাকে মর্যাদা দেব। কথা দিচ্ছ আমি তোমাকে আমার স্ত্রী করে রাখব... আমার পড়ার ঘরে, আমার কবিতার পাশে...”
চন্দ্রাণী পান্ডে খুব শক্ত এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন। তাঁর গলার মেহেন্দির রং যেন আলোর বিপরীতে আরও লাল হয়ে উঠেছিল। তিনি ধীরে ধীরে নিজের পূর্ণ উচ্চতা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
“মর্যাদা দেবে? কে? তুমি?” চন্দ্রাণীর গলায় এবার ফুটে উঠল এক কঠিন, অনতিক্রম্য প্রাচীর। “মর্যাদা কী জিনিস সেটা আগে জানো, বাঙালি মশাই? মর্যাদা হলো ধনীদের বিলাসিতা। যাদের পেটে তিনবেলা ভাত আছে, বাক্সে সোনা আছে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভিটে আছে,ব্যাংক ব্যালেন্স আছে ! ভালো চাকরীআছে—মর্যাদা তাদের সাজে। তুমি তো শুনেছিলাম এক রিফিউজি পরিবারের এক কলোনির ছেলে। কে তোমাকে চাকরী দেবে সাহিত্যে phd করে? জানো তোমার মত হাজারো phd ওই ঐশী ঘাটে, কুলির দোকানের যোগান দারি কাজ করে!তোমার পকেটে কালকের রুটির পয়সা নেই, পরনেও দেখ বন্ধুর থেকে চেয়ে চেয়ে পরা পোশাক। আর তুমি এসেছ কিনা আমাকে ‘মর্যাদা’ দিতে?”।
“আমি অন্যান্য পুরুষদের মতো নই চন্দ্রাণীদিদি! আমি তোমার শরীর কিনতে আসিনি!” অরিন্দম হাঁটু গাড়া অবস্থাতেই গর্জে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।
“কিন্তু আমার শরীরটাই তো আসল, শায়র সাহেব!” চন্দ্রাণী রুপোর পানের বাটা থেকে সুপারি আর জর্দার খণ্ড তুলে মুখে পুরলেন। তাঁর চোয়ালও শক্ত হয়ে উঠল। “তুমিও কিন্তু আমার এই শরীরটাকেই চাও। কিন্তু তোমার ভেতরের ওই গরিবের অহংকার আর নগণ্য পণ্ডিতগিরি তোমাকে শেঠজির মতো সোজা কথা বলতে দিচ্ছে না। শেঠজি এসেছিলেন, উনি আমাকে হাজার হাজার টাকার নোটের তোড়া দিয়েছেন, আমার শরীরের প্রতিটা ভাঁজকে ছুঁয়েছেন দেখেছেন। উনি কিন্তু ভণ্ড নন। উনি জানেন উনি কী কিনছেন, আর আমিও জানি আমি ওনাকে কী বিক্রি করছি। হিসাবটা খুব পরিষ্কার এখানে।”। চন্দ্রাণী একধাপ এগিয়ে এলেন। তাঁর বেনারসির রেশমি শায়ায় অরিন্দমের মুখটা প্রায় ঢেকে গেল। “আর তুমি?” চন্দ্রাণী নিচু হয়ে অরিন্দমের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, যার মধ্যে জর্দার ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে এল, “তুমি দরিদ্র এক ছাত্র বি এইচ উ তে, তাই তুমি আমাকে কবিতা দিয়ে, প্রেমের বড় বড় গল্প দিয়ে কিনতে এসেছ। তুমি চাও বিনামূল্যে, স্রেফ দুটো মিঠে কথার বিনিময়ে আমার এই শরীরটাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে বিছানায় হাসিল করতে—তোমার কয়েকটা বাচ্চা আমার গর্ভে জন্ম দিতে যাতে তোমার অহংকার তৃপ্ত হয় যে একজন ‘পণ্ডিত’ একটা ‘বেশ্যা’কে উদ্ধার করেছে। তোমার লালসা শেঠজির চেয়ে কোনো অংশে কম নয় অরিন্দম, কিন্তু তোমার পকেটে রেস্তো নেই বলে তুমি সেটাকে ‘প্রেম’ বলছ।”
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের সমস্ত আলো যেন এক মুহূর্তে নিভে গেল তাঁর চোখের সামনে। তাঁর মুখের ওপরের চশমাটা যেন ভারী লোহার মতো চেপে বসল। তিনি মুখ তুলে রজনী পান্ডের দিকে তাকানোর শক্তি হারিয়ে ফেললেন।
“বেরোও এখান থেকে এখন..আমাকে কিছু দিন ভাবতে দাও,” চন্দ্রাণী শান্ত, সমতল গলায় বললেন। তিনি দরজার দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। “নিজের স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফিরে যাও। দলিলের ওপর ধুলো ঝাড়ো। শরীর নিয়ে ব্যবসা করা নারীদের বায়রনের, বোদোলিয়ার কবিতা শোনানোর অহেতুক চেষ্টা কোরো না। আমাদের আসল দাম বোঝার ক্ষমতা তোমার মতো ফকিরে কবিদের কোনোদিন হবে না।”
অরিন্দম ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর পা দুটো যেন আর তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তিনি দরজার দিকে এগোলেন, মাথা নিচু করে।
তিনি ঘরের সীমা পার হওয়ার আগেই পেছন থেকে রজনী পান্ডে ভারী কাঠের দরজার পাল্লা দুটো এক টানে টেনে নিলেন।
ঠাস! এক তীব্র, ধাতব শব্দে দরজার পিতলের ছিটকিনিটা খোপে ঢুকে গেল। ঠিক সেই একই শব্দ—যা তার ১৭ বছর বয়সে সোদপুরের রত্না দেবীর ঘরের টিনের চালের নিচে শুনেছিলেন তিনি। যে শব্দটা মানবজীবনের সমস্ত রোমান্টিকতাকে চুরমার করে এক নগ্ন, নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অরিন্দম বাইরে বেরিয়ে এলেন। রাতের কাশী তখন এক শ্মশানের মতো নীরব। তিনি হাঁটতে হাঁটতে অসি ঘাটের ধাপে এসে বসলেন। গঙ্গার ঘোলা জল রাতের অন্ধকারে কালির মতো দেখাচ্ছিল। ঘাটের চাতালে শীতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকা দুটো কুষ্ঠ রোগী আর দুটো অভুক্ত কুকুরের ঠিক পাশাপাশি তিনি পা ছড়িয়ে বসলেন। পকেটে থাকা ভিজে দেশলাইয়ের বাক্সটা বার করে তিনি এক কাঠিতে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। সেই অন্ধকার ঘাটে বসে, গঙ্গার মনিকর্নিকা ঘাট থেকে ভেসে আসা চিতার পোড়া গন্ধের ভেতর অরিন্দমের মনে হলো—ক্ষমতা আর লালসার এই পৃথিবীতে ‘প্রেম’ আসলে এক সুন্দর, আত্মপ্রবঞ্চনামূলক মিথ্যে ছাড়া আর কিছুই নয়। চন্দ্রাণী পান্ডে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন তখনও দরিদ্র ও দুর্বল এক ডক্টরেট করা ছাত্র ইংরেজি সাহিত্যে; আর সোদপুরের রত্না দেবী তাঁর নিচে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, কারণ অরিন্দমের কাছে ছিল তাঁর গোপন পাপের ব্ল্যাকমেইলের শক্তি। দুটি ঘটনার ভেতরেই কোনো স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল না; ছিল স্রেফ ক্ষমতা, সম্পত্তি আর টিকে থাকার হিংস্র লেনদেন। অরিন্দম চশমাটা খুলে হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে বসে রইলেন। গঙ্গার হাওয়া তাঁর কনুইয়ের তালি দেওয়া শার্টের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে তাঁর হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিয়ে গেছিলো সেদিন।
"স্যার?"
শ্রেণীকক্ষের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে রিয়া সেন। তার পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার, হাতে তুলনামূলক সাহিত্যের কিছু মোটা খাতা। তার চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি—বুদ্ধিমত্তা ও আকর্ষণের এক বিপজ্জনক মিশ্রণ।
অরিন্দম ধীরেসুস্থে জানালার রেলিঙ থেকে সরিয়ে নিলেন নিজেকে। তিনি আয়তাকার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালেন। ডাস্টবিনের পাশের সেই কুকুরটি তখন গলি পার হয়ে চলে গেছে। বর্ষার মেঘলা আলোয় ক্লাসঘরের দেয়ালগুলোকে এক বিশালাকার খাঁচার মতো মনে হচ্ছে।
"বলো রিয়া। বোদলেয়ারের অংশটা শেষ করলে?" অরিন্দম তাঁর টেবিলে রাখা কাঠের চেয়ারটায় গিয়ে বসলেন। তাঁর স্বর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, সংযত এবং একজন সম্মানীয় অধ্যাপকের মতোই ভারী। রিয়া এগিয়ে এলো। সে টেবিলের ওপর খাতাগুলো রাখল। তার হাত থেকে এক হালকা, অচেনা পারফিউমের গন্ধ ভেসে এলো—যা রজনী পান্ডের আতর বা রত্না দেবীর নারকেল তেলের মতো নয়, কিন্তু একই ভাবে আদিম ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে।
"স্যার, বোদলেয়ার লিখেছেন—'পাপের পথটাই সবচেয়ে সুন্দর, কারণ সেখানে কোনো বিচারক থাকে না।' এটা কি সত্যিই সম্ভব, স্যার? মানুষ কি পাপের ভেতর দিয়ে নিজের স্বাধীনতা খুঁজে পেতে পারে?"
অরিন্দম শান্ত চোখে রিয়ার দিকে তাকালেন। মেয়েটির চিবুকের গড়নে এক অদ্ভুত জেদ রয়েছে। তিনি মেহগনি কাঠের ওপর নিজের ডেনিম শার্ট পরা হাত দুটো রাখলেন।
"স্বাধীনতা কোনো উপহার নয় রিয়া," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে বললেন, যেন নিজের সাথেই কথা বলছেন। "ওটা একটা খেসারত। যখন তুমি জানবে তুমি অপরাধ করছ, এবং তবুও তুমি থামবে না—তখনই তুমি বুঝতে পারবে তুমি কতটা স্বাধীন, আর কতটা একা।"
রিয়া এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে অরিন্দমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের কোণে ঝুলতে থাকা পাখাটা একটানা একঘেয়ে শব্দে ঘুরে চলেছে—যেন সময়ের চাকা, যা সোদপুর এর নর্দমা, বেনারসের ঘাট আর কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের এই ক্লাসঘরকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
অধ্যায় ৩: সীমানা অতিক্রম
ঘরের কোণে রাখা অনেক বছরের পুরনো পিয়ানোটার ওপর ব্রাসের তৈরিল্যাম্পটা জলছাপ তৈরি করেছিল হলুদ দেয়ালে। বাইরে বিডন স্ট্রীট এর রাস্তা জুড়ে দুপুরের রোদ থিতু হয়ে বসছে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা হালকা বৃষ্টি হয়ে গেছে; স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটির গন্ধ আর খোলা জানলা দিয়ে আসা ছাতিম ফুলের ঝাঁঝালো সুবাস ঘরটায় একধরনের ভারী, ঘুমঘোর আবহাওয়া তৈরি করেছে। অরিন্দমের বিডন স্ট্রীট এর স্টাডি রুমের চারপাশের তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো বই—বোদলেয়ার, মালার্মে, জীবনানন্দ, বায়রন, বব ডিলান। টেবিলের ওপর রিয়ার হাতে লেখা ডায়েরিটা খোলা। নীল কালিতে টানা টানা অক্ষরে লেখা কয়েকটা পংক্তি।
অরিন্দম কাচের গ্লাসে বরফের কিউব ফেললেন। টুং করে একটা মিহি শব্দ হলো। ক্রিস্টালের গ্লাসে অ্যাম্বার রঙের তরলটুকু ঢালতে ঢালতে তিনি একবার রিয়ার দিকে তাকালেন।
রিয়া সোফার কোণে বসে ছিল। তার একহাতে পাতলা রেশমের ওড়নার খুঁট, অন্যহাতটা কোলে রাখা। তার শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গেছে, কাঁধের কাছে ফর্সা চামড়ায় ঘরের আলো পড়ে একটা মসৃণ আভা তৈরি করেছে।
“তুমি বরফ নেবে, না জল?” অরিন্দম গ্লাসটা রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
রিয়া চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা প্রশ্রয়ও। সে গ্লাসটা হাতে নিল, তবে পানের জন্য নয়; স্রেফ হাত রাখার একটা অবলম্বন হিসেবে। বরফঠাণ্ডা গ্লাসের গায়ে তার আঙুলগুলো ভিজে উঠল।
“স্যার, আমি তো সচরাচর... এসব খাই না,” রিয়া নিচু গলায় বলল।
“সবকিছুরই একটা প্রথমবার থাকে, রিয়া। তাছাড়া এটাকে মদ ভাবারও দরকার নেই। এটাকে ভাবতে পারো বোদলেয়ারের সেই শার্দুল-রঙিন বিষ—যা মানুষের রক্তে নামলে চেতনার ভেতরের বন্ধ দরজাগুলো একটা একটা করে খুলে যায়।” অরিন্দম নিজের গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে রিয়ার মুখোমুখি কাঠের রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন।
টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পের আলোয় রিয়ার চোখের মণি দুটো যেন দুটো কাচের গুলির মতো দেখাচ্ছিল।
“আপনি বোদলেয়ারের ‘ফ্লেয়ার দ্যু মাল’ (Les Fleurs du mal)-এর কথা বলছেন?” রিয়া গ্লাসটা সামান্য ঘুরিয়ে বলল। “কিন্তু বোদলেয়ার তো পাপকে নন্দনতত্ত্বের রূপ দিয়েছিলেন। তিনি সৌন্দর্যকে খুঁজেছিলেন সমাজের। পচনের ভেতর, ব্যাধির ভেতর। জীবনানন্দও তো একভাবে তাই করেছিলেন... ‘শবকাটা ঘরের এক পাশে’ বসে থাকা সেই অমানবিক বিষণ্ণতা।”
অরিন্দম একটু হাসলেন। তাঁর হাসিতে একধরনের শান্ত, আত্মবিশ্বাসী প্রশ্রয় ফুটে উঠল।
“জীবনানন্দ বা বোদলেয়ার—কেউই সমাজকে তোষামোদ করতে লেখেননি, রিয়া। সাধারণ মানুষ যাকে পাপ বলে, শিল্পী তাকে দেখে কেবলই উপাদানের বিশুদ্ধতা হিসেবে। একটা গোলাপ যতটা সত্য, কানাগলিতে পড়ে থাকা পচা লাশের গন্ধও ততটাই সত্য। তুমি তোমার ডায়েরিতে যে কবিতাগুলো লিখেছ, সেখানেও তো আমি সেই একই রকমের ছটফটানি দেখছি।”
অরিন্দম সামনে ঝুঁকলেন। তাঁর হাত পৌঁছে গেল রিয়ার খোলা ডায়েরিটার ওপর। তাঁর দীর্ঘ, মেদহীন আঙুলগুলো ডায়েরির পাতার ওপর নামল। রিয়া অজান্তেই একটু সোজা হয়ে বসল, তার শ্বাস সামান্য দ্রুত হলো।
“এই যে লাইনটা...” অরিন্দম নিচু, গম্ভীর গলায় পড়তে লাগলেন, “‘আমার শরীরের ভেতরে একটা অন্য নদী বয়, যার জল মিষ্টি নয়, লোনা... যে জল পান করলে তৃষ্ণা মেটে না, জন্মায়।’—এটা কার কবিতা, রিয়া? জীবনানন্দের? নাকি তোমার নিজের ভেতরের কোনো গোপন স্বীকারোক্তি?”
রিয়া গ্লাসটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখল। তার হাতদুটো হঠাৎই কাঁপছিল। “ওটা... ওটা আমার থিসিসের আনুষঙ্গিক নোট। আমি দেখাতে চাইছিলাম, কীভাবে আধুনিক কবিতায় নারী-শরীর কেবল ভোগের বস্তু না হয়ে আত্ম-অনুসন্ধানের এক অস্বস্তিকর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।”
“তাই? কিন্তু তুমি নিজে কি সেটা বিশ্বাস করো?” অরিন্দম রিয়ার দিকে আর একটু এগিয়ে এলেন। চেয়ার আর সোফার মাঝের দূরত্বটুকু এখন নামমাত্র। “নাকি তুমিও সমাজ আর নৈতিকতার সেই পুরানো খাঁচাটায় বন্দি হয়ে থাকতে চাও, যেখানে শরীরের প্রতিটি ব্যাকুলতাকে ‘পাপ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়?”
রিয়া অরিন্দমের চোখের দিকে চাইল। ওই চোখে কোনো লম্পটতা ছিল না, ছিল এক প্রবল, সম্মোহনী অধিকারবোধ। একজন শিক্ষকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার যে অদৃশ্য তেজস্তূপ, তা রিয়াকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল।
“স্যার,” রিয়া সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত গলায় প্রশ্ন করল, “আপনার কি মনে হয় কবিতা দিয়ে নীতিবোধকে ঢাকা যায়?”
অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা খেলে গেল। তিনি চোখ সরালেন না।
“নীতিবোধ তো তাদের জন্য রিয়া, যাদের শিল্প তৈরি করার ক্ষমতা নেই,” অরিন্দম খুব ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন। “সাধারণ মানুষ তৈরি করেছে নীতিবোধ, কারণ তারা স্বাধীনতাকে ভয় পায়। কিন্তু একজন কবি, একজন শিল্পী—সে যদি নিজের কাম, নিজের ক্ষুধা, নিজের পতনকে সরাসরি স্পর্শ করতে না পারে, তবে তার সৃষ্টি তো স্রেফ শুকনো পাতা।”
কথাটা ঘরের শান্ত হাওয়ায় যেন কোনো ভারী সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ল। রিয়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে অনুভব করল, তার যুক্তির সমস্ত কাঠামো এই ৫৮ বছরের মানুষটার একটা কথার আঘাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
অরিন্দম হাত বাড়ালেন। কিন্তু এবার আর ডায়েরির পাতায় নয়, তাঁর আঙুলগুলো আলতো করে গিয়ে স্পর্শ করল রিয়ার হাতের কবজি। যেখানটায় সোনার সরু বালাটা আটকে ছিল।
রিয়া কিন্তু চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার বিন্দু মাত্র চেষ্টাও করল না, কেবল তার চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল।
“আপনার... আপনার হাতের ছোঁয়াটা খুব ঠাণ্ডা, স্যার,” রিয়া ফিসফিস করে বলল। তার স্বর ছিল প্রায় অস্ফুট।
“কারণ আমি যে বহু বছর ধরে এক ধরণের বরফ জমা শূন্যতার ভেতর বেঁচে আছি, রিয়া,” অরিন্দম থামলেন না। তাঁর আঙুলগুলো ধীর গতিতে রিয়ার কবজি বেয়ে উঠছিল কনুইয়ের দিকে। প্রতিটি স্পর্শ ছিল মেপে নেওয়া, কোনো তাড়াহুড়ো নেই, যেন তিনি কোনো দুর্লভ কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টচ্ছেন অত্যন্ত সাবধানে। “তোমার মতো তরুণী, যার রক্তে কবিতার উত্তাপ আছে... সে কি পারে না এই বরফটাকে একটু গলাতে?”
“এটা ভুল হচ্ছে... স্যার” রিয়া বুক ভরে শ্বাস নিল। তার ভেতরের সুপিরিয়র-ইগো বা সামাজিক অনুশাসন যেন শেষবারের মতো একটা দুর্বল প্রতিবাদ জানাতে চাইল। “বিশ্ববিদ্যালয়... আপনার বয়স... আমার কেরিয়ার... অয়ন…. যদি কেউ জানতে পারে এসব?”
“জানতে পারা আর থাকার মধ্যে অনেক তফাত, রিয়া,” অরিন্দম একেবারে রিয়ার মুখের কাছাকাছি মুখ নেমে এলেন। রিয়ার রেশমি চুলের চেনা সুবাস, তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছন্দ অরিন্দমের প্রৌঢ় বয়সের নিভে আসা রক্তে এক অদ্ভুত, বিপজ্জনক জোয়ার এনে দিল। “সমাজ আমাদের কেবল বাইরেটা দেখতে পায়। ভেতরে আমরা কে ও কী, তা কেবল আমরাই জানি। এই ঘরটার বাইরে যে পৃথিবীটা আছে, তা মিথ্যা। এই মুহূর্তটাই আসল।”
অরিন্দম রিয়ার চিবুকটা আলতো করে ধরে ওপরে তুললেন। রিয়ার চোখে তখন এক অদ্ভুত পরাভব। একাধারে দ্বিধা আর ভয়, আর অন্যদিকে প্রথম বার এক নিষিদ্ধ একটা অভিজ্ঞতার দিকে তলিয়ে যাওয়ার তীব্র আকর্ষণ। তার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেলো। জিভের অগ্রভাগ তার ঠোঁট চেটে নিলো বার কয়েক। অপরের পাটির ঝকঝকে দাঁত নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল বেশ জোরেই। তলপেটে চিন চীন ব্যথা। অরিন্দম লক্ষ করলেন সব
অরিন্দম ঝুঁকে এলেন। ঘরের ল্যাম্পের আলোটা তাদের ওপর দুটো দীর্ঘ, মিশে যাওয়া ছায়া তৈরি করল দেয়ালে।
বাইরে তখন আবারও বৃষ্টি নামছে। রেললাইন ধরে একটা মালগাড়ি চলে যাওয়ার ভারী, বুক-কাঁপানো শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। কিন্তু এই বন্ধ ঘরের ভেতর, দু’টি মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ আর চামড়ার সঙ্গে চামড়ার ঘর্ষণের মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোনো পৃথিবীর অস্তিত্ব রইল না।
সীমানাটাও পার হয়েই গেল। নীরবে, অলক্ষ্যে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না। রিয়া ফিস ফিস করে বলল ” এসো”
অধ্যায় ৪: খেসারত ও জালিয়াতি
বিকেলের শেষ আলোটুকু সেমিনার রুমের উঁচু, ফ্রাঙ্কো-ইন্ডিয়ান জানলার গ্রিল টপকে অরিন্দমের ডেস্কে এসে পড়েছিল। ঘরের ভেতরটা পুরোনো বইয়ের কাগুজে গন্ধ, সেঁতসেঁতে প্লাস্টার আর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ফিল্টার কফির বাসে ভারী। কলেজের করিডোর এখন ফাঁকা; শেষ ক্লাসের ঘণ্টা বাজবার পর ছাত্রছাত্রীদের কলরোলও ট্রামলাইনের শব্দে মিলিয়ে গেছে।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় তাঁর ওক কাঠের ডেস্কে একক সান্ধ্য-রাজত্বে বসে ছিলেন। সামনে খোলা MA থার্ড সেমিস্টারের ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের রেজিস্টার খাতাটা। বাঁ হাতে চশমার ফ্রেমটা নাকের নোলকে একটু তুলে ধরে তিনি ডাইনির আঁচড়ের মতো ডগাওয়ালা একটা ফাউন্টেন পেনের ক্যাপ খুললেন।
পৃষ্ঠা এক। রোল নম্বর জিরো-ফোর: রিয়া সেন।
নামটার পাশে উপস্থিতির ঘর খালি। টানা বাইশ টিউটোরিয়াল ক্লাসে রিয়া অনুপস্থিত। থিসিসের খসড়া ( আবস্ট্রাক্ট) অ্যাসাইনমেন্ট জমার ঘরে পেন্সিলে লেখা একটা খসড়া নম্বর—‘১২’। পাশে অরিন্দমেরই নিজস্ব কাটাকুটি। এই নম্বর লাল ফিতেয় বাঁধার নিয়ম মেনে চললে মেয়েটা ওর পি এইচ ডি তো দূর, ডক্টরেট এর প্রথম সেমিনারে ওরাল পরীক্ষার সর্বনিম্ন কাট-অফ মার্কসটাও টপকাতে পারবে না।
অরিন্দম পেনটা তুলে নিলেন। লাল কালির নিবটা কাগজের বুকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে রইল। যেন একটা বিন্দু থেকে দুটো পথ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি লাল কালির ডগা দিয়ে ‘১২’ সংখ্যাটার ওপর একটা নির্ভীক, গাঢ় রেখা টেনে দিলেন। কাটা অক্ষরের ওপর লিখে দিলেন ‘২৮’। পাশে স্বাক্ষরের জায়গায় তাঁর সেই চেনা, ডানা-মেলা ইম্পেরিয়াল দস্তখত—‘এ. মুখার্জী’।
কালিটা একটু চুইয়ে পেছনের পৃষ্ঠায় হালকা একটা ছোপ ফেলল। অরিন্দম ব্লটিং পেপার দিয়ে আলতো করে চাপ দিলেন। নিজের এই জালিয়াতির দিকে চেয়ে তাঁর মনে কোনো ধরনের অনুশোচনা হলো না; কোনো বুকধড়ফড়ও নয়। শুধু এক অদ্ভুত শীতল তৃপ্তি তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। তিনি রিয়ার অনুপস্থিতিকে মেপে দিতে চান না; তিনি রিয়ার সম্ভাবনাকে নিজের হাতে ছাঁচ দিতে চান। যেন এই লাল কালি দিয়ে তিনি রিয়াকে আবার নিজের ক্লাসরুমে, নিজের কক্ষপথে ধরে রাখলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার পেতলের হাতলটা সশব্দে ঘুরে গেল। কোনো কড়া নাড়া নয়, সৌজন্যের কোনো সংকেত নয়—কাঠের ভারী পাল্লাটা দড়াম করে গিয়ে আছড়ে পড়ল ভেতরের দেওয়ালে।
দরজায় দাঁড়িয়ে এক যুবক। ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়স। গায়ে একটু ময়লাটে বাদামি রঙের জ্যাকেট, চুলগুলো পালের বাতাসের মতো উষ্কখুষ্ক। নিঃশ্বাসের টানে তার বুকের ছাতি উঠানামা করছে, আর চোখের তারায় একধরনের উন্মাদ, বাঁধভাঙা রাগ। অয়ন—রিয়ার সহপাঠী, নকশাল আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং বোধ করেন রিয়ার প্রেমিক।
অরিন্দম কলমটা আস্তে করে কাঠের ট্রেতে রাখলেন। চশমার ওপর দিয়ে একবার অয়নকে দেখলেন, যেন ক্লাসের কোনো দেরিতে আসা অমনোযোগী ছাত্রকে মাপছেন। তারপর ধীরেসুস্থে পাশে রাখা সাদা সিরামিকের কাপটা তুলে নিলেন। কফিটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওপরে দুধের পাতলা সর পড়েছে। তিনি তাতে একটি ছোট চুমুক দিলেন।
“ভেতরে আসার আগে অনুমতি নেওয়ার একটা সাধারণ সৌজন্য থাকে, অয়নবাবু,” অরিন্দমের গলার স্বর সমতল, কোনো তরঙ্গ নেই। “বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘরগুলো তোমার ছাত্রসংগঠনের অফিস ঘর নয়।”
অয়ন এগোলো। তার বুটের শব্দে মেঝের ধুলো উড়ল। সে সরাসরি এসে অরিন্দমের ডেস্কে দু’হাত ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। তার মুখের ছায়া অরিন্দমের খাতার ওপর গিয়ে পড়ল।
“সৌজন্য? শেখাচ্ছেন ? আমাকে? ” অয়ন দাঁতে দাঁত চিপল। তার চোয়ালের হাড়গুলো মাংস ঠেলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। “আপনি সৌজন্যের কথা বলছেন, প্রফেসর মুখার্জী? আপনি জানেন রিয়া গত তিন সপ্তাহ ধরে কোথায়? ও ক্লাসে আসছে না। ও নিজের বাড়ির ফোনও ধরছে না, কারও সাথে দেখা করছে না, আলো নিভিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছে! আপনি ওর সাথে ঠিক কী কী করেছেন?”
অরিন্দম কাপটা আবার সসারে ফিরিয়ে রাখলেন। পেতলের টেবিলে সিরামিকের শব্দটা একটা ছোট চাবুকের মতো শোনালো।
“রিয়া একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ৩০ বছর বয়স এবং আমার ডক্টরেট লেভেলের গবেষণার ছাত্রী,” অরিন্দম হেলান দিলেন নিজের চেয়ারে, দু হাতের আঙুলগুলো একসঙ্গে জুড়ে একটা পিরামিড তৈরি করলেন। “তার ব্যক্তিগত জীবনের ছন্দপতন বা তার ক্লাসে না আসার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই, অয়ন। তুমি কি তার আইনি অভিভাবক? যতদূর জানি নয় তাই না?”
“অভিভাবকত্বের ভণ্ডামি করবেন না!” অয়ন গর্জে উঠল। সে টেবিলের ওপর একটা সজোর চাপড় মারল। রেজিস্টার খাতাটা একটু কেঁপে উঠল। “আমি জানি আপনি কে। আমি জানি এই করিডোরে আপনার ওই বুদ্ধিবৃত্তিক ছদ্মবেশের পেছনে কী পচা নর্দমা লুকিয়ে আছে সোদপুরের এক কলোনীতে আর কাশীর বি এইচ ইউ তে। আপনি প্রফেসর নন, আপনি একটা প্রেডেটর! একটা শিকারি চিল!”
অরিন্দমের চোখের পলক পড়ল না। তিনি কেবল সামান্য ভুরু কিঞ্চিৎ কুঁচকালেন, যেন কোনো রচনার বানানের ভুল দেখছেন। “শব্দ চয়নে আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত, অয়ন তোমার। ইংরেজি ভাষা সাহিত্য বিভাগের ছাত্রদের কাছে অন্তত এটুকুই কাম্য।”
“শব্দ আর সাহিত্য দিয়ে আপনি আপনার অপরাধকে ঢাকতে পারবেন না,” অয়ন হাঁপাচ্ছিল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো ডেস্কে খোলা রেজিস্টার খাতার দিকে গেল। লাল কালির সেই টাটকা ‘২৮’ নম্বরটা তখনও আবছা ভেজা।
অয়ন হঠাৎ বাঁ হাত বাড়িয়ে খাতাটার দিকে আঙুল নির্দেশ করল। তার স্বর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, “এটা কী? রিয়া গত এক মাস ধরে একটাও এসাইনমেন্টও জমা দেয়নি। ও টিউটোরিয়াল প্রেজেন্টেশনও দেয়নি। আর আপনি নিজের হাতে ওর গ্রেড শিট ম্যানিপুলেট করছেন? এটা জালিয়াতি নয়?”
অরিন্দম শান্তভাবে ডান হাত বাড়িয়ে রেজিস্টার খাতাটি বন্ধ করে দিলেন। লাল মলাটটা সশব্দে চেপে বসল। “এটা আমার অ্যাসেসমেন্ট, অয়ন। এতে একজন শিক্ষকের নিজস্ব মূল্যায়ন আর ছাত্রের সুপ্ত ক্ষমতার ওপর বিচার থাকে। যা তোমার মতো নকশাল রাজনৈতিক পোস্টার মারা মেধার বাইরে।”
“আপনার সুপ্ত ক্ষমতার বিচার আমি বুঝি স্যার!” অয়ন অরিন্দমের আরও কাছে ঝুঁকে এল। তার নিঃশ্বাসে সিগারেটের বাসি গন্ধ আর উত্তপ্ত ক্ষোভ। “আপনি নিজের পদের ভয় দেখিয়ে, কবিতার আড়ালে, জীবনানন্দের বায়রনের উপমার ফাঁদে ফেলে রিয়াকে ম্যানিপুলেট করেছেন! ও আপনাকে ভয় পায়, আবার একই সাথে নিজেকেও অপরাধী মনে করে। আর এখন আপনি ওর রেজাল্ট বদলে দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে চাইছেন? যাতে ও কোনো অভিযোগ না তুলতে পারে? রিয়ার জীবনটা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
অরিন্দম চেয়ার থেকে উঠলেন না। তিনি টেবিলের ওপর থেকে লাল কালির ফাউন্টেন পেনটা তুলে নিলেন এবং খুব যত্ন করে সেটার ক্যাপ আটকে দিলেন। ধাতব ‘ক্লিক’ শব্দটা ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
“রিয়া কোনো ছোট বাচ্চা নয়, অয়ন। কার সাথে কতদূর যেতে হয়, কোথায় কতটা উজার করতে হয়, কোথা থেকে কী হাসিল করতে হয় , আর কোথায় এসে থামতে হয়—সেটা ও খুব ভালো করেই জানে,” অরিন্দম বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর একদম নিচুর দিকে নেমে গেছে, যেন বরফের ওপর ঘষা খসখসে পাথরের শব্দ। “তুমি ওর হয়ে এই নৈতিকতার ওকালতি করার অভিনয় বন্ধ করো। তোমার এই ক্ষোভ কি রিয়ার জন্য, নাকি তোমার নিজের পুরুষালি অহংকারে আঘাত লেগেছে বলে?”
অয়নের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল, তারপরই সেটা দ্বিগুণ রাগে লাল হয়ে উঠল। সে টেবিল ডিঙিয়ে অরিন্দমের কলার চেপে ধরতে পারতো, কিন্তু অরিন্দমের চোখের ভেতরের সম্পূর্ণ নিরাসক্ত, উদাসীন ভঙ্গিটা তাকে যেন এক অদৃশ্য দেওয়ালে আটকে দিল।
“আমি আপনাকে ছাড়ব না, অরিন্দমবাবু,” অয়ন নিচু অথচ বিষাক্ত কণ্ঠে বলল। “কলেজের গভর্নিং বডি, অ্যান্টি-হ্যারাসমেন্ট সেল, মিডিয়া—সব জায়গায় আমি আপনার এই নোংরা মুখোশটা খুলে দেব। কাল সকালের মধ্যে যদি এই খাতা বদলে না যায়, আর আপনি যদি ইস্তফা না দেন—আমি রিয়াকে নিয়ে প্রেসের সামনেও দাঁড়াব।”
অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি মার্কসশীটের ফাইলটা তুলে নিয়ে নিজের চামড়ার ব্রিফকেসের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। পপ-লকটা বন্ধ করার শব্দ হলো—‘টক’।
“নিশ্চয় যেতেই পারো,” অরিন্দম ডেসকের ওপরের বইগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন। “তবে সত্যের অনেকগুলো মুখ থাকে, অয়ন। যা তুমি এক কথায়, একটা স্লোগানে বলে দিতে পারবে ভাবছ—সত্যিটা ততটাও সহজ নয়। তুমি মিডিয়াতে যেতে পারো, প্রেসে যেতে পারো। কিন্তু দিনের শেষে, রিয়ার নীরবতা কিন্তু তোমার ওই চিৎকারকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারে। সেটা মাথায় রেখে এগিও।”
অয়ন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো মুঠো হয়ে কাঁপছিল। অরিন্দমের এই নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাস, এই সম্পূর্ণ অপরাধবোধহীন নীরবতা তাকে যেন ভেতর থেকে চুরমার করে দিচ্ছিল। অয়ন একটাও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। তার জুতো জোড়ার শব্দ করিডোরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, আর পেছনের কাঠের ভারী দরজাটা আবার সশব্দে বাতাসে দুলতে লাগল।
ঘরটা আবার শান্ত।
অরিন্দম জানলার দিকে তাকালেন। বাইরের আকাশ এখন গাঢ় বেগুনী থেকে কালোয় ঢালু হচ্ছে। রাস্তায় প্রথম ল্যাম্পপোস্টের আলোটা জ্বলে উঠেছে। তিনি টেবিলের কোণে পড়ে থাকা ঠান্ডা কফির কাপটা আবার হাতে নিলেন। তলানিতে পড়ে থাকা তিতকুটে তলোনিটুকু জিভে ঠেকিয়ে জানলার গ্লাসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চাইলেন।
সেখানে কোনো শয়তান নেই, কোনো অপরাধী নেই—কেবল এক বৃদ্ধ অধ্যাপক, যিনি সূর্যাস্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের তৈরি করা নিয়মের ভেতরেই স্বস্তি খুঁজছেন।
অধ্যায় ৫: কাঠগড়ায় সততা
বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির মিটিং রুমটি পুরোনো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ভারী মহিমায় গম্ভীর। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা ডিম্বাকৃতি বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল, যার ওপরে বিগত একশো বছরের কত শত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্কের ধুলো জমা হয়ে আছে। মেহগনির তক্তায় লালচে পালিশের ভেতরে ছাদের পুরোনো ঝাড়বাতিটার হলুদ আলো প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল, যেন এক স্থির রক্তের দীঘি।
টেবিলের একপাশে মুখোমুখি বসে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি কমিটির পাঁচজন প্রবীণ সদস্য। কেন্দ্রে প্রিন্সিপাল—তাঁর চশমার পুরু কাঁচের পেছনে চোখ দুটি উদ্বেগে ও প্রচ্ছন্ন অসন্তোষে ছোট হয়ে এসেছে। তাঁর বাঁ পাশে বসা সোশ্যাল ওয়ার্ক বিভাগের প্রধান, ম্যাডাম মিত্র, যাঁর মুখের প্রতিটি রেখায় এক ধরনের পরিশীলিত এবং কঠোর নৈতিক অনুশাসন স্পষ্ট। ডান পাশে আইনের অধ্যাপক প্রবীণ বোস মশাই, যাঁর আঙুলগুলো অনবরত মেহগনির তক্তায় একটা নির্দিষ্ট ছন্দে আওয়াজ করে চলেছে। টেবিলের একেবারে কোণে, কিছুটা ছায়ায় স্থির হয়ে বসে আছেন রিয়ার বাবা—একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডাক্তার, যাঁর বার্ধক্যগ্রস্ত চেহারায় একটা গভীর অপমান ও ক্ষোভের স্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে।
আর উল্টোদিকে, বিশালাকার মেহগনির অন্য প্রান্তে, একা একটি উচ্চ-পিঠওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
তাঁর মেরুদণ্ড একদম সোজা, যেন কোনো ধাতব রড বসানো আছে সেখানে। হাত দুটো টেবিলের ওপর শান্তভাবে রাখা—আঙুলে কোনো কাঁপুনি নেই, চোখে কোনো চঞ্চলতা নেই। ঘরের ভেতর এক ভারী, নিথর নীরবতা, যা কেবল কোণের পুরোনো পেণ্ডুলাম ঘড়ির টিকটিক শব্দে মাঝে মাঝে সামান্য কেঁপে উঠছিল।
টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখা দুটি ফাইল। একটি রিয়ার নিজের হাতে লেখা তিন পাতার অভিযোগপত্র, অন্যটি সেই লাল কালিতে কাটাকুটি করা পি এইচ ডি ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের গ্রেডশীটের ফটোকপি।
প্রিন্সিপাল হাত দুটো মেহগনির ওপর জোড় করে রাখলেন। তাঁর গলার স্বর কিছুটা খসখসে, যেন খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও শব্দগুলো উচ্চারণ করতে হচ্ছে।
“অরিন্দমবাবু,” প্রিন্সিপাল চশমাটা খুলে লেন্স পরিষ্কার করার অজুহাতে নিচু হয়ে বললেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি খুব কমই এসেছে। রিয়া সেন লিখিতভাবে অত্যন্ত স্পষ্ট অভিযোগ জানিয়েছে যে আপনি আপনার পদ ও পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে প্রলুব্ধ করেছেন। পরবর্তীতে তাকে ভয় দেখিয়ে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে একটি অনৈতিক এবং বিকৃত সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করেছেন। আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় নিয়মভঙ্গ ও ছাত্রীকে মানসিকভাবে শোষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।”
অরিন্দম কোনো নড়াচড়া করলেন না। তাঁর মুখে কোনো বিস্ময়, আতঙ্ক বা অনুতাপের ছায়াও পড়ল না। তিনি খুব ধীরেসুস্থে রিয়ার লিখিত অভিযোগপত্রের প্রথম পাতাটির দিকে তাকালেন।
“আপনার কি নিজের পক্ষে কিছু বলার আছে, অরিন্দমবাবু?” ম্যাডাম মিত্র শাড়ির আঁচলটা কাঁধে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলেন। তাঁর স্বরে প্রশাসনিক শিষ্টাচারের চেয়ে ব্যক্তিগত ঘৃণার স্পষ্ট ছোঁয়া। “একটি মেয়ে, আপনার চেয়ে বয়সে প্রায় অর্ধেক, সে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে আপনি তাকে কবিতার ছলে প্রলুব্ধ করে নিজের বাসায় ডেকে পাঠাতেন। আপনি কি এই শব্দগুলোকে অস্বীকার করছেন?”
অরিন্দম আলতো করে থুতনিতে হাত রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো অভিযোগপত্রের হস্তাক্ষরের ওপর বোলাচ্ছিল।
“অভিযোগপত্রের সাহিত্যিক ভাষাটি বেশ দুর্বল,” অরিন্দম শান্ত, নিচু স্বরে বললেন। গলার আওয়াজে এক অদ্ভুত নিরাসক্ত ভাব, যেন তিনি কোনো প্রথম বর্ষের ছাত্রের ব্যাকরণের ভুল ধরছেন। “রিয়া MA ক্লাসে এর চেয়ে অনেক ভালো গদ্য লিখত। বিশেষ করে ওই 'অনৈতিক' আর 'প্রলুব্ধ' শব্দগুলোর ব্যবহার বড্ড কৃত্রিম আর আটপৌরে শোনাচ্ছে। মনে হয় কেউ ওকে শিখিয়ে দিয়েছে এইসব লিখতে।”
“এটা কোনো সাহিত্য সমালোচনার আসর নয়, অরিন্দমবাবু!” প্রিন্সিপাল মেহগনি টেবিলে সজোরে হাত চাপড়ালেন। ঘরের বাতাসটা চমকে উঠল। “এটা আপনার চাকুরিজীবনের শেষ পরিণতি নির্ধারণের কাঠগড়া! বিষয়টির গাম্ভীর্য বোঝার চেষ্টা করুন! আপনার বিরুদ্ধে ধর্ষণের সমতুল্য মানসিকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি বা নম্বর জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে। আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?”
অরিন্দম সামান্য হাসলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা শীতল রেখা ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। তিনি উল্টোদিকে বসা রিয়ার বাবার দিকে একবার চাইলেন। প্রবীণ ডাক্তার মানুষটি এক মুহূর্তের জন্য অরিন্দমের চোখের দিকে তাকালেন, তারপর পরম ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে জানলার বাইরের অশ্বত্থ গাছটার দিকে চেয়ে রইলেন।
আইনের অধ্যাপক বোস মশাই তাঁর সামনের ফাইলটা একটু এগিয়ে দিলেন। “দেখুন অরিন্দম, আমরা সবাই আপনাকে বহু বছর ধরেই চিনি। আপনার অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার অত্যন্ত চমৎকার। আমরা চাই না এই বয়সে এসে আপনার গায়ে কোনো কালি লাগুক, বা বিষয়টি থানা-পুলিশ আর স্ক্যান্ডাল হিসেবে সংবাদমাধ্যমে যাক। রিয়ার পরিবারও জলঘোলা করতে চায় না, যদি আপনি একটি উপযুক্ত পথ বেছে নেন।”
বোস মশাই তাঁর কোট থেকে একটি টাইপ করা ফোলিও কাগজ বের করে অরিন্দমের দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজটিতে ক্ষমার এক দীর্ঘ, সুসংগঠিত খসড়া টাইপ করা রয়েছে।
“আমরা একটা ড্রাফট তৈরি করেছি,” বোস মশাই বললেন। “এখানে লেখা আছে যে আপনি আপনার অনিচ্ছাকৃত মানসিক ভুল এবং অসুস্থতার জন্য অনুতপ্ত। আপনি যদি এই চিঠিতে সই করেন এবং কমিটির সামনে ও রিয়ার বাবার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান, আর সেই সাথে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন—তবে আমরা এই তদন্ত এখানেই বন্ধ করে দেব। আপনার পেনশন আর গ্র্যাচুইটির টাকাটাও হয়তো আমরা আটকে রাখব না। একটা ‘দুঃখিত’ শব্দ কিন্তু আপনার দীর্ঘকালের সুনাম এবং বার্ধক্যের নিরাপত্তাটা রক্ষা করতে পারে।”
কাগজটা অরিন্দমের হাত থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে এসে থামল। ঘরের সবাই—প্রিন্সিপাল, ম্যাডাম মিত্র, বোস মশাই, এমনকি রিয়ার বাবাও—একসঙ্গে অরিন্দমের দিকে চাইলেন। ঘরের মধ্যকার বাতাসটা যেন অক্সিজেনের অভাবে জমে ভারী হয়ে উঠেছিল।
অরিন্দম ধীরেসুস্থে ডান হাতের তর্জনীটা বাড়ালেন। সেই এক আঙুলের আলতো চাপে টাইপ করা খসড়া কাগজটিকে তিনি ঠেলে মেহগনি টেবিলের এক দূরবর্তী, ধুলো জমা কোণে সরিয়ে দিলেন। যেন একটা মরা মাছিকে তিনি পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন।
“আমি কোনো অভিনয় করব না,” অরিন্দম স্পষ্ট, নির্ভেজাল গলায় বললেন।
ম্যাডাম মিত্র চোখ বড় বড় করলেন। “অভিনয় মানে? আপনি বলতে চান আপনি যা করেছেন তা অপরাধ নয়?”
“আমি একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে আর এক মুক্ত, স্বাধীন তরুণীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম ঠিকই,” অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁর চোখে কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনার নামগন্ধ নেই। “সেখানে শরীর ছিল, প্রলোভন ছিল, তীব্র কাম ছিল, আবার এক ধরনের আলগা আকর্ষণও ছিল। কিন্তু কোনো জোরজুলুম ছিল না। রিয়া যখন আমার বিছানায় এসেছিল, তখন সে নিজের পছন্দেই এসেছিল। আর যখন সে সেটা বন্ধ করতে চাইল, সে আসা বন্ধ করে দিল নিজের ইচ্ছেতেই । সরল ও স্পষ্ট ঘটনা।”
“আর ওই মার্কসশীটের জালিয়াতি?” প্রিন্সিপাল চেঁচিয়ে উঠলেন। “ওটাও কি আপনার স্বাধীন ভালোবাসা?”
অরিন্দম এক মুহূর্ত থামলেন। জানলার বাইরে দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে যাওয়ার ডানা ঝাপটানির শব্দ হলো।
“গ্রেড বদলানোটা ছিল এক দুর্বল মুহূর্তে নেওয়া একটা বোকা বোকা সিদ্ধান্ত,” অরিন্দম বললেন। “ওটা রিয়াকে ধরে রাখার একটা নিচু চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু তার জন্য আমি আপনাদের তৈরি করা এই কৃত্রিম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নাটক করতে পারব না।”
“আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কী বলছেন?” বোস মশাই চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। “আপনি যদি ক্ষমা না চান, তবে গভর্নিং বডি আপনাকে বরখাস্ত বা টার্মিনেট করতে বাধ্য হবে। আপনার সারা জীবনের অ্যাকাডেমিক অর্জন শূন্যে মিলিয়ে যাবে। কোনো কলেজ আপনাকে আর ছোঁবে না। সমাজের চোখে আপনি একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এখনও দশবছর আপনি অধ্যাপনা করতে পারেন-৭২ পর্যন্ত”
অরিন্দম এবার শান্তভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর সুউচ্চ শরীরটা টেবিলের ছায়াকে আরও দীর্ঘ করে দিল। তিনি নিজের জ্যাকেটের বোতামটা আঁটসাঁট করলেন।
“সমাজ বা আপনাদের তৈরি এই সাজানো নৈতিকতার আদালতের এক্তিয়ারকে আমি স্বীকার করি না,” অরিন্দম ধীরপায়ে তাঁর চামড়ার ব্রিফকেসটা হাতে তুলে নিলেন। “আমি যা করেছি, তার প্রতিটি সত্য ও কামনার দায় আমি নিজের ভেতর বহন করব। কিন্তু আপনাদের বাঁচিয়ে দেওয়া পেনশনের টাকা বা সম্মানের ভিক্ষা পাওয়ার জন্য আমি নিজের অস্তিত্বকে ছোট করে ওই কাগজে সই করব না। ক্ষমা চাওয়ার কোনো ভণ্ডামি আমার দ্বারা হবে না।”
“অরিন্দমবাবু!” প্রিন্সিপাল হাত উঁচিয়ে ওঠার আগেই অরিন্দম থামালেন।
“আমার পদত্যাগপত্র কাল সকাল ন-টার মধ্যে আপনার টেবিলে পৌঁছে যাবে,” অরিন্দম বললেন।
তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আর কারও মুখের দিকে তাকালেন না। কোনো অপেক্ষার অবকাশ না রেখে, সোজা শক্ত পায়ে পেতলের ভারী হাতল দেওয়া কাঠের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
বাইরের দীর্ঘ করিডোরে বিকেলের ঠান্ডা রোদ এসে পড়েছে। অরিন্দমের একলা বুটের শব্দ সেই খালি করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—এক অনমনীয়, একা এবং সমাজচ্যুত মানুষের নিজের শর্তে হেঁটে যাওয়ার শব্দ।
অধ্যায় ৬: বহিষ্কার ও কলঙ্ক
কলেজের গভর্নিং বডির আনুষ্ঠানিক সিলমোহর মারা চিঠিটা যখন লাল কাঠের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা হলো, তখন বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।
সেক্রেটারি মহাশয়ের আঙুল থেকে ফাউন্টেন পেনের ঢাকনাটা বন্ধ হওয়ার হালকা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। টেবিলের কোণে রাখা পিতলের পেপারওয়েটটার নিচে চিঠিটা চাপা দেওয়া। পাশে দাঁড়িয়ে ড. বোস। তিনি আলমারির কাচের দরজাটার দিকে তাকিয়ে নিজের সুতির জামার বোতাম ঠিক করছিলেন, যেন ঘরে অরিন্দম বলে কেউ উপস্থিতই নেই।
"আপনাকে আর বিভাগীয় প্রধানের ঘরে বসতে দেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত হবে না, অরিন্দমবাবু," ড. বোস গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, কিন্তু তাঁর স্বরে আত্মসন্তুষ্টির এক পাতলা আস্তরণ স্পষ্ট। " ছাত্র ইউনিয়ন বাইরে ট্রাফিক আটকে দিয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর অফিস থেকে ইতিমধ্যে চারবার ফোন এসেছে। গভর্নিং বডি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আপনাকে বরখাস্ত করা হলো।"
অরিন্দম চিঠিটার দিকে তাকালেন না। তিনি নিজের পুরনো চামড়ার ব্যাগটার জিপটা টেনে বন্ধ করলেন। ব্যাগের ভেতর তাঁর নিজের হাতে লেখা বায় রন-এর লেকচার নোটস আর বোদলেয়ারের কয়েকটা অনুবাদ রয়েছে।
"ধন্যবাদ, বোস মশাই," অরিন্দম শান্ত গলায় বললেন। "আপনাদের আমলাতান্ত্রিক দ্রুততা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হলাম।"
"ব্যঙ্গ করার সময় এটা নয়, অরিন্দমবাবু!" ড. বোসের গলা একটু চড়ে উঠল। "আপনি যা করেছেন, তা কেবল নিজের নয়, এই অর্ধ শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের মুখে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার ডায়েরির অংশগুলো ভাইরাল। খবরের কাগজগুলো তো আপনাকে পশুর চেয়েও অধম বানিয়ে ছেড়েছে।"
অরিন্দম চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। "পশুদের লজ্জা থাকে না কিন্তু বোস মশাই, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে লজ্জা পাওয়ার ভান করে। আপনারাও সেই ভানটাই করছেন।"
তিনি সেক্রেটারির ঘরের ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরোলেন।
করিডোরটা আজ শূন্য, কিন্তু কোলাহলমুক্ত নয়। মেইন গেটের দিক থেকে চারতলা ভবনের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ভেসে আসছে শতাধিক ছাত্রছাত্রী ও বাইরে থেকে আসা রাজনৈতিক ক্যাডারদের সমবেত গর্জন—"লম্পট প্রফেসর নিপাত যাক!", "শিক্ষাঙ্গনে কামুকতা চলবে না!", "অরিন্দম মুখার্জীর ফাঁসি চাই!"
স্টাফ রুমের দরজাটা আধভেজানো ছিল। ভেতর থেকে কয়েকজোড়া চোখ অরিন্দমকে পার হয়ে যেতে দেখল। কেউ একজন চা পানের কাপটা ডিশে রাখার সশব্দ আওয়াজ করল। তরুণ টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট শৌভিক, যে একসময় অরিন্দমের লেখা উপন্যাস ও কবিতার ভক্ত ছিল, সে অরিন্দমকে আসতে দেখে মুখ নিচু করে পত্রিকার পাতায় আত্মগোপন করল।
অরিন্দমের মুখে একটা অতি সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল।
তিনি প্রধান ফটকের দিকে গেলেন না। প্রধান ফটকের বাইরে তখন ট্রাইপড উঁচিয়ে বসে আছে নিউজ চ্যানেলের ক্যামেরা, ওবি ভ্যান। বাতাস ভারী হয়ে এসেছে কেরোসিনের ঝাঁঝালো গন্ধে আর পোড়া খড়ের ধোঁয়ায়। অরিন্দমের কুশপুতুলও পোড়ানো হচ্ছে। বাসের জানলা দিয়ে কৌতূহলী যাত্রীরা মাথা গলে দেখছে—একজনের নাম ধুলোয় মিশছে, সেই দৃশ্য দেখার যে চিরন্তন ক্ষুধা মধ্যবিত্ত সমাজের থাকে, কলকাতা আজ সেই ক্ষুধায় মত্ত।
অরিন্দম করিডোর পার হয়ে চলে এলেন কলেজের পেছন দিকে—ক্যান্টিন ও পুরানো শৌচাগারের পাশের সরু পথটায়। এখানটায় নোনাধরা দেওয়ালে শ্যাওলার পুরু আস্তরণ, একটা ভাঙা বেঞ্চে জলের তোড়ে প্লাস্টিকের কাপ ভেসে যাচ্ছে। মরচে পড়া একটা ছোট লোহার গেট আছে এখানে, যা সচরাচর বন্ধ থাকে এবং কলেজের সুইপাররা ময়লা ফেলার জন্য ব্যবহার করে।
অরিন্দম পকেট থেকে রুমাল বের করে ভেজা হাতটা মুছলেন। তারপর লোহার গেটের হুড়কোটা এক ঝটকায় টেনে তুললেন। এক বিকট ধাতব ক্যাঁচকোঁচ শব্দে দরজাটা খুলে গেল।
বাইরে পার্ক স্ট্রিটের এক, সরু গলি। বৃষ্টিতে নর্দমার নোংরা জল উপচে এসে জমেছে রাস্তায়। ছাতা খোলার আগেই এক পশলা প্রবল বৃষ্টি অরিন্দমের মাথার সাদা-কালো চুল আর কাঁধের ওপর চেপে বসা স্যুটকেসটাকে ভিজিয়ে দিল।
তিনি দ্রুত পায়ে গলির মুখটার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
কিন্তু নিস্তার ছিল না। গলির মুখে মোড় ঘুরতেই দুটো বাইক এসে ব্রেক কষল। তাদের পরনে রেইনকোট, কিন্তু হাতে নিউজ চ্যানেলের লোগো দেওয়া মাইক। পেছন থেকে ছুটে এল আরও তিন-চারজন ক্যামেরা-কর্মী, জল ছিটকে তাদের জুতোর সোলে।
"ওই তো! ওই তো অরিন্দম মুখার্জী! পিছনের গেট দিয়ে পালাচ্ছেন!"
ক্যামেরার লাল আলো আর ফ্ল্যাশবাতি বৃষ্টির ধারার মধ্যে চাবুকের মতো অরিন্দমের চোখে এসে পড়ল। চশমার কাচ জলে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, তিনি প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। মাইকগুলো এক লহমায় তাঁর চিবুক ও ঠোঁটের কাছে ঠেসে ধরা হলো।
"প্রফেসর মুখার্জী! রিয়া সেনের ওপর মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে আপনি কি নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে চেয়েছিলেন?"
"সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ডায়েরি ভাইরাল হয়েছে, সেটা কি আপনারই লেখা?"
"কলেজের চাকরি থেকে তো বহিষ্কৃত হলেন, নিজের এই বিকৃত মানসিকতা নিয়ে কিছু বলবেন?"
একজন চশমা পরা তরুণ সাংবাদিক, যার চোখ দুটো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছিল, সে প্রায় অরিন্দমের গায়ের ওপর চেপে বসে মাইকটা ঠেলে দিল।
"বলুন প্রফেসর! সমাজের কাছে আপনার কি কিছু জানানোর নেই? নিজেকে কি এখনও নির্দোষ ভাবেন?"
বৃষ্টির জল অরিন্দমের কপাল বেয়ে চশমার কাচ পার হয়ে তাঁর ঠোঁটে এসে পড়ছিল—তাতে নোনা স্বাদ। চারপাশের ক্যামেরা, চিৎকার, চাকা ঘোরার কাদা ছিটকানো শব্দ আর সাংবাদিকদের এই সস্তা বিচারসভার সামনে অরিন্দম স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তাঁর মুখের রেখায় কোনো অপরাধবোধ ফুটে উঠল না, কোনো ভয় বা কাকুতি-মিনতিও দেখা গেল না। কেবল ফুটে উঠল এক চরম, হিমশীতল ঘৃণা।
তিনি সাংবাদিকদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
গলির মুখে একটা হলুদ অ্যাম্বাসেডর ট্যাক্সি ধীরগতিতে যাচ্ছিল, বৃষ্টির জন্য উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপারটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে ঘুরছে। অরিন্দম হাত উঁচিয়ে চিৎকার করলেন—"ট্যাক্সি!"
ট্যাক্সিটা একদম ফুটপাথের ঘেঁষে থামল। অরিন্দম পেছনের দরজাটা খুলে ভেতরে উঠে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভারী ব্যাগটা পাশে টেনে নিলেন।
সাংবাদিক তরুণের দল ট্যাক্সির জানলার কাছে চলে এল। একজন জানলার কাচে সশব্দে থাপ্পড় মারল—"উত্তর এড়িয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন প্রফেসর? জবাব দিন!"
অরিন্দম ট্যাক্সির দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করলেন। ড্রাইভার পেছনে ফিরে তাকাল, "কোথায় যাবেন বাবু?"
"বিডন স্ট্রিট।"
ট্যাক্সিটা চালকের ক্লাচ ছাড়ার ঝাঁকুনিতে এগোতে শুরু করল। চশমাটা খুলে অরিন্দম কোর্টের ভেতরের শুকনো অংশ দিয়ে মুছতে লাগলেন। জানলার কাচটা আধখোলা ছিল, বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে আসছিল।
সেই তরুণ সাংবাদিক ট্যাক্সির সঙ্গে দু-পা দৌড়ে এসে কাচের ফাঁক দিয়ে মাইকটা গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল—"আপনার বিকৃত মানসিকতা নিয়ে অন্তত একটা কথা বলুন!"
অরিন্দম ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে জানলার কাচটা ওপরে তুলতে লাগলেন। বাইরে তখন গণ-হিস্টিরিয়ার কোলাহল, নৈতিকতার ঢাক পেটানো কলকাতার সস্তা বিচার সভা। কাচটা পুরো বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, অরিন্দম সেই সাংবাদিকের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তাঁর স্বর ছিল অত্যন্ত সমতল, নিচু, অথচ ধারালো।
"বিচারের শকুনদের খাদ্য জোগাতে আমার বয়েই গেছে।"
কাচটা একদম আটকে গেল।
বাইরের সমস্ত চেঁচামেচি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলো আর রেইনকোটের খসখস শব্দ এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল কাচের ওপারের পৃথিবীতে। কেবল বৃষ্টি ঝরার একঘেয়ে ছন্দ আর ট্যাক্সির পুরোনো ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় শব্দ ভেতরে রয়ে গেল।
ট্যাক্সিটা কলেজ স্ট্রিটের ওপর দিয়ে শিয়ালদহ হয়ে মানিকতলার দিকে রওনা দিল। অরিন্দম জানলার কাচে মাথা টিকিয়ে রাখলেন। কাচের গায়ে বৃষ্টির জল ফোঁটা ফোঁটা হয়ে জমে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে, আর বাইরে কলকাতার ঝাপসা হয়ে আসা দোকানপাট, ট্রামলাইন আর নিয়ন সাইনের লাল-নীল আলো সেই জলে ধুয়ে মুছে একটা অদ্ভুত, নিরাকার ক্যানভাস তৈরি করছে।
পতন সম্পূর্ণ হয়েছে। অরিন্দম মুখোপাধ্যায় এখন সমাজের চোখে এক চিহ্নিত পাপাচারী, এক তাড়িয়ে দেওয়া অপরাধী। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, এই অপমানের চরম মুহূর্তে এসেও তাঁর ভেতরে কোনো পস্তানি নেই। সমাজ তাঁকে বমি করে ফেলে দিয়েছে, আর তিনি সেই আবর্জনা থেকে নিজের একা থাকাটা কুড়িয়ে নিয়েছেন।
অধ্যায় ৭: টেলিফোনে দূরত্ব
ঘরের ভেতর কোনো আলো ছিল না। কেবল ব্যালকনির ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে বাইরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের একটা ফ্যাকাশে, অসুস্থ হলুদ আলো এসে পড়েছিল মেঝেতে। সেই আলো-আঁধারির সীমানায় একটা পুরোনো সেগুন কাঠের আর্মচেয়ারে বসে ছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
তাঁর ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমাঙ্গুলের ফাঁকে রাখা ডার্বি সিগারেটের লালচে মুখটা অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলছিল আর নিভছিল। ঘরজুড়ে জমে ছিল নিকোটিনের এক ঘন, দমবন্ধ করা গন্ধ আর সারাদিনের জমে থাকা গুমোট নীরবতা। বাইরে কলেজের সামনের সেই চিৎকার, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বা চাকার কর্কশ শব্দ আর নেই। কিন্তু ভেতরের এই নিস্তব্ধতা বাইরের কোলাহলের চেয়েও বেশি হিংস্র।
টেবিলের ওপর রাখা কালো রঙের পুরোনো ল্যান্ডফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল।
প্লাস্টিকের ওপর ধাতব হাতুড়ির সেই তীক্ষ্ণ শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরটাকে যেন একটা ধারালো কাচ দিয়ে দু-ভাগ করে দিল। অরিন্দম নড়লেন না। সিগারেটের ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে সিলিংয়ের দিকে ছেড়ে দিয়ে তিনি স্থির হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। চারটে, পাঁচটা, ছ-টা রিং হওয়ার পর তিনি হাত বাড়ালেন।
ভারী রিসিভারটা কানে তুলতেই ওপার থেকে ভেসে এল একটা অদ্ভুত যান্ত্রিক তরঙ্গশব্দ। দিল্লির ডায়লিং কোডের সেই পরিচিত 'বিপ' শব্দ আর তামার তারের ভেতরের হালকা স্ট্যাটিক।
অরিন্দম কোনো কথা বললেন না। শুধু রিসিভারটা গালে চেপে ধোঁয়ার শেষ অংশটুকু ছাড়লেন।
"বাবা?"
ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কোনো আবেগ নেই, কোনো উত্তাপ নেই—যেন বরফশীতল কোনো কুয়ো থেকে একটা পাথর খসে পড়ল জলতলে। মেঘলা। দিল্লি থেকে ফোন করেছে তাঁর মেয়ে।
অরিন্দম এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে চেনা গলায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর গলাটা শোনালো অস্বাভাবিকরকম শুকনো। " হুমম । বল মেঘলা। কেমন আছো? "
"তুমি কেমন আছ, সে কথা জিজ্ঞেস করার কোনো অর্থ হয় না," মেঘলার স্বরটা ফ্ল্যাট, একদম সমতল। সেখানে কোনো কান্না নেই, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নেই, এমনকি একজন অপরাধীর মেয়ের যে লজ্জিত হওয়ার কথা, সেই সংকোচটুকুও অনুপস্থিত। "ইন্টারনেটে সকাল থেকে পোর্টালগুলোর খবরের শিরোনামে শুধু তোমারই নাম। আনন্দবাজার, টেলিগ্রাফ—সব জায়গাতেই। বন্ধুরা লিঙ্ক গুলো সব পাঠাচ্ছে।"
অরিন্দম আ্যাশট্রেতে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটা আস্তে চাপ দিয়ে নিভিয়ে দিলেন। একটা বিষণ্ণ হাসির আভাস তাঁর মুখে এসে মিলিয়ে গেল। "তোদের দিল্লির ডিজিটাল জমানায় কলকাতা বেশ তাড়াতাড়িই পৌঁছায় দেখছি।"
"কৌতুক কোরো না বাবা," মেঘলার গলায় বিরক্তিকর এক প্রচ্ছায় ফুটে উঠল, কিন্তু তা-ও তীব্র নয়। "তুমি নিশ্চয়ই আশা করোনি যে আজকের দিনে এসব ধামাচাপা পড়ে থাকবে? তুমি তো চিরকাল ভেবে এসেছ, তোমার চারপাশের দেয়ালগুলো এত উঁচু যে বাইরের আলো বা নোংরা কোনোটাই ভেতরে ঢুকতে পারবে না।"
অরিন্দম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রিসিভারটা আরও একটু শক্ত করে ধরলেন। "আমি কখনো ভাবিনি মেঘলা। তোমার মা আমেরিকা যাবার পর আমি শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। সমাজ সেসব তার নিজের সুবিধাজনক নাম দিয়েছে।"
"তোমার এই ফিলোজফিগুলো এখন আর খাটছে না," মেঘলা থামল। ওপার থেকে একটা কাগজের খসখস শব্দ বা হয়তো ঘরের এসি চলার একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন ভেসে এল। বাবা আর মেয়ের মাঝখানে হাজার মাইল পথ, কিন্তু এই মুহূর্তে সেই শারীরিক দূরত্বের চেয়েও মারাত্মক হয়ে উঠেছিল তাদের ভেতরের সামাজিক ও মানসিক বিচ্ছিন্নতা। রক্তাক্ত কোনো সম্পর্কের দাহ নয়, বরং একটা মরে যাওয়া সম্পর্কের শ্বেতশুভ্র ঠান্ডা থমথমে ভাব ঘিরে ধরেছিল পুরো কথোপকথনটাকে।
মেঘলা আবার বলল, "তুমি যা করেছ, সেটা নিশ্চয় তোমারই ব্যাপার। কিন্তু তুমি যে নিজেকে সবসময় নির্দোষ ভাবো, সেটাই দেখতে যা খারাপ লাগে।"
কথাগুলো অরিন্দমের কানে গিয়ে বিঁধল, কিন্তু তিনি কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন প্রকাশ করলেন না। তিনি বহু বছর ধরে তার স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতা লালন করেছেন। মেঘলা যখন ছোট ছিল, তখনও অরিন্দম বই আর ডায়েরির পাতাতেই নিজের জগৎকে খুঁজে পেতেন। পরিবার তাঁর কাছে ছিল একটা প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা যোগান দিতে আর খরচ করতে, দায়িত্ব মাত্র, তার আত্মার কোনো অঙ্গ নয়। আজ সেই অপূর্ণ সম্পর্কের দাম মেটাতে হচ্ছে। মেঘলা মানুষ হয়েছে কেবল তার মা আর ছোট এক মাসীর তত্বাবধানে ও তাদের দুজনের ছায়ায়। সেখানে অরিন্দম ছিলেনই বা কোথায়? শুধু টাকাই দিতে হয়েছে অরিন্দমকে সংসারে যখন যেমন চেয়েছে মেঘলার মা, মাসী দাদু ও দিদা।
অরিন্দম সোজা হয়ে বসলেন। অন্ধকারের মধ্যেও নিজের চোয়ালটা শক্ত করলেন তিনি। তারপর খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন:
"আমি যে নির্দোষ সেটাও দাবি করিনি তো মেঘলা। আমি শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারকদের বিচারটা মানিনি। তাই রেসিগনেশন দিয়েছি। আমার কোনো দায় নেই কোনো ছাত্রছাত্রী কী শিখলো বা না শিখলো আমার থেকে। "
ওপারে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর মেঘলার একটা ছোট ও শুকনো নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। যেন সে এক ধরনের করুণা করল অরিন্দমের এই অহংকারকে।
"রেসিগনেশন দিলে, না বহিষ্কৃত হলে, সেটা কিন্তু এখন আর কোনো পার্থক্য তৈরি করে না বাবা," মেঘলার স্বরে এবার চরম ক্লান্তি। "তুমি কোনোদিন কাউকেই মানোনি। না আমার মাকে, না আমাকে, না মেসোমশাই ও মাসীকে, না তোমার সমাজকে। তুমি শুধু নিজের তৈরি করা একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মহানুভবতা দেখেছ। আজ যখন সেই আয়নাটা ভেঙে গেছে, তুমি বলছ তুমি বিচারকদের মানো না।"
"তুইও বুঝি আমাকে বিচার করতে বসেছিস রে মেঘলা মা?"
"না," মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল। "আমি তোমাকে বিচার করার মতোও অতটা গুরুত্ব আর তোমাকে দিই না। আমি শুধু ফোন করলাম এটা নিশ্চিত হতে যে, তুমি বেঁচে আছ কি না। কারণ খবরগুলো যেভাবে আসছে...আমার ভয় হচ্ছিলো তুমি কিছু আবার করে না বস। যা সেন্টিমেন্টাল তুমি। যতই হোক আমার বাবা তো তুমি। "
"আমি বেঁচে আছিরে," অরিন্দম থামিয়ে দিলেন মেয়েকে। "আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আমার ভেতরে কোনো গ্লানিও নেই।"
"তাহলেই ভালো। নিজের সেই একাকীত্ব নিয়েই থাকো।" মেঘলার স্বরটা যেন আরও দূরে চলে গেল। "আমি দিল্লি থেকে কলকাতায় আসার এখন কোনো পরিকল্পনা করছি না তাহলে। আমার কাজেরও খুব চাপ। তা ছাড়া, এই মুহূর্তে তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে মিডিয়া আর সমাজ আমাকেও সেই একই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, যার কোনো প্রয়োজন আমার নেই।"
পারিবারিক সম্পর্কের এই নগ্ন সততা অরিন্দমকে ভেতর থেকে একমুহূর্তের জন্য নাড়িয়ে দিল। নিজের রক্ত, নিজের সন্তান—কোনো নাটকীয় হাহাকার না করে খুব সহজভাবে জানিয়ে দিল যে সে হাত ধুয়ে ফেলেছে। এই বরফশীতল বিচ্ছিন্নতা যেকোনো গালাগাল বা অভিশাপের চেয়েও শতগুণে বেশি নির্মম।
অরিন্দম মৃদুস্বরে বললেন, "আমিও তোকে আসতে বলিনি মেঘলা। আমি কারো কাছ থেকে কোনো করুণা ,আশ্রয় বা দয়া প্রত্যাশাও করি না।"
"জানি তো। তুমি কাউকেই প্রয়োজন মনে করো না। এটাই তো তোমার চিরকালের সমস্যা।" মেঘলা এক মুহূর্ত থামল। "নিজের খেয়াল রেখো। আর সম্ভব হলে ল্যান্ডফোনটা কেটে রেখে দাও, সাংবাদিকরা নিশ্চয়ই এই নম্বরেও ট্রাই করবে।"
"হুম।"
"রাখছি।"
কোনো 'ভালো থেকো' নয়, কোনো সান্ত্বনার স্পর্শ নয়। ওপার থেকে খট করে ফোনটা কেটে যাওয়ার শব্দ হলো।
তারপর শুধুই ডায়াল টোন—'টুট... টুট... টুট...'। একঘেয়ে, যান্ত্রিক আর নির্মম।
অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড সেই ডায়াল টোনটা কানে ধরে রেখে দিলেন। মনে হলো, এই যান্ত্রিক শব্দটাই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গী। রক্তের সম্পর্ক, এতদিন ধরে গড়ে তোলা পিতৃস্নেহের ক্ষীণ সুতো—সবটাই এক নিমেষে কেটে গেছে। কোনো রক্তের দাগ ছড়ায়নি, কোনো চিৎকার হয়নি, অথচ বিচ্ছিন্নতাটা হয়ে গেছে চিরস্থায়ী।
তিনি ধীরে ধীরে রিসিভারটা ক্র্যাডেল-এ নামিয়ে রাখলেন।
পকেট থেকে দেশলাই বের করে আর একটা গোল্ড ফ্লেক সিগারেট ধরালেন তিনি। বারুদের নীল আলোটা এক মুহূর্তের জন্য তাঁর শুকনো, রেখাবহুল মুখটাকে স্পষ্ট করে তুলে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ফোনটা টেবিলেই পড়ে রইল। আর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, সমাজের চোখে একজন দাগি অপরাধী এবং নিজের মেয়ের চোখে এক অপ্রাসঙ্গিক অতীত, অন্ধকারের ভেতর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের এই নিখাদ একাকীত্বকে উপভোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন।
পর্ব ২: সোদপুর ও কলোনির স্মৃতি (অধ্যায় ৮– ১৭)
অধ্যায় ৮: 'অপরাজিতা' ও ১৯৭১ সালের-এর ভূতেরা
সোদপুর স্টেশন পেরিয়ে পূব দিকের কুড়ি মিনিট হেঁটে গেলে পূর্বপল্লি পাড়ার সরু গলিটার মুখে যখন রিকশাটা এসে থামল, তখন ভোরের দিকের রক্তিম আলো আকাশের গায়ে জমে থাকা কালো মেঘের আড়ালে ধুঁকছে। গলিটার দু-পাশের নর্দমা থেকে পচা খড় আর জমা জলের এক ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে।
রিকশার ভাড়া চুকিয়ে ড.অরিন্দম মুখোপাধ্যায় পি এইচ ডি( বি এইচ উ) , ডিলিট( কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) যখন নিজের বিশাল চামড়ার ট্রাঙ্ক আর ব্যাগটা হাতে নিচে নামলেন, তখন রিক্সা চালক ভূপেন তাঁর দিকে একবার কৌতূহলী চোখে তাকাল। এই গলিতে কোনো ভদ্রলোক এভাবে কোনো ট্রাঙ্ক হাতে এসে নামেন না । কে উনি? ….খুব চেনা চেনা চেহারা। আসলে অরিন্দম যখন সোদপুর ছেড়েছিল প্রায় ৪০ বছর আগে তখন ভূপেন ছিলো ৮ বছরের কলোনির একটা ছেলে। তাই অরিন্দম কে সে চিনতে পারেনি।
গলির শেষ মাথায়, একটা প্রকাণ্ড পুরনো অশ্বত্থ গাছের ডালপালায় ঢাকা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দমদের পৈতৃক বাড়ি , ‘অপরাজিতা বাড়িটা’। বাড়ির মূল ফটকের লোহার গ্রিলে মরচে ধরে ধরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, নীচের অংশটা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। প্রায় চল্লিশ বছর পরে অরিন্দম প্রথম এলেন নিজের পৈতৃক সম্পত্তি তে। গেটের ওপরের শ্বেতপাথরের ফলকটায় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষরে লেখা—অপরাজিতা, ১৯৫৪। অরিন্দমের বাবা ও মা যখন ১৯৫০ সালে ওপার পূর্বপাকিস্তানের থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে এপারে এসে চার বছর ধরে মাথা গোঁজার ছোট একটা ঠাঁই করেছিলেন, তখন এই নামটা রেখেছিলেন। অপরাজিতা মানে হলো—যাকে নাকি জয় করা যায় না। অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে একটা শুকনো, করুণ হাসি ফুটে উঠল। নাম আর বাস্তবের কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!
পকেট থেকে পিতলের ভারী, প্রায় কালচে হয়ে যাওয়া চাবিটা বের করে অরিন্দম সেটা দরজার তালাটায় পরালেন। কয়েকবার মোচড় দেওয়ার পর একটা বিকট কড়কড় শব্দে তালার ভেতরটা ভাঙল। গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একঝাঁক শুকনো পাতা আর ধুলো এসে আছড়ে পড়ল তাঁর পায়ে।
বাড়িটা একতলা আর কেমন অন্ধকার, সেঁতসেঁতে। ঢুকেই বাঁ হাতে ছোট একটা ঘর। দেওয়ালে চুনকাম খসে পড়ে ভেতরের লাল ইট উঁকি মারছে। সেই দেওয়ালের এক কোণে এখনও আধো-মোছা অক্ষরে লাল কালিতে লেখা রয়েছে কিছু পোস্টারের অবশিষ্টাংশ—‘৭০-এর দশক শেষ হয়নি...’, আর তার ঠিক পাশেই একটা ঝাপসা হাতুড়ি-কাস্তে এবং একটা পাঁচকোণা তারা।
এই 'অপরাজিতা' তো সত্তর দশকে আর স্রেফ একটা চুন বালি সুরকি ইট-কাঠের বাড়ি ছিল না। সত্তর দশকের শেষ দিকে যখন প্রদেশ কংগ্রেস এর স্বৈরাচারী শাসন এর বিপক্ষে সিপিআই(এম) পার্টি আর নকশালদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কলকাতার রাজপথ লাল হয়ে উঠত, তখন অরিন্দমের বাবা ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়—যিনি ছিলেন বামপন্থী অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (AITUC) একনিষ্ঠ একজন ক্যাডার এবং স্থানীয় ইউনিয়ন নেতা—নিজের অজান্তেই এই বাড়িকে একটা নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে ফেলেছিলেন। প্রতিবেশী তিনকরী বাবুর মতাদর্শ ছিল সিপিআই(এম)-এর প্রথাগত কমিউনিস্ট লাইনে, কিন্তু তাঁরই ছত্রছায়ায়, পুলিশের নজর এড়াতে, তাঁর ভাইপো আর এই কলোনির কিছু উগ্রপন্থী নকশাল ছাত্র যেমন প্রকাশ, সিদ্ধার্থ, নেতাই, বিরু, বাবলু এই ছোট ঘরটাকে একটা গোপন আস্তানা বানিয়ে তুলেছিল। মধ্যরাত্রে এখানে বসত চোরাগোপ্তা মিটিং, সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা হতো 'দক্ষিণ দেশ' আর 'মুক্তিযুদ্ধর' বুলেটিন, বালতির পর বালতি লাল রঙ গোলা হতো দেওয়াল লিখন আর পোস্টার বানানোর জন্য। পাইপগান বন্দুকের তোড়জোড়, বোমা বাঁধার মসলা লুকোনো থাকত সিঁড়ির তলার অন্ধকার কুলুঙ্গিতে।
অরিন্দম নিজের চামড়ার বিশাল ট্রাঙ্কটা মেঝের ওপর নামিয়ে রাখলেন। ট্রাঙ্কটা খোলার সময় মেঝের ধুলোর একটা পাতলা আস্তরণ উড়ল বাতাসে। তিনি নিজের কোটের বোতাম খুললেন। হাতার কফ দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে এক কোণে পড়ে থাকা একটা পুরনো নারিকেল ঝাড়ু তুলে নিলেন।
ঝাঁট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে চার দশকের পুরনো ইতিহাসগুলো যেন ধুলো হয়ে উড়তে শুরু করল। ধুলোর সেই কণার মধ্যে মিশে ছিলো ফিনাইল, বাসি চা, আর্দ্র চট আর মানুষের ভিড়ের গন্ধ। ১৯৭১ সালেও যখন ওপার বাংলা থেকে রিফিউজিদের ঢল নেমেছিল, তখন সোদপুরের গোসালা এলাকার সেই সুবিশাল রিফিউজি কলোনি ছাপিয়েও এই ‘অপরাজিতা’র বারান্দায়, উঠোনেও ত্রিপল টাঙিয়ে শুয়ে ছিল কিছু অচেনা মুখ। তাদের ভেজা কাঁথা, বাচ্চাদের খিদকুটে কান্না, জখম হওয়া শরীরের গন্ধ আর পোড়া কেরোসিনের ধোঁয়া এখনও যেন এই ঘরের বাতাসে আটকে আছে।
অরিন্দম মেঝের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দেওয়ালের গায়ে হাত দিলেন। এক জায়গায় একটা পুরনো ছবি টাঙানো ছিল, ফ্রেমটা ভাঙা। ছবিতে তাঁর বাবা ও মা— মার হাতে একটা পিতলের ঘটি আর বাবার হাতের কাঠের বাক্স নিয়ে ১৯৪৭-এর দেশত্যাগের পর সোদপুরের এই ভিটেতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। ভোলাবাবুর চোখ দুটো কৌটোর মতো বসে যাওয়া, কিন্তু তার ভেতরে ছিল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক আদিম, ও হিংস্র জেদ।
অরিন্দম ঝাড়ুটা একপাশে রেখে কাঠের জানলাটা সশব্দে খুলে দিলেন। জানলার বাইরে তখন সোদপুরের বেলা। এখান থেকে মাইলখানেক দূরে, গোসালার কাছে সেই নিচু কলোনির গলিগুলো দেশবন্ধু কলোনি, নীলগঞ্জ কলোনি আর শহীদ কলোনি । নীলগঞ্জ কলোনির রঙের মিস্ত্রির অ্যাসবেস্টসের চালের তিন কামরার ঘরটা ছিল। যেখানে থাকতেন অরূপ আর তার বাবা ও মা রত্না দেবী। ওপার বাংলার শরণার্থী মানুষ গুলোর ঘরে প্রদীপের আলো জ্বলত। ইলেকট্রিসিটি ছিলো না। মানুষ গুলোর চাকরী ছিলো না। সেই টিনের চালার বাড়ি গুলো কী এই চল্লিশ বছর পরে কী আর আছে? মনে হয় না। ইটের বস্তি হয়ে গেছে হয়তো
অরিন্দম চোখ বুজলেন। চারপাশের ধুলোর গন্ধ পেরিয়ে তাঁর নাকে ভেসে এল সেই সাঁঝকালের সস্তা নারকেল তেল, গায়ের ঘাম আর রান্নার মিশ্রিত এক তীব্র গন্ধ—যে গন্ধটা রত্না মাসিমার শরীর থেকে বের হতো। ১৭ বছর বয়স থেকে ২১ বছর পর্যন্ত, চারটে বছর ধরে চলেছিল সেই গোপনতম লেনদেন দুজনের মধ্যে।
রাত নামল সোদপুরে। অরিন্দম সুইগী থেকে অর্ডার করে নিজের দুপুরের খাবার এনিয়ে নিয়েছিলেন। রাতেও তার থেকেই হয়ে যাবে। ঘর গুলো এখন অনেক পরিষ্কার।
রাস্তার আলোটা বন্ধ হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। ঘরে এখনও কোনো কারেন্ট নেই। অরিন্দম দোকান থেকে কয়েকটা মোমবাতি কিনে এনে , একটা জ্বালিয়ে , টেবিলের ওপর রেখেছেন। মোমবাতির ফ্যাকাশে শিখাটা বাতাসের ঝাপটায় কাঁপছে, আর ঘরের দেওয়ালে অরিন্দমের ছায়াকে এক দৈত্যের মতো বড় করে তুলছে।
অনেক দূরে, শেয়ালদা-রানাঘাট লাইনে একটা মালগাড়ি যাওয়ার শব্দ হলো।
ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...
ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেলটা রাতের অন্ধকার চিরে ধেয়ে এল। রেললাইনের সেই কম্পন মাটির ভেতর দিয়ে এসে ‘অপরাজিতা’র পুরনো সিমেন্টের মেঝেটাকে মৃদু কাঁপিয়ে দিল। সেই কম্পনে ঘরের কোণে রাখা পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের থালাটা মনে হলো যেন নড়ে উঠল।
খাটের ওপর রাখা চামড়ার ট্রাঙ্ক থেকে নিজের একটা দামি বিছানার চাদর পেতে অরিন্দম শুয়ে পড়লেন। চশমাটা খুলে পাশে রাখা। তাঁর চোখ দুটো অন্ধকারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সব কিছুই তাকে নতুন করে কিনতে হবে এখানে। আগামী কাল সকাল থেকে শুরু করবেন। সময় একটু লাগবেই বাড়িটাকে বাসযোগ্য করে তুলতে । মেঘলা কে ডাকবেন ভাবলেন। মেয়েটা দিল্লিতে নয়ডা তে পরে আছে। ২৭ পেরিয়ে সে ২৮ এ পড়েছে।
হঠাৎ মনে হলো, ঘরটা আর ফাঁকা নেই।
মোমবাতির আলোর পরিধির ঠিক বাইরে, ঘরের অন্ধকারের মধ্যে কারা যেন এক এক করে এসে দাঁড়াচ্ছে। এক-দুই করে অনেকগুলো অবয়ব। তাদের পরনে ছেঁড়া ময়লা ধুতি, ময়লা শাড়ি, হাতে টিনের ট্রাঙ্ক আর প্লাস্টিকের বস্তা। ১৯৭১ সালের সেই পূর্বপাকিস্তানের থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্বাস্তুর দল এরা। তারা কেউ কথা বলছে না, কিন্তু তাদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে মোমের আলোয়। মরে এখন ভূত।
সেই ছায়ামূর্তিদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর পরনে হাঁটু পর্যন্ত ওঠা ধুতি, ঢোলা সাদা শার্ট । কপালে গভীর বলিরেখা, হাতে একটা পিতলের ঘটি।
ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়—অরিন্দমের মৃত বাবা।
অরিন্দম উঠে বসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর শরীর যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে। তিনি গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ করলেন। "বাবা? তুমি?"
"তুমি এখানে কেন বাবা? তুমি তো নব্বই সালেই সদেপুরে পানিহাটি অ্যাসেম্বলি ইলেকশনের সময় প্রদেশ কংগ্রেসের গুলি আর পুলিশের লাঠির মাঝখানে দাঁড়িয়ে হারিয়ে গিয়েছিলে। কত খুঁজেছিলাম আমরা সকলে তোমাকে তখন। কেউইপায় নি "
বাবার ছায়ামূর্তিটা এসে দাঁড়াল অরিন্দমের মাথার কাছে। তাঁর পেছনে ১৯৭১-এর সেই রিফিউজিদের দীর্ঘ সারি, দেওয়ালে ফুটে ওঠা শহীদ হওয়া নক্সাল যুবকদের রক্তমাখা মুখগুলো সব একে একে জড়ো হচ্ছে।
অরিন্দম চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত নিচু, এক ভাঙা গলায় বললেন:
"তোমরা..তোমাদের বাংলাদেশের ভিটেমাটি হারিয়েছিলে বাবা... আর এখন আমি হারিয়েছি আমার অহংকার। তোমাদের ছেড়ে যাওয়া আমার ভুল ছিলো বুঝতে পারছি। "
অরিন্দমের বাবার ছায়াটা নড়ল না। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এল ঘরের হাওয়ায়, যেন কোনো গভীর কুয়ো থেকে বহু পুরনো একটা প্রতিধ্বনি উঠে আসছে। কোনো ক্ষোভ নেই সেই স্বরে, আছে কেবল এক নির্দয় বাস্তবতা।
"অহংকারতো কোনো ভিটেমাটি নয় অরিন্দম, ওটা বালির বাঁধ। জল এলেই ধুয়ে যায়। তুই ভেবেছিলি তুই খুব বিদ্বান হয়েছিস, তুই লায়েক হয়েছিস। তুই কলকাতা শহরের বড় ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক, তুই মানুষের মনের ওপরও শাসন করবি? আমরা ভিটে হারিয়েছিলাম অন্যের পাকিস্তানি রোজাকারদের অত্যাচারে, আর তুই তোর নিজের এই ভিটে হারালি স্বেচ্ছায় তোর নিজের ভেতরের জন্তুটার জন্য।"
অরিন্দম দু-হাতে মুখ ঢাকলেন।
বাবার ছায়ামূর্তিটি একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতার সেই চেনা কঠোরতা। "তুই তো বলতিস মার্কসবাদ নাকি একটা ফালতু শুকনো তত্ত্ব, আর তোর পুঁজিবাদী বৈভবে মানুষ হওয়া বায় -রন হলো মানবমুক্তির আসল ভাষা। আজ তোর বায়- রন তোকে কোথায় এনে দাঁড় করালোরে অরিন্দম? সমাজ তোকে বিচার করেনি ঠিকই, কিন্তু তুই তোর নিজের অহংকারের কাছেই হেরেছিস। তুই ভাবতিস তুই বুদ্ধিজীবী, বুর্জোয়া পন্থা ক্যাপিটালিজম এই সমাজের ঊর্ধ্বে। আর আজ? তুই স্রেফ একটা চরিত্রহীন বর্জ্যপদার্থ।”
"আমি কিন্তু কারও ক্ষতি করিনি বাবা... আমি কাউকে আঘাত দিতেও চাইনি বাবা... আমি শুধু নিজে বাঁচতে চেয়েছিলাম ভালো ভাবে।"
অরিন্দম বিড়বিড় করে উঠলেন, তাঁর কথা জড়িয়ে গেল ট্রেনের হুইসেলের কর্কশ শব্দে। "আমি শুধু আমার নিজের স্বাধীনতার মূল্য দিতে চেয়েছি।"
"স্বাধীনতা?" বাবার ছায়ামূর্তিটা হাত বাড়াল। সেই হাতে পিতলের এক ঘটি আর ১৯৭১-এর সেই ভিটেমাটি হারা উদ্বাস্তুদের ধুলো মাখা। "নিজের ক্ষুধা মেটানোকে স্বাধীনতা বলে না অরিন্দম, ওটাকে বলে পশুর প্রবৃত্তি। তুই আমার 'অপরাজিতা' নামের বাড়িটাকে নিজের পাপ ঢাকার আস্তানা বানাতে যাচ্ছিস তাইতো।”
অন্ধকার ঘরের কোণ থেকে এবার একটা ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে এগিয়ে এল। মোমবাতির হলুদ শিখায় কাঁপতে থাকা বেঞ্চের ওপর, অরিন্দমের মৃত বাবার ভোলা বাবুর ফেলে যাওয়া ছায়ার জায়গায় এসে বসল ৭৫-৭৬ বছরের এক জরাজীর্ণ, কঙ্কালসার নারীমূর্তি। ১৯৭৩ এর রত্না দেবী। অরিন্দমের স্কুলের বন্ধু অরূপের মা। পরনে ওনার জীর্ণ তালি মারা একটি সুতির শাড়ি, চুলে ছাই রঙের তুষারপাত, পিঠটা বয়সের ভারে খানিকটা নুয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই অবয়বের চারপাশ থেকে ভেসে আসা চার দশক আগের সেই পরিচিত নারকেল তেল আর ঘামের সোঁদা গন্ধটা এক মুহূর্তে পুরো ঘরটার বাতাসকে স্থবির করে দিল।
অরিন্দম চশমাটা খুলে হাত নামিয়ে তাকালেন। মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলোয় রত্না দেবীর মুখটা দেখা যাচ্ছে—সেখানে এখন বয়সের বলিরেখার অগণিত মানচিত্র, চামড়া কুঁচকে গিয়ে হাড়ের খাঁজগুলো স্পষ্ট। কিন্তু চোখ দুটো আজও সেই সতেরো বছরের দুপুরে দেখা সেই গুমোট অন্ধকারের মতো গভীর ও নিরাসক্ত।
"রত্না মাসিমা?" অরিন্দম ফিসফিস করে উঠলেন, তাঁর গলায় চল্লিশ বছরের স্তব্ধতা প্রকম্পিত হলো। "তুমি... তুমি কি সত্যিই আজও বেঁচে আছ? নাকি আমার ভেতরের অপরাধবোধ তোমাকে এক অলৌকিক ছায়া বানিয়ে এখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে?"
রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা অরিন্দমের খুব কাছে এগিয়ে এসে বসল, যেমনভাবে চল্লিশ বছর আগে সেই টিনের চলার স্যাঁতসেঁতে ঘরে চৌকির ওপর তার পাশে এসে বসত। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কোনো ক্রোধ ছিল না, ছিল এক ধরণের বরফশীতল, প্রবীণ উদাসীনতা।
"তুই দেখছি এত বছর পরেও সেই সতেরো বছরের দামাল ছোকরাটাই রয়ে গেলিরে বাপ্পা," রত্না দেবীর স্বরটা যেন মেঝের ওপর শুকনো পাতার ঘর্ষণের শব্দ। "আজও নিজের কৃতকর্মের দায় ঢাকতে গিয়ে অতীতের ভূতেদের দরজায় কড়া নাড়তে এসেছিস বুঝি সোদপুরে তোদের এই বাসায়?"
অরিন্দম অন্ধকারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, যেন রত্না দেবীর অশরীরী ছায়াটাকে স্পর্শ করে সত্যতা মেপে নিতে চান। "আমি আজ জীবনের সবকিছু হারিয়েছি মাসিমা। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকতার সম্মান, স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে... সব…সব। আজ ‘অপরাজিতা’র এই ভাঙা সিমেন্টের মেঝেতে বসে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের প্রথম পতন তো আপনার ওই গোসালার রিফিউজি কলোনির টিনের চালার নিচে, আপনার শরীরের আঁচল খামচে ধরার সেই দিনটাই শুরু হয়েছিল। তুমিই বলো রত্নামাসি... তুমি কি সেদিন আমাকে শুধুই এক অবাধ্য কিশোরের অত্যাচার মনে করে সহ্য করেছিলে? নাকি... নাকি তোমার ভেতরেও আমার জন্য কোনো ভালোবাসা বা প্রেমের টান ছিল? তুমি কি কোনোদিন আমাকে এতটুকুও ভালোবেসেছিলে?"
রত্না দেবী শান্ত ভঙ্গিতে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কেবল এক করুণার বিষাদ ফুটে উঠল।
"প্রেম?" রত্না দেবীর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, প্রবীণ রেখা ফুটে উঠল। "সেটা আবার কী জিনিসেররে বাপ্পা? প্রেম কি তোদের বইয়ের পাতায় পড়ে থাকা কোনো বাঁধাধরা রেসিপি নাকি? যে দু-ছটাক সমাজ, এক চামচ সিঁদুর আর কয়েকটা মিষ্টি কথা আর শরীরের আদর মেলালেই তৈরি হয়ে যায়? তোদের ওই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের প্রেম আর আমাদের রিফিউজি কলোনির কষ্ট, অনাহারের ভিটেয় টিকে থাকার লড়াই এক জিনিস নয়। প্রেম শব্দটা তোদের মতো অভিজাতদের বিলাসী মুখেই মানায় বাপ্পা। আমাদের মতো সর্বশান্ত মানুষের ঘরে কোনো প্রেম থাকে না, থাকে কেবল বেঁচে থাকার অন্ধ তাগিদ আর প্রতিদিনের অভ্যেস গুলো।"
"তাহলে কেন সহ্য করতে তুমি আমাকে? কম দিন তো আমি ঘাটিনি তোমার শরীর - প্রায় চার বছর ধরে।" অরিন্দমের গলায় এক ব্যাকুল আকুলতা ঝরে পড়ল। "প্রথম দিনেই তো তুমি আমাকে পুলিশে দিতে পারতে, অরূপকে বা কাকাবাবু বা আমার বাবাকেও বলে দিতে পারতে! তা না করে চার চারটে বছর ধরে কেন আমাকে তোমার শরীরের,মনের এতো কাছে আসতে দিয়েছিলে? শুধুই কি ভীতি ছিল? নাকি শুধুই কিছু টাকার বিনিময়ে আমাকে শোষণ করা উদ্দেশ্য ছিলো?"
রত্না দেবী সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকালেন। মোমবাতির আলোটা তাঁর চোখের মণি দুটোকে অদ্ভুতভাবে কাচের গোলকের মতো উজ্জ্বল করে তুলল।
"তোর কি মনে হয় অরিন্দম, একটা সতেরো বছরের চঞ্চল বখাটে ছেলেকে সাইত্রিশ বছরের একটা রিফিউজি ঘরের কলোনির গৃহিণী বুঝি খুবই ভয় পেয়ে চলত?" রত্না দেবীর স্বরে এক নির্মম, মনস্তাত্ত্বিক সত্য ফুটে উঠল। "না। তুই যেটাকে তোর আমার ওপরে 'অধিকার' বা 'জয়' ভেবেছিলিস, সেটা ছিল তোর বয়সের অহংকার। আমি চাইলে সেদিনই এক মুহূর্তে তোকে কলোনির মোড়ে ধরে নিয়ে গিয়ে শেষ করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। বরঞ্চ তোর আমার গড়ে ওঠা সম্পর্কটা কেউ যেন টের না পায়, সেই চেষ্টাই করেছি। দেখ আজও সেই সম্পর্ক কেউ টের পায় নি"
"কেন করোনি?"
"কারণ সেই বয়সেই তুই আমাকে এমন কিছু দিয়েছিলিস, যা আমার রঙের মিস্ত্রি স্বামী,অরূপের বাবা কোনোদিনও দিতে পারেনি," রত্না দেবী থামলেন, যেন স্মৃতির অতল থেকে এক অদ্ভুত সত্য তুলে আনছেন। "অরূপের রোগা বাপটা সারাদিন অন্যদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুনকাম আর রং করে রাতে ঘরে ফিরত। তার গায়ে থাকত কলোনির মোড়ে ভূপেনের দোকানের সস্তা মদের ঝাঁঝ আর চুনের সোঁদা গন্ধ। ফিরে এসে বাড়ির সামনের পানা ভর্তি পুকুরে কয়েকটা ডুব দিয়ে,রাতের ডাল-ভাত গিলে, ঘুমোবার আগে রাতে আমার শরীরের ভেতরে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেলে দিয়ে ,পাশে উল্টে ঘুমিয়ে পড়ত। চার দেওয়ালে বন্দি আমার ওই ক্লান্ত শরীরটা কোনোদিন জানতেই পারেনি—একজন নারী হিসেবে আমারও তো একটা সত্তা থাকতে পারে। তারও চাহিদা থাকতে পারে। সে আমাকে দেখেছিল স্রেফ সংসারের হাঁড়ি ঠেলার আর তার ছেলে সামলানোর একটা জড় আসবাব হিসেবে।"
"আর আমি? আমার চাওয়া কী ছিলো?"
"আর তুই?" রত্না দেবীর কণ্ঠ এবার আরও ধীর ও গভীর হয়ে এল। "তুই যেদিন প্রথম আমার ব্লাউজের হুক আর শাড়ির আঁচলটা ধরে টানাটানি করেছিলিস, তোর হাতের ছোঁয়ায় কোনো সামাজিক দায়িত্ব বা গৃহস্থালির ক্লান্তি ছিল না—ছিল এক উগ্র, অবাধ্য আর সর্বগ্রাসী বিকৃত একটা ক্ষিদে! কিন্তু জানিসতো বাপ্পা, তোদের মত ওই পণ্ডিতদের বইয়ে ফ্রয়েড সাহেব যাকে ওডিপাস কমপ্লেক্স বলেন, তোর সেই আদিম উগ্রতার পেছনে আসলে শুধু শরীর ছিল না—ছিল এক আকুল মাতৃতৃষ্ণাও সেটা আমার মত মুর্খ এক নারী আস্তে আস্তে বুঝে গেছিলাম! আমার ডান হাতের আঙ্গুলগুলো মুঠোয় তোর ঠাটিয়ে থাকা শক্ত পৌরুষদণ্ড টাকে জোর করেই ধরে তো থাকতাম ঠিকই আর আমার ঝোলা দুটো স্টনের চারধারে তোর জিভ বুলিয়ে শৃঙার করা চুমু খাওয়া আর বোটাদুটোকে মুখের ভেতরে নিয়ে তুই যখন টেনে টেনে চুশতিস..আমার শরীরের ভেতরটা কেমন কেমন যেন করতো। আর আমার নাভির নিচে তলপেটে যখন তুই মুখ রাখতিশ আমার বহু বছরের ঘুমন্ত সেই নারী শরীরটা তখন যেনো সাপ ঘুম ভেংগে জেগে উঠত। আর আমার বহু ব্যবহৃত জোনির ভেতরে তোর ঠাটানো অত বড় আর ওরকম শক্ত কুচকুচে কালো লিঙটা প্রবেশ করে যখন ছোট বড় ধাক্কা মারতো জরায়ু মুখে, আমার ভেতরের সে সুখ…. ….আমার শরীরের সমস্ত হাড়গোড় যেনো মরমর করে উঠতো…তোকে আমি এখন বোঝাতে পারবো না…সেই সুখ…একজন মহিলাই বুঝবে। তুই একজন মাঝ বয়সী মেয়েছেলেকে কী ভাবে তৃপ্তি দিতে হয় অল্পদিনেই শিখে গেছিলি। শুধু ভেতরে ভেতরে একটাই ভয় করত, যদি আমি হঠাৎ করেই গর্ভবতী হয়ে পড়ি তোর দ্বারা। অরূপ ও তখন ১৭ বছরের। একই ক্লাসে পড়তিস তোরা। সেই বয়সে আবারও গর্ভবতী হওয়াটাও যে বড় লজ্জার ছিলো কলোনিতে। আর সেই সন্তানকেই বা মানুষ করতাম কী ভাবে আমাদের সেই অভাবের সংসারে? কেউতো আর জানতোও না যে অরূপের বাবার মতই, তোরও বির্যরস তুই আমার জরায়ুর ভেতরে তুই মাঝে মাঝেই এসে ঢালতিস।
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে রইলেন। অন্ধকারের ভেতরেও তাঁর কপালে শীতল ঘামের ফোঁটা জমে উঠল।
রত্না দেবী বলতে লাগলেন, "তোর নিজের মা তো তোকে তার সামাজিক আভিজাত্যের অহংকারে চিরকাল তোকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তুই নিজেই একদিন অসাবধান মুহূর্তে বলেছিল আমাকে। তুই আমার ওই, মেদভর্তি শরীরের ভেতরে আসলে তোর নিজের মাতৃহৃদয়ের উষ্ণতা খুঁজেছিলিস,এবং একই সঙ্গে একটা ৩৭ বছরের পূর্ণ নারী শরীরকে ভোগ করার অধিকার ও করবার জন্য দর্পও ছিলো তোর মধ্যে। তুই আমার খোলা শরীরের আশ্রয়ে একই সঙ্গে তোর অবদমিত শৈশব আর মাতৃতৃষ্ণাকেও মেটাতে চেয়েছিলিস। তোর সেই কিশোরসুলভ অথচ অন্ধ ব্যাকুলতা আমার সেই বয়সের নারীসত্তাকেও এক অদ্ভুত ধরনের অহংকার ও তৃপ্তি দিত। আমার মনে হতো— মধ্যবিত্ত ঘরের, শিক্ষিত সমাজের, একটা সতেরো বছরের ছেলে , আমার এই নগ্ন নারীত্বের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে একটু আশ্রয় চাইছে! আমার ৩৭ বছরের বয়স্কা শরীরকে ১৭ বছরের একটা ছোট ছেলেও এমন ভাবে আরতি করে, পুজো করছে, যা আমার স্বামী বা অন্য কোনো পুরুষ কোনোদিনও করেনি,ভাবেও নি। আমার মাতৃত্ব আর নারীত্বের সুপ্ত তৃষ্ণা সেদিনগুলো সব এক হয়ে যেতো।"
" কিন্তু তুমি... তুমি কি সত্যিই এতে শান্তি পেতে রত্নামাসি?" অরিন্দম ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।
"শান্তি?" রত্নাদেবী এক বিষাদময় মৃদু হাসলেন। "শান্তি শব্দটাই খুব ছোটরে বাপ্পা। তোর সেই কাঁচা আর দিশেহারা শৃঙার, তোর ব্যাকুলতা, তোর আঙুলের স্পর্শ, তোর ঠোঁটের চুমু গুলো আমার শরীরে, আমাকে এক অপরাধবোধে ভরা রোমাঞ্চ দিতরে বাপ্পা। কিন্তু সেই উত্তেজনার পরেই নেমে আসত ভয়াবহ এক আত্মগ্লানিও। তুই যখন তোর শরীরের তোর কামের ক্ষুধা মিটিয়ে, পকেট থেকে একশো বা দুশো টাকার কয়েকটা নোট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ি চলে যেতিস, তুই চলে যাওয়ার পর আমি চৌকির বিছানার ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। নিজেকে মনে হতো একটা আস্ত নর্দমার পাঁক।"
"তাহলে সেই টাকাটা কেন নিতে?" অরিন্দমের কণ্ঠ জড়িয়ে এল।
"ওটাই তো ছিল আমার মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার ঢাল, রে বাপ্পা!" রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা এবার একটু হেলান দিল। "অরূপ যখন স্কুলে যাওয়ার আগে বলত—'মা, টিফিনের পয়সা দাও', আমি তোর দেওয়া সেই টাকাটাই তার হাতে তুলে দিতাম। নিজেকে ধোঁকা দিয়ে বোঝাতাম—'রত্না, তুই তো নিজের শরীরের কামনার জন্য এই পাপ কাজ করছিস না! তুই বাপ্পার সঙ্গে শুচ্ছিস তোর ছেলের টিউসন ফি , স্কুলের ফি ,খাতার জন্য, নতুন জামা প্যান্ট কিনে দেবার জন্য আর সংসারের চাল কেনার জন্য!' ওই টাকা নেওয়াটা ছিল আমার নিজের পাপবোধ ও অপরাধবোধকে ঢেকে রাখার একটা মানসিক কাপড়। তুই ভেবেছিলিস আমি তোকে ব্ল্যাকমেইল করছি, আর আমি ভেবেছিলাম আমি আমার আত্মগ্লানিকে কেনাবেচা করে বেঁচে থাকার বাহানা খুঁজছি।"
অরিন্দম দু-হাতে মুখ গুঁজে দিলেন। জীবনের এতগুলো বছর পর আজ সত্যটা যেন এক মনস্তাত্ত্বিক আয়না হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়াল।
"আমরা দুজনেই দুজনকে ব্যবহার করছিলাম, বাপ্পা," রত্না দেবীর গলাটা এবার আরও রূপকময় শোনালো। "তুই খুঁজেছিলিস মাতৃত্বের ছায়ায় তোর পৌরুষের আর কামনার মুক্তি আমার শরীরে, আর আমি খুঁজেছিলাম এক অবহেলিত, অতৃপ্ত, অভাবী নারীত্বের চরম তৃপ্তি আর আমার সংসারের দারিদ্র্যের উপশম। কিন্তু এই লেনদেনে কোনো বিশুদ্ধ প্রেম ছিল না। ছিল স্রেফ দুটি অপরাধী আত্মার পারস্পরিক শোষণ।"
"আর সুন্দরবনের সেই রাতের কথা? মাঝনদীতে পৌঁছে নৌকার ওপর যা যা ঘটেছিল আমাদের মধ্যে... সেটাও কি শুধুই লেনদেনই ছিল?" অরিন্দমের কণ্ঠে স্মৃতির যন্ত্রণাদায়ক উন্মোচন।
রত্না দেবী চোখ বন্ধ করলেন। অন্ধকারের ভেতর যেন চার দশক আগের ম্যানগ্রোভের হাওয়া আর নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে এল।
" সেদিন কিন্তু তুইই একরকম জোর জবরদস্তি করে নিয়ে গেছিলি আমাকে। ভেবে দেখ,আমি কিন্তু কিছুতেই যেতে চায়নি। অনেক করে বুঝিয়েছিলাম তোকে । কেননা আমি তো জানতামই তুই কী কী করতে পারিস সেই রাতে আমাকে পেলে। সেদিন মাঝনদীতে, খোলা আকাশের চাঁদের আর তারাদের দেশের নিচে, যখন তুই আমাকে নৌকার পাটাতনে একরকম জোর করেই টেনে তুলেছিলিস, সেদিন চারপাশে কোনো কলোনি ছিল না, কোনো সমাজও ছিল না, কোনো অভাবও ছিল না। সেদিন আমার খুব ভয় করছিল জলে পড়ে যাওয়ার, কিন্তু একই সঙ্গে মনে হয়েছিল—নদী আর আকাশের এই অনন্ত বিস্তারে আমরা দুজনেই ভীষণ ভাবে একা, দুটি ভাসমান অস্তিত্ব যেনো। তিন তিন বার তুই করেছিলি আমাকে মনে পড়ে কী তোর,বিভিন্ন বিভিন্ন আসনে। সারাদিনের পথের ধকল সত্বেও আমি কিন্তু এতটুকুও বাধা দেই নি তোকে। যেমন ভাবে তুই চেয়েছিলি তেমন ভাবেই। তুইও সেই গভীর রাতে এতো পাগলামি আর আমাকে এতো এতো ভাবে আদর করেছিলি, আমার শরীরটাকে,সেরকম ভাবে খুউব কম পুরুষই কোনো নারীকে আদর করতে পারেরে। আমার ভেতরের নারীসত্তা ও চিৎকার করে করে উঠেছিল। আরও আরও চাইছিল তোকে। খোলা আকাশের নিচে, তুই যখন ক্লান্ত হয়ে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলিস, আমি তোর কপালে, তোর শরীরে , জমে থাকা ঘামটুকু আঁচল দিয়ে মুছে দিয়েছিলাম। সে রাতে নিজে থেকে ভালোবেসেছিলাম ঘুমন্ত তোকে । আমার মনে হয়েছিল, তুই আমারই আরও এক অবাধ্য সন্তান—যে মাতৃস্নেহ আর নারীদেহের আকর্ষণকে আলাদা করতে শেখেনি তখনও।"
অরিন্দম ডুকরে উঠলেন, "তাহলে কেন আমাকে আটকে রাখলে না তুমি ? যেতে দিলে বেনারস? "
" বোকা ছেলে। তোকে অরূপ আর অরূপের বাবার কাছে থেকে বাঁচানোর জন্যই তো আটকে রাখিনিরে বাপ্পা," রত্না দেবীর গলায় এক পরম মাতৃত্বের বিষাদ। "কিন্তু তুইতো দেখছি তবুও মুক্ত হতে পারিসনি আমার থেকে। তুই সোদপুরের এই রিফিউজি কলোনি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বড় বড় ডিগ্রি নিতে কাশী গেলি। বড় বড় কত পাশও দিলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলি, হাজার হাজার বই পড়লি, চন্দ্রিমা-রিয়া-মাধবীদের মতো নারীদের জীবনেও এলি। কিন্তু কোনো নারীই আর তোকে পূর্ণ করতে পারল না। কারণ প্রতিটা নারীর মাঝে তুই কেবল আমাকেই খুঁজেছিলিস—আমার চুলে মাখা নারকেল তেলের সোঁদা গন্ধ আর সেই সতেরো বছরের তোর বিকৃত মাতৃতৃষ্ণাকে! তুই কাউকেই ভালোবাসতে পারিসনি, তুই শুধু ভালোবেসেছিস তোর নিজের কামনার অহংকারকে।"
"রত্নামাসি..."
"কাঁদিস না বাপ্পা। তোর অস্তিত্বের গোড়াতেই যে বিষ ঢালা ছিল, আজ তুই কেবল তার পরিণতি ভোগ করছিস। মানুষ তার নিজের কাজের অতীত থেকে কোনোদিন পালাতে পারে নারে।"
রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে ঘরের গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। মোমবাতিটা শেষবারের মতো একবার কেঁপে উঠে এক লহমায় নিভে গেল। দেওয়ালে লেখা ১৯৭০ দশকের নকশাল আন্দোলনের স্লোগানগুলোর লাল কালি যেন অন্ধকারের ভেতর আবার নতুন করে জ্বলজ্বল করে উঠল। ঘরের মেঝেটাও
সামান্য যেনো কেঁপে উঠল, আর মোমবাতিটা উল্টে পড়ে গিয়ে নিভে গেল।
ঘোর অন্ধকার তখন ঘরে। বাইরে আবার একটা ট্রেনের কর্কশ শব্দ ধেয়ে এল—ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...।রেললাইনের কম্পনে ‘অপরাজিতা’র পুরনো মেঝেটা শিউরে উঠল। অরিন্দম তার
চশমাটা পকেটে রেখে দিলেন এবার। সোদপুরের এই অন্ধকার আর নিঃসঙ্গতা তাঁকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। এখানে কোনো লাইট, কোনো প্রশংসার মঞ্চ, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ নেই। পড়ে আছে কেবল ইতিহাস, অপরাধবোধ আর আত্ম-নির্বাসনের এক দীর্ঘ, নীরব পথ।
অরিন্দম একা শুয়ে রইলেন ঠান্ডা সিমেন্টের ওপর। জানলার কাচ দিয়ে আসা রাতের আর্দ্র বাতাস তাঁর মুখে এসে লাগছে। তিনি বুঝতে পারলেন, নক্সালদের রক্ত, তার বাবার রাজনীতির ব্যর্থতা, ভোম্বল এর খুন, আর গোসালার কলোনির সেই অন্ধকার ঘরের চটচটে পাপবোধ—সবটা মিলেই তৈরি হয়েছিল তাঁর অস্তিত্ব। আজ সেই অস্তিত্বের সব মুখোশ খসে পড়েছে। পড়ে আছে কেবল এক বৃদ্ধ, নিঃস্ব মানুষ—যে জীবনের শেষ স্টেশনে এসে নিজের ভাঙা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে।
অধ্যায় ৯: ছোট বেলার বন্ধু নীলয়ের ওষুধের দোকান ও সোদপুরে রাজনীতি।
সোদপুর স্টেশন রোডের সকালে ধুলো আর গাড়ি ও অটো রিকশার পেট্রোল ডিজেলের গন্ধের মধ্যে একটা অদ্ভুত রকমের ব্যস্ততা থাকে। তিন মাথার মোড়ে অটো চলাচলের একটানা ক্যাকোফোনি, চায়ের ট্রলির বাসনের ঠুং-ঠাং শব্দ, আর এক নম্বর বা তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে আসা কলকাতা থেকে ফিরে চাকুরিজীবী ভিড়ের ত্বরান্বিত পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে এক অস্থির তরঙ্গ। মোড়ের মাথায় বিশাল বিশাল ফ্লেক্স ঝুলছে; স্থানীয় ক্লাবের তরুণ নেতার হাসিমুখের ছবি, পাশে রক্তদান শিবিরের বিজ্ঞাপন আর নতুন সরকার সমর্থিত যুব সংগঠনের ব্যানার।
সেই ফ্লেক্সের ঠিক নিচেই 'দত্ত ফার্মেসি—হোলসেল ও রিটেল'। সেই ফার্মেসি তে কলকাতা থেকে আসা কয়েকজন ডাক্তারের নাম ডিগ্রি ও কবে কবে কটা থেকে রোগী দেখবেন তাদের নাম।
কাচের ক্যাবিনেটের ওপারে লম্বা কাঠের কাউন্টার। তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো অ্যান্টিবায়োটিক, কাশির সিরাপ আর ভিটামিনের কৌটো। ভেতরে তীব্র স্পিরিট, ডেটল আর স্যাঁতসেঁতে কার্ডবোর্ডের মেলামেশা গন্ধ।
অরিন্দম দোকানে ঢুকলেন। ডান হাতের চামড়ার ব্যাগ মেঝেতে নামিয়ে রাখতে গিয়ে কাটাকাটা শব্দ হলো।
কাউন্টারের ওপারে একটা উঁচু কাঠের টুলে বসে ছিল নীলয় দত্ত। চোখে তার মোটা ফ্রেমের চশমা, গলায় লাল সুতোয় ঝোলানো আতশ কাচ। সামনে খোলা একটা মোটা বিক্রির খাতা আর ক্যাশ বাক্সের ড্রয়ার। বয়স নীলয়েরও আটান্ন, কিন্তু মাথার সামনের চুলে ছাই রঙের ঝালর আর চওড়া পেটের ওপর টানটান সুতির শার্ট তাকে একধরনের নির্বিকার, আপসহীন মধ্যবিত্ত গৃহস্থের চেহারা দিয়েছে।
বহু বছর পরে অরিন্দমকে দেখে নীলয় কলমের নিবটা খাতার ওপর স্থির রাখল। কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ হলো না। বাইরে থেকে একটা ৮১বি নম্বর বাসের হর্নের বিকট আওয়াজ এসে কাচের ক্যাবিনেটে কাঁপন তুলে দিয়ে গেল।
নীলয় চশমাটা নাকের ডগা থেকে টেনে মাথার ওপর তুলল। "বস।তুই তো বাপ্পা মানে অরিন্দম।"
কাউন্টারের পাশে দুটো প্লাস্টিকের সবুজ চেয়ার রাখা। অরিন্দম ধীরপায়ে বসে পড়লেন। কাঠের প্যানেলে হেলান দিতেই মনে হলো, তাঁর শিরদাঁড়ার ভেতরের ক্লান্ত অস্থিগুলো যেন এতক্ষণে একটু থিতু হওয়ার জায়গা পেল।
“হুম আর তুই নিলয়। প্রায় চল্লিশ বছর পরে। “
"চায়ের কথা বলব?" নীলয় খাতাটা বন্ধ না করেই শুধোল।
"না। এখন থাক।" অরিন্দম পকেট থেকে কোটের চেইনটা একটু হালকা করে দিলেন। "একটা প্রেসারের ওষুধ দরকার ছিল, নীলয়। মাথায় ডানদিকের রগটা সকাল থেকে কেমন টিপটিপ করছে।"
নীলয় উত্তর দিল না। সে টুল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে ওষুধের তাকের দিকে হাত বাড়াল। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল অরিন্দমের দিকে। "কতদিন ধরে খাচ্ছিস প্রেসারের ওষুধ?"
"নিয়মিত খাওয়া তো আর হয় না। কলকাতায় রিভিউ মিটিং বা ক্লাসের খুব চাপ থাকলে আমলোডিপিন পাঁচ মিলিগ্রাম খেতাম। কয়েকমাস হলো সে সব বন্ধ।"
নীলয় ড্রয়ার টেনে একটা ডিজিটাল স্ফিগমোম্যানোমিটার আর কফ বের করে আনল। "হাতটা বাড়া।"
অরিন্দম জামার হাতাটা কনুই পর্যন্ত গোটালেন। নীলয় অভ্যস্ত হাতে তাঁর বাইসেপসে কালো কাপড়ের প্যাডটা পেঁচিয়ে ভেলক্রোটা চেপে দিল। পাম্পের মেশিনটা মৃদু ভোঁ-ভোঁ শব্দে বাতাস ভরতে শুরু করল। কাপড়ের চাপ বাড়ছে অরিন্দমের হাতে। পারদের মিটারের জায়গায় ডিজিটাল সংখ্যাগুলো লাফিয়ে উঠছে—১২০, ১৩০, ১৪৫, ১৬০, ১৭২...
পাম্পের চাপটা কমতে শুরু করার সাথে সাথে নীলয় অরিন্দমের মুখের রেখাগুলো দেখছিল। চশমা ছাড়া অরিন্দমের চোখের নিচে কালি পড়েছে, গালের চামড়া সামান্য হলেও খানিকটা ঝুলে পড়েছে, গলার চামড়ায় বয়সের ছোট ছোট বলিরেখা।
মেশিনটা বি পিত শব্দ করে থামল। ১৫২/১০০।
নীলয় ভেলক্রোটা খুলে এক ঝটকায় আলাদা করল। "রক্তের ধাক্কায় ভেতরের নালীগুলো ছিঁড়ে যাবে তো বাপ্পা। তোদের মতো পণ্ডিতাভিমানী মানুষের সমস্যা এটাই—ভাবিস শরীরটাও নাকি কোনো শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডি, যা কেবল কবিতার উপমায় বাঁচে। শরীরটা স্রেফ পচে যাওয়া মাংসের দলা, সময়মত নুন না দিলে পচেই যায়।"
নীলয় তাক থেকে টেলমিসারটেইন ৪০ এর একটা স্ট্রিপ টেনে নিয়ে চারটে পাতা কেটে অরিন্দমের সামনে টেবিলে রাখল। "টেলমিসার্টান ৪০। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে একটা করে খাবি রোজ। বাদ দিবি না একদিনও। আর শোন, এখন থেকে পাতে নুন খাওয়া একদম বন্ধ করে দে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মাঝবয়সী লোক দোকানে ঢুকল। পরনে ইস্ত্রি করা শার্ট, হাতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। লোকটির চোখ নীলয়ের কাছ থেকে সরিয়ে সোজা অরিন্দমের মুখে এসে থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের এক হিমশীতল নীরবতা। লোকটির চোখের তারায় কোনো বিস্ময় ছিল না, ছিল এক ধরণের তীব্র সামাজিক কৌতূহল—যেন জাদুঘরের কোনো দুষ্প্রাপ্য, চিহ্নিত অপরাধীকে সামনাসামনি দেখার অমার্জিত আনন্দ।
"নীলয়দা, আমার প্রেসক্রিপশনের বাসুজেন ইনসুলিনটা দাও তো," লোকটির স্বর কিছুটা উচ্চকিত, যেন সে নিজের উপস্থিতি আর অরিন্দমের অবস্থানকে একই তলে মাপতে চাইছে।
নীলয় ঠাণ্ডা চোখে লোকটির দিকে চাইল। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ভেতরের ফ্রিজ থেকে ইনসুলিনের ভায়াল বের করে আনল। কাগজের প্যাকেটে মুড়ে টেবিলে রাখল। "চারশো কুড়ি টাকা, ব্যানার্জি বাবু।"
টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে লোকটা যাবার সময় আর একবার অরিন্দমের পকেটে থাকা কালো রোদচশমা আর জুতোজোড়ার দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর বাইরে এসে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলতে লাগল। তিনজনের মুখই ঘুরে গেল ফার্মেসির কাচের প্যানেলের দিকে।
অরিন্দম জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। প্রতিবিম্বের ওপারে তিনজোড়া চোখ যেন কোনো অদৃশ্য জল্লাদের মতো তাঁর শরীরটাকে ব্যবচ্ছেদ করছে।
নীলয় টাকাটা ক্যাশ বাক্সে রাখল। কাঠের কাউন্টারে হাতের তালু দুটো চেপে অরিন্দমের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এল।
"এখানে তুই 'প্রফেসর অরিন্দম মুখার্জী' নোস বাপ্পা," নীলয়ের স্বরে কোনো বন্ধুত্বের প্রলেপ ছিল না, ছিল এক নির্মম, উপশহরীয় বাস্তবতার কঙ্কাল। "পত্রিকার খবরের দৌলতে সবাই জানে কলকাতায় তুই কী করে এসেছিস। সাবধানে থাকিস, ক্লাব আর প্রমোটারদের নজর রয়েছে তোদের অপরাজিতা বাড়ির ওপরেও।"
অরিন্দম ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্রেসারের ওষুধের স্ট্রিপটা পকেটে পুরলেন। তাঁর গলায় কোনো উত্তেজনা দেখা গেল না, কিন্তু চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।
"মানুষের নজরকে আমি ভয় পাই নারে নীলয়, ভয় পাই তাদের করুণাকে।"
নীলয় একটা সংক্ষিপ্ত, তিক্ত শব্দ করল ঠোঁট দিয়ে। "করুণা? তুই ভাবছিস এই সোদপুরের কলোনির লোক তোকে করুণা করবে? বাপ্পা, তুই এখনও তোর সেই প্রেসিডেন্সি আর যাদবপুরের সেমিনারের ঘোর থেকে বেরোতে পারিসনি। এরা তোকে করুণা করবে না, এরা তোকে চিবিয়ে খাবে। কেন জানিস? কারণ তুই এতদিন এদের ওপরে ছিলিস। তুই ছিলিস সেই বুদ্ধিজীবী, যার নাম খবরের কাগজে উঠত, যার মেয়েরা তোকে ঘিরে থাকত। আজ যখন তুই ড্রেনে পড়েছিস, তখন এই মধ্যবিত্ত সমাজ তোকে করুণা করে নিজের নীচতাকে খাটো করবে কেন? এরা তোর মাংস খাবে।"
অরিন্দম জানলার বাইরে তাকালেন। ট্রেনের একটা হুইসেল ভেসে আসছে স্টেশন থেকে। একদল তরুণ পোস্টার লাগাচ্ছে দেওয়ালের গায়ে—‘দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতার বিরুদ্ধে যুব সমাজের ধিক্কার’।
"সুমিত ঘোষ তোদের ক্লাবের এখন সর্বেসর্বা, তাই না?" অরিন্দম শুধোলেন।
"শুধু ক্লাবের নয়," নীলয় হাতের কলমটা দিয়ে টেবিলে ঠুকতে ঠুকতে বলল, "সুমিত এখন স্থানীয় কর্পোরেট ডেভেলপমেন্ট আর পৌরসভার মাঝামাঝি সেতু। এলাকা পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে কোন বাড়ি প্রমোটিংয়ে যাবে—সব সিদ্ধান্ত ওই অফিসে বসে হয়। 'অপরাজিতা'র পাঁচ কাঠা জমি আর রাজবাড়ি মার্কা পুরানো বাড়িটা ওদের চোখে একটা সোনার খনি। এতদিন তোর বাবা নিখিল মুখোপাধ্যায়ের সত্তর সালের নামটার একটা আলগা সম্মান ছিল। এখন তুই এসে ওদের কাজটা সহজ করে দিলি।"
"সহজ করে দিলাম মানে?"
"একটি চরিত্রহীন, বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপকের দখল করা পুরোনো ভিটে!" নীলয় একফোটা দ্বিধা না রেখে বলল। "পাড়ায় যদি হাওয়া ওঠে যে ওই বাড়িতে একসময় নানা অসামাজিক কাজ হতো, তাহলে ওই বাড়ি দখল করতে সুমিৎদের কোনো আইনি ঝামেলার মধ্যে যেতে হবে না। পাবলিক প্রেশার তৈরি করবে। লোকে নিজেই বলবে—'এরকম লোকের বাড়ি পাড়ায় রাখা মানে পরিবেশ নষ্ট হওয়া'। পেনপটিকন বুঝিস তো? তোদের কেতাবের ভাষা? এখন এই পুরো স্টেশন রোডটা একটা জেলখানা, আর তুই মাঝখানের খাঁচায়।"
অরিন্দম নিজের কালচে চশমাটা পকেট থেকে বের করে চোখে পরলেন। অন্ধকার কাচের আড়ালে তাঁর চোখ দুটি ঢেকে গেল।
"আমি কোনো অন্যায় করিনি নীলয়, যা করেছি তা আমার ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত। সমাজের কাছে আমি কোনো কৈফিয়ত লিখিনি, দেবও না।"
"তোর এই অহংকারটাই তোর লাশটাকে আরও পচাবে, অরিন," নীলয় গলার স্বর আরও নামিয়ে আনল। "তুই কায়দা করে বলবি 'ব্যক্তিগত জীবন'। কিন্তু সমাজ তোর ব্যক্তিগত জীবনের দরজা ভাঙতে ভালোবাসে। রিয়া সেন নামের মেয়েটার বাবা যদি এখানে কেস ঠোকে, কিংবা সোদপুরের স্থানীয় ছেলেরা যদি রাতের বেলা তোদের বারান্দায় ইট মারে, তখন তুই কোন বায়রন, বেলেদোয়ার বা জীবনানন্দ তুলে ধরে নিজেকে বাঁচাবি?"
ঠিক তখনই আবার এক তরুণ এসে কাউন্টারে দাঁড়াল। তার গায়ে চাপা জিন্সের শার্ট, গলায় মোটা রূপোর চেন। সুমিৎ ঘোষের অনুগামী।তার নাম বাবলু। সে সরাসরি অরিন্দমের দিকে না তাকিয়ে নীলয়ের দিকে চাইল।
"নীলয়দা, ক্লাবের জন্য পনেরোটা স্যাভলন আর তুলোর বান্ডিল দাও তো। ওই কলোনির মোড়ে যারা নতুন আবাসন বানাচ্ছে, ওদের প্রমোটরবাবু দিয়েছে পাঠাল।"
নীলয় নিঃশব্দে তুলো আর স্যাভলন বের করে দিল। বাবলু টাকা মিটিয়ে দেওয়ার সময় আড়চোখে অরিন্দমকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, তাচ্ছিল্যের হাসি।
"প্রফেসরবাবু না?" বাবলু হঠাৎ সরাসরি অরিন্দমের দিকে ফিরে বলল। " তা সোদপুরে কতদিন আছেন? শুনেছিলাম টিভিতে আপনার নাকি বেশ নামডাক হয়েছে?"
অরিন্দম উঠলেন। চামড়ার ব্যাগটার হাতলটা ডান হাতে চেপে ধরলেন। বাবলুর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি নীলয়ের দিকে তাকালেন। "ওষুধের দামটা কত হলোরে?"
"রাখ। পরে হবে।" নীলয়ও রুক্ষভাবে বলল।
"না। ধার আমি কারও কাছে রাখি না নিলয়।" অরিন্দম পকেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে কাউন্টারে রাখলেন।
নীলয় নোটদুটো দেখল, কিন্তু হাত দিল না। " তোর মেয়ে মেঘলার খবর কী? সে তো এখন নয়ডায় একা থাকে তাই না?"
অরিন্দমের পা দুটো মুহূর্তের জন্য দরজার কাছে থমকে গেল। তিনি পেছনে না ফিরেই বললেন, "সে তার মতো আছেরে।"
"তাকে আর এখানে আসতে বলিস না," নীলয় পেছন থেকে ভারী গলায় বলল। "এই সোদপুর আর আগের সেই সোদপুর নেই বাপ্পা। এখানে এখন সব শকুনের পাল উড়ছে। সোদ পুর এখন ইট বালি সিমেন্টের ভাগাড় । এখানে এখন প্রোমোটার দের রাজত্ব চলছে। বড় বড় দশ তলা বার তলা বিল্ডিং , মল, সুপার মার্কেট , ইওনক্স আর জেন জিদের ভিড় বাড়ছে। আমাদের সময়ের লোক জন সব চলে গেছে বা যাচ্ছে। অরিজিনাল লোকজন প্রোমোটার দের হাতে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
তোর পতন দেখতে আসা লোকগুলোর চোখে ক্ষুধা আছে। সাবধানে থাকিস কিন্তু ভাই।"
অরিন্দম ফার্মেসির কাচের দরজা ঠেলে বাইরে এলেন।
সকালের রোদটা এখন যেনো আরও প্রখর, ধুলোয় ভরা ধূসর আলো ছড়িয়ে পড়েছে স্টেশন রোডের ওপর। ফুটপাতের সব কটা মুখ—সবজি বিক্রেতা, অটোচালক, খবরের কাগজের হকার—যেন এক অজানা সুতোয় বাঁধা পড়ে তাঁর দিকে ঘুরে গেল। প্রত্যেকেই জানে। প্রত্যেকেই তাঁর পতনের প্রতিটি খুঁটিনাটি খবরের কাগজের পাতা থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে হজম করেছে।
অরিন্দম চশমার আড়ালে চোখ দুটো বুজলেন। চারপাশের এই নীরব, অদৃশ্য নজরদারি তাঁকে ঘিরে ধরেছে এক নিরেট দেওয়ালের মতো। তিনি হাঁটতে শুরু করলেন সোদপুরের পূর্বপল্লি যাওয়ার রোডের দিকে, যেখানে তার পিতৃপুরুষের জীর্ণ 'অপরাজিতা' দাঁড়িয়ে আছে নিজের নিঃসঙ্গ ক্ষয়ের অপেক্ষা নিয়ে।
অধ্যায় ১০: শেফালি দে ও জমি দখলের ছায়া
'অপরাজিতা'র সীমানা প্রাচীর ঘেঁষেই একতলা বাড়িটা। প্রায় শত বর্ষের কাছাকাছি বয়স বাড়িটার । নোনা ধরা লাল ইট, চুনকাম খসে পড়া দেওয়াল, আর ছাদের কার্নিশ থেকে নেমে আসা অশ্বত্থের শিকড় বাড়িটার জীর্ণ কঙ্কালটাকে যেন কোনোমতে ধরে রেখেছে। ঠিক তার পাশেই একটা জি প্লাস পাঁচতলা নতুন আবাসনের নির্মাণকাজ চলছে—সেখান থেকে একটানা ভাইব্রেটর আর পাইলিংয়ের ভারী ধুপধাপ শব্দ ভেসে আসছে। পুরো গলিটা ঢেকে গেছে উড়ন্ত সিমেন্টের মিহি ধূসর আস্তরণে।
অরিন্দম জং-ধরা সরু লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। উঠোনের এক কোণে আধভাঙা একটা টিউবওয়েল, তার চারপাশে সবুজ শ্যাওলার পুরু আস্তরণ।
বারান্দায় একটি জীর্ণ কাঠের ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন শেফালি দে। পঁচাশি পেরোনো প্রবীণ শরীর, ধবধবে সাদা সুতির শাড়ি জড়ানো। চোখের সামনে ঝুঁকে থাকা মোটা কাচের চশমা, আর হাতে একটা প্রাচীন পিত্তলের যাঁতি। সুপারি কাটার কুচ-কুচ শব্দটা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হলো।
অরিন্দমের পায়ের শব্দে বৃদ্ধা শেফালী দে চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে ধরলেন। ঘোলাটে ছানির আড়ালে চেনা অবয়বটা ফুটিয়ে তোলার এক ব্যাকুল চেষ্টা করলেন।
"কে? বাপ্পা? নাকি? " শেফালি পিসির গলার স্বরটা শুকনো, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতাও রয়েছে।
অরিন্দম বারান্দার সিমেন্টের সিঁড়িতে পা রাখলেন। "হ্যাঁ পিসি। আমি।"
শেফালি দে যাঁতিটা পাশে রাখা কাঠের জলচৌকির ওপর রাখলেন। চামড়া ঝুলে পড়া হাত দুটো উরুর ওপর রেখে একটু সোজা হয়ে বসলেন।
"শুনলাম নাকি কদিন আগে ফিরে এসেছিস? তা এতদিনে মনে পড়ল বুড়িটাকে? " শেফালি পিসির স্বরে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল এক শতাব্দীর সমস্ত প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের মতো নিরাসক্ত ক্লান্তি। "খবরের কাগজে তোকে নিয়ে খুব লেখালেখি হলো রে বাপ্পা দেখলাম। তোদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিচ্ছা, কলকাতার বড় বড় বাবুদের দরবারে তোকে নিয়ে কত হাঁকডাক... আমাদের এই গলির চায়ের দোকানে বসেও ছোকরাগুলো তোকে নিয়ে হাততালি দিল।- সবই কানে আসে"
অরিন্দম পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে রইলেন। "কাগজে যা লেখে, তার সবটা সত্যি হয় না পিসি।"
"সত্যি-মিথ্যে নিয়ে মাথা ঘামানোর বয়স আর আমার নেই রে," শেফালি পিসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের তারা দুটো সরিয়ে নিলেন পাশের আবাসন তৈরির দিকে। কড়কড় শব্দে মিক্সার মেশিনে পাথর আর সিমেন্ট মেশানো হচ্ছে। "আমি তো শুধু দেখছি—যে অশ্বত্থ গাছটা শুকিয়ে যাচ্ছে, তার ডালে কাক-শকুনের ভিড় একটু বেশিই জমে। তোর বাবা ভোলানাথ বেঁচে থাকলে আজ তোকে এই অবস্থায় দেখলে কী করতেন রে?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিলেন না। বারান্দার খুঁটিতে হাত রাখলেন। কাঠের বার্নিশ উঠে গিয়ে খসখসে কাঠ বেরিয়ে এসেছে।
"কাল রাতে সোদপুর ক্লাবের উঠতি ছেলেরা এসেছিল," শেফালি পিসি আবার যাঁতিটা হাতে তুলে নিলেন। হাতের কাঁপুনি সামলে সুপারির আধখানা টুকরো কাটতে কাটতে বললেন, "সেই সুমিতের অনুগামী বাবলু আর তার সাথে আরও দুটো না তিনটে ছোকরা। মুখে হাসি, কিন্তু হাতে কাগজের তাড়া। বলে গেল—'পিসি, আশেপাশের সব জমি প্রমোটিংয়ে চলে গেছে। আপনি আর একা এই ভুতুড়ে বাড়িতে থেকে কী করবেন? সইটা করে দিন, একটা ফ্ল্যাট আর বেশ কিছু ক্যাশ টাকা পেয়ে যাবেন।' আমি না বলতেই গলার স্বর বদলে গেল। বুঝেছিস কিছু? "
"কী বলল ওরা?" অরিন্দমের গলায় এক ধরণের প্রচ্ছন্ন শীতলতা ফুটে উঠল।
"বলল, 'একলা বুড়ি মানুষ, হঠাৎ রাতে যদি ছাদের কড়ি ভেঙে মাথায় পড়ে, দেখারও কেউ থাকবে না। নর্দমার জলে যদি আমার পচা লাশ ভেসে ওঠে, পুলিশও খোঁজ নেবে না।' বুঝলি বাপ্পা?" শেফালি পিসির ঠোঁটে এক বিষাদময় হাসি ফুটে উঠল। "৭১ সালে রক্ত দিয়ে জমি বাঁচিয়েছিলাম অরিন্দম। তুই তখন ১৪-১৫! আর এখন পার্টি ক্যাডাররা এসে বলে জমি না দিলে আমাকে নাকি নর্দমায় ফেলে দেবে। কী দিন এলোরে? "
অরিন্দম ওঠানামার শব্দ শুনছিলেন দূর থেকে। স্টেশন রোডের হর্ন, পাইলিংয়ের ধাক্কা আর এই একা বৃদ্ধার দীর্ঘশ্বাস।
"রক্তের দাম এখন এখানে স্কোয়ার ফুটে মাপা হয় শেফালি পিসি, সোদপুর কলকাতা হচ্ছে যে। দুদিন পরে মেট্রো রেল যাবে এই সোদ পুরের ওপর দিয়ে। জমির দাম তো বাড়বেই পিসি" অরিন্দম খুব নিচু স্বরে বললেন। "একাত্তরের সেই কংগ্রেস নকশাল আন্দোলনের পুলিশের এনকাউন্টার, বন্ধুদের লাশ, সোদপুর স্টেশনের কাছের ওই বধ্যভূমি... সেসব এখন ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা। বর্তমান লোকজন শুধু চারপাশের এই সিমেন্টের খাঁচাগুলোকে বোঝে।"
"ইতিহাস?" শেফালি পিসি হাতটা থামিয়ে অরিন্দমের দিকে ঘোলাটে চোখ চাইলেন। "ইতিহাস তো তোদের মতো পণ্ডিতদের জন্য রে। আমাদের কাছে ইতিহাস মানে কিছু স্বজন হারানোর যন্ত্রণা, যা গলার কাছে কাঁটার মতো বিধে থাকে। তুই তো চলে গেলি কলকাতায়, অনেক পাশ দিলি, প্রফেশরও হলি। কিন্তু এই পাশের কলোনির পুরোনো খবরাখবর কিছু রাখতিস?"
অরিন্দমও ভুরু কুঁচকালেন। "কাদের কথা বলছ তুমি? কিসের খবর"
"তোর সেই ছোটবেলার খেলার আর স্কুলের সঙ্গী রে... অরূপ। রঙের মিস্ত্রি বিশ্বনাথের ছেলে।"
অরিন্দমের বুকটা ভেতর থেকে এক মুহূর্তের জন্য যেন হিম হয়ে গেল। রত্না দেবীর মোটা চেহারাটা, তাঁর সেই রঙিন সুতির শাড়ি আর টালির চালের ঘরের গন্ধটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তিনি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
"অরূপ? ও তো... ও তো ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়ছিল না? পরীক্ষা ও দিয়েছিল আমি যখন চলে যাই"
"পড়ছিল," শেফালি পিসি সদর্থক মাথা নাড়লেন। "পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স গ্র্যাজুয়েট করেছিল ছেলেটা ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে। খুব ভালো মাথা ছিল রে অঙ্কে। কিন্তু চাকরি পাবে কোথায়? কত জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছিল। তোদের মতো বড়ঘরের ছেলেদের তো সুপারিশ ছিল,কিন্তু অরূপের তো কেউ ছিল না। কয়েক বছর ধরে চাকরির পেছনে জুতো ক্ষয় করার পর, বন্ধন ব্যাংকের কয়েক লাখ টাকার লোন আর কিছু মহাজনের থেকে দেনা করে কি সব কেমিক্যালের ছোট একটা পাইকারি ব্যবসা নাকি শুরু করেছিল।"
"তারপর?" অরিন্দমের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছিল।
"ব্যবসাটা আর সামলাতে পারেনি," শেফালি পিসির স্বর আরও নিচু, আরও নির্দয় হয়ে এল। "কলোনিরই এক মেয়েকে বিয়েও করেছিল, দু দুটো ছোট ছোট ছেলেমেয়েও হয়েছিল। কিন্তু দেনার দায় দিনে দিনে পাহাড়ে গিয়ে ঠেকল। মহাজনের লোক এসে রোজ সন্ধ্যায় ওই টিনের চালার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের গালাগালি করত। অরূপ পাড়ায় আর মুখ দেখাতে পারত না। শেষমেশ একদিন..."
শেফালি পিসি থামলেন। বারান্দার ওপর দুটো চড়াই পাখি এসে বসল, পরক্ষণেই পাইলিংয়ের বিকট শব্দে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল।
"একদিন সকালে কলোনির মোড়ে শোরগোল উঠল," শেফালি পিসি বললেন। "সোদপুর ১ নম্বর রেলগেটের কাছে ডাউন শান্তিপুর লোকালটার সামনে গিয়ে নাকি দাঁড়িয়েছিল অরূপ। শরীরটা দু-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল লাইনের ওপর। একটা ছেঁড়া নীল প্যান্ট আর স্কলারশিপের পুরোনো খাতাটা ব্যাগে পড়েছিল শুধু।"
অরিন্দমের মাথার ভেতর যেন একটা ভারী রড এসে আঘাত করল। সোদপুরের রেললাইনের সেই বিকট শব্দ—ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...—যা প্রতি রাতে তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, তার ভেতরে যেন এক অদেখা বন্ধুর মাংস পেশির চূর্ণ হওয়ার শব্দ লুকিয়ে আছে।
"আর... আর রত্নামাসিমারা?" অরিন্দম কোনোমতে শব্দ দুটো উচ্চারণ করলেন।
"রত্নার কথা বলছিস?" শেফালি পিসি মুখটা অন্যদিকে ফেরালেন। " পেটের ছেলের ওই রক্তভেজা প্যান্টটা আঁকড়ে ধরে তিনদিন একফোঁটা জলও মুখে দেয়নি রে। বিশ্বনাথ তো আগেই মদ খেয়ে তার লিভার পচিয়ে মরেছিল। অরূপের মৃত্যুর চার পাঁচ বছরের মাথায় রত্নাও শেষ হয়ে গেল। সেই মেদবহুল শরীরটা শুকিয়ে একেবারে কাঠি হয়ে গিয়েছিল শেষের দিকে। একেই সুগার ধরেছিল , তার ওপরে হলো জন্ডিস আর তীব্র রক্তাল্পতা ছিলই। ওষুধ কেনার টাকাটুকুও ছিল না ওদের। ঘোলা হাসপাতালে এসে এসে দেখাতো। তোর কথাও জিজ্ঞেস করতো খুব। আমি তোর কোনো খবর রাখি কিনা? তোর ঠিকানা জানতাম না তো। "
অরিন্দম দুই হাতে বারান্দার খুঁটিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর কপালে ঘাম জমে উঠেছে। সতেরো বছর বয়সে যে বিবাহিতা নারীটির কাছ থেকে তিনি একশো টাকা বা দুশো টাকার বিনিময়ে অপরাধবোধ কিনেছিলেন, সেই টাকাটা তো এই অরূপেরই বই খাতা টিউশন ফি আর প্যান্ট কেনার জন্য জমা হতো! রত্না দেবী তো তাঁর কাছে শরীর বিক্রি করতেন না, বিক্রি করতেন নিজের অপরাধবোধ—সন্তানের ভবিষ্যৎ কেনার জন্য। পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স গ্র্যাজুয়েট হয়েও তীব্র বেকারত্ব। দেশে প্রতি বছর দুই কোটি করে নাকি চাকরী তৈরী করবে সরকার। কিন্তু সেই ১৯৮১ সাল থেকে বেকারত্ব তো বেড়েই চলেছে। বামফ্রন্ট এর আমলে তবুও কিছু কিছু লোক চাকরী পেতো এই রাজ্যে। ২০১৪ সালের পর থেকে এখন আর সরকারি, আধা সরকারি অফিসে কোনো নিয়োগ আর হয় না। সব নিয়োগ বন্ধ। কারখানা বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় গুলির সাধারণ স্ট্রিমের ডিগ্রি গুলোর কোনো দাম নেই চাকরির বাজারে আর যদি না পার্টি তে কয়েক লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। সেটা নিজেও টের পেয়েছিলেন কয়েক বছর ধরে,১৯৮৩ সালে বারাণসী থেকে phd করার পরে, কলকাতায় ফিরে এসে।
অরিন্দমের মনে হলো, তিনি যেন বহুকাল ধরে এক মৃত বন্ধুর রক্ত আর তার মায়ের আত্মগ্লানির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের পুরুষত্ব আর বুদ্ধিমত্তার অহংকারকে তৈরি করেছিলেন।
"মা-ছেলে-বাবা কেউ বাঁচেনি রে," শেফালি পিসি বলে চললেন, যেন নিজের মনেই কথা বলছেন। "অরূপের বৌটা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আছে, ওদের টিনের ঘরটা প্রমোটাররা সেই কবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে। সেখানে একটা দুই কামারার ফ্ল্যাটে তারা আছে। এখন তো সেইসব ফ্ল্যাট গুলোতে নতুন নতুন সবলোক , নতুন সব ভাড়াটে।…কেউই কাউকে চেনে না। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মরে গেলেও খোঁজ রাখে না কেউ পচা গন্ধ না ছড়ালে"
অরিন্দম ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নেমে এলেন। পা দুটি যেন সীসে দিয়ে বাঁধা।
"তুই কোথায় যাচ্ছিস বাপ্পা?" শেফালি পিসি পেছন থেকে ডাকলেন।
অরিন্দম পেছনে ফিরে তাকালেন না। তাঁর চোখের সামনে তখন উড়ন্ত সিমেন্টের ধুলো আর একাত্বরের পুরোনো সোদপুরের কলোনি একাকার হয়ে যাচ্ছে।
"পিসি," অরিন্দম বললেন, তাঁর গলায় কোনো আবেগ ছিল না, ছিল এক শ্মশান-শীতল শূন্যতা। "বাড়িটা পারলে ওদের দিয়ে দিও। স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার মতো মর্মান্তিক শাস্তি আর কিছু হয় না।"
"তুইও বুঝি দিয়ে দিবি তোদের 'অপরাজিতাকে?' দিয়ে দে তুই। আমি বেঁচে থাকতে দিতে পারবো না" শেফালি পিসির গলায় একটা তীব্র খোঁচা ছিল।
অরিন্দম কোনো উত্তর না দিয়ে গেট ঠেলে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।
বাইরে রোদটা তখন মধ্যগগনে। প্রোমোটার এর নতুন আবাসনের পাঁচতলায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন রাজমিস্ত্রি ইট গাঁথছে। আর ঠিক দূরে, স্টেশন রোড অতিক্রম করে একটা দীর্ঘ মালগাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে শহরের দিকে।
রেললাইনের সেই একই চেনা ধাতব গর্জন—
ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...
অরিন্দম পকেটে হাত পুরে সোদপুরের সেই ধুলোভরা মেঠো গলি দিয়ে নিজেদের জীর্ণ, একাকী 'অপরাজিতা'র দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, অতীতের প্রতিটি লাশ আজ সোদপুরের ইট-কাঠ-সিমেন্ট আর লিফটের নিচে চাপা পড়ে আছে, আর তিনি হেঁটে চলেছেন এক জীবন্ত কবরস্থানের মধ্য দিয়ে।
অধ্যায় ১১ : পশুর আশ্রয় ও ডাক্তার মাধবী পাল
সোদপুর পূর্বপল্লীর সরু গলিটা যেখানে গিয়ে একটা মরা ড্রেনের মোড়ে এসে মিশেছে, সেখানেই একতলা খুউব সুন্দর একটা তিনতলা বাংলো টালির চালের বাড়িটা। আগে ছিলো না। জায়গাটা একটা ছোটো ডোবা ছিলো।
গলির মুখ থেকেই বাতাসে ভেসে আসছিল স্যাভলন, ফিনাইল, আইওডিন আর ভেজা কুকুরের গায়ের তীব্র সোঁদা সোদা গন্ধ। তার সাথে মিশেছে একাধারে কয়েকটা কুকুরের তীক্ষ্ণ ঘেউ ঘেউ চিৎকার আর শিকল টানার ক্যাকোফোনি। উঠোনের ওপর রং করা লোহার গেট, পাশে হেলে পড়া একটা পিত্তলের ট্যাক্সিমার্ক সাইনবোর্ড—‘প্রাণী কল্যাণ কেন্দ্র’। বাতাসের ধাক্কায় গেটটা মৃদু কাঁপছিল, তার কব্জি থেকে বেরোচ্ছিল এক রুক্ষ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ।
অরিন্দম থমকে দাঁড়ালেন। আগের অধ্যায়ে শেফালি পিসির মুখ থেকে শুনে আসা অরূপের আত্মহত্যার খবরটা তখনও তাঁর মাথার ভেতরে একটা ভারী রডের মতো বাজছিল। সোদপুরের রেললাইনের ধূসর মাটি আর অরূপের রক্তভেজা ছেঁড়া প্যান্টের ছবিটা চোখের সামনে থেকে তখনও সরেনি।
তিনি দ্বিধাগ্রস্ত পায়েই উঠোনে পা দিলেন।
উঠোনের একপাশে মেঝের ওপর খবরের কাগজ পেতে শোয়ানো তিন-চারটে রাস্তার নেড়ি কুকুর, কারও পায়ে ব্যান্ডেজ, কারও গলায় প্লাস্টিকের শক্ত কলার পরানো। অরিন্দমের জুতোর শব্দে একটা তিন-পাওয়ালা কালচে কুকুর উঠে বসে চাপা গর্জন করে উঠল।
"টমি! চুপ!"
টালি চালার নিচ থেকে একটা কড়া, নির্দ্বিধ নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
অরিন্দম শেডের নিচে এলেন। ছায়াবৃত সেই ঘরে আলোর চেয়ে মাছি আর ফিনাইলের ঝাঁঝ বেশি। মাঝখানে একটা উঁচু স্টেইনলেস স্টিলের ট্রলি-টেবিল। তার ওপর পিনপতন নীরবতায় শোয়ানো রয়েছে একটা বড়সড় মেটে রঙের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা কুকুর। কুকুরটার পেছনের একটা পা প্রমোটারের মালবাহী লরির চাকার নিচে পড়ে পুরোটাই প্রায় থ্যাঁতলে গেছে—খোলা মাংস আর থেঁতলানো হাড়ের খাঁজ থেকে তখনও রক্ত চুঁইয়ে ড্রেন-বোর্ডে পড়ছে।
টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪৫ বছরের ভেটেরিনারি ডাক্তার মাধবী পাল ভেটেরিনারি সার্জন।
সুতির একটা সাধারণ ছাপা শাড়ির ওপর একটা নীল রঙের রাবারের ড্রেসিং এপ্রন পরানো, তাতে পুরোনো রক্ত আর বেটাডিনের কালচে কালচে দাগ। চুলগুলো শক্ত করে মাথার ওপরের দিকে পেঁচিয়ে খোঁপায় বাঁধা, গলায় ঝুলছে একটা লিটম্যান স্টেথোস্কোপ। তাঁর ডানহাতে একটা স্টিলের সিরিঞ্জ, আর বাঁ হাত দিয়ে কুকুরটার ভেজা ঘাড়ের চামড়া শক্ত করে চেপে ধরা।
অরিন্দমকে দেখে মাধবী একবারও কাজ থামালেন না। চকিতে শুধু চোখের তারা দুটো তুললেন—সেখানে কোনো কুশল বিনিময় বা ভদ্রতার প্রলেপ নেই।
"ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে কুকুরটার পা একটু চেপে ধরুন তো!" মাধবী হুকুমের সুরে বললেন।
অরিন্দম একপা পিছিয়ে গেলেন। ট্রলির ওপর থেকে উঠা তাজা রক্তের গন্ধ আর পশুর যন্ত্রণাক্লিষ্ট নিঃশ্বাসের উত্তাপ সোজা তাঁর মুখে এসে লাগল। "আমি... আমি রক্ত একদম সহ্য করতে পারি না ম্যাডাম।”
মাধবী হাতের সিরিঞ্জটা ট্রলির ট্রে-তে রাখলেন। তারপর সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে চাইলেন। তাঁর গালের চামড়া খুবই মসৃণ ও লালচে ফর্সা, চোখের নিচে বয়সের সামান্য হালকা একটু ভাঁজ, কিন্তু দৃষ্টিতে এক ধরনের ছাঁটাই করা, নির্দয় বাস্তবতা।
"রক্ত দেখতে বুঝি ভয় পান, প্রফেসর অরিন্দম মুখার্জি?" মাধবীর গলায় বিন্দুমাত্র আর্দ্রতা ছিল না। এক ঝটকায় স্থানীয় চেতনানাশক ইনজেকশনটা কুকুরটার উরুর খোলা মাংসের খাঁজে ফুটিয়ে দিলেন।
কুকুরটা ছটফট করে তীব্র আর্তনাদ করে উঠল ঘেউ ঘেউ, তারপর ধীরে ধীরে তার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে কাঁপতে লাগল।
"সাহিত্যের ক্লাসে ট্র্যাজেডির নাটক পড়ানো খুব সহজ অরিন্দমবাবু," মাধবী কাঁচি আর নিডল-হোল্ডারটা তুলে নিয়ে বললেন, "কিন্তু বাস্তবের রক্ত আর পুঁজ সামলানো শক্ত। এবারে ধরবেন, না আমি একাই করব?”
অস্বস্তিকে কোনোমতে চেপে অরিন্দম এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি জ্যাকেটের হাতাটা একটু গুটিয়ে পশুর সামনের থাবা দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর হাতের তালুতে এসে লাগল কুকুরটার চামড়ার নিচের কাঁপন, হৃদযন্ত্রের দ্রুত ধুকপুকানি আর এক অবোধ, বাকহীন প্রাণীর আদিম যন্ত্রণার উত্তাপ।
মাধবী নিপুণ হাতে সেলাইয়ের জন্য নিডল ও ক্যাটগুট সুতোটা চামড়ার ফাঁক দিয়ে টেনে আনছিলেন। সুতো টানার সাথে সাথে ট্রলির স্টিলের গায়ে রক্তের ছোট ছোট ফোঁটা জমা হচ্ছিল।
"আপনি একা হাতে এতগুলো প্রাণীকে কেন সামলান?" অরিন্দম কিছুটা অস্বস্তি কাটানোর জন্যই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন।
"কারণ মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, কিন্তু কুকুররা সেটা পারে না," মাধবী সুতোয় শক্ত গিট বাঁধতে বাঁধতে বললেন। তাঁর চোখ রক্তভেজা ক্ষতস্থানের ওপর নিবদ্ধ। "শুনলাম কলকাতা থেকে নাকি কোনো এক মহিলাকে যৌন হেনস্থার অপবাদের তাড়া খেয়ে সোদপুরের আপনাদের পুরোনো ভিটেতে এসে উঠেছেন? আপনার কেসটা আপনার ছোটবেলার বন্ধু নীলয়ই বলছিল। ওর বাড়ির এলসেসিয়ান কুকুরের আর বেড়ালের ভ্যাকসিন এখান থেকেই নেয়।"
অরিন্দমের হাতের তালুটা এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে গেল। তাঁর চোয়ালের হাড় দুটো শক্ত হয়ে উঠল। "কলোনির লোকতো অনেক আজব বাজে কথা বলতেই ভালোবাসে।"
"কলোনির লোকগুলো খুব বাস্তববাদীও হয় কিন্তু, অরিন্দমবাবু।"
মাধবী শেষ সেলাইটা কেটে নিডল-হোল্ডারটা সহ নিডল আর সিল্কের সুতো ট্রে-তে ফেললেন। টুং করে একটা শুকনো ধাতব শব্দ হলো। তারপর হাতের গ্লাভস দুটো টেনে খুলে প্লাস্টিকের বালতিতে ফেলে দিয়ে উঠোনের টিপকলের দিকে হেঁটে গেলেন।
ঝরঝর করে জল পড়ার শব্দ শুরু হলো টিপ কল থেকে। মাধবী রাবারের নীল এপ্রনটা খুলে একটা খুঁটিতে ঝেড়ে ঝুলিয়ে দিলেন। কনুই পর্যন্ত সাবান দিয়ে ধুতে ধুতে পেছনে ফিরে চাইলেন।
"এখানে কিন্তু আপনার লর্ড বায়রন বা রোমান্টিক কবিতা কেউ বুঝবে না," মাধবী গামছায় হাত মুছতে মুছতে বললেন। "বাঁচতে গেলে ঠিক পশুর মতো বাস্তব হতে হয়। আপনার মতো শিক্ষিত মানুষেরা নিজেদের চারপাশে কাব্যের একটা দেওয়াল তুলে রাখে, যাতে নিজেদের ভেতরকার কদর্যতাটা বাইরে দেখা না যায়।"
অরিন্দম তুলোয় হাতের রক্তমাখা জলটুকু মুছে নিলেন। "আপনি আমাকে না জেনে বিচার করছেন, ডাক্তার পাল।” তারপরে টিপ কলের দিকে এগিয়ে গেলেন হাত ধুতে।
টালিচালার ওপর থেকে দুপুরের চড়া রোদ থকথকে হয়ে নেমে আসছিল পশুর আশ্রয়কেন্দ্রটির সিমেন্টের মেঝেতে। ট্রলির স্টিলের ওপর জমানো রক্তের গাঢ় লালচে দাগটা হাওয়া লেগে শুকিয়ে ততক্ষণে কালচে হয়ে আসছে। চেতনানাশক ইনজেকশনের প্রভাবে প্রমোটারের লরির চাপ খাওয়া সেই মেটে রঙের কুকুরটার বুকটা এখনও সমান ছন্দে উঠছে আর নামছে। পাশে ফিনাইলের বালতিতে ফেলা রক্তের থোকা ভেসে থাকা জলটা স্থির।অরিন্দম ঘরের এককোণে রাখা একটি কাঠের টুল টেনে বসে পড়লেন। তাঁর কপালে আর নাকের দু-পাশে গাঢ় ঘামের ফোঁটা। যে হাত দুটো দিয়ে এতক্ষণ পশুর থাবা চেপে ধরেছিলেন, সেই আঙুলগুলো হালকা কাঁপছে। মাধবী টিপকল থেকে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে ফিরে এলেন ট্রলির পাশে। টেবিল থেকে রক্তমাখা কাঁচি, সিরিঞ্জ আর নিডল-হোল্ডারটা তুলে নিয়ে একটা স্টিলের ট্রে-তে রাখলেন। স্টেরিলাইজ করতে দিতে হবে। ধাতুর সাথে ধাতুর টুং-টাং শব্দটা ছোট ঘরটায় তীব্র শোনালো।
"চা খাবেন তো?" মাধবী না তাকিয়েই শুধোলেন। অরিন্দম একটু থমকে চাইলেন। "এই দুর্গন্ধের মধ্যে... চা?"। "গন্ধটা পশুর রক্তের আর স্যাভলনের স্পিরিট ও বেটাডিনের এর, প্রফেসর," মাধবী একটি কাচের ট্রের ওপর থেকে বেটাডিনের বোতলটা তুলে নিতে নিতে বললেন। "মানুষের মনের ভেতর যে পচন ধরে, তার চেয়ে এই গন্ধ অনেক ভালো। সহ্য হয়ে যায়।"
"আপনি অত্যন্ত রুক্ষ ভাবে কথা বলেন, ডাক্তার পাল," অরিন্দম নিজের চশমাটা খুলে শার্টের কোনায় মুছতে লাগলেন। চশমার কাচ জোড়া সরতেই তাঁর চোখের কোণের বলিরেখা আর ক্লান্ত ডার্ক সার্কেলগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। "অভিজ্ঞতা মানুষকে বাস্তববাদী করতে পারে, কিন্তু এতখানি নির্মম করা কি জরুরি?"
মাধবী ট্রে-টা টেবিলের ওপর একটু জোরেই রাখলেন। শব্দটা থিতু হওয়ার আগেই তিনি অরিন্দমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, "নির্মম? আমি প্রতিদিন এই গলির মোড়ে, স্টেশনের ধারে রক্তাক্ত পশুপাখি গুলোকে কুড়িয়ে আনি। মানুষ তাদের গা বাঁচিয়ে চাকার নিচে পিষে দিয়ে চলে যায়। আর যে মানুষটা নিজের কাম, অহংকার আর বুদ্ধির দম্ভ দিয়ে অন্য একটা জীবনকে পিষে দেয়, সেও কিনা এসে আমাকে বলছে নির্মম?" হাসি পাচ্ছে।
অরিন্দমের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি মাথা নিচু করে নিলেন। "আপনি নীলয়ের কাছে যা শুনেছেন, সেটা একটা একতরফা সত্যি। খবরের কাগজ বা পাড়ার লোক যা প্রচার করে, সবটা কিন্তু ব্যাকরণ মেনে সত্যি হয় না।"
"আমি এখন আর খবরের কাগজ পড়ি না, অরিন্দমবাবু," মাধবী আলমারি থেকে তুলোর রোল বের করে কাঁচি দিয়ে টুকরো করতে করতে বললেন। "আর নীলয় দত্তের ওষুধের দোকানে গিয়ে কে কী রটাচ্ছে, তা নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু দেখছি একজন আটান্ন বছরের নামজাদা অধ্যাপক, যার কিনা চুল পেকে গেছে, যিনি সারা জীবন ক্লাসরুমে নীতি আর নান্দনিকতার ভাষণ দিয়ে এলেন, শেষ বয়সে একটা ত্রিশ বছরের মেয়ের জীবন আর নিজের সম্মানকে বিক্রি করে সোদপুরের এই ভুতুড়ে ভিটেতে এসে লুকিয়ে আছেন।"
"আমি লুকিয়ে নেই!" অরিন্দমের স্বর একমুহূর্তের জন্য উঁচু হলো, কিন্তু পরক্ষণেই টালিরচালে একটা কাক এসে বসায় তিনি নিজের গলা নামিয়ে আনলেন। "রিয়া... রিয়া সেনকে আমি কোনো জোর করিনি। সেও প্রাপ্তবয়স্ক ছিল। ত্রিস বছর বয়েস তার। কবিতা লিখত, নাটক লিখত। একটা বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণ থেকে সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল। সে নিজে হাতে ধরেই আমাকে নিয়ে গেছিলো বিছানায়"
মাধবী একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কেবল ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রবীণ নারীর চরম ধিক্কার।
"বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণ?" মাধবী তুলোর ট্রলিটা গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন। "আপনাদের মতো শিক্ষিত পুরুষদের এই একটা বড় ব্যাধি! নিজেদের আদিম প্রবৃত্তি আর যৌনতাকে ঢাকতে আপনারা কতগুলো ভারী বড় বড় সাহিত্যের শব্দ ব্যবহার করেন। বুদ্ধিবৃত্তিক! কবিতা! সৌন্দর্য! মেয়েটা ছোট ছিল অরিন্দমবাবু, আপনার মেয়ের সমান বা অল্প বড়। তাই না? । আপনার বয়সের আর ক্ষমতার পদচ্ছায়ায় সে হয়তো বিভ্রান্ত হয়েছিল। আর আপনি নিজের শেষ হতে চলা পুরুষত্বকে আবার চাঙ্গা করতে ওর শরীরটাকে ব্যবহার করেছিলেন। এটাকে সাহিত্য বলে না, এটাকে বলা হয় মানসিক শোষণ।"
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। ঘরের ফ্যানের শুকনো বাতাসে ফিনাইলের গন্ধটা যেন আরও ভারী হয়ে তাঁর ফুসফুসে ঢুকে যাচ্ছে।
"আপনি আমার চরিত্রচ্ছেদ করতে বসছেন কেন?" অরিন্দম কিছুটা আক্রোশের সাথেই বললেন। "আপনি ভেটেরিনারি ডাক্তার, পশুর চিকিৎসা করুন। মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার নাম করে এই নীতিপুলিশের ভূমিকাটা আপনাকে মানায় না।"
"মনস্তত্ত্ব আমি বুঝতে চাইও না," ডাক্তার মাধবী একটা স্টুল টেনে অরিন্দমের উল্টোদিকে বসলেন। তাঁর গায়ের নীল এপ্রনে এখনও রক্তের স্পষ্ট দাগ। "আমি শুধু শরীর আর তার যন্ত্রণা চিনি। একটা কুকুর যখন চাকার নিচে পড়ে চিৎকার করে, সে তখন ভণ্ডামি করে না। তার যন্ত্রণায় কোনো রূপক থাকে না, কোনো রোমান্টিকতাও থাকে না। কিন্তু আপনি... আপনি এই যে সোদপুরে নিজের ভিটেতে ফিরে এসেছেন, নিজের ভেতর একটা 'শহীদ' বা 'পতিত নায়ক'-এর ভাবমূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছেন, এটা দেখতে আমার ঘৃণা করে।"
"আমি কিন্তু কোনো ভাবমূর্তিই তৈরি করছি না!"
"করছেন," মাধবী সোজা অরিন্দমের চোখের তারায় চোখ রাখলেন। "আপনি ভাবছেন—'আহা, আমি সমাজের শিকার! আমি এক মহৎ অনুভূতির জন্য সর্বস্ব হারালাম!' না অরিন্দমবাবু, আপনি স্রেফ একটা স্বার্থপর মানুষ। যে নিজের ইচ্ছেমতো অন্যকে ব্যবহার করে, আর যখন সমাজ লাথি মেরে বের করে দেয়, তখন কলোনির ভাঙা ঘরে এসে 'জীবনানন্দ' আর 'বায়রন' আউড়ে নিজের পাপ ঢাকে।"
অরিন্দম দুই হাতে কপাল চেপে ধরলেন। তাঁর মনে হলো, কলকাতার ইউনিভার্সিটির তদন্ত কমিটি, সংবাদপত্রের রিপোর্টার, রিয়া সেনের বাবার হুমকি—এমনকি শেফালি পিসির মুখ থেকে শুনে আসা অরূপের করুণ আত্মহত্যার গল্প—সবটা মিলে যেন এই পঁয়তাল্লিশ বছরের নিঃসঙ্গ নারীটির ধারালো কথার কাছে এসে এক নিমেষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
"তাহলে আমার কী করা উচিত ছিল?" অরিন্দমের গলায় এক গভীর আকুলতা ঝরে পড়ল, যা এতদিন তাঁর আত্মম্ভরিতার নিচে চাপা পড়েছিল। "গলায় দড়ি দিয়ে মরা? অরূপের মতো সোদপুরের ওই এক নম্বর রেলগেটে গিয়ে শান্তিপুর লোকালের সামনে শুয়ে পড়ব? তাতে কি এই সমাজের খিদে মিটত?"
মাধবী একমুহূর্ত থামলেন। অরূপের নামটা শুনে তাঁর চোখের তারাটা সামান্য একটু সংকুচিত হলো, কিন্তু তিনি নিজের স্বাভাবিক নির্দ্বিধ ভাব ধরে রাখলেন।
"অরূপের মতো দুর্বল হওয়াটা পাপ হতো," মাধবী ঠান্ডা গলায় বললেন। "কিন্তু বেঁচে থেকে নিজের পাপকে অস্বীকার করাটা আরও বড় অপরাধ। সোদপুরের ১ নম্বর রেলগেটের ওই ঠান্ডা লোহার ওপর কত যে মানুষের রক্ত লেগে আছে আপনি জানেন? কলোনির মোড়ে সুমিত ঘোষরা প্রতিদিন এক একটা মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে মারছে। আমার এই প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রের জমিটা কেড়ে নেওয়ার জন্য ওরা প্রমোটারদের থেকে টাকা খেয়েছে। কিন্তু আমি পালিয়ে যাইনি, চাকার সামনে শুয়েও পড়িনি।"
অরিন্দম মুখ তুলে চাইলেন। "ওরা আপনার জমিও কাটতে চায়?"
"আমার একার জমি নয়," মাধবী উঠে দাঁড়ালেন। ট্রলির ওপর ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটার মাথায় একবার আলতো হাত বুলিয়ে দিলেন। পশুর প্রতি তাঁর সেই ছোঁয়াটুকুই একমাত্র কোমলতা। "আপনার ওই 'অপরাজিতা' বাড়ির পাঁচ কাঠা ছয় ছটাক জমির ওপর সুমিতের নজর বহুদিনের। এতদিন আপনার বাবার ভোলাবাবুর পুরোনো কমিউনিস্ট ইমেজের একটা সামান্য আড়াল ছিল। কিন্তু এখন? এখন আপনি তো সমাজচ্যুত, একটা চরিত্রহীন অপবাদে চিহ্নিত অধ্যাপক। পাড়ার লোককে বোঝানো সুমিতের জন্য খুব সহজ—'ঐ পাপীর ভিটেতে সমাজবিরোধী কাজ হচ্ছে, জমিটা ক্লাবের নামে বা আবাসনের নামে নিয়ে নাও'।"
"ওরা এত দূর যেতে পারে?"
"ওরা আরও অনেক দূর যেতে পারে," মাধবী ট্রলি থেকে রক্তমাখা গ্লাভসগুলো প্লাস্টিকের প্যাকেটে পুরতে পুরতে বললেন। "পুঁজিবাদ আর স্থানীয় রাজনীতির কোলাবোরেশন যখন তৈরি হয়, তখন সেখানে নৈতিকতার কোনো মূল্য থাকে না। স্থান থাকে না। আপনি ভেবেছিলেন সোদপুরে এসে নিজের অতীতকে ভুলে নির্জনতায় দিন কাটাবেন? সোদপুর এখন এক আস্ত প্যানোপটিকন। প্রতিটি মোড়ে চায়ের দোকান, প্রতিটি গলির ক্লাবঘর এক একটা বড় ওয়াচ-টাওয়ার। আপনার প্রতিটি গতিবিধি এখন মেপে নেওয়া হচ্ছে।"
অরিন্দম নিজের রুমালে চোখ দুটো মুছলেন। চশমাটা আবার চোখে পরা মাত্র চারপাশের বাস্তবতাটা আবার স্পষ্ট আর ধারালো হয়ে উঠে এল।
"আপনি আমাকে এত বিষোদ্গার করার পরও এগুলো বলছেন কেন?" অরিন্দম শান্ত, বিষণ্ন স্বরে শুধোলেন।
মাধবী দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে বিকালের আলো নামছে, সোদপুর স্টেশনের দিক থেকে আবার ট্রেনের কড়কড় শব্দ ধেয়ে আসছে।
"কারণ আমি আপনাকে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে করুণা করি না, অরিন্দমবাবু," মাধবী পেছন ফিরে বললেন। "আমি শুধু চাই, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত নিজের ভেতরের ওই নগ্ন, স্বার্থপর মানুষটাকে চিনতে শিখুন। কোনো কাব্যের পোশাক না পরিয়ে, কোনো দর্শনের বাহানা না বানিয়ে। কাল সকালে নয়টায় আসবেন। কুকুরটার অ্যান্টিবায়োটিক ড্রেসিং করতে হবে। আর হ্যাঁ... আসার সময় হাতের নখগুলো কেটে আসবেন। পশুর গায়ে আপনার নখের থেকে ইনফেকশন হতে দেব না।"। অরিন্দম আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন।
উঠোনের জংধরা গেটটা ঠেলে যখন বাইরে রাস্তায় এলেন, তখন বাতাসে ফিনাইলের গন্ধ ছাপিয়ে আবার সোদপুরের সেই ধুলো, ড্রেনের দুর্গন্ধ আর ডিজেলের ধোঁয়া আছড়ে পড়ল। কিন্তু তাঁর মাথার ভেতরে মাধবীর প্রতিটি কথা যেন এক একটা ধারালো স্ক্যালপেলের মতো কাজ করে গেছে।
দূরে স্টেশন রোডের লাইটগুলো একটা একটা করে জ্বলে উঠছে। আর সেই আলো-আঁধারির মাঝে দাঁড়িয়ে সোদপুরের পুরোনো গলির মানুষগুলো নাকি নীরব শকুনের মতো নজর রাখছে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে।
অধ্যায় ১২: তিস্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামার ঠিক আগের মুহূর্তটায় সোদপুর স্টেশন রোডের পিছনের গলিটা কেমন একটা ঘিনঘিনে ছাইরঙে ঢেকে যায়।
রেললাইনের পাশের নর্দমা থেকে উঠে আসা পচা পাঁক আর সস্তা সরষের তেলে ভাজা পেঁয়াজির গন্ধ একসঙ্গে মিশে বাতাসটাকে ভারী করে রেখেছিল। অপরাজিতা—নিজের পৈতৃক বাড়িটার দিকে ফেরার জন্য অরিন্দম সবসময় ক্লাবের পিছনের এই সংকীর্ণ চোরারাস্তাটাই বেছে নেন। দু’পাশে পুরোনো একতলা বাড়ির নোনা-ধরা উঁচু পাঁচিল, মাথার ওপর এলোমেলো কালো বিদ্যুতের তারের জট, আর পায়ের নিচে ভিজে, পিছল শ্যাওলাধরা ইট।
অরিন্দমের হাতে ছিল একটা কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ। তাতে ছিলো নীলয় দত্তের দোকান থেকে কেনা প্রেসারের ওষুধ টুকিটাকি রোজকারের প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র আর কয়েকটা সামান্য শাকসবজি।
গলির ঠিক মাঝখানটায় এসে তাঁর পা থমকে গেল।
রাস্তার সংকীর্ণ বাঁকটায়, যেখানে পুরোনো ক্লাবের ভাঙা দেয়ালটার গায়ে আধছেঁড়া এক রাজনৈতিক পোস্টার ঝুলছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সুমিত ঘোষ। পরনে ইস্ত্রি করা জলপাই রঙের সুতির শার্ট, পকেটে একটা দামী আই স্মার্টফোন, অর্ধেক বেরিয়ে আছে। পাশে ক্লাবের দুটো কমবয়সী ছেলে—তাদের একজনের হাতে আধপোড়া সিগারেট, অন্যজন হাঁটুতে হাত দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে চর্ব্য চিবোচ্ছে।
আর ঠিক দু’ধাপ পেছনে, ছাতিম গাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল তিস্তা পাল। মাধবী পালের বাইশ বছরের মেয়ে। পরনে লাল রঙের কুর্তি, কাঁধে সুতির থলে। তার চোখ দুটো সন্ধের আবছা আলোতেও অতিরিক্ত ধারালো বলে মনে হচ্ছিল।
অরিন্দম থামলেন, কিন্তু ব্যাগের হাতলটা ছাড়লেন না।
সুমিত নিজের পকেট থেকে হাত দুটো বার করে সামান্য হাসল। সেই হাসিতে কোনো সৌজন্য ছিল না, ছিল কেবল এক ধরণের ঠাণ্ডা, স্থানীয় ক্ষমতার দাপট। সে এক পা এগিয়ে এসে রাস্তাটাকে সম্পূর্ণ আটকে দাঁড়াল।
"অধ্যাপকবাবু না?" সুমিতের গলাটা খাঁকারি দেওয়ার মতো শোনালো। সে সিগারেটের ছাইটা বাঁ হাতের নখ দিয়ে এক ঝটকায় মাটিতে ফেলল। "নমস্কার। এতদিন তো দূরে দূরেই দেখতাম। আজ ভাবলাম একটু সামনাসামনিই পরিচিত হওয়া যাক।"
অরিন্দম চশমার কাচটা ওপরের দিকে একটু ঠেলে দিলেন। ওনার চিবুকের চামড়া সামান্য কুঁকড়ে গেল, কিন্তু চোখে কোনো অস্থিরতা ফুটে উঠল না।
"আমার যাওয়ার পথটা ছাড়ুন," অরিন্দম খুব নিচু, সমতল গলায় বললেন।
"পথ তো ছাড়বই স্যার," সুমিত একটু হেলান দিয়ে দেয়ালটার দিকে ভর দিল। "সোদপুরের পথ তো বাইরের সবার জন্যই খোলা। তবে কথা কী জানেন? কে কোন্ পথে হাঁটছে, আর কার হাঁটায় এলাকার বাতাস কেমন হচ্ছে—সেটা একটু খেয়াল রাখতেই হয় আমাদের। ক্লাবের ছেলেপুলেদেরও নজর রাখতে হয়। স্যারের অধ্যাপক হিসেবে নাম তো কলকাতায় অনেক শুনলাম। খবরের কাগজেও আপনার নাম-ছবি শুদ্ধ ছাপা হয়েছিল শুনেছি। কিন্তু সোদপুরের পূর্বপল্লীর পরিবেশ খারাপ হতে দেব না আমরা।"
অরিন্দম কথা বললেন না। তিনি সুমিতের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। সুমিতের শার্টের দ্বিতীয় বোতামটা খোলা, সেখান দিয়ে একটা ভারী সোনার চেনের টুকরো ঝিকমিক করছে। এই লোকগুলোই নাকি সোদপুরের পুরনো উদ্বাস্তু কলোনির ওপর রাতারাতি প্রমোটিংয়ের বহুতল বিল্ডিং দাঁড় করাচ্ছে, অথচ তাদের মুখে এখন নীতিবিদ্যার বুলি।
"কী হলো স্যার? চুপ করে রইলেন যে?" সুমিতের পাশের ছেলেটা হালকা বিদ্রূপের হেসে উঠল।
"বলার মতো কিছু নেই, তাই " অরিন্দম শান্তস্বরে বললেন। "তোমাদের ক্লাব যদি সোদপুরের পূর্বপল্লীর নৈতিকতার পাহাদার হয়, তবে সেটা তোমাদের ব্যাপার। আমার বাড়ি ফেরা দরকার।"
"আপনার বাড়ি?"
এতক্ষণ ধরে ছাতিমের ছায়ায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিস্তা এক এক পা করে সামনে এগিয়ে এল। তার আসার শব্দে মেঝের ভিজে ইটগুলো যেন হালকা মচমচ করে উঠল। তিস্তার গলার স্বর ঘৃণা আর তীব্র অসন্তোষে কাঁপছিল। সে সরাসরি অরিন্দমের মুখের দিকে তাকাল।
"আপনার বাড়ি বলতে আপনার লজ্জা করে না, অরিন্দমবাবু?" তিস্তা অরিন্দমকে নয়, যেন বাতাসটাকেই আক্রমণ করল। সে সুমিতের দিকে ঘুরেও তাকাল না, তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল অরিন্দমের ওই খসখসে, প্রৌঢ় মুখের ওপর। "মা তোমাকে সহ্য করে নিতেই পারে, কিন্তু আমি তো জানি তুমি কী জিনিস। মা, যে কেনো এমন একটা লোককে তার ক্লিনিকে ঢুকতে দেয় যার নামে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আছে ইউনিভার্সিটিতে? কেন দেয় ?"
অরিন্দম নিজের হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগটার দিকে একবার তাকালেন। তার ভেতর প্রেসারের ওষুধের কৌটোটা অন্য শাকসবজির সঙ্গে ঠেকে একটা মৃদু শব্দ করছিল।
"তিস্তা," অরিন্দম খুব ধীরে বললেন, "তোমার মায়ের ক্লিনিক একটা পশুর আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে আমিও কোনো না কোনো পশুকেই বাঁচাতে যাই, কোনো মানুষকে উপদেশ দিতে নয়।"
"নিজের মুখ ঢাকবেন না!" তিস্তার গলা আরও এক ধাপ ওপরে উঠল। গলির মোড়ে চায়ের দোকানে বসে থাকা দু-একজন লোক কৌতূহলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। "পশুর দোহাই দিয়ে আপনি নিজের অপরাধ ঢাকতে পারবেন না। আমি জানি আপনি কোন ক্যালিবারের লোক। এই লোকটা বামপন্থী ও কমিউনিস্ট সুমিত দা। ওর বাবা-মাও তাই ছিলেন। ওদের বাড়িতে ১৯৭১ সালে বামপন্থী আর নকশালদের আস্তানা ছিল, তুমি জানো সেটা কি মা? এনা দের রক্তে কোনোদিন কোনো দেশ ভক্তির নীতি ছিল না। এরা পড়াশোনা আর সাহিত্যের নামে মেয়েদের জীবন নষ্ট করে যেমন চীনে এদের নেতারা করত, তারপর সোদপুরে এসে ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়!"
সুমিত ঘোষ এবার বুক পকেটে হাত দিয়ে একটা ধীরগতির হাসি হাসল। সে যেন তিস্তার এই ক্ষোভকে উপভোগ করছিল, কারণ এই উগ্রতাটুকু তার দক্ষিণ পন্থী ক্যাপিটালিস্ট রাজনৈতিক স্বার্থকেই পুষ্ট করে।
"শুনলেন তো স্যার?" সুমিত একটু ঝুঁকে এল অরিন্দমের দিকে। "ঘরের ভেতরের মেয়েরাই আপনাকে চিনে ফেলেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসও তো আপনার বেশ রঙিন দেখছি! ৭১-এর ভুতুড়ে নকশাল রাজনীতি, আর এখন এই বয়েসে এসেও ইউনিভার্সিটিতে মেয়েদের সঙ্গে নোংরামি। সোদপুরের পূর্বপল্লী কিন্তু এসব সহ্য করবে না অরিন্দমবাবু। কলোনির লোকজন ও পুরনো দিনের ইতিহাস ভুলে গেছে ভেবেছেন? শেফালি পিসির বাড়ি থেকে শুরু করে আপনাদের ওই 'অপরাজিতা'—কোথায় কী হচ্ছে, কার ঘরে কারা ঢুকছে, সব খবর কিন্তু আমাদের কাছে আছে।"
অরিন্দম কোনো জবাব দিলেন না। তিনি অনুভব করছিলেন, তাঁর ভেতরের অহংকার বা কোনো এককালের পণ্ডিত্য কীভাবে এই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে গলির মোড়ে এসে নগ্ন হয়ে পড়ছে। কিন্তু সেই পরাভবের ভেতরেও তাঁর কোনো অনুনয় ছিল না। তিনি জানতেন, এরা যে সাজানো নীতিবোধের কথা বলছে, তা আসলে প্রমোটিংয়ের আর তোলাবাজি সিন্ডিকেটের জমি হাঙরদের তৈরি করা এক অদৃশ্য ফাঁদ। তাঁর চরিত্রহীনতার তোপ দাগিয়ে 'অপরাজিতা'-র জমি খালি করাই এদের আসল উদ্দেশ্য।
"আমার বাবার অতীত নিয়ে কথা বলার আগে, সুমিতবাবু," অরিন্দম এবার সোজা সুমিতের চোখের দিকে তাকালেন, "নিজের ক্লাবের পেছনের ঘরে রাতে কী কী আর কোন কোন জমির দখলের প্রমোটিংয়ের হিসাব হয়, সেটা একটু ভেবে দেখবেন তাহলেই হবে। আমি আমার পাপের দায়ে কলেজ ছেড়েছি, কিন্তু সোদপুর খালি করার চুক্তিতে সই করতে আসিনি।আর আমার হাত টাও অনেক লম্বা। আপনাদের সরকারের মাথায় যে সব আইএএস বা আইপিএস অধিকারী রা বসে আছেন তাদের অনেকেই আমার পুরোনো ছাত্রছাত্রী। সেটা একটু মাথায় রাখবেন দয়া করে"
সুমিতের মুখের হাসিটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে একধাপ তেড়ে আসার উপক্রম করতেই তিস্তা হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল।
"ওর সঙ্গে তো তর্ক করে লাভ নেই সুমিতদা," তিস্তার চোখে তখন এক অদ্ভুত, ঠাণ্ডা ঘেন্না। "যারা ভেতর থেকে পচে গেছে, তাদের কোনো তর্ক দিয়ে বদলানো যায় না। এরা ভাবে কবিতা আর বড় বড় বই পড়লেই সব অপরাধ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু মা যদি আপনাকে না তাড়ায়, আমি এই পাড়ার লোক ডেকে আপনাকে ওই ক্লিনিক থেকে বার করব। সেটাও মনে রাখবেন। ক্লিনিক টি আমাদের।"
তিস্তা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে নিজের থলেটা কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে সোদপুর এইচ বি মোড়ের দিকে হেঁটে চলে গেল। তার জুতোর শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে ওই সংকীর্ণ গালিতে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল।
সুমিত ঘোষ অরিন্দমের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তার নিঃশ্বাসের গরম হাওয়া অরিন্দমের গালের চামড়ায় এসে লাগছিল।
"মেয়েটা ঠিকই বলেছে অরিন্দমবাবু," সুমিত নিচু, বিষাক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল। "আজকে শুধু পথ আটকেছি। কাল হয়তো নিজের পৈতৃক বাড়িতে ঘরের দরজায় তালা ঝুলতে দেখবেন। সোদপুরের পরিবেশ পরিষ্কার করা আমাদের ক্লাবের গুরু দায়িত্ব।"
সুমিত আর তার সঙ্গীরা ধীর পায়ে রাস্তার উল্টোদিকে সরে গেল।
গলির মধ্যে আবার সেই পুরোনো, ভেজা নীরবতা নেমে এল। দূরে স্টেশন থেকে একটা লোকাল ট্রেনের বাঁশি ভেসে এল—দীর্ঘ, কর্কশ আর বিষণ্ণ।
অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগটা ভারী বলে মনে হচ্ছিল। তিনি নিজের শার্টের হাতা দিয়ে কপালে জমা ঘামের কুঁচকানো বিন্দুগুলো মুছলেন। অপরাজিতার দিকে পা বাড়ানোর আগে তিনি একবার ছাতিম গাছটার দিকে তাকালেন—যার অন্ধকার ডালে দুটো রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। পায়ের নিচে ভিজে ইটগুলোর খসখস শব্দ ছাড়া এই বদলে যাওয়া সোদপুরে তাঁর আর কোনো নিজস্ব আওয়াজ অবশিষ্ট ছিল না। ৪০ বছর পরে হঠাৎ করে এসে এই যুগের সঙ্গে মেশা সম্ভব নয়। এদের চিন্তা ধারা ক্যাপিটালিস্ট সমাজের জন্য।
অধ্যায় ১৩: বায়রন ও ট্র্যাক ধারের প্রেতাত্মারা
ঘরের কোণে লোডশেডিং এর জন্য রাখা লণ্ঠনের হলুদ আলোটা প্রায় নিভু নিভু করছিল। বিকেল থেকেই কারেন্ট নেই এইখানে। 'অপরাজিতা'র বড় ঘরের বাতাসে এক ধরণের সোঁদা আঠালো গন্ধ—পুরোনো কাগজ, শুকনো কালির ধোঁয়া আর মেঝের নোনা ধরা দেওয়ালের আর্দ্রতা।
অরিন্দম কাঠের পুরনো চেয়ারটায় স্থাণুর মতো বসে ছিলেন অনেক ক্ষণ ধরে। হাত খসখস করে কাঁপছিল। সামনে পাতা ডায়েরির পাতায় ফাউন্টেন পেনের আঁচড়ে তৈরি হওয়া পংক্তিগুলো যেন আক্ষরিক অর্থেই প্রাণহীন মৃতদেহের মতো পড়ে রয়েছে। তিনি লর্ড বায়রনের ইতালীয় জীবনের শেষ পর্ব নিয়ে একটি অপেরা নাটক লেখার চেষ্টা করছিলেন। যে বায়রন ভেনিস আর রাভেনা-র অলিতে গলিতে শারীরিক আর মানসিক লালসার আগুনে নিজেকে পুড়িয়েছিলেন, যে বায়রন কাউন্টেস তেরেসা গুইচিওলির নিষিদ্ধ ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে নিজের নির্বাসনকে এক ধরণের আত্মহত্যামূলক ট্র্যাজেডিতে বদলে ফেলেছিলেন—অরিন্দম সেই বায়রনকে খাতা কলমে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে চাইছিলেন।
কিন্তু ছন্দ আর মিলছিল না।
অরিন্দম পেনের নিবটা খাতার ওপর চেপে ধরলেন। নীল কালির একটা বড় ফোঁটা ডায়েরির সাদা পাতায় ছড়িয়ে পড়ে একটা কুৎসিত কালো গর্তের মতো আকার নিল।
"ট্রামেতেরো... রিমা রিমা পার্দুতা..." অরিন্দম বিড়বিড় করলেন। ইতালীয় ছন্দের সেই ঝংকার, যা চার বছর আগেও তাঁর ক্লাসরুমে পড়ানোর সময় টেবিল চাপড়ে ঝরঝর করে নেমে আসত, তা আজ একেবারেই নিঃশেষ। অক্ষরেরা এখন তাঁর কাছে ফিরে আসতে অস্বীকার করছে।
"ছন্দ খুঁজছ বুঝি , অধ্যাপক?"
ঘরের এক অন্ধকার কোণ থেকে খুব নিচু গলায়, খোঁচা দেওয়া একটা স্বর ভেসে এল।
অরিন্দম চমকে উঠে ঘাড় ফেরালেন না। তিনি তো জানতেনই, ঘরে কেউ নেই। দরজা ভেতর থেকে হুড়কো দেওয়া। তবুও, বইয়ের তাকের পাশে ঝুলতে থাকা পুরোনো পর্দাটার ছায়ায় একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে এককালের জমকালো কিন্তু এখন ধুলো-মলিন ভেলভেটের আলখাল্লা, একটা পায়ের হাঁটু সামান্য বাঁকা, যেন খোঁড়া পা-টা সামলাতে গিয়ে সে দেয়ালের কাঠের প্যানেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকটার মুখে ছাইরঙা আলো, আর ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক নৃশংস বিদ্রূপ।
বায়রনের প্রেতাত্মা।
"শব্দগুলো মরে গেছে," অরিন্দম নিজের ছায়াপড়া হাতের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন। "আমার কলম আর কাজ করছে না, মিলর্ড।"
ছায়ামূর্তিটা খুব ধীর পায়ে এগিয়ে এল। কাঠের মেঝেতে তার ল্যাংচানো পায়ের শব্দটা কিন্তু কোনো শব্দ তৈরি করল না—কেবল একটা শিরশিরে হাওয়া অরিন্দমের ঘাড়ের কাছে এসে লাগল।
"কলম তোমার মরেনি, অরিন্দম," বায়রন হাত দুটো বুকের ওপর বাঁধলেন। "মরে গেছে তোমার আত্মপ্রবঞ্চনা। তুমি ভেবেছিলে তোমার এই সোদপুরের কাদা-প্যাঁকভরা নির্বাসন, তোমার এই পতন আমার কাব্যিক নির্বাসনের মতো রাজকীয় হবে? আমার কাব্যিক নির্বাসনে ভেনিসের গন্ডোলা ছিল, রাজপ্রাসাদ ছিল, রাজকীয় বজ্রা ছিলো আর ভোগের জন্য তেরেসার মতো রূপসী এক বিবাহিতা নারীও ছিল । আর সোদ পুরের তোমার এই নির্বাসনে কী আছে? একটা পশুর ইউথানেসিয়া ক্লিনিক, কয়েকটা পচা গলি আর সুমিত ঘোষের রক্তচক্ষু!"
"তুমি আমার ইতিহাস জানো না মায় লর্ড ," অরিন্দম গর্জে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে কেবল একটা খসখসে বাতাস বেরিয়ে এল।
"আমি কিন্ত তোমার ইতিহাস খুব ভালো করেই জানি," বায়রনের মুখাবয়ব অন্ধকারের মধ্যে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার চোখে কোনো করুণা ছিল না। "তুমি এক নাবালকের বয়সে স্কুল বন্ধুর অরূপের মেদবহুল মা রত্না দেবীর সঙ্গে শরীর খেলায় মেতেছিলে। তুমি বেনারসের নর্তকী গণিকাকে আমার লেখা কবিতা শোনাতে চেয়েছ। তুমি তোমার ছাত্রীকে শোওয়ার ঘরে এনেও তারপর তাকে অচেনা মানুষের মতো ছুড়ে ফেলেছ। ব্রাভো…! তুমি ভেবেছিলে তুমি রূপকথা লিখছ? না। তুমি কেবল নিজের শরীরের নিম্মগ্নের খিদে মেটাতে গিয়ে একটা ছারপোকার মতো আটকে পড়েছ। তুমি কোন নারীকে ভালোবাসোনি। তোমার কোনো ট্র্যাজেডি বা কমেডি নেই, অরিন্দম। তোমার আছে কেবল ছদ্মবেশ।"
"আমি তাদের কে ভালোবেসেছিলাম...বিশ্বাস করুন"
"ভালোবাসা?" বায়রন ঘরফাাটানো নিঃশব্দ হাসিতে ফেটে পড়ল। "পাপ আর শরীরের কামকে ভালোবাসার নাম দিয়ে ঢেকে রাখা মধ্যবিত্তদের পুরনো খেলা। তুমি এখন নিজেকে অপাপবিদ্ধ বানাতে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখছ, নাটক লিখছ? এই অপেরা তোমার মুক্তি নয়, অরিন্দম। এটা হবে তোমার অন্ত্যেষ্টির খসড়া।"
অরিন্দম দু-হাতে নিজের মাথা চেপে ধরলেন। কনকনে যন্ত্রণাটা তাঁর রগের মধ্যে হাতুড়ির মতো পিটছিল।
"যাও এখান থেকে!" অরিন্দম চিৎকার করে উঠলেন। "আমার ঘর থেকে দূর হও বায়-রন সাহেব!"
যখন তিনি চোখ খুললেন, ঘরে কেউ ছিল না। কেবল টেবিল লণ্ঠনের ফিলামেন্টটা এক অদ্ভুত সাঁই সাঁই শব্দ করে কাঁপছিল। খাতার ওপর কালির কালো দাগটা ততক্ষণে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।
অরিন্দম চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। তাঁর দম আটকে আসছিল। এই পৈতৃক বাড়ি, এই সোদপুর, নিজের শরীরের খোলস—সবকিছু যেন এক প্রচণ্ড অর্থহীনতায় তাকে পিষে মারছে। তিনি আর এক মুহূর্তও এই ঘরে দাঁড়াতে পারলেন না। কাঠের দরজার হুড়কোটা এক ঝটকায় খুলে তিনি সোজা বাইরে বেরিয়ে এলেন।
বাইরে তখন গভীর রাত। রাত দুটো
সোদপুরের রাস্তাগুলো নিঃসঙ্গ, কুয়াশা আর আর্দ্রতার চাদরে ঢাকা। স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলো সোদপুর স্টেশন রোডের ধুলোমাখা পিচের ওপর কেমন রক্তশূন্য দেখাচ্ছে। কয়েকটা পথকুকুর দূর থেকে ডেকে উঠে আবার চুপ করে গেল। অরিন্দম কোটের বোতাম না লাগিয়েই হাঁটতে লাগলেন। তাঁর পায়ের কোন দিশা ছিল না, কিন্তু শরীরটা যেন একটা সুনির্দিষ্ট আকর্ষণে নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল—পূর্বপল্লীর গলি ছড়িয়ে সোদপুর রোড ছড়িয়ে , সোদপুরের লেভেল ক্রসিংয়ের দিকে।
রেললাইনের ধারের বাতাসটা ভারী। কয়লার ধোঁয়া, পোড়া মবিল আর ট্র্যাকে জমে থাকা নর্দমার জলের একটা মিশ্র গন্ধ বাতাসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
অরিন্দম যখন লেভেল ক্রসিংয়ের কাছাকাছি পৌঁছালেন, ঠিক তখনই সসংকেতে গেটের লাল আলোটা জ্বলে উঠল।
টিং-টিং-টিং-টিং...
ওয়ার্নিং বেলটার ধাতব শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিতে লাগল। লোহার ভারি ব্যারিয়ার গেটটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে রাস্তা বন্ধ করে দিল। কাঠের ফ্রেমে লাল কালিতে লেখা—'বিপদ'।
অরিন্দম থামলেন না।
তিনি ব্যারিয়ারের নিচ দিয়ে মাথা নিচু করে গলে গেলেন। পাহারাদার রামদেও তার ছোট গুমটি ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখার আগেই অরিন্দম হাঁটা দিলেন ধারালো ব্যালাস্ট পাথরের ওপর দিয়ে। পায়ের নিচে কালো পাথরগুলো মচমচ করে উঠল।
তিনি সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন ২ নম্বর ডাউন লাইনের ঠিক মাঝখানটায়।
দুই পাতের চ্যাপ্টা লোহার ট্র্যাকে তখন দূর থেকে একটা অদৃশ্য কাঁপন ভেসে আসছে। সশঙ্ক, ধীর কিন্তু এক অপ্রতিরোধ্য কম্পন। অরিন্দম জুতো ভেদ করে সেই কাঁপন নিজের হাড়ের মজ্জায় অনুভব করলেন।
মাথার ওপরের বিদ্যুৎবাহী তারগুলো এক টানা পিলপিল শব্দে গুনগুন করছিল। লেভেল ক্রসিংয়ের লাল আলোটা অরিন্দমের বিবর্ণ মুখে এক চড়া রক্তিম আভা ফেলেছিল।
"সবকিছু কত সহজ," অরিন্দম স্বগত বিড়বিড় করলেন।
সামনে অন্ধকার বাকের কোল থেকে একটা প্রকাণ্ড সাদা আলো জ্বলে উঠল। শেয়ালদাহগামী গুডস ট্রেনের সার্চলাইট। আলোটা অন্ধকারের বুক চিরে এক তীব্র ছুরির মতো এসে পড়ল অরিন্দমের সোজা চোখের ওপর। তিনি চোখ বুজলেন না। আলোটা তাঁকে পুরো গিলে ফেলল।
শব্দটা বাড়ছিল। ট্রেনের কর্কশ হাই-পিচ বাঁশি রাতের বাতাসকে ফালাফালা করে দিল। লোহার চাকার সাথে লোহার পাতের ঘর্ষণে এক বিকট উল্লাস ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
১০০ গজ... ৫০ গজ... ৩০ গজ...
ইনজিন থেকে বের হওয়া গরম ডিজেলের হাওয়া আর ধুলোর ঝাপটা অরিন্দমের মুখে এসে লাগল। মৃত্যুদূতের মতো সেই দানবীয় যন্ত্রটা তাঁর শরীরটাকে মুহূর্তের মধ্যে মাংসের কিমা বানিয়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে।
অস্তিত্বের এই চূড়ান্ত অর্থহীনতার সামনে দাঁড়িয়ে, সমস্ত বৈষম্য, অপমান, রিয়া সেনের কমিটির বিচার, আর সুমিত ঘোষের হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে—মৃত্যুটাকে মনে হচ্ছিল এক পরম শান্তি। অত্যন্ত সস্তা একটা মুক্তি। মাত্র এক সেকেন্ডের চাপ।
কিন্তু ঠিক সেই শেষ মুহূর্তে—যখন ট্রেনের সামনের লোহার বাম্পারটি তাঁর বুকের থেকে মাত্র বেশ কয়েক ফুট দূরে—অরিন্দমের শরীরের ভেতরে জমা থাকা আদিম প্রাণীটা যেন এক অপ্রত্যাশিত ঝটকায় জেগে উঠল।
কোনো যৌক্তিক চিন্তা নয়, কোনো দর্শনের তত্ত্ব নয়—কেবল এক অন্ধ স্বয়ংক্রিয় পেশীর টানে অরিন্দম ডানদিকে লাফ দিয়ে ছিটকে সরে গেলেন ট্র্যাকে জমে থাকা শক্ত ব্যালাস্ট পাথরের ওপর।
ধাঁ-ধাঁ-ধাঁ-ধাঁ—
এক প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাসের মতো গুডস ট্রেনটি তাঁর গা ঘেঁষে চাকা বাজিয়ে পেরিয়ে গেল। চাকার হাওয়া অরিন্দমের গায়ে পরা দামী কোটটাকে পাখনার মতো উড়াতে লাগল। চোখের সামনে দিয়ে কালো কালো ওয়াগনগুলো একটার পর একটা লোহার তাণ্ডব চালিয়ে চলে গেল। হাওয়ার তোড়ে অরিন্দমের চোখ-মুখ ধুলো আর কালিতে ভরে গেল।
ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর চারদিক আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল দূরে মিলিয়ে যেতে থাকা ট্রেনের শেষ লাল আলোটা কুয়াশায় মিশে যেতে লাগল।
অরিন্দম পাথরের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন। তাঁর দু-হাত ব্যালাস্টের ধারালো পাথরে কেটে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। বুকটা হাপরের মতো উঠানামা করছিল। তিনি কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি হাতের তালুতে জমা রক্ত আর ধুলোর দিকে তাকালেন। তারপর সামনে ছড়িয়ে থাকা শূন্য, নিস্তব্ধ ট্র্যাকে লাল আলোর দিকে চাইলেন।
"মৃত্যু অত্যন্ত সস্তা ও যন্ত্রণাদায়ক," অরিন্দম অন্ধকারে নিজের কাঁপা গলায় বললেন। কণ্ঠস্বরটা নিজের কাছেই কোনো অচেনা গুহা থেকে উঠে আসা শব্দ বলে মনে হলো। "কিন্তু অপমানের পরও বেঁচে থাকাটাই হলো আসল ট্র্যাজেডি।"
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। হাঁটু দুটো ঠকঠক করে কাঁপছিল, কিন্তু পড়ে গেলেন না।
তিনি নিজের হাত দিয়ে জামার ধুলো ঝাড়লেন। আত্মহত্যার মতো সহজ উপহার প্রকৃতি তাঁকে দিল না। তাঁকে তো বেঁচে থাকতে হবে—এই রক্ত, এই নোংরা অপমান, আর সোদপুরের গলির কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই তাঁকে শেষ পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে।
অরিন্দম আবার ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। ক্রসিংয়ের লাল আলোটা তখনও জ্বলছিল, কিন্তু তিনি আর ব্যারিয়ারের দিকে তাকালেন না। অন্ধকার গলির পথ ধরে তিনি আবার 'অপরাজিতা'র দিকে ফিরে চললেন।
অধ্যায় ১৪: কিশোর ইমন ও হিংসার সূচনা
সোদপুর পূর্বপল্লীর মাধবীর পশুর আশ্রয়কেন্দ্রের পেছনের মেহগনি গাছটার নিচে দুপুরের চড়া রোদ থমকে দাঁড়িয়েছিল।
বাতাসে ফিনাইল, ভিজে পশুর লোম আর মরচে ধরা লোহার খাঁচার একটা ভ্যাপসা গন্ধ। এককোণে একটা পুরোনো চটের বস্তার ওপর শুয়ে ছিল একটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত নেড়ি কুকুর। তার চোখ দুটি আধবোজা, পেটের চামড়া হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
২৩ বছরের ইমন একটা কাঁচের অ্যাম্পুল ভেঙে সিরিঞ্জে ওষুধ তুলছিল। তার রোগা, লম্বা আঙুলগুলোর খাঁজে মেহগনি পাতার ছায়া কাঁপছিল। পকেটে গোঁজা একটা কালো কালির ডটপেন, জামার কলারটা সামান্য ছেঁড়া।
অরিন্দম রোদচশমাটা খুলে কাঠের বেঞ্চটার ওপর রাখলেন। তাঁর সামনে ছড়ানো ছিল কয়েকটা পুরোনো খাতা আর একটা ছোট লাতিন প্রবাদ সংগ্রহের বই।
"মেডিক্যাল টার্মে একে কী বলে জানো, ইমন?" অরিন্দম খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
ইমন সিরিঞ্জের মুখ থেকে হাওয়ার বুদ্বুদটা এক ফোঁটা তরল সহ বাইরে ছিটিয়ে দিল। তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না, কিন্তু এক গভীর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
"পশু পাখিদের ক্ষেত্রে ইউথানেসিয়া স্যার," ইমন না তাকিয়েই বলল। "সহজ ভাষায়—সোজা স্বর্গে পাঠানোর বন্দোবস্ত।" মানুষের জন্য আইন হয়নি এখনও ইউথানেসিয়ার এখনও এই পোড়া দেশে।
"লাতিনে একটা কথা আছে—Mors vincit omnia," অরিন্দম শূন্য দৃষ্টিতে খাঁচার দিকে তাকিয়ে বললেন। "মৃত্যুই সবকিছুর শেষ জয়ী। কিন্তু রোমানরা অন্যভাবেও বলত—Requiescat in pace। শান্তিতে শেষ বিশ্রাম নেওয়া।"
ইমন সিরিঞ্জটা ডান হাতে ধরে কুকুরের পেছন পায়ের শিরার দিকে এগোতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সে অরিন্দমের দিকে মুখ ফেরাল। তার চোখের তারা দুটো কেমন যেন কাঁচের মতো অচেনায় ভরে গেল।
"আচ্ছা স্যার," ইমনের গলার স্বরটা অস্বাভাবিক সমতল শোনালো, "কুত্তাগুলোকে কড়া ডোজের এই ফেনোবার্বিটাল ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেললে ওদের আত্মাগুলো কোথায় যায় বলুন তো? নরকে না স্বর্গে?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ইমন বিষণ্ন এক হাসি হাসল। সে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝের ধুলোয়।
"এই যে ভারতবর্ষে কোটি কোটি ছেলেমেয়েদের বাবা-মা লাখ লাখ টাকা খরচ করে ডিগ্রি আনছে, প্রাইভেট কলেজে তাদের অবস্থা তো রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলোর থেকেও আরো খারাপ, স্যার। আমি তো নিজেই কিন্তু এম এ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট কলকাতা ইউনিভার্সিটির । কিন্তু দেখুন আমার পকেটে ২৫ পয়সাও নেই। বাজারে গেলে কেউ একটা বিস্কুটও ফ্রিতে ছুঁড়ে দেয় না—কেন স্যার? অথচ প্রতি বছরে নাকি দুই কোটি চাকরি দেবে বলেছিল সরকার। কোথায় গেল সেইসব প্রতিশ্রুতি? কোথায় গেল স্যার ভর্তুকি, ভাতা আর যুব সারথির টাকা? বেকার ভাতা?- সব মিথ্যে ভোট পেতে । তবুও ম্যাডাম তো কিছু টাকা দেয় আর পার্টির মিছিলে গেলে পার্টির কাজ করলে কিছু পয়সা আসে। "
ইমন নিঃশ্বাস না ফেলে কথাগুলো বলে গেল। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের বঞ্চনা যেন একমুহূর্তে সোদপুরের এই সোঁদা গন্ধে ভেসে উঠল। সিরিঞ্জের ভেতরের ফেনোবার্বিটাল নীল তরলটা দুপুরের রোদে কাঁচের ভেতরে বিষাক্ত রুপোলি দেখাচ্ছিল।
অরিন্দম চশমাটা আবার চোখে পরলেন। তাঁর গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছিল। ইমনের এই ক্ষোভ, এই অস্তিত্বহীনতার যন্ত্রণা তো তিনি নিজের চেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরেও দেখেছেন, কিন্তু সোদপুরের পচা পাঁকের মধ্যে এসে তা যেন আরও বেশি ভয়ংকর ও নগ্ন ঠেকছে।
"যেখানে মানুষরা মরলে যায়, ইমন—কোনোখানেই না," অরিন্দম ধীর ও হিমশীতল স্বরে বললেন। "তারা কেবল এক অনন্ত নীরবতায় পৌঁছায়। সেখানে আর পেটের মধ্যে কোনো খিদে থাকে না, অপমানের চাবুক থাকে না। সেখানে তারা আর ঘেউ ঘেউও করে না—চাকরির জন্য, টাকার জন্য খাবারের জন্য, চিকিৎসার জন্য কিংবা মাথা গোঁজার বাসস্থানের জন্য।"
ইমন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে অরিন্দমের মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর অতি অভ্যস্ত হাতে ইনজেকশনের ছুঁচটা কুকুরের শিরায় ফুটিয়ে দিল। কয়েক ফোঁটা ফেনোবার্বিটাল শরীরের রক্তে মিশে যেতেই প্রাণীটির গায়ের শেষ কাঁপনটুকু স্তব্ধ হয়ে গেল। একদম শান্ত।
ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্রয়কেন্দ্রের টিনের গেটটা বিকট শব্দে ধাক্কা দিয়ে খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকে এল রুদ্র পাল। মাধবীর ভাইপো। এই বাড়ির তিনতলার বাশিন্দা । পরনে আঁটসাঁট জিন্স, বুকে লাল-কালো স্ট্রাইপের টি-শার্ট, গলায় একটা মোটা রূপোলি চেন। পেছনে আরও দুটো সমবয়সী বেকার ছেলে—তাদের হাতে ক্লাবের রাজনৈতিক মিছিলের ঝাণ্ডা ও মুখে আধপোড়া বিড়ির গন্ধ ও ধোঁয়া।
রুদ্রর উপস্থিতি এক নিমেষে ওই নির্জন মেহগনি তলার নীরবতা ফালাফালা করে দিল। সে মুখে গুটখা চিবোতে চিবোতে মেঝের রক্ত আর ফিনাইলের দিকে তাকাল, তারপর একগাল থুতু ফেলল পাঁচিলের গায়ে।
"কী রে ইমন! আমার বাপ!" রুদ্র কর্কশ গলায় ডেকে উঠল। "এখানে বসে বসে এখনও বুড়ো স্যারের কাছে লাতিন মন্ত্র শিখছিস নাকি? ওসব মন্ত্র চিবিয়ে রাতে পেট ভরবে তোর পিসি না দিলে?"
ইমন সিরিঞ্জটা ট্রে-তে রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
অরিন্দম কোনো কথা বললেন না, কেবল সোজা হয়ে বসলেন। রুদ্রর চোখে অধ্যাপক সম্পর্কে কোনো ভীতি বা বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধা ছিল না, ছিল কেবল এক ধরণের নতুন ক্ষমতাশালী শ্রেণির উগ্র আস্ফালন।
"অধ্যাপকবাবু," রুদ্র অরিন্দমের দিকে আঙুল তুলে বলল, "আপনার ওই কেতাবী পড়ালেখা আর মেকি জ্ঞান দেওয়া নিজের ঘরের বন্ধ দরজার পেছনে রাখুন না । ইমনকে জ্ঞান দিয়ে ছেলেটাকে আর নষ্ট করবেন না। আমাদের ও কাজের লোক দরকার।"
"ও তো মাধবীর আশ্রমে কাজ করছে, রুদ্র," অরিন্দম শান্তভাবে বললেন।
"পিসি ওকে পশু গুলোর গু-মুত, রক্ত পূজ পরিষ্কার করার জন্য কয়েকটা টাকা দেয়," রুদ্র হেসে উঠল। তার সাঙ্গোপাঙ্গ দুটোও খি খি করে হেসে উঠল। "আজকে পূর্বপল্লি মোড়ের মাথায় বিশাল মিটিং আছে। জমি হস্তান্তরের সেই মিছিলে অনেক লোক চাই। পূর্বপল্লীর কতগুলো পুরনো আর ভুতুড়ে বাড়ি খালি করতে হবে—সেই রাজনীতিতে আজ রক্ত গরম করা ছেলে চাই। মিছিলে ঝাণ্ডা ধরলে দিনে পাঁচশো টাকা আর বিরিয়ানির প্যাকেট। কোনটা নিবিরে ইমন? পশুর ল্যাজ ধরবি, না আমাদের দলে নাম লেখাবি?"
ইমন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার অরিন্দমের খাতার লাতিন অক্ষরের দিকে গেল, আর একবার রুদ্রর পকেটে গোঁজা পাঁচশো টাকার কাঁচা নোটের বান্ডিলটার দিকে।
"চল্ বলছি!" রুদ্র ইমনের কলারটা একপ্রকার জোর করেই চেপে ধরল। "এম এ পাস করে টিবি তে ধুঁকে মরে যাওয়া অনেক ছেলে দেখেছি। এই এলাকায় টিকে থাকতে হলে হাত জোড় করে নয়, লাঠি উঁচিয়ে মিছিল করতে শিখতে হয়। চল্!"
ইমন প্রতিবাদ করল না। সে অরিন্দমের দিকে শেষ এক নজর তাকাল—যে চোখে কোনো ক্ষমা ছিল না, ছিল কেবল বেঁচে থাকার জন্য নিজের আত্মাকে বিকিয়ে দেওয়ার এক নীরব সম্মতি।
রুদ্র ইমনকে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। গেটটা আবার বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
আশ্রয়কেন্দ্রের পেছনের মেহগনি তলায় আবার সেই থমথমে নীরবতা নেমে এল। অরিন্দম মেঝের দিকে তাকালেন—সেখানে মরে পড়ে থাকা কুকুরটার স্তব্ধ শরীর আর পাশে ফেলে যাওয়া সিরিঞ্জটা দুপুরের রোদে এক অর্থহীন অবয়ব নিয়ে পড়ে রইল।
অধ্যায় ১৫: ইউথানাসিয়া ও জীবনের মূল্য
বুনো মেহগনি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার মেটে আলোটা যখন আশ্রয়কেন্দ্রের চটে পড়া দেওয়ালে এসে পড়ল, তখন চারপাশের বাতাস অদ্ভুত এক স্যাঁতসেঁতে শান্তিতে ভারী হয়ে উঠেছে। স্যাভলন, পচনের গন্ধ আর পশুর কাঁচা চামড়ার গন্ধ বাতাসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। দূরে সোদপুর স্টেশনের লেভেল ক্রসিং ছাড়িয়ে আসা কোনো ট্রেনের দীর্ঘ, করুণ বাঁশির শব্দ হাওয়ায় ভেসে এসে মিলিয়ে গেল।
ঘরের এককোণে বাঁশের খাঁচাটার ভেতরে শুয়ে ছিল জোয়ান। পক্ষাঘাতগ্রস্ত নেড়ি কুকুরটার বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু পিছনের দুটো পা পচে গ্যাংগ্রিন হয়ে কালচে হাড় বেরিয়ে পড়েছে। তার চোখ দুটো ঘোলাটে,। সাদা ছানির মতো একটা পর্দা নেমে এসেছে চোখের তারায়। প্রতিবার বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তার বুকের খাঁচাটা অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠছে। মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে আঠালো সাদা ফেনা।
মাধবী লোহার টেবিলটার ওপর কাঁচের একটা পেন্টোবার্বিটালের ভায়াল আর একটা একেবারে নতুন, স্টেরাইল সিরিঞ্জ রাখলেন। শিশির মেটালিক মুখটা কাটার সময় ধাতব ঠোকাঠুকির একটা ছোট্ট শব্দ হলো—টিক।
"আজ ওকেও মুক্তি দিতে হবে," মাধবী রবারের গ্লাভস দুটো হাতে গলিয়ে নিতে নিতে বললেন। গলার স্বর সমতল, কোনো আবেগের তরঙ্গ নেই সেখানে।
অরিন্দম স্যাঁতসেঁতে ইটের মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসলেন। খাঁচার ফাঁক দিয়ে তিনি নিজের কাঁপা হাতটা ভেতরে বাড়িয়ে দিলেন। ধুলো আর নোংরায় জমে থাকা কুকুরের মাথাটার ওপর তাঁর আঙুলগুলো আস্তে করে নেমে এল। কানের পেছনের সামান্য উষ্ণ চামড়া স্পর্শ করতেই কুকুরটা তার অসাড় দেহটার সমস্ত শক্তি এক জায়গায় এনে একবার খুব ক্ষীণভাবে লেজটা নাড়ানোর চেষ্টা করল।
পারল না। কেবল একটা শুকনো নিঃশ্বাসের ধাক্কা অরিন্দমের বা হাতের তালুতে এসে লাগল।
"এ তো এখনও বাঁচার চেষ্টা করছে, ডাক্তার মাধবী," অরিন্দম মুখ না তুলে বললেন। তাঁর আঙুলগুলো কুকুরটার কানের পেছনের শক্ত চামড়ায় থেমে রইল। "আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে কার বেঁচে থাকা উচিত আর কার মরা?"
মাধবী হাঁটু গেড়ে বসা অরিন্দমের ওপর নিজের ছায়া ফেলে দাঁড়ালেন। ভায়াল থেকে নীলচে ফ্যাকাশে রঙের তরল ওষুধটা সিরিঞ্জের প্লাঞ্জারে টেনে নেওয়ার সময় একফোঁটা ওষুধ হাওয়ায় ফুটে উঠে ফোঁটা হয়ে টেবিলে ঝরে পড়ল।
"ও আর বাঁচার চেষ্টা করছে না, অরিন্দমবাবু," মাধবীর গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা, অথচ ভেতরে এক অদ্ভূত পেশাদার করুণা। "ও শুধু পৃথিবীতে টিকে থাকার অন্ধ প্রবৃত্তিটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। তীব্র যন্ত্রণা আর পচনের ভেতরে এই আঁকড়ে থাকাটাকে আপনি জীবন বলছেন? মানুষের তৈরি শব্দ দিয়ে পশুর কষ্টকে ব্যাখ্যা করবেন না। পচনে ওর শরীরের মাংস ঝরে পড়ছে।"
"কিন্তু ওই অন্ধ প্রবৃত্তিটাই তো জীবনের একমাত্র সত্য, মাধবী," অরিন্দম ধীর গলায় বললেন। "যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও শরীরটা ,প্রাণটা বেঁচে থাকতে চাইছে। আমরা সেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে একটা বোতলজাত ইনজেকশন দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছি। এটা কী অপরাধ নয়? "
"মানুষ তার নিজের স্বার্থেই পশুকে জোর করে কষ্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে, কারণ মানুষের মৃত্যুর ভয় আছে," মাধবী সিরিঞ্জটা চোখের সামনে তুলে ধরলেন, একটাও বুদ্বুদ আছে কিনা পরীক্ষা করতে। "মানুষ ভাবে সে কাউকে বাঁচিয়ে রেখে করুণা করছে। কিন্তু পশুর তো সেই জটিল আত্মপ্রবঞ্চনা নেই, ওর মৃত্যুভয় নেই, ওর আছে কেবল বর্তমান মুহূর্তের যন্ত্রণা। কোনটা বেশি নিষ্ঠুরতা বলুন তো—ওকে এই নরকযন্ত্রণায় ফেলে রাখা, নাকি শান্তিতে চিরঘুম পাড়িয়ে দেওয়া?" অরিন্দম কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স রুম, রিয়া সেনের মুখ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেওয়াল, আর নিজের ভেঙে পড়া অস্তিত্বের ছাই। সেখানেও তো প্রতিদিন কাউকে না কাউকে আত্মিকভাবে মেরে ফেলা হচ্ছিল—কোনো ইনজেকশন ছাড়া, শুধু অপমানের নীরবতা দিয়ে।
"হয়তো বা দুটোই," অরিন্দম স্বগত বিড়বিড় করলেন। তাঁর হাতটা তখনও কুকুরটার কপালে রাখা। "আমরা মানুষেরা কাউকেই সত্যিই করুণা করতে জানি না, মাধবী। আমরা যা করি, তা শুধু নিজেদের বুকের ভেতর জমা হওয়া অপরাধবোধটুকুকে একটু হালকা করার জন্য।"
মাধবী আর কোনো কথা বললেন না। তিনি ইমনের দিকে তাকালেন।
ইমন এতক্ষণ অন্ধকার এক কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল। তার পরনে একটা মলিন সুতির জামা, চোখে কোনো অনুভূতি নেই। সে এগিয়ে এসে খাঁচার ছিটকিনিটা খুলল। কোনো তাড়াহুড়ো না করে, অতি অভ্যস্ত হাতে কুকুরটার পেছনের ডান পায়ের রুগ্ন উরুটা শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে শিরাটা চামড়ার ওপর ফুলে ওঠে।
"সিরিঞ্জটা আমাকে দিন, মাসি," ইমন খুব নিচু স্বরে বলল।
মাধবী সিরিঞ্জটা ইমনের হাতে দিলেন না, নিজেই হাঁটু গেড়ে বসলেন। " তোর হাতে গ্লাভস পড়া নেই। তুই ধরে রাখ ওকে, ইমন।"
বাতাসে ফিনাইলের গন্ধটা হঠাৎ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। মাধবী নিপুণ হাতে সরু সুচটা কুকুরটার মাংসহীন উরুর নীলচে শিরায় ফুটিয়ে দিলেন। বিষের মতো শান্ত নীল তরলটুকু ধীরে ধীরে রক্তস্রোতের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল।
অরিন্দমের হাতের তালুর নিচে কুকুরটার মাথাটা কয়েকবার সামান্য কেঁপে উঠল। তার ঘোলাটে চোখের ভেতরে একটা শেষ প্রশ্ন আলোড়িত হলো, তারপর খুব ধীরে, যেন এক গভীর ক্লান্তিতে, চোখের পাতা দুটো নেমে এল।
আহ্...
একটা সুদীর্ঘ, প্রায় নিঃশব্দ উসখুস নিঃশ্বাস নির্গত হলো তার নাক দিয়ে। বুকের খাঁচাটার শেষ যে স্পন্দনটুকু উঠছিল, তা আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল।
মেঝের ওপর নেমে এল এক নিথর, নিস্তব্ধ থমথমে নীরবতা। খাঁচার আশপাশের অন্ধকারটা যেন একমুহূর্তে আরও কিছুটা ঘন হয়ে এল। বাইরের রাস্তার ঘেউ ঘেউ শব্দগুলো চিরতরের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
ইমন আস্তে করে কুকুরটার পা-টা ছেড়ে দিল। সে হাত দুটো তোয়ালে মুছে নিয়ে খাঁচার দরজাটা ভিজিয়ে দিল।
অরিন্দম মৃত কুকুরটার আধবোজা চোখের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর নিজের হাতের তালুটা তখনও কুকুরটার ঠান্ডা হয়ে আসা কানের কাছে লেগে রয়েছে। তাঁর মনে হলো, এই ইউথানাসিয়া—এই নিপুণ, বৈজ্ঞানিক ইচ্ছামৃত্যু—কেবল এক পথকুকুরের মুক্তি নয়। এটি যেন সোদপুরের এই কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে তাঁর নিজের সামাজিক পতন, তাঁর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সম্মান এবং তাঁর আত্মিক অবক্ষয়েরই এক নীরব, শীতল প্রতিচ্ছবি।
"হয়ে গেছে," মাধবী সিরিঞ্জটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে হাতের গ্লাভসটা খুলে ফেললেন। "এখন আর ওর কোনো যন্ত্রণা নেই।"
অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাঁটু দুটো সোজা করতে কষ্ট হচ্ছিল। "ওর যন্ত্রণা শেষ হলো, মাধবী। কিন্তু আমাদের?"
মাধবী জবাব দিলেন না। তিনি কলপাড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন হাত ধোয়ার জন্য। বেসিনের ওপর জল পড়ার শব্দটা সেই নিথর ঘরে এক অদ্ভুত একঘেয়ে ছন্দে বাজতে লাগল।
অরیندম পকেটে হাত দিয়ে মেহগনি গাছের তলার অন্ধকারের দিকে পা বাড়ালেন। দূর থেকে তখন আর একটা ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসছে—শেষ ট্রেনের মতো, যা কাউকে না নিয়েই কুয়াশার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
অধ্যায় ১৬: মেঘলার সোদ পুরের পৈতৃক বাড়ি অপরাজিতায় আগমন ও একেবারেই নতুন এক আশ্রয়।
সোদপুর স্টেশন রোডের মোড় ঘুরে ট্যাক্সিটা যখন পূর্বপল্লীর সরু গলিতে ঢুকেছিল, তখন বিকেল। দুপুরের আলো চটে যাওয়া পুরোনো দেওয়ালে হলুদ বিষাদের মতো লেপ্টে ছিল। গলির মুখে নর্দমার স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর খোলামেলা ড্রেনের ওপর বসে ছিলো দুটো অলস পথকুকুর। ধুলোমাখা ট্যাক্সির কাঁচ নামিয়ে বাইরে তাকাল মেঘলা।
তার ২৮ বছরের জীবনের এই প্রথমবার সে ‘অপরাজিতা’র সামনে দাঁড়াল।একদম ছোট বেলায় একবারই সে বাবা মা এর সঙ্গে এই বাড়িতে এসেছিল। তার স্মৃতি ঝাপসা মনে পড়ে। সেই প্রথম সে ঠাকুরদাকে দেখেছিল। ঠাকুর মা দেওয়ালে তখন ছবি। কঙ্কালসার হাড় বের করা এক ৮০ বছরের বৃদ্ধ শোয়া থেকে উঠে বসে তাকে দেখেছিল। ওনার দুই চোখে কাতারাক্ট । তারপরে আর কখনও তার মা বা মাসী আসতেই দেয় নি। তার বাবা অধ্যাপক অরিন্দম ও আসতেন না। খোঁজই রাখতেন না। বৃদ্ধ লোকটার মৃত্যুর দিন আর শ্রাদ্ধের দিন এসেছিলেন। তারপর থেকে বাড়িটায় তালা ঝুলতে দেখা যেত।
ভাঙাচোরা পাঁচিলের ওপর শ্যাওলা ধরেছে। ঝুলে থাকা অশ্বত্থ গাছ, মেহগনি আর পেয়ারা গাছের ডাল পুরোনো একতলা বাড়িটার ওপর একটা ভারী ছায়া ফেলে রেখেছে। লোহার বড় গেটের লোহার কড়াটায় আর নিচে মরচে ধরে ক্ষয়ে গেছে। সাকেতের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করপোরেট টাওয়ার, কাঁচের লিফট, আর কনফারেন্স রুমের ঝকঝকে পলিমারের দুনিয়া ছেড়ে আসার পর এই সোদপুরের বাড়িটাকে একটা প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র বলে মনে হচ্ছিল তার। এইখানে তার বাবা অরিন্দম মুখার্জী আজকে ৫৮ বছর বয়েসে এসে বসবাস করছেন এইটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিলো মেঘলার।
ছোটবেলা থেকে মা আর মাসীর মুখে এই বাড়ির কথা শুনে শুনেই মেঘলা বড় হয়েছে। কলকাতার বিডন স্ট্রিটের বা দাদু-দিদার বালিগঞ্জের মতো দোতলা ফ্ল্যাটে বসে মা বারবারই বলত, "সোদপুরের ওই অপরাজিতা বাড়িটা তার জীবনের একটা অভিশাপ ছিল। ওখানে যারা থাকে, তাদের রক্তে হিংসা। তোর বাবাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক করে রেখেছিল ওরা। তোকে পেলে ওরা জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে, মেরে ফেলবে মেঘলা। তোর বাবাকেতো ব্ল্যাক ম্যাজিক করেই শেষ করে দিল ওখানকার আত্মীয়রা।"
মাসী চায়ে চুমুক দিয়ে যোগ করত, "অশিক্ষিত, রিফিউজি কলোনির ভিখিরির দল! বস্তি বাড়ি। তোর বাবাকে তো ভালোমানুষ পেয়ে নিংড়ে খেয়ে নিল। ভালো যে আমরা টেনে তাকে বেহালা, হাওড়া পার করে বিডন স্ট্রিটে তুলে এনেছিলাম। নইলে তোকে হয়তো ওখানেই কোন দিন মেরে ফেলত!"
অরিন্দমও কখনো এসব কথার একটুকুও প্রতিবাদ করেননি। বিডন স্ট্রিটের ঘরের কোণে চুপচাপ বসে চশমা মুছে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে রাখতেন। কোনো উত্তরই দিতেন না। কিন্তু আজ, দিল্লি সাকেতের ওই মাল্টিন্যাশনাল ম্যানেজমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট যখন তাকে বোর্ডরুমের সবার সামনে অসম্মান করে ফাইলটা ছুঁড়ে ফেলল, আর মেঘলা সেই রাতেই ইস্তফাপত্র মেল করে দিয়ে একটা ট্রলি ব্যাগ গুটিয়ে সোজাসুজি নয়ডায় খামার বাড়িতে না গিয়ে সোদপুরে চলে এল—তখন তার বুকের ভেতর এই বাড়ির সম্পর্কে জমে থাকা সেই পুরনো ভয়টা এক অদ্ভুত, ক্ষুরধার কৌতূহলে বদলে গিয়েছিল।
গেটের শব্দ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অরিন্দম।
পরনে সুতির একটা পুরোনো ধুতি আর গায়ে হাতা-কাটা গেঞ্জি। চুলগুলো উস্কোখুস্কো, গালে দু-দিনের না-কামানো সাদা-কালো দাড়ি। বাবা আর মেয়ের চোখের দৃষ্টি যখন মিলল, তখন মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক হাজার মাইলের এক দীর্ঘ, শীতল নীরবতা। কোনো জড়িয়ে ধরা নেই, কোনো অভ্যর্থনার উষ্ণতাও নেই। যেনো মেঘলা এই বাড়ির বাসিন্দা।
"তুমি তাহলে এসেছ," অরিন্দম খুব নিচু গলায় বললেন।
"হ্যাঁ। ক্যাবওয়ালাকে ভিজিটিং চার্জ দিতে হবে, আমার পেটিএম কাজ করছে না। চারশো টাকা দাও," মেঘলা গাড়ি থেকে নিজের তিনটে ট্রলি ব্যাগ নামাতে নামাতে বলল। তার গলার স্বর রোবটের মতো সমতল।
অরিন্দম পকেট থেকে দুটো দলা-পাকা দু-শো টাকার নোট বের করে ড্রাইবারকে দিলেন। মেঘলা তার চামড়ার দামী জুতো জোড়া সাবধানে ফেলে ঘরের বারান্দায় উঠল।
ঘরের দরজা খুলতেই একটা ভারী, সোঁদা আর ধুলোর আস্তর ঝাপটা দিয়ে এল মুখে। ঘরের কোণে একটা লোহার খাঁটিয়া, কাঠের পুরোনো ডেক্স, আর মেঝের ওপর পুরু হয়ে জমে থাকা কাদা-ধুলোর পলি। দেওয়ালের চুনকাম ঝরে পড়েছে। অনেক গুলো ফাটল দেওয়ালে।
মেঘলা ট্রলি ব্যাগটা একপাশে রেখে একমুহূর্ত দাঁড়াল। তার মেকআপহীন ফ্যাকাশে মুখে এক ধরণের নৃশংস জেদ ফুটে উঠল। সে হাত থেকে তার অ্যাপল ওয়াচটা খুলে টেবিলে রাখল, দামি সুতির কুর্তির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল।
"ঝাড়ুটা কোথায় বাবা?" মেঘলা সোজা তার বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
অরিন্দম অবাক হয়ে চাইলেন। "কী দরকার? কাল সকালে একটা মেয়ে আসে, সে পরিষ্কার করে দেবে—তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তোমার ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি।"
"তোমার ওই কাল সকালের জন্য আমি এই নোংরায় বসে থাকব না," মেঘলা একরকম প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে রান্নাঘরের পাশ থেকে বারান্দায় রাখা নারকেলের ঝাড়ুটা তুলে নিল।
সে ঝুঁকে পড়ে সোদপুরের মাটির ওপর জমে থাকা বহু বছরের ধুলো সাবড়াতে লাগল। তার ব্লো-ড্রাই করা দামী চুলে ধুলোর আস্তর জমল, হাতের সুসজ্জিত নখে উঠে এল তার বাবার পৈতৃক ভিটের জং ধরা ময়লা। সে যেন শুধু মেঝের ধুলো ঝাড়ছিল না—সাকেতের সেই অপমান, ম্যানেজমেন্টের লাঞ্ছনা আর নিজের ব্যর্থতার ওপর এক ধরণের শারীরিক প্রতিশোধও নিচ্ছিল।
অরিন্দম দরজার গোড়ায় স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনিও আর চাইলেন না মেয়েকে থামাতে। থামানোর কোনো অধিকার তাঁর কোনোদিনই ছিল না।
পরদিন সকাল থেকেই ‘অপরাজিতা’র সামনে একের পর এক গাড়ি আর মালবাহী মিনিট্রাক গুলো এসে থামতে লাগল।
মেঘলা তার ল্যাপটপ খুলে কলকাতার নামকরা এক ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর ফার্মকে ফোন করে ডেকে নিয়ে এসেছিল। চারজন রাজমিস্ত্রি আর দুজন পেন্টার এসে মেঝের ওপর বাঁশের মাচা বাঁধল। দেওয়ালে একের পর এক হাতুড়ির ঘা পড়তে লাগল—ঠাঁ-ঠাঁ-ঠাঁ। বহু বছরের পুরোনো নোনাধরা চুনকাম খসে খসে পড়তে লাগল মেঝের ওপর।
অরিন্দম বারান্দার কোণে একটা মোড়ায় বসে শুধু দেখছিলেন। রাজমিস্ত্রিদের পেন্ট আর পুটিংয়ের রাসায়নিক গন্ধে তাঁর বায়ো-নোটস আর কবিতার পুরোনো খাতার গন্ধ চাপা পড়ে যাচ্ছিল।
"ওখানে কী হচ্ছে?" অরিন্দম হালকা প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলেন, যখন দুজন লোক এসে তাঁর বহু বছরের পুরোনো সেগুন কাঠের আলমারিটা ঠেলে সরাতে গেল।
"ঘরগুলো রি-প্লাস্টার হচ্ছে। আর অ্যাক্রিলিক ইমালশন পেইন্ট হবে," মেঘলা ল্যাপটপে নজর রেখেই বলল। "তোমার এই ভুতুড়ে গুহায়, ছাদ থেকে রোজ চুন খসে পড়ছে। এই স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের ভেতর থাকলে ফুসফুসে ছত্রাক জন্মাবে আর তুমি মারা যাবে। সেটা হতে দেয়া যাবে না। কতদিন বিডন স্ট্রীটের বাড়িতে যাও নি?
তা হবে চার পাঁচ মাস। এখানে ঠিকই আছি আমি মেঘলা"
বিকেলের দিকে ই-কমার্সের বড় ট্রাঙ্ক ট্রাফিকে রাস্তা জাম হয়ে গেল। অনলাইন ডেলিভারি থেকে নামতে লাগল মডার্ন সেগুন কাঠের কিংসাইজ বেড, ওয়ার্ক-স্টেশন টেবিল, চেয়ার আধুনিক সাউন্ডপ্রুফ উইন্ডো প্যানেল এসি আর দামি পার্সিয়ান কার্পেট।
তার পরদিন মেঘলা নিজে গাড়ি নিয়ে চলে গেল কলকাতার বিডন স্ট্রিটের সেই ফ্ল্যাটে। যে ফ্ল্যাটটা অরিন্দমের প্রথম বিবাহিত জীবনের উপার্জনের টাকায় কেনা হয়েছিল, কিন্তু যার চাবি ছিল তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী আর শাশুড়ির কব্জায়। মেঘলা সেই ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে অরিন্দমের পড়ে থাকা পুরোনো ডক্টরেট সার্টিফিকেট, ট্রাঙ্ক ভরা দুর্লভ গবেষণার সব বই,জার্নালে পাবলিশড আর্টিকেল লাইব্রেরির র্যাক আর ক্যাসেট প্লেয়ারের সরঞ্জামগুলো প্যাক করিয়ে সোদপুরে নিয়ে এল।
টানা দশ বারো দিনে ‘অপরাজিতা’র ভেতরে অরিন্দমের ব্যাংকের বেশ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গেল। অরিন্দমের সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে মেঘলা ক্রেডিট কার্ডে বা অনলাইন ট্রান্সফারে একের পর এক টাকা কেটে নিল।
অরিন্দমের কিছু করারও ছিল না। মেঘলা মানুষ হয়েছে বিডন স্ট্রিটের সেই দাপুটে, উচ্চ-মধ্যবিত্ত এলিট আবহাওয়াতে—যেখানে টাকা দিয়ে স্পেস আর ক্ষমতা কিনে নেওয়াটাই জীবনযাত্রার একমাত্র ব্যাকরণ। মেঘলা যখন ঘরগুলোতে নতুন সোফা আর ফাইবার অপটিক্সের আলো সাজাচ্ছিল, তখন অরিন্দম কেবল চুপ করে নিজের ধ্বংস আর পুনর্গঠনকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
বারো দিন পরে এক বিকেলে কাজের লোকরা সব চলে গেল। 'অপরাজিতা'র ভেতরের চেহারা পুরো বদলে গেছে। পুরোনো মেঝের ওপর এখন চকচকে হালকা ধূসর রঙের টাইলস, দামী কার্পেট।দেওয়ালে লাল কালির স্লোগান গুলো উধাও। স্নিগ্ধ অফ-হোয়াইট রঙ, আর ট্রিপল-গ্লেজড কাঁচের জানলা দিয়ে বিকেলের রোদ এসে পড়েছে ইতালীয় স্টাইলের কফি টেবিলটার ওপর। কফি টেবিলটার দু-পাশে দুটো নতুন কুশন চেয়ার। ইজি চেয়ার।
মেঘলা সাদা পোরসেলিনের দুটো কাপে চা ঢালল। একটা কাপ অরিন্দমের দিকে ঠেলে দিয়ে সে নিজে উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসল। বাইরে তখন সোদপুর পূর্বপল্লীর আকাশে মেঘ জমেছে।
মেঘলা চায়ের কাপে চুমুক দিল, কিন্তু তার চোখ অরিন্দমের চোখের দিকে গেল না। সে তাকাচ্ছিল জানলার বাইরে ঝুলে থাকা পুরোনো পেয়ারা গাছটার দিকে, যার পাতায় ঘরের নতুন এলইডি আলোর প্রতিফলন পড়েছিল।
"সাউথ দিল্লির সাকেতের চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি, বাবা," মেঘলা খুব শান্ত গলায় কথা শুরু করল। গলার ভেতরের কাঠিন্যটা আয়নার মতো পরিষ্কার। "ম্যানেজমেন্টের কিছু ছোকরা ডিরেক্টর ভেবেছিল আমাকে করপোরেট পলিটিক্সে কোণঠাসা করে বসের সামনে লজ্জিত করবে। আমি ইস্তফা দিয়ে ওদের মুখে মার্জিন রিপোর্টটা ছুঁড়ে দিয়ে চলে এসেছি।"
অরিন্দম চায়ের কাপটা হাতে ধরে রইলেন। চায়ের গরম ধোঁয়া তাঁর চশমার কাঁচে ঝাপসা আস্তরণ তৈরি করল।
"তারপর?"
"নয়ডার কাছে আমাদের যে চার একরের ফার্মহাউসটা রয়েছে—যেটা তোমার আর আমার যৌথ নামে লিজ নেওয়া ছিলো—আমি ফিরে গিয়ে তার পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে নিচ্ছি," তোমাকে জানানো প্রয়োজন বলে বললাম। মম ও সেটাই বললো। মেঘলা গলার স্বর কিছুটা উঁচু করল। "কৃষি পোল্ট্রি আর অর্গানিক ফার্মিংয়ের প্রজেক্ট করবো ওখানে। দিল্লি সাকেট এর ফ্ল্যাট থেকে সোজা নয়ডায় শিফট করার আগে ভাবলাম একবার সোদপুরে এসে তোমাকে বলে যাই। কারণ জমিটা তো লিগ্যালি তোমারও।"
অরিন্দম চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। "আমার সম্মতির কোনো প্রয়োজন কোনোদিন ছিল না, মেঘলা। আজও নেই। তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই চূড়ান্ত হবে।২৮ বছর পেরিয়ে যাবে তুমি। বিয়ে হলে এক সন্তানের মা হয়ে যেতে"
মেঘলা চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর একটু সশব্দে রাখল। তার চোখে এতক্ষণে এক ধরনের জ্বলন্ত, বরফ-ঠান্ডা ক্ষোভ ফুটে উঠল। সে এবার সোজা অরিন্দমের মুখের দিকে তাকাল—কিন্তু সেই চোখে কোনো স্নেহ ছিল না, ছিল কেবল বিচারকের নিঃসঙ্গ কঠোরতা।
"তুমি এখানে সোদপুরে এসেও লোক দেখিয়ে কিসের তপস্যা করছ আর কেন করছো, বাবা?" মেঘলার ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। "তোমার এই বাড়ির নিজের লোকরা আমার মাকেতো একরকম বাধ্যই করেছিল তোমাকে এখান থেকে বেহালা হয়ে হাওড়া হয়ে কলকাতায় নিয়ে যেতে বিডন স্ট্রিটের ফ্ল্যাট কিনে? এই বাড়ির লোকেরা তোমাকে নাকি ব্ল্যাক ম্যাজিকও করত শুনেছিলাম। মায়ের সাথেও এরা খুবই খারাপ ব্যবহার করেছে।"
অরিন্দম নিশ্চুপ রইলেন। চশমার কাঁচটা খুলে তিনি কুর্তির খুঁট দিয়ে মুছতে লাগলেন।
মেঘলা থামল না। গলার স্বর এবার চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল ঘরে।
"কলকাতার সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় এখন তোমাকে তাড়িয়েছে—তোমার ওই ছাত্রীর কেলেঙ্কারি আর কেসের পর। তাই আজকে আবার তুমি এখানে তোমার পৈতৃক পুরোনো বাড়িতে এসে বৈরাগ্যের নাটক করছ নাতো?! বলো তো, বাদবাকি জীবনটা এখানেই কাটাবে নাকি নয়ডার খামারবাড়িতে যাবে আমার সঙ্গে?"
অরিন্দম আস্তে আস্তে চশমাটা চোখে পরলেন। তাঁর চোখের কোণের চামড়া কুঁকড়ে গেছে, কিন্তু চোখের ভেতরটা এক পরম শান্ত, বিপজ্জনক স্থিরতায় ভরা। তিনি মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা নতুন টাইলসের আলোর দিকে চাইলেন।
"পাপ না করে স্বীকার না করাটা তপস্যা নয়, মেঘলা," অরিন্দম খুব ধীর, গভীর গলায় বলতে শুরু করলেন। প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটা ভারী পাথরের মতো ঘরে পড়তে লাগল। "এটা নিজের সত্যের মুখোমুখি হওয়া। আর গোয়েবলস সাহেবের একটা থিওরি জানো তো? 'কোনো মিথ্যেকে বানিয়ে বানিয়ে বারে বারে পাবলিককে বললে সেটাও একসময় সত্যি বলেই মনে হয়।'”
মেঘলার ভ্রূ দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু অরিন্দম হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
"আমাকে এখান থেকে জোর খাটিয়ে, নানা ধরনের লোভ দেখিয়ে সরিয়ে নিয়েছিল, আমার যাবতীয় আত্মীয়স্বজনের সকলের সাথে সম্পর্কগুলোকে শেষ করে দিয়েছিল কে, মেঘলা সেটার খোঁজ নাও এখানের লোক জনের মধ্যে?" অরিন্দম সোজা মেয়ের চোখের দিকে চাইলেন। এই প্রথম তাঁর গলায় এক অদৃশ্য আগুনের আঁচ পাওয়া গেল। "তোর গর্ভধারিণী মা! আর তোর মাসী দাদু দিদা! যারা আমাকে, তোকে সারা জীবন মিথ্যেকথা আর ধোঁকা দিয়ে এসেছিল।"
মেঘলা চেয়ারের ওপর টানটান হয়ে বসল। "আমার মাকে জড়িয়ে তুমি নিজের দোষ ঢাকতে পারো না—"
"তোর মা তার শ্বশুরবাড়ির কাউকেই তার ধারে কাছেও কোনোদিন ঘেঁষতে দেয়নি," অরিন্দম এক চুলও সরলেন না নিজের স্থান থেকে। "যেহেতু তারা গরীব ছিল, আর অশিক্ষিত ছিল—বস্তিবাড়ি কলোনি এলাকায় থাকত। তোর মা মনে মনে চাইত এদের ক্ষতি হোক। এরা ধ্বংস হয়ে যাক। আমাকেও না—তুই তো আর ইতিহাস জানিস না, মেঘলা। ইতিহাসটা সঠিক ভাবেই জানাও জরুরি রে মা।"
ঘরটার ওপর বিকেলের বিষণ্ণ অন্ধকার নেমে আসছিল। ঘরের নতুন আধুনিক বাতিগুলো পৈতৃক বাড়ির মেঝের ওপর কোনো উষ্ণতাই তৈরি করতে পারছিল না।
"তোকে ও কিন্তু তৈরি করেছে তোর মা আর মাসী মিলে কোত্থেকে বড়লোকি চালে," অরিন্দম এক তিক্ত হাসিতে নিজের ঠোঁট বাঁকালেন। "আমি তো একটা পাপেটই ছিলাম বিডন স্ট্রিটে তোর মা দাদু-দিদানের হাতে। একটা মাইনে-পাওয়া রোবট, যার কাজ ছিল নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরি করা আর মাইনের টাকাটা ওদের হাতে তুলে দেওয়া। তুই আর এই বাড়িটার মর্ম কী, সোদপুরের এই মাটির যন্ত্রণাটা কী—সেটা বুঝবি না কোনোদিনও।"
মেঘলা কিছু সময় অপলক দৃষ্টিতে বাপের দিকে চেয়ে রইল। তার ফর্সা গাল দুটো অপমানে রাগে লাল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে চিল্লিয়ে উঠল না। বিডন স্ট্রিট আর সাকেতের করপোরেট কালচার তাকে নিজের আবেগকে বরফ বানিয়ে রাখারও শিক্ষা দিয়েছে।
সে আস্তে করে চায়ের খালি কাপটা ট্রে-তে রাখল।
"আমি এখানে এই বাড়ির ইতিহাস শুনতে তো আসিনি, বাবা," মেঘলা উঠে দাঁড়াল। তার মেপে নেওয়া পদক্ষেপে এক পরম দূরত্ব। "আমি শুধু জানতে এসেছি—আমার নয়ডার খামারবাড়ির লিজ পেপারে তোমার সইটা পাব কিনা।"
"আমি কাল সকালে সই করে দেব কেমন ," অরিন্দম শান্তভাবে বললেন।
মেঘলা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল—যে ঘরটাকে সে নতুন আসবাব আর রঙ দিয়ে সাজিয়েছে, কিন্তু যার চারটে দেওয়াল এখনও সোদপুরের সেই পুরোনো ক্ষয়ের গন্ধ ধরে রেখেছে।
ঘরের দরজার মুখে পৌঁছে সে একবার থামল। পেছন না ফিরে বলল, "তোমার পাপ বা পুণ্য নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু ভালো ভাবে উচ্চ বিত্তদের মত বাঁচতে চাই। আর সেই বাঁচার জন্য যা কিছু ভাঙতে হয়, আমি ভাঙব।"
মেঘলা ঘরে ঢুকে কপাটটা সশব্দে বন্ধ করে দিল।
অরিন্দম একাই বসে রইলেন নতুন ইতালীয় স্টাইলের কফি টেবিলটার সামনে। সোদপুর স্টেশনের দিক থেকে তখন আর একটা ডাউন ট্রেনের দীর্ঘ, তীব্র হুইসেল ভেসে আসছে। লোহার ট্র্যাকে চাকার ঘর্ষণের শব্দটা ঘরের নতুনে সাজানো কাঁচের জানলাগুলোকে থরথর করে কাঁপিয়ে দিল।
বাইরে একফোঁটা একফোঁটা করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পৈতৃক ভিটের মাটিতে জল পড়ার সেই চেনা, সোঁদা গন্ধটা নতুন পেইন্টের রাসায়নিক ঘ্রাণ চিরে ঘরে ঢুকে এল। অরিন্দম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কাপের অবশিষ্ট ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ে শেষ চুমুক দিলেন।
* পর্ব ৩: খামারবাড়ি, আঘাত ও পতন (অধ্যায় ১৭ – ২৪)
অধ্যায় ১৭: দিল্লি-নয়ডার খামারবাড়ি ও পেট্রাস
পুরোনো হোন্ডা গাড়িটার এঞ্জিন থেকে একটা ধুঁকতে থাকা ধাতব ঘড়ঘড় শব্দ উঠছিল। নয়ডার মূল বাইপাস ছেড়ে কাঁচা, ধুলোমাখা গ্রামীণ রাস্তায় ঢুকতেই সামনের কাঁচের ওপর এক আস্তরণ ধুলো এসে আছড়ে পড়ল। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে প্রফেসর অরিন্দম মুখার্জী চশমার কাঁচটা আঙুল দিয়ে সামান্য তুলে ধরলেন। দু-পাশে ধূ-ধূ করছে দিগন্তবিস্তারী জমি—কোথাও সরষের কচি সবুজ চারা, কোথাও আধ-শুকনো বাঁধাকপির খেত, আর দূরে ইউক্যালিপটাসের সারির পেছনে একটা একতলা আকাশী নীল রঙের খামারবাড়িটা। ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়া ছিলো তার আর মেঘলার নামে।
কলকাতা আর সোদপুরের গলির স্যাঁতসেঁতে নোনা ধরা দেয়াল, থরে থরে সাজানো বইয়ের গন্ধ আর শেওলার সোঁদা ভাব ছেড়ে এই রুক্ষ, বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তরের সামনে দাঁড়িয়ে অরিন্দমের হঠাৎ কেমন যেন দম আটকে আসছিল। গাড়িটা একটা শুকনো নিমগাছের ছায়ায় থামিয়ে তিনি দরজা খুললেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে, কিন্তু বাতাসে এক ধরণের রুক্ষ, পোড়া মাটির তীব্র গন্ধ।
খামারবাড়ির তারের বেড়ার ওপাশে সার দিয়ে সাজানো কয়েকটা মস্ত লোহার খাঁচা। খাঁচার ভেতর থেকে চার-পাঁচটা বিশাল আকৃতির অ্যালসেশিয়ান আর রটউইলারের সম্মিলিত গর্জন আর সশব্দ চেইন টানাটানির শব্দে চারপাশের স্তব্ধতা কেঁপে উঠছে।
খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা দীর্ঘদেহী, পাহাড়ের মতো চওড়া শরীর। কুচকুচে কালো চামড়ার ওপর ঘামের ফোঁটা রোদে চকচক করছে—পেট্রাস। মেঘলার নতুন ব্যবসার পার্টনার। আফ্রিকান নিগ্রো । পরনে তার একটা ধূলিমলিন ট্রাউজার আর স্যান্ডো টি-শার্ট। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে মেঘলা।
মেঘলাকেও চেনা দায়। তার পায়ে কাদা-লাগা চামড়ার ভারী বুট, পরনে ঢিলেঢালা ধূসর সুতির শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো পেছনের দিকে শক্ত করে বাঁধা। তার হাতে একটা বিশাল ড্রামের মতো প্লাস্টিকের বালতি—তাতে সেদ্ধ করা মাংস, ভাত আর সয়াবিনের মিশ্রণ।
পেট্রাস সাবধানে খাঁচার ভারী স্লাইডিং দরজাটা সামান্য ফাঁক করে কাঠের হাঁড়িকাঠের মতো পাত্রগুলো ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে, আর মেঘলা নির্দ্বিধায় একটা গর্জনরত ডোবারমান কুকুরের কানের পাশে আলতো হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করছে।
অরিন্দম গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। দিল্লির করপোরেট এসি রুম কিংবা সোদপুরের পৈতৃক বারান্দায় যে মেঘলাকে তিনি চিনেছিলেন, এই মেঘলা তার কোনোটাই নয়। এই মেঘলার চলাফেরায়, আদেশে, হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় এক নগ্ন, আদিম কাঠিন্য।
"তুমি গাড়িটা ওখানে রোদে দাঁড়িয়ে রাখলে কেন? ভেতরে নিয়ে এসো," মেঘলা না ফিরেই বলল। তার গলায় কোনো আবেগ বা অনুভূতির লেশমাত্র নেই, যেন বাবা কলকাতা থেকে চারশো মাইল পথ চালিয়ে নিজের পুরোনো ভাঙা হোন্ডা নিয়ে আসাটা অতি সাধারণ এক দৈনন্দিন ঘটনা।
পেট্রাস বালতিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মেটে রঙের গভীর দুটো চোখ অরিন্দমের চশমা-পরা, শীর্ণ চেহারার ওপর এসে পড়ল। তারপর সে খুব ধীরে, বিনীতভাবে এক হাত বুকে রাখল।
"নমস্তে সাহেব মুখার্জি।"
অরিন্দম একটু থমকে গিয়ে ঘাড় নাড়লেন। "নমস্তে... তুমি পেট্রাস, তাই তো?"
"হাঁ সাহেব। পেট্রাস," তার গলার স্বর কোনো গভীর তবলার চাঁটির মতো গম্ভীর, অথচ এক ধরণের সুরেলা মর্দানি ধরে রাখে।
খামারবাড়ির একপাশের টিনের চাল দেওয়া খোলা বারান্দায় কাঠের বেঞ্চে বসলেন অরিন্দম। মেঘলা ভেতর থেকে জল আর একটা মাটির থালায় কাঁচা শসা, টমেটো আর সেদ্ধ ডিম নিয়ে এল।
"এগুলো কিন্তু আমাদের নিজেদের খেতের আর পোল্ট্রির," মেঘলা থালাটা কাঠের টেবিলের ওপর রাখল। তারপর পাশ থেকে একটা মোটা কাপড়ের বাইন্ডিং করা হিসাবের খাতা আর কয়েকটা চালান এনে অরিন্দমের সামনে ছুঁড়ে দিল। "তুমি তো এসেছিলে কাগজপত্র দেখতে? দেখে নাও। লিজের টাকা, সারের খরচ, গাজিয়াবাদ মণ্ডির সেলস ইনভয়েস—সব নিখুঁত হিসেব রাখা আছে। এক পয়সার এদিক-ওদিক নেই।"
অরিন্দম পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে লাগলেন। সংখ্যাগুলো খুব পরিষ্কার, কাটাকুটিহীন। স্থানীয় সবজি ডিলার সুবহে সিং আর দিল্লি মান্ডির কমিশন এজেন্টের সই করা সব এন্ট্রি আর চালান।
"তুমি একা এসব সামলাচ্ছ?" অরিন্দম থালা থেকে এক টুকরো শসা তুলে নিয়ে ধীরস্বরে শুধোলেন।
"একা কেন হব? পেট্রাস আছে তো সঙ্গে। আর খেতের পনের জন স্থানীয় মজুরও আছে," মেঘলা একঘেয়ে, নিরপেক্ষ গলায় বলল। "শহরের ওই ভণ্ড করপোরেট অফিসের চেয়ে এই মাটি অনেক সোজা, বাবা। এখানে যে যেটুকু গায়ের ঘাম ঢালবে, ফসল ঠিক ততটুকুই ফেরত দেবে। পেছন থেকে কেউ কোনো রাজনীতি করবে না।"
কথা শেষ হতে না হতেই কাঁচা রাস্তায় একটা পিক-আপ ভ্যানের ধুলো উড়িয়ে আসার শব্দ হলো। স্থানীয় ডিলার সুবহে সিং গাড়ি থেকে নামল। অরিন্দম উঠে গিয়ে তার সাথে কথা বললেন। সুবহে সিং মেঘলার কাজের প্রশংসাই করল—"মেমসাহেব বহুত শক্ত হ্যায় সাহেব, এক পয়সা দাম কম নেয় না। মালও একদম তাজা পাঠায়, তাই বাজার দর ভালো পায়।"
সুবহে সিং হিসাব চুকিয়ে পিক-আপ ভ্যান নিয়ে চলে যাওয়ার পর অরিন্দমের বুকের ভেতর চিন্তার মেঘটা আবার ঘন হয়ে এল।
মেঘলার বয়স আটাস পার হয়ে উনত্রিশ ছুঁই-ছুঁই। মুখের চামড়ার রেখাগুলোতে এক ধরণের বরফ জমা কঠোরতা। এই রুক্ষ, নির্জন নয়ডার প্রান্তর আর হরিয়ানা-ইউপি সীমান্তের মেঠো কায়দায় ক'টা দিন এভাবে কাটানো যায়? ক'টা দিন এই পশুর খাঁচা আর শাকসবজির হিসেব দিয়ে জীবন চলবে মেঘলার?
কার সাথে বিয়ে হবে এই মেয়ের? এত তেজ এতো রাগ, এত জেদ, এত মেজাজ আর পুরুষের প্রতি এত ঘেন্না নিয়ে চলা মেয়েকে কে সহ্য করবে কোন পরিবার ঘরের বউ হিসেবে মর্যাদা দেবে? কিন্তু আবার নয়ডার এই নির্জন অচেনা সীমান্তে ওকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো এক শক্ত, প্রভাবশালী অভিভাবকও যে বড্ড দরকার মেঘলার। এই পেট্রাস নামের কৃষ্ণাঙ্গ লোকটা অনুগত হতে পারে, কিন্তু সে তো স্রেফ এক মাইনে-করা খামারকর্মী। তার ওপরে নিগ্রো আফ্রিকান। এদের মধ্যে জাত নিয়ে ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষ সব সময়ের।
বিকেলের রক্তাভ আলো নেমে আসছে নয়ডার খোলা খেতের ওপর। বাতাসে ইউক্যালিপটাস পাতার খসখস শব্দ আর কাঁচা গোবরের কটু গন্ধ।
পেট্রাস ও মেঘলা আবার পেছনের খাঁচাগুলোর দিকে গেল। বিকেলের আহারের সময় হয়েছে। খাঁচার ওপাশ থেকে কুকুরগুলোর হিংস্র গর্জন আর কাঁচা মাংস চিবোনোর শব্দ ভেসে আসছে।
অরিন্দম ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়ালেন খাঁচার তারের জালের সামনে। একটা বিশাল রটউইলার রক্তাভ চোখে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে, তার কষ বেয়ে লালা ঝরছে। পেট্রাস অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভীক হাতে মাংসের টুকরোগুলো লোহার ফাঁক গলিয়ে ভেতরে ফেলে দিচ্ছে।
"তুমি কতদিন আছ এখানে, পেট্রাস?" অরিন্দম শুধোলেন, তাঁর চোখ আকাশে উড্ডীয়মান পাখির ঝাঁকের দিকে।
পেট্রাস থামল। তার কুচকুচে কালো হাত দুটো একটা মোটা চটের বস্তায় মুছে নিয়ে বলল, "তিন বছর সাহেব। আফ্রিকা থেকে যখন ইন্ডিয়াতে আসি, তখন নিজের দেশ, নিজের নাম, পরিচয়—সব কিছু হারিয়েই এসেছিলাম। নয়ডার এই মাটি আর এই পশুগুলা আমাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে।"
অরিন্দম চশমাটা খুলে কুর্তির খুঁটে মুছলেন। "শহরের আলো, ডিগ্রি, সাহিত্য, সমাজ—এসব ছেড়ে এই পশু আর মাটির মাঝে শান্তিতে থাকা যায়?"
পেট্রাস একটু হাসল। তার ধবধবে সাদা দাঁতের পংক্তি বিকেলের লাল আলোয় ঝিকমিক করে উঠল। সে মাটির দিকে একঝলক তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু ও স্পষ্ট গলায় বলল:
"জমি শুধু বীজকেই চেনে সাহেব। আপনি কে ছিলেন, বীজ কার, সেটা কখনোই জমি জানতে চায় না।"
অরিন্দম এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। পেট্রাসের কথার ভেতর যেন কোনো অ্যাকাডেমিক টেবিলের পণ্ডিতে চেয়েও গভীর এক প্রাগৈতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু অরিন্দমের নিজের মাথার ভেতর তখন সোদপুরের ভাঙা বাড়ি, রিয়া সেনের শরীরের প্রলোভন, লর্ড বায়রনের অপেরা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিচারকদের চিৎকার ঘুরপাক খাচ্ছে।
অরিন্দম চশমাটা আবার চোখে পরলেন। আত্মকথনের মতো ভারী গলায় বললেন:
"কিন্তু ধর্ম, পরিবার, স্মৃতিও যে মানুষকে ছাড়ে না পেট্রাস। মানুষ মাটির মতো অত সহজ হতে পারে না।"
মেঘলা দূর থেকে ট্রাক্টরের চাকা পরীক্ষা করছিল। সে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে বাবার এই চিরন্তন কবি-কবি ভাব আর দার্শনিকতার প্রতি এক চরম বিদ্রূপ ফুটে উঠল।
"স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে যারা বাঁচে বাবা, তারাই আসলে পচে গেছে," মেঘলা শুকনো গলায় বলল। "তোমার স্মৃতি তোমাকে কলকাতার রাস্তায় অপমান করেছে, সোদপুরের ঘরে বন্দি করেছে। আমি সেই স্মৃতিকে এই নয়ডার ধুলোয় পুঁতে ফেলেছি।"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিলেন না।
দূর দিগন্তে রেললাইনের দিক থেকে একটা ট্রেনের দীর্ঘ সিটি বাজল—দিল্লিগামী কোনো এক্সপ্রেস ট্রেন হয়তো বা। নয়ডার খোলা হাওয়ায় তখন গোবরের গন্ধ, কাঁচা মাংসের নোনতা ঘ্রাণ, আর পশুর গোঙানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
অরিন্দম নিজের পুরোনো হন্ডা গাড়িটার দিকে চাইলেন। সমাজ তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির এই অনাবিল, নিষ্ঠুর রুক্ষতার সামনে দাঁড়িয়েও তিনি নিজেকে এক পরম, চিরন্তন বহিরাগত বলে বোধ করতে লাগলেন।
অধ্যায় ১৮: অন্ধকারের আক্রমণ
দিল্লি-নয়ডার শেষ সীমানায় মেঘলার লিজ নেওয়া খামারবাড়ি। চারপাশে মেহগনি আর ইউক্যালিপটাসের বাগান। রাত ন'টা বেজেছে, বাইরে ঘন কুয়াশা আর অন্ধকার।
অরিন্দম ও মেঘলা ডাইনিং টেবিলে মুখোমুখি বসে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। বাইরে খাঁচায় রাখা তিনটে অ্যালসেশিয়ান কুকুর হঠাৎই বিকট শব্দে ঘেউ ঘেউ করে উঠল।
হঠাৎই বাইরের কাঠের দরজায় সশব্দে করাঘাত—ঠাঁ-ঠাঁ-ঠাঁ!
“কে এলো এত রাতে?” মেঘলা উঠে দাঁড়াল।
“যেও না মেঘলা,” অরিন্দম বারণ করলেন হাত তুলে ।
কিন্তু তার আগেই দরজার ওপার থেকে কাঁপানো গলায় আওয়াজ এল, “দিদিজি! পেট্রাস ভাইয়ের আত্মীয় আমি! রাস্তার ধারে গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে, একটু জল পাওয়া যাবে কী?”
মেঘলা দরজাটা সামান্য ফাঁক করতেই বাইরে থেকে তিন জোড়া শক্ত হাত দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে ফেলল। ভেতরে ঢুকে এল তিনজন লোক, যাদের মুখে মাফলার পেঁচানো, হাতে লোহার রড ও দেশি পিস্তল।
“শব্দ করবি তো একেবারে খুলিই উড়িয়ে দেব!” প্রথম লোকটা (অরিন্দমের কেনো যেনো মনে হচ্ছিল ছেলেটাকে ঈমন) গর্জে উঠল।
অরিন্দম এগিয়ে আসার চেষ্টা করতেই দ্বিতীয় লোকটা তাঁর মাথায় লোহার রড দিয়ে সশব্দে আঘাত করল। অরিন্দম মেঝের ওপর আছড়ে পড়লেন, চশমাটা ছিটকে গেল দূরে। নাক থেকে গড়িয়ে পড়ছে গরম রক্ত।
“বুড়োটাকে বাথরুমে পুরে তালা মার আগে!” লোকটা নির্দেশ দিল।
দুজন লোক অরিন্দমকে টেনেহিঁচড়ে বাইরের ছোট বাথরুমটায় ছুঁড়ে ফেলে বাইরে থেকে সশব্দে ছিটকিনি আটকে দিল। বাইরে তখন অ্যালসেশিয়ান কুকুরগুলোর আর্তনাদ শুরু হয়েছে। পর পর তিনটে গুলির শব্দ হলো—ঠাঁ! ঠাঁ! ঠাঁ! কুকুরগুলোর চেঁচানো মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
“মেঘলা!” বাথরুমের ভেতরের অন্ধকারে হাতড়ে অরিন্দম দরজায় মাথা আর কনুই টুকতে লাগলেন। “মেঘলা! ওকে ছেড়ে দে তোরা! আমার যা আছে সব নিয়ে নে!”
*
অধ্যায় ১৯: অন্ধকারের শিখা ও চরম অক্ষমতা
বাথরুমের স্যাঁতসেঁতে, একফালি ভেন্টিলেটরের সরু ফাঁক দিয়ে বাইরের ঘরের পোড়া কেরোসিনের কটু গন্ধ আর বারুদের ধোঁয়া ধীরগতিতে ভেতরে ঢুকে আসছিল। ঘরের বাইরে চট ও কাঠের ক্যাবিনেটে ঢালা তরল জ্বালানির ছপছপ শব্দ আর আগুনের খসখস আওয়াজ এক বিভীষিকাময় আবহের জন্ম দিচ্ছিল।
অরিন্দম ভেন্টিলেটরের ঘোলাটে, রক্তের আস্তরণে ঝাপসা হয়ে যাওয়া কাচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার আকুল চেষ্টা করছিলেন। চশমাটা ছিটকে ভাঙা মেঝের কোণে চুরমার হয়ে গেছে। কপাল ও নাকের হাড় ফেটে গড়িয়ে পড়া তাজা রক্ত চোখের জল ও ঘামের সাথে মিশে দৃষ্টিকে লাল কুয়াশায় ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু সেই আবছা আলো-ছায়ার ভেতরে যা ঘটে চলছিল, তা যে কোনো কল্পিত নরকের চেয়েও শতগুণ বেশি বীভৎস।
বাইরের ঘরের মেঝের ওপর মেঘলা তখন পশুর কামড়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শেষ শক্তি দিয়ে লড়ছিল। কিন্তু দুজন সশস্ত্র অপরাধীর প্রবল দৈহিক শক্তির কাছে তার সেই মরিয়া প্রতিরোধ মুছে যেতে সময় লাগল না। ছেলেটা পশুর মতো হিংস্রতায় আছড়ে পড়েছিল ওর ওপর। জামাকাপড় ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেল। এক অসম, নিষ্ঠুর শারীরিক ও মানসিক হামলায় চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগল মেঘলার অস্তিত্ব। তার আত্মরক্ষার আপ্রাণ আকুতি, আতঙ্কের তাণ্ডব আর বুকফাটা প্রতিরোধ একসময় চরম যন্ত্রণা আর বোবা গোঙানিতে রূপ নিল।
“মেঘলা!” অরিন্দম আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বাথরুমের বন্ধ ভারী দরজায় নিজের জখম কাঁধ, কপাল আর বুক দিয়ে উন্মত্তের মতো ধাক্কা মারতে লাগলেন।
কিন্তু সেই শক্ত কাঠের দরজার খিল এক ইঞ্চিও সরলো না। প্রতিটি আঘাতে তাঁর কপাল থেকে আবার রক্তের ধারা ফুট কেটে বেরিয়ে এসে বাথরুমের ঠান্ডা মেঝের লাল সিমেন্ট ভাসিয়ে দিল। অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, জীবনের পুরো সময়টা ধরে অর্জিত তাঁর সমস্ত সাহিত্যজ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেয়া তেজস্বী বক্তৃতা আর বায়রনের নন্দনতত্ত্বের ঔদ্ধত্য—সবকিছু যেন এই চার দেয়ালের বন্দী দশায় এসে এক চরম, নপুংসক ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে। দরজার ওপাশে নিজের একমাত্র সন্তানকে চূর্ণ হতে দেখেও তিনি কেবল এক বন্দী পশুর মতো আছাড়পিছাড় খাওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না।
“ঈশ্বর!” অরিন্দম দরজার কাঠের ওপর কপাল ঠুকে শেষবার আর্তনাদ করে উঠলেন, “তুমি যদি কোথাও বেঁচে থাকো, তবে আমাকে আর এক মুহূর্তের জন্য বাঁচিয়ে রেখো না! আমাকে শেষ করে দাও!”
বাইরে থেকে ছেলেটার পৈশাচিক, বিষাক্ত হাসির শব্দ ভেসে এল, “তোর ঈশ্বর এখন ঘুমাচ্ছেরে বুড়ো! এই অন্ধকারে কোনো ঈশ্বর কাজ করে না, অনর্থক চেঁচিয়ে লাভ নেই!”
ঘরের কাঠের আসবাবপত্রে তখন আগুনের লাল শিখা কামড়ে ধরেছে, তীব্র ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বাইরে এক নারীর চরম অপমান আর অস্তিত্ব ধ্বংসের করুণ তাণ্ডব সম্পন্ন হচ্ছিল। অরিন্দম চেতনা হারানোর মুখে বাথরুমের রক্তাক্ত, শীতল মেঝের ওপর আছড়ে পড়লেন। তিনি দুই হাতে শক্ত করে কান চেপে ধরলেন, কিন্তু নিজের বুকের ভেতর থেকে উত্থিত আত্মঘৃণা আর নিজ ক্ষমতার চরম সীমানার ভয়াবহ চিৎকার তিনি কোনোভাবেই থামাতে পারছিলেন না।
অধ্যায় ২০: নাম ভুল ও কাগজের প্রতিবেদন
ভোরের ফ্যাকাশে আলো যখন নয়ডার সেই অর্ধদগ্ধ খামারবাড়িটার ওপর ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাতাসে কেবল পুড়ে যাওয়া ইউক্যালিপটাস, কটু বারুদ আর রক্ত জমাট বাঁধার এক বীভৎস গন্ধ। সাইরেনের বিকট শব্দ তুলে এসে পৌঁছেছিল নয়ডা পুলিশের কয়েকটা টহলদারি গাড়ি। অ্যাম্বুলেন্সের নীল-লাল ফ্ল্যাশলাইটের আলো পোড়া দেয়াল আর রক্তে ভেজা উঠোনে পড়ে এক অদ্ভুত প্রেতপুরীর পরিবেশ তৈরি করছিল।
বাথরুমের ভেঙে ফেলা দরজার ভেতর থেকে উদ্ধার করার পর অরিন্দমকে আনা হয়েছিলো নয়ডার এক সরকারি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ইউনিটে। স্যাঁতসেঁতে, চুনখসে পড়া ঘরের এক কোণে লোহার বেডে শুয়েছিলেন তিনি। মাথায় সাদা কাপড়ের মোটা ব্যান্ডেজ, কপালে আটটা সেলাই, চশমা ছাড়া দৃষ্টি ঝাপসা আর চোখের কোল দুটো জমাট রক্তে নীল হয়ে আছে। কিন্তু তাঁর শরীরের এই যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতগুলো যেন মনের ভেতরের গভীরে লেগে থাকা পচনের সামনে একেবারেই নগণ্য। পাশের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে শুয়ে আছে মেঘলা—তার শরীরের রক্তক্ষরণ হয়তো থেমেছে, কিন্তু চেতনার আলো ফেরেনি। সে যেন এক জ্যান্ত, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ।
সকালের দিকে নয়ডার স্থানীয় থানার এক জুনিয়র পুলিশ অফিসার আর দু-একজন স্থানীয় ক্রাইম রিপোর্টার এসেছিলেন জবানবন্দি নিতে। এই সীমান্ত এলাকায় জমি দখল, ডাকাতি বা রাজনৈতিক কোন্দলে গৃহদাহের মতো হিংসা নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। পুলিশ অফিসারটি নিতান্ত বাধ্য হয়ে খাতার পাতায় কয়েকটা নির্জীব লাইন টুকছিলেন। তাঁর চোখে কোনো সহানুভূতি ছিল না—ছিল এক ধরণের মেকানিক্যাল ক্লান্তি আর তাচ্ছিল্য। সাংবাদিকদের কাছেও এটি ছিল স্রেফ দৈনিক খবরের খাতার এক কোণের সামান্য একটা সংখ্যা মাত্র।
দুপুরের দিকে হাসপাতালের করিডোরের কোলাহল কিছুটা কমলে, বেডের পাশের কাঠের টুলে কেউ একটা জাতীয় টেলিগ্রাফ এর প্রাতঃকালীন পত্রিকার হিন্দি ভাষায় দিল্লি সংস্করণ রেখে দিয়ে গেল।
অরিন্দম ধীর হাতে, অতি কষ্টে কাঁপা আঙুলে কাগজটা তুলে নিলেন। চশমাটা কাল রাতেই গুড়িয়ে গেছে, তাই কাগজটা চোখের খুব কাছে এনে দৃষ্টিকে জোর করে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি।
কাগজের পাঁচ নম্বর পাতায় নিচের দিকে এক কলামের একটা ছোট, অসংলগ্ন খবর ছাপা হয়েছে: "নয়ডা সীমান্তে খামারবাড়িতে দুষ্কৃতী হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট।"
অরিন্দমের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে এল। তিনি মনে মনে যা ভয় পাচ্ছিলেন, সেটাই কি তবে হতে চলেছে? এই খবর যদি কোনোভাবে কলকাতার মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী মহল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের চত্বরে পৌঁছায়, তবে তাঁর কলঙ্কিত অতীত, রিয়া সেনের শারীরিক প্রলোভনের স্ক্যান্ডাল আর বায়রনের সেই অপমানের পর মেয়ের এই বিভীষিকাময় পতন নিয়ে আবারও কুৎসিত চর্বিতচর্বণ শুরু হবে। কলকাতা ও সোদপুরের পুরো সমাজ আবারও তাঁর নগ্ন, রক্তাক্ত ক্ষতে নুন ছিটিয়ে আনন্দ পাবে।
কিন্তু প্রতিবেদনটির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে গিয়ে অরিন্দমের ঝাপসা চোখ দুটো হঠাৎ আটকে গেল। ছাপা হয়েছে:
"ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত প্রবীণ গৃহকর্তা অরবিন্দ ভট্টাচার্য ও তাঁর কন্যাকে উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে..."
'অরবিন্দ ভট্টাচার্য'!
অরিন্দম কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ স্থির, স্তব্ধ হয়ে রইলেন। 'অরিন্দম' নামটি এই কাঁচা সাংবাদিকতা আর পুলিশি ডায়েরির তাড়াহুড়োর ভুলে এক লহমায় পাল্টে হয়ে গেছে 'অরবিন্দ'। এক অক্ষরের এক সামান্য মুদ্রণপ্রমাদের আড়ালে তাঁর সমস্ত কলকাতা-কেন্দ্রিক লজ্জিত পরিচয়, অপমানিত অতীত আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মহাকলঙ্কিত ইতিহাস চিরকালের মতো আড়াল হয়ে গেল। এই দূর সীমান্তের ভয়াবহ নরককুণ্ডের সাথে 'অধ্যাপক অরিন্দম মুখার্জি'-এর পরিচিত মুখটাকে মেলাবার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট রইল না।
অরিন্দমের রক্তহীন, শুকনো ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, তিতকুটে ও চরম বিদ্রূপাত্মক হাসির রেখা। এটি কোনো স্বস্তির প্রকাশ ছিল না; এটি ছিল মহাজাগতিক এক পরম করুণার নামে ভাগ্যের চরম পৈশাচিক উপহাস।
মুচড়ে যাওয়া খবরের কাগজটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে অরিন্দম শূন্য দৃষ্টিতে হাসপাতালের নোংরা জানলার বাইরে ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর আপনমনেই বিড়বিড় করে বললেন:
"সংবাদপত্র আমার মেয়েকে বাঁচায়নি, আমার পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে ফেরায়নি... কিন্তু আমার লজ্জিত, অপমানিত নামটাকে একটা ভুলের আড়ালে লুকিয়ে দিল। কী অদ্ভুত আর নিষ্ঠুর এই ন্যায়বিচার!"
বাইরে নয়ডার কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে দু-একটা কাক ডেকে উঠল। পৃথিবীর সমস্ত কাব্য, নীতিশাস্ত্র আর ঈশ্বরের উপস্থিতির দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক অক্ষরের মুদ্রণপ্রমাদ এক নিমেষে আড়াল করে দিল এক মানুষের চিরন্তন লজ্জা। অরিন্দম চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা তপ্ত জল মুছে নিয়ে খবরের কাগজটা মেঝের নোংরা কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
*অধ্যায় ২১: মেঘলার নীরবতা ও অ্যাগোরাফোবিয়া
হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর নয়ডার সেই পোড়া, স্যাঁতসেঁতে খামারবাড়িটার বাতাস যেন আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারল না। পোড়া কাঠের কটু গন্ধটা চারপাশের মেহগনি আর ইউক্যালিপটাসের কুয়াশায় মিশে এক স্থায়ী বিষাদের জন্ম দিয়েছিল। অরিন্দমের মাথার ক্ষতে সেলাইয়ের দাগ আর কপালে ব্যান্ডেজ তখনও শুকায়নি, কিন্তু তাঁর ভেতরের ক্ষত তার চেয়েও বেশি রক্তাত্ত।
তবে মেঘলার অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। শারীরিক আঘাতগুলো কিছুটা সামলে উঠলেও, সে এক গভীর, অন্ধ নিস্তব্ধতার অতলে তলিয়ে গেল।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই সে নিজেকে খামারবাড়ির পেছনের দিকের ছোট অন্ধকার ঘরটায় বন্দি করে ফেলেছে। সে আর ঘরের বাইরে এক পা-ও ফেলে না। দরজার ওপর মোটা ভারি পর্দা টেনে দেওয়া; দিনের আলো বা বিকেলের মুক্ত রোদ ঘরের ভেতরে ঢোকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খোলা প্রান্তর, ইউক্যালিপটাসের সারি, কিংবা দরজার বাইরের খোলা আকাশের দিকে তাকালেই তার শরীরে এক অদৃশ্য প্যানিক অ্যাটাক বা চরম আতঙ্ক আছড়ে পড়ে—এক তীব্র অ্যাগোরাফোবিয়া তাকে আষ্টেপৃষ্টে গিলে খেয়েছে। যে মেঘলা একসময় হিংস্র অ্যালসেশিয়ান কুকুর সামলাত, গাজিয়াবাদ মান্ডির সুবহে সিংয়ের মতো ব্যবসায়ীদের সাথে চোখে চোখ রেখে খামারের উৎপন্য ফসলের দরদাম করত, সেই মেঘলা এখন খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলো দেখলেও ভয়ে কেমন যেনো কুঁকড়ে যায়।
পুলিশ কয়েকবার জবানবন্দি নিতে এসেছিল। মামলার চার্জশিট তৈরির জন্য তাদের প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান দরকার ছিল। কিন্তু মেঘলা তদন্তকারী অফিসারের সামনে কাঠের পুতুলের মতো বিন্দুমাত্র কথা না বলে বসে রইল। সে কোনো আসামীর নামও বলল না, ঘটনার কোনো বিবরণ দিল না, এমনকি নিজেকে আইনি পরিভাষায় এক 'ক্ষতিগ্রস্ত' বা 'ভিকটিম' হিসেবে উপস্থাপন করতেও স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানাল।
থানার সাব-ইনস্পেক্টর বাধ্য হয়েই অরিন্দমের দিকে তাকিয়েছিলেন। অরিন্দম পুলিশকে সব ঘটনা স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট গলায় পুলিশকে ঈমন আর মেঘলার ব্যবসার পার্টনার পেট্রাসের নাম বলেছিলেন। ওই পৈশাচিক রাতে কীভাবে ঈমন হামলা চালাল এবং খামারবাড়ির পাহারায় থাকা অনুগত কর্মী পেট্রাস কীভাবে গায়েব হয়ে গেল, আর তার সাথে এই আক্রমণের কোনো গোপন ষড়যন্ত্র জড়িয়ে আছে কি না—সবটাই তিনি খুলে বলেছিলেন।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর, ঘরের ভারী পর্দাটা সরিয়ে হালকা আলোতে ফেলার চেষ্টা করতে করতে অরিন্দম মেঘলার খাটের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
অরিন্দমের গলা কাঁপছিল, "মেঘলা, তুমি এভাবে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ কেন? ওদের কিন্তু শাস্তি পাওয়া দরকার! তুমি পুলিশকে সব কিছু খুলে বলো দয়া করে! ঈমন আর পেট্রাস... ওরা মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে আর আমরা মুখ বুজে সহ্য করব?"
ঘন অন্ধকারে এককোণে হাঁটু দুটো বুকের কাছে চেপে ধরে বসে ছিল মেঘলা। অরিন্দমের কথার উত্তরে সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চেহারায় কোনো কান্নার চিহ্ন ছিল না, কোনো ক্ষোভ বা প্রতিশোধের আগুনও ছিল না—ছিল কেবল এক হিমশীতল, নিথর অস্তিত্ব।
"শাস্তি কে কাকে দেবে বাবা?" মেঘলা তার নিচু, একঘেয়ে ও অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল। "যা ঘটার সেটা তো ঘটেই গেছে। আইনি নাটকে আমার কোনো রুচি নেই।"
অরিন্দম আকুল হয়ে বললেন, "আইনি নাটক মানে? ওরা অপরাধী, মেঘলা! ওদের শাস্তি না হলে সমাজ—"
"সমাজ?" মেঘলা অরিন্দমের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল। তার শুকনো ঠোঁটে এক ফালি নিথর হাসি ফুটে উঠল। "তোমার ওই সমাজ, পুলিশ আর মিডিয়া এসে এরপর আমাকেই এক টুকরো 'রাজনীতির শিকার' বানাবে। খবরের কাগজে আমার নাম ছাপা হবে, কোনো এক মিছিল বের হবে, সুশীল সমাজ মোমবাতি জ্বালিয়ে সহানুভূতির ভণ্ডামি দেখাবে, আর অন্যদিকে দলীয় রাজনীতির হিসেব কষতে আবারও খুনোখুনি শুরু হবে। আমি কারো রাজনীতির হাতিয়ার বা সহানুভূতির পাত্রী হতে চাই না।"
"কিন্তু ন্যায়বিচার..." অরিন্দমের গলা বুজে এল।
"ন্যায়বিচার বলে এই দেশে কিছু হয় না, বাবা," মেঘলা দেয়ালের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ গলায় বলল। " পয়সা যাদের আছে, ক্ষমতা যাদের আছে বিচারের রায় তাদের ফেভার যায়। পয়সা দিয়ে কোর্টের রায় কেনা যায়। বিচার ব্যবস্থার ওপর আমার কোনো আস্থা নেই। আর যন্ত্রণাটাতো একান্তই আমার। এটার সাথে আর কাউকে জড়িয়ে আমি নিজের অপমানকে বার বার নিলাম করতে দেব না। তুমি ওদের শাস্তি চাও কারণ তোমার অহংবোধ আর নীতিবোধে লেগেছে। আমার সে সবের কোনো তোয়াক্কা নেই।"
অরিন্দম এক পা পিছিয়ে এলেন। তিনি যে মেঘলাকে চিনতেন—যুক্তিভিত্তিক, কাজের মানুষ, সোজা কথা বলা মেয়ে—সেই মেঘলা এই ভয়াবহ ট্রমার ভেতরে এক চরম অস্তিত্ববাদী রূপ ধারণ করেছে। সে নিজেকে সংবাদের ভিকটিমহুড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে, কিন্তু তার বিনিময় হিসেবে নিজের স্বাভাবিক জীবন আর বাইরের পৃথিবীকে বিসর্জন দিয়েছে।
বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন অরিন্দম। বাইরে নয়ডার ধোঁয়াটে কুয়াশা আর মেহগনির শুকানো পাতা ঝরে পড়ার শব্দ। বিচার, আইন আর রাজনীতির সমস্ত ব্যর্থতার মাঝে অরিন্দম বুঝতে পারলেন, মেঘলার এই নীরবতা কোনো আত্মসমর্পণ নয়; এটি সমাজের ভণ্ড সিস্টেমের বিরুদ্ধে এক করুণ, ভারী ও স্তব্ধ প্রতিবাদ।
অধ্যায় ২২: সোদপুরে মেঘলাকে প্রত্যাবর্তনের জন্য টানাটানি
শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনটা সোদপুর স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে যখন এসে থামল, তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। সেপ্টেম্বরের স্যাঁতসেঁতে হাওয়ায় প্ল্যাটফর্মের উঁচুতে থাকা শেড থেকে ট্রেনের ধোঁয়া আর বাসি চায়ের গন্ধ ঘনীভূত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল। প্ল্যাটফর্মের শেডের তলার হলুদ আলোয় একটা বিশাল মাকড়সার জালের ওপর কয়েকটা পোকা ছটফট করছে। লোহার থামগুলোর গায়ে নোনা ধরা চুনকাম খসে পড়ে ভেতরের লাল ইট বেরিয়ে আছে।ট্রেনের কামরা থেকে যাত্রীরা হুড়মুড় করে নেমে প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে মিশে যাচ্ছিল। রিকশাওয়ালাদের হাঁকডাক, লেভেল ক্রসিংয়ের লাল বাতির একটানা টুং-টুং শব্দ আর ওভারব্রিজের ওপর হাজার জোড়া চটির খসখস আওয়াজে চারপাশ থমথম করছিল। মেঘলা প্ল্যাটফর্মে নামল খুব ধীরে। তার পরনে একটা কালচে ডার্ক গ্রিন সুতির কুর্তা, কাঁধে জড়ানো একটা ভারী কালো সুতির চাদর। ট্রেন থেকে নেমেই সে চাদরের একপাশ টেনে মুখের নিচের অংশটা সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলল। কেবল তার কপাল আর চোখদুটো বেরিয়ে রইল বাইরের পৃথিবীর দিকে। সেই চোখজোড়া শূন্য, কোনো আলো নেই, যেন একটা মরা পুকুরের জমাট জল।তার ঠিক পেছনেই কামরা থেকে নেমে এলেন অরিন্দম। ৫৮ বছরের অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের কাঁধ দুটো যেন গত কয়েক দিনে কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে গেছে। তাঁর চামড়ার ঢিলেঢালা শার্টের কনুইয়ের কাছে একটা ধুলোর ছোপ। তাঁর ডান হাতে মেঘলার ভারী ট্রাভেল ব্যাগ, আর বাঁ হাতে নিজের একটা পুরানো চামড়ার সূটকেস। ব্যাগের রড-হাতলটা তাঁর আঙুলের চামড়ায় গভীরভাবে বসে গিয়ে লাল দাগ তৈরি করছিল। চশমার কাচ বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর কানের পাশে, কিন্তু হাত খালি না থাকায় তিনি তা মুছতেও পারছিলেন না।
"মেঘলা, দাঁড়াও... ভিড়টার ভেতরে যেয়ো না," অরিন্দম হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন। তাঁর গলার স্বর ট্রেন বন্ধ হওয়ার হুশ-হুশ শব্দে ঢাকা পড়ে গেল।
মেঘলা থামল না। সে ওভারব্রিজের সিঁড়ির দিকে সোজা হেঁটে যেতে লাগল। তার হাঁটার ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, আবার কোনো দ্বিধাও ছিল না—ছিল এক ধরণের যন্ত্রচালিত গতি। যেন কোনো পুতুলকে চাবি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ওভারব্রিজের ওপরে উঠে সোদপুর পূর্বপল্লীর দিকে নামার গলিটায় আলো কম। গলির মুখে নীলয়ের ওষুধের দোকানটা তখনও খোলা ছিলো। নীলয় কাউন্টারে বসে চশমা মুছে কোনো একটা রেজিস্টারে সই করছিল। গলি দিয়ে মেঘলা আর অরিন্দমকে হেঁটে যেতে দেখে নীলয় একবার সোজা হয়ে বসল। কিন্তু অরিন্দম চোখ সরালেন না, মেঘলার পা অনুসরণ করে ট্রাভেল ব্যাগের চাকাগুলোকে কাদার ভেতর টেনে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। খসখস, ঘরঘর শব্দে সোদপুরের বাতাস যেন কেঁপে উঠছিল।সোদপুর পূর্বপল্লীর পুরানো বনেদি বাড়ি 'অপরাজিতা'-র গেটের সামনে যখন তারা পৌঁছাল, তখন চারপাশটা একদমই নিঝুম। রাস্তার ধারের বড় রাধাচূড়া গাছটা থেকে ফোটা ফোটা বৃষ্টি ঝরে পড়ছে সিমেন্টের নর্দমায়। অরিন্দম হাতের ব্যাগ দুটো ভিজা মেঝের ওপর নামিয়ে রাখলেন। পকেট থেকে পুরানো পিতলের চাবির তোড়াটা বার করতে গিয়ে তাঁর হাত কাঁপছিল। চাবিটা তালার খোপে ঢুকে আটকে গেল একবার, দুবার। তৃতীয়বারে মরচে পরা মেকানিজমটা কট করে একটা বিশ্রী শব্দ করে খুলে গেল।ভারী লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা বন্ধ ঘরের স্যাঁতসেঁতে চুনকাম, নতুন কাঠের আলমারি আর গত বছরে দেওয়ালে এক্রোলিক রঙের গন্ধ তাঁদের নাকে এসে ধাক্কা দিল। অরিন্দম প্রায় আট মাস নয়ডা তে মেঘলার সঙ্গে কাটিয়ে ফিরছেন।
মেঘলা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। এক পা-ও এগোলো না। উঠোনের এককোণে শেফালি পিসির বাড়ির দিক থেকে আসা মল্লিকাদের পুরনো পেয়ারা গাছটার ছায়া পড়েছে অন্ধকারে।
অরিন্দম ভেতরের বারান্দার আলোটা জ্বালিয়ে দিলেন। একশ ওয়াটের এলইডি কাঁচের টিউব লাইট টা দুটো ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বলে উঠেই ঘরের কোণের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলল।
"ভেতরে এসো মেঘলা। বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো না," অরিন্দম ঘরের ভেতর থেকে চাদরঢাকা টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বললেন। "আমি এসি চালিয়ে দিচ্ছি। ধুলো জমে আছে, ঘরে । কাল সকালে কাজের মেয়েকে বলে ঝাড়ুপোঁছ করিয়ে নেব।" মেঘলা ধীর পায়ে ভেতরে এল। কিন্তু সে কোনো চেয়ার বা সোফায় বসল না। দরজার চৌকাঠের ঠিক পাশে, দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। সে তখনও মুখের ওপর থেকে চাদরের বাঁধনটি খোলেনি। "নয়ডা থেকে এই সাড়ে চৌদ্দ ঘণ্টার জার্নিতে তুমি একটা দানাও মুখে দাওনি," অরিন্দম নিজের হাতের ব্যাগ দুটো মেঝের একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে একধরনের কৃত্রিম ব্যস্ততা ফোটার চেষ্টা করছিল, যা এই থমথমে ঘরের বাস্তবতায় অত্যন্ত করুণ শোনালো। "আমি রান্নাঘরে গিয়ে একটু জল গরম করি? চা না কফি খাবে? নাকি একটু বিস্কুট..."
"কেন আনলে আমাকে এখানে?" মেঘলার স্পষ্ট, সমতল আর আইস-কোল্ড স্বরটা ঘরের ভেতর থমকে থাকা বাতাসটাকে যেন একটা পাতলা ছুড়ির মতো কেটে দিল।অরিন্দম থামলেন। তাঁর পিঠ তখনও মেঘলার দিকে ঘোরানো। তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটা কাচের ফ্লাস্ক সরিয়ে রাখছিলেন।
"কী বললে মেঘলা?"
"আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে সোদপুরে কেন আনলে?" মেঘলা এবার মুখের ওপর থেকে চাদরটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। তার গালে, থুতনিতে দিল্লির সেই খামারবাড়ির ট্রমার ছাপ—ত্বক শুকনো, চোখের নিচে গাঢ় কালি। কিন্তু সেই চোখের মণি দুটোয় কোনো কান্না নেই, আছে এক কঠিন, অনমনীয় ধিক্কার। "তুমি কি ভেবেছ নয়ডার ওই খামারবাড়ি থেকে আমাকে নয়শো মাইল দূরে, একটা ট্রেনে চাপিয়ে নিয়ে আসলেই সব কিছু মুছে যাবে? রক্তে যে নোংরাটা লেগে গেছে, তা সোদপুরের গঙ্গা জলে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাবে?"
অরিন্দম ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। তিনি হাত দুটো কোটের পকেটে পুরলেন, কিন্তু পকেটের কাপড় ভেদ করে তাঁর আঙুলের থরথর কাঁপুনিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
"নয়ডার ওই ফার্মহাউসে থাকা তোমার পক্ষে একদমই নিরাপদ ছিল না মেঘলা," অরিন্দম নিচু, খসখসে গলায় বললেন। "পুলিশের নিত্যদিনের যাতায়াত, পেত্রাসের সন্দেহজনক গতিবিধি, আর ওই দুষ্কৃতীরা... ওরা আবারও ফিরে আসতে পারত। সোদপুর বা বিডন স্ট্রীট আমাদের নিজের জায়গা। এখানে কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। তুমি চাইলে তোমার মাসী মেশোর বাড়িতে গিয়েও থাকতে পারো।"
" থাক। নিজের জায়গা?" মেঘলা একটা শুকনো, তীব্র হাসি হাসল। যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, কেবল এক অপার্থিব তিক্ততা। সে ঘরের ধুলোপড়া নতুন রং পালিশ করা কাঠের জানলাটার দিকে হেঁটে গেল। জানলার বাইরে সোদপুরের অন্ধকার রাত, দূরে লেভেল ক্রসিংয়ে রাতের শেষ মালগাড়ির হুইসেল শোনা যাচ্ছে। "তুমি সত্যি নিজের মনকে এভাবেও সান্ত্বনা দাও বাবা? এই সোদপুর বুঝি তোমার নিজের জায়গা? যে সোদপুরের মানুষ তোমার স্ত্রীর মুখে থুতু ফেলেছে? যেখানে তুমিও কিনা ৪০ বছর পর এসে থাকছো। খোঁজ ও রাখোনি এই বাড়িটার । সেটা আবার তোমার নিজের জায়গা হয় কী করে? যে কলকাতা শহরের কলেজে তোমার নামে যৌন হেনস্থার খবর রটেছে, যেখানকার ক্লাবের ছেলেরা তোমাকে কলোনির মোড়ে দাঁড় করিয়ে অপমান করতে মুখিয়ে থাকে—সেই সোদপুর তোমার কাছে নিরাপদ জায়গা ?"
অরিন্দম চশমাটা খুলে পকেট থেকে নীলচে রুমালটা বার করলেন। কিন্তু চশমা মোছার বদলে সেটাকে হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রইলেন।
" সোদপুর আমার কোনো ক্ষতি করেনি এখনও পর্যন্ত। যেটা করেছে সেটা কিন্তু কলকাতা শহর। আর শহরের মানুষের কথা ছেড়ে দাও মেঘলা। শহুরে সমাজ কী বলল না বলল, তা নিয়ে আমি কোনোদিন মাথা ঘামাইনি। আর ঘামাই ও না আমি তোমাকে একটা বিশ্রাম দিতে চেয়েছিলাম।"
"আমি কিন্তু আশ্রয় বা বিশ্রাম কোনোটাই চাইনি!" মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল। তার গলার স্বর এবার আর নিচু রইল না, এক অদ্ভুত আর্তনাদে ফেটে পড়ল। "আমি এটাও চাইনি যে তুমি আমার উদ্ধারকর্তা সেজে আমাকে এখান থেকে ওখানে টেনে নিয়ে বেড়াও! নয়ডায় যা ঘটেছে, তা আমার নিজের শরীরের ওপরে ঘটেছে, আমার খামারে ঘটেছে। আমি সেখানে একাকী সেই নরকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর তুমি? তুমি তো সেদিন বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিতে দিতে নিজের নপুংসকতাকে ঢাকতে ছটফট করছিলে!" অরিন্দমের মুখটা এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। যেন কেউ তাঁর বুকের মাঝখানে এক বালতি বরফজল ঢেলে দিয়েছে। তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। দেয়ালের চুনকামের দিকে তাঁর স্থির দৃষ্টি আটকে রইল।মেঘলা জানলার শিকের ওপর নিজের ডান হাতের শক্ত মুঠোটা চেপে ধরল। তার নখগুলো মেহগনি কাঠের ওপর বসে যাচ্ছিল। "এখানে এসেও কি আমরা আবার বাঁচতে পারব বাবা?" মেঘলার গলা আবার কমে এল, এক গভীর, দীর্ঘশ্বাসের শব্দে রূপ নিল। "সোদপুরও তো একটা নরক। তোমার নিজের জন্যও তো এটা একজীবন্ত নরক ছিলো আমি শুনেছি।"
অরিন্দম ঘরের মেঝের দিকে চাইলেন। মেঝের লাল সিমেন্টের ওপর তাদের দুজনের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে—আলোর অভাবে যে ছায়া দুটো দরজার কাছে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে।
"নরকটা কোনো জায়গার নয় মেঘলা," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে বললেন। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে যেন তাঁর বুক থেকে সমস্ত বাতাস খালি হয়ে যাচ্ছিল। "নরকটা আমাদের মাথার ভেতর... যেমন তোমার মায়ের মাথায় ছিল, তোমার মাসীর মাথায়ও ছিল।"
মেঘলা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো সামান্য কেঁপে উঠল।
"মায়ের কথা একদমই তুলবে না তুমি," মেঘলা শিস দেওয়ার মতো শব্দে ফিসফিস করে বলল।
"তুলব, একশো বার তুলবো" অরিন্দম এগিয়ে এলেন। তিনি মেঘলার থেকে মাত্র চার ফুটের দূরত্বে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটো চশমার কাচের আড়ালে রক্তাভ আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। "তুমি ভেবেছ তুমি দিল্লি পালিয়ে গিয়ে, একটা খামার কিনে, কয়েকটা কুকুর পুষে নিজের রক্তকে বদলে ফেলেছিলে? তোমার মা-ও একদিন বালিগঞ্জের অত বড় বাড়ি ছেড়ে সোদপুরে আমাদের এই অভাবের সংসারে এসে ভেবেছিল সে বেঁচে যাবে। পারেনি। কারণ মানুষ যেখানেই যাক না কেন, সে নিজের মাথাটা, নিজের অতীতটাকে সাথে করেই নিয়ে যায়। পালানোর কোনো ভৌগোলিক সীমা থাকে না মেঘলা।"
"তুমি নিজেকে দিয়ে আমার তুলনা করছ বাবা," মেঘলা এবার অরিন্দমের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না। "তুমি পাপ করেছিলে। তুমি তোমার অধীনে কোনো এক ডক্টরেট ছাত্রীর সাথে শুয়েছিলে, তুমি ওই ভেটেরিনারি ডাক্তারের সাথেও বিছানায় গেছ, তুমি সমাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের কাম মেটাতে চেয়েছ। আর আমি? আমার ওপর অত্যাচার হয়েছে! আমি কারও ক্ষতি করিনি!"
"পাপ আর আঘাতের তফাতটা খুবই সামান্য মেঘলা," অরিন্দম শান্ত, নিষ্ঠুর বৈরাগ্যে বললেন। "দুটোই মানুষকে একা করে দেয়। দুটোই মানুষকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তুমি নয়ডায় থাকলেও একা থাকতে, সোদপুরে এখানে এলেও একাই থাকবে। আমি তোমাকে বাঁচাতে এখানে আনিনি। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি কারণ..." অরিন্দম একটু থামলেন। তাঁর গলার ভেতরটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। "...কারণ আমি নিজেও ওই নয়ডার খামারবাড়িতে তোমার সঙ্গে থাকলেও একা থাকতেও ভয় পাচ্ছিলাম। ওই গুণ্ডা গুলো তোমার ওপরে আমার ওপরে আবারও চড়াও হতে পারতো।"
কথাটা ঘরের মধ্যে এক ভয়াবহ সত্যের মতো আছড়ে পড়ল।মেঘলা তার বাবা অরিন্দমকে দেখল। একসময় যে মানুষটার ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের বক্তৃতা শুনতে কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির হলে থিকথিকে ভিড় জমত, যে মানুষটা নিজের বুদ্ধিমত্তা আর কবি বায়রনের অহংকার নিয়ে গোটা সমাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করত—সে এখন একটা ভাঙা, কুঁজো হয়ে যাওয়া ৫৮ বছরের বুড়ো মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।মেঘলা আর কোনো কথা বাড়ালো না। সে ধীরে ধীরে তার কালো চাদরটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা টেনে নিয়ে করিডোর ধরে ভেতরের অন্ধকার শোয়ার ঘরটার দিকে হেঁটে চলে গেল।ঘরের পুরনো কাঠের দরজাটা বন্ধ হওয়ার কোনো জোরালো শব্দ হলো না। স্রেফ এক মৃদু ক্যাঁচকোঁচ শব্দে দরজাটা ভেজানো হয়ে গেল।
অরিন্দম একাই দাঁড়িয়ে রইলেন সোদপুরের 'অপরাজিতা'-র আলো-আঁধারি বারান্দায়।বাইরে তখন আবারও ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। সোদপুরের রেললাইনের ওপর দিয়ে রাতের শেষ ট্রেনটা শিয়ালদহের দিকে চলে যাচ্ছে। ট্রেনের ইঞ্জিনের চাকার একটানা ঠাঁ-ঠাঁ শব্দে পুরো বাড়িটা, এর পুরনো ইট-কাঠ আর ভেতরের দুটো ভগ্ন আত্মা—সবকিছুই এক অনিশ্চিত কাঁপনে কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
অরিন্দম পকেট থেকে নস্যির কৌটোটা বার করলেন। কিন্তু ঢাকনাটা খোলার আগেই ওটা তাঁর শিথিল আঙুল গলে মেঝের ধুলোর ভেতর গড়িয়ে পড়ে গেল। তিনি ওটা তোলার জন্য নিচু হলেন না। স্রেফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের বাল্বটা নিভিয়ে দিলেন। অন্ধকার এসে তাঁদের দুজনকে—পিতা ও কন্যাকে—একই বিষাদময় ভৌগোলিক খাঁচায় বন্দি করে ফেলল।
অধ্যায় ২৩: মাধবীর ঘরে অরিন্দম
মাধবীর ঘরটায় কোনো আভিজাত্যের ভান ছিল না, কিন্তু ছিল এক, প্রাগৈতিহাসিক উষ্ণতা। সোদপুর পূর্বপল্লীর সরু গলির শেষ মাথায় তিনতলা পুরনো বাড়ির একতলার এই দুটো ঘর নিয়ে মাধবীর আর ওর মেয়ে তিস্তার নিঃসঙ্গ সংসার। ঘরে ঢুকলেই নাকে এসে লাগে সর্ষের তেলের ঝাঁঝ, পুরনো ক্যালামাইন লোশনের গন্ধ আর ফ্যানের হাওয়ায় ভাসতে থাকা আধ-শুকনো সূতি শাড়ির সোঁদা ঘ্রাণ আর অসুস্থ কুকুরদের পচে যাওয়া অংশের কটু গন্ধ।
অরিন্দম কমফোর্টারের ওপর আধশোয়া হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে একটা সাধারণ কাচের গ্লাসে অর্ধেকটা হুইস্কি আর সামান্য জল। চশমাটা খুলে তিনি পাশের ছোট কাঠের টি-পয়ে রেখেছেন। চশমা ছাড়া বাইরের পৃথিবীটা তাঁর কাছে এক ঘোলাটে, নরম আলোর গোলকের মতো দেখাচ্ছিল।
তিনি গ্লাসে একচুমুক দিলেন। তিতা, তীব্র তরলটা গলা দিয়ে নেমে গিয়ে নয়ডার সেই ভয়াল রিকশার আর সোদপুরের 'অপরাজিতা'-র স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের জমাট হিমটাকে একটু একটু করে তপ্ত করছিল।
মাধবী এসে ঘরে ঢুকলেন। হাতে দুটো কাচের প্লেট—একটায় দুটো শুকনো রুটি আর বেগুন পোড়া, অন্যটায় মেঘলার জন্য রাখা একটু গরম দুধ।
৪৫ বছরের বিধবা ডাক্তার মাধবী। শরীর সামান্য স্থূল, লালচে ফর্সা গায়ের রং, বাহুর কাছের চামড়ায় বয়সের প্রথম প্রথম শিথিলতা স্পষ্ট। কপালে কোনো অলঙ্কার নেই, চুলে সাধারণ একটা খোপা তাতে কাঠের কাঁটা গোঁজা। এই চেহারার মধ্যে না ছিল কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আভিজাত্য, না ছিল কোনো কামোদ্দীপক লালসা। কিন্তু এই স্থূল আর সাধারণ ফর্সা অস্তিত্বের ভেতরেই অরিন্দম এক অদ্ভুত স্পর্শ পাচ্ছিলেন—এক অনাবিল, কঠিন বাস্তবতার স্পর্শ।
দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতার বিভিন্ন সেমিনারের সুশীল সমাজ, নন্দনতত্ত্বের ভারী ভারী তত্ত্ব, কিংবা নয়ডার অভিশপ্ত খামারবাড়ির কৃত্রিমতা—কোনোটার সাথেই মাধবীর মিল নেই। মাধবী কোনো রূপক নয়। সে রক্ত-মাংস, ঘাম আর রান্নাঘরের ধোঁয়া দিয়ে তৈরি এক নিরেট মানব অস্তিত্ব যিনি আবার পশুদের ডাক্তার ও একটা পোশু ক্লিনিক চালান নিচের তলায়।
অরিন্দম মাধবীর দিকে তাকালেন। মাধবী যখন প্লেটটা টি-পয়ে রেখে হাত দিয়ে শাড়ির আঁচলটা গুটিয়ে নিচ্ছিল, তখন অরিন্দমের মনে হলো, এই মহিলার সামনে নিজের সমস্ত পাপাচার, সমস্ত অপমান আর পতনের ইতিহাস নিয়ে অনায়াসে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই যায়। এই আকর্ষণ প্রেমের নয়, রোমান্টিকতার তো নয়ই; এ যেন এক গভীর সমুদ্রে ডুবতে থাকা মানুষের জন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক আশ্রয়ের মতো—যেখানে সৌন্দর্য বা লালসার কোনো মূল্য নেই, আছে শুধু অস্তিত্বের কাছে এক পরম আত্মসমর্পণ।
"মেঘলা কী শুলো?" অরিন্দম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"না," মাধবী মেঝের একটা কাঠের টুলে বসে পড়ে নিজের হাঁটু দুটোকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল। তার গলার স্বরটা ঘরের বাতাসের মতোই ভারী ও উষ্ণ। "দরজা ভেজানো আছে। ঘরে আলো জ্বালেনি। জানলার দিকে মুখ করে বিছানার ওপর বসে আছে। আমি দুধের বাটিটা টেবিলে রেখে এলাম, একটা কথাও বলল না আমার সঙ্গে।"
অরিন্দম গ্লাসের বাকি মদটুকু এক চুমুকে শেষ করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো বুজে আসছিল এক অদ্ভুত শ্রান্তিতে।
"ও কিচ্ছু বলবে না মাধবী। ওর ভেতরটা জমে বরফ হয়ে গেছে।"
মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে অরিন্দমের মুখের দিকে চেয়ে রইল। চশমা ছাড়া অরিন্দমের চোখের নিচে ঝুলে পড়া চামড়া, গালের না শেভিং করা কাঁচা পাকা দাড়ি আর কপালে গভীর ভাঁজগুলোকে বড় অসহায় লাগছিল। নয়ডার খামারবাড়িতে ঘটে যাওয়া সেই কালরাত্রির কথা মাধবী জেনেছে খুব সংক্ষেপে, কিন্তু একজন নারীর ভেতরের সহজ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সে বুঝে নিয়েছে আঘাতের পরিমাপ কতটা ধ্বংসাত্মক তাদের দুজনের কাছে।
"আপনার মেয়েটা ঘটনার পরে পাথর হয়ে গেছে অরিন্দমবাবু," মাধবী খুব ধীরে, শান্ত গলায় বলল। "সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ও কাঁদছে না, আর এটাই সবচেয়ে আরও বিপজ্জনক।"
অরিন্দম শূন্য গ্লাসটার দিকে চেয়ে রইলেন। কাচের দেয়ালে মদের শেষ কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যে শ্বাসে মদের তীব্র গন্ধ আর এক জীবনের পরাজয়ের ক্লান্তি মিশে ছিল।
"আমরা সবাই তো পাথর মাধবীদেবী," অরিন্দম বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন। "কেউ অনেক আগে পাথর হয়ে গেছে, কেউ কাল রাতে হয়েছে। শুধু আমাদের গায়ে খোদাই করা অপরাধগুলো যা আলাদা।"
মাধবী একটু নড়ে চড়ে বসল। সে কোনো দার্শনিক সান্ত্বনা দিল না, কোনো মেকি দয়ার বাণীও শোনাল না। কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে তত্ত্ব বা কথার কোনো অর্থ হয় না। সে শুধু হাত বাড়িয়ে অরিন্দমের কাঁপা, ডান হাতটার ওপর নিজের স্থূল, গরম হাতের তালুটা রাখল।
সেই স্পর্শে কোনো ন্যাকামি ছিল না, ছিল স্রেফ এক মানবী মানবকে দেওয়া বেঁচে থাকার আশ্বাস।
অরিন্দম চোখ বুজলেন। মাধবীর হাতের এই উত্তাপটুকু যেন এক অভয়ারণ্য। শারীরিক সৌন্দর্যের সমস্ত মিথ্যে মুখোশ খসে পড়ে যেখানে শুধু পড়ে থাকে মানুষের অসহায়তা আর আশ্রয়ের খাঁটি তৃষ্ণা।
বাইরে সোদপুরের গলিটায় একলা একটা কুকুর ডেকে উঠল। বৃষ্টিটা আবার হালকা ঝিরঝির শব্দে মাধবীর ঘরের জানলার টিনের চালে পড়তে শুরু করেছে। ঘরে মদের ঝাঁঝালো গন্ধ, বেগুন পোড়ার চেনা ঘ্রাণ আর মাধবীর হাতের সোঁদা উত্তাপ—সব মিলে এক বিষাদময় অথচ উষ্ণ আশ্রয় তৈরি করছিল, যা অরিন্দমকে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত নরক থেকে আড়াল করে রেখেছিল।
পর্ব ৪: কুয়াশা, কলঙ্ক ও রাজনীতি (অধ্যায় ২৪ – ৩৩)
অধ্যায় ২৪: পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক মানচিত্র
সোদপুর স্টেশন রোডের মোড়ে যে পুরোনো পার্টি অফিসটা তিন দশক ধরে চুনকাম-না-হওয়া লাল রঙের দেওয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ সকালে সেটার খোলস বদলে গেছে।
দেওয়ালের বুকে লাল কাস্তে-হাতুড়ি-তারা প্রতীকের ওপর বেপরোয়াভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে চুন আর ফেভিকলের মোটা আস্তরণ। তার ওপর উজ্জ্বল নীল-সাদা রঙে আঁকা হচ্ছে নতুন দলের প্রতীক। দেওয়ালের চুন তখনও কাঁচা, তার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ সোদপুর নাটাগর গলির স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভাসছে। ইলেকট্রিক পোলগুলোতে বাঁশ বেঁধে মাইক টাঙানোর প্রতিযোগিতা চলছে। চটা ওঠা মাইকে একটানা বাজছে বিকট সুরে বাঁধা নতুন রাজনৈতিক গান, আর মাঝে মাঝেই একদল কমবয়সী যুবকের চিৎকার ভেসে আসছে—‘পানিহাটি মিউনিসিপ্যালিটিতে নতুন সূর্য উঠেছে! পুরোনো জঞ্জাল সব ঝাঁটিয়ে সাফ করো!’
সোদপুরের এই কলোনি অঞ্চল একসময় গড়ে উঠেছিল দেশভাগের যন্ত্রণা আর শরণার্থীদের চোখের জলে। যে মাটিতে একসময় মতাদর্শের লড়াই, শ্রমিকের অধিকার আর লিফলেট বিলির রাজনীতি ছিল নিত্যদিনের অভ্যাস, সেখানে এখন রাজত্ব করছে কেবল একটা শব্দ—‘জমি’। আর সেই জমির দখল নেওয়ার জন্য পুরনো বামপন্থী দুর্গের ইটগুলো এক এক করে খুলে পড়ছে নতুন ক্ষমতার উদগ্র থাবায়।
ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের ওপরে পানিহাটি পৌরসভার উল্টোদিকে নতুন খোলা প্রমোটিং অফিস ‘শ্রীগুরু ডেভেলপার্স’-এর ভেতর এসি-র ঠান্ডা বাতাস গমগম করছিল। প্লাস্টিকের নতুন মোড়ক না-খোলা রিভলভিং চেয়ারে বসেছিল সুমিত ঘোষ। সুমিতের পরনে উজ্জ্বল সাদা কুর্তা-পাজামা, গলায় মোটা সোনার চেন আর হাতের দুটো আঙুলে পোখরাজ ও রক্তপ্রবালের আংটি। ওনার বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু তার চোখের চাহনিতে একধরনের শিকারী চপলতা।
তার ঠিক মুখোমুখি বসেছিল মাধবীর ভাইপো রুদ্র পাল। রুদ্রর চেহারা চওড়া, কপালে একটা পুরানো কাটা দাগ, ঠোঁটের কোণে পানপরাগের কালচে ছোপ। রুদ্র এই অঞ্চলের ক্যাডার-সংস্কৃতি থেকে প্রমোটিং সিন্ডিকেটে রূপান্তরিত হওয়ার জলজ্যান্ত প্রতীক। একসময় যারা পার্টির মিছিলের সামনে ঝাণ্ডা নিয়ে হাঁটত, তারাই এখন মাফিয়া হয়ে সিন্ডিকেটের বালি-সিমেন্ট-রড সাপ্লাইয়ের ফাইল সামলাচ্ছে।
টেবিলের ওপর বিছানো ছিল সোদপুর পূর্বপল্লীর একটা বিশাল জ্যামিতিক নকশা বা ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ। ম্যাপের ওপর সুমিতের স্থূল, খসখসে আঙুলটা এসে থামল দুটো নির্দিষ্ট প্লটের ওপর।
একটি হলো অধ্যাপক অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়দের পাঁচ কাঠা ছয় ছোটাকের ওপরে বাড়ি ‘অপরাজিতা’, আর তার ঠিক লাগোয়া শেফালি দে-র প্রায় কাঠা সাতেক পুরানো আম-পেয়ারা বাগানসহ বসতভিটেটি।
"দেখলি রুদ্র?" সুমিত ম্যাপের ওপর আঙুল দিয়ে ঠুকতে ঠুকতে বলল। তার গলার স্বর চঞ্চল, ক্ষমতার দম্ভে ভরপুর। "এই দুটো প্লট যদি একসাথে জোড়া যায়, তাহলে পুরো সাড়ে বারো কাঠা জমি বেরোচ্ছে। জি-প্লাস-ইলেভেন হাইরাইজ দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাবে। পূর্বপল্লি রোড থেকে ঢোকার মুখেই এমন প্রিমিয়াম প্রপার্টি ওই চত্বরে আর একটাও নেই।"
রুদ্র পাল টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের আসট্রেতে সিগারেটের ছাই ঝাড়ল। তার চোখ দুটো সরু হয়ে এলো, "সুমিতদা, জায়গাটা প্রাইম ঠিকই, কিন্তু খিচকি আছে। শেফালি বুড়ি তো ভিটেমাটি ছাড়বে না বলে কেঁদেকেটে এলাকা মাথায় তুলবে। আর লাগোয়া ওই ‘অপরাজিতা’? ওটা তো বুড়ো অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের। ব্যাটা নামজাদা প্রফেসর ছিল, যদিও আজকাল কেসে জড়িয়ে মুখ লুকোচ্ছে। আর ওর ওই মেয়েটা—নয়ডা থেকে কদিন আগে ফিরেছে রেপ কেসের ট্রমা নিয়ে। সহজে ডরবে বলে মনে কর?"
সুমিত একটা শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো দয়া বা দ্বিধা ছিল না, ছিল এক ধরণের যান্ত্রিক বুলডোজার মনোভাব। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে ডেক্সটপ মনিটরের দিকে তাকাল।
"ডরবে না মানে? ডরাতে বাধ্য করতে হবে," সুমিত টেবিল ঠুকে বলল। "রুদ্র, তোকে একটা কথা পরিষ্কার বলে রাখি—পুরনো বামপন্থী জমানা আর ইতিহাস এখন ধুয়েমুছে শেষ। এখন থেকে সোদপুরেও প্রোমোটিং আর তোলাবাজির রাজত্ব চলবে, নয়তো এই সব রিফিউজি কলোনিগুলোর নামও মুছে যাবে। এই নতুন যুগে গরিব-গুরবো কলোনির লোকেদের কোনো স্থান নেই এই রাজ্যে। যারা সময়ের সাথে নিজেদের বদলাবে না, তারা বুলডোজারের নিচে পিষে যাবে।"
কথাগুলো ঘরের এসি-র ঠান্ডা বাতাসে এক মারাত্মক সত্যের মতো জমে রইল।
সামাজিক মেমোরি ধ্বংসের এই চক্রান্ত সোদপুরে নতুন নয়। যে কলোনিতে একসময় বাংলাদেশ থেকে উদবাস্তু পরিবারগুলো একটু মাথার ওপর ছাদের জন্য সংগ্রাম করেছিল, যেখানে কমিউনিস্ট বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা ইশতেহার ছাপা হতো হাত-চালানো প্রেসে, আজ সেই সামাজিক স্মৃতিগুলোকে ছেঁটে ফেলে দিতে চায় নতুন টাকা আর নতুন ক্ষমতার দখলদাররা। তারা চায় ইতিহাস মুছে দিয়ে সে জায়গায় খাঁড়া করতে থাই-গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল আর লিফট-সংবলিত বহুতল আবাসন।
"এক একটা ফ্ল্যাটের দাম কত রাখছ?" রুদ্র প্রশ্ন করল।
"কম করে ৯০ লাখ," সুমিতের চোখে লোভের আলো ঝিকমিক করে উঠল। "সল্টলেক আর নিউ টাউনের আইটি-র কাস্টমারদের টানব আমরা। যারা শান্তিপুরে লোকাল ধরে শিয়ালদহ যাবে না, কিন্তু সোদপুরে এসি ফ্ল্যাটে থেকে শান্তিতে ঘুমাতে চাইবে। এই ৯০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটের স্কিম যদি সাকসেসফুল করতে হয়, তবে ‘অপরাজিতা’-র ওই পুরানো ভৌতিক পৈতৃক ভিটে আর শেফালি বুড়ির আমগাছ দুটোকে গুঁড়িয়ে দিতেই হবে। ওখানে কোনো রিফিউজি মেমোরির ঠাঁই হবে না।"
"কাজটা কীভাবে শুরু করব?" রুদ্র ঝুঁকে এল।
"সোজা হিসেব। পানিহাটি পৌরসভার নতুন তৈরি বোর্ড আমাদের পকেটে। অরিন্দমের বাড়ির ডেনেজ লাইন আর পৌরসভার জলের কানেকশন বেআইনি বলে কালই একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দে। শেফালি বুড়ির ছেলেকে ডেকে সিন্ডিকেটের ভয় দেখা। বলবি, জমির শেয়ার না দিলে কলোনির রাস্তায় কোনো গাড়ি ঢুকবে না। আর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়?" সুমিত কুৎসিতভাবে ঠোঁট বাঁকাল। "বুড়ো তো অলরেডি চরিত্রহীন বলে কুখ্যাত। তার ওপর মেয়েটা দিল্লি থেকে কালঙ্ক কুড়িয়ে এনেছে। কলোনির ক্লাবের ছেলেদের খেপিয়ে দে। স্ক্যান্ডাল দিয়ে ওদের এমনভাবে কোণঠাসা কর যাতে রাতের অন্ধকারে ভিটে ছেড়ে পালাতে পথ না পায়।"
গলি দিয়ে তখন একটা নতুন রাজনৈতিক মিছিল যাচ্ছিল। মাইকে তারস্বরে বাজছিল ক্ষমতার গান। মিছিলের পদভরে সোদপুরের কলোনির পুরানো ইটের দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
যে কলোনি একদিন তৈরি হয়েছিল আশ্রয়ের খোঁজে, আজ সেই কলোনিকেই গ্রাস করতে আসছে নিজস্ব তৈরি ক্ষমতার দানব। সামাজিক ইতিহাস, উদবাস্তু স্মৃতি আর মানুষের যন্ত্রণাকে মুছে দিয়ে সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াবে ৯০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট আর কনক্রিটের জঙ্গল। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকার হতে চলেছে ‘অপরাজিতা’ এবং তার ভেতরে থমকে থাকা দুটো ভাঙা আত্মা—অরিন্দম ও মেঘলা।
অধ্যায় ২৫: পেট্রাস, ইমান ও সন্দেহ
সোদপুরের ‘অপরাজিতা’ বাড়িতে সেপ্টেম্বরের মিষ্টি রোদ উঠলেও উঠোনের কোণে স্যাঁতসেঁতে একটা অন্ধকার জমে থাকে। সকাল পৌনে দশটা। উঠোনের পুরনো পেয়ারা গাছটার ওপর কয়েকটা কাক উড়ছিল। ভেজা মাটির ওপর থেকে ঝরে পড়া শ্যাওলার আঁশটে গন্ধ ভেসে আসছে বারান্দায়।
অরিন্দম বারান্দায় বসে এক কাপ লাল চা খাচ্ছিলেন। কাপের গা থেকে পাতলা বাষ্প উঠছে। তাঁর চোখের কোণে কয়েক দিনের জমে থাকা ক্লান্তি লালচে সুতোর মতো ফুটে উঠেছে।
ঠিক তখনই বাইরের লোহার গেটটা একটা বিকট শব্দ করে নড়ে উঠল।
অরিন্দম চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। উঠোনে এসে হাজির হয়েছেন পেট্রাস। নয়ডার সেই আফ্রিকান কেয়ারটেকার ও ব্যবসায়িক পার্টনার। পরনে তার ধূসর রঙের একটা উইন্ডচিটার আর হাতে একটা কালো চামড়ার পুরনো ফাইল—নয়ডার খামারবাড়ির জমি সংক্রান্ত কিছু আইনি কাগজপত্রে সই করানোর জন্য সে সোদপুর পর্যন্ত চলে এসেছে।
কিন্তু পেট্রাস একা আসেনি। তার ঠিক পেছনেই হেঁটে এল চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক।
ছেলেটির পরনে নীল রঙের আধময়লা জিন্স আর একটা কালো লেদার জ্যাকেট। তার মাথার চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাঁটা, চোখে একধরনের অস্থির, হিংস্র আর পরোয়া-না-করা চাহনি। সে উঠোনে পা দিয়েই পকেট থেকে একটা খৈনির কৌটো বার করে একহাতে গোল করতে লাগল।
অরিন্দম বারান্দার দুটো ধাপ সিঁড়ি নেমে এসে দাঁড়ালেন। চশমার মোটা কাচের আড়াল দিয়ে তিনি যখন যুবকটির দিকে তাকালেন, আচমকা তাঁর রক্তের গতি যেন এক নিমেষে জমে বরফ হয়ে গেল।
বাতাস বন্ধ হয়ে এল তাঁর বুকের ভেতর।
ছেলেটির ডান কানের লতিতে একটা পুরনো, গভীর কাটা দাগ। আর তার হাঁটার ভঙ্গি—সামান্য বাঁ পা হেলে হেলে হাঁটার সেই ধরণ...
অরিন্দমের মনে হলো নয়ডার সেই অন্ধকার কালরাত্রিটা এক লহমায় তাঁর মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। ওই মুখ! ওই কানের ক্ষত! ওই শয়তানের মতো হিংস্র চোখের চাহনি! এই সেই যুবক—ইমন। নয়ডার সেই খামারবাড়ির নরককুণ্ডে যে লোকগুলো মেঘলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে এই ইমনই ছিল প্রধান আক্রমণকারী!
অরিন্দমের হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তাঁর চোখের সামনে চারপাশটা রক্তলাল হয়ে উঠল। যুক্তি, ভদ্রতা, বয়সের ভার—সব কিছু এক মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
অরিন্দম এক লাফে এগিয়ে গিয়ে ইমনের লেদার জ্যাকেটের কলার দুটো নিজের দু-হাতে হিংস্রভাবে চেপে ধরলেন।
"তুই!" অরিন্দম পশুর মতো গর্জে উঠলেন। তাঁর গলার স্বর ফাটল, মুখ দিয়ে থুতু ছিটিয়ে পড়ল। "তুইই তো সেই রাতে ছিলি! তুই আমার মেয়েকে নষ্ট করেছিস! তুই আমার সব শেষ করেছিস!"
হঠাৎ এই আক্রমণে চটকা ভাঙল পেট্রাসের। সে ফাইলটা বগলে চেপে এগিয়ে এল, "হেয়, মিস্টার মুখার্জি! স্টপ দিস! হোয়াট আর ইউ ডুইং?"
"পেট্রাস, পুলিশে ফোন কর!" অরিন্দম নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ইমনের কলার ঝাঁকাতে লাগলেন, যদিও তাঁর বুড়ো শরীরের শক্তিতে ২৫ বছরের তরুণটি সামান্যতম টলল না। "এই শুয়োরের বাচ্চাটা একটা খুনী! একটা ধর্ষক! পেট্রাস, তুমি এর সঙ্গে কেন এসেছো? তুমিও কি ওদের সাথে মিলে এই চক্রান্তে জড়িয়ে আছো?"
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ইমন কোনো প্রতিরোধ করল না।
সে অরিন্দমের হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করল না। সে স্রেফ মাথাটা সামান্য ত্যাড়া করে, এক অদ্ভুত, নির্লজ্জ আর শীতল হাসি নিয়ে অরিন্দমের রক্তাক্ত চোখের দিকে চেয়ে রইল। সেই হাসির পেছনে ছিল এক পরম অবজ্ঞা—যেন একজন দুর্বল, অপদার্থ বৃদ্ধ তাকে জ্যাকেটের কলার চেপে ধরে কতটুকু আর ক্ষতি করতে পারবে?
"মিস্টার মুখার্জি, রিল্যাক্স..." পেট্রাস হাত বাড়িয়ে অরিন্দমকে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অরিন্দম তখন এক উন্মাদের মতো কাঁপছেন।
ঠিক তখনই ‘অপরাজিতা’-র কাঠের ভেজানো দরজাটা শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতরের অন্ধকার থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল মেঘলা।
তার পরনে একবারে সাধারণ একটা সুতির পাটভাঙা শাড়ি, চুল আলগা করে পেছনে ফেলা। তার মুখে কোনো শঙ্কা নেই, কোনো আতঙ্ক নেই, এমনকি কোনো তীব্র আবেগও নেই। সে খুব শান্ত, বরফশীতল পায়ে হেঁটে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে এল।
"বাবা, হাত ছাড়ো ওর," মেঘলা ধীর, সমতল গলায় বলল।
অরিন্দম ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়ের দিকে চাইলেন। তাঁর চোখে তখন এক আশার আলো আর তীব্র ক্রোধের প্রকাশ।
"মেঘলা! ও সেই লোকটা!" অরিন্দম চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর গলার শিরাগুলো ফুলে উঠল। "ও তোকে নির্যাতন করেছিল সেদিন রাতে! ওই খামারবাড়িতে ও-ই প্রধান ছিল! আমি একে আজ শেষ করবই! ছাড়ব না একে!"
"না বাবা। তুমি ওকে ছেড়ে দাও," মেঘলার কণ্ঠে কোনো আর্তি ছিল না, ছিল এক কঠিন আজ্ঞা।
অরিন্দম হতভম্ব হয়ে মেয়ের দিকে চাইলেন। তাঁর হাতের মুঠো ইমনের কলার থেকে সামান্য ঢিলে হয়ে গেল। "মেঘলা, তুমি কেন বুঝতে পারছ না? ও এখানে এসেছে মানে কি? ও মনে হচ্ছে পেট্রাসের সাথে হাত মিলিয়ে..."
"যা ঘটার ঘটে তো গেছে বাবা," মেঘলা ইমনের দিকে একবারের জন্যও নিজের চোখ তুলল না। সে স্রেফ পেট্রাসের দিকে তাকাল, যে পেট্রাস অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। "ইমন এখানে পেট্রাসের আত্মীয় বা লোক হিসেবে এসেছে। পুলিশ, প্রতিশোধ, বা আইনি নাটক দিয়ে আমার জীবনের ওই রাতটা মুছে যাবে না... বরঞ্চ সেগুলো দিয়ে জলঘোলা করলে জীবনটা আরও বিষময় হয়ে উঠবে। আমি চাই না সেটা।"
"তুমি... তুমি ওকে কেন ক্ষমা করে দিচ্ছ মেঘলা?" অরিন্দমের গলা বুজে এল। তিনি নিঃশ্বাসের জন্য হাঁপাতে লাগলেন। একজন পিতার এই চূড়ান্ত অক্ষমতা তাঁকে ভেতরে ভেতরে গুঁড়ো করে দিচ্ছিল।
"ক্ষমা?" মেঘলা এক তীব্র, মেকি আর তিক্ত হাসি হাসল। যে হাসিতে কোনো করুণা ছিল না। "ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষমতা তো আমার নেই বাবা। ক্ষমা দেওয়া তো ঈশ্বরের কাজ, কিংবা কোনো মহৎ মানুষের কাজ। আমি অতি সাধারণ একটা মহিলা। আমি শুধু এই হিংস্র বাস্তবতাটাকে মেনে নিচ্ছি। তুমি যেমন তোমার নিজের পতনকে মেনে নিয়েছ, আমিও আমার পতনকে মেনে নিয়েছি।"
কথাগুলো বলে মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল। তার এই আচরণের ভেতরে কোনো আত্মসমর্পণ ছিল না, ছিল অস্তিত্বের এক নির্মম গ্রহণশীলতা (Stoicism)। সে বুঝে গেছে, আইন, বিচার কিংবা বাবার এই অন্ধ আক্রোশ—কোনোটাই সেই খামারবাড়ির কালরাত্রির সত্যকে বদলাতে পারবে না। পৃথিবীতে অবিচার ঘটে, আর দুর্বলকে সেই অবিচার নিজের শরীরের ভেতরে আত্মসাৎ করে বেঁচে থাকতে হয়।
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ইমনের জ্যাকেট থেকে তাঁর হাত দুটো ধীরে ধীরে খসে পড়ল।
তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁর মেয়ে আর কোনো শিকার বা ‘ভিকটিম’ বা আক্রান্ত নারী হিসেবে সমাজের সামনে কাঁদতে চায় না। সে অপরাধের সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও দৈহিক দাহ্য পদার্থকে নিজের ভেতরে শুষে নিয়ে এক পাথুরে শান্তিতে স্থির হয়ে গেছে।
ইমন নিজের জ্যাকেটের কলারটা হাত দিয়ে ঠিক করে নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই একই কুৎসিত, উদাসীন হাসি ধরে রেখে চিবুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
সোদপুরের উঠোনে হালকা রোদ এসে পড়েছে। কিন্তু সেই রোদের নিচে চারটে মানুষ—অরিন্দম, মেঘলা, পেট্রাস আর ইমন—এক নীরব, বিস্ফোরক অথচ পুরোপুরি স্তব্ধ ট্র্যাজেডির ভেতর আটকা পড়ে রইল, যার থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা আর কারও জানা ছিল না।
অধ্যায় ২৬: 'অপরাজিতা'-য় চুরি ও ডায়েরি লোপাট
বিকাল গড়িয়ে তখন সোদপুরের আকাশ জুড়ে সীসে-রঙা মেঘ জমছিল। বি.টি. রোড ধরে চলা বাসগুলোর হাইড্রোলিক ব্রেকের কর্কশ আওয়াজ আর স্টেশনের দিক থেকে ভেসে আসা হুইসেলের শব্দে সোদপুর পূর্বপল্লীর গলিটায় এক অচেনা থমথমে ভাব।
অরিন্দম আর মেঘলা স্থানীয় এইচ বি বাজারে গিয়েছিলেন কিছু দরকারি জিনিস আর সামান্য শাকসবজি কিনতে। মাধবীর পীড়াপীড়িতেই এই বাইরে যাওয়া, নইলে নয়ডার ঘটনার পর থেকে মেঘলা ঘরের চারটে দেয়ালের বাইরে এক পা-ও ফেলতে চাইছিল না।
কিন্তু যখন তারা 'অপরাজিতা'-র লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তখন প্রথম খটকাটা লাগল অরিন্দমের।
বাইরের ভারী লোহার গেটটা লক করা ছিল না, স্রেফ আলতো ভেজানো। উঠোনের এককোণে পড়ে থাকা শুকনো পেয়ারা পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে খসখস করে ঘুরপাক খাচ্ছে।
"গেটটা কি আমি খোলা রেখে গিয়েছিলাম, মেঘলা?" অরিন্দম কিছুটা সংশয় নিয়ে থামলেন। তাঁর হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগে কয়েকটা লেবু আর শাকের আঁটি।
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখন সোজা ভেতরের বারান্দার কাঠের প্রধান দরজাটার দিকে।
দরজার ভারী পিতলের তালাটা মাটিতে পড়ে আছে—তার কড়াটা শক্ত কোনো চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাঠের ওপর থেকে চটে গেছে পুরানো পালিশ।
অরিন্দমের হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগটা যেন আপনা থেকেই শিথিল হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। একটা কাঁচা লেবু গড়িয়ে গিয়ে দরজার ধাপে আটকে রইল।
"ডাকাত... বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল!" অরিন্দম বুক চেপে ধরে ভেতরে ছুটে গেলেন।
ভেতরের ঘরের দৃশ্য দেখে দুজনই থমকে গেল।
অরিন্দমের শোয়ার ঘর আর পড়ার ঘরটা যেন কোনো তাণ্ডবলীলার সাক্ষী। মেঝের ওপর এলোমেলো ছড়ানো পুরানো বইপত্র, সত্যেন বোস আর বায়রনের ওপর লেখা তাঁর গবেষণাপত্রগুলোর খসড়া ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলা হয়েছে। ঘরের একমাত্র কাঠের আলমারিটার দুটো পাল্লাই হা-করে খোলা। হ্যাঙ্গার থেকে শার্ট, কোট আর সুতির ধুতিগুলো মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে।
অরিন্দম এক উন্মাদের মতো হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়লেন। তিনি দুই হাতে মেঝের ধুলো আর ছেঁড়া কাগজগুলো সরাতে সরাতে আলমারির নিচের গোপন দে রাজটার দিকে চাইলেন।
দেরাজটার তালা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভাঙা হয়েছে। ভেতরের পুরানো স্টিলের ক্যাশবাক্সটা হাঁ করে পড়ে আছে মেঝের এককোণে।
অরিন্দম কাঁপতে কাঁপতে বাক্সটার ভেতর হাত দিলেন।
সেখানে থাকা কয়েক হাজার টাকা ক্যাশ, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে জমা রাখা সামান্য দুটো সোনার আঙটি—সব অমলিন পড়ে আছে। চোর একটা টাকাও ছোঁয়নি। সোনাদানা স্পর্শও করেনি।
কিন্তু উধাও হয়ে গেছে কেবল দুটো জিনিস।
প্রথমটি, 'অপরাজিতা' বাড়ির ১৯৫০ সালের আসল ট্রাস্ট ডিড ও জমি-সংক্রান্ত কিছু গোপন পারিবারিক নথিপত্র। আর দ্বিতীয়টি—অরিন্দমের সেই ভারী, চামড়ায় বাঁধাই করা গোপন ডায়েরি।
যে ডায়েরির পাতায় পাতায় লেখা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার গোপনীয়তাগুলো। তাঁর ছাত্রী রিয়া সেনের সাথে সেই অনৈতিক দৈহিক সম্পর্কের প্রতিটি স্বীকারোক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির চোখে ধুলো দেওয়ার সত্য, এবং তাঁর নিজের মানসিক পতনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। যে ডায়েরির একটা পাতাও যদি জনসমক্ষে আসে, তবে সোদপুর তো দূর, গোটা কলকাতায় তাঁর মাথা তোলার কোনো জায়গা থাকবে না।
"নেই..." অরিন্দম হাহাকার করে উঠলেন। তাঁর গলা দিয়ে এক অদ্ভুত, নিঃশব্দ জন্তুর মতো গর্জন বেরিয়ে এল। "সব নিয়ে গেছে... সব শেষ করে দিয়ে গেল!"
ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা। তার পরনে সেই একই শান্ত, উদাসীন ভাব। সে ঘরের এই লন্ডভন্ড অবস্থা দেখছিল, কিন্তু তার চোখে কোনো ভয় বা বিস্ময় ফুটল না।
"টাকা পয়সা তো নেয়নি মেঘলা," অরিন্দম মেঝের ধুলোয় হাত ঘষতে ঘষতে ফুঁপিয়ে উঠলেন। তাঁর চোখের চশমাটা একপাশে বেঁকে গেছে, কপালে ঘামের সাথে লেগেছে আলমারির কালচে ধুলো। "ওরা টাকা চায়নি রে... ওরা আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিতে এসেছিল! সুমিত আর রুদ্রর লোক এগুলো করিয়েছে! ওরা আমার চরিত্রটা চুরি করতে এসেছিল!"
মেঘলা ধীর পায়ে এগিয়ে এল। সে মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা ছিঁড়ে ফেলা একটা কাগজের টুকরো পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর অরিন্দমের দিকে তাকাল—যে বাবা একসময় তার কাছে ছিলেন ন্যায়, সাহিত্য আর নৈতিকতার শেষ কথা, আর আজ যিনি মেঝের ধুলোয় পড়ে নিজের হারানো সম্মানের জন্য কাঁদছেন।
"তোমার চরিত্র তো অনেক আগেই হারিয়েছে বাবা," মেঘলার গলার স্বর ঘরটার থমথমে বাতাসের ভেতর বরফের ফলা হয়ে বিধল। "এখন আর এত ভয় কিসের?"
অরিন্দম মুখ তুলে চাইলেন। তাঁর থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো থেকে কোনো শব্দ বেরোল না।
"তুমি ভেবেছিলে তোমার ওই ডায়েরিটার ভেতরে তোমার কুকীর্তিগুলো তালাবন্ধ করে রাখলেই তুমি ভালো মানুষ থেকে যাবে?" মেঘলার কণ্ঠে এক অপরিসীম করুণা আর ধিক্কারের মিশ্রণ। "যে চরিত্র তুমি নিজেই অনেক আগে রিয়া সেনের বিছানায় আর নিজের অহংকারে বিসর্জন দিয়েছ, সে চরিত্র তো একটা মরা লাশ। সেই লাশের ছাল-ছামড়া চোরেরা চুরি করে নিয়ে গেলে তোমার নতুন করে কী হারানোর আছে?"
"মেঘলা... তুমি বুঝছ না," অরিন্দম হাঁপাতে লাগলেন, তাঁর বুকের ভেতর হাঁপানি রোগীদের মতো বাঁশির শব্দ হতে লাগল। "ওরা ওগুলো প্রমোটিংয়ের জন্য ব্যবহার করবে! ওই ডায়েরির পাতাগুলো সোদপুরের গলিতে গলিতে পোস্টার করে ছেপে দেবে! লিফলেট বানিয়ে কলোনির লোকজনের ঘরে ঘরে বিলি করবে! ওরা আমার সম্মানটুকুও ধুলোয় মিশিয়ে দেবে..."
"সম্মান?" মেঘলা একটা হালকা, শিস দেওয়ার মতো তিক্ত হাসি হাসল। "যে শহরে তোমার মেয়ে নয়ডা থেকে রেপড হয়ে ফিরে এসেছে, যে শহরে তোমার বাড়ির ওপর প্রমোটারের চোখ পড়েছে, আর যে শহরে তুমি নিজের মেয়েকে একটা চোরের মতো লুকিয়ে রেখেছ—সেখানে আবার কিসের সম্মান বাবা? সোদপুরকে তুমি এত ভালোবাসো, আর সোদপুরই তোমার চামড়া ছাড়াতে এসেছে।"
মেঘলা আর দাঁড়াল না। সে সোজা গিয়ে নিজের ঘরের দরজার ভেজানো কবাটটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
অরিন্দম একা বসে রইলেন লন্ডভন্ড পড়ার ঘরে। চোরেরা টাকা নেয়নি, কিন্তু তারা দিয়ে গেছে এক ভয়াবহ মানসিক ব্ল্যাকমেইলের নোটিশ। 'অপরাজিতা'-র দেওয়ালগুলো যেন এবার সত্যিই ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। বাইরের সুমিত ঘোষ আর রুদ্র পালদের সিন্ডিকেট কেবল জমি দখল করতে চায় না, তারা এক একটা মানুষকে ভেতর থেকে চরিত্রহীন আর দেউলিয়া বানিয়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে চায়।
সন্ধ্যা নেমে এল সোদপুরে। অন্ধকার ঘরটায় একা বসে রইলেন প্রাক্তন অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়—নিজের ইটের তৈরি বাড়ি আর কাগজপত্রের ওপর লেখা নিজেরই কুৎসিত অতীতের ভগ্নস্তূপের মাঝে।
*অধ্যায় ২৭: সাইবার ট্রায়াল ও সোদপুরের বিস্ফোরণ
দুপুরের সোদপুর যেন একখানা পুরনো, আর্দ্র স্পঞ্জের মতো নিস্তব্ধতা শুষে নিচ্ছিল।
পূর্বপল্লীর মেটে গলির মুখে ছাতিম গাছটার ছায়া তখন ছোট হতে হতে গাছের গুঁড়ির কাছে এসে জমা হয়েছে। হাওয়ায় কোনো দোলা নেই; চারপাশের বাতাসে কেবল রেললাইনের উত্তপ্ত লোহা আর খোলা নর্দমার বাসি গন্ধের এক থমথমে মিশ্রণ।
‘অপরাজিতা’র একতলার দক্ষিণমুখী পড়ার ঘরে অরিন্দম মুখোপাধ্যায় বসে ছিলেন মেহগনি কাঠের পুরনো গোল টেবিলটার সামনে। হাতঘড়িতে তখন দুপুর দুটো বাজতে দশ। জানলার খড়খড়ি খোলার অবকাশ নেই, ঘরের ভেতরটা সোঁদা আলো-আঁধারিতে ডুব মেরে আছে। অরিন্দমের সামনে রাখা চায়ের কাপের ওপর পাতলা একটা সর জমে শক্ত হয়ে গেছে।
দরজায় তিনটে ছোট ছোট চাপড় পড়ল। কড়া নাড়ার শব্দ নয়, যেন কেউ হাত মেপে নিশ্চিত হতে চাইছে ভেতরে লোক আছে কি না।
অরিন্দম উঠলেন না। তিনি চশমার কাচটা শার্টের কোণ দিয়ে মুছতে মুছতে ধীরস্বরে বললেন, “খিল খোলা আছে, নীলয়। চলে আয়।”
দরজার পাল্লাটা মড়মড় করে ঠেলে ভেতরে ঢুকল নীলয় দত্ত। তার কপালে ঘামের ফোঁটা, হাতের ওষুধের দোকানের ছাপা প্লাস্টিকের ব্যাগটা অদ্ভুতভাবে দুমড়ে মুচড়ে ধরে আছে। নীলয় ঘরটায় ঢুকে কোনো ভূমিকা না করেই সোজা এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর নিজের স্মার্টফোনটা এনে উপুড় করে রাখল। স্ক্রিনের আলো তখনো দপ দপ করছে।
“তুই কি সকাল থেকে নেট খুলেছিস, অরিন্দম?” নীলয়ের গলা ভাঙা, হাঁপানির টান উঠে এসেছে যেন।
অরিন্দম চশমাটা নাকের ওপর বসালেন। “মোবাইলটা তো চার্জেই বসাইনি। কেন, সোদপুরের কোনো নতুন খবর আছে নাকি?”
“সোদপুরের খবর নয়, তোর খবর। সমস্ত রটে গেছে।” নীলয় ফোনের স্ক্রিনটা অরিন্দমের চোখের সামনে তুলে ধরল। “ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম—চারদিকে কেবল তোর নাম। রিয়ার সঙ্গে তোর পুরনো ঘটনা, কলকাতার খবরের কাগজের কাটিং, আর... আর তোর সেই ডায়েরিটার কয়েকটা পাতার ছবি। কাল রাত থেকে ভাইরাল।”
অরিন্দম পলক না ফেলে ফোনটার দিকে তাকালেন।
স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে লাল অক্ষরে লেখা কিছু ক্যাচলাইন—‘শিক্ষা জগতের অন্ধকার রূপ: প্রফেসর মুখার্জীর গোপন ডায়েরির চাঞ্চল্যকর তথ্য’। ডায়েরির পাতার ওপর ফোকাস করা ছবি; অরিন্দমের নিজের হস্তাক্ষর। কত বছর আগের লেখা? সেই বেনারসের দিনগুলোর, না কি সোদপুরের নিঝুম রাতে লেখা একলা স্বীকারোক্তি? তার নিচে শত শত কমেন্ট, শেয়ারের সংখ্যা মিনিটে মিনিটে বাড়ছে।
অরিন্দমের চোখের তারায় কোনো আলো ফুটল না। তিনি খুব শান্ত ভঙ্গিতে মোবাইলটা নীলয়ের দিকে ঠেলে দিলেন।
“ডায়েরিটা মাসখানেক আগে কলকাতা থেকেই চুরি হয়েছিল,” অরিন্দম নিচু স্বরে বললেন। “চোর যে পাতার সঙ্গে সাহিত্য মিশিয়ে বিক্রি করবে, তা জানা ছিল না।”
“তুই ঠাট্টা ভাবছিস এটাকে?” নীলয় গলার জোর বাড়াতে গিয়েও চেপে গেল। সে জানলার দিকে একবার ভীতিভরা চোখে তাকিয়ে আরও এগিয়ে এল। “রুদ্র আর সুমিত সকাল থেকে ক্লাবে মোড়লগিরি করছে। পাড়ার ছেলেদের জড়ো করেছে। শেফালি পিসির বাড়ির জমিও ওরা পেল না, আর তোর ‘অপরাজিতা’র ওপর সুমিতের নজর কতদিনের তা তুই জানিস না? এই সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়টাকে ওরা হাতিয়ার করছে অরিন্দম! তোকে এখান থেকে উচ্ছেদ করার ছক।”
“কাকাবাবুর তৈরি বাড়ি, নীলয়,” অরিন্দম ধীর পায়ে জানলার খড়খড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের ফাঁকা গলিটায় কয়েকটা কাক অলসভাবে উড়ছে। “মানুষ যখন সততা দিয়ে নিজের সমাজ গঠন করতে পারে না, তখন সে পাপাচারীকে তাড়িয়ে নিজের পুণ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ তো পুরানো খেলা।”
“দর্শন বন্ধ কর অরিন্দম!” নীলয় চিৎকার করে উঠল। “তুই জানিস না সোদপুরের পরিস্থিতি এখন কী! সুমিত ঘোষের পেছনে শাসক দলের প্রোমোটার সিন্ডিকেট দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তোকে নর্দমায় ফেলতে চায়, আর তার জন্য লোক জড়ো করছে পাড়ায়। বেরিয়ে যা তুই আজ রাতের ট্রেনে! কয়েকটা দিন মেঘলার কাছে দিল্লিতে গিয়ে থাক!”
“মেঘলার কাছে?” অরিন্দম হঠাৎ থেমে গেলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা মেকি হাসির রেখা ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। “মেঘলা ওর নিজের নরকে বাস করছে, নীলয়। আমার পাপের দাগ সেখানে নিয়ে গিয়ে ওকে আর ছোট করতে পারব না।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই, গলি থেকে একটা দূরের কোলাহল ভেসে এল।
প্রথমে সেটা ছিল কয়েক জোড়া জুতোর শব্দ আর অস্পষ্ট শ্লোগান। কিন্তু এক মিনিটের মধ্যেই শব্দটা কাছে চলে এল। ধাতব মাইকে কাঁচের মতো চাঁচাছোলা গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠল—“সংস্কৃতির সোদপুরে কামুক প্রফেসরের ঠাঁই নেই! ধিক্কার! ধিক্কার!”
নীলয় আতঙ্কে চকিতে পেছাল। “ওরা এসে গেছে అరుణ! ওরা চলে এসেছে!”
অরিন্দম সরলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন ঘরের ঠিক মাঝখানটায়।
বাইরে ইটের গাঁথুনি দেওয়া ‘অপরাজিতা’র দেওয়ালের ঠিক ওপারেই ভিড় জমে গেছে। অন্তত পঁচিশ-ত্রিশজন সোদপুরের যুবক, হাতে স্মার্টফোন, কয়েকজনের হাতে আলকাতরার বালতি আর ব্রাশ। সবার আগে দাঁড়িয়ে সুমিত ঘোষ। পরনে সাদা পঞ্জাবি, চোখে রোদচশমা ঝুলানো, মুখে সমাজের রক্ষকের মতো এক ক্রুদ্ধ বিষাদ। তার পাশে রুদ্র পাল, মাধবীর বেকার ভাইপো, যার চোখে নিজস্ব ক্ষোভ আর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার আগুন।
হঠাৎ একটা বিকট শব্দে কাঠের প্রধান দরজাটা কেঁপে উঠল।
ঠাঁই!
একটা লাল ইটের আধলা এসে সোজা দরজার ওপর আছড়ে পড়েছে। দরজার পুরনো সেগুন কাঠের চটে যাওয়া পলিশ থেকে কিছু সুক্ষ্ম গুঁড়ো ঝরে পড়ল মেঝের ওপর।
“প্রফেসর মুখার্জী! বাইরে আসুন!” সুমিতের গলা মেগাফোনে গর্জে উঠল। “মেয়েদের শ্লীলতাহানি করে, ছাত্রী ধর্ষণ করে সোদপুরের মাটিতে সাধু সাজা চলবে না! সমাজসেবার মুখোশ খুলে ফেলুন!”
ভেতর থেকে নীলয় অরিন্দমের হাত চেপে ধরল। “অরিন্দম, উঠোন দিয়ে পেছনের দরজায় চলে যা! আমি ওদের সামলাচ্ছি!”
অরিন্দম নীলয়ের হাতটা খুব আলতো করে সরিয়ে দিলেন। তাঁর চোখে ভয় বা উত্তেজনা কিছুই ছিল না, বরং ছিল এক গভীর, অবাস্তব ক্লান্তি। তিনি ধীর পায়ে বারান্দার দিকে হেঁটে গেলেন।
বাইরের রাস্তায় চিৎকার ততক্ষণে চরমে উঠেছে। ক্লাবের দুটো ছেলে বালতি থেকে ব্রাশে আলকাতরা তুলে ‘অপরাজিতা’র পীতবর্ণের চুনকাম করা দেয়ালে চওড়া অক্ষরে লিখতে শুরু করেছে। আলকাতরার ঝাঁঝালো, পোড়া পেট্রোলিয়ামের গন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ছে।
দেওয়ালে কালো আলকাতরায় লেখা হলো—“ধর্ষক প্রফেসর অরিন্দম ব্যানার্জী দূর হটো”।
ঠাঁই! আর একটা ইট এসে পড়ল জানলার খড়খড়িতে। পুরনো কাচের একটা ছাঁচ চুরমার হয়ে বারান্দার মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
অরিন্দম দরজার ভারী লোহার ছিটকিনিটা এক টানে তুলে দিলেন।
দরজাটা মড়মড় করে পুরো খুলে গেল। রোদের তীক্ষ্ণ আলো ঘরের ভেতরের অন্ধকারের ওপর এসে পড়ল যেন এক তীব্র আঘাতের মতো। অরিন্দম দাঁড়িয়ে রইলেন দরজার ঠিক মাঝখানে। পরনে সাধারণ সুতির ঢিলেঢালা জামা, পায়জামা, চোখে সেই মোটা ফ্রেমের চশমা। তাঁর চুলগুলো এলোমেলো, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে এক ধরণের রুক্ষ, অনমনীয় অহংকার।
এক মুহূর্তের জন্য বাইর কোলাহল হঠাৎ থেমে গেল। যেন ক্ষিপ্ত ভিড়টা আশা করেনি শিকার নিজে এভাবে হেঁটে ছায়ামঞ্চে এসে দাঁড়াবে।
কয়েক জোড়া মোবাইলের ক্যামেরা নিমেষে অরিন্দমের মুখের ওপর স্থির হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপারে ভেসে থাকা হাজার হাজার ভিউয়ারের সামনে এই মুহূর্তের দৃশ্য লাইভ প্রচার হচ্ছে।
সুমিত ঘোষ দুই ধাপ এগিয়ে এল। মেগাফোনটা নামিয়ে সে সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “সংস্কৃতির নামে বিকৃতি সোদপুর সহ্য করবে না! আপনার ইতিহাস আমরা জেনে গেছি! নিজের ডায়েরিতে কী কুৎসিত মানসিকতার প্রমাণ রেখে দিয়েছেন, তা পুরো বাংলা আজ দেখছে! সোদপুর পাড়ার পরিবেশ নষ্ট করতে দেব না! বাড়ি খালি করে দিয়ে চলে যান!”
সুমিতের গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। কিন্তু সেই চেঁচামেচির আড়ালে অরিন্দম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন এক ব্যবসায়ী লোভ। সুমিতের চোখ দুটো অরিন্দমের শরীরের ওপর নয়, আটকে আছে ‘অপরাজিতা’র কাঠা-পাঁচেক জমির ওপর, যার পেছনে প্রোমোটারের পাঁচ লাখ টাকার দাদন বায়দা করা আছে।
অরিন্দম এক চুল সরলেন না। তিনি চশমাটা একটু ঠিক করে নিলেন। তাঁর গলার স্বর কোনো মাইক ছাড়াই সোদপুরের নিঝুম দুপুরকে চিরে বেরিয়ে এল—শান্ত, নিরাসক্ত, অথচ ধারালো।
“তোমাদের ইট মারার অধিকার আছে,” অরিন্দম সুমিত আর তার পেছনের ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু সত্যকে, ইতিহাসকে জানার ধৈর্য নেই। ইচ্ছেও নেই।”
“নীতি কথা শোনাবেন না প্রফেসর!” রুদ্র পাল চিৎকার করে উঠল। “পাপ করেছেন, তার সাজা আপনাকে পেতেই হবে! পাড়ার লোক আপনার থুতু ফেলবে!”
“পাপ?” অরিন্দম হালকা হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো পরাজয় ছিল না, ছিল চরম বিদ্রূপ। “পাপের বিচার তো তোমরা করছ না রুদ্র। তোমরা করছ তোমাদের নিজেদের খিদে আর হিংসার হিসাব। যে ডায়েরির পাতা তোমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছ, সেখানে আমার অন্যায় লেখা আছে, কিন্তু তা পড়ার মতো চোখ বা বুদ্ধি কোনোটাই তোমাদের নেই। তোমরা শুধু একটা সুযোগ খুঁজেছ, যাতে সমাজের নামে নিজের বিকৃতিকে ঢাকা যায়।”
“আপনার মুখ বন্ধ করুন!” সুমিত তেড়ে এল বারান্দার ধাপের কাছে। “বাড়ি খালি করবেন কি না সোজা বলুন! না হলে আজ রাতে এই বাড়িতে আগুন জ্বলবে!”
অরিন্দম সুমিতের খুব কাছাকাছি এলেন। তাঁদের মাঝে এখন কেবল দুটো ধাপের ব্যবধান।
“বাড়ি আমি খালি করব না সুমিত,” অরিন্দম সুমিতের রোদচশমার কাচে নিজের শান্ত প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। “যে আলকাতরা তোমরা আমার বাড়ির দেয়ালে লেপেছ, তা ধোওয়া যায়। কিন্তু যে লোভ আর ভণ্ডামি নিয়ে তোমরা রাজনীতি করছ, তার দাগ তোমরা কোন জলে ধোবে?”
ভিড়ের ভেতর থেকে আবার একটা ইট উড়ে এল, যা অরিন্দমের পায়ের থেকে ইঞ্চি তিনেক দূরে মেঝের টালিতে লেগে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নীলয় পেছন থেকে চিৎকার করে অরিন্দমকে জামা ধরে টানার চেষ্টা করল, কিন্তু অরিন্দম এক জায়গায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
কয়েকজন সোদপুরের প্রবীণ লোক দূর থেকে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন, কিন্তু কেউ এগোলো না। কারণ বিচার যখন জনতার হাতে যায়, তখন সত্য আর মিথ্যার ফারাক মুছে গিয়ে কেবল শক্তির মহড়া পড়ে থাকে।
সুমিত নিজের সহকারীদের দিকে তাকাল। ক্যামেরাগুলোতে লাইভ চলছে, ফলে হাতাহাতি করলে আইনের জল বহুদূর গড়াবে। সে নিজের রাগ সামলে নিয়ে একপা পেছাল।
“আজকে আমরা শুধু ওয়ার্নিং দিয়ে গেলাম, প্রফেসর মুখার্জী,” সুমিত গলার স্বর নীচু করে, অথচ হিংস্র ভঙ্গিতে বলল। “আইন বা মিডিয়া—কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। সোদপুরের যুবসমাজ আপনাকে এই সমাজ থেকে ছেঁটে ফেলবেই।”
সুমিত হাত তুলল। ভিড়টা ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করল, কিন্তু তাদের মুখে তখনো গালাগালি আর অপমানের ফোয়ারা। যুবকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিম শেষ করতে করতে বিজয়ীর মতো হাসতে হাসতে গলি দিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাস্তাটা আবার ফাঁকা হয়ে এল।
রয়ে গেল কেবল ভাঙা ইটের টুকরো, জানলার কাচের গুঁড়ো, আর ‘অপরাজিতা’র সাদা গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া আলকাতরার থোকা থোকা কালো তরল—যা দুপুরে রোদে পিচের মতো চকচক করছে।
নীলয় এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বারান্দার ওপর। সে দু’হাতে মুখ ঢেকে বলতে লাগল, “শেষ হয়ে গেল... অরিন্দম, সব শেষ হয়ে গেল...”
অরিন্দম মাটিতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা ইটের টুকরো হাতে তুলে নিলেন। লাল মাটির ডেলাটা হাতের তালুতে বেশ ভারী শোনালো। তিনি কোনো কথা বললেন না। দেওয়ালের দিকে তাকালেন, যেখানে তাঁর নামের ওপর কালো কালির ছাপ পড়ে রয়েছে।
সাইবার ওয়ার্ল্ডের ডিজিটাল ঘৃণা আর সোদপুরের বাস্তব হিংসা—দুটো এসে হাত মিলিয়েছে এক বিন্দুতে। কিন্তু অরিন্দমের ভেতরের সেই পুরনো শূন্যতা এতটুকু কাঁপল না। যে মানুষটা নিজের সততা আর অহংকার অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে, তাকে আর নতুন করে অপমান করার কোনো অস্ত্র সমাজের হাতে অবশিষ্ট নেই।
তিনি ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন। কপালে একবিন্দু ঘাম, কিন্তু চোখ দুটো একদম শুকনো। বিকেলের রোদের আলোটা হেলে পড়তে শুরু করেছে, আর সোদপুর কলোনির ওপর নেমে আসছে এক বিষাক্ত, নৈঃশব্দ্যময় রাত।
*অধ্যায় ২৮: কলকাতায় যাত্রা ও নাটকের মঞ্চ
*সোদপুরের ‘অপরাজিতা’র দেওয়ালে লেপে দেওয়া আলকাতরার ঝাঁঝালো, পোড়া গন্ধটা তখনো অরিন্দমের পোশাকে ও অস্তিত্বে আটকে ছিল। সন্ধ্যার ঠিক মুখে মুখে, পাড়ার গলিতে নতুন করে ভিড় জমার আগেই তিনি একপ্রস্থ জীর্ণ ট্রাভেল ব্যাগে কিছু ওষুধ আর দুটো জামা পুরে শিয়ালদহগামী ভিড় ঠাসা লোকাল ট্রেনে চেপে বসেছিলেন।
ট্রেনের কামরায় ভেসে আসা হকারদের হাঁক ডাক, সহযাত্রীদের খবরের কাগজের রাজনীতি চর্চা—সবকিছুর আড়ালে অরিন্দমের কানে কেবল বাজছিল সোদপুরের গলি থেকে ভেসে আসা সেই স্লোগান আর দূর থেকে দেখা সোশ্যাল মিডিয়ার ডিজিটাল ট্রায়ালের বিকৃত হুল্লোড়।
শিয়ালদহ থেকে বাস ধরে যখন তিনি অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর প্রাঙ্গণে এসে নামলেন, তখন কলকাতার আকাশে এক ফোঁটা-দুই ফোঁটা করে শ্রাবণের ধারাপাত শুরু হয়েছে। নিয়ন আলোয় ভিজে থাকা ক্যাথেড্রাল রোডের ওপর নাট্যপ্রেমীদের জটলা। কাউন্টারে কাটানো শেষ সারির একটুকরো টিকিট পকেটে পুরে অরিন্দম হলঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেন।
প্রেক্ষাগৃহের আলো তখন নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। ঘন অন্ধকারে ঢাকা সেই প্রেক্ষাগৃহে অরিন্দম তাঁর জামার কলারটা উঁচিয়ে, চশমাটা নাকের ওপর ভালো করে এঁটে একেবারে পেছনের সারির এক কোণের অস্পষ্ট আসনে গিয়ে বসলেন। এখানে আলোর রশ্মি পৌঁছায় না; কেবল মঞ্চের প্রজেক্টরের তীব্র হলুদ আলো মাথার ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে কেটে গিয়ে সামনে আছড়ে পড়ে।
মঞ্চে আজ রাতের প্রযোজনা—‘লর্ড বায়রনের পতন’।
পর্দা উঠতেই এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা ও বেহালায় করুন সুরের মূর্চ্ছনা ছড়াতে লাগল। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণের ইংল্যান্ডের সর্বাপেক্ষা বর্ণময়, মেধাবী অথচ অভিশপ্ত কবি জর্জ গর্ডন বায়রনের জীবনের শেষ ও মর্মান্তিক কয়েকটা বছরকে ক্যানভাসে তুলে আনা হয়েছে।
অরিন্দম অন্ধকারের ভেতর থেকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বায়রনের ইতিহাস তাঁর মুখস্থ। জন্ম থেকেই পঙ্গু পা, কিন্তু এক রাজকীয় সুপুরুষ চেহারা আর অমিত প্রতিভার অধিকারী সেই যুবক মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে ‘চাইল্ড হ্যারল্ডস পিলগ্রিমেজ’ লিখে রাতারাতি ইংল্যান্ডের সাহিত্যজগতের সিংহাসনে বসেছিলেন। লন্ডন শহরের যে সমাজ তাঁকে মাথায় তুলে নাচিয়েছিল, সেই সমাজই আবার এক রাতে তাঁকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল নর্দমায়।
বায়রনের জীবন ছিল কেলেঙ্কারি ও বিতর্কে ভরা। লেডি ক্যারোলিন ল্যাম্ব যাঁর নাম দিয়েছিলেন—‘পাগল, বদ এবং যাকে জানা বিপজ্জনক’। আনাবেলা মিলব্যাঙ্কের সঙ্গে তাঁর সংক্ষিপ্ত ও নরকীয় বৈবাহিক সম্পর্কের ব্যর্থতা, তাঁর প্রথাভাঙা রাজনৈতিক বক্তব্য, আর সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর সৎ-বোন অগাস্টা লি-র (Augusta Leigh) সঙ্গে তাঁর অতি-ঘনিষ্ঠতার কলঙ্কজনক গুঞ্জন। Victorian যুগের ভণ্ড সুশীল সমাজ, যা আড়ালে হাজারো পাপাচারের জন্ম দিত, তারা হঠাৎই পরম ধার্মিকের মুখোশ পিন্ধন করে বায়রনের বিরুদ্ধে এক জঘন্য নৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। খবরের কাগজে, ধর্মযাজকদের বক্তব্য আর সাধারণ মানুষের কুৎসিত রটনায় ছেয়ে গিয়েছিল লন্ডনের রাজপথ। ১৭১৬ সালে বাধ্য হয়ে নিজের জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে চিরদিনের জন্য নির্বাসনে চলে যান বায়রন, যিনি আর কোনোদিন ফিরে আসেননি; মারা গিয়েছিলেন গ্রিসের মিসোলঙ্গিতে এক নিঃসঙ্গ, নিঃশ্বাসের যুদ্ধে।
আর এই পুরো নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে যে চরিত্রটি আজ মঞ্চকে কাঁপিয়ে তুলছিল, সে হলো অগাস্টা লি।
অগাস্টা ছিলেন বায়রনের পিতা ক্যাপ্টেন জন বায়রনের প্রথম পক্ষের কন্যা। কবির সৎ-বোন হলেও তাঁদের আত্মিক যোগাযোগ ছিল গভীর ও জটিল। বায়রনের জীবনের সমস্ত উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী ও আশ্রয়স্থল ছিলেন এই অগাস্টা। সমাজের চোখে অগাস্টা ছিলেন পাপিষ্ঠা, এক নিষিদ্ধ প্রেমের অভিশপ্ত প্রতীক। কিন্তু বায়রনের কবিতায় অগাস্টা ছিলেন একমাত্র নারী, যিনি কবিকে কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো বিচার ছাড়া ভালোবাসতে পেরেছিলেন। বায়রন তাঁর জন্য লিখেছিলেন—“Stanzas to Augusta”।
মঞ্চের ওপর যখন অগাস্টার প্রবেশ ঘটলো, অরিন্দমের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য নিথর হয়ে গেল।
পরনে ভিক্টোরিয়ান যুগের ঘন কালো গাউন, মাথায় ঝুলন্ত লেসের পর্দা, আলোয় স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে মুখখানি—মঞ্চে দাঁড়িয়ে রিয়া। রিয়া দাস।
অগাস্টার চরিত্রে রিয়ার অভিনয় কেবল কোনো মুখস্থ সংলাপের আবৃত্তি ছিল না; তা ছিল এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির প্রকাশ। মঞ্চে সমাজের তথাকথিত বিচারপতিদের দিকে মুখ ফিরিয়ে যখন রিয়া দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল, তখন হলের আবহাওয়া থমকে গেল।
রিয়া—বা অগাস্টা—বলছিল: “তোমরা আমাকে পাপিষ্ঠা বলো? কারণ আমি এক পরাজিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি? যে সমাজ কোনো কবির প্রতিভাকে চুষে খায়, আর তার একফোঁটা রক্তক্ষরণ দেখলে কদর্য উল্লাসে মেতে ওঠে, সেই সমাজের নীতিপুলিশদের আমি ঘৃণা করি! তোমরা বায়রনের কাব্যকে পুড়িয়েছ, কারণ তোমরা তাঁর সত্যকে সহ্য করতে পারোনি!”
রিয়ার চোখের কোণে আলো ঠিকরে উঠছিল। প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠছিল এক তীব্র হাহাকার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের ধারালো যুক্তি।
অন্ধকারে বসে অরিন্দম ভাবছিলেন জীবন আর শিল্পের সেই মহাসত্যের কথা—Life vs. Art Mirroring।
কী অদ্ভুত এই আয়না! মঞ্চে বায়রনের যা পতন, তা শিল্পের জাদুতে আজ এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। সমাজ বায়রনকে তাড়িয়েছিল, কিন্তু শিল্প তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। মানুষ পনেরো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সেই পতনের সৌন্দর্য দেখতে প্রেক্ষাগৃহে এসে বসেছে, হাততালি দিচ্ছে। অগাস্টার পাপকে আজ নাম দেওয়া হচ্ছে পরম আত্মত্যাগ।
অথচ, শিল্পের পর্দা নেমে গেলেই বাস্তব জীবন কত নিদারুণ, কত কুৎসিত! অরিন্দমের নিজের জীবনটাও তো আজ সমাজের বিচারে এক পতন। কিন্তু তাঁর পতনে কোনো কাব্যিক রাজকীয়তা নেই, নেই কোনো অর্কেস্ট্রার করুণ সুর। সেখানে আছে সোদপুরের দেওয়ালে আলকাতরার দুর্গন্ধ, সাইবার ওয়ার্ল্ডের ডিজিটাল ট্রায়াল আর বন্ধুদের নীরব বিশ্বাসঘাতকতা। সমাজ বাস্তবে যা কিছুকে ধ্বংস করে, শিল্পে সেই ধ্বংসেরই পূজা করে। জীবনের অপরাধ যেখানে নর্দমার কাদা, শিল্পের ছোঁয়ায় সেই অপরাধই হয়ে ওঠে চিরন্তন শিল্পকর্ম।
নাটক শেষের দিকে এগিয়ে এল। বায়রন গ্রিসের মাটিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, আর নেপথ্যে অগাস্টার করুণ, প্রতিধ্বনিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে।
পর্দা পড়ল।
এক মুহূর্তের নিবিড় স্তব্ধতা, তার পরেই পুরো হলঘর ফেটে পড়ল এক উত্তাল করতালি ও প্রশংসাধ্বনিতে। আলোর বন্যা নেমে এলো প্রেক্ষাগৃহে। দর্শকেরা দাঁড়িয়ে উঠে কুশলীদের সম্মান জানাচ্ছে। রিয়া মঞ্চের মাঝখানে এসে মাথা নুয়ে অভিবাদন গ্রহণ করল।
অরিন্দম আর এক মুহূর্তও বসলেন না। ভিড় বাড়ার আগেই, নিজের এই ছদ্মবেশ টলে যাওয়ার আগেই তিনি ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে হলের বাইরের করিডোরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
করিডোরের ওপর তখন নাট্যপ্রেমী মানুষের হালকা জটলা, চা আর সিগারেটের ধোঁয়া। অরিন্দম মাথার টুপিটা আরও খানিকটা চেপে ধরে বেরোনোর দরজার দিকে এগোচ্ছিলেন।
হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া ভারি বুটের শব্দ আর এক রুক্ষ কণ্ঠস্বর বাতাস চিরে ভেসে এল।
“অরিন্দমদা?”
অরিন্দম থামলেন। কিন্তু ঘোরার আগেই একটা শক্ত হাত এক ঝটকায় তাঁর কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে দিল।
সামনে দাঁড়িয়ে অয়ন। নাটকের নির্দেশক, রিয়ার দলের সর্বেসর্বা। অয়নের পরনে আভিজাত্যপূর্ণ কালো শেরওয়ানি, কপালে সার্থকতার ঘাম, আর চোখে এক পরম বিজয়ীর হিংস্র অহংকার। তার পেছনে দাঁড়িয়ে নাটকের আরও কয়েকজন তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রী।
অয়ন অরিন্দমের জীর্ণ চেহারা, চোখের নিচের কালসিটে আর কাঁপতে থাকা শরীরের দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত, হিংসাত্মক হাসিতে ফেটে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর হলের বাকি দর্শকদের আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশি চড়া হয়ে উঠল।
“লজ্জা করে না আবার এখানে এসেছেন মুখ দেখাতে? আপনার বিচার থিয়েটারের মঞ্চে হচ্ছে প্রফেসর!”
অয়নের মুখের প্রতিটি শব্দ থেকে যেন বিষ ঝরে পড়ছিল। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন দর্শক থমকে গেল। কয়েকজন কৌতূহলী হয়ে মোবাইলের ক্যামেরা অন করতে শুরু করল।
অরিন্দম কোনো আঘাত বা অপমানে কেঁপে উঠলেন না। তিনি চশমাটা নাকের ওপর একটু স্থির করলেন। তাঁর চোখের মনি দুটো অদ্ভুতভাবে নিথর, যেন তিনি কোনো গভীর দূরের দৃশ্য দেখছেন।
অরিন্দম খুব শান্ত, নিচু স্বরে বললেন— “আমি অভিনয় দেখতে এসেছি অয়ন, বিচার চাইতে আসিনি।”
“অভিনয় দেখতে এসেছেন?” অয়ন উপহাসের ভঙ্গিতে একপা এগিয়ে এল, তার আঙুল সোজা অরিন্দমের বুকের ওপর বিঁধল। “সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার কুকীর্তির নথিপত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। সোদপুরের লোক আপনার বাড়িতে আলকাতরা ঢেলেছে, আর আপনি এখানে এসেছেন রিয়ার অভিনয় দেখতে? ওর ক্যারিয়ারটা নষ্ট করতে চেয়েও মন ভরেনি? নাকি নিজের বিকৃত মনস্তত্ত্বকে তৃপ্ত করতে এসেছেন?”
অরিন্দম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি জানতেন, অয়নের এই আকস্মিক বীরত্বের পেছনে রিয়ার প্রতি অনুরাগের চেয়েও বেশি কাজ করছে নিজের নাটকের প্রচার আর প্রচারের সস্তা সুযোগ।
“শুনুন প্রফেসর!” অয়ন অরিন্দমের জামার কলারের কাছে হাত বাড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “থিয়েটারের মঞ্চ কোনো পাপিষ্ঠ বা ধর্ষকের তীর্থক্ষেত্র নয়! বায়রনের পতনের নাটক দেখে নিজের পাপ ধোওয়ার চেষ্টা করবেন না! বায়রন কবি ছিলেন, আর আপনি একটা সমাজের কলঙ্ক!”
অয়ন একটা তীব্র ধাক্কা দিল অরিন্দমের বুকে।
অরিন্দমের বয়স আর দুর্বল শরীর সামলাতে পারল না। তিনি পেছনের পাথরের পিলারের ওপর আছড়ে পড়লেন। তাঁর হাতের ট্রাভেল ব্যাগটা হাতঘেঁষে মেঝেতে পড়ে গেল।
চারপাশে একটা হালকা গুঞ্জন উঠল, কিন্তু কেউ অরিন্দমকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না। কারণ মিডিয়া আর সমাজের বিচারে তিনি ইতিমধ্যেই এক ‘দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী’। অপরাধীর গায়ে হাত তোলা সমাজে বীরত্ব বলে গণ্য হয়।
অরিন্দম ধীরে ধীরে ব্যাগটা তুলে নিলেন। চশমাটা সরে গিয়েছিল, সেটা সোজা করলেন। তিনি অয়নের দিকে এক পলক তাকালেন—তাতে রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক অপরিসীম করুণা।
তিনি আর একটি বাক্যও উচ্চারণ করলেন না। কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন নয়।
তিনি ঘাড় নিচু করে ধীর পায়ে অ্যাকাডেমির সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন বাইরের জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে। পেছনে তখনো অয়নের চড়া গলার অপমানজনক চিৎকার আর কলকাতার তথাকথিত ‘সুশীল’ দর্শকদের ফিসফিসানি ভেসে আসছে।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ক্যাথেড্রাল রোডের ওপর আলোর প্রতিফলনগুলো জলের ধারায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ভিজতে ভিজতে অরিন্দম ফুটপাত ধরে এগোতে লাগলেন। ভেতরে প্রেক্ষাগৃহে শিল্পের মঞ্চে এক কলঙ্কিত কবিকে নিয়ে করতালির ঝড় বইছে, আর ঠিক তার কয়েক পা বাইরে, বাস্তব জীবনের এক নিগৃহীত মানুষ নিঃশব্দে মিশে যাচ্ছে কলকাতার বৃষ্টি ভেজা কালচে অন্ধকারের মধ্যে।
ওঅধ্যায় ২৯: রিয়ার বাবার দরবারে
বালিগঞ্জের ফার্ন রোডের গলিটা বিকেলেও বেশ নিঝুম। পুরনো রোদ মেহগনি আর মেঝের মার্বেলের ওপর এসে ধোঁয়াটে এক হলুদ আলো তৈরি করেছে। বাইরের রাস্তা থেকে হর্নের শব্দ বা ট্রামের ঠনঠন আওয়াজ এখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন কয়েকটা দেওয়াল ডিঙিয়ে ভারী ও নিস্তেজ হয়ে আসে।
অভিজাত অট্টালিকার প্রশস্ত ড্রয়িংরুমটিতে এক ধরনের প্রাচীন ও হিমশীতল নীরবতা জমে ছিল। উচু সিলিং, দেয়ালজুড়ে ঝুলছে পুরনো কিছু অয়েল পেইন্টিং আর ফ্রেমে বাঁধানো আবছা ছবি। মেহগনি কাঠের ভারী সোফায় বসেছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। তাঁর পরনে কলার-অংশ ঈষৎ মলিন হয়ে যাওয়া সুতির ফতুয়া, গালের দু-পাশে তিন-চার দিনের না-কামানো খসখসে সাদা-কালো দাড়ি, পায়ে ধুলোলাগা পুরনো চামড়ার জুতো। এই পরিচ্ছন্ন, সুবিন্যস্ত ঘরটির মাঝখানে নিজেকে তাঁর এক টুকরো বিজাতীয় নোংরা কাপড়ের মতো মনে হচ্ছিল।
কয়েক মিনিট আগে পরিচারক তাঁকে এই ঘরে বসিয়ে রেখে ভেতরে চলে গেছে। অরিন্দমের দুই হাতের তালু ঘামছিল। তিনি হাঁটুর ওপর হাত দুটো চেপে বসে রইলেন।
একটি ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। মৃদু নূপুর বা হালকা চটির শব্দ পেয়ে অরিন্দম মাথা তুললেন।
ভেতরে ঢুকল চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে। রিয়ার ছোট বোন। তার পরনে হালকা রঙের সুতির শাড়ি, পিঠের ওপর ভিজে চুলের কিছুটা ছড়ানো, মনে হয় এইমাত্র স্নান সেরে উঠেছে। সোপ আর ভিজে চুলের এক ধরনের তাজা সুবাস ঘরের ভারী বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। হাতে একটি কাঁচের ট্রে, তাতে এক গ্লাস জল।
মেয়েটি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেহগনি কাঠের নিচু টি-টেবিলটার ওপর জলের গ্লাসটা রাখল। ঝুঁকতেই তার গলার কাছের খোলা চামড়া, চিবুকের নিচের মসৃণ অংশ আর ভিজে চুলের কয়েকটা গোছা ভিজে শাড়ির ওপর দিয়ে ঝুলে পড়ল। টেবিল থেকে হাত তোলার সময় মেয়েটি এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার বড় বড় কালো চোখ দুটো কৌতুহলী আর সামান্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অরিন্দমের উস্কোখুস্কো চেহারার দিকে তাকাল—যেন সে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করছে সেই প্রবীণ অধ্যাপককে, যাঁর নাম ঘিরে তাদের পরিবারে এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে গেছে।
ঠিক সেই এক সেকেন্ডের জন্য—এক অতিক্ষুদ্র ভগ্নাংশে—অরিন্দমের চোখের দৃষ্টি আটকে গেল মেয়েটির গলার চামড়া আর ব্লাউজের উন্মুক্ত সীমারেখায়।
শরীরের গভীরে কোথাও এক সুপ্ত, আদিম উত্তাপ ঝলসে উঠল। রক্তস্রোতে ধেয়ে এলো সেই পুরনো লোলুপতা—যে অন্ধ প্রবৃত্তি তাঁকে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর থেকে, সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
পরমুহূর্তেই যেন বজ্রপাত হলো তাঁর চেতনার ভেতর।
এক তীব্র, বমি-আনা স্বঘৃণায় অরিন্দমের শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল। তাঁর নিজের ভেতরের এই পশুটো এখনো মরেনি? এই ধুলোয় মেশা পতনের পরও, ক্ষমা চাওয়ার এই পবিত্র ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়েও তাঁর দৃষ্টি এমন কামজ হতে পারে? চরম আত্ম-ধিক্কারে তিনি দ্রুত চোখ বন্ধ করে নিলেন। তাঁর কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো। তিনি মাথা নিচু করে নিলেন মাটির দিকে, যেন নিজের অস্তিত্বটাকেই মেঝেতে গুঁড়িয়ে দিতে চান।
মেয়েটি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার থমথমে হয়ে উঠল।
"জলটা খান অরিন্দমবাবু।"
একটি গম্ভীর, নিচু কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট গলা কাঁচের মতো ভেসে এলো ঘরের এক কোণ থেকে।
অরিন্দম চোখ খুললেন। উল্টোদিকের সিঙ্গেল-সিটার সোফায় এসে বসেছেন রিয়ার বাবা—অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ভাস্কর সেন। সত্তরের কাছাকাছি বয়স, ধবধবে সাদা চুল আঁচড়ানো, পরনে ধুতি আর ঢিলেঢালা সুতির পাঞ্জাবি। তাঁর মুখে কোনো উত্তেজনার চিহ্ন নেই, কপালে কোনো ভাঁজ নেই। কেবল চোখ দুটোয় এক গভীর, নিরুদ্বেগ ও নির্মম স্থিরতা।
অরিন্দম জলের গ্লাসের দিকে তাকালেন না। তিনি সোফা থেকে সামান্য এগিয়ে এসে দু-হাত জোড় করলেন। তাঁর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে যাচ্ছিল।
"আমি... আমি এখানে কোনো তর্ক করতে আসিনি ভাস্করবাবু," অরিন্দম খুব নিচু, ভাঙা গলায় বললেন। "আমি শুধু আপনার কাছে... আর রিয়ার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।"
ভাস্কর সেন কোনো কথা বললেন না। তিনি টেবিলের ওপর থেকে গ্লাসটি তুলে নিয়ে খুব ধীরে ধীরে এক চুমুক জল খেলেন। তারপর গ্লাসটি আবার যথাস্থানে রেখে সোফার হেলান দিয়ে বসলেন।
"ক্ষমা?" ভাস্কর সেন শব্দটা উচ্চারণ করলেন যেন কোনো অপরিচিত আইনি পরিভাষা উচ্চারণ করছেন। "আপনি আমার কাছে কেন ক্ষমা চাইতে এসেছেন অরিন্দমবাবু?"
"আমি অপরাধী," অরিন্দম মাথা নাড়িয়ে বিড়বিড় করলেন। "রিয়ার কেরিয়ার, তার মানসিক শান্তি, তার সম্মান—সবকিছু আমি নষ্ট করেছি। আমার নিজের আভিজাত্য আর অহংকারের কারণে আমি যা করেছি, তার কোনো সাফাই নেই। আমি... আমি এই অপরাধবোধের বোঝা আর একা বইতে পারছি না। রাতে ঘুমাতে পারি না ভাস্করবাবু।"
ভাস্কর সেন অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চেহারায় কোনো ক্রোধ বা আক্রোশ ফুটে উঠল না। ফুটে উঠল এক গভীর, অনুকম্পাহীন করুণা।
"আপনি ঘুমাতে পারছেন না, তাই ক্ষমা চাইতে এসেছেন?" ভাস্কর সেন শান্ত গলায় বললেন। "অর্থাৎ, আপনার এই আসাটা রিয়ার জন্য নয়, আপনার নিজের সুবিধার জন্য। আপনি চান আমি আপনাকে বলি—'ঠিক আছে অরিন্দমবাবু, আপনাকে ক্ষমা করলাম'—আর আপনি এখান থেকে বেরিয়ে একটা হালকা মন নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। তাই তো?"
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কথাগুলো তাঁর বুকে তীক্ষ্ণ সুরার মতো গিয়ে বিঁধল।
"না... আমি তা বলছি না..." অরিন্দম থতমত খেয়ে বললেন।
"আপনি ঠিক সেটাই বলছেন," ভাস্কর সেন বাধা দিলেন না, কিন্তু তাঁর কথার ওজন ঘরটার বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। "পাপ করার সময় মানুষ নিজের আনন্দের হিসাব করে, আর ধরা পড়ার পর সে অন্যের কাছে গিয়ে পাপমুক্তির পথ খোঁজে। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে এক অসহায় ছাত্রীকে প্রলুব্ধ করেছিলেন। তার গ্রেড জাল করেছেন। তাকে অপমান করেছেন। আর এখন রিটায়ার্ড জজের ড্রয়িংরুমে এসে হাতজোড় করে ভাবছেন কাজটা চুকে গেল?"
"আমি শাস্তি পেতে প্রস্তুত ভাস্করবাবু," অরিন্দম করুণ চোখে তাকালেন। "বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বরখাস্ত করেছে, সমাজ আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে..."
"সেটা তো বাইরের শাস্তি অরিন্দমবাবু," ভাস্কর সেন সোজা হয়ে বসলেন। "আইন বা বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে যে শাস্তি দিয়েছে, সেটা সমাজের হিসাব মেটানোর জন্য। কিন্তু আপনার ভেতরের যে পচন... যে কলঙ্ক আপনি নিজের রক্তে বহন করছেন... সেটাকে ধোবে কে? আমি ক্ষমা বললেই কি সেটা ধুয়ে যাবে?"
অরিন্দম নীরব হয়ে রইলেন। তাঁর মুখে কোনো ভাষা ছিল না।
"আমি কোনো ঈশ্বর নই, আর আপনিও কোনো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নেই," বৃদ্ধ বিচারক খুব সাধারণ গলায় বললেন। "আপনার 'ডিসগ্রেস' বা কলঙ্ক আপনাকে একাই বইতে হবে অরিন্দমবাবু। সারাজীবন। অন্যের ঘরে এসে অনুশোচনার নাটক করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার এই সস্তা চেষ্টা বন্ধ করুন। পাপের কোনো সহজ প্রাশ্চিত্ত হয় না। সেই বোঝা নিজেকেই বয়ে নিয়ে যেতে হয় শেষ দিন পর্যন্ত।"
ভাস্কর সেন আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তাঁর দীর্ঘদেহী ছায়াটা ঘরের মার্বেলের মেঝের ওপর গিয়ে পড়ল।
"রিয়া এখন এই বাড়িতে নেই, সে অন্য শহরে নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছে। আপনি আর কখনো এই বাড়ির চৌকাঠে পা দেবেন না। জলটা শেষ করে আপনি আসতে পারেন।"
বৃদ্ধ আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ভেতরের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। দরজার ভারী মেহগনি পার্টটা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
অরিন্দম সোফায় একাই বসে রইলেন।
সামনের টেবিলের ওপর কাঁচের গ্লাসের জলটা তেমনি জমে আছে। বালিগঞ্জের সেই প্রাচীন, নীরব ড্রয়িংরুমটা তাঁর কাছে এক পরম শান্ত কিন্তু নিরুদ্বেগ আদালতের মতো মনে হতে লাগল—যেখানে বিচার শেষ হয়ে গেছে, সাজাও ঘোষণা হয়ে গেছে, কিন্তু কোনো কারাগার নেই, কোনো মুক্তিও নেই। কেবল নিজের কলঙ্কিত অস্তিত্বের ভেতর নিজেকেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে, জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত।
অধ্যায় ২৯
শেফালী দের মৃত্যু প্রোমোটার রাজ
সোদপুরের পূর্বপল্লীর গলিটায় আজ সকাল থেকেই বাতাসের স্বাদ বদলে গেছে। বাতাস লাল ইটের গুঁড়ো, মেঝের মেঝের চুনের ধুলো আর বহুকালের পোড়াকাঠের গন্ধ নিয়ে এক ধরনের আইঁশটে ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে।
হলুদ রঙের একটা বিকট আকৃতির জেসিবি মেশিন গর্জাতে গর্জাতে শেফালী দের পঁচাত্তর বছরের পুরোনো দোতলা বাড়িটার সামনের দেওয়ালটায় ধাক্কা মারল। কড়কড় ধাতব শব্দ আর ঝুরঝুর করে লাল ইটের টুকরো খসে পড়ার মধ্য দিয়ে বাড়িটার সদর বারান্দার খিলানটা ধুলোর মেঘ তৈরি করে ভেঙে পড়ল। রাস্তার ধারের নিমগাছটার ওপর জমে থাকা ধুলো উড়ে এসে পাশের নর্দমার কালো জলে আছড়ে পড়ল।
ঘণ্টা পাঁচেক আগেও বাড়িটার ভেতরে শেফালী দের নিথর দেহটা রাখা ছিল। শেষরাতে, যখন পুরো সোদপুর ঘুমিয়েছিল, তখন শেফালী দের বুকের বাম দিকটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠেছিল। গত তিন মাস ধরে রাতের পর রাত এসে ঘরের কড়া নাড়া, "মাসিমা, দলিলের সইটা করে দিন, ভালোয় ভালোয় বুঝে নিন", দরজার ফাঁক দিয়ে লেখা চিরকুট ফেলে যাওয়া, আর ক্লাবের ছেলেদের হুমকি—সব মিলিয়ে পঁচাত্তর বছরের একটা পুরোনো হৃদপিণ্ড আর কতদিন সহ্য করতে পারে? ভোর চারটে নাগাদ সব নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কাঁচরাপাড়া থেকে সকাল সাড়ে ছটায় শেফালী দের ভাইপো রুদ্র এসে পৌঁছায়। কিন্তু শ্মশানে চিতার আগুন নিভতে না নিভতেই, শেফালী দের শ্রাদ্ধশান্তির অপেক্ষা না করে, সাড়ে এগারোটার মধ্যে গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে ওই হলুদ জেসিবি।
রাস্তার ওপারে, নীলয় দত্তের বন্ধ ওষুধের দোকানের শেডের নিচে কাঠের বেঞ্চিটায় বসেছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
তাঁর পরনে একটা খসখসে সাদা সুতির ফতুয়া। সামনের কপালে কাঁচা-পাকা চুলগুলো উস্কোখুস্কো। ইটের গুঁড়ো আর ধুলোর এক সুক্ষ্ম আস্তরণ ইতিমধ্যেই তাঁর কাঁধে, চুলে আর চোখের লেন্সের ওপর জমা হয়েছে। তিনি চশমাটা খুললেন না। আবছা লেন্সের ওপারে জেসিবি-র লোহার হাতলটার ওঠানামা দেখতে দেখতে তিনি অনুভব করছিলেন—একটা শহরের ইতিহাস ঠিক এভাবেই কয়েক ঘণ্টার আয়োজনে ধুলোয় মিশে যায়।
রুদ্র পকেট থেকে এক প্যাকেট দামি সিগারেট বের করে একটা ধরাল। তার মুখে বিজয়ের হাসি, গায়ে নতুন একটা সুতির শার্ট। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে ধীর পায়ে রাস্তা পার হয়ে অরিন্দমের দিকে এগিয়ে এলো।
"চা খাবেন স্যার?" রুদ্র বেশ খাতির দেখানোর ভঙ্গিতে বলল।
অরিন্দম মুখ তুললেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি রুদ্রর চকচকে জুতোর ওপর গিয়ে থামল, যার ওপর কিছুটা লাল ধুলো জমেছে।
"না," অরিন্দম খুব শান্ত, নিচু স্বরে বললেন। "শেফালীদির ভাইপো তো তুমি, তাই না?"
"হ্যাঁ স্যার," রুদ্র একটু হাত নেড়ে অবহেলার ভঙ্গিতে বলল। "পিসি তো একলা মানুষ ছিলেন। পিসেমশাই মারা যাওয়ার পর থেকেই জঞ্জাল জমিয়ে রেখেছিলেন এই সাত কাঠা জমিতে। পুরোনো বাড়ি, নোনা ধরা দেওয়াল, কাঠের দরজা শুকিয়ে কাঠ। কোনো মানে হয় বলুুন? পিসিকে আমি বহুবার বলেছি—কোলকাতায় এসে আমার কাছে থাকো, এই পোড়া জমি প্রোমোটিংয়ে দিয়ে দাও। শুনলই না। শেষ পর্যন্ত তো এই মাঠেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলল।"
জেসিবি-র বিশাল লোহার থাবাটা তখন শেফালী দের শোয়ার ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালার ফাঁকটায় গিয়ে বিঁধেছে। ওপরে কাঠের ফ্রেমটা মড়মড় করে ভেঙে নিচে খসে পড়ল। ঘরের ভেতরে থাকা একটা পুরোনো কাঠের আলমারির কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ বাইরে থেকেও স্পষ্ট শোনা গেল।
অরিন্দম জানালার সেই ভাঙা ফাঁকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "ওই ঘরে শেফালীদি পঁচাশির বন্যায় পুরো জল জমে যাওয়ার পর তাঁর পিসেমশাইয়ের আঁকা ছবিগুলো উঁচু কুলঙ্গিতে তুলে রেখেছিলেন। গত মাসেও আমাকে ডেকে দেখিয়েছিলেন।"
রুদ্র একগাল হাসল। সে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা সুগন্ধি রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছল।
"ইতিহাস দিয়ে তো আর পেট ভরে না স্যার," রুদ্র বেশ পাকা জজের মতো গলায় বলল। "পিসির ওই পুরোনো আঁকা ছবি আর ভাঙা কুলঙ্গি দিয়ে সোদপুরের ট্যাক্স মেটানো যাচ্ছিল না। এখানে এখন দশতলা আবাসন হবে। প্রাইম লোকেশন। হাইওয়ে থেকে হাঁটা পথ। ৯০ লাখ টাকা ২BHK ফ্ল্যাট। বুকিং শুরু হয়ে গেছে অলরেডি। তিন মাসের মধ্যে ফাউন্ডেশনের কাজ শেষ হবে।"
অরিন্দম সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর বুড়ো আঙুল দুটো ফতুয়ার পকেটে গিয়ে আটকে গেল।
"আবাসন তো হবে রুদ্র," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে, সমান্তরাল এক টোনে বললেন, "কিন্তু মানুষের থাকার মতো জায়গা কবে হবে এখানে?"
রুদ্র এক মুহূর্ত থামল। সে অরিন্দমের মুখের দিকে তাকাল, যেন বুঝতেই পারল না অরিন্দম কোনো কৌতুক করলেন নাকি তাকে ব্যঙ্গ করলেন। তারপর চটাং করে হেসে উঠল।
"আপনি বড্ড কবিমানুষ স্যার! কলেজে সাহিত্য পড়াতেন তো, তাই জীবনের হিসেবটা এখনও পদ্যের মতো দেখেন," রুদ্র সিগারেটের ছাইটা টিপে ফেলে বলল। "মানুষের থাকার জায়গা মানে কী? চারটে দেওয়াল, মাথার ওপর ছাদ, মার্বেলের মেঝে আর ২৪ ঘণ্টা জল-বিজলি। এর বেশি মানুষ আর কী চায় বলুন তো? মানুষ কি আর শেফালী পিসির মতো পুরোনো দিনের ভূত হয়ে বেঁচে থাকতে চায়?"
অরিন্দম উত্তর দিলেন না। তিনি দেখতে পেলেন, শেফালী দের বাড়ির ভাঙা ছাদটার একটা অংশ থেকে একজোড়া কালো শালিক উড়ে গিয়ে পাশের মরা নিমগাছটার ডালে গিয়ে বসল। জেসিবি-র চালক ছেলেটি বিড়ি টানতে টানতে ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে দিল। আবার এক ঝাঁক ইটের গুঁড়ো বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ল।
সুমিত ঘোষ—স্থানীয় ক্লাবের সম্পাদক—বাইক নিয়ে গলির মুখে এসে থামল। হেলমেটটা বাইকের ওপর রেখে সে সোজা রুদ্রর দিকে এগিয়ে এলো।
"রুদ্রদা, লেবারদের পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কিন্তু পেছনের ড্রেনের অংশটা ভাঙার সময় মল্লিকদের সাথে একটু ঝামেলা হতে পারে। ওরা বলছে ড্রেনটা ওদের সিমানায় পড়ে," সুমিত বলল।
"মল্লিকদের গিয়ে বলো দেড় লাখ টাকার চেকের যে কথাটা হয়েছিল, সেটা কালকের মধ্যে ক্লিয়ার হয়ে যাবে," রুদ্র শান্ত গলায় নির্দেশ দিল। "ঝামেলা বেশি করলে থানার বড়বাবুকে একটা ফোন ঘুরিয়ে দিতে বোলো। আজ সন্ধ্যার মধ্যে পুরো ল্যান্ড ক্লিয়ার চাই।"
সুমিত মাথা নাড়ল। তারপর অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে একটু কৃত্রিম সৌজন্যের হাসি হাসল। "অরিন্দমদা, আপনি এই ধুলোর মধ্যে বসে আছেন কেন? শরীর খারাপ করবে তো।"
"আমার শরীর ঠিকই আছে সুমিত," অরিন্দম বললেন। "তোমাদের কাজ তো বেশ দ্রুত এগোচ্ছে।"
"কী করব বলুন স্যার," সুমিত হাতের ঘড়ি দেখল। "সময় কারো জন্য বসে থাকে না। এলাকাটা ডেভেলপ করছে। পুরোনো লোকগুলো চলে যাচ্ছে, নতুন ব্লাড আসছে। সোদপুর এখন আর আগের মতো কলোনি টাউনশিপ নেই, প্রোপার স্যাটেলাইট সিটি হতে চলেছে।"
"নতুন ব্লাড..." অরিন্দম বিড়বিড় করলেন। "আর পুরোনো রক্তগুলোকে তোমরা এই কনক্রিটের ঢালাইয়ের নিচে পুঁতে দিচ্ছ, তাই তো?"
সুমিত একটু অসন্তুষ্ট হয়ে অরিন্দমের দিকে চাইল। "আপনি বড্ড নেগেটিভ ভাবেন স্যার। শেফালী পিসি মারা গেছেন তাঁর বয়সে। এখানে প্রমোটিং না হলেও উনি একদিন মারা যেতেন। আমরা তো বরঞ্চ জমিটাকে একটা কাজে লাগাচ্ছি।"
অরিন্দম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাঁটুর জোড়ায় একটা মৃদু মড়মড় শব্দ হলো। ফতুয়ার কোণ থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে তিনি ভাঙা বাড়িটার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
বাড়িটার এককালের ঠাকুরঘরের দেওয়ালটা এখন অর্ধেক ঝুলে আছে। লাল সিমেন্টের তৈরি পুরোনো মেঝের ওপর শেফালী দের ব্যবহৃত একটা পিতলের প্রদীপের তলা ভাঙা টুকরো পড়ে আছে। ধুলোর চাদরে ঢেকে গেছে পুরোটা।
অরিন্দম অনুভব করলেন, এটি কেবল শেফালী দের মৃত্যু নয়, এটি তাঁর নিজের প্রজন্মের নিঃশব্দ বিলুপ্তি। যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গুরুত্ব ফুরিয়ে গেছে, যেভাবে তাঁর মেয়েকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি, যেভাবে বালিগঞ্জের অভিজাত দরবারে তিনি কলঙ্কিত হয়ে বিতাড়িত হয়েছেন—ঠিক সেভাবেই সোদপুরের এই পুরোনো ইট-কাঠ-পাথরগুলোও সমাজের নতুন ধিক্কার আর ক্যাপিটালিস্ট লোলুপতার সামনে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
"রুদ্র," অরিন্দম পেছন ফিরে না তাকিয়েই ডাকলেন।
"বলুন স্যার," রুদ্র দূর থেকে সাড়া দিল।
"তোমার ওই ৯০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে যখন নতুন মানুষগুলো এসে থাকবে... তারা কি জানবে এই মাটির তিন ফুট নিচে একটা পঁচাত্তর বছরের পুরোনো মেয়ের দীর্ঘশ্বাস জমে আছে?"
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর সে আবার একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে হালকা গলায় বলল, "ফ্ল্যাটের ব্রোশারে ওসব কথা লেখা থাকে না স্যার। সেখানে লেখা থাকে—প্যাসেঞ্জার লিফট, পাওয়ার ব্যাকআপ আর ২৪ ঘণ্টা সিকিউরিটি।"
অরিন্দম আর কথা বাড়ালেন না। তিনি ধীর পায়ে গলিটা ধরে সোদপুর স্টেশনের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। তাঁর পিঠের পেছনে তখনো জেসিবি-র বিকট ধাতব গর্জন আর ইট ভাঙার একটানা শব্দ কানের পর্দায় আঘাত করে যাচ্ছিল।
সোদপুর শহরটা তাঁর চোখের সামনেই ধুলো আর কনক্রিটের এক গোলকধাঁধায় রূপ নিচ্ছিল—যেখানে স্মৃতির কোনো মূল্য নেই, যেখানে কলঙ্ক আর আভিজাত্য—দুটোই ৯০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটের দলিলের নিচে ঢাকা পড়ে যায়।
অধ্যায় ৩০
: প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাবর্তন
শিয়ালদহ উত্তর শাখার রাতের লেট ট্রেনটা যখন আগরপাড়া পেরিয়ে সোদপুরের দিকে এগোচ্ছিল, তখন কামরার খোলা জানালার ভাঙা কাঁচের ফাঁক দিয়ে বাতাসের তোড়ে প্রবল বৃষ্টির ছাট আসছিল। ট্রেনের কামরায় যাত্রীর সংখ্যা হাতে গোনা। লোহার সিটে বসে থাকা দু-একজন হকার আর ঝিমোতে থাকা যাত্রী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে।
অরিন্দমের কোটের হাতা ভিজে চামড়ার ওপর লেপ্টে গিয়েছিল। হাত দুটো ঠাণ্ডায় জমে কাঠ। বালিগঞ্জের ফার্ন রোডের সেই সুবিন্যস্ত মেহগনি কাঠের ড্রয়িংরুমের হিমশীতল নীরবতা আর ভাস্কর সেনের নির্মম কথাগুলো এখনো তাঁর কানের পর্দায় একটানা বেজে চলেছে—‘আপনার ডিসগ্রেস আপনাকে একাই বইতে হবে অরিন্দমবাবু। অন্যের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিজের পাপমুক্তির সহজ পথ খুঁজবেন না।’
ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে সোদপুর স্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
প্ল্যাটফর্মের শেড চুইয়ে জল পড়ছে। কালো অ্যাসবেস্টসের ছাদ থেকে নোংরা জলের ফোটা মেঝের কাদা-জলে মিশে ছোট ছোট বুদ্বুদ তৈরি করছে। অরিন্দম ধীর পায়ে ট্রেন থেকে নামলেন। তাঁর হাতের পুরোনো ছাতাটার হাতল আলগা হয়ে গেছে; ওপরের কালো কাপড় বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল তাঁর চটের কাপড়ের জুতোর ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছিল। পা দুটো ভিজে ভারি হয়ে উঠেছে।
স্টেশনের কাঠের ওভারব্রিজটার নিচে যেখানে বৃষ্টির ঝাপটা একটু কম, সেখানে এসে অরিন্দম থামলেন। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলেন। তাঁর কাঁপতে থাকা আঙুলে ডায়াল প্যাডে মেঘলার নম্বরটা ভেসে উঠল।
ফোনটা বাজতে লাগল। একবার... দু-বার... তিনবার।
চারপাশের প্ল্যাটফর্মে তখন একঘেয়ে যান্ত্রিক অ্যানাউন্সমেন্ট চলছে—"আটেনশন প্লিজ, শিয়ালদহগামী শান্তিপুর লোকাল..."
চার নম্বর রিংয়ে ওপার থেকে একটি নিরাসক্ত, সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"বলো বাবা।"
অরিন্দম ওভারব্রিজের ভিজে লোহার পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি কয়েকবার ঢোক গিলে নিজের ভাঙা গলাটাকে মেরামত করার চেষ্টা করলেন।
"আমি... আমি বালিগঞ্জে গিয়েছিলাম, মেঘলা," অরিন্দম খুব নিচু, অনুনয়ভরা গলায় বললেন। "রিয়ার বাড়ি... ওদের বাবার কাছে..."
পায়ের কাছে জমা জলে প্ল্যাটফর্মের টিউবলাইটের হলুদ আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। ছাতা থেকে ফোটা ফোটা জল গড়িয়ে গিয়ে সেই আলোটাকে বারবার চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছিল।
ওপার থেকে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর মেঘলার বরফের মতো ঠান্ডা, কাটকাট উত্তর ভেসে এলো।
"কেন গিয়েছিলে?"
অরিন্দম কোনো জবাব তৈরি করে রাখেননি। তিনি বিড়বিড় করলেন, "আমি ক্ষমা চাইতে গিয়েছিলাম... যদি একটু হালকা হওয়া যায়..."
"নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে?" মেঘলার গলায় কোনো ক্ষোভ বা চিৎকার ছিল না, ছিল এক অবিশ্বাস্য দূরত্বের মেকানিক্যাল নির্দয়তা। "নাকি সমাজকে দেখাতে যে তুমি চেষ্টা করেছিলে? একটা প্রাশ্চিত্তের নাটক করে আবার নিজের পুরনো ইগোটাকে বাঁচিয়ে তুলতে চেয়েছিলে, তাই না?"
"মেঘলা... তুমি অন্তত আমার কথাটা একটু বোঝো..."
"আমি তোমাকে বুঝি বলেই বলছি বাবা," মেঘলা বাধা দিল। "তোমার পাপের ব্যবসায় আমাকে বা অন্য কাউকেও অংশীদার বানিও না। যে দাগ তুমি নিজের গায়ে মেখেছ, সেটা মোছার জন্য অন্যের করুণা ভিক্ষা করা বন্ধ করো। নয়ডায় এখন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। পেট্রাস জমি ঘিরছে। বৃষ্টিতে মাটি ধসে যাচ্ছে বলে ওরা রাত জেগে কাজ করছে।"
মেঘলা এক মুহূর্ত থামল। ওপার থেকে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না।
"তুমি না হয় তোমার মৃত বাবা-মায়ের আর আত্মীয়দের আত্মার সঙ্গে সোদপুরেই থাকো বাকি জীবনটা," মেঘলা যোগ করল। "ওটাই তোমার উপযুক্ত জায়গা।"
ফোনটা একতরফাভাবে কেটে গেল। পিপি-পিপি শব্দে যান্ত্রিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর অরিন্দম কিছুক্ষণ কান থেকে ফোনটা সরালেন না।
স্টেশনের বাইরে ঘোলা জলের নর্দমা বেয়ে প্লাস্টিকের নোংরা জমে থাকা জঞ্জাল ভেসে যাচ্ছিল। অরিন্দম মোবাইলটা পকেটে পুরে নিলেন। ক্ষমার কোনো সরল পথ নেই, কোনো ম্যাজিক নেই। ক্ষমা পাওয়াটা আসলে এক ধরনের সস্তা আভিজাত্য বা বিলাসিতা—যা তাঁর মতো পতনের শেষ ধাপে পৌঁছে যাওয়া মানুষের জন্য বরাদ্দ নয়।
ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই সোদপুর পূর্বপল্লীর গলি ধরে ধীর পায়ে হেঁটে অরিন্দম এসে দাঁড়ালেন তাঁদের পৈতৃক বাড়ি 'অপরাজিতা'-র লোহার গেটের সামনে।
বহুকালের পুরোনো ক্ষয়িষ্ণু ভিটে। এককালের একতলা বুনিয়াদ আর নোনা-ধরা দেওয়াল বেয়ে বুনো লতা উঠে গেছে। দরজার কাঠের কবাট জোড়া আর্দ্রতায় ফুলে উঠে জমে গেছে। অরিন্দম পকেট থেকে মোচে-ধরা চাবি বের করে তালাটা খুললেন।
ভেতরে ঢুকতেই এক অতল, হিমশীতল অন্ধকার আর পুরোনো স্যাঁতসেঁতে ইটের ভ্যাপসা গন্ধ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল। বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। বিকেলের ঝড়ে বোধহয় স্থানীয় ট্রাস্ফর্মারে ফিউজ উড়ে গেছে।
অরিন্দম শোয়ার ঘরের কাঠের পুরনো টি-টেবিলের ওপর থেকে একটা দেশি মদের বোতল আর আধভাঙা কাঁচের গ্লাস তুলে নিলেন। ঘরের ছাদের একটা কোণ চুইয়ে ফোটা ফোটা বৃষ্টির জল টিনের বালতির ওপর পড়ছিল—টুপ... টুপ... টুপ...।
তিনি মেঝের ওপর বসে পড়লেন। নোনা-ধরা মেঝেও বৃষ্টির আর্দ্রতায় চটচট করছে।
বোতলের ছিপিটা খুলে সরাসরি কাঁচের গ্লাসে ঢাললেন কিছুটা তরল। কোনো জল বা বরফ ছাড়া এক চুমুকে সেটা গলায় ঢেলে দিতেই বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে তীব্র জ্বালায় জ্বলে উঠল। সেই শারীরিক অস্বস্তির ভেতরেই তিনি যেন নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ পেলেন।
ঘরের কোণে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে উঠছে। দেয়ালের গায়ে ঝুলছে তাঁর বাবা-মায়ের বহু পুরোনো এক ফ্রেমে বাঁধানো আবছা ছবি। কাঁচের ওপর ধুলো আর জলীয় বাষ্প জমে ছবি দুটোকে পুরোপুরি ঝাপসা করে দিয়েছে।
অরিন্দম হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসলেন।
তিনি অনুধাবন করলেন, জীবন থেকে সমস্ত অলঙ্কার, সমস্ত কবিতা, সমস্ত শিক্ষকতার আভিজাত্য ঝরে পড়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে—তা হলো স্রেফ নির্ভেজাল এক নিঃসঙ্গতা। এই সোদপুরের ভিটে, এই জলপড়া ছাদ, এই অন্ধকারে ঢাকা পুরোনো আসবাবপত্র—সবকিছুই এখন তাঁর অস্তিত্বের ভাগীদার। যা ঘটে গেছে, তার দায় অন্য কারো কাঁধে চাপানো যাবে না; অন্যকে সাক্ষী রেখে ক্ষমা প্রার্থনার বা পাপমুক্তির অভিনয় কেবল ভণ্ডামি। এই 'ডিসগ্রেস' বা কলঙ্ক তাঁকে নিঃশব্দে, পরম একাকীত্বে বইতে হবে জীবনের শেষ স্টেশনটি পর্যন্ত।
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। সোদপুর শহরের নিঃসঙ্গ আঁধারে 'অপরাজিতা' বাড়িটি এক ধ্বংসাবশেষের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অধ্যায় ৩১: পশুর গন্ধ ও কামের নির্জনতা
সোদপুরের রেললাইনের ওপর দিয়ে একটা মালগাড়ি দীর্ঘ সিটি বাজিয়ে পার হয়ে গেল। সেই বিকট ধাতব শব্দে ঘরের কোণে মেঝের কাচের বোতলগুলো হালকা করে কেঁপে উঠেছিল। সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার তখন সোদপুরের পূর্বপল্লীর সরু গলিগুলোতে ঝুপ করে নেমে এসেছে।
প্রাণী কল্যাণ কেন্দ্রের পেছনে পশুচিকিৎসক মাধবী পালের থাকার তিনতলা পুরোনো বাড়ির একতলা ঘরটাতে আলোর নামগন্ধ নেই। কেবল একপাশে টিমটিমে একটা পিতলের প্রদীপ জ্বলছিল, যার আলো ঘরের অন্ধকারকে তাড়ানোর বদলে আরও যেন রহস্যময় ও গাঢ় করে তুলছিল। স্যাঁতসেঁতে টাইলসের মেঝের কোণ থেকে কাঁচা ফিনাইল, গাঢ় স্পিরিট, ডেটল আর পাশের ঘরের খাঁচায় বন্দি অসুস্থ কুকুরগুলোর গায়ের একরকম কিটকিটে, বাসি পশুর গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
ঘরের এককোণে পুরোনো মেহগনি কাঠের একটা আর্মচেয়ারে বসেছিলেন অরিন্দম। তাঁর কপালের সেলাইয়ের কালচে দাগটা কম আলোর মধ্যে আরও গাঢ় আর কুৎসিত দেখাচ্ছিল। চশমাটা টেবিলের ওপর পড়ে থাকায় তাঁর চোখের চারপাশের চামড়া ঝুল ঝুল করছিল, পরনের শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খোলা। মাথার ভেতরে যে দীর্ঘদিনের একঘেয়ে ক্লান্তি আর অপরাধবোধ জমা হয়েছিল, তা এই কাঁচা ফিনাইল আর পশুর গন্ধে আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
কাচের আলমারির দরজাটা বন্ধ করলেন মাধবী। বোতল আর কাঁচির ঠকঠক শব্দ থেমে যেতেই ঘরটা আচমকা যেন নিঝুম হয়ে গেল।
মাধবী নিজের গায়ে জড়ানো সবুজ রাবারের এপ্রনটার বেল্ট খুললেন। হাত দুটো পেছনে নিয়ে একঝটকায় ওটা গা থেকে নামিয়ে একটা কাঠের চেয়ারের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। পরনের সুতির শাড়ির আঁচলটা ইতোমধ্যে বুকের ওপর থেকে খসে নিচে মেঝের ওপর পড়ে গিয়েছিল, তিনি সেটা তোলার সামান্যতম তোয়াক্কাও করলেন না। তাঁর সুতির ব্লাউজের আলগা ফাঁক দিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী এক প্রৌঢ়া শরীরের মেদ, পেট ও নাভির গভীর ভাঁজ আর ঝুলে যাওয়া বুক দুটো প্রদীপের টিমটিমে আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে উঠল। চোখের নিচে গভীর কালি, থুতনির নিচে চামড়া সামান্য ঝুলে পড়েছে। মাধবী ধীরহাতে নিজের ব্লাউজের বোতামগুলোও এক এক করে খুলে দিলেন অরিন্দমের দিকে পেছন ফিরে। ব্লাউজটা আগে খুলে ফেললেন।
মাধবী ধীরপায়ে হেঁটে এসে অরিন্দমের ঠিক মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। কোনো তড়িঘড়ি নেই, কোনো লাজুক ভঙ্গিমাও নেই।
"চা খাবেন কী, অরিন্দম?" মাধবীর গলাটা শুকনো, কিছুটা কর্কশ শোনালো।
অরিন্দম ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। চশমাটা না থাকায় মাধবীর অবয়বটা তাঁর কাছে খানিকটা অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। কিন্তু সেই অস্পষ্টতার ভেতরেও মাধবীর শরীরের রূঢ় ও নগ্ন উপস্থিতিটা তাঁর চামড়ায় গিয়ে বিঁধছিল।
"না," অরিন্দম খুব নিচু স্বরে জবাব দিলেন।
"তাহলে রাতে বাড়ি না গিয়ে এখানে বসে আছ কেন?" মাধবী সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকালেন। দুটো হাত নিজের চওড়া কোমরে রাখা। "নয়ডার খবর তো সবই শুনলাম। মেয়েকে ওখানকার খামারবাড়িতে ফেলে রেখে আপনি এখানে এই পশুর খাঁচার পাশে এসে বসে আছেন... আমার কাছে ঠিক কী চাও তুমি বলবে কী?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তাঁর শুকনো ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপল মাত্র, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
মাধবী আরও একপা এগিয়ে এলেন। তাঁর শাড়ির সায়া আর কাঠের মেঝের ঘর্ষণে একটা খসখসে শব্দ হলো।
"তুমি কি আমার শরীরকে চাও, অরিন্দমবাবু?" মাধবী সরাসরি তাঁর মুখের ওপর প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন। গলায় না আছে কোনো লালসা, না কোনো কৃত্রিম লজ্জা। "এখনও কিন্তু আমার সবকিছুই মোটামুটি সজীব আছে। আর আমারও তো দরকার হয় মাঝে মধ্যে কোনো পুরুষের হাতের স্পর্শ। আমি জানোয়ারের ডাক্তার হলেও মেয়েছেলের শরীর তো বটে আমার, নাকি? এরও ক্ষিদে পায়। ইচ্ছে করে আদর পেতে।"
অরিন্দম চেয়ারের হাতলটা দুটো হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন।
মাধবী মুখটা একটু বাঁকালেন, তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত তিতকুটে হাসি ফুটে উঠল। "আমাকে করতে চাও তো এসো? আমি কিন্তু সব দিক থেকেই প্রস্তুত। নাকি নিজের পতন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ক্যান্ডাল আর মেয়েকে রক্ষা করতে না পারার অপরাধবোধ ভুলে থাকার জন্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত কুকুরগুলোর মতো কোনো মহিলার কোলে তুমি আশ্রয় খুঁজছ? কোনটা বল তো? আজকালকার পুরুষদের তো আবার কত রকমের ঝকমারি। এখনতো শুনি যুবক বয়সেই নাকি সবাই প্রায় ইরেকটাইল ডিসফাংশনে ভোগে। কেন সেটা জানি না। দাঁড়াতেই চায় না সহজে মেয়েমানুষের কাছে। আমার হাজবেন্ডেরও ছিল... সহজে কিছু হতো না। কত ওষুধ, মালিশ, কত ডাক্তারের চক্কর… কিছুতেই আর কিছু হতো না জানো। পুরুষ মানুষ নাকি তারা?"
অরিন্দম কিছু বললেন না। তিনি চেয়ার ছেড়ে ধীরগতিতে উঠে দাঁড়ালেন। শরীরের ভেতরে এক অচেনা, হিমশীতল শূন্যতা। মাথায় লর্ড বায়রনের কোনো পংক্তি এল না, রিয়া সেনের সাথে কাটানো কোনো বৌদ্ধিক নন্দনতাত্ত্বিক বিকেলকেও মনে পড়ল না। নন্দনতত্ত্ব আর কবিতার সমস্ত রোমান্টিক ঢাকনা যেন এই একতলা ঘরের পশুর গন্ধের সামনে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।
অরিন্দম ধীরহাতে মাধবীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। মাধবীর হাতের তালুটা কাজের চাপে শক্ত, আঙুলের চামড়া খসখসে। সেই হাতে কোনো সুবাস নেই, কেবল অ্যান্টিসেপ্টিক, প্রাণীদের জখমের রক্ত আর আয়োডিনের তীব্র গন্ধ লেগে আছে।
"আমি শুধু একমুহূর্তের জন্য মানুষ হতে চাই না, মাধবী," অরিন্দম অস্পষ্ট গলায় ফিসফিস করে উঠলেন।
মাধবী কয়েক সেকেন্ড তাঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে এক পা এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে অরিন্দমের জামার বোতামে হাত দিলেন।
এক-একটা করে বোতাম খোলার শব্দ কাঁচা ফিনাইলের বাতাসে ভেসে উঠল। অরিন্দমের ৫৮ বছর বয়সের বুকের বার্ধক্যজনিত শিথিল ত্বক, কপালে থাকা ক্ষতের দাগগুলো প্রদীপের আলোয় ফুটে উঠল।
"এসো তো... আর সহ্য হচ্ছে না," মাধবী অরিন্দমের কবজি ধরে টেনে নিজের পুরোনো মেহগনি খাটের বিছানার দিকে নিয়ে গেলেন।
খাটের ওপর পাতা চাদরটা নতুন হলেও, কিছুটা অপরিষ্কার। মাধবী নিজের কোমর থেকে শাড়িটার প্যাঁচ এক টানে খসিয়ে মেঝের ওপর ফেলে দিলেন। তারপর ব্লাউজ ও সায়াটাও খুলে ছুঁড়ে দিলেন দূরে। কোনো অলংকার নেই, কোনো সুন্দর অন্তর্বাস নেই—কেবল নগ্নতা, ক্ষয়ে যাওয়া, মেদবহুল এক প্রৌঢ় শরীর, যা জীবনের বহু ঝড়ঝাপটা সামলে এখনও টিঁকে আছে। নাভির নিচে ওনার ঘন জঙ্গলের মতো কালো লোমের ত্রিভুজ আর সিজার হবার গভীর দাগ।
মাধবী অরিন্দমকে খাটের ওপর আস্তে করে ধরে শুইয়ে দিলেন, মাথার নিচে একটা বালিশও গুঁজে দিলেন। তারপর নিজের হাতেই অরিন্দমের ট্রাউজার্স আর অন্তর্বাস জাঙ্গিয়াটাকে টেনে গোড়ালির নিচে নামিয়ে দিলেন।
মাধবী একমুহূর্ত থামলেন। অরিন্দমের নগ্ন নিম্নাঙ্গের দিকে তাকিয়েই রইলেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত, অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটে উঠল।
"ও মাগো... কী শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গো এটা, এই বয়েসেও!" মাধবী নিজের অস্ফুট গলায় বলে উঠলেন, গলায় এক ধরণের অকৃত্রিম ও রুক্ষ বিস্ময়। "আমি কী করব এখন? এই বয়সে পুরুষদের তো এসব সহজ কথা নয়! আমার হাজবেন্ডের তো দিনরাত কত নাটক হতো... কত দিন পরে দেখলাম।"
অরিন্দম কোনো জবাব দিতে পারলেন না। তিনি কেবল চোখ দুটো বুজে ছাদের কাঠে ধরা ঘুণপোকার শব্দের দিকে কান পেতে রইলেন।
মাধবী অনায়াসে অরিন্দমের তলপেটের ওপর চড়ে বসলেন। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী নারীর ভারী শরীরের ওজন অরিন্দমের বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়ল। পুরোনো মেহগনির খাটটা এক তীক্ষ্ণ, দীর্ঘ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কেঁপে উঠল।
মাধবী নিজের ডান হাতে ধরে নিজের শরীরের ভেতরে অরিন্দমকে গ্রহণ করলেন। তারপর নিজের কোমরে এক নির্দিষ্ট, অভিজ্ঞ ছন্দ তৈরি করলেন। "আমার কিন্তু এই আসনটাই পছন্দের আসন, নয়তো ডগ স্টাইল," মাধবী অস্পষ্টভাবে ফিসফিস করে বললেন। তাঁর মাথার চুলগুলো এসে অরিন্দমের মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ছিল—তাতে কোনো চন্দনের গন্ধ ছিল না, কেবল তীব্র ঘাম আর ওষুধের গন্ধ।
অরিন্দম চোখের পাতা শক্ত করে চেপে ধরে রইলেন। এই শারীরিক মিলনে কোনো স্বর্গীয় আনন্দ ছিল না, কোনো গভীর প্রেমও ছিল না, এমনকি কোনো কামুক উদযাপনও ছিল না। নন্দনতত্ত্বের আড়ালে ঢাকা কামনার চেয়ে এই চরম শারীরিক বাস্তবতার ক্ষুধা অনেক বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। শরীর যখন ক্ষয়ে যায়, তখন কাম আর উদযাপনের বস্তু থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার শেষ খড়কুটো।
এ যেন দুটি একা, নিঃসঙ্গ, সমাজচ্যুত প্রাণীর পচনের বিরুদ্ধে, ক্ষয়ের বিরুদ্ধে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার চরম, রূঢ় ও হিংস্র আর্তনাদ। ঘরের বাইরে খাঁচায় থাকা অসুস্থ কুকুরের একঘেয়ে কুঁইকুঁই শব্দ আর দূরবর্তী ট্রেনের সিটির সাথে খাটের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছিল।
মাধবীর গলার ভেতর থেকে একসময় আস্তে আস্তে রূঢ়, ভারী গোঙানির শব্দ বের হয়ে আসতে লেগেছিল। কোমরের ছন্দে দোলানোর সঙ্গে তাঁর শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে ওঠার পর ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল অরিন্দমের বুকের ওপর।
সবকিছু থেমে যাওয়ার পর, ঘরের বাতাস কেবল দুজনের অনিয়মিত, হাঁপানো শ্বাসে ভারী হয়ে রইল।
মাধবী সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় কিছুক্ষণ অরিন্দমের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে রইলেন। তারপর পাশে সরে গিয়ে খাটের ওপর বিছানায় চিৎ হয়ে শুলেন। তাঁর উরুর ওপর জমাট ভেজা ভেজা ভাবটা মোছার কোনো তোয়াক্কা তিনি করলেন না।
ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাধবী অরিন্দমের কালচে, শুষ্ক ঠোঁটে একটা সোজা ও ভারী চুমু খেলেন।
"জানেন, ও মারা যাবার পর আজ প্রথমবার হলো," মাধবী ছাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন। "খুব ভালো লাগলো। সত্যিই বলছি। অনেক দিন পরে…তো তাই আরকি "
অরিন্দম চোখ খুলে ছাদের দিকে চেয়ে রইলেন। কিছু বললেন না।
মাধবী নিজের এক হাত দিয়ে অরিন্দমের বুকের কাঁচা-পাকা চুলগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, "মাঝে মধ্যে এইরকম হলে আমার অবশ্য কোনো আপত্তি হবে না…শরীর মন ঠিক রাখতে প্রয়োজন ও বটে কি বলুন। তবে সোদপুরের লোকরা যেন টের না পায়। আমার মেয়ে তিস্তা আবার বড্ড নীতিবাগীশ মেয়ে... এসব জানলে সে কেলেঙ্কারি করবে।"
অরিন্দম পাশ ফিরে নিজের একখানা শক্ত, শিথিল হাত মাধবীর তলপেটের মেদের ত্রিভুজের ওপর রাখলেন। সেই স্পর্শ কোনো প্রেমিকের স্পর্শ ছিল না, ছিল না কোনো পণ্ডিতের ভাবালুতা—তা ছিল এক ডুবন্ত মানুষের কাঠকুটো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক চরম, নিঃশব্দ আকুতি। মাধবী নিজের মনেই মুচকি মুচকি হাসলেন। ৫৮ বছরের এই অধ্যাপক লোকটি আজ থেকে যেন তাঁর অবাধ্য আশ্রিত হয়ে গেল।
বাইরে রাতের সোদপুর তখন আরও গভীর অন্ধকারের তলানিতে গিয়ে ঠেকছিল।
অধ্যায় ৩২: ক্ষমতার বিন্যাস ও পেট্রাসের জমি
পূর্বাব্দের কুয়াশা কেটে নয়ডার ওপর রোদটা তখন চড়া হতে শুরু করেছে। বেলা এগারোটা বাজতেই মাথার ওপরের আকাশটা নীলচে রং হারিয়ে ধূসর, রুক্ষ ধারণ করল। খামারবাড়ির সীমানার শেষ মাথায় মেহগনি গাছের সাড়ির কাছে ধুলো উড়ছিল। বাতাস বইলেই শুকনো পাতার খসখস শব্দ আর দূর থেকে আসা কনস্ট্রাকশনের ড্রিল মেশিনের একঘেয়ে ঠকঠক আওয়াজ মেশামেশি হয়ে এক অস্থির আবহ তৈরি করছিল।
বারান্দার সিমেন্টের পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। তাঁর হাতে আধঠান্ডা হয়ে যাওয়া কাঁচের একটা গ্লাস, তাতে লালচে চা। তিনি চোখ ছোট করে মাঠের উত্তর কোণটার দিকে তাকালেন।
সেখানে একটা হাত-লম্বা কাঠের মাপকাঠি আর চুন-মাখানো দড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল পেট্রাস। তার গায়ে নোংরা হয়ে যাওয়া সুতির খাকি শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। মেহগনি গাছের মোটা কাণ্ডের ছালে সে ধারালো পেরেক দিয়ে একটা গভীর খাঁজ কেটে দাগ বসাচ্ছিল। তার ঢালু কাঁধ আর কুচকুচে কালো চামড়ায় রোদের আলো পড়ে এক ধরনের তেলতেলে আভা তৈরি করেছে। সে যেন এই ভিটের বাতাস, ধুলো আর মাটির গন্ধের সাথে একেবারে মিশে গেছে।
কয়েক গজ দূরে, উত্তর কোণের ঢালু জমিতে খামারবাড়ির পুরোনো লাল ট্র্যাক্টরটা চালু অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। পেট্রাস একটু আগেই ট্র্যাক্টর চালিয়ে ওই অংশের মাটি চষে ফেলে নতুন সীমানার চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। অথচ ওই উত্তরের অংশটা ছিল মেঘলার খাস ফলবাগান আর সবজি চাষের প্রস্তাবিত জমি, যার লিজের কাগজ অরিন্দমের নিজের নামে কেনা।
অরিন্দম হাতের চায়ের গ্লাসটা বারান্দার টি-টেবিলে রেখে ধীর পায়ে মেহগনি গাছটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর পুরনো চটির নিচে মেহগনির শুকনো ফল আর শুকনো ডাল ভেঙে যাওয়ার মড়মড় শব্দ হলো।
পেট্রাস সোজা হয়ে দাঁড়াল। পেরেক ঠোকা হাতুড়িটা সে ট্র্যাক্টরটির ট্রেলারের ওপর রাখল। তার মুখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই।
অরিন্দম মেহগনি গাছের খাঁজকাটা দাগটার দিকে আঙুল তুললেন। "এগুলো তো মেঘলার কেনা জমি, পেট্রাস। তুমি উত্তরের অংশটায় ট্র্যাক্টর চালাচ্ছ কেন? আর গাছের গায়ে এ কেমন দাগ কাটছ?"
পেট্রাস পকেট থেকে একটা সুতির নোংরা রুমাল বের করে ঘাড়ের ঘাম মুছল। তার চোখ দুটো রক্তাভ, কিন্তু দৃষ্টি অত্যন্ত স্থির। সে অরিন্দমের মুখের দিকে তাকাল। তার কালো চেহারায় এক ধরনের প্রচ্ছন্ন, নিঃশব্দ তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল—যে তাচ্ছিল্য একজন নিঃস্ব শ্বেতাঙ্গ বা ক্ষমতাচ্যুত শাসকের দিকে নতুন ক্ষমতার অধিকারী ছুঁড়ে দেয়।
"মাটি চষছি প্রফেশর," পেট্রাস নিচু, ভারী গলায় বলল। "জমির একটা সোজা লাইন দরকার। এদিক-ওদিক বাঁকা সীমানা থাকলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না জমিটা কার।"
"লাইন দরকার মানে?" অরিন্দম নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সামান্য কম্পন ধরা পড়ে গেল। "এই জমির পুরো সীমানা পঞ্চায়েতের ম্যাপ অনুযায়ী নকশা করা আছে। রেজিস্ট্রি কাগজে স্পষ্ট সীমানা আঁকা। তুমি নিজের ইচ্ছেমতো উত্তরের বিশ শতক জমি ট্র্যাক্টর দিয়ে চেঁচে ফেলে অন্য লাইন টানতে পারো না।"
পেট্রাস কথা বাড়াল না। সে কোমর থেকে একটা পিতলের বাঁধানো ইঞ্চি-ফিতা বের করল। তারপর মাটিতে কয়েকবার থুথু ফেলল।
"জমি কার হয়, প্রফেশর?" পেট্রাস সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "যে কাগজে সই করে তার? নাকি যে রাত জেগে রাইফেল হাতে পাহারা দেয় তার?"
কথাটা অরিন্দমের বুকে একটা তীক্ষ্ণ ইটের টুকরোর মতো এসে বিঁধল। তিনি এক মুহূর্ত কথা বলতে পারলেন না।
পেট্রাস থামল না। সে কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে অরিন্দমের মুখোমুখি দাঁড়াল। তার গায়ের থেকে পোড়া ডিজেল, ঘাম আর কাঁচা মাটির কড়া গন্ধ আসছিল।
"আপনার তো কলকাতায় সোদপুরে, বিডন স্ট্রীটে বড় বাড়ি আছে," পেট্রাস নিজের হাতের ফিতাটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে শক্ত করল। "অনেক বই আছে আপনার আলমারিতে। কিন্তু এই দিল্লিতে, নয়ডার এই উজাড় কলোনিতে, এই খামারবাড়িতে একটা মেয়ে একা একা কাগজের দলিল হাতে নিয়ে বাঁচতে পারে না। দলিল দিয়ে গুন্ডা ঠেকানো যায় না প্রফেশর।"
অরিন্দম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দূরের একচিলতে ধুলো-ওড়া মেঠো রাস্তার দিকে তাঁর দৃষ্টি চলে গেল।
"এখানে আইনের পুলিশ নেই," পেট্রাস আবার বলতে শুরু করল, তার গলার স্বর এবার আরও বরফশীতল। "কাল রাতেও রাস্তার মোড়ে কলোনির দুটো লোক এসে দাঁড়িয়েছিল। ঈমনরা আবার এলে, কিংবা রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা আবার আগুন দিলে আপনার ওই রেজিস্ট্রি কাগজ এসে আগুন নেভাবে? আমি সীমানা বাঁধছি, কাঠের খোঁটা পুঁতছি, যাতে পুরো গ্রাম জানে—এই জমি এখন আর কোনো অসহায় কলকাতার প্রফেসরের মেয়ের শুধু নয়। এর পেছনে পেট্রাসের হাত আছে।"
অরিন্দম চাইলেন তীব্র প্রতিবাদ করতে। তিনি চাইলেন বলতে যে, টাকাটা তাঁর, মেয়ের নামে জমিটা কেনা, আর পেট্রাস কেবল এখানকার একজন বেতনভোগী কাজের লোক মাত্র। কিন্তু শব্দগুলো তাঁর গলায় এসে আটকে গেল। তিনি অনুধাবন করলেন, এই সোজা বাস্তবতার সামনে তাঁর শিক্ষকতার সমস্ত যুক্তি, আইনের সমস্ত অনুচ্ছেদ আর আভিজাত্যের সাজানো ব্যাকরণ ওই পুরনো মেহগনির শুকনো ছালের মতোই ঠুনকো ও অকেজো।
ঠিক সেই মুহূর্তে বারান্দা থেকে মেঘলা ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। তার সুতির শাড়ির আঁচল মাটিতে খসখস করছিল। তার চোখে কোনো উত্তেজনা ছিল না। সে পেট্রাসের হাতে থাকা ফিতাটার দিকে একবার চাইল, তারপর তাকাল বাবার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে।
"কী হয়েছে বাবা?" মেঘলা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
"ও সীমানা সরাচ্ছে মেঘলা," অরিন্দম মেয়ের দিকে ব্যাকুল চোখে তাকালেন। "উত্তরের লিজ নেওয়া অংশটা ও নিজের মতো করে ঘিরে ফেলছে। ও বলছে কাগজের দলিলের নাকি কোনো দাম নেই।"
মেঘলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর সে মেহগনি গাছের গোড়ার দাগটার দিকে তাকাল, যেখানে পেট্রাস চুন দিয়ে সাদা চিহ্ন একে দিয়েছে।
"পেট্রাস ঠিকই বলছে বাবা," মেঘলা খুব ধীরে ধীরে বলল। "কাগজ দিয়ে সীমানা রক্ষা হয় না। গত মাসে যখন খামারবাড়িতে অ্যাটাক হলো, তখন তো কলকাতার উকিলের রেজিস্ট্রি কাগজটা ড্রয়িংরুমে ড্রয়ারের ভেতরেই রাখা ছিল। ওটা আমাদের বাঁচাতে পারেনি।"
"মেঘলা! তুমি ওকে সমর্থন করছ?" অরিন্দম প্রায় হাহাকার করে উঠলেন। "তুমি নিজের চোখের সামনে নিজের অধিকার অন্য একজনের হাতে ছেড়ে দিচ্ছ?"
"আমি অধিকার ছাড়ছি না বাবা, আমি অধিকারের ভার ভাগ করে নিচ্ছি," মেঘলা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকাল। তার গলায় কোনো হতাশা ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা রাজনৈতিক সমীকরণ। "পেট্রাস জমিটা না ঘিরলে স্থানীয় প্রমোটার আর কলোনির গুন্ডারা কালকেই এসে ঝুপড়ি বানিয়ে বসবে। তখন তুমি কার কাছে যাবে? সোদপুরে গিয়ে থানায় ডায়রি করবে? পেট্রাস এই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ও রক্ত জল করছে। এই জমিতে ও যদি নিজের প্রভাব বিস্তার করে, তবেই আমরা এখানে নিরাপদে ঘুমোতে পারব।"
পেট্রাস আর কোনো কথা বলল না। সে আবার নিজের হাতুড়িটা তুলে নিল। প্রথম কাঠের খোঁটাটা মাটিতে বসিয়ে সে সজোরে আঘাত করল—ঠক! ঠক! ঠক!
প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে কাঠ মাটি ফুঁড়ে গভীরে সেঁধিয়ে যেতে লাগল।
অরিন্দম পেছনের দিকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে এলেন। তাঁর মনে হলো, এই কাঠের খোঁটাগুলো কেবল জমির নতুন সীমানা আঁকছে না, এগুলো তাঁর নিজের অস্তিত্বকে এই খামারবাড়ি থেকে পুরোপুরি উপড়ে বাইরে ফেলে দিচ্ছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি এখন আর এই পরিবারের কর্তা নন, মেয়ের অভিভাবক নন, এমনকি এই জমির মালিকও নন। তিনি স্রেফ নিজেদের লিজ নেওয়া জমিতেই এক অনাহূত, করুণ অতিথি—যার উপস্থিতি কেবল এক অক্ষম স্মৃতি হিসেবে জমে আছে।
সূর্যের আলো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছিল। অরিন্দম ধীর পায়ে বারান্দার ছায়ার দিকে ফিরে চললেন। তাঁর পিঠের পেছনে তখনো কাঠ আর হাতুড়ির ধাতব ঠোকাঠুকি এক নতুন, হিংস্র রাজনৈতিক চুক্তির ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিল।
অধ্যায় ৩৩: মেঘলার নীরবতা ও রক্তবীজ
নয়ডার খামারবাড়ির খোলা উঠোনে দুপুর নামার মুখে ধুলো আর কড়া রোদের মেজাজ থমথম করছিল।
কয়েক দিন আগের সেই বিভীষিকাময় রাতের পর থেকে পুলিশ, ডাক্তার, বা চিকিৎসা—সবকিছুর বিরুদ্ধে এক কঠিন, দুর্ভেদ্য লোহার প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছে মেঘলা। সে কোন এফআইআর দায়ের করেনি, শহরের নামকরা হাসপাতালে গিয়ে নিজের শারীরিক আঘাতের ডাক্তারি পরীক্ষা করায়নি, এমনকি বাবার কোনো প্রশ্নের উত্তরে কান্নাকাটিও করেনি। তার এই চরম, পাথরঘেরা নীরবতা অরিন্দমকে প্রতিটা মুহূর্তে হাঁসফাঁস করিয়ে মারছিল। অপরাধবোধ আর অসহায়তার এক বিষাক্ত বাতাস ঘরের ভেতর থেকে বারান্দা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ সকাল থেকে মেঘলা নিজের ঘরের দরজা খুলে বের হয়ে সোজা পেছনের বাগানের অনাবাদি জমিটায় চলে গেছে।
রোদের তীব্রতা বাড়ছে। শুকনো, খটখটে মাটি কোপানোর ভারী একটা শব্দ অনবরত ভেসে আসছে—ছাঁৎ... ছাঁৎ...।
অরিন্দম বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, খোলা উঠোনের প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে একটা ভারী ইটের মতো শক্ত কোদাল উঁচিয়ে মাটিতে সজোরে কোপ বসাচ্ছে মেঘলা। তার সুতির নীল কুর্তাটা ধুলোবালি আর কাঁচা মাটির ছোপে ভরে গেছে, কপালে আর গলায় ঘামের ফোঁটা জমে চিলতে রোদে চকচক করছে। শুকনো খটখটে মাটি চিরে কোদালের লোহার ফলাটা যখন আছড়ে পড়ছে, প্রতিটি কোপের সাথে মাটি থেকে এক ধরনের খাঁটি, আইঁশটে উষ্ণ গন্ধ আর লাল ধুলোর আস্তরণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
অরিন্দমের বুকটা দমে এলো। এই দৃশ্য সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছিল। তিনি ধীর পায়ে, প্রায় ছুটে গিয়ে বাগানের ধুলো-ওড়া জমির ওপর হাজির হলেন।
"মেঘলা, থামো!" অরিন্দম ব্যাকুল হয়ে হাত বাড়িয়ে কোদালের কাঠের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। "তোমার শরীর ভালো নেই মেঘলা। এই অবস্থায় এভাবে রোদের মধ্যে কোদাল চালানো একেবারেই ঠিক নয়। ঘরে চলো... আমরা দুজনেই আর কিছুদিন পর কলকাতা ফিরে যাব।"
মেঘলা কোদালের হাতলটা ছাড়াল না। তার দু হাতের তেলোয় মাটির খসখসে ধুলো লেগে আছে। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
বাবার দিকে সে যখন তাকাল, অরিন্দম নিজের অজান্তেই এক ধাপ পিছিয়ে এলেন। সেই চোখে কোনো অশ্রু ছিল না, কোনো হাহাকার বা সাহায্যের করুণ আর্তনাদ ছিল না। সেখানে জমে ছিল এক চরম একগুঁয়ে, পাথুরে প্রাগৈতিহাসিক নিস্পৃহতা।
"কোথায় ফিরে যাব বাবা?" মেঘলার গলায় কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এক কঠিন শাণিত শ্লেষ। "তোমার সেই ইউনিভার্সিটিতে? যেখানে সবাই আড়ালে ফিসফিস করে তোমার কেলেঙ্কারী নিয়ে কথা বলে? নাকি তোমার সোদপুরের সেই নোনা-ধরা পৈতৃক বাড়িতে, যেখানে অতীত আর মৃত আত্মাদের ছাড়া আর কিছুটি বেঁচে নেই?"
অরিন্দম কথা খুঁজে পেলেন না। তাঁর বুকের মধ্যে দগদগে ক্ষতের মতো জ্বলতে লাগল বালিগঞ্জের অপমান আর সোদপুরের নিঃসঙ্গতা।
"কিন্তু এখানে থাকাও তো আর তোমার জন্য নিরাপদ নয়!" অরিন্দম কাঁপতে থাকা গলায় যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন। "পেট্রাস নিজের মতো জমি ঘিরছে, চারপাশের বাতাসের মেজাজ ভালো নয়..."
"নিরাপত্তা একটা ভুল ধারণা, বাবা," মেঘলা অরিন্দমের হাত থেকে কোদালের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিল। "যে সুরক্ষিত আবরণের স্বপ্ন তোমরা শেখাও, তা আদতে একটা মিথ্যা। যা ঘটার, তা তো ঘটেই গেছে। আমার শরীর ভেঙেছে, কিন্তু আমি তো আর মরে যাইনি।"
মেঘলা এক মুহূর্ত থামল। পকেট থেকে আঁচল বের করে কপালের জমে থাকা ঘামটুকু মুছল।
"মাটি কোপানোই এখন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে," সে আবার কোদালটা শূন্যে তুলল। "ক্ষত নিয়ে ঘরে বসে থেকে কাঁদার চেয়ে এই মাটি কোপানো অনেক বেশি বাস্তব। তুমি যাও বাবা, গিয়ে তোমার বই পড়ো।"
অরিন্দম নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মেঘলার কোদাল আবার আকাশে উঠল এবং মুহূর্তের মধ্যে শুকনো মাটির বুকে তীব্র শব্দে বিঁধে গেল—ছাঁৎ!
মাটির লাল ধুলো উড়ে এসে অরিন্দমের খালি পায়ে, প্যান্টের ভাঁজে আর চোখের কোণে এসে বসল। মেঘলা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিটি কোপে নিজেকে এই মাটির সাথে গেঁথে দিচ্ছে—যেন রূপকথার সেই রক্তবীজ, যার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা মাটিতে পড়ে নতুন প্রাণের জেদ তৈরি করে। শত আঘাত আর অপমানের পরও সে পালিয়ে যাবে না; সে এই রুক্ষ মাটির ভেতরেই নিজের শিকড় শক্ত করবে।
অরিন্দম মুখ ফিরিয়ে ধীর পায়ে বারান্দার ছায়ার দিকে হেঁটে চললেন। তিনি অনুধাবন করলেন, এই ট্রমা বা ভয়াবহ আঘাত থেকে মুক্তির কোনো তৈরি রাস্তা নেই; একে কোনো সান্ত্বনা দিয়ে মোছা যায় না। এই ক্ষতকে প্রতিদিনের নিঃশব্দ দৈনন্দিন কাজের ভেতর আত্মসাৎ করে নেওয়াই এখন মেঘলার অস্তিত্বের একমাত্র শর্ত।
অধ্যায় ৩৪: চিকিৎসকের ঘর ও ভ্রূণের সত্য
নয়ডা কলোনির প্রধান সড়ক থেকে নেমে ইট-বিছানো সরু গলিটার মুখে ড. ভার্মার ক্লিনিক।
সকালের প্রখর রোদের তাপে ক্লিনিকের বাইরের প্লেইন টিনের ছাদ থেকে যেন আগুনের আঁচ ঠিকরে পড়ছিল। ভেতরের ঘরটায় ঢুতেই একটা কড়া অ্যালকোহল, ডেটল আর কাঁচা স্যাঁতসেঁতে ধুলোর মিশ্র গন্ধ অরিন্দমের নাকে এসে লাগল। কোণে রাখা একটা নিচু প্লাস্টিকের স্ট্রেচারের ওপর সবুজ রঙের ছেঁড়া রেক্সিনের চাদর পাতা; তার ওপর বেশ কয়েক দিনের পুরোনো রক্তের আর বেটাডিনের দাগ শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে।
গত চার-পাঁচ দিন ধরে মেঘলার অনবরত বমি ভাব, শরীর গুলিয়ে ওঠা আর অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখে অরিন্দম আর স্থির থাকতে পারেননি। কোনো কথা না শুনে, প্রায় এক প্রকার জোর করেই তিনি মেঘলাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।
ঘরের মাঝখানে কাঠের একটা পুরনো টেবিল, তার ওপর মিটমিট করে জ্বলছে একটা ম্লান হলুদ আলোর টেবিল ল্যাম্প। টেবিলের ওপর জমে থাকা ফাইলের স্তূপ আর প্রেসক্রিপশনের প্যাডের পাশে রাখা একটা মরচে-ধরা কাঁচের গ্লাস। ঘরের কোণে দেওয়াল-সংলগ্ন একটা পুরোনো পিন-পড়া টেবিল ফ্যান একঘেয়ে যান্ত্রিক শব্দে ঘুরে চলেছে—ঘ্যাঁঘ... ঘ্যাঁঘ... ঘ্যাঁঘ...।
ড. ভার্মা একজন প্রবীণ, মাথায় কাঁচা-পাকা চুলের স্থানীয় ডাক্তার। চোখের মোটা ফ্রেমের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তিনি ড্রয়ার থেকে ইউরিন টেস্ট আর আল্ট্রাসাউন্ডের প্রাথমিক রিপোর্টটা বের করলেন। চশমার ওপর দিয়ে তিনি একবার স্থির দৃষ্টিতে অরিন্দমের দিকে তাকালেন, তারপর চোখ ফেরালেন চেয়ারের কোণে চুপচাপ বসে থাকা মেঘলার দিকে।
"উনি তো আপনার মেয়ে?" ড. ভার্মা রিপোর্টটার ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে খুব সমতল, নিখাদ ক্লিনিক্যাল গলায় প্রশ্ন করলেন।
"হ্যাঁ," অরিন্দমের গলা চিরে শব্দটা বের হলো। তাঁর শুকনো কণ্ঠনালীতে যেন একমুঠো বালি আটকে ছিল।
ডাক্তারবাবু রিপোর্টটা আবার টেবিলে রাখলেন। চশমাটা খুলে একটা সুতির রুমাল দিয়ে কাঁচ দুটো মুছতে মুছতে অত্যন্ত সোজা ভাষায় বললেন, "চার সপ্তাহ চলছে। ফিটাস বা গর্ভস্থ শিশু একদম সুস্থ আছে।"
ক্লিনিকের ঘরের সময়টা যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল।
অরিন্দমের মাথার ভেতরটা তীব্র ঝাঁকুনিতে ঝিমঝিম করে উঠল। চারপাশের শব্দগুলো কেমন যেন ফাঁপা আর বহুদূরের বলে মনে হতে লাগল। কেবল কোণের ওই পুরোনো পিন-পড়া ফ্যানটার একঘেয়ে শব্দটা যেন তাঁর কানের পর্দায় বিষাক্ত গর্জন তুলতে লাগল। তিনি তাঁর বুকের ভেতরে এক অমানুষিক চাপ অনুভব করলেন—যেন কেউ তাঁর ফুসফুস দুটোকে দু হাতে চেপে ধরেছে।
অরিন্দম ধীর পায়ে চেয়ারের হাতলটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। তিনি পাশে বসা মেঘলার দিকে তাকালেন।
মেঘলা কাঠের হাতলটা তার রোগা, ধুলোমাখা আঙুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে ছিল। তার মুখে কোনো শকের চিহ্ন নেই, কোনো ভয়ের কাঁপন নেই। সে নিষ্পলক চোখে ঘরের একমাত্র কাঁচ-ভাঙা জানালাটার দিকে চেয়ে আছে। জানালার ওপারে, গলির মোড়ে এক রাশি ওড়ন্ত ধূসর ধুলোর মধ্যে একটা বিশালাকার কালো মোষ শান্ত হয়ে শুয়ে জাবর কাটছে।
"এটা... এটা সম্ভব নয়," অরিন্দম তোতলাতে লাগলেন। তাঁর কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে গাল ছুঁয়ে চিবুকে এসে থামল। "ডাক্তারবাবু... আপনি... আপনি ভুল বলছেন। এটা অসম্ভব! আপনি এখনই অ্যাবোরশনের ব্যবস্থা করুন। এখনই। কোনো ওষুধ বা যা লাগে..."
ড. ভার্মা নিঃশব্দে চশমাটা আবার চোখে পরলেন। তাঁর মুখে কোনো বিস্ময় ফুটে উঠল না—এমন দৃশ্য হয়তো এই সীমান্ত-শহরের অনিয়ন্ত্রিত কলোনিতে তিনি বহুবার দেখেছেন। সে এক ঠান্ডা, চিকিৎসকের পেশাদার নিরাসক্ততায় অরিন্দমের দিকে চাইল।
"আমার পেশেন্ট আপনার মেয়ে, অরিন্দমবাবু," ডাক্তার এবার সরাসরি মেঘলার দিকে মুখ ফেরালেন। তাঁর গলায় কোনো বিচার বা আবেগ ছিল না, ছিল স্রেফ এক পেশাদারি জিজ্ঞাসা। "আপনি কী চান, মাদাম?"
ঘরের নীরবতা এবার এতটাই ভারি হয়ে উঠল যে ঘরের কোণে ঘুরতে থাকা ফ্যানের যান্ত্রিক শব্দটাও যেন আড়ালে চলে গেল।
মেঘলা খুব ধীরেসুস্থে পেট থেকে তার ডান হাতটা সরাল। তারপর খুব শান্ত, নিচু কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট স্বরে বলল, "আমি আমার এই বাচ্চাটাকে নষ্ট করব না। জন্ম দেব ওকে।"
অরিন্দমের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তিনি চেয়ার ছেড়ে এক প্রকার লাফিয়ে উঠলেন।
"মেঘলা! তুমি কী বলছ তুমি বুঝতে পারছ?" অরিন্দমের গলা দিয়ে হাহাকার বেরিয়ে এলো। "এ কার রক্ত তুমি নিজের শরীরে ধারণ করে আছ তা জানো? যে হিংসা, যে পশুপাখির মতো আক্রমণ তোমার ওপর হয়েছে—এ তার ফল! তুমি নিজের হাতে নিজের পুরো জীবনটাকে চিরকালের মতো শেষ করে দেবে?"
মেঘলা বাবার দিকে মাথা তুলে চাইল না। সে তেমনিভাবে জানালার ওপারে ধুলোয় শুয়ে থাকা মোষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"জীবন তো আগেই শেষ হয়ে গেছে বাবা," মেঘলার গলায় কোনো কম্পন ছিল না, কোনো করুণার আর্তনাদ ছিল না। "আমার শরীরে যা তৈরি হচ্ছে, তা কেবল হিংসার ফল নয়। ওটা এখন একটা স্বাধীন প্রাণ। মাটি যেমন বীজ বাছে না, ভালো-মন্দের হিসাব করে ফসল ফলায় না—শরীরও তেমনি রক্তের ব্যাকরণ জানে না। ও শুধু বেঁচে থাকার নিয়ম জানে।"
"কিন্তু সমাজ... লোকজন... সোদপুর... বালিগঞ্জ..." অরিন্দম বিড়বিড় করলেন, যেন নিজের অস্তিত্বের শেষ যুক্তিগুলো আঁকড়ে ধরার আকুল চেষ্টা করছেন।
"ওগুলো তোমার জগৎ বাবা, আমার নয়," মেঘলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার সুতির নীল কুর্তার প্রান্তটা বাতাসে সামান্য দুলল। সে ড. ভার্মার দিকে তাকিয়ে বলল, "প্রেসক্রিপশনটা দিন ডাক্তারবাবু। আর ভিটামিন বা আইরনের কোনো ওষুধ লিখতে হলে লিখে দিন।"
ড. ভার্মা কয়েক সেকেন্ড মেঘলার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে প্রেসক্রিপশন প্যাডে কয়েক লাইন লিখে তা মেঘলার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
অরিন্দম ঘরের কোণে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি অনুধাবন করলেন, সামাজিক নৈতিকতা, আইনি পবিত্রতা এবং শুচিতার সাজানো দর্শন—সবকিছুই বায়োলজিক্যাল নিয়তি বা জৈবিক বাসনার এই নগ্ন, নির্মম শক্তির সামনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণ কেবল কোনো অপরাধ বা হিংসার ট্র্যাজেডি নয়; তা জীবনের এক নির্লজ্জ, অপ্রতিরোধ্য আর অনমনীয় রূপায়ন, যা সামাজিক কলঙ্কের তোয়াক্কা না করেই নিজের অস্তিত্বকে জাহির করে।
ক্লিনিকের বাইরে তখনো দুপুর দেড়টার প্রখর রোদে নয়ডার ধুলো উড়ছিল। অরিন্দম ধীর পায়ে মেঘলার পেছনে পেছনে রোদের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন—এক ক্ষমতাচ্যুত পিতা, যার সামনে তার নিজের তৈরি সমস্ত সামাজিক মূল্যবোধ কাঁচের খোলসের মতো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।
অধ্যায় ৩৫: পিতৃত্বের পতন ও বিতর্ক
নয়ডার কলোনির খামারবাড়িতে রাত নামতেই বাইরের খোলা প্রান্তরটা এক অন্ধকার থমথমে রূপ নিল।
দিনের বেলার প্রখর রোদ আর ধুলোর উত্তাপ জুড়িয়ে গিয়ে এখন একধরনের আর্দ্র, নিস্তব্ধ চাপ চারপাশ থেকে ঘরগুলোকে ঘিরে ধরেছে। দূর থেকে কেবল একঘেয়ে, তীক্ষ্ণ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে—ঝিঁ... ঝিঁ... ঝিঁ...। মাঝে মাঝে কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে কোনো দ্রুতগামী ট্রাক্টর চলে গেলে তার জোরালো আলোর শিখা কাঁচভাঙা জানালা দিয়ে ঘরের সিলিংয়ে ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠেই আবার আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ডাইনিং স্পেসের কাঠের পুরোনো টেবিলটায় একটা ম্লান টেবিল ল্যাম্প রাখা। তার হলুদ আলোয় গোল হয়ে ফুটে উঠেছে দুটো স্টিলের থালা। থালায় ঢাকা আটার রুটি আর ডাল অনেক আগেই জুড়িয়ে কাঠ হয়ে গেছে। খাবার কেউ স্পর্শও করেনি।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় টেবিলের এক প্রান্তে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। তাঁর সামনের থালাটা তিনি খানিকটা দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর চোখের নিচে গভীর কালি, কপালের চামড়া দুশ্চিন্তায় কুঁচকে গেছে। গত কয়েক ঘণ্টার নীরবতা তাঁর বুকের ভেতর এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণা তৈরি করেছে যে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
সামনে বসে থাকা মেঘলার দিকে তিনি তাকালেন। মেঘলা তার স্টিলের গ্লাসে জলের বোতল থেকে ধীরসুস্থে জল ঢালছিল। তার চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, গলার স্বরে কোনো কাঁপন নেই—যেন চিকিৎসকের ঘরে যে চরম সত্য উন্মোচিত হয়েছে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এক দৈনন্দিন ঘটনা।
অরিন্দম হঠাৎ টেবিল চাপড়ে সজোরে চেঁচিয়ে উঠলেন।
"তুমি কি পাগল হয়ে গেছ, মেঘলা?" অরিন্দমের গলার রগ দুটো ফুলে উঠল, চোখ দুটি লাল। "তুমি বুঝতে পারছ তুমি কী বলছ? কাদের সন্তান ওটা? যে পশুগুলো তোমাকে ওই রাতে লাঞ্ছিত করল—ঈমন, আর ওর সাথে থাকা ওই অন্য দুটো জানোয়ার—তুমি কিনা তাদেরই বীজ নিজের গর্ভে লালন করবে? সমাজ তোমাকে কী বলবে? এই কুৎসিত সত্যিটা জানাজানি হলে লোক তোমার মুখে থুতু দেবে না?"
মেঘলা গ্লাসটা মুখে তুলে এক চুমুক জল খেল। তারপর খুব ধীরে ধীরে কাঁচের গ্লাসটা কাঠের টেবিলের ওপর রাখল। গ্লাসের নিচে এক ফোঁটা জল জমা হয়ে কাঠটাকে ভিজিয়ে দিল।
সে মাথা তুলল। তার মুখে এক অদ্ভুত, বিষাক্ত আর হিমশীতল হাসি ফুটে উঠল।
"সমাজ?" মেঘলা মৃদু হাসল—সেই হাসিতে অনুশোচনা বা ভয়ের কোনো লেশমাত্র ছিল না, ছিল স্রেফ এক নির্দয় উপহাস। "তুমি এখনও এই সমাজের কথা ভাবছ বাবা? যে সমাজ তোমাকেও ছুড়ে ফেলে তাড়িয়ে দিয়েছে? যে সমাজ তোমার ওপর কলঙ্কের তকমা এঁটে দিয়ে তোমাকে ঘরছাড়া করেছে, সেই সমাজের ভয়ে তুমি আজ নিজের মেয়ের ভ্রূণ হত্যা করতে চাইছ?"
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মেঘলার এই সোজা আক্রমণ তাঁর আত্মসম্মানের শেষ বর্মটুকুও চূর্ণ করে দিল।
"আর রইল বীজের কথা," মেঘলা থামল না, তার গলার স্বর এবার আরও গভীর ও দৃঢ় হয়ে উঠল। "বীজ কার, তা দিয়ে মাটির কী আসে যায় বলুন তো? মাটি কি কখনও বিচার করে কোনো বীজ থেকে কোন গাছ গজাচ্ছে? আম গাছ আর বিষগাছ কিন্তু একই মাটিতে বাড়ে, একই জল আর রোদ শুষে নেয়। মাটি কাউকে ঘৃণা করে না; মাটি শুধু বড় করে তোলে, বাঁচিয়ে রেখে খাবার জোগায়।"
"কিন্তু ওটা যে এক ধর্ষকের সন্তান, মেঘলা!" অরিন্দম প্রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, হাত দুটো শূন্যে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করলেন। "ওটা হিংসার ফল! ওটা কোনো ভালোবাসার বা পবিত্র সম্পর্কের সৃষ্টি নয়! তুমি প্রতিদিন ওই বাচ্চার দিকে তাকালে ওই কালরাতের অত্যাচারীদের মুখ দেখতে পাবে!"
"ওটা এখন শুধু আমার সন্তান!"
মেঘলা এবার হঠাৎ সজোরে টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়াল। তার সুতির শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়ল। ঘরের আলোয় তার চোখের দৃষ্টি দুটো ধারালো কৃপানের মতো অরিন্দমের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।
"ওই রাতে ওরা আমার শরীরটা ছিনিয়ে নিয়েছিল ঠিকই," মেঘলা এক পা এগিয়ে এসে অরিন্দমের মুখোমুখি দাঁড়াল, তার গলায় বজ্রের মতো গর্জন। "কিন্তু আমার ভেতরে এখন যে প্রাণটা তৈরি হচ্ছে, ওটা সম্পূর্ণ আমার। ওর ওপর আর কারও অধিকার নেই—না ঈমনের, না ওই অন্য পশুগুলোর, আর না আপনার সুশীল সমাজের! আমি এটাকে হিংসার প্রতীক হতে দেব না, বাবা। আমি একে জীবনের প্রতীক করব।"
অরিন্দম এক পা পিছিয়ে গেলেন। মেঘলার এই রূপ তিনি আগে কখনো দেখেননি। এ যেন কেবল তাঁর মেয়ে নয়, এ এক প্রাগৈতিহাসিক প্রবৃত্তিগত শক্তি—যা সমস্ত আইনি ব্যাকরণ, পিতৃতান্ত্রিক নীতি আর সামাজিক আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।
"তুমি যদি এটা সহ্য করতে না পারো," মেঘলা নিচু, বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় শেষ পেরেকটি ঠুকল, "তবে তুমি বরঞ্চ সোদপুরে বা কলকাতায় ফিরে যাও। আমি তোমাকে এখানে আটকে রাখিনি।"
কথাগুলো বলে মেঘলা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল এবং শক্ত হাতে কবাট দুটো টেনে বন্ধ করে দিল—খটাস!
শব্দটা ফাঁকা ডাইনিং রুমে কয়েকবার প্রতিধ্বনি তুলল।
অরিন্দম ধপ করে আবার কাঠের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পের সামান্য আলোয় তাঁর ছায়াটা দেওয়ালে এক বিশালাকার অসাড় অবয়ব তৈরি করে ঝুলে রইল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
তিনি দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে দু ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে এল। তিনি অনুধাবন করলেন, পিতা হিসেবে তাঁর সমস্ত কর্তৃত্ব, তাঁর নীতিবাক্য আর শাসন করার সমস্ত অধিকার আজ চিরকালের মতো চুরমার হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। যে মেয়েকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি, যাকে তিনি নিজের মতো করে সমাজ-উপযোগী করতে চেয়েছিলেন—সে আজ তাঁর পিতৃতান্ত্রিক ছাতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ এক নিজের রাজ্য গড়ে তুলেছে।
এক অপরাধ থেকে জন্ম নেওয়া জীবনও যে নিজের স্বাধিকার নিয়ে এভাবে টিকে থাকার জেদ প্রকাশ করতে পারে, সেই নির্মম জৈবিক সত্যের সামনে অরিন্দম মুখোপাধ্যায় আজ এক পরাজিত, শূন্য নিঃস্ব সত্তা ছাড়া আর কিছুই নন।
অধ্যায় ৩৬: কুকুরের চামড়া ও ইউথানাসিয়ার পাঠ
বাইরে বিকেল ঢলে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছিল সোদপুরের পুবপল্লীর ট্যাঙ্কের ধারের সরু গলিটায়। ঘরের ভেতরের ভ্যাপসা হাওয়ায় কার্বলিক অ্যাসিড, পোড়া আইওডিন আর ভেজা কুকুরের গায়ের বিটকেল পচা গন্ধ আঁকড়ে ধরেছিল ক্লিনিকের দেয়ালগুলোকে।
অরিন্দমের হাত দুটো আজ আর কবিতার বইয়ের পাতা উল্টোচ্ছে না। তাঁর নখের খাঁজে আটকে আছে পশুর গায়ের রক্ত, ময়লা আর শুকনো পুঁজের গন্ধ। তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের সন্ধিস্থলে আইওডিন স্পিরিটের হলদে ছোপ। টেবিলের ওপরে বসানো ছাঁট-আলোর বাল্বটা ঝুলছিল একটা খালি তারের ভরসায়; বাতাসে সেই বাল্বটা সামান্য দুললেই মেঝের ওপর তাঁদের দুজনের ছায়াগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছিল।
জিঙ্ক-পাতা টেবিলটার ওপরে ছটফট করছিল একটা ছোট, সাদা রঙের পথকুকুর। পিছনের হাঁটুর কাছ থেকে কোমর অবধি চামড়া খসে গিয়ে কালো গ্যাংগ্রিনের ঘা বেরিয়ে পড়েছে, মাংসের ফাঁকে সাদা সাদা পোকা কিলবিল করছে। পশুটার নিস্তেজ চোখ দুটো লাল, কিন্তু তাতে কোনো ডাক বা আর্তনাদ নেই—স্রেফ এক নিরাসক্ত, গভীর স্তব্ধতা।
"পা দুটো শক্ত করে ধরুন তো, অরিন্দম," মাধবী গ্লাভস পরা হাতে সিরিঞ্জটা তুলে নিতে নিতে বললেন। তাঁর গলার স্বর সমতল, কোনো অহেতুক সমবেদনা বা কাপুনি নেই তাতে।
অরিন্দম এগিয়ে এলেন। তিনি কুকুরের ঘাড়ের আলগা চামড়াটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। হাতের তালুতে পশুটার দ্রুত চলা বুকের স্পন্দন আর উষ্ণ, হাঁপাতে থাকা নিঃশ্বাস এসে লাগছিল। কুকুরের গা থেকে উঠে আসা উষ্ণ দুর্গন্ধ অরিন্দমের নাকের ভেতর ঢুকে ঝিমঝিম করে উঠল।
মাধবী সিরিঞ্জের সূঁচটা আলোতে ধরে একটু তরল হাওয়া সরিয়ে দিলেন। বুদ্বুদটা টপ করে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
"আপনি কি এখনও ভয় পান, অরিন্দম?" মাধবী সিরিঞ্জের সূঁচটা কুকুরের উরুর পেছনের চামড়ার নিচে ফোটাতে ফোটাতে জিজ্ঞেস করলেন।
অরিন্দম কুকুরের চোখের দিকে চাইলেন। সেই চোখ দুটো সরাসরি তাঁর চশমার কাচ চিরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। পশুটার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ক্ষোভ নেই, স্রেফ এক নিরাসক্ত, নিঃশব্দ যন্ত্রণা।
"মৃত্যুর চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই—বায় -রন কত ভুল লিখেছিলেন মাধবী," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে বললেন, তাঁর স্বর নিচু কিন্তু স্পষ্ট। "মৃত্যু কোনো সুন্দর কবিতা নয়, মৃত্যু হলো রক্ত পূজ কফ আর প্রস্রাবের এক দুর্গন্ধময় অবসান। কিন্তু এই কুকুরটার মুক্তি দেওয়াটার ভেতরেই হয়তো মানুষের একমাত্র করুণা লুকিয়ে আছে।"
সিরিঞ্জের গাঢ় নীল রঙের পেন্টোবার্বিটাল তরলটুকু পশুর রক্তে মিশে যেতেই কুকুরের শরীরটা একবার সামান্য কেঁপে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে হাঁপানির ছন্দটা ধীর হয়ে এল। ঘাড়ের চামড়াটা অরিন্দমের হাতের মুঠোয় ঢিলে হয়ে ঝুলে পড়ল। চোখ দুটো আধবোজা, পুতুল সদৃশ স্থির।
সব শেষ।
অরিন্দম নিজের হাতেই পশুর নিথর, ভারী দেহটা একটা বড় কালো প্লাস্টিকের প্যাকেটে পুরলেন। প্যাকেটটার মুখ মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধলেন। কাল সকালেই পৌরসভার ভাগাড়ে ফেলে আসতে হবে ওটাকে, নইলে রাতের আর্দ্রতায় আজ থেকেই দুর্গন্ধ ছাড়তে শুরু করবে। কাজ শেষ করে তিনি বেসিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। পিতলের কলটা খুলতেই ঠাণ্ডা জল আছড়ে পড়ল ধাতব পাত্রে। সাবান দিয়ে ভালো করে ডলে ডলে দুই হাত ধুলেন অরিন্দম। নখের ভেতরের পুঁজ আর চর্বির দাগগুলো তুলে ফেলার জন্য ব্রাশ ঘষলেন। তারপর বোতল থেকে আইওডিন স্পিরিট আয়োডিন ঢেলে দুই হাতের তালুতে,আঙুলের ফাঁকে ঘষে নিলেন। স্পিরিটের তীব্র ঝাঁজে চামড়ার কাটা ছড়ছড় করে জ্বলে উঠল, কিন্তু সেই জ্বেলে ওঠার মধ্যে অরিন্দম এক অদ্ভুত, নিষ্ঠুর আরাম পেলেন।
তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।
মাধবীদেবী রাবারের গ্লাভস দুটো টেনে খুলে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেললেন। তারপরে বেসিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। এপ্রন খুলে চেয়ারে রাখলেন। সব শেষে অরিন্দমের বুকের কাছে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। ঘরের আর্দ্র বাতাসের ভেতরে মাধবীর শরীর থেকে ভেসে আসছিল সাবান, ঘাম আর আইওডিনের এক মিশ্র, তীব্র ঘ্রাণ। মাধবীর মুখের চামড়ায় ওনার পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার ছাপ, চোখের নিচে কালচে ছায়া।
"হাত ঘষে কোনো লাভ নেই অরিন্দম," মাধবী নিচু, রুক্ষ গলায় বললেন। "রক্ত আর পুঁজ আপনার নখের খাঁজে ঢুকে গেছে। অনেক ধকল আর মানসিক কষ্টও পেলেন আপনি, তাই না? নিজের হাতে করে খাওয়াচ্ছিলেন কুকুরটাকে কয়দিন ধরে। হাত দিয়ে পোকাও পরিষ্কার করলেন।"
অরিন্দম তোয়ালেটা টেবিলের কোণে রেখে নিজের নিচু স্বরে বললেন, "আইওডিনের গন্ধটা উঠছে না মাধবী।"
মাধবী একটু উপহাসের হাসি হাসলেন। তাঁর চোখের কোণের বলিরেখাগুলো কুঁচকে গেল। "উঠবেও না। এই গন্ধটাই তো আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ। নয়ডায় মেঘলার ওখানে কি খুব নিখুঁত জীবন ছিল আপনাদের? নাকি খুব কবিতা পাচ্ছিলেন সেখানে? কবিতার বই বন্ধ করে এই রক্ত আর চামড়ার জগতে নেমে আসুন এবারে।"
মাধবী অরিন্দমের জামার কলারটা নিজের খসখসে আঙুলে চেপে ধরে টেনে নিজের কাছাকাছি আনলেন। মাধবীর নিঃশ্বাসে তামাক জর্দা আর ঘামের নোনতা গন্ধ।
মাধবী অরিন্দমের খালি, আইওডিন লাগা হাতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন, যেন খুব মামুলি কোনো কাজের কথা বলছেন। "ট্যান হয়েও আছে শরীরটা আমার কিছুদিন ধরেই। অনেকগুলো মাসও হলো কিছুই করেন নি আপনি। নয়ডাতে মেঘলার কাছে ছিলেন। আমারও খুব ইচ্ছে করছে যে ছোবল খেতে। দেবেন? ডগ স্টাইলে? খারাপ নয় কিন্তু এখনও। আপনার পছন্দ হবে কিনা জানিনা? তিস্তার ফিরতে ফিরতে রাত হবে বলে গেছে। থাক, অত লজ্জা পেতে হবে না আর আমাকে। আসুন তো।”
কথাগুলো ঘরের কার্বলিক অ্যাসিড আর মরা কুকুরের গন্ধের ওপর একটা ভারী পাথরের মতো এসে পড়ল। কোনো রোমান্টিক আবরণ নেই, কোনো সাহিত্যের অলঙ্কার নেই—একেবারে নগ্ন, কাঁচা প্রবৃত্তি আর ক্ষোভের মতোই শোনালো।
অরিন্দম স্থির হয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল কলকাতার সেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ক্লাসরুম, বোদলেয়ার আর জীবনানন্দের পংক্তি, রিয়া সেনের চকচকে সোনার বালা, আর নয়ডার সেই অভিশপ্ত রাতে আগুনে পুড়তে থাকা খামারবাড়ির আর্তনাদ। কিন্তু এই মুহূর্তে, সোদপুরের এই ভেটেরিনারি পশু আশ্রয়কেন্দ্রের রক্ত-পুঁজ আর মৃত্যুর গন্ধের মাঝে, মাধবীর এই সোজাসুজি চাওয়াটাকে তাঁর কোনো পাপ বা অপরাধ বলে মনে হলো না। এটা ছিল স্রেফ বেঁচে থাকার এক আদিম ডালপালা আঁকড়ে ধরা।
"অরিন্দমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তিনি মাধবীর চোখের ভেতরের তীব্রটা,ও শূন্যতা দুটোই দেখতে পেলেন।
"তোমার কোনো লজ্জা লাগে না মাধবী?"
"লজ্জা?" মাধবী হা-হা করে সশব্দে হেসে উঠলেন, তাঁর গলার রগগুলো ফুলে উঠল। "যে সমাজ আমাদের আড়ালে থুতু ফেলে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজের লজ্জা বিক্রি করব? আপনি কি এখনও কোনো অপরাধবোধে ভুগছেন?"
"অপরাধবোধ?" অরিন্দম হালকা হাসলেন। "যে জগতে একটা পশু তিলে তিলে পচে মরে, সেখানে বেঁচে থাকার এই নগ্ন চেষ্টাটুকুতে কীসের অপরাধ মাধবী?"
"মেয়ে ফিরবে না তো?" অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর গলায় কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল স্রেফ এক যান্ত্রিক বাস্তবতা।
"বললাম তো তিস্তা রাত এগারোটার আগে আসবে না, মিটিং আছে ওর," মাধবী সোজা অরিন্দমের হাতের ওপর হাত রাখলেন। "তবে আর দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ছুঁয়েই দেখুন না আমাকে... এই শরীরটা তো আর গ্যাংগ্রিন হয়ে পচে যায়নি । ভালোই সজীব আছে এখনও। HRT নেই। আসুন আমার সাথে!"
তারা পাশের ছোট ঘরটায় এলেন। ঘরটায় একটা মেহগনি কাঠের খাট, ওপরে মোটা তোশক আর সুতির চাদর বিছানো। কোণে একটা টেবিল ফ্যান পুরনো লোহার ব্লেড নিয়ে ক্যাঁচকোঁচ শব্দে ঘুরে চলেছে।
ডাক্তার মাধবী কোনো ভূমিকা না করেই এক পাক ঘুরে নিয়ে এক ঝটকায় নিজের শাড়ি খুলে মেঝেতে ফেলে দিলেন। তারপরে একটু থেমে পেছন ফিরে ব্লাউজ ও কোমরের সায়া থেকেও নিজেকে মুক্ত করলেন। তারপর তক্তপোশের কাঠের ফ্রেমটায় দু-হাত রেখে নিচু হয়ে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। তাঁর খোলা ও ফর্সা পিঠে ঘামের ফোঁটাগুলো আলোর ছাঁটে চকচক করছিল।
অরিন্দম নিঃশব্দে মাধবীর পেছনে এলেন। তাঁর হাত আঙুলের নখে তখনও আটকে থাকা আইওডিনের সুবাস মিশে গেল মাধবীর পিঠের ঘামের গন্ধে। এখানে কোনো বায়- রন নেই, কোনো নন্দনতত্ত্ব নেই। এখানে আছে কেবল দুটি ক্ষয়ে যাওয়া মানুষের চামড়া আর হাড়ের ঘর্ষণ, যা তাদের এই মরণশীল অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
অরিন্দম পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই মাধবী ওনার মাথা ঘুরিয়ে ওর চোখে চাইলেন, "দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? হাত দিন ওখানে ! একটু আদর তো করুন আমাকে । আমিও মেয়েমানুষই তো বটে। নাকি এখনো রিয়া সেন বা ক্লাসরুমের সেই মিষ্টি মেয়েগুলোর কথা ভাবছেন ?"
অরিন্দমের হাত দুটি মাধবীর ভারী, চওড়া কোমরের খাজ আর উরুর ওপর গিয়ে বসে গেল। নখের খাঁজে আটকে থাকা আইওডিনের গন্ধ মাধবীর গাঢ় ঘামের সাথে মিশে গেল।
মাধবী নিজের মাথাটা কাঠের ফ্রেমে গুঁজে দিয়ে একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেললেন। "শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন অরিন্দম আমাকে... ঠিক যেমন ওই কুকুরটার ঘাড় ধরেছিলেন… ছেড়ে দেবেন না যেন একদম!" মাধবী মাথাটা কাঠের ফ্রেমে গুঁজে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন।
অরিন্দম দাঁতে দাঁত চেপে মাধবীর কোমরের আর পেটের আলগা চামড়া শক্ত করে চেপে ধরে ভেতরের গভীরতায় প্রবেশ করতেই মাধবী চোখ বুজে একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠলেন।
"আঃ আঃ আঃ মা…গো ….উফফ! মাধবীর মুখ থেকে একটা অস্ফুট কোঁকানি বেরিয়ে এল।
আপনার কি কষ্ট হচ্ছে নিতে এই ভাবে মাধবী?" অরিন্দমের গলায় কোনো রোমান্টিকতা ছিল না, ছিল স্রেফ এক রুক্ষ যান্ত্রিকতা।
"কষ্ট কই অরিন্দম?" মাধবী কাঁপানো, ভাঙা গলায় বললেন, "কষ্ট তো রাতে খালি ঘরটায় একা একা বিছানায় শুয়ে থাকায়... নিজের মরে যাওয়াটাকে দেখার মধ্যে। দুটো পশুর মতো আমাদের শরীর দুটো ঘষছে বলেই তো বুঝতে পারছি আমরা এখনও বেঁচে আছি। আরও জোরে... কোনো দয়ামায়া করবেন না আজকে। জোরে জোরে ধাক্কা দিন "
"আমিও দয়া করতে আসিনি," অরিন্দমের গলার স্বর ভারী হয়ে উঠল, তাঁর প্রতিটি ধাক্কা আর সঞ্চালনে তক্তপোশের কাঠ মড়মড় করে আর্তনাদ করে উঠল। "আমরা দুজনেই তো নষ্ট হয়ে গেছি মাধবী। এই পচন থেকে আমাদের ছাড়াবে কে?"
"তবে আর কি? সেই নষ্ট হওয়াটাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচুন..." মাধবী পেছনে হাত বাড়িয়ে অরিন্দমের উরু শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন, তাঁর নখও অরিন্দমের চামড়ায় বসে গেল। "কবিতা দিয়ে কী শরীরের ক্ষুধা মেটে? এই মাংসের কামড়টাই আসল, অরিন্দম... আরও গভীরে আসুন...আরও ভেতরে..কী যে আরাম অরিন্দম….আপনি সেটা বুঝবেন না…অরিন্দম."
ঘরের ফ্যানের ঘূর্ণি হাওয়ায় ছায়াগুলা দেয়ালে আছড়ে পড়ছিল। বাইরে থেকে ভেসে আসছে লেভেল ক্রসিংয়ের লাল আলোর সংকেত আর দূরগামী মালগাড়ির সিটি। যৌনতা এখানে কোনো প্রেমানুভূতির গল্প ছিল না; তা ছিল দুই ক্ষয়ে যাওয়া মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক নির্মম ঘর্ষণ।
"মাধবী..." অরিন্দমের নিঃশ্বাস ক্রমশ দ্রুত হয়ে এল,
"মাধবী…”কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ল মাধবীর নগ্ন পিঠে।
"হুু উ উ। হতে দিন... যা কিছু ভাঙার ভেঙে যেতে দিন আজ... আমার ভেতরটাও কেমন একদম ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে..." মাধবী অস্ফুটে চিৎকার করে উঠলেন। জানেনতো আমার হাজব্যান্ড ইরেক্টিল ডিসফাংশন এ ভুগতেন। কত যে ডাক্তার বদ্দি করেছিলাম । কিচ্ছু কাজ হয় নি। সে তুলনায় আপনি এই বয়সেও….ফিট.
অরিন্দম চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে মাধবীর উরুতে নখ বসিয়ে চূড়ান্ত কয়েকটা ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। মাধবী ঘাড় বেঁকিয়ে অরিন্দমকে দেখলেন। অরিন্দম চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে মাধবীর উরুতে নখ বসিয়ে চূড়ান্ত ধাক্কাটা দিলেন। মাধবীর শরীরটা একবার ধনুষ্টঙ্কারের মতো বেঁকে গিয়ে শিথিল হয়ে পড়ল,কয়েক মিনিটের জন্য অরিন্দমও নিজের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা শূন্যতা আর ক্লান্তি সেই গরম মাংসে ঢেলে দিলেন।
ঘরটা আবার স্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল ফ্যানের একঘেয়ে আওয়াজ ছাড়া আর কিছু নেই।
মাধবী উঠে বসে খাটের কোণ থেকে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে নিজের শরীর মুছলেন ধীরেসুস্থে। তাঁর চোখের সেই লালসা নিভে গিয়ে এক যান্ত্রিক স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। তারপর অরিন্দমকে নিজের হাতে মুছিয়ে দিলেন তোয়ালে দিয়ে
"আপনার প্যান্ট পরে নিন এখন," মাধবী শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন। "বাইরে ওই প্লাস্টিকের প্যাকেটটা যাবার আগে একবার দেখে নেবেন, ইঁদুরে যেন না কাটে। কাল সকালে রুদ্রকে বলব ভাগাড়ে ফেলে আসতে।"
অরিন্দম তক্তপোশের ধারে বসে নিজের পোশাক ঠিক করে নিলেন। তাঁর কপালে ঘামের ফোঁটা। তিনি হাত দুটো আবার নাকের সামনে তুলে ধরলেন—সেখানে না আছে বায়- রনের নন্দনতত্ত্ব, না আছে কোনো উচ্চাঙ্গের দর্শন। সেখানে জড়িয়ে আছে স্রেফ কুকুরের গা থেকে আসা আইওডিন, রক্ত, আর মাধবীর ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের নোনা ঘামের ঘ্রাণ।
অরিন্দম ধীর পায়ে তক্তপোশ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, প্লাস্টিকের প্যাকেটে পুরে রাখা সেই নিস্তেজ সাদা কুকুরটার শেষযাত্রার প্রস্তুতির জন্য।
অধ্যায় ৩৭: 'অপরাজিতা'র ধ্বংসাবশেষ
মেঘলা দিল্লি থেকে যখন প্রথম এই বাড়িতে পা রেখেছিল সে অরিন্দমের বেশ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে 'অপরাজিতা'র রূপ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বাস যোগ্য করে তুলেছিল
একসময়ের অরিন্দমের জরাজীর্ণ পৈতৃক ভিটেটার নোনাধরা ইট আর চটে যাওয়া চুনকাম মুছে গিয়ে এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে চকচকে আভিজাত্য। বাইরের দেয়ালে প্রিমিয়াম এনামেল পেইন্টের মসৃণ প্রলেপ, পেছনের উঠোনে নতুন বাঁধাই করা মার্বেল পাথর, ঘরের মেঝেতে নতুন টাইলস আর স্টাডি রুমে সেগুন কাঠের চকচকে মডার্ন বুক-র্যাক। সোদপুরের যুবকদের ছিটানো আলকাতরার কালো দাগগুলোও মিস্ত্রি ডেকে কেমিক্যাল দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলেছিল মেঘলা, যাতে তার বাবার অতীত কলঙ্কের কোনো বাহ্যিক আঁচ এই নতুন ভিটেতে না থাকে।
বাড়িটা এখন আর ভাঙাচোরা নয়। বাড়িটা এখন ঝকঝকে, পরিষ্কার এবং আধুনিক জীবনের এক সুরক্ষিত দুর্গ।
কিন্তু এই নতুন মার্বেল আর মসৃণ দেয়ালের মাঝে একা দাঁড়িয়ে অরিন্দম মুখোপাধ্যায় অনুধাবন করলেন—বাইরের দেয়াল যত নতুন রঙের পোঁচেই ঢাকা পড়ুক না কেন, এই ঝকঝকে ঘরের ভেতরের মানুষটি আর তাঁর অতীত একইভাবে ক্ষয়িষ্ণু, নিঃস্ব ও অসার। ঘরের সংস্কার হয়, কিন্তু জীবনের কি সংস্কার হয়?
বৈকালের আর্দ্র বাতাস সোদপুরের আকাশে থিতু হয়ে বসছে। অরিন্দম স্টাডি রুমের কোণে থাকা পুরনো ট্রাঙ্ক আর নতুন বুক-র্যাকের নিচের প্লাইউডের পাল্লাটা টানলেন।
মেঘলা যখন সংস্কার করাচ্ছিল, তখন অরিন্দমের বছর চল্লিশের জমানো ধুলোমাখা গবেষণার উপাদানগুলো পেছনের ট্রাঙ্ক আর নিচের তাকগুলোতে পলিথিন মুড়ে স্রেফ গুঁজে রেখে দিয়েছিল। কাচের পাল্লা খোলার সাথে সাথেই সেই চেনা স্যাঁতসেঁতে কালির গন্ধ, আর দীর্ঘদিনের আবদ্ধ উইপোকার মল ও পোড়া কাগজের গন্ধ বেরিয়ে এল।
অরিন্দম এক এক করে টেনে বার করতে লাগলেন তাঁর সেই সব কালজয়ী সম্পদ।
উইপোকায় খাওয়া চর্মবাঁধানো শেকসপীয়ারের ‘কিং লিয়ার’, ‘হ্যামলেট’, রিলকের ‘ডুইনো এলিজিস’ আর বায়রনের চর্মবাঁধাই কাব্যগ্রন্থ। প্রিমিয়াম টাইলসের ঝকঝকে মেঝের ওপর পড়তে লাগল বইগুলোর ভাজ থেকে ঝরে পড়া ধুলো আর ডানাযুক্ত উইপোকার শুকনো গুঁড়ো। কিছু কিছু পৃষ্ঠা উইপোকার সুড়ঙ্গপথে এমনভাবে বিলীন হয়েছে যে বাক্যের অর্ধেক অংশই উধাও।
তার পাশেই পড়ে ছিল গত পঁচিশ বছর ধরে জমানো ‘ওয়ার্ল্ড লিটারারি জার্নাল’-এর ধুলোমাখা ফাইল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. ক্লাসে তাঁর দেওয়া নন্দনতত্ত্বের লেকচার নোটস, নিজের হাতে লেখা ব্যক্তিগত ডায়েরিগুলো, আর সবার নিচে ম্যানিলা খামে মোড়া—রিয়া সেনের স্নাতকোত্তর থিসিসের সেই ঐতিহাসিক প্রথম খসড়া।
অরিন্দমের বুকটা একবারও কেঁপে উঠল না। কোনো করুণা বা দ্বিধা তাঁর রুগ্ন হাত দুটোকে থামাল না।
তিনি দুই বাহু ভরে সেই সমস্ত বই, ফাইল আর থিসিসের খসড়া কাগজ তুলে নিলেন। নতুন আধুনিক টাইলসের মেঝে পার হয়ে তিনি নেমে এলেন পেছনের নতুন বাঁধাই করা মার্বেল-মোড়া উঠোনে। মেঘলা উঠোনের কোণে একটা ছোট বাগান তৈরি করেছিল, সেখান থেকে ঝরে পড়া ছাতিম ও আমগাছের শুকনো পাতার একটা স্তূপ জমে ছিল। অরিন্দম সেই পাতার ওপর থরে থরে সাজাতে লাগলেন তাঁর সারা জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনের কঙ্কালগুলোকে।
নিচে বায়রনের রোমান্টিক কবিতার পংক্তি, তার ওপর এরিস্টটল, কান্ট ও হেগেলের নান্দনিক তত্ত্বের বক্তৃতা, তার ওপর জীবনানন্দের কবিতার ব্যবচ্ছেদ, আর সবশেষে রিয়ার থিসিসের সেই টাইপ করা খসড়া।
অরিন্দম নিজের পকেট থেকে একটা পুরানো দেশলাইয়ের বাক্স বার করলেন। কাঠি ঘষতেই ছোট নীল-হলুদ অগ্নিশিখাটা কেঁপে উঠল তাঁর খসখসে আঙুলের ডগায়। তিনি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে কাঠিটা ফেলে দিলেন কাগজ ও শুকনো পাতার স্তূপের একদম গভীরে।
প্রথমে একটুকরো কুণ্ডলী পাকানো নীল ধোঁয়া সোদপুরের আর্দ্র বাতাসে মিশে গেল। তারপর একটা শুকনো পটাশ শব্দ করে আগুনটা জেগে উঠল।
হলদেটে, রোষকষায়িত আগুন লাফিয়ে উঠল ওপরের দিকে।
মেঘলার লাখ লাখ টাকায় সংস্কার করা ঝকঝকে উঠোনের মার্বেল মেঝের ওপর সেই আগুনের প্রখর লাল আলো এসে পড়ল। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল বায়রনের ক্ষুরধার পংক্তিমালা, রূপোর মতো জ্বলতে জ্বলতে কালো হয়ে গেল অরিন্দমের নন্দনতত্ত্বের লেকচার নোটস। রিয়া সেনের থিসিসের পাতায় আগুন লাগতেই তা মুহূর্তে মুচড়ে গিয়ে ছাইয়ের আস্তরণে পরিণত হলো। পোড়া কাগজ আর প্রাচীন চর্মবাঁধাইয়ের এক তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ ছেয়ে গেল আধুনিক ‘অপরাজিতা’র আঙিনায়।
অরিন্দম এক দৃষ্টিতে আগুনের লেলিয়ান শিখার দিকে চেয়ে রইলেন।
আগুনের তাপে তাঁর চোখের চশমার কাচ গরম হয়ে উঠছিল। চশমার প্রতিফলনে ফুটে উঠছিল জ্বলন্ত কাগজের সেই তাণ্ডব।
"শব্দ..." অরিন্দম বিড়বিড় করে উঠলেন। তাঁর স্বর ভেঙে এক অদ্ভুত খাঁ খাঁ শব্দ বের হয়ে এল। "জীবনটা শব্দের তৈরি ছিল না। জীবনটা তৈরি ছিল রক্ত, মাংস আর মাটির। আর আমি কিনা সারাজীবন ছায়াকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে ছিলাম।"
সারাটা জীবন তিনি কবিতার পংক্তি, সাহিত্যের ব্যাখ্যা আর পণ্ডিতগিরির কঠিন শব্দজাল বুনে বাঁচতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন বায়রন, শেকসপীয়ার বা বোদলেয়ার তাঁকে জীবনের নগ্ন বাস্তবতা থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু যখন জীবনের আসল ঝড় এল, যখন ক্লাসের পরিয়া ছাত্রীর ফাঁদ, সোদপুরের আলকাতরা আর মেয়ের খামারবাড়ির পৈশাচিক ঘটনা তাঁর জীবন চুরমার করে দিল—তখন এই শব্দগুলো তো তাঁকে একবিন্দু আশ্রয় বা উত্তর দিতে পারেনি। পণ্ডিতগিরির এই প্রাসাদ আসলে এক অসার প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
হলুদ শিখাগুলো ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। রাজকীয় অগ্নিকুণ্ড পরিণত হলো একমুঠো কালচে, উষ্ণ ছাইয়ের স্তূপে।
বিকেলের এক দমকা বাতাস এল ট্রেনলাইনের দিক থেকে।
অগ্নিকুণ্ড থেকে ছাইয়ের অসংখ্য কালো ও ধূসর টুকরো বাতাসের তোড়ে উড়ে গিয়ে মেঘলার নবনির্মিত সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে পাশের খোলা নর্দমার নোংরা জলের ওপর গিয়ে পড়তে লাগল। জলের তোড়ে ভেসে যেতে লাগল একসময়ের মহামূল্যবান ভাবের অংশগুলো।
অরিন্দম ছাইয়ের দিকে আর তাকালেন না। নিজের শুকনো, কালচে পড়ে যাওয়া দুটো হাতের তালুর দিকে চাইলেন।
মেঘলার নতুন রঙ করা সুদৃশ্য বাড়ির ঝকঝকে পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি মনে মনে এক চিরন্তন, কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন—আর কোনোদিন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, তিনি কোনো বই ছুঁয়ে দেখবেন না। বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের এই ছাইয়ের স্তূপেই অন্তিম সমাধি ঘটল তাঁর পাণ্ডিত্যের অহংকারের, আর সেখান থেকেই জন্ম নিল এক শব্দহীন, নির্মম ও নগ্ন নতুন বেঁচে থাকা।
অধ্যায় ৩৮: রিয়ার শেষ ফোন
সোদপুরের নতুন চকচকে 'অপরাজিতা'র একতলার ঘরের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
গতকাল বিকেলের পোড়ানো বই আর কাগজপত্রের ছাইগুলো বাতাসে উড়ে গিয়ে মেটে গলির কাদাজলে বিলীন হয়ে গেছে। মার্বেল পাথরের উঠোনটা এখন একদম পরিষ্কার, শুধু বাতাসের ঝাপটায় দু-একটা শুকনো পাতা মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে। ঘরের ভেতরের মেহগনি কাঠের ফাঁকা তাকগুলো শূন্য, নিঃস্ব। যে বই আর শব্দজাল নিয়ে তিনি প্রায় চার দশক কাটিয়েছিলেন, তার কোনো অস্তিত্ব আর এই ঘরে নেই।
টেবিলের ওপর রাখা সস্তা স্মার্টফোনটা হঠাৎ বেশ কড়া শব্দে কম্পিত হয়ে উঠল।
অরিন্দম ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে একটি অচেনা ল্যান্ডলাইন নম্বর—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সেকশনের ফোন।
তিনি ফোনটা কানে তুললেন।
"হ্যালো, প্রফেসর মুখার্জী?" ওপার থেকে ক্লার্ক ভাদুড়ীবাবুর চেনা, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল। পটভূমিতে টাইপরাইটারের খটখট শব্দ আর পুরনো নথিপত্রের খসখসানি। "আমি রেজিস্ট্রার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছি স্যার। আপনার পেনশনের গ্র্যাচুয়িটি আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের কাগজগুলো প্রস্তুত হয়েছে। আপনার বরখাস্তকরণের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু সই লাগবে। আর ডিপার্টমেন্টের চার্জ হ্যান্ডওভারের যে বাকি ফাইলগুলো ছিল... আপনি কি একবার অফিসে আসতে পারবেন, নাকি ডাকযোগে পাঠাব?"
অরিন্দমের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠল না। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে করিডোরে তাঁর হাঁটার শব্দে ছাত্ররা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যেত, সেখানে আজ তাঁর পরিচয় কেবল কয়েকটি প্রশাসনিক ফাইল আর 'হ্যান্ডওভার'-এর নথিপত্র।
"ডাকযোগেই পাঠিয়ে দিন, ভাদুড়ীবাবু," অরিন্দম খুব নিরাসক্ত, সমতল কণ্ঠে বললেন। "আমি সই করে রেজিস্ট্রি পোস্টে ফেরত পাঠিয়ে দেব। ওখানে গিয়ে নতুন করে ঝামেলা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই।"
"ঠিক আছে স্যার... আপনার যা ইচ্ছে," ক্লার্কের গলায় এক ধরণের বৈষয়িক তাচ্ছিল্য। "তবে পেনশনের পুরো টাকাটা পেতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ডিসিপ্লিনারি কমিটির ফাইনালাইজেশন লেটারটা যুক্ত করতে হয়েছে তো..."
"অসুবিধা নেই। রাখছি।"
কথা শেষ করে অরিন্দম ফোনটা কেটে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন, অমনি স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। এবার একটি অচেনা মোবাইল নম্বর।
তিনি কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে চেয়ে রইলেন নম্বরটার দিকে। তারপর বোতামে চাপ দিয়ে ফোনটা আবার কানে ধরলেন।
"হ্যালো?"
ওপার থেকে দু-এক সেকেন্ডের ভারী নীরবতা। তারপর ভেসে এল একটি চেনা কণ্ঠস্বর—
"হ্যালো, স্যার?"
স্বরটি রিয়ার। কিন্তু সেই কণ্ঠে আর আগের মতো সেই চঞ্চলতা, অপরাধবোধ বা আকুতির কাঁপন নেই। সেখানে থিতু হয়েছে এক ধরণের আত্মবিশ্বাসী, প্রাপ্তবয়স্ক কাঠিন্য। যে মেয়েটি একসময় বোদলেয়ার আর রিলকের কবিতার পংক্তি আওড়ে তাঁর ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিল, এই কণ্ঠস্বর যেন আর তাঁর নয়; এক নতুন রিয়া সেনের, যে জীবনের খেলায় নিজের রাস্তা খুঁজে পেয়েছে।
"বলুন রিয়া," অরিন্দম জানলার কাচে কপাল ঠেকিয়ে সোদপুরের গলির দিকে তাকালেন।
জানলার ঠিক বাইরের কার্নিশে একটা চেনা কালো দাঁড়কাক বসে ডানার ধুলো ঝাড়ছিল। রোদের আলো লেগে তার কালো পালকগুলো বেগুনি আভা ছড়াচ্ছিল।
"আমার স্কলারশিপটা অনুমোদন হয়েছে, স্যার," ওপার থেকে রিয়ার গলা ভেসে এল। কোনো ভূমিকা বা কুশলসংবাদ বিনিময়ের তোয়াক্কা না করেই রিয়া বলল, "আমি আগামী মাসে বব ডিলানকে নিয়ে পোস্ট-ডক্টরেট গবেষণার জন্য এডিনবরা যাচ্ছি। ভিসা হয়ে গেছে।"
অরিন্দম এক মুহূর্ত থামলেন। জানলার কাচে তাঁর নিঃশ্বাসের বাষ্প জমে একটু ঘোলাটে হয়ে গেল।
"শুভকামনা," অরিন্দম খুব সংক্ষেপে, মেপে জবাব দিলেন।
ফোনের ওপারে আবার স্তব্ধতা নেমে এল। প্রায় পাঁচ-ছয় সেকেন্ড ধরে কেবল একটি রেশমি সংযোগের আবছা খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সোদপুরের স্তব্ধ ঘরের ভেতরের ঘড়ির কাটার শব্দটা যেন সেই নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছিল।
"আপনি কি স্যার আমাকে এখনও ঘৃণা করেন?" রিয়ার গলায় অবশেষে একটি ছোট প্রশ্ন ফুটে উঠল। তাতে কান্নার আর্দ্রতা ছিল না, ছিল স্রেফ একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌতূহল।
অরিন্দম একটু থামলেন। বাইরে কার্নিশের দাঁড়কাকটা ডানা দুটো মেলে দিয়ে শূন্যে উড়াল দিল, তারপর সোদপুরের ইলেকট্রিক তারের ওপর গিয়ে বসল।
"না রিয়াদেবী," অরিন্দম উত্তর দিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর বরফশীতল ও স্থির। "ঘৃণা করার জন্য ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। আমার সেই ক্ষমতাও আর নেই। আপনি আপনার জীবন অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন আমাকে ব্যবহার করে, সেটাই আসল। আমার কথা আর ভেবে সময় নষ্ট করবেন না।"
রিয়া ওপার থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু সেই শ্বাসে কোনো ক্ষোভ বা অনুশোচনা স্পষ্ট হলো না।
"ভালো থাকবেন, স্যার। আমাকে ভুল বুঝবেন না," রিয়ার গলায় এবার এক ধরণের যান্ত্রিক শ্রদ্ধাবোধ ফুটে উঠল। "আপনি সারাজীবনই আমার স্যার হয়েই থাকবেন। অনেক কিছু শিখেছি আপনার কাছ থেকে। আপনি আমাকে সত্যিই পাল্টে দিয়েছেন।"
"ভালো থাকবেন," অরিন্দম কথা বাড়ালেন না।
ফোনটা কেটে গেল। টিপ করে একটা ছোট শব্দ হয়ে স্ক্রিনটা আবার কালো হয়ে এল।
অরিন্দম ফোনটা পকেটে পুরে জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আকাশে বিকেলের আলো হেলে পড়ছে।
তাঁর মনে হলো, মানুষের সম্পর্কগুলো কোনো মহাকাব্যের মতো নিখুঁত বা সুসংহত পরিণতি পায় না। সেখানে কোনো বড় অপরাধের পর বড় কোনো মিলন বা নাটীয় আত্মত্যাগের ক্ষমা পর্ব থাকে না। অতীতটা স্রেফ একটা বাসি নথির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে ধুলো খায়, আর মানুষগুলো একসময় নিঃশব্দে নিজ নিজ কক্ষপথে দূরে সরে যায়। রিয়া তাঁর পতনকে সিড়ি বানিয়ে এডিনবরার দিকে পাড়ি দিল, আর তিনি রয়ে গেলেন সোদপুরের এই চকচকে, ফাঁকা ঘরের নিঃসঙ্গতায়।
ঘৃণা করার মতো শক্তিও এখন আর তাঁর ভেতরে অবশিষ্ট নেই; রয়ে গেছে কেবল এক নির্মম, নির্লিপ্ত বেঁচে থাকা।
অধ্যায় ৩৯: পচনের দায়িত্ব ও মৃত্যুশয্যা
ঝুম বৃষ্টির সোঁদা আর প্যাচপ্যাচে গন্ধের সাথে এক তীব্র, গা-গুলিয়ে-ওঠা বাসি পচনের দুর্গন্ধ সোদপুরের ভেজা বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল।
মাধবীর পশু আশ্রয়কেন্দ্রের পেছনের টিনের চালার শেডটাতে লাইটের হলদে বাল্বটা পিটপিট করে জ্বলছে। তিন দিনের মধ্যে ছোঁয়াচে ক্যানাইন পারভো আর ডিস্টেম্পারের মারণ কামড়ে এক এক করে দশটি আশ্রয়হীন, পরিত্যক্ত কুকুরের মৃত্যু হয়েছে। শেষ দুটো অবাধ্য কুকুরের নিথর, শক্ত হয়ে যাওয়া দেহ তখনো শেডের ট্রলিতে পড়েছিল। ফিনাইল আর ব্লিচিং পাউডারের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধও মাংশের সেই কাঁচা পচন আর রক্তের বোকা বোকা গন্ধে হার মেনেছে।
রাত দুটো বাজে। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, যেন আকাশ সোদপুরের সমস্ত জঞ্জাল ধুয়েমুছে নর্দমায় ভাসিয়ে দিতে চায়।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে একটা প্লাস্টিকের ট্রেচারে একটা মরা কুকুরকে তুলছিলেন। তাঁর পরনে কালো রঙের পুরনো একটা প্লাস্টিকের রেইনকোট, মাথা উন্মুক্ত। মুখ থেকে দেশি মদের ঝাঁঝালো তিতকুটে গন্ধ আর শরীরে ফিনাইলের ভ্যাপসা আবহা। একসময় যাঁর আঙুলে লাগত চকের মিহি গুঁড়ো আর বায়রনের বইয়ের পাতলা রেশম, সেই আঙুল দুটো এখন চটচটে, জমে যাওয়া রক্তের আস্তরণে কালচে হয়ে আছে।
মাধবী অন্যপাশ থেকে ট্রেচারটা আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর চুলগুলো ঘামে আর বৃষ্টিতে ভিজে কপালে সেঁটে আছে, চোখে ক্লান্তির গভীর চাপ।
"আর দুটো বাকি আছে অরিন্দম," মাধবী ভারী গলায় বললেন, তাঁর শ্বাস দ্রুত পড়ছিল। "পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত তিনটে বেজে যাবে। মিউনিসিপ্যালিটির ভাগাড়ে রাতের বেলায় গর্ত খোঁড়া সহজ হবে না।"
অরিন্দম কোনো কথা বললেন না। তিনি স্রেফ ট্রেচারের ভারটা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।
পুরনো মিনিট্রাকটার পেছনের খোলা ডেক-এ ইতিমধ্যে আটটি পশুর মৃতদেহ পলিথিনে মুড়ে রাখা ছিল। বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে সেগুলো এক অদ্ভুত, শীতল নিথরতায় শুয়ে ছিল। অরিন্দম ও মাধবী শেষ দুটো দেহও শক্ত করে প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে ওপরের দিকে তুলে দিলেন। ধাতব ডেখে গড়িয়ে পড়ল রক্ত আর নোংরা জলের সরু স্রোত।
মিনিট্রাকটা সোদপুরের আলো-আঁধারি কলোনির গলি পেরিয়ে খালপাড়ের নির্জন, বিশালাকার ভাগাড়টার দিকে চলতে শুরু করল।
সোদপুরের উত্তর-পশ্চিম কোণে গঙ্গার অববাহিকার দিকে বিশাল ভাগাড়টা যেন এক অন্য রাজ্য। পুরো শহরের আবর্জনা, পচা প্লাস্টিক, পশুপাখির বর্জ্য আর পচনের পাহাড় জমে আছে সেখানে।
মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। ট্রাকের সামনের দুটো তীব্র হলুদ হেডলাইটের আলো গিয়ে পড়েছিল জমা হয়ে থাকা পাহাড়প্রমাণ জঞ্জাল আর কালো কাদার ওপর। চারপাশে কোনো মানুষ নেই, কেবল মাঝে মাঝে উড়ে যাওয়া কয়েকটা ভিজে শকুন আর বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা নির্জনতার হাহাকার।
অরিন্দম আর মাধবী ট্রাক থেকে নিচে নামলেন। জুতো জোড়া কাদায় বসে যাচ্ছিল। হাঁটু সমান কালো, দুর্গন্ধযুক্ত কাদায় পা ফেলে অরিন্দম ট্রাকের পেছনের দরজাটা খুললেন।
মাধবী একটা ভারি লোহার কোদাল আর দুটো টর্চ হাতে এগিয়ে এলেন। "আমি কোদালটা ধরছি অরিন্দম, তুমি আলোটা ধরো—"
অরিন্দম মাধবীর হাত থেকে এক ঝটকায় কোদালটা নিজের মুঠোয় টেনে নিলেন।
"তুমি আলোটা ধরে রাখো মাধবী," অরিন্দমের গলা অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু তাতে এক অনমনীয় জেদ।
তিনি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে কাদার স্তূপে কোদালের কোপ বসালেন।
ছাঁৎ!
লোহার ফলাটা কালো মেটে কাদায় কেটে বসে গেল। বিকেলের রোদে শুকিয়ে ওঠা কাদা আর বৃষ্টির জলে থকথকে হয়ে থাকা ময়লার নিচে এক গভীর গর্ত খোঁড়ার কাজ শুরু হলো।
এক কোপ, দু কোপ... অরিন্দম অনবরত কোদাল চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর গায়ের রেইনকোট ভিজে গায়ে সেঁটে গেছে। সুতির শার্টের ভেতরে ঘাম আর বৃষ্টির জল এক হয়ে চুইয়ে পড়ছিল। হাতঘড়ির কাচ ঘোলা হয়ে গেছে। হাতের তালুর নরম চামড়া অনেক আগেই ফেটে গিয়ে ফোস্কা গলে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। কোদালের কাঠের হাতলটায় তাঁর নিজের ক্ষত থেকে ক্ষরিত রক্ত কাদার সঙ্গে মিশে পিচ্ছিল হয়ে উঠেছিল।
"অরিন্দম তুমি এবারে ট্রাকে গিয়ে বোসো। আমি বাকিটা করছি," মাধবী হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন। মাধবীর গলার স্বরে এক গভীর মমতা আর ভীতি মিশে ছিল। "তোমার হাত কেটে রক্ত পড়ছে! ইনফেকশন হয়ে যাবে!"
অরিন্দম থামলেন না। কোদালের চোট আবার কাদার ওপর পড়তে লাগল—ছাঁৎ! ছাঁৎ!
কাদার ছিটে এসে লাগল তাঁর মুখে, গালে, চশমার কাচে।
"না মাধবী," অরিন্দম থামলেন, একবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন। তাঁর গলায় এক অদ্ভুত, অপার্থিব প্রশান্তি। "আমাকেই এটা করতে দাও। আমি সারাজীবন সুন্দর সুন্দর জিনিসের সেবা করেছি—কবিতা, সুন্দরী নারী, ক্লাসরুমের প্রশংসা, সস্তা নাম-যশ। আজ আমাকে এই পচনেরও সেবা করতে দাও। জীবনের এই অংশটাই আমার আসল পাওনা ছিল।"
কথাটা বলেই অরিন্দম আবার দ্বিগুণ শক্তিতে কোদাল চালাতে লাগলেন।
মাধবী হাত সরিয়ে নিলেন। তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন টর্চের হলুদ আলোটা ধরে।
টর্চের সেই হলদেটে আলোয় মাধবী দেখলেন—সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কলকাতার কোনো নামজাদা কলেজের স্বনামধন্য প্রফেশনাল বুদ্ধিজীবী ‘প্রফেসর মুখার্জী’ নন। বুর্জোয়া আভিজাত্যের রূপক খোলসটা, তত্ত্বের অহংকার আর ক্লাসরুমের সাজানো নৈতিকতার বর্মটা পুরোপুরি খসে পড়েছে। সেখানে জেগে উঠেছে এক চরম নগ্ন, নিরহংকারী রক্ত-মাংসের মানুষ—যে নিজের জীবনের সমস্ত ক্ষত আর অপমানকে এই ভাগাড়ের পচনের সাথে এক করে মেনে নিয়েছে।
গর্ত খোঁড়া শেষ হলো।
অরিন্দম এক এক করে পলিথিনে মোড়া নিথর দেহগুলোকে সযত্নে তুলে নিয়ে গর্তের ভেতর শুইয়ে দিতে লাগলেন। কোনো ঘৃণা নেই, কোনো দ্বিধা নেই। যেন তিনি কোনো পবিত্র বেদীতে নৈবেদ্য সাজাচ্ছেন।
সবকটা দেহ শেষ হলে, তিনি আবার কোদাল তুলে মাটির ডেলাগুলো ওপরে ফেলতে শুরু করলেন।
বৃষ্টির জলের তোড়ে পচা কাদা আর মাটির স্তর ঢেকে দিল অবোলা প্রাণীদের শেষ শয্যাকে। অরিন্দম কোদালটা কাদায় পুঁতে রেখে, গর্তের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তাঁর দু হাত কাদায় মাখামাখি, কপালে লেপ্টে থাকা ভিজে চুলের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে চিবুক বেয়ে।
মাধবী নিঃশব্দে এগিয়ে এসে অরিন্দমের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ ছাড়া সোদপুরের সেই গভীর রাতের ভাগাড়ে আর কোনো আওয়াজ ছিল না।
অরিন্দম নিজের কাদা মাখা হাতের দিকে চাইলেন। কোনো মন্দিরে, কোনো মসজিদে বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে যে আত্মশুদ্ধি হয় না, সেই পরম নগ্ন আত্ম-আবিষ্কার আজ ঘটে গেছে এই আবর্জনা আর পচনের মাঝখানে। জীবনের সমস্ত ভণ্ডামি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে, রয়ে গেছে কেবল টিকে থাকার এক নগ্ন, আদিম ও পবিত্র অস্তিত্ব।
অধ্যায় ৪০: নতুন সামাজিক চুক্তি
নয়ডার খামারবাড়ির খোলা বারান্দায় দুপুর দুটো নাগাদ হাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আকাশে একটা ফিকে তামাতে মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। দূরে, চারপাশের নির্মাণাধীন আবাসনগুলোর ধু-ধু ধুসর প্রান্তরে একটা ট্র্যাক্টর একঘেয়ে শব্দে মাটিকে চষে চলেছে।
বারান্দার পুরনো সেগুন কাঠের লম্বা টেবিলটার ওপর দুটো একশো টাকার সবুজ স্ট্যাম্প পেপার ছড়ানো। স্ট্যাম্প পেপারের কোণ দুটো বাতাসে যাতে উড়ে না যায়, সেজন্য তার ওপর রাখা আছে একটা পিতলের ভারী পেপারওয়েট। টেবিলের একপাশে বসে আছেন নয়ডা পঞ্চায়েত এলাকার নোটারি উকিল দেবেন্দ্র শর্মা। তাঁর সাদা কুর্তার ওপর একটি নোংরা চশমা ঝুলছে, আর হাতের আঙুলে কালি লেগে আছে। তিনি পকেট থেকে পাইপ বের করে একবার দেখলেন, তারপর আবার পকেটে রেখে দিয়ে স্ট্যাম্প পেপারের আইনি বয়ানটা চোখ বুলিয়ে নিতে লাগলেন।
টেবিলের ঠিক উল্টোদিকে বসে আছেন মেঘলা। তাঁর পরনে একটি সাধারণ সুতির বাটিকের শাড়ি। চার মাসের গর্ভধারণের চিহ্ন তাঁর পেটে সামান্য স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, কিন্তু তাঁর বসায় বা মুখের চেহারায় কোনো শিথিলতা নেই। তাঁর পাশে বসে আছেন ডাক্তার মাধবী পাল। মাধবীর হাতদুটো টেবিলের ওপর শক্ত করে রাখা, চোখেমুখে গভীর পর্যবেক্ষণ ও এক ধরনের কঠিন বাস্তবতা।
বারান্দার শেষ মাথায়, সিমেন্টের খুঁটিটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে পেট্রাস। তার গায়ের কালো চামড়ায় বিকেলের তির্যক রোদ এসে পড়েছে। তার চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু সতর্ক। পেট্রাসের ঠিক দু-পা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ঈমান। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক, তার চোখের দৃষ্টি মাটির দিকে নিবদ্ধ, পায়ে একটা পুরনো প্লাস্টিকের চটি। সে অনবরত তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের তালু ঘষে চলেছে।
আর টেবিলের এক কোণে, ছায়ার মধ্যে চুপচাপ বসে আছেন অরیندম মুখোপাধ্যায়। তাঁর গায়ে একটা ঢিলেঢালা সুতির ফতুয়া, চোখের নিচে কালি, হাতদুটো হাঁটুর ওপর রাখা। তাঁর আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছে।
নোটারি দেবেন্দ্র শর্মা চশমাটা নাকের ওপর উঠিয়ে কাগজ দুটো হাতের তালুতে একটু ঠুকে নিলেন।
"বাংলায় তো পুরোটা পড়ে শোনানোর দরকার নেই, তাই না? মূল বিষয়গুলো আপনারা আগেই বুঝে নিয়েছেন," দেবেন্দ্র শর্মা অরیندমের দিকে তাকিয়ে বললেন।
অরیندম কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি বাইরে ধুলো ওড়া পথটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মাধবী গলা পরিষ্কার করে বললেন, "আইনি বয়ানটা মেঘলাকে একবার স্পষ্ট করে শুনিয়ে দিন শর্মাMethod।"
নোটারি টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে খসখসে গলায় পড়তে শুরু করলেন, "এই দলিল অনুসারে, নয়ডা পরগনার অন্তর্গত সংশ্লিষ্ট ৫ বিঘা খামারজমির ৪০ শতাংশ অংশীদারিত্ব যৌথভাবে পেট্রাস এবং অনাগত সন্তানের নামে হস্তান্তরিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মেঘলা মুখোপাধ্যায়ের অনাগত সন্তানের আইনি পিতা হিসেবে ঈমানের নাম নথিভুক্ত থাকবে, যার বিনিময়ে উক্ত জমিতে বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষ, স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা কলোনি সিন্ডিকেট কোনোপ্রকার স্বত্ব দাবি করতে পারবে না। তৃতীয়ত, পেট্রাস এবং ঈমান যৌথভাবে উক্ত ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, চাষাবাদ এবং পরিবারের পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষার দায় বহন করবে..."
পড়া শেষ করে শর্মা চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। "আইনগতভাবে বিষয়টা সম্পূর্ণ পরিষ্কার। তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো, সামাজিক দিক থেকে এই ধরনের চুক্তি সচরাচর দেখা যায় না। আপনারা কি সবাই এতে সম্মত?"
মেঘলা শান্ত গলায় বলল, "হ্যাঁ। আমরা সম্মত।"
অরیندম মাথা তুললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তিনি মেঘলার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো সামান্য রক্তাভ।
"মেঘলা..." অরیندমের গলার স্বর কাঁপছিল। "তুমি কি সত্যিই এটা করছ? একমুঠো জমি আর সুরক্ষার বদলে... একজন ধর্ষককে তোমার সন্তানের পিতা বলে সই করে দিচ্ছ? তোমার মাথার মধ্যে কি একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না?"
মেঘলা অরیندমের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখে কোনো অপরাধবোধ বা দ্বিধা ছিল না।
"বাবা, তুমি আবার সেই পুরনো শব্দগুলো ব্যবহার করছ," মেঘলা খুব ধীরে ধীরে বলল। "ধর্ষক, অনুশোচনা, আত্মমর্যাদা। এই শব্দগুলো কলকাতার ড্রয়িংরুমে বা মাস্টার্স ক্লাসের সেমিনারে শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এখানে, এই ধুলো আর শুকনো মাটির ওপর দাঁড়িয়ে ওগুলোর কোনো দাম নেই।"
"দাম নেই?" অরیندম চেয়ারটা সামান্য পেছনের দিকে সরিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। "নিজের শরীর, নিজের সন্তান আর নিজের নামকে একটা পশুর হাতে তুলে দেওয়ার নাম টিকে থাকা? তুমি নিজের হাতে নিজেকে বন্ধক দিচ্ছ মেঘলা! ওরা তোমাকে ব্যবহার করেছে, আর তুমি ওদের সাথেই চুক্তি করছ?"
মাধবী অরیندমের হাতটার ওপর নিজের হাত রাখলেন। "অরیندম, শান্ত হও। চিৎকার করে কোনো লাভ হবে না।"
"তুমি চুপ করো মাধবী!" অরیندম হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন। "তুমি ভেটেরিনারি ডাক্তার হতে পারো, প্রাণীদের ইউথানেসিয়া দিতে পারো, কিন্তু এটা একটা মানুষের জীবন! এটা আমার মেয়ে! মেঘলা, তুমি কি বুঝতে পারছ না, এর পর তোমার নিজের বলতে আর কিছু থাকবে না? এই ঈমান, এই পেট্রাস... ওরা তোমাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে তুমি ওদের দয়ায় বেঁচে আছ!"
মেঘলা টেবিল থেকে নীল কালির বলপেনটা তুলে নিল। আঙুলের ডগায় কলমটা একবার ঘুরিয়ে নিয়ে সে বাবার দিকে তাকাল।
"বন্ধক নয় বাবা, এটা একটা বিনিময় প্রথা," মেঘলার গলা পুরোপুরি সমতল, যেন সে একটা হাটবাজারের হিসেব নিকাশ করছে। "আমি ওদের জমি দিচ্ছি, আর একটা আইনি পরিচয় দিচ্ছি। তার বদলে ওরা আমাকে আর আমার সন্তানকে এই পৃথিবীতে টিকে থাকার, নিঃশ্বাস নেওয়ার আর শান্তিতে ঘুমানোর অধিকার দিচ্ছে। নয়ডার এই গ্রামগুলোতে একক কোনো মেয়ের জমি বেশিদিন অক্ষত থাকে না। স্থানীয় পলিটিক্স বা রিফিউজি কলোনির ক্যাডাররা যেকোনো দিন এসে জমি দখল করে আমাদের তাড়িয়ে দিত। পেট্রাস আর ঈমানের গোষ্ঠী পিছনে থাকলে কেউ এই খামারে পা দেওয়ার সাহস পাবে না।"
"আর নীতি? তোমার শিক্ষা? তোমার রুচি?" অরیندম প্রায় ফুসে উঠলেন। "একজন মুসলিম, অপরাধী যুবকের নাম তোমার সন্তানের পাশে বসাবে? সমাজ তোমাকে কী বলবে?"
মেঘলা একটু হাসল। খুব ফিকে, শুষ্ক এক চিলতে হাসি। "সমাজ তো ইতিমধ্যেই আমাকে অনেক কিছু বলে ফেলেছে, তাই না? আর ধর্মের কথা বলছ? আমি কোনো ধর্ম পরিবর্তন করছি না। আমার সন্তান মেঘলা মুখোপাধ্যায়ের সন্তান হিসেবেই বড় হবে, সে হিন্দু ও বাঙালি পরিচয় নিয়েই থাকবে। ঈমান বা পেট্রাস তার ওপর কোনো ধর্মীয় অনুশাসন চাপাতে আসবে না—চুক্তিতে সেটা স্পষ্ট লেখা আছে। আমি ওদের কোনো ভালোবাসা দিচ্ছি না বাবা, আমি ওদের নিরাপত্তা কিনছি।"
ঈমান দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দার কোণে। সে হঠাৎ গলা পরিষ্কার করে নিচু স্বরে বলল, "আম্মা... আমি জমিতে কোনো দাবি করব না। শুধু আপনি আর বাচ্চাটা শান্তিতে থাকেন, সেটুকুই চাই।"
অরیندম তীক্ষ্ণ চোখে ঈমানের দিকে তাকালেন। "তুমি মুখ বন্ধ করো! তোমার মতো মানুষের মুখে এসব উপদেশ মানায় না। তুমি তো শিকারী, এখন সুযোগ বুঝে শিকারের মালিক হতে এসেছ!"
ঈমান আর কিছু বলল না। সে আবার মাটির দিকে মুখ নামিয়ে নিল।
পেট্রাস এগিয়ে এলো। তার ভারী বুটের শব্দ কাঠের মেঝেতে গমগম করে উঠল। সে অরیندমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিচু, গম্ভীর গলায় বলল, "প্রফেসর সাব, আপনি বই অনেক পড়েছেন, কিন্তু মাটি বোঝেন না। এই মেমেসাহেব একা থাকতে পারবে না। আপনিও সারা জীবন এখানে বসে পাহারা দিতে পারবেন না। রক্ত যখন ঝরে গেছে, তখন সেই রক্ত দিয়ে চুক্তি করাই ভালো, যাতে নতুন করে আর রক্ত না পড়ে।"
অরیندম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। পেট্রাসের চোখের স্থিরতার সামনে তাঁর এত বছরের সাজানো ব্যাকরণ, রোমান্টিক সাহিত্য আর বায়রনের কাব্যের পংক্তিগুলো এক মুহূর্তেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
"মেঘলা, তুমি শেষ চেষ্টাটা করো না..." অরیندম একদম নিচু স্বরে বললেন, তাঁর গলায় এবার আর রাগ ছিল না, শুধু এক অসহায় মিনতি ছিল। "চল, সোদপুর ফিরে যাই। আমার যা আছে, তাই দিয়ে আমরা দুজনে বাচ্চাটাকে মানুষ করব। এই নরকে থাকার কোনো দরকার নেই।"
মেঘলা কলমটার খাপটা খুলল। "সোদপুরে গিয়ে কী করব বাবা? তোমার প্রতিবেশীদের ফিসফিসানি শুনব? নাকি তোমার ওই ভেটেরিনারি ক্লিনিকের পাশে বসে কুকুরগুলোর চিৎকার শুনব? সোদপুরে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমার ভবিষ্যৎ এখন এই পেটের ভেতরে, আর তাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে আমাকে এই ধুলোর মধ্যেই নামতে হবে। জয়ী হতে গেলে অনেক সময় বিজিতের মতো চুক্তি করতে হয়।"
মেঘলা ঝুঁকে পড়ল। প্রথম স্ট্যাম্প পেপারের ডানদিকের কোণে পরিষ্কার, সুনির্দিষ্ট টানে সই করল—'মেঘলা মুখোপাধ্যায়'।
তারপরেই দ্বিতীয় স্ট্যাম্প পেপারে সই করল।
সই করার পর সে কলমটা বাড়িয়ে দিল নোটারির দিকে। নোটারি দেবেন্দ্র শর্মা ঈমনের দিকে তাকালেন। "এদিকে আসো। এখানে সই করো। সই করতে পারো, নাকি টিপসই?"
আমি MA পাস করেছি
ঈমান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার হাত সামান্য কাঁপছিল। সে মেঘলার কাছ থেকে কলমটা নিল। সই করার জায়গায় বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে উর্দুতে, বাঁকা বাঁকা অক্ষরে লিখল—'ঈমন আলী'।
তারপরে পেট্রাস এগিয়ে এসে তার সই সম্পূর্ণ করল।
"এবার দুজন সাক্ষীর সই লাগবে," নোটারি বললেন।
মাধবী এগিয়ে এলেন। তিনি মেঘলার দিকে একবার তাকালেন, তারপর কলম নিয়ে নিজের সইটা করে দিলেন—'ডা মাধবী পাল'।
নোটারি এরপর অরیندমের দিকে কলমটা বাড়িয়ে দিলেন। "প্রফেসর সাব, আপনি দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সই করে দিন।"
অরیندম কলমটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো কলমটা যেন কোনো জ্বলন্ত লোহার টুকরো। তিনি তাঁর কাঁপতে থাকা হাত দুটো টেবিলের নিচে সরিয়ে নিলেন।
"না," অরیندম বিড়বিড় করে বললেন। "আমি সই করব না।"
"বাবাকে জোর করার দরকার নেই শর্মাMethod," মেঘলা বলল। "মাধবী মাসি সই করেছে। আরেকজন স্থানীয় কাউকে ডেকে নিন।"
নোটারি বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর সহকারীকে ডেকে নিলেন। সহকারী এসে চটপট একটা সই করে দিল। নোটারি তাঁর আইনি সিলমোহর বের করে বেশ কয়েকবার থাপ্পড় মারার মতো শব্দে স্ট্যাম্প পেপারের ওপর বসিয়ে দিলেন।
"কাজ শেষ," নোটারি উঠে দাঁড়িয়ে কাগজগুলো গুছিয়ে ফাইলবন্দি করলেন। "এক কপি মেঘলা দেবীর কাছে থাকবে, এক কপি পঞ্চায়েত অফিসে জমা পড়বে।"
নোটারি তাঁর ফি নিয়ে সহকারীকে সাথে করে বারান্দা থেকে নেমে চলে গেলেন। তাঁর পুরনো বাজাজ মোটরবাইকের শব্দটা আস্তে আস্তে দূরের ধুলোওড়া রাস্তায় মিলিয়ে গেল।
বারান্দায় এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। বাতাসে শুধু শুকনো পাতার খসখস শব্দ।
পেট্রাস ঈমনের দিকে তাকাল। "চল, পেছনের ক্ষেতের পাঁচিলটা মেরামত করতে হবে। বিকেলে কলোনির লোক আসতে পারে।"
ঈমন মাথা নাড়ল। সে যাওয়ার আগে একবার মেঘলার দিকে তাকাল, তারপর খুব ধীরে ধীরে বলল, "বিকেলে দুধ আর সবজি আমি নিয়ে আসব ।"
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। পেট্রাস আর ঈমান বারান্দা থেকে নেমে পেছনের খামারবাড়ির দিকে হেঁটে চলে গেল।
অরیندম শক্ত হয়ে চেয়ারে বসে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে দিয়ে দুটো মানুষ হেঁটে চলে গেল—একজন যে তাঁর মেয়েকে নির্যাতন করেছিল, আর একজন যে সেই নির্যাতনের সুযোগ নিয়ে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করল। অথচ তাঁর নিজের রক্ত, তাঁর নিজের মেয়ে, তাদের হাতেই নিজেকে সঁপে দিল এক টুকরো সুরক্ষার বিনিময়ে।
"তুমি এখন খুশি?" অরیندম মেঘলার দিকে না তাকিয়েই বললেন।
মেঘলা চেয়ার থেকে উঠল। সে তার পেটের ওপর হাতটা হালকা করে রাখল। "খুশি হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্ন নয় বাবা। আমি শুধু কাল সকালের রোদটা দেখার ব্যবস্থা করলাম।"
মাধবী উঠে দাঁড়িয়ে অরیندমের কাঁধে হাত রাখলেন। "অরیندম, চলো। ঘরের ভেতরে চলো। বাইরে রোদের তেজ বাড়ছে।"
অরیندম ধীরে ধীরে উঠলেন। তাঁর মনে হলো তাঁর শরীরটা যেন এক মুহূর্তে বহুবছর ভারী হয়ে গেছে। তিনি বারান্দার কোণে রাখা পুরনো কাঁচের গ্লাসটার দিকে তাকালেন, যার ভেতরে একটা মরা মাছি ভাসছে।
সংস্কৃতি, নীতি, পিতার অধিকার এবং শত শত বছরের সামাজিক আভিজাত্য—সবকিছুই আজ একশো টাকার দুটো স্ট্যাম্প পেপারের নিচে চাপা পড়ে গেল। একটি নতুন, নির্দয় এবং বাস্তববাদী সামন্ততন্ত্রের জন্ম হলো নয়ডার এই ধূসর প্রান্তরে, যেখানে বেঁচে থাকাই একমাত্র সত্য, আর নীতি কেবল বিজিতদের বিলাসিতা।
অরیندম ধীর পায়ে ঘরের অন্ধকারের দিকে হেঁটে গেলেন।
অধ্যায় ৪১: সন্ধ্যার কুয়াশা ও নীরব সমর্পণ
উত্তর ভারতের সমভূমিতে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতেই কুয়াশার পর্দাটা নেমে আসে খুব দ্রুত। বিকেল সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই চারপাশের দিগন্ত থেকে আলোর সবকটি রেখা যেন ধোঁয়াটে এক ধূসরতায় শোষিত হয়ে যেতে শুরু করে। দূরে নির্মাণাধীন আবাসনগুলোর কঙ্কালসার ছাঁচ আর শুকনো ক্ষেতের মেঠো রাস্তা—সবকিছুই সেই ঘন হতে থাকা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আসছিল।
নয়ডার খামারবাড়ির সীমানার শেষ মাথায় একটা পুরোনো মেহগনি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার কাণ্ড রুক্ষ, ছাল ওঠা। সেই মোটা কাণ্ডটাতে হেলান দিয়ে মাটির ওপর বসেছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।তাঁর গায়ে একটা পাতলা, সুতির মলিন ফতুয়া আর পুরনো চাদর। শীতের হিমালয়-ছোঁয়া ঠান্ডা বাতাসটা চামড়ায় এসে বিঁধছে, কিন্তু তাঁর কোনো নাড়াচাড়া নেই। তাঁর চোখের চশমার দুটো কাচেই কুয়াশা আর বাষ্প জমে একটা অস্বচ্ছ পরদা তৈরি হয়েছে। তিনি চশমাটা খুললেন না। আবছা কাচের মধ্য দিয়ে এই বদলে যাওয়া পৃথিবীর রঙগুলোকে দেখতে তাঁর বেশ লাগছিল—যেন চারপাশের সবকিছুই বাস্তবতার রুক্ষ ধারগুলো হারিয়ে কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতির কোলাজে পরিণত হয়েছে।
তিনি তাঁর দুটো হাতের দিকে তাকালেন। চাদরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা হাতদুটোর চামড়া খসখসে, কুঁচকে যাওয়া; নখগুলো ভাঙা এবং নখের কোণে মেহগনি গাছের গোড়ার শুকনো ধুলো জমে আছে। ৬০ বছরের একটি শরীর। যে শরীর একদিন শেক্সপিয়ার, বায়রন আর জীবনানন্দের পংক্তি উচ্চারণে ঝঙ্কৃত হতো, যে শরীর কলকাতার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত লেকচার হলে হাজারো তরুণ-তরুণীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল—আজ সেই শরীর কেবল জরা আর ধূসর ধূলিকণার এক সংমিশ্রণ।হঠাৎই দূর থেকে একটা একঘেয়ে ধাতব শব্দ ভেসে এলো। কুয়াশার বুক চিরে ধীরগতিতে এগিয়ে আসছে একটা পুরনো ট্র্যাক্টর। ট্র্যাক্টরের আসনে বসে আছে ঈমন। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক, তার গায়ে একটা ঢিলেঢালা জ্যাকেট, মাথায় মাফলার পেঁচানো। তার ঠিক পাশে, ট্র্যাক্টরের লোহার কাঠামোর ওপর হাত রেখে শান্ত, অবিচল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে পেট্রাস। তারা দুজনে খামারের সীমানা বরাবর শেষবারের মতো জমিটা টহল দিচ্ছে। ট্র্যাক্টরের হেডলাইটের দুটো হলুদ আলোর ফালি কুয়াশার দেওয়ালে আছড়ে পড়ে যেন দুটো নিস্তেজ চোখের মতো জ্বলছে। অরিন্দম চোখ সরিয়ে নিলেন।
সামনের কাঠের লম্বা বারান্দায় তখন একটা টিমটিমে হারিকেন জ্বালানো হয়েছে। কুয়াশার মধ্য দিয়ে সেই আলোর শিখাটা একটা ধোঁয়াটে বৃত্ত তৈরি করেছে। বারান্দার সিমেন্টের পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা। তার পরনে একটা লম্বা সুতির শাল। ডান হাতটা তার আলতো করে রাখা নিজের স্পষ্ট হয়ে ওঠা পেটের ওপর।
অরিন্দম দেখতে পেলেন, মেঘলা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার আঙুলগুলো শাড়ির ওপর দিয়ে পেটের ভাঁজে একটু শক্ত হলো। পেটের ভেতরের অনাগত সন্তানটি বোধহয় এইমাত্র প্রথমবার আলতো কিক মেরে নিজের উপস্থিতি জানান দিল। মেঘলার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল কি? নাকি সেটা শুধুই হারিকেনের আলোর কাঁপন? অরিন্দম বুঝতে পারলেন না।
মাধবী বারান্দা থেকে নেমে একবাটি গরম চা হাতে ধীর পায়ে মেহগনি গাছটার দিকে হেঁটে এলেন। তাঁর পায়ে চটির খসখস শব্দ। "অরিন্দম," মাধবী নিচু,অথচ শান্ত গলায় ডাকলেন। "এখানে মাটিতে বসে আছ কেন? ঠান্ডা নামছে। চা-টা নাও।"। অরিন্দম চশমাটা খুলে হাঁটুর ওপর রাখলেন। কাচ দুটো এতক্ষণ আবছা ছিল, এখন খালি চোখে মাধবীর মুখটাও একটু ঝাপসা দেখাল।
"চাটা রেখে দাও মাধবী," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে বললেন। তাঁর গলা ভাঙা, শুকনো পাতার ঘর্ষণের মতো শোনালো। "মাটিতে বসে থাকতে খারাপ লাগছে না। মাটির নিজস্ব একটা ওম আছে, জানো? এই মেহগনির শিকড়গুলো মাটির কতটা গভীরে গেছে ভেবেছ?"
মাধবী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে গাছের গুঁড়ির পাশে মাটির ওপরই বসে পড়লেন। তাঁর হাতের বাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে।
"তুমি আবারও নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছ," মাধবী চায়ের বাটিটা মাটির ওপর রাখতে রাখতে বললেন। "নয়ডার এই চুক্তিটার পর থেকে তুমি একটা কথাও বলোনি। তুমি কি এখনও ভাবছ সোদপুরে ফিরে গেলে সব ঠিক হয়ে যেত?"
অরিন্দম চশমাটা দিয়ে তাঁর জামার সাতাটা মুছতে লাগলেন। "সোদপুর? কোথায় সোদপুর? আমার কি আর কোনো ফেরার জায়গা আছে মাধবী? নয়ডা বা সোদপুর... এই দুটোর মাঝামাঝি কোথাও একটা প্ল্যাটফর্ম থাকে না, যেখানে কোনো ট্রেনের টিকিট লাগে না? আমি এখন সেই স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি।"
মাধবী নিঃশ্বাস ফেললেন। কুয়াশায় তাঁর নিঃশ্বাস সাদা ধোঁয়ার মতো শূন্যে মিলিয়ে গেল। "তুমি নিজের চারপাশে একটা অপরাধবোধের দেয়াল তৈরি করে তার ভেতর আত্মরতি উপভোগ করছ অরিন্দম। এটা তোমার হয়তো পুরনো কোনো অভ্যাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন রিয়া সেনের ঘটনাটা ঘটল, তখনও তুমি ক্ষমা চাওনি—কারণ নিজেকে ভিকটিম বা অপরাধী যেকোনো একটা ট্র্যাজিক চরিত্রে দেখতে তোমার ভালো লাগে।"
অরিন্দম সামান্য হাসলেন। খুব বিষণ্ণ, নির্ভার এক চিলতে হাসি।
"হয়তো," অরিন্দম বললেন। "হয়তো তুমি ঠিক বলছ। কিন্তু জানো মাধবী, আজ এই সন্ধ্যার কুয়াশায় বসে থাকতে থাকতে আমার অন্য একজোড়া হাতের কথা মনে পড়ছিল।"
"কার হাত?"
"রত্না দেবী..." অরিন্দমের স্বর আরও নিচু হয়ে এলো। "আমার তখন ষোলো, সতেরো বছর বয়স। কলোনির সেই একচিলতে ঘরটা, বিকেলে টিনের চালে শালিকের ডাক, আর একটা মেদবহুল ও মোটা শরীর। রত্না দেবী—আমার বন্ধু অরূপের মা। সতেরো বছরের একটা ছেলে যখন জোর করে, একরকম অন্ধ কামনায় একটা ৩৭ বছরের পরিণত মহিলাকে স্পর্শ করে... আর সেই নারী অপরাধবোধে ভুগেও তাকে থামায় না, আবার পরে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করে টাকা নেয়... পতনটা কি সেদিনই আমার শুরু হয়নি মাধবী?"
মাধবী নীরব রইলেন। তিনি মেহগনি গাছের ছালের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
"আমি চিরকাল ভেবেছি আমি মাস্টার," অরিন্দম বিড়বিড় করে বলে চললেন, যেন তিনি নিজেকেই শোনাচ্ছেন। "বেনারসের সেই রেড লাইট এরিয়ার মেয়েটি... যে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল কারণ আমি নাকি ছিলাম দরিদ্র, উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান। তারপর রিয়া সেন... যে ডক্টরেট করতে এসে আমার ক্লাসরুমের মোহজালে আটকে গেল। আমি তখন নিজেকে ভেবেছিলাম আমি লর্ড বায়রন। আমি ভেবেছিলাম আমি কবিতার লাইন দিয়ে জীবনকে শাসন করব। কিন্তু আসলে কি জানো? আমি কেবল তৃষ্ণার্ত ছিলাম। এক অন্ধ, করুণ আত্মপ্রেমের তৃষ্ণা।"
"আর এখন?" মাধবী শুধালেন।
"এখন আর সেই তৃষ্ণা নেই," অরিন্দম চশমাটা আবার চোখে পরলেন। চশমা পরতেই কুয়াশার ভেতর ট্র্যাক্টরের আলোটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঈমন আর পেট্রাস এখন ট্র্যাক্টরটা খামারবাড়ির শেডের নিচে দাঁড় করাচ্ছে। ঈমন নেমে এসে ইঞ্জিনটা বন্ধ করল। বিকট ধাতব শব্দটা স্তব্ধ হতেই চারপাশটা এক নিবিড়, থমথমে নীরবতায় ডুবে গেল।
দূর থেকে মেঘলার গলার স্বর ভেসে এলো, "ঈমন, ছাগলগুলোকে শেডে ঢুকিয়েছ কী?"
"হ্যাঁ , সব ঢোকানো হয়ে গেছে," ঈমানের শান্ত, আর বশ্যতাবাদী গলা পাওয়া গেল। অরিন্দম দূর থেকে মেঘলার সেই ছায়ামূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "মেঘলা আমাকে মুক্তি দিয়েছে মাধবী," অরিন্দম বললেন।
মাধবী অবাক হয়ে অরিন্দমের দিকে তাকালেন। "মুক্তি? একজন ধর্ষকের সাথে জমি আর নিরাপত্তার চুক্তি করে সে তোমাকে কী ভাবে মুক্তি দিল?"
"হ্যাঁ," অরিন্দম এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "মেঘলা দেখিয়ে দিল, আমার এই সমস্ত তথাকথিত নীতি, শিক্ষকতা, বাবার অধিকার, আভিজাত্য—সব কতটা ফাঁপা। সে কোনো ধরনের আদর্শের তোয়াক্কাই করেনি। সে পৃথিবীতে টিকে থাকাকে বেছে নিয়েছে। সে আমাকে সেই বোঝা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে যা আমি এতদিন বহন করছিলাম—'পিতা' হিসেবে তাকে রক্ষা করার বোঝা। আমি তো তাকে রক্ষা করতে পারিনি মাধবী। এমনকি নিজেকেও না।"। তিনি হাঁটুর ওপর হাত দুটো রাখলেন। ভাঙা নখগুলোর দিকে আর একবার তাকালেন।
"বায়রন, রিলকে, ডন জুয়ান, বব ডিলান..." অরিন্দম বিড়বিড় করলেন। "এতদিন মাথা ভর্তি কত শত নাম ছিল। কাব্যগ্রন্থের পাতা, ক্লাসরুমের হাততালি... সব মুছে যাচ্ছে মাধবী। সব শব্দ ধূসর হয়ে আসছে।"
"তোমার কি এতে ভয় করছে অরিন্দম?" মাধবী নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"না," অরিন্দম মাথা নাড়লেন। "ভয় তো তখন লাগে যখন কিছু হারানোর থাকে। আমার আর হারানোর মতো কিছুই নেই। আমি না কোনো কলেজের না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নামী অধ্যাপক, না কোনো আদর্শ পিতা, না কারো প্রেমিক। আমি স্রেফ এই মেহগনি গাছের নিচে বসে থাকা একটা ৬০ বছরের বৃদ্ধ শরীর। প্রকৃতির এক নীরব পর্যবেক্ষক।"
তিনি মাটির দিকে নামিয়ে আনা হাতের তালু দিয়ে শুকনো ঘাস আর ধুলো স্পর্শ করলেন।
"আমি পড়ে গেছি," অরিন্দম নিজেকেই নিজে বললেন, পরম শান্ত, স্পন্দনহীন এক গলায়। "কিন্তু মাটি তো পড়ে যাওয়া মানুষকেই ধরে রাখে মাধবী। যে মাটি মানুষকে ধরে রাখে, সেখান থেকে আর ওঠার কী দরকার? ওঠার চেষ্টা করাটাই তো অহংকার।"
মাধবী আর কিছু বললেন না। তিনি বুঝলেন, এই মানুষটি এখন এক অদ্ভুত অস্তিত্ববাদী নিস্পৃহতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে কোনো তর্ক, কোনো সান্ত্বনা বা কোনো রাজনৈতিক নীতি দিয়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটি কোনো পরাজয় নয়, এটি অস্তিত্বের চরম বাস্তবতাকে নিঃশব্দে স্বীকার করে নেওয়া।
কুয়াশা এখন আরও ঘন হয়ে নেমে এসেছে। মেহগনি গাছের পাতা থেকে টুপুর করে দু-এক ফোঁটা শিশির ঝরে পড়ল অরিন্দমের ফতুয়ার ওপর।
দূরে, খুব দূরে কোথাও—হয়তো নয়ডা বা দিল্লির রেললাইন ধরে—একটি ট্রেনের বাঁশি ভেসে এলো। রাতের কুয়াশা চিরে সেই বাঁশির শব্দটা বহু দূর পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে গেল।
অরিন্দম আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করলেন।
বাতাসের হিম, মেহগনির গন্ধ, আর কুয়াশার আস্তরণ তাঁর শরীরকে ধীরে ধীরে ঢেকে দিতে লাগল। তিনি প্রস্তুত হলেন তাঁর চেতনার শেষ স্টেশনের জন্য—যেখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো গ্লানি নেই, কেবল এক পরম ও নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা।
অধ্যায় ৪১: গর্ভধারণ, নিয়তি ও জমি
নয়ডার খামারবাড়ির খোলা চত্বরে বিকেলের রোদটা তখন নরম হলুদ থেকে ফিকে তামাতে রঙে রূপ নিচ্ছিল। চারপাশের রুক্ষ মাটির ওপর শুকনো ঘাসের গন্ধ আর দূর থেকে আসা ডিজেলের ধোঁয়া মিশে এক ধরনের ভারী আবহ তৈরি করেছে।
বারান্দার পুরনো কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল মেঘলা। তার সুতির হালকা শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরে যেতেই পেটের উঁচিয়ে ওঠা গোলাকার ঢালটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।পাঁচ মাসের গর্ভ। যে গর্ভাবস্থা কোনো আনন্দ বা উৎসবের মধ্য দিয়ে আসেনি, এসেছিল এক হিংস্র আকস্মিকতায়, নয়ডার সেই থমথমে রাতে।
অরিন্দম ঘরের ভেতর থেকে এক কাপ গরম চা হাতে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন। চা থেকে সামান্য ধোঁয়া উঠছে। তিনি কাপটা মেঘলার পাশের ছোট্ট টি-টেবিলের ওপর রাখলেন, কিন্তু নিজে বসলেন না। বারান্দার কাঠের রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চুলগুলো গত কয়েক মাসে আরও সাদা হয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালি।
"চা-টা খাও," অরিন্দম খুব নিচু, থমথমে গলায় বললেন।
মেঘলা চায়ের কাপটার দিকে তাকাল না। সে চত্বরের ওপারে বিস্তৃত জমিটার দিকে চোখ রাখল। সেখানে পেট্রাস আর ঈমন একটা পুরনো লাল রঙের ট্র্যাক্টর দিয়ে শুকনো মাটি চষছে। মাটির ঢ্যালাগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে ট্র্যাক্টরের চাকার নিচে ধুলোর মেঘ তৈরি করছে।
অরিন্দম কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার কথা বললেন। গলার স্বর আরও নামিয়ে, যেন কেউ শুনতে না পায় এমন ভঙ্গিতে বললেন, "আজ সকালে দিল্লির ডাক্তার সেনের সাথে আমার ফোনে কথা হচ্ছিল।"
মেঘলা স্থির চোখে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
"ডাক্তার সেন বলছিলেন, এখনও সময় আছে মেঘলা," অরিন্দম একটু ইতস্তত করে যোগ করলেন। "মেডিকেল গ্রাউন্ডে এখনো কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। গর্ভপাত করালে তোমার শরীর আর ভবিষ্যৎ—দুটোই কিন্তু বেঁচে যায়। তুমি আবারও নতুন করে শুরু করতে পারবে।"
মেঘলা ধীর গতিতে মুখ ফেরাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ বা উত্তেজনা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শীতল সমতা।
"কার সন্তান এটা বাবা?" মেঘলার শান্ত, খসখসে গলা শোনা গেল। "ঈমানের? নাকি ওই অন্য দুজনের? নাকি এই পোড়া ভারত নামক দেশের আবহমান রাজনৈতিক হিংসার সন্তান?"
অরিন্দম শিউরে উঠলেন। তিনি রেলিং থেকে হাত সরিয়ে মেঘলার কাছাকাছি এলেন। "যে নামই দাও মেঘলা, ওটা তো একটা পাপের ফল। একটা বিভীষিকাময় অপরাধের চিহ্নকে সারা জীবন নিজের শরীরে বহন করে বেড়াবে?"
মেঘলা তার ডান হাতটা পেটের উঁচিয়ে থাকা অংশে রাখল। তার আঙুলগুলো শাড়ির কাপড়ের ওপর আলতো করে ছড়িয়ে পড়ল।
"পাপ আর পুণ্য কেবল তোমার বইয়ের পাতায় থাকে বাবা," মেঘলাও খুব ধীরে ধীরে বলল। "তুমিও আজ এটাকে পাপের ফল বলছ? কিন্তু ভেবে দেখেছ, প্রতিদিন যারা শহরের বড় বড় আইভিএফ ক্লিনিকে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করে অচেনা, অজানা ডোনারের স্পার্ম কেনে আর সেই শুক্রাণু নিয়ে নলজাত সন্তানের জন্ম দিচ্ছে—তারা কি পাপ করছে? সেই সন্তানেরা তো সারা জীবনেও তাদের আসল বাবাকে চিনতেই পারে না। তারা কি পাপের ফল নয় বাবা? আমি তো এই সন্তানকে নিজের রক্ত-মাংস দিয়ে বড় করছি। সে কার স্পার্মে এলো, তা দিয়ে আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিচয় আটকে থাকবে না।"
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মেঘলার যুক্তির সামনে তাঁর দীর্ঘদিনের তৈরি করা নৈতিকতার কাঠামোটা কেঁপে উঠল।
"কিন্তু এই জমি? এই খামার?" অরিন্দম কিছুটা ব্যাকুল হয়ে বললেন। "কাল পেট্রাস যা বলল... তুমি নাকি ঈমনকে বিয়ে করে জমিটা ওদের নামে লিখে দিতে রাজি হচ্ছ? যাতে এলাকার কলোনির লোক বা রাজনৈতিক গুন্ডারা এই জমিতে হাত না দেয়?"
"হ্যাঁ তো," মেঘলা এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে উত্তর দিল।
"তুমি কী পাগল হয়ে গেছ মেঘলা!" অরিন্দম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না, তাঁর গলার স্বর সামান্য চড়ে গেল। "শেষ পর্যন্ত তুমি নিজেকেও এক ধর্ষকের হাতে তুলে দেবে? তোমার পৈতৃক জমি, তোমার বাবার সঞ্চয়, তোমার নিজের রক্তজল করা বাড়ি—সব ওদের নামে লিখে দেবে? এটা কী ধরনের আত্মহত্যা?"
মেঘলা চেয়ার থেকে উঠল না, কিন্তু তার বসার ভঙ্গিটা আরও সোজা হলো। সে অরিন্দমের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
"এটা নতি স্বীকার নয় বাবা," মেঘলার গলায় কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা ছিল না, ছিল এক কঠিন সত্যের উচ্চারণ। "এটাকে বলে টিকে থাকা। পেট্রাসের বাড়ি দক্ষিণ আফ্রিকা হোক কিংবা এই ভারতের কোনো এক প্রান্ত—শ্বেতাঙ্গ বা উচ্চবর্ণের অহংকার ভেঙে যখন সে ধুলোয় মেশে, তখন জমি তার আসল মালিককে চিনে নেয়। যে মাটিকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে থাকে, জমি শেষ পর্যন্ত তারই হয়।"
"আর তুমি? তোমার স্বাধীনতা? তোমার আত্মসম্মান?" অরিন্দম হাহাকার করে উঠলেন।
"আমি সাব-অর্ডিনেট হিসেবে বাঁচতে রাজি বাবা," মেঘলা দূর থেকে ধেয়ে আসা ট্র্যাক্টরের শব্দটার দিকে কান পেতে বলল। "কিন্তু এখান থেকে আর পালিয়ে যেতে রাজি নই। সোদপুরে গিয়ে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে লোকেদের করুণা বা ফিসফিসানি শোনার চেয়ে, এই ধুলো-মাটির ওপর নিজের শর্তে এক ইঞ্চি জমি আঁকড়ে বেঁচে থাকা অনেক বেশি বাস্তব।"
ট্র্যাক্টরটা চত্বরের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়াল। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা আবার স্তব্ধ হয়ে গেল। ঈমন ট্র্যাক্টর থেকে নেমে গায়ের ধুলো ঝাড়ল। পেট্রাস চত্বরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা জলের ড্রাম থেকে এক ঘটি জল নিয়ে নিজের মুখে-চোখে ছিটিয়ে দিল।
অরিন্দম আর একটি শব্দও বলতে পারলেন না। তিনি মেঘলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়েটিকে তিনি জন্ম দিয়েছেন, মানুষ করেছেন, সাহিত্যের ক্লাসে বায়রন আর রিলকের কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন। কিন্তু আজ তিনি বুঝতে পারলেন, এই মেঘলা তাঁর চেনা সেই মেয়ে নয়। সে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি নির্দয়ভাবে বাস্তববাদী। সে নিজের জীবনকে কোনো কাব্যের ট্র্যাজেডি বা করুণ রস হিসেবে দেখছে না; সে অস্তিত্বের নির্মম সত্যকে পরম স্বাভাবিকতায় গ্রহণ করে নিয়েছে।
সূর্যটা নয়ডার মেঠো প্রান্তরের ওপারে পুরোপুরি ডুবে গেল। কুয়াশা আর মেহগনি গাছের ছায়া একসঙ্গে মিশে বারান্দাটাকে ঢেকে দিতে লাগল। অরিন্দমের হাতের চায়ের কাপটা ততক্ষণে পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে।
অধ্যায় ৪২সোদপুরের ‘প্রাণী কল্যাণ কেন্দ্র’। রাত পৌনে এগারোটা।
বাইরে আশ্বিনের স্যাঁতসেঁতে হাওয়া। ঘরের কাঠের খড়খড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে ভেতরে আছড়ে পড়ছে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে, তীক্ষ্ণ ডাক। দূরবর্তী লেভেল ক্রসিংয়ের উঁচু লাল আলোর আভাটা কাচের জানলায় এসে এক ফোঁটা তাজা রক্তের মতো জমে আছে। ঘরের ভেতরের একটা মাত্র পঁচিশ ওয়াটের টিউবলাইট মৃদু মিটমিট করে জ্বলছে, আর সেই আলোর নিচে ঠাণ্ডা, ধূসর স্টেইনলেস স্টিলের টেবিলটা জ্বলজ্বল করছে।
টেবিলের ওপর শুয়ে আছে একটা তিন-পাওয়ালা পঙ্গু নেড়ি কুকুর। তার ধোোঁয়াটে সাদা লোমের ভেতর পাছাঁ আর পেটের কাছে নোনা-ধরা ক্ষতের পচন। পচনের এক কটু, মিষ্টি আর মেটে গন্ধ ঘরটার ফেনিল পিনাইলের আবহাওয়াকে চিরে ভেসে উঠছে। কুকুরটির ডান পেছনের পা-টা বছরখানেক আগে ট্রেনের চাকার তলায় কাটা পড়েছিল, আর বাকি তিনটি পায়ে সে কোনোমতে ধুকপুক করে বেঁচে ছিল। গত দু’মাস আগে সোদপুরের কলোনির গলিতে যখন কজন ছোকরা ওকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ড্রেনের ওপর ফেলে দিয়েছিল, অরিন্দম নিজের শরীরের সমস্ত বল প্রয়োগ করে ছোকরাগুলোকে তাড়িয়ে কুকুরটাকে নিজের পুরানো কোটের ভেতর জড়িয়ে তুলে এনেছিলেন এই ক্লিনিকে। গত ষাট দিন ধরে প্রতিদিন সকাল-বিকেল তিনি নিজে হাতে ওকে সিদ্ধ ভাত আর মাংসের কাথ মেখে খাইয়েছেন।
কুকুরটার চোখ দুটি এখন স্থির। ধোোঁয়াটে কাচের পুঁতির মতো তার মণি, কিন্তু অরিন্দমের হাতটা কাছে আসতেই তার লেজের অবশিষ্টাংশটা স্টিলের টেবিলে মৃদু টুং-টুং শব্দ করে দুটো তোলা দিল।
অরিন্দমের হাতের তালুটা থরথর করে কাঁপছিল। যে হাতে একসময় লর্ড বায় বায়রনের 'ডন জুয়ান'-এর পংক্তি চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা হতো, যে হাত দিয়ে কলেজের মাস্টার্স ক্লাসের টেবিলে ডাস্টার ঠুকে তিনি কবিতার নান্দনিকতা শেখাতেন, সেই ছাল-ওঠা, শুকনো হাতের আঙুলগুলো এখন কুকুরটার থুতনির নিচে জমা হওয়া ভেজা কফের ওপর আলতো করে বসে গেল।
মাধবী পাশের কাঠের ক্যাবিনেটের ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। পিতলের ল্যাচটা খোলার শুকনো ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হলো। মাধবীর হাতে একটা কাচের সিরিঞ্জ, যার ভেতরে পাঁচ সিসি নীল রঙের তরল কাঁপছে—ইচ্ছামৃত্যুর ইউথানাসিয়া।
মাধবী নিঃশব্দে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পরনে একটা হালকা খয়েরি সুতির শাড়ি, চুলগুলো পিঠের দিকে আলগা করে ক্লিফ দিয়ে আটকানো। মাধবীর ৪৫ বছরের মুখে কোনো বাড়তি প্রসাধন নেই, কেবল চোখের নিচে এক গভীর, ক্লান্ত বিষাদের রেখা, যা সোদপুরের বহু মৃত্যু, বহু প্রাণীর আর্তনাদ আর নিজের জীবনের টানাপোড়েন দেখতে দেখতে স্থায়ী হয়ে গেছে।
“আজকেই কি ওকে দিতে হবে মাধবী?” অরিন্দম নিচু, খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর চোখ তখন কুকুরটার বুকের অনিয়মিত ওঠানামার দিকে আটকে। “ও তো... ও তো আমাকে দেখলে এখনও লেজ নাড়ে। আজ সকালেও তো ও আমার হাতের তালুটা চাটছিল।”
মাধবী একটু সময় নিলেন। তিনি নীল তরল ভরা সিরিঞ্জটা আলোর মুখোমুখি ধরে ভেতরের বুদ্বুদটুকু আঙুলের হালকা টোকায় সরিয়ে দিলেন।
“ও যে কষ্ট পাচ্ছে অরিন্দম,” মাধবী খুব শান্ত, সমতল গলায় বললেন। ওঁর কণ্ঠে কোনো কৃত্রিম আবেগ ছিল না, আবার কোনো নির্মমতাও ছিল না। “শরীরের ভেতরের পচনটা এখন ফুসফুসে ধরেছে। আজ রাতে না দিলে ও কাল সকাল পর্যন্ত পিঠের চামড়া মেঝেশুদ্ধ ঘষে ঘষে যন্ত্রণায় ছটফট করবে। ওর হাঁপানির টানে বুক ফাটবে। আপনি কি আরও একদিন ওকে এভাবে বাঁচিয়ে রেখে নিজের দয়া আর প্রেম জাহির করতে চান, নাকি ওকেই মুক্তি দেবেন?”
অরিন্দম মাধবীর দিকে তাকালেন না। তিনি হাঁটু দুটো সামান্য ভেঙে টেবিলের ওপর ঝুকে এলেন। কুকুরটির কানের পেছনের নরম, উষ্ণ লোমে মুখ ছোঁয়ালেন। কুকুরটি তার ভেজা, ঠাণ্ডা নাকটা অরিন্দমের চামড়া-ওঠা খসখসে কবজিতে আলতো করে ঘষে দিল।
“আমি ওয়ান্টেড লোক ছিলাম মাধবী,” অরিন্দম ফিসফিস করে বললেন, যেন কুকুরটাই তাঁর শেষ শ্রোতা। “বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ঘেন্না করে তাড়িয়েছে, খবরের কাগজ আমার নাম ভুল বানানে ছেপে বিদ্রূপ করেছে, রিয়া আমাকে এক নরকের দরজায় দাঁড় করিয়ে চলে গেছে, মেঘলা দিল্লির খামারে আমারই চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল... আর ও... ও আমাকে দেখে এখনও লেজ নাড়ে। ও আমার পদবী জানে না, আমার অতীত জানে না।”
“ও আপনাকে মানুষ ভাবে না অরিন্দম, ও আপনাকে কেবল আশ্রয় ভাবে,” মাধবী শান্তভাবে বললেন। “কিন্তু আশ্রয়ের শেষ কাজটা হলো কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া। মানুষ নিজের অহংকার দিয়ে পশুকে বাঁধে। আপনিও কি ওকে নিজের একা থাকার ভয়ের সঙ্গী করে রেখে দিতে চান?”
অরিন্দম এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চশমার চওড়া কাচের আড়ালে চোখের কোণে কোনো জল ছিল না। কোনো নালিশ বা আর্তনাদ ছিল না। সেখানে ছড়িয়ে পড়েছিল এক পরম শান্ত, ধূসর নিরাসক্তি—যা সমস্ত লড়াই হেরে যাওয়ার পর মানুষের মুখে এসে জমে।
“ঠিক আছে,” অরিন্দম ধীর গতিতে, অত্যন্ত সাবধানে কুকুরটিকে নিজের দুই হাতে তুলে নিলেন। তিন-পাওয়ালা পঙ্গু শরীরটা ভারী ও কাঁপছিল। পচনের কটু গন্ধটা অরিন্দমের নাকের ভেতর ঢুকে বুক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তিনি মুখ ফেরালেন না। তিনি কুকুরটির মাথাটা নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে মাধবীর দিকে এগিয়ে দিলেন। “নিয়ে যাও। ওকে আর কষ্ট দিয়ো না মাধবী। আমার পাপের বোঝা আর ও বইবে কেন?”
মাধবী সিরিঞ্জটি প্রস্তুত করলেন। অরিন্দম যখন কুকুরটিকে মাধবীর প্রসারিত হাতের ওপর সঁপে দিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই—একদম সেই আধা-সেকেন্ডের ব্যবধানে—সোদপুর স্টেশনের দিক থেকে এক বিকট শব্দে রাতের শেষ ট্রেনের দীর্ঘ, চেরা সিটি ভেসে এল—উউউউ-উউউ!
সেই ধাতব হুইসেলটা রাতের স্তব্ধ বাতাসকে এক কোপে চিরে দিয়ে চলে গেল।
রেললাইনের ধারের ঘন, কালো শ্যাওলাধরা জঙ্গল, শতবছরের পুরানো ‘অপরাজিতা’ বাড়িটার জরাজীর্ণ থাম, এবং গোটা সোদপুর শহরটা ট্রেনের চাকার দানবীয় ভারী কম্পনে কেঁপে উঠল। জানলার কাচগুলো ঝনঝন করে বাজতে লাগল।
মাধবী অতি অভ্যস্ত হাতে নীল রঙের সুইটা কুকুরটির পায়ের শিরায় গেঁথে দিলেন। কুকুরটি কোনো আর্তনাদ করল না, কেবল একবার অরিন্দমের চোখের দিকে চেয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তার চোখের মনিটা একটু পরেই স্থির হয়ে গেল।
অরিন্দম আস্তে করে পিছু হটলেন। তিনি ঘরের খোলা জানলাটার দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বাহিরে অন্ধকারের বুক চিরে রাতের শেষ শান্তিপুর লোকাল ট্রেনটি কুয়াশা, ধোঁয়া আর লাল আলোর ঝিলিক ছিটিয়ে সাঁ সাঁ করে ধেয়ে চলে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। ট্রেনের একের পর এক কামরার জানলা থেকে ঠিকরে বের হওয়া হলুদ আলোর ফালিগুলো সোদপুরের ভেজা নর্দমা, কলোনির টিনের চাল আর বটগাছের পাতার ওপর ছড়িয়ে পড়ে আবার এক নিমেষে মিলিয়ে যাচ্ছে।
অরিন্দম জানলার রেলিঙে হাত রেখে নিজের দুটি খালি হাতের দিকে তাকালেন।
হাতের তালুতে তখনও লেগে আছে কুকুরটির বাসি গায়ের গন্ধ, পচনের ভেজা ছাপ আর শেষ নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। অরিন্দম অনুভূতির সেই নগ্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর ভেতরে এখন আর কোনো অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের অহংকার নেই। কোনো পিএইচডি, ডিলিট বা অন্য ডক্টরেটের পদবী নেই। বোদলেয়ার বা বায়রনের কোনো নন্দনতত্ত্ব নেই। কলকাতার বিদগ্ধ মহলের মিডিয়া ট্রায়াল বা কলোনির সমাজসেবকদের গালিগালাজ কোনো কিছুই আর ওনাকে স্পর্শ করতে পারছে না। তিনিও নিঃশেষ হয়ে গেছেন। একেবারে ফাঁকা, রিক্ত, সম্পূর্ণ শূন্য কুকুরটির মতোই।
কিন্তু এই সম্পূর্ণ ধ্বংস ও শূন্যতার শেষ চূড়ায় দাঁড়িয়েই তিনি নিজের ভেতরের এক পরম, খাঁটি সত্যকে স্পর্শ করতে পারলেন। যা কোনো পতন, কোনো কলঙ্ক, কোনো বহিষ্কার বা অগ্নিদগ্ধ স্মৃতি আর কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না।
তিনি পেছনে ফিরলেন।
মাধবী স্টিলের টেবিলের ওপর একটি সাদা সুতির কাপড় দিয়ে নিঃসাড় পঙ্গু কুকুরটির শরীর ঢেকে দিচ্ছিলেন। মাধবীর হাত দুটো সাময়িক ক্লান্তি ও কাজের অভ্যাসে সামান্য শিথিল। আলোটা ওঁর মুখের একপাশে লেগে এক স্নিগ্ধ,ও করুণ ছায়া ফেলেছে।
অরিন্দম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মাধবীর একদম পাশে দাঁড়ালেন। কোনো কথা হলো না। কোনো থিওরি বা দার্শনিক তত্ত্বেরও প্রয়োজন রইল না।
অরিন্দম কেবল মাধবীর ক্লান্ত হাতটার ওপর নিজের খালি, নিঃশ্বেস হাতটি রাখলেন। ঘরের কোণে তখনও জংধরা ফ্যানের একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছিল, আর বাইরে ট্রেনের শেষ চাকার আওয়াজটা সোদপুরের নিঝুম কলোনির রেললাইন বেয়ে বহু দূরে, এক অপার অন্ধকারের পেটে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
অরিন্দম মাধবীকে আলতো করে ধরে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আর সোদপুরের রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দটাই কেবল বেঁচে ছিল। বহু ঝড়-ঝাপটা ও হারানোর গ্লানি পার করে আসা দুটি মানুষের কাছে এই স্পর্শ কেবল কোনো সাময়িক আবেগ ছিল না, এটি ছিল অন্ধকার রাতে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক গভীর আকুলতা।
মাধবীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে অরিন্দম খুব নিচু, ধীর গলায় বললেন, “মেঘলা আর তিস্তা... ওরা তো আমাদের দুজনেরই লড়াইগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছে মাধবী। ওরা কি বুঝবে না যে দুটো ভেঙে যাওয়া মানুষ কেবল একটু আশ্রয় আর শান্তিতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে?” পোশুর ডাক্তার মাধবী অরিন্দমের কাঁধে মাথা রেখে ধীরে ধীরে শান্ত হলেন। ওঁর চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার জলটুকু অরিন্দমের জামার সুতোয় শুষে গেল।
“ওরা হয়তো বা কোনোদিন বুঝবে অরিন্দম,” মাধবী মৃদু কণ্ঠে বললেন, ওঁর গলায় আত্মসংশয় ও ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। “তিস্তা আমার একাকীত্ব বোঝে, আর মেঘলাও জানে তোমার জীবনের ওপর দিয়ে কতটা ঝড় বয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের বাস্তবটাও তো সহজ নয়। সমাজ আর চারপাশের মানুষের কথা বাদ দিলেও, নতুন করে সবাইকে এক ছাদের নিচে বাঁধা কি এতই সহজ হবে?”
অরিন্দম মাধবীর হাত দুটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। “যে মানুষগুলোর হারাবার আর কিছু থাকে না, মাধবী, তাদের ভয় পাওয়ারও কিছু থাকে না। আমরা তো কাউকে কিছু প্রমাণ করতে যাচ্ছি না। শুধু জীবনের শেষ কটা দিন পরস্পরের পাশে থাকার সত্যিটুকু বেঁচে থাকুক।”অরিন্দম মাধবীর হাত দুটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। “যে মানুষগুলোর হারাবার আর কিছু থাকে না, মাধবী, তাদের ভয় পাওয়ারও কিছু থাকে না। আমরা তো কাউকে কিছু প্রমাণ করতে যাচ্ছি না। শুধু জীবনের শেষ কটা দিন পরস্পরের পাশে থাকার সত্যিটুকু বেঁচে থাকুক।”
ক্লিনিকের বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে দুজনে যখন কাঠের দরজায় তালা মারলেন, তখন রাতের শেষ ট্রেনের আওয়াজ বহু দূরে মিলিয়ে গেছে। সোদপুরের নির্জন, ভেজা রাস্তায় দুটি মানুষের ছায়া পাশাপাশি এক হয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলল।
চ্যাট জি পি টি ইন্টেলিজেন্স দিয়ে শেষ ট্রেনের সমালোচনা ও বিশ্লেষণ করা ২১.০৯.২০২৬এ সন্ধ্যে ৭ টায়
প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্য রচিত ৪২ টি অধ্যায়ের মিনি উপন্যাস "শেষ ট্রেন"-এর সম্পূর্ণ আখ্যানভাগ, অধ্যায়ভিত্তিক রূপরেখা, মূল সংক্ষেপ এবং মনস্তাত্ত্বিক-দার্শনিক পরিণতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পাঠ ও বিশ্লেষণ করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি (Royal Swedish Academy)-র কল্পিত নোবেল সাহিত্য জুরী বোর্ডের এক কল্পিত পার্মানেন্ট সেক্রেটারি হিসেবে সমগ্র ১-৪৩ অধ্যায়ের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করছি:
১. নোবেল পুরস্কারের জন্য যোগ্যতা (Nobel Prize Eligibility for Chapters 1–43)
একটি সাহিত্যকর্মকে নোবেল পুরস্কারের দরবারে উন্নীত হতে হলে তাকে কেবল আঞ্চলিক ট্র্যাজেডি বা কোনও ব্যক্তিগত পতনের গল্প হলেই চলে না; তাকে মানব অস্তিত্বের নতুনতম কোনো দর্শন বা বিশ্বজনীন সাহিত্যিক দিগন্তের উন্মোচন করতে হয়।
* সমগ্র উপন্যাসের পরিধি (১-৪৩ অধ্যায়): উপন্যাসটির পরিধি অত্যন্ত বিশাল। কলকাতার অ্যাকাডেমিক জীবন (১-৮ অধ্যায়), সোদপুরের কলোনি জীবন ও ১৯৭১ সালের বাস্তুচ্যুত ইতিহাস (৯-১৭ অধ্যায়), দিল্লীর নয়ডার প্রান্তিক খামারবাড়ির ভয়াবহ আক্রমণ ও ধর্ষণ (পরবর্তী অধ্যায়সমূহ), এবং পরিশেষে পশুর আশ্রয়কেন্দ্রে ইউথানেসিয়া ও এক নবজাতক কন্যার জন্ম—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মানুষের পতন, অপরাধবোধ, অস্তিত্বের শূন্যতা ও নিয়তিকে স্পর্শ করার চেষ্টা নিশ্চিত ভাবেই করেছেন প্রফ ড . প্রণব ভট্টাচার্য।
Worked for 1m 26s
আমি “শেষ ট্রেন”-এর আপলোড করা পাণ্ডুলিপিটিকে শুধু synopsis হিসেবে নয়, তার চরিত্র-নির্মাণ, বর্ণনাভঙ্গি, সংলাপ, নৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রতীক, অধ্যায়-গঠন এবং সমাপ্তির দিক থেকে বিচার করার চেষ্টা করেছি। পাণ্ডুলিপিটি ১৩৯ পৃষ্ঠার; প্রথম দিকেই এটিকে সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক/সমকালীন বাংলা উপন্যাস, সম্পর্ক ও নৈতিকতার কাহিনি এবং অস্তিত্ববাদী-ম্যাজিক-রিয়ালিজমের পরিসরে স্থাপন করা হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আগে পরিষ্কার করা দরকার: Royal Swedish Academy-এর “লংলিস্ট/শর্টলিস্ট” বলে Nobel Prize in Literature-এর কোনো প্রকাশ্যনা বা official shortlist/longlist নেই। Nobel-এর nomination ও deliberation-এর প্রকৃত প্রক্রিয়া গোপন থাকে। তাই নিচের “জুরি স্কোর” হবে সম্পূর্ণ কাল্পনিক সাহিত্য-সমালোচনামূলক simulation, কোনো প্রকৃত Swedish Academy সদস্যের মতামত নয়।
আমার সামগ্রিক রায়
“শেষ ট্রেন”-এ আন্তর্জাতিক উচ্চসাহিত্যের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বর্তমানে সম্পাদিত না-হওয়া অবস্থায় আমি এটিকে Nobel-level finished manuscript হিসেবে বলব না।
বরং আমার মূল্যায়ন হবে:
Conceptual ambition: খুব উচ্চ
Psychological ambition: উচ্চ
সামাজিক-নৈতিক complexity: উচ্চ
চরিত্রের সম্ভাবনা: খুব উচ্চ
ভাষা ও prose control:
বর্তমানে অসমগঠন ও pacing: তাই উল্লেখযোগ্য revision দরকার
বিশ্বসাহিত্যে অনুবাদযোগ্যতা: যথেষ্ট সম্ভাবনাময়
বর্তমান manuscript হিসেবে ।
আন্তর্জাতিক পুরস্কার-যোগ্যতা: সম্ভাবনাময় কিন্তু অসম্পূর্ণ বিশেষ করে অরিন্দম চরিত্রটি উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক সম্পদ। সে conventional “ভালো মানুষ/খারাপ মানুষ” নয়; বরং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, তার যৌন ক্ষমতায়, অপরাধ বোধে, সামাজিক অপমান, পিতৃত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে ক্রমাগত আটকে থাকা মানুষ। প্রথম অধ্যায়েই Byron-এর পাঠ থেকে তার নিজের নৈতিক পতনের দিকে যে সেতুটি তৈরি হয়েছে, সেটি যথেষ্ট শক্তিশালী সাহিত্যিক device।
একটি বিশেষভাবে শক্তিশালী দিক
“স্বাধীনতার মূল্য যখন অন্য কাউকে দিতে হয়?”—এই প্রশ্নটি অরিন্দমের Byron-বিষয়ক aesthetic philosophy-কে পরবর্তী ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত করে।
এখানেই উপন্যাসটি নিছক scandalous story না হয়ে নৈতিক দর্শনের উপন্যাস হওয়ার সম্ভাবনা অর্জন করে।
১. সম্ভাব্য “Nobel/Swedish Academy simulation”
আমি যদি একটি কাল্পনিক ৭ সদস্যের সাহিত্য-জুরি তৈরি করি, তাহলে তারা এই শেষ ট্রেন নিয়ে সম্ভবত এভাবে আলোচনা করতে পারেন( অবশ্যই যখন ইংরেজি তে অনুবাদ করে পাঠানো হলে)
কাল্পনিক সদস্য প্রধান মানদণ্ড সম্ভাব্য স্কোর /100
সদস্য A ভাষা ও prose 72
সদস্য B চরিত্র ও psychological depth 88
সদস্য C নৈতিক/দার্শনিক গভীরতা 91
সদস্য D narrative architecture 74
সদস্য E সামাজিক/ঐতিহাসিক বিস্তার 86
সদস্য F originality 84
সদস্য Gবিশ্বসাহিত্যে অনুবাদযোগ্যতা 79
গড় 82.0
লং লিস্টেড হতে প্রয়োজন 90
কাল্পনিক সদস্য A
“এই লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্রের ভিতরের অন্ধকারে প্রবেশ করার সাহস। কিন্তু prose এখনও সম্পূর্ণ disciplined নয়। বহু জায়গায় লেখক পাঠককে অনুভব করতে দেওয়ার পরিবর্তে অনুভূতিটি নিজেই ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন।”
72/100
কাল্পনিক সদস্য B
“অরিন্দম একটি morally comfortable protagonist নয়—এটাই তার শক্তি। পাঠক তাকে ভালোবাসতে পারে না, কিন্তু তাকে পড়া আবার বন্ধও করতে পারে না।”
88/100
এটি আমার কাছেও উপন্যাসটির অন্যতম শক্তিশালী দিক।
কাল্পনিক সদস্য C
“এটি আসলে sexual scandal-এর উপন্যাস নয়; এটি ক্ষমতা, অপরাধবোধ, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং ক্ষমার অধিকার নিয়ে উপন্যাস।”
91/100
এই পাঠটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাণ্ডুলিপিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের disciplinary process, রিয়ার অভিযোগ, অরিন্দমের আত্মপক্ষসমর্থন এবং পরে রিয়ার বাবার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে “ক্ষমা কে চাইতে পারে এবং কে দিতে পারে”—এই প্রশ্নটি বারে বারেই ফিরে আসে।
কাল্পনিক সদস্য D
“Novel has powerful episodes, but the architecture occasionally feels like several major novels competing for space.”
74/100
এখানেই আমার বড় reservation। কারণ কাহিনিতে একসঙ্গে আছে—
refugee history 1971
class conflict
university politics
sexual transgression
academic abuse
father-daughter relationship
Delhi/Noida
African migrant
communal/political tension
rape
veterinary euthanasia
capitalism
local politics
existential isolation
প্রতিটি বিষয়ই একেকটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের material হতে পারে।
এত বেশি thematic load উপন্যাসটির শক্তি যেমন, তেমনি দুর্বলতাও বটে।
২. কাল্পনিক Permanent Secretary-এর মূল্যায়ন
যদি আমাকে একটি কাল্পনিক Swedish Academy Permanent Secretary-এর অবস্থানে বসিয়ে manuscript-এর উপর confidential note লিখতে হয়, তাহলে আমি লিখতাম:
“The manuscript demonstrates substantial literary ambition and a morally uncompromising central character. Its strongest achievement lies in its attempt to deny the reader an easy distinction between guilt, victimhood, self-justification and social punishment. However, the manuscript requires substantial structural and stylistic revision before it can be considered a fully mature work of international stature.”
কাল্পনিক Permanent Secretary Score
84/100
কিন্তু এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ distinction:
84/100 মানে Nobel nomination পাওয়ার 84% chance নয়। কম করে দরকার 90% এর ওপরে এটি কেবল literary-potential score। আমার কাল্পনিক confidential classification
বর্তমান manuscript টি:
“Promising / Major Revision is Required”
গভীর সম্পাদনার পর হতে পারে:
“International Literary Prize Contender”
চাই অত্যন্ত শক্তিশালী ইংরেজি অনুবাদ + প্রকাশনা + editorial revision-এর পর:
“Potentially serious International Booker-level submission”
Nobel-এর ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো manuscript-কে এভাবে “shortlist” করা বাস্তব প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
৩. কেন Nobel-level potential একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না?
কারণ উপন্যাসটির কিছু বিষয় স্থানীয় অথচ universal।
অরিন্দম কলকাতার মানুষ, সোদপুরই তার পৃথিবী, refugee history তার সামাজিক genealogy; কিন্তু প্রশ্নগুলো—এই ভাবে আসে
অপরাধের পর মানুষ কি নিজের কাছে নিজেকে নির্দোষ ঘোষণা করতে পারে?
শিল্পীর স্বাধীনতার সীমানা কোথায়?
ক্ষমতা কীভাবে যৌনতার সঙ্গে যুক্ত?
সমাজের বিচার ও ব্যক্তিগত বিবেকের বিচার কি একই?
ক্ষমা কি অপরাধীর অধিকার?
একজন পিতা কি সন্তানের সামনে নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে?
victim এবং perpetrator-এর সম্পর্ক কি সবসময় সরল?
মানুষ কি নিজের পতনকে intellectual philosophy দিয়ে বৈধতা দিতে পারে?
—এসব সর্বজনীন প্রশ্ন। এদের সলভ করতে হবে
এই central moral question গুলো manuscript-এ সরাসরি ঘোষিত হয়েছে: একজন মানুষ সমাজের চোখে দোষী হয়ে গেলে নিজের কাছে নির্দোষ থাকার কোনো অর্থ আছে কি না।
এটি একটি serious literary question। যার উত্তর জানা নেই
৪. কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়?
ক. ভাষা( বাংলা ভাষায় লেখা )এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা। পাণ্ডুলিপিতে অনেক বাক্য অত্যন্ত শক্তিশালী; কিন্তু একই সঙ্গে— punctuation সমস্যা spacing সমস্যা spelling inconsistency বাংলা-ইংরেজি code switching-এর অসামঞ্জস্য
কখনও অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক narration যেটা সুইডিশ একাডেমি মেনে নেয় না
একই emotional point পুনরাবৃত্তি
কিছু জায়গায় prose-এর অতিরিক্ত ভার
আছে।
আপনার নিজের manuscript-এই লেখা আছে যে এটি এখনও edited নয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ Nobel/Booker-level literary prose-এ idea-এর চেয়ে sentence-level control অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. যৌন সহিংসতার treatment
এটি উপন্যাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ literary area।
রত্না দেবীর সঙ্গে অরিন্দমের প্রথম সম্পর্কটি শুরু হয় coercion-এর মাধ্যমে; manuscript-এর বর্ণনায় তার প্রতিরোধ, ভয় এবং পরবর্তী psychological/economic entrapment আছে।
এরপর সম্পর্কটি blackmail ও reciprocal exploitation-এর দিকে যায়।
এখানে একটি অসাধারণ literary possibility আছে: অরিন্দম কি নিজেকে victim ভাবতে শুরু করে, যদিও সে নিজেই অন্যের victimizer?
এটি খুব শক্তিশালী অংশ। কিন্তু বিপদ হলো—যদি erotic description বেশি জায়গা নেয় এবং psychological consequence তুলনামূলক কম হয়, তাহলে literary tragedy কখনও কখনও sensationalism-এর কাছাকাছি চলে যেতে পারে।
আমার পরামর্শ:
freudian psychological consequence বাড়ানো।
৬. রিয়া চরিত্রটি
রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চরিত্রকে আরও গভীর করা দরকার। বর্তমান কাঠামোতে রিয়া simultaneously—doctoral student writer
ambitious intellectual sexual participant
possible victim accuser artistic counterpoint হয়ে উঠেছে। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানে রিয়াকে শুধু অরিন্দমের নৈতিক mirror হিসেবে না রেখে নিজস্ব consciousness দিতে হবে।
যদি রিয়ার নিজস্ব literary ambition, fear, desire, anger, self-deception এবং post-trauma intellectual development আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে novel অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।
৭. মাধবী—সম্ভবত underrated character
আমার মতে manuscript revision-এর সময় মাধবীকে আরও কেন্দ্রীয় করা উচিত। তিনি veterinarian, widow, animal shelter চালান এবং euthanasia করেন। এখানে অসাধারণ symbolism আছে: জীবনকে বাঁচানো বনাম জীবনকে শেষ করার নৈতিক অধিকার। এটি সরাসরি অরিন্দমের moral existence-এর সঙ্গে parallel তৈরি করে। শেষে অরিন্দম যখন সেই অবাধ্য কুকুরটিকে euthanasia-র হাতে তুলে দেয়, তখন “শেষ ট্রেন” title-এর সঙ্গে একটি গভীর existential closure তৈরি হয়।
এটি আমার কাছে manuscript-এর অন্যতম শক্তিশালী conceptual achievement।
৮. “শেষ ট্রেন” নাম প্রতীকটি সফল কি?
হ্যাঁ—খুব সম্ভাবনাময়। প্রথম দিকে train:
movement + crowd + loneliness
শেষদিকে train: departure + irreversibility + exclusion আর মাঝখানে কলকাতা–সোদপুর–দিল্লি–খামার—সব geographic movement আসলে অরিন্দমের psychological movement-এর সঙ্গে parallel।
এক পর্যায়ে train-কে “বিশাল কালো সাপ”-এর মতো দেখা এবং crowded train-এ থেকেও অরিন্দমের extreme loneliness—এই imagery বেশ কার্যকর।
৯. সামাজিক-রাজনৈতিক স্তর
এখানে manuscript-এর scope বড়। সোদপুরকে শুধু setting না করে একটি living social organism হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা আছে—refugee colony, railway, tea shops, clubs, political stage, temple-mosque, security guards, old families, new middle class। এটি সফলভাবে develop করতে পারলে উপন্যাসটি শুধু “এক অধ্যাপকের পতন” থাকবে না।এটি হয়ে উঠতে পারে: একজন মানুষের পতনের মধ্য দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক/উদ্বাস্তু/শহরতলির মধ্যবিত্ত সমাজের moral anatomy। এটাই manuscript-এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
১০. পুরস্কারভিত্তিক মূল্যায়ন যদি করা হয় কল্পিত ভাবে
🏆 Sahitya Akademi Award — Bengali
এখানে একটি বাস্তব eligibility issue আছে।
Sahitya Akademi-এর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বইটি সংশ্লিষ্ট ভাষা ও সাহিত্যে outstanding contribution হতে হবে; Bengali একটি স্বীকৃত ভাষা। ISBN-এর requirement-ও রয়েছে, এবং self-publication-ও কিছু শর্তে eligible হতে পারে।
সাম্প্রতিক Bengali award-এর তালিকাতেও novel ধারাটি যদি নিয়মিত দেখা যায়—যেমন 2023-এ Jaler Upar Pani এবং 2022-এ Birbal।
আমার literary assessment:
বর্তমান manuscript এ: 78/100
সংশোধনের পরে সম্ভাব্য: 86–89/100
কিন্তু এটি কোনো winning prediction নয়—কারণ বাস্তব পুরস্কার বিচারকরা অন্য বইয়ের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
১১. Booker Prize
এখানে দুটো আলাদা পুরস্কার।
Booker Prize
বর্তমান rules অনুযায়ী মূল Booker Prize-এর জন্য fiction-টি originally English-এ লেখা এবং UK/Ireland-এ প্রকাশিত হতে হবে; publisher-ই entry দেয়। সুতরাং বাংলায় লেখা “শেষ ট্রেন” সরাসরি Booker Prize-এর জন্য eligible নয়। যদি এটি author-এর নিজস্ব English version হিসেবে originally English work না হয়, তাহলে মূল Booker নয়।
১২. International Booker Prize
এখানেই manuscript-এর জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক সম্ভাবনা রয়েছে। International Booker Prize translated fiction-এর জন্য; work originally অন্য ভাষায় লেখা হয়ে English-এ translated এবং UK/Ireland-এ eligible publisher দ্বারা প্রকাশিত হতে হয়। Publisher-ই submission করে।
অর্থাৎ:
বাংলা → শক্তিশালী ইংরেজি translation → UK/Ireland publisher → International Booker submission এই route theoretically সম্ভব।2026-এর International Booker shortlist-ও দেখায় যে translated literature-এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ইতিহাস, sex,power, class, colonialism, violence, identity ইত্যাদি জটিল বিষয় খুবই relevant হতে পারে।
আমার simulated International Booker score:
বর্তমান Bengali manuscript: 81/100
publication-quality revision + excellent translation হলে: 88/100-এর কাছাকাছি potential 90 score বা তার বেশি তে পৌঁছাচ্ছে না শর্ট লিস্টেডআবার বলছি—এটি literary assessment, shortlist probability নয়।
১৩. Nobel বনাম Booker বনাম Sahitya Akademi
ক্ষেত্র বর্তমান manuscript-এর মূল্যায়ন
সাহিত্যিক ambition ⭐⭐⭐⭐⭐
চরিত্র ⭐⭐⭐⭐½
Psychological depth ⭐⭐⭐⭐½
দর্শন ⭐⭐⭐⭐⭐
সামাজিক পরিসর ⭐⭐⭐⭐½
ভাষা ⭐⭐⭐
গঠন ⭐⭐⭐½
Originality ⭐⭐⭐⭐
International potential ⭐⭐⭐⭐
Sahitya Akademi suitability যথেষ্ট শক্তিশালী সম্ভাবনা
International Booker potential revision/translation-এর পরে উল্লেখযোগ্য
Nobel-level finished work এখনই নয়; বড় ধরনের revision দরকার
১৪. আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
আমি এখনই “Nobel-এর জন্য long listed বা shortlist-worthy” বলব না। কিন্তু আমি এটাও বলব না যে এটি Nobel-ধরনের ambition থেকে অনেক দূরে।
বরং আমার ভাষায়:
“শেষ ট্রেন” একটি অসম্পূর্ণ কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী literary manuscript, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র, নৈতিক ambiguity, সামাজিক landscape এবং existential architecture যথেষ্ট শক্তিশালী; কিন্তু বর্তমান prose এবং structural discipline আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ পুরস্কারের মানে পৌঁছানোর আগে গভীর editorial revision দাবি করে।
কাল্পনিক Swedish Academy evaluation
Literary Potential: 84/100
Current Execution: 74/100
Originality: 84/100
Psychology: 89/100
Philosophical depth: 91/100
Language: 70/100
Structure: 74/100
Overall present manuscript: 82/100
Permanent Secretary simulation: 84/100
Status:
“Keep under serious consideration after major revision”
---
১৫. এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা
আপনার manuscript-এ এমন material আছে যা সাধারণ পুরস্কার-যোগ্যতার চেয়েও বড় literary question তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেটি অর্জন করতে হলে আমি প্রথমে তিনটি কাজ করতাম:
১. প্রায় ২০–২৫% prose কাটতাম।
২. অরিন্দমের দর্শনের পরিবর্তে তার actions-এর মাধ্যমে দর্শনকে প্রকাশ করতাম। অরিন্দম ও রেবার সাইকানালিসি করতাম আরও গভীরে গিয়ে
৩. রিয়া, মাধবী এবং মেঘলাকে অরিন্দমের orbit থেকে বের করে প্রত্যেককে autonomous consciousness দিতাম।
তাহলে “একজন নৈতিকভাবে পতিত অধ্যাপকের গল্প” থেকে এটি একটি বৃহত্তর Bengali literary novel হয়ে উঠতে পারে।
আর একটি বাস্তব বিষয়: আপনার manuscript-এর বর্তমান সংস্করণে নিজেই “এডিট করা—এখনও হয়নি” বলা আছে। আমার মতে এটিই এখনও সবচেয়ে বড় সুযোগ—কারণ story architecture সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে করার দরকার নেই; বরং ভাষা, structure, character-depth এবং repetition-এর surgical revision করলে অনেকটা উন্নতি সম্ভব।
১৬. ‘শেষ ট্রেন’-এ যে দর্শনগুলি আছে
আপনার manuscript-এ শুধু “অস্তিত্ববাদ” বলা হয়নি; বিভিন্ন দর্শনের উপাদান কাহিনির ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—
দর্শন/চিন্তাধারা উপন্যাসে প্রকাশ
*Existentialism / অস্তিত্ববাদ খুব ভালো করেই বর্ণিত আছে -:অর্থহীনতা, একাকীত্ব, মৃত্যু, স্বাধীনতা, নিজের অস্তিত্বের দায়
*Albert Camus-এর Absurdism
ট্রেনের সামনে দাঁড়ানো, মৃত্যু ও জীবনের অর্থহীনতার মুখোমুখি হওয়া
*Nietzsche-এর Will to Power
যৌনতা, আধিপত্য, ক্ষমতা, অপরকে ব্যবহার এবং নৈতিকতার সীমা
*Freudian psychology ও repression,
কামনা, অপরাধবোধ, অবদমিত যৌন আকাঙ্ক্ষা
একটি কথা বলতেই হচ্ছে লাতিন ম্যাজিক রিয়ালিজম ( পরাবাস্তব) ও freudian psychoanalysis নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে হবে আপনাকে আরও গভীর ভাবে পড়াশুনো করে। কাজ করতে করতে অভিজ্ঞতা বাড়বে
Moral relativism / নৈতিক আপেক্ষিকতা “প্রকৃত অপরাধী” কে—ব্যক্তি, সমাজ, না পরিস্থিতি?
Power–sexuality relationship
যৌন সম্পর্ককে এখানে প্রেমের বদলে ক্ষমতা ও লেনদেন হিসেবে দেখানো হয়েছে। পাওয়ার ডায়নামিক
Class conflict উদ্বাস্তু/নিম্নবিত্ত বনাম উচ্চবিত্ত, কমিউনিজম স্পষ্ট
academic elite বনাম সাধারণ মানুষ
Moral policing সমাজের নৈতিক বিচার বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা
Cosmic irony চরিত্রের পরিকল্পনা ও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস
Animal ethics / euthanasia
মানুষ ও প্রাণীর যন্ত্রণা, মৃত্যু এবং “মুক্তি”র প্রশ্ন
Self-exile / social exile। Euthanasia মানুষের ক্ষেত্রে কতটা এক্সেপ্টেবিল প্রশ্ন টি এসেই পরে। এক্ষেত্রে কুকুরের মত ইউঠেনেসিয়া দিয়ে অ্যাসিস্টেড কিলিং মানুষের জন্য আইন কতটা মেনে নেবে সেটাও প্রশ্ন
অরিন্দমের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া
Aesthetics বনাম morality Byron/Baudelaire/Rilke-র সৌন্দর্যচিন্তা বনাম বাস্তব জীবনের নৈতিকতা
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে manuscript নিজেই অধ্যায় ২-তে “মনস্তাত্ত্বিক ফ্রয়েডীয় অবদমন ও ক্ষমতার লালসা (Will to Power)” বলেছেন এবং অধ্যায় ১৪-তে Camus-এর Absurdity-কে সরাসরি উল্লেখ করেছেন। আবার শেষের দিকে euthanasia-কে অরিন্দমের নিজের সামাজিক পতন ও আত্মিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি করা হয়েছে।
১৭. কিন্তু plagiarism-এর দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা হয়েছে
এখানে আমার মতে অত্যন্ত গুরুতর একটি literary similarity আছে।আপনার ‘শেষ ট্রেন’-এর কাহিনির বেশ কয়েকটি মূল structural element J. M. Coetzee-র 1999 সালের উপন্যাস Disgrace-এর সঙ্গে শুধু সাধারণ থিমে নয়, ঘটনাক্রম ও চরিত্রগত কাঠামোতেও প্রায় অত্যন্ত কাছাকাছি যদিও নকল করা নয়।
J. M. Coetzee-র Disgrace-এর documented plot হল:
বয়স্ক university English professor, PhD student-এর সঙ্গে coercive sexual relationship, university থেকে অপমানজনকভাবে সরে যাওয়া, adult daughter-এর isolated farm-এ যাওয়া
farm-এ violent attack, daughter-এর rape
dogs-এর হত্যা, professor-এর ওপরও আক্রমণ/আগুন, daughter-এর rape থেকে pregnancy,daughter-এর abortion প্রত্যাখ্যান
স্থানীয় পুরুষের সঙ্গে land/protection-এর সম্পর্ক,animal shelter-এ dogs euthanasia
শেষে professor একটি কুকুরকে euthanasia-র জন্য দিয়ে দেয়।
এখন আপনার manuscript-এর সঙ্গে পাশাপাশি দেখুন:
Disgrace ‘শেষ ট্রেন’
Disgrace David Lurie ।— university professor
‘শেষ ট্রেন’। অরিন্দম। — university professor
Disgrace।David Lurie। English/romantic literature পড়ান
‘শেষ ট্রেন’।অরিন্দম। —English/Comparative Literature পড়ান
Disgrace। David Lurie। student Melanie-এর সঙ্গে sexual involvement
‘শেষ ট্রেন’।অরিন্দম। —Riya-র সঙ্গে Disgrace।David Lurie।professor–student sexual involvement
‘শেষ ট্রেন’।অরিন্দম।university scandal ও চাকরি হারানো
Disgrace। David Lurie।— committee ও চাকরি/পদত্যাগ daughter Lucy-র farm-এ যান
‘শেষ ট্রেন’। অরিন্দম। —মেয়ে Meghla-র Noida farm-এ যান
Disgrace। David । farm-এ তিনজন পুরুষের attack farm-এ তিনজনের attack
daughter Lucy raped
‘শেষ ট্রেন’।অরিন্দমএর মেয়ে মেঘলা। — raped
Disgrace। David Lurie। professor আহত/পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
‘শেষ ট্রেন’।অরিন্দমকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা farm-এর dogs হত্যা
শেষ ট্রেন । dogs হত্যা
Disgrace। David er daughter pregnant by several attacker
শেষ ট্রেন । Meghla single attacker-এর মাধ্যমে pregnant
Disgrace। daughter abortion প্রত্যাখ্যান করে
শেষ ট্রেন । মেঘলা abortion প্রত্যাখ্যান করে
attacker/স্থানীয় শক্তির সঙ্গে land/protection সম্পর্ক
শেষ ট্রেন ।Iman/Petrus-জাতীয় land/security arrangement
Disgrace। animal clinic-এ euthanasia
শেষ ট্রেন Madhabi-র animal shelter-এ euthanasia
Disgrace। শেষদিকে Lurie প্রিয় dog-কে euthanasia-র জন্য দেয়
শেষ ট্রেন।শেষে অরিন্দম পথকুকুরটিকে euthanasia-র হাতে সঁপে দেয়
এই শেষের ঘটনাটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—Disgrace-এর শেষ দৃশ্যে Lurie যে কুকুরটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, সেটিকেই শেষ পর্যন্ত euthanasia-র জন্য দিয়ে দেয়।
আপনার manuscript-এও ঠিক একই ধরনের narrative endpoint আছে। তাই এটাকে শুধু “একই দর্শন” বলা যথেষ্ট হবে না।
Structural ও চরিত্রের similarity খুব উচ্চ।
বিশেষ করে এই combination—Professor → student sexual scandal → academic downfall → daughter-এর farm → violent attack → daughter rape → dogs killed → pregnancy → land/security issue → animal euthanasia → শেষ কুকুরটি euthanasia-তে দেওয়া—এটি এতগুলি স্বতন্ত্র ঘটনা একসঙ্গে বহন করছে যে Disgrace-এর সঙ্গে similarity-টি সাধারণ literary coincidence হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
১৮. Nobel-এর সঙ্গে সম্পর্কটি অত্যন্ত সরাসরি
এখানেই আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর খুব গুরুত্বপূর্ণ। J. M. Coetzee 2003 সালে Nobel Prize in Literature পান এই disgrace বইটির ওপরে ভিত্তি করেই। আর Disgrace প্রকাশিত হয় 1999 সালে সাউথ আফ্রিকাতে এবং সেই বছরই Booker Prize জেতে। Booker-এর official archive-ও Disgrace-কে 1999 winner হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং জে এম Coetzee-কে 2003 Nobel laureate হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ আপনার manuscript-এর সঙ্গে যে সবচেয়ে শক্তিশালী literary parallel আমি পাচ্ছি, সেটি একজন Nobel Prize in Literature বিজয়ীর উপন্যাসের সঙ্গে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:
এটি কি সরাসরি plagiarism প্রমাণ করে?
না—তবে এখানে খুব সতর্ক হওয়া দরকার।
আমি যে পরীক্ষা করেছি তা হলো literary/plagiarism red-flag analysis, আদালতে গ্রহণযোগ্য forensic plagiarism determination নয়।
Plagiarism সাধারণত নির্ধারণ করতে হলে দেখতে হয়:
1. manuscript কখন লেখা হয়েছে;
2. লেখক Disgrace পড়েছেন কি না; এখানে উনি নিশ্চয় Disgrace বইটি পড়েছেন।এর কারণ লেখক প্রফ ডাক্তার প্রণব কুমার ভট্টাচার্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকদের বা নোবেল পুরস্কার এর জন্য নমিনেটেড লেখকদের বই পড়তে অভয়স্ত এবং প্রতি বছরই নোবেল পুরস্কার পাবার পূর্বে কোন কোন লেখক সেই বছরের জন্য শর্ট লিস্টেড ক্যান্ডিডেট হতে পারেন সেটা প্রেডিক্ট করে থাকেন ও অনেক বার ওনার প্রেডিকশন মিলেও গেছে।
3. কোনো অনুবাদ/summary/AI-generated source ব্যবহার হয়েছে কি না; এখানে হয় নি।
4. exact বা near-exact wording আছে কি না; না নেই
5. plot structure ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া হয়েছে কি না; এখানে প্রায় ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়েছে ।এমন কি মাঝ নদীর ওপরে গভীর রাতে নৌকায় শারীরিক মিলনের প্লটটি ও প্রায় একই রকম disgrace এর সঙ্গে
6. কোথায় adaptation এবং কোথায় copying;
7. manuscript-এর drafting history/version history কী বলে।
তবে এটা ঠিক যে আপনার manuscript-এর ভাষা হুবহু Coetzee-র ইংরেজি text-এর copy—এমন প্রমাণ আমি পাইনি।
কিন্তু plot architecture-এর similarity অত্যন্ত শক্তিশালী।এটাকে আমি এই মুহূর্তে বলব:
“High-risk structural similarity / possible plot-level plagiarism or very close adaptation requiring attribution and originality review.”
সরাসরি “নিশ্চিত plagiarism” বলা এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
৫. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
আপনার manuscript-এ নিজেই Disgrace-এর সঙ্গে similarity আরও বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু উপাদান আছে—যেমন Byron, professor-এর sexual scandal, daughter, farm, rape, dogs, euthanasia, social disgrace।
Coetzee-র Disgrace-এ Byron-ও গুরুত্বপূর্ণ literary reference; David Lurie Byron-এর জীবন নিয়ে opera লিখতে চান।
আপনার manuscript-এও অরিন্দম Byron নিয়ে পড়ান এবং রিয়ার Byron-এর জীবন নিয়ে opera লেখার সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করেন। এটি similarity-র আরও একটি স্তর।
৬. তবে ‘শেষ ট্রেন’-এর নিজস্ব দার্শনিক সংযোজনও আছে
এটাকে সম্পূর্ণ Disgrace বলা ঠিক হবে না। আপনার manuscript-এ কিছু স্বতন্ত্র স্তর রয়েছে:
1971 refugee history, Sodepur refugee-colony memory, Bengali middle-class social morality, Kolkata/Sealdah/Suburban Bengal setting
Riya–Arindam academic power relationship, Madhabi-র veterinary/euthanasia setting, Bengali political club/moral policing, Hindu–Muslim/social tension, Byron/Baudelaire/Rilke-র মাধ্যমে literary aesthetics, Camus-style absurdity, Freud/Nietzsche explicitly invoked
“শেষ ট্রেন”কে existential metaphor হিসেবে ব্যবহার
বিশেষ করে Sodepur-কে শুধু background না করে একটি পরিবর্তনশীল সামাজিক চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনাটি manuscript-এর নিজস্ব structural ambition।
আমার প্রাথমিক plagiarism-risk assessment
ক্ষেত্র আমার পাঠভিত্তিক মূল্যায়ন
সাধারণ theme similarity মাঝারি
philosophical similarity মাঝারি–উচ্চ
character-role similarity উচ্চ
plot-event similarity খুব উচ্চ
sequence similarity খুব উচ্চ
ending similarity অত্যন্ত উচ্চ
exact wording similarity এখনো প্রমাণিত নয়
Disgrace-এর সঙ্গে সম্ভাব্য influence খুব শক্তিশালী red flag
Nobel connection J. M. Coetzee — Nobel Literature prize 2003
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
আপনার উপন্যাসের দর্শনগুলি যথেষ্ট বিস্তৃত ও আকর্ষণীয়; কিন্তু originality-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা দর্শন নয়—plot structure।
কারণ Disgrace 1999 সালের একটি প্রকাশিত এবং Booker-winning novel, আর আপনার 2026 manuscript-এ তার সঙ্গে একাধিক অস্বাভাবিকভাবে নির্দিষ্ট narrative correspondence রয়েছে। Disgrace যে 1999 Booker winner, সেটি official Booker archive-এ নিশ্চিত।
তাই উপন্যাসটি বই হিসেবে প্রকাশের আগে আমি বিশেষভাবে ‘Disgrace vs শেষ ট্রেন’ একটি chapter-by-chapter forensic comparison করার পরামর্শ দেব। সেটিতে প্রতিটি chapter-এর plot event, character function, scene sequence, symbolism, ending এবং wording পাশাপাশি বসিয়ে কোথায় coincidence, কোথায় common literary trope, আর কোথায় সম্ভাব্য borrowing—তা আলাদা করা যাবে।
