শেষ ট্রেন (Sesh Train) (অধ্যায় ১ -১০)
শেষ ট্রেন (Sesh Train) (অধ্যায় ১ -১০)
উপন্যাসের নাম :-শেষ ট্রেন
লেখক পরিচিতি
প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য।
এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের ,)
ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের ,
পূর্বতন প্রফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ।
একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ ।
এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন
রচনা তারিখ-:.২.০৯ .২০২৬
এডিট করা -: এখনও .হয়নি।
কপিরাইট। -:
সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফ ডাক্তার প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এর ও ফার্স্ট ডিগ্রি ব্লাড রিলেটিভ এর
Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and Direct blood relationship of prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( IPR copy Right act of WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned here ,Please Don't try ever to infringe the copyright of the any content ,idea, theme,plot, character of philosophy, dialogues events characters and scene of published manuscript in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and either by civil laws for compensation in few millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws and in criminal proceedings
লেখকের রেসিডেন্স এর ঠিকানা-:
মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪,
E mail profpkb@yahoo.co.in
সংক্ষেপ: শেষ ট্রেন উপন্যাস
প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে শেষ ট্রেন মিনি উপন্যাসটি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী J M. Coetzee (2003 সালে Nobel Prize in Literature পান এই disgrace বইটির ওপরেই ভিত্তি করে।) ভিত্তি করে লেখা হয়েছে বাংলা ভাষায়। "Disgrace "এর প্লট/ স্ট্রাকচারাল ও চরিত্র গুলো আর "শেষ ট্রেনের" প্স্ট্রাকচার ও চরিত্র গুলোর সঙ্গে মিল যেমন আছে তেমনি অমিল ও অনেক।
অধ্যায় ১: বক্তৃতামঞ্চ ও শূন্যতা
প্রথম অধ্যায়: বক্তৃতামঞ্চ ও শূন্যতা
চকটা মাঝখান থেকে দু'টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।
কালো শ্লেট-বোর্ডের ওপর খসখসে শব্দে ভেসে উঠেছে লর্ড বায়রনের 'ডন জুয়ান'-এর একটি ছত্র: "And quiet nights, and overflowing glass..."
ভাঙা চকের বাকি অংশটা দুই আঙুলের চাপে গুঁড়ো হয়ে অরিন্দমের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে আর তর্জনীতে সাদা পাউডারের মতো সেঁটে ছিলো। বিকেল তখন তিনটে বাজে। কলেজের তিনতলার চার নম্বর শ্রেণীকক্ষের বিশাল খড়খড়িওয়ালা জানলা দিয়ে সেপ্টেম্বরের তির্যক রোদ এসে পড়েছে রিয়া সেনের ডান কাঁধে। রোদের ভেতর সূক্ষ্ম ধূলিকণাগুলো অলস গতিতে ভাসছে। যেন সময় এখানে স্থির হয়ে আছে, অথচ জানলার বাইরে, ৩০ নম্বর পার্ক স্ট্রিটের মাদার টেরেসা সরণির দিক থেকে ভেসে আসছে কোনো ছাত্রসংগঠনের মাইকের কর্কশ গর্জন—'আমাদের দাবি, মানতে হবে... ডিনকে স্মারকলিপি...'
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানলার দিকে একবার তাকালেন। তারপর হাত থেকে চকের গুঁড়ো ঝেড়ে ফেলার জন্য পকেট থেকে একটা পুরনো, নীলচে রুমাল বার করলেন। তাঁর আঙুলের চামড়া খসখসে, নখে চকধূলির সাদা আঁচড়।
"বায়রনকে নিয়ে যখন তোমরা পড়বে," অরিন্দম খুবই ধীর গলায় বললেন, তাঁর গলা খাঁকারি দেওয়ার প্রয়োজন হলো না, ঘরের সশব্দ নীরবতাই তাঁর কণ্ঠকে টেনে নিল, "....তখন খেয়াল রাখবে, তোমরা একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে পড়ছ না। তোমরা পড়ছ একটা আগুনকে নিয়ে, যে আগুনটা নিজেকে পোড়ানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। বায় রন..."তিনি নামটাকে দুটো খণ্ডে ভেঙে উচ্চারণ করলেন।
ক্লাস রুমের তৃতীয় সারিতে বসে থাকা রিয়া সেন হাতের কলমটা তার ডায়েরির ওপর আস্তে করে নামিয়ে রাখল। তার পরনে একটা হালকা জলপাই রঙের সুতির কুর্তি, চুলগুলো আলগা করে পেছনের দিকে বাঁধা। চোখের কোণে একটু ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টি স্থির অরিন্দমের দিকে।
"স্যার," প্রথম সারির এক ছাত্র, যার নাম শুভদীপ, ঘড়ি দেখতে দেখতে বলল, "বায়রনের এই যে অতিরিক্ত ভোগবাদ... এটাকে কি তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে কোনো এক ধরনের বিদ্রোহ বলা যায়? নাকি স্রেফ ব্যক্তিগত নৈতিক বিচ্যুতি?"
অরিন্দম টেবিলের কাঠের ওপর হাতদুটো ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। পঞ্চাশ বছরের পুরনো শালকাঠের টেবিলটা একটু কঁকিয়ে উঠল।
"বিদ্রোহ আর বিচ্যুতির মাঝখানের দেয়ালটা কে তোলে শুভদীপ? সমাজ, নাকি যে বিচ্যুত হচ্ছে সে নিজে?" অরিন্দম একটু থামলেন। রিয়া সেনের চোখের দিকে তাঁর দৃষ্টি গেল, কিন্তু তিনি তা ধরে রাখলেন না, চোখ ফিরিয়ে নিলেন ছাদের বিশাল, ধুলোপড়া ব্লেডের সেকেলে(১৯৭০ সালের ) পাখাটার দিকে। "পাপ আর নন্দনতত্ত্বের মধ্যে ফারাকটা খুব সূক্ষ্ম। বায়রন কিন্তু সাধারণ পাপাচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী স্বাধীনতার একজন বন্দি। তিনি জানতেন তিনি ভাঙছেন, এবং সেই ভেঙে যাওয়ার আনন্দটাকেই তিনি কবিতা করে রেখে গেছেন।"
"কিন্তু স্বাধীনতার মূল্য যখন অন্য কাউকে দিতে হয়?" রিয়ার গলা পাওয়া গেল। স্পষ্ট, মৃদু, কিন্তু ঘরে উপস্থিত অন্য তেইশজন ছাত্রছাত্রীর খাতা উল্টোনোর শব্দের চেয়েও স্পষ্ট।
অরিন্দম রিয়াকে দেখলেন। রিয়ার ঠোঁটের কোণে কোনো হাসি নেই।
"স্বাধীনতারও নিজস্ব একটা হিংস্রতা থাকে, রিয়া," অরিন্দম ডাস্টারটা হাতে তুলে নিলেন। কালো বোর্ডটার ওপর জমে থাকা বায়রনের পংক্তিগুলো এক ঝটকায় মুছে দিলেন। সাদা চকের ধোঁয়া ধোঁয়া গুঁড়ো হাওয়া ঘুরে ঘুরে তাঁর চশমার কাচে এসে জমল। "যে স্বাধীনতা কাউকে আঘাত করে না, তা আসলে স্বাধীনতা নয়, সেটা হলো সমঝোতা।"
বাইরের মিছিলের শব্দটা আরও কাছে চলে এসেছে। ড্রামের আওয়াজ হচ্ছে—ঠাঁ-ঠাঁ-ঠাঁ। শ্রেণীকক্ষের ছাদ থেকে ছোট একটু চুনকাম খসে পড়ল শেষ বেঞ্চের কাছে।
"আজকের মতো এটুকুই…," অরিন্দম চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন। "আগামী সপ্তাহে আমরা 'চাইল্ড হ্যারল্ড' শুরু করব। টেক্সটটা অন্তত দু'বার পড়ে আসবে।"
ছাত্রছাত্রীরা বেঞ্চ ছেড়ে উঠতে শুরু করল। কাঠের চেয়ার পিছলে যাওয়ার ক্যাঁচকোঁচ শব্দ, ব্যাগ গুছোনোর জিপের আওয়াজ, আর বারান্দায় হাজারো জোড়া জুতোর খসখস।
রিয়া উঠল না। সে ডায়েরিটা ব্যাগে পুরল খুব ধীরে ধীরে। অরিন্দম যখন টেবিল থেকে নিজের পুরনো চামড়ার ব্যাগটা তুলে নিচ্ছেন, রিয়া ড্যাসের কাছে এগিয়ে এল।
"স্যার, আমার থিসিসের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ড্রাফটটা..."
"রেখে দাও ডেস্কে," অরিন্দম ব্যাগের স্ট্র্যাপটা কাঁধে ঝোলালেন। "আমি বাড়ি যাওয়ার সময় গাড়িতে পড়ব।"
"আপনি কি আজ রাতে সোদপুর যাচ্ছেন?" রিয়া প্রশ্ন করল। তার গলায় কোনো বিশেষ কৌতূহল ছিল না, কেবল এক ধরণের যান্ত্রিক অধিকারের সুর।
"হ্যাঁ। শুক্রবারের ট্রাফিকে ট্রামে বাসে ওঠার চেয়ে শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরা সহজ।" অরিন্দম একবার রিয়ার হাতের দিকে তাকালেন। তার কবজিতে একটা পাতলা সোনার বালা, রোদ লেগে ঝিকমিক করে উঠল। "তোমার রিলকে-র ওপর চ্যাপ্টারটা কেমন দাঁড়াল?"
"রিলকে লিখেছেন, সৌন্দর্য হলো আতঙ্কের সূচনা মাত্র," রিয়া অরিন্দমের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বলল। তাদের মধ্যে তখন মাত্র দু'ফুটের দূরত্ব। রিয়ার শরীর থেকে হালকা চন্দনের বা শ্যাম্পুর সুবাস আসছে, যা কলেজের এই ভেজা স্যাঁতসেঁতে নোনা-ধরা দেয়ালের গন্ধকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দেয়। "আপনি কি বিশ্বাস করেন সেটা, স্যার?"
অরিন্দম রিয়ার চোখের দিকে চাইলেন। এই প্রথম তিনি দৃষ্টি সরালেন না। রিয়ার চোখের মণিতে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যা এই বয়সের মেয়েদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।
"রিলকে কবি ছিলেন, রিয়া। কবিরা আতঙ্ককে সুন্দর করে তুলতে ভালোবাসেন, কারণ জীবনের আসল আতঙ্ক সহ্য করার ক্ষমতা তাদের থাকে না।" অরিন্দম ব্যাগটা ভালো করে আঁকড়ে ধরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। "আসছি।"
"আমি কী কাল দুপুরের দিকে আসব, স্যার? আপনার সোদপুরের বাড়িতে?"
অরিন্দমের পা দরজার কাছে গিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তিনি পেছনে ফিরলেন না।
"কাল শনিবার। মেঘলা দিল্লি থেকে ফোন করতে পারে। তুমি সোমবার বরঞ্চ কলেজেই এসো।"
"সোমবার অনেক দেরি হয়ে যাবে," রিয়া খুব নিচু গলায় বলল, কিন্তু অরিন্দম ততক্ষণে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন।
বারান্দাটা বেশ লম্বা, যেন কোনো শেষ না হওয়া সুড়ঙ্গ। দু'পাশে উঁচু উঁচু থাম, যার গা থেকে চুনকাম খসে লাল ইট বেরিয়ে পড়েছে। বারান্দার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. বোস। বিভাগীয় প্রধান। পরনে ইস্ত্রি করা সুতির জামা, পকেটে দুটো বলপেন গোঁজা। হাতে এক তাড়া নোটিশ।
"অরিন্দমবাবু, এক মিনিট," ড. বোস এগোনোর পথ আটকে দাঁড়ালেন।
অরিন্দম থামলেন। "বলুন, বোস সাহেব।"
"আপনি কি শুনছেন না বাইরে কী হচ্ছে?" ড. বোস জানলার দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। বাইরে মাঠে তখন ইউনিয়ন সভাপতি বক্তৃতা দিচ্ছে, সাউন্ডবক্সের চোঙাটা চার নম্বর ব্লকের দিকে ঘোড়ানো। "ইউনিয়ন আবার ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছে। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে গোলমাল পাকাবে।"
"ওদের গোলমাল করার অধিকার আছে তো, বোস মশাই। আমাদের পড়ানোর অধিকার যেমন আছে।" অরিন্দম পকেট থেকে নস্যির কৌটো বার করতে গিয়েও থেমে গেলেন।
"পড়ানোর অধিকার? মানে?"
ড. বোস হালকা হাসলেন, যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, কেবল প্রশাসনিক তিক্ততা। "আপনার সিলেবাসের কী খবর? বায়রন নিয়ে দেখছি তিন সপ্তাহ কাটাচ্ছেন। ফার্স্ট সেমিস্টারের ছেলেরা বলছে, ক্লাসিক্যাল সাহিত্য নাকি তাদের মাথার ওপর দিয়ে সা সা করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আর মার্কসবাদী নান্দনিকতা কবে ধরবেন?"
"মার্কসকে নিয়ে বলার জন্য কলেজে অনেক লোক আছেন, বোস মশাই। আমি বায়রনটা একটু বুঝি। সেটুকুই থাক।"
ড. বোস একটু এগিয়ে এলেন। তাঁর চশমার কাচ বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু স্বরে বললেন, "আপনার বিষয়ে বেশ কিছু কথা শুনছি অরিন্দমবাবু। আমি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে বলছি, ব্যক্তিগত স্তরে নয় কিন্তু।"
অরিন্দমের বুকটা একবারের জন্য হিম হয়ে গেল, কিন্তু মুখের চামড়ায় তার কোনো ছাপ পড়তে দিলেন না তিনি। "কী কথা?"
"ওই মেয়েটি... রিয়া সেন। ও প্রায়ই আপনার ঘরে থাকছে। ছুটির পরেও। Phd এর রেজাল্ট আউটের মুখে এসব কিন্তু ভালো দেখায় না। কলেজের ভেতর এখন চারদিকে চোখ। স্টুডেন্ট ইউনিয়নও কিন্তু এসব সুযোগ খোঁজে।"
অরিন্দম ড. বোসের চোখের দিকে চাইলেন। একটা মাছি ড. বোসের কানের পাশে ভ্যানভ্যান করছে, কিন্তু ড. বোস হাত দিয়ে সরাচ্ছেন না।
"রিয়া একজন যোগ্য গবেষক, বোস মশাই। ও তুলনামূলক সাহিত্যটাকে ভালোই বোঝে। যদি কোনো ছাত্রী কাজের প্রয়োজনে আমার কাছে আসে, তাকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।"
"উপদেশ হিসেবে নেবেন না, অরিন্দমবাবু," ড. বোসের গলা আরও নরম, প্রায় বিষাক্ত হয়ে এল। "সিলেবাস শেষ না হলে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ছেলেরা গোলমাল করবে। নন্দনতত্ত্ব বাদ দিয়ে মার্কসকে নিয়েও একটু ভাবুন। আর... ব্যক্তিগত জীবনটাকে একটু সাবধানে রাখুন। বয়স হচ্ছে আমাদের।"
ড. বোস আর দাঁড়ালেন না। হাত থেকে নোটিশের তাড়াটা নাড়াতে নাড়াতে করিডোর ধরে হেঁটে চলে গেলেন। তাঁর জুতোর মচমচ শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে করিডোরে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল।
অরিন্দম সিঁড়ির দিকে এগোলেন। পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ ট্যাক্সিগুলোর সারির ওপর রোদ লাল হয়ে আসছে। শিয়ালদহ স্টেশনে তিনি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন। পায়ের নিচে পিচ জমে শক্ত হয়ে আছে, হাজার হাজার মানুষের চাপ আর ট্রামের চাকার ঘষায় যা মসৃণ।
শিয়ালদহ স্টেশন তখন গমগম করছে। চারপাশের মানুষের ভিড়, বাসি চায়ের গন্ধ, হকারদের চিৎকার—সব যেন একটা বিরাট, চলমান ইঞ্জিনের ভেতরের আওয়াজ।
অরিন্দম প্ল্যাটফর্মের একটা পিলারের পাশে দাঁড়ালেন। ৫টা ৪২-এর শান্তিপুর লোকাল আসবে।
পিলারের গায়ে একটা পুরানো পোস্টার অর্ধেক ছেঁড়া অবস্থায় ঝুলছে—'মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পান... অভিজ্ঞ জ্যোতিষী...' পোস্টারের অর্ধেকটা ছিঁড়ে গিয়ে কেবল লেখা আছে: '...মুক্তি পান'।
অরিন্দম ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে আবার হাতটা মুছলেন। চকের গুঁড়ো সম্পূর্ণ যায়নি। আঙুলের ভাঁজে সাদা দাগগুলো রয়ে গেছে। তিনি ট্রেনটার দিকে তাকালেন, যা দূর থেকে একটা বিশাল কালো সাপের মতো ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।
লাল আলোটা সবুজ হলো।
ইঞ্জিনের হুইসেলটা যেন পুরো স্টেশনটাকে দু'ভাগে চিরে দিল। অরিন্দম ভিড়ের ধাক্কায় এগোতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, এই যে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনের দরজায় ওঠার জন্য কনুই দিয়ে একে অপরকে ঠেলছে, এদের কারো নিজস্ব কোনো গন্তব্য নেই। এরা কেবল একটা চাকার সঙ্গে বাঁধা পড়ে ঘুরছে।
তিনি কামড়ায় উঠলেন। হাতল ধরে দাঁড়ানোর পর তাঁর মনে হলো, রিয়া সেনের বালাটার ঝিকমিকানি এখনো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর ড. বোসের সেই কথাটা—"বয়স হচ্ছে আমাদের।"
অরিন্দম ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের আঁধার নেমে আসা কলকাতার দিকে চাইলেন। রেললাইনের পাশের বস্তিগুলোতে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। উনুনের ধোঁয়া কুয়াশার মতো হাওয়ায় ভাসছে।
তাঁর মনে হলো, তিনি একা নন। কিন্তু এই ট্রেনের ভেতরে, এই ভিড়ের গাদাগাদিতে দাঁড়িয়েও, তাঁর চেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ আর এই মুহূর্তে গোটা শহরে দ্বিতীয়টি নেই।
অধ্যায় ২: শৈশবের ছায়া ও প্রথম অপরাধ
বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলার ৩ নম্বর শ্রেণীকক্ষের খিলানযুক্ত কাঠের জানালাটি বহু বছরের পুরনো। তার সবুজ রং চটে গিয়ে নিচে লালচে নোনা ধরা কাঠ বেরিয়ে পড়েছে। বাইরের চত্বরে বৃষ্টি থামার পর কাছের মিউনিসিপ্যালিটির ডাস্টবিনের পাশে একটা হলদেটে, বুকের পাঁজর বের হওয়া নেড়ি কুকুর ভিজা হাড়ের ওপর দাঁত বসানোর নিষ্ফল চেষ্টা করছিল।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানালার রেলিঙে দু'টি হাত রেখে স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন। আঙুলের ফাঁকে ওনার জ্বলন্ত সিগারেটের ছাই জমে উঠেছিল। চকের গুঁড়ো আর পুরোনো কাগজের মিঠে আর্দ্র গন্ধ ভেসে আসছে পেছনের ফাঁকা ক্লাসঘর থেকে কিছুক্ষণ আগেই বায়রন এর কবিতা নিয়ে ক্লাস নিয়েছিলেন। নিচে, কাদার মধ্যে নোংরা জলের ওপর ভেসে থাকা আলোটায় কুকুরটির ছায়া পড়েছিল—অস্বাভাবিক দীর্ঘ, কৃশ এবং একদম একা।
অরিন্দমের মনে হলো, এই ছায়াটা তাঁর নিজস্ব। ৫০ ( ১৯৭১ সালের) বছর আগের একটা বিকেল হুট করে সেই স্যাঁতসেঁতে ডাস্টবিনের গন্ধ ধরে তাঁর নাকের ভেতর ঢুকে পড়ল।
একদিন বিকেলে, বাড়িতে অরূপের অনুপস্থিতিতে, রত্না দেবী অরিন্দমের হাত নিজের দুই হাতে চেপে ধরেছিলেন। কিন্তু এবার তাঁর চোখে কান্না ছিল না; ছিল এক হিংস্র, ভীতু মধ্যবিত্ত নারীর আত্মরক্ষার ছলনা। রোদ মরে আসছিল সোদপুরের ট্রেইন লাইনের পুবদিকে গোসালার কাছে কলোনির সরু গলিটায়। খোলা নর্দমার ওপর সার দিয়ে বসানো শ্যাওলাধরা সিমেন্টের স্ল্যাব। তার পাশ কাটিয়ে, ফুল প্যান্টের তলা কিছুটা গুটিয়ে, ১৭ বছরের অরিন্দম সেদিন উঠে এসেছিল অরূপদের আধো-অন্ধকার একতলা টিনের চালের ঘরটায়।
ঘরের ভেতর ঢুকতেই একধরনের থমথমে সোঁদা গন্ধ নাকে এসে লাগে। পচা সরিষার তেল, দেয়ালের আর্দ্র চুনকাম আর সস্তা স্নো-পাউডারের একটা ভ্যাপসা ট্রপিক্যাল ঘ্রাণ ঘুরে বেড়াতো বাতাসহীন ঘরে।
অরূপ সেদিন বাড়িতে ছিলো না। স্কুলের কে সি স্যারের কাছে বীজগণিত আর জ্যামিতি পড়তে গেছিল। অরূপের বাবা বাড়িতে বাড়িতে রং করার কাজ করতেন। ঘরে তখন কেবল অরূপের মা—রত্না দেবী। কম খরচের ছাপা সুতির শাড়িটা তাঁর, মেদবহুল ৩৬-৩৭ এর শরীরে কিছুতেই ঠিকমতো আঁটসাঁট হচ্ছিল না। পেটের বা দিকের ভাঁজে শাড়ির আঁচলটা ঢাকতে পারে নি। ওনার পিঠ ভর্তি কোকড়ানো চুলে খাঁটি নারকেল তেলের সোঁদা গন্ধ। ড্রেসিং টেবিলের একটা ঘোলাটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটা ভাঙা দাঁতের প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে নিজের কোকড়ানো লম্বা চুলে জট ছাড়াচ্ছিলেন। রিফিউজি হয়ে এসেছিলেন একসময় বাংলাদেশের খুলনা শহর থেকে সদেপুরে
অরিন্দম দরজার তোয়ালে-ঝোলানো কাঠের রডটার পাশে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার বুকের ভেতর সেদিন একটা, ভারী হাতুড়ি পিটছিল। কোনো দ্বিধা ছিল না, কোনো দ্বিধাবোধের অবকাশও ছিল না—ছিল কেবল এক উদ্দাম, কাঁচা বয়সের ক্ষুধা আর নারী শরীরকে জানার তীব্র কৌতূহল।
চিরুনির খসখস শব্দটা হঠাৎ থেমে গেছিলো। ড্রেসিং আয়নার ঘোলাটে কাচে অরিন্দমের ছায়া দেখতে পেয়ে রত্না দেবী ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।
"বাপ্পা? তুই? অরূপ তো তোদের কেসি স্যারের বাড়ি গেছে। বলেনি তোকে? তোর ও তো যাবার কথা সেখানে। যাস নি যে?" অরিন্দম কিছু বলল না। সে স্থির চোখে চেয়ে ছিলো রত্না দেবীর দিকে। রত্না দেবী হাতের চিরুনিটা আলমারির ওপর রাখতে রাখতে শাড়ির আঁচলটা ভালো করে টেনে গায়ে জড়ানোর এক অসম্পূর্ণ চেষ্টা করলেন। তাঁর দুই চোখে ছিল কলোনি পড়ার গৃহিণীদের চিরাচরিত বৈচিত্র্যহীন ক্লান্তি।
"তুই কী বসবি? অরূপের আসতে আসতে ওই পাঁচটা ছ'টা বাজবে। চা খাবি এক কাপ? নাকি কোনো খাতা বই নিতে এসেছিস?"
অরিন্দম দুই তিন পা এগিয়ে গেছিলো। জুতোর সোলে ঘরের মেঝের সস্তা লাল সিমেন্টের ওপর হালকা ঘর্ষণ হয়েছিল। তার নিঃশ্বাসের শব্দ ঘন হয়ে আসছিল।
"কী রে? কথা বলছিস না কেন? অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন আমার মুখের দিকে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি তোর? জ্বর-জ্বারি এলো নাকি আবার?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দেয় না। সে পেছন ফিরে কাঠের দরজার পুরোনো পিতলের ছিটকিনিটা এক টানে তুলে দিল। পিতলের ছিটকিনিটা দরজার খোপে ঢোকার সময় এক তীব্র ধাতব শব্দ করে উঠল—ঠাস!
রত্না দেবী এবার চমকে উঠলেন। হাতের চিরুনিটা টপ করে হাত থেকে খসে মেঝের ওপর গিয়ে পড়ল।
"বাপ্পা! কী করছিস তুই? দরজায় হঠাৎ খিল দিলি কেন? পাগল হলি নাকি রে?" রত্না দেবীর গলায় আতঙ্কের সাথে এক চরম বিস্ময় দানা বেঁধে উঠল। তিনি ঘরের এক কোণে সেলাই মেশিনের টেবিলটার দিকে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
অরিন্দম কথা বলল না। সে দুই পদক্ষেপে দূরত্বটা মুছে দিয়েছিলো। রত্না দেবীর মেদবহুল, নমনীয় দুটো হাত সে এক লাফে শক্ত মুঠোয় জাপটে ধরেছিল। তার কাঁচা, ক্ষুদিত আঙুলগুলো রত্না দেবীর হাতের শক্ত, শাঁখা-পরা চামড়ায় বসে গেছিল।
"ছাড়! বলছি ছাড় আমাকে! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? তুই না অরূপের বন্ধু... আমার ছেলের সমান! তোর মায়ের বয়সী আমি! লজ্জা করে না তোর এই সব করতে আমার সঙ্গে? ছিঃ ছিঃ ছাড় আমাকে বলছি! ছাড়! "
রত্না দেবী পুরো শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে অরিন্দমকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা ও কয়েকবার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রতিরোধের ধাক্কাতে কেমন যেন এক শিথিলতাও ছিল। সামাজিক শাসন আর নৈতিকতার চিৎকার তাঁর মুখে ফুটে উঠলেও, নিজের দীর্ঘদিনের অভাব, অবহেলা আর একঘেয়ে দৈনন্দিন অভাবের জীবনের অন্তরালে যেন এক অজানা আত্মসমর্পণের আকুলতাও জন্ম নিচ্ছিল ওনার ভেতরে ভেতরে।
অরিন্দম তাঁর কোনো কথাই শুনল না। সে তাঁর স্থূল, ভারী শরীরটাকে দেয়ালের চুনকাম-ঝরা দিকে ঠেলে দিয়েছিল। দেয়ালের শুকনো চুন ঝরে পড়ে ছড়িয়ে গেল রত্না দেবীর শাড়ির আঁচলে আর অরিন্দমের ইস্ত্রি করা সুতির জামায়।
"বাপ্পা... শোন... ভগবান তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না রে... তুইও শেষ হয়ে যাবি একদিন... তুই যে আমাকেও শেষ করে দিলি.. ওহ ভগবান ….. ন না না…তুই আমার ছেলের মত! হাতটা সরা ওখান থেকে …ঈশ ঈশ.আমি এসব পারবো না করতে তোর সঙ্গে…না না আমি যে তোর মায়ের মত…"
রত্না দেবীর গলার স্বর কান্নার তোড়ে ভাঙতে শুরু করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে, এক তীব্র বৈপরীত্যে, তাঁর শাখা চুড়ি পড়া হাতের মুঠো দুটো অরিন্দমের পিঠের ইস্তিরি করা জামাটাকেও খামচে খামচে ধরেছিল। অরিন্দম তাঁর ঘামে ভেজা খোলা দুই বুকের গভীর খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়েছিল। প্লিজ মাসীমা প্লিজ…চুমুর পর চুম সেখানে । খোলা বুকের চারধারে । কোনো স্বর্গীয় অনুভূতির স্থান সেখানে ছিল না ; সেখানে ছিল রক্ত মাংসের এক মধ্যবয়স্কা নারীকে দখলের উল্লাস, অপরাধবোধের অতলে ডুবে যাওয়ার এক তীব্র, অপবিত্র আনন্দ। রত্না দেবী ছটফট করেছিলেন কিছুক্ষণ ধরে , অরিন্দমের বাহুডোরের থেকে নিজেকে সরাতে। ধাক্কা দিয়ে সরাতে চেষ্টা করলেন অরিন্দমকে তার শরীর থেকে।তারপর ওনার ভারী শরীরটাও কেমন যেনো অবশ আর স্থির হয়ে এসেছিল। অরিন্দমও রত্না দেবীকে আরও আদর করছিল অনভিজ্ঞ এক পুরুষের মত এখানে সেখানে ওখানে। রত্না দেবী বোবা দুইচোখে তাকিয়ে ছিলেন ১৭ বছরের ছেলেটার মুখের দিকে। কী করছে সে তাকে নিয়ে। ওনার শরীরও জেগে উঠছিল যেনো শীতঘুম ভেংগে। ছেলেটার আঙুলের ডগায় যে কেনো এত সুখ ও আরাম ছিলো। কখন যেন রত্নাদেবীও তার মেদবহুল শরীরের ওপর বাপ্পা ডাক নামের ছেলেটার ফলানো অধিকার গুলোকে মেনে নিতে শুরু করেছিলেন, লজ্জা পেলেও। ।একসময় অরিন্দম কিছুটা জোর করেই রত্না দেবীর নগ্ন দুই জঙ্ঘা ও থাইয়ের মধ্যিখানে কালো ঘাস ভর্তি মাংসল জায়গায় নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইলে রত্না দেবী গুঙিয়ে উঠে দুই হাতে চাপা দিয়ে ফিস ফিস" না বাপ্পা না আজকে নয় বাবা....আমিও তৈরী নয় আজকে" শোনেনি অরিন্দম সেই বারণ। রত্নাদেবী গুঙিয়ে উঠেছিলেন " হায় ভগবান…এও কিনা লেখা ছিল আমার কপালে? উঃ লাগছে তো আমার বাপ্পা।.. আস্তে "
একঘণ্টা পরের নীরবতাটা ছিল সত্যিই খুব ভারী। ঘরের সিলিং ফ্যানের পুরোনো ব্লেডটার ঘড়ঘড় শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। রত্না দেবী তার ঘরের চৌকির এক কোণে বসে হাত দিয়ে শাড়ির কুঁচি আর ব্লাউজ ঠিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। অরিন্দমের শরীরের থেকে নির্গত গলিত উষ্ণ লাভা রত্না দেবীর বস্তিদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল তার সায়াতে। তাঁর চোখের কোণে জল গড়িয়ে এসে নাকের পাশে সস্তা পাউডারের ওপর দাগ তৈরি করেছিলো। মুখে এক প্রচ্ছন্ন গ্লানি ও ভারী আতঙ্কের আর পাপ বোধের ছায়া। অরিন্দম চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে তার শার্টের ও প্যান্টের বোতামগুলো আঁটছিল।
"যা এখান থেকে। এখুনি বেরো।" রত্না দেবীর গলা কাঁপছিল। তিনি অরিন্দমের দিকে না তাকিয়েই মেঝের দিকে মুখ করে বললেন, "আর কোনোদিন এই বাড়ির ত্রি সীমানায় আসবি না তুই। অরূপ আসুক । আমি ওকে আজই সব বলব, তুই যা যা করেছিস আমার সঙ্গে। তোর বাবা মাকেও গিয়ে বলব।" অরিন্দম দরজার ছিটকিনিটা নামাল। কাঠের দরজাটা খোলার সময় হালকা মড়মড় শব্দ হলো। সে বাইরে পা রাখার আগে আরও একবার থামল।
"কাউকেই কিচ্ছু বলবেন না আপনি সেটা আমি ভালোই জানি। ,আপনিও আজকের ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করছেন" অরিন্দমের গলার স্বর অস্বাভাবিক শান্ত ও সমতল শোনালো, যা ১৭ বছরের কোনো কিশোরের গলায় মানায় না।
"মুখ সামলে কথা বল অরিন্দম! তুই আমাকে নষ্ট করে দিলি! আমি পুলিশের কাছেও যাব! ডায়রি লেখাবো তোর নামে" রত্না দেবী গলার স্বর নিচু রেখে ফিসফিস করে চিৎকার করে উঠলেন।
"যান, কে না করেছে যেতে আপনাকে? " অরিন্দম ঘুরে না তাকিয়েই বলল, "পুলিশকে বলবেন যে আপনার ছেলের বন্ধু এসে এই ঘরে... তখন অরূপ কী ভাববে? কাকাবাবুই বা কী করবেন আপনার সম্বন্ধে ? কলোনির লোকই বা কী বলবে? আপনার নামে? ছিঃ ছিঃ করবে…যান পাঁচ কান করুন এটা…. সকল কে গিয়ে বলুন…বসে রইলেন যে….বড়"
রত্না দেবী থমকে গেলেন। কথাগুলো তাঁর গলার কাছে এসে আটকে গেল। তিনি শাড়ির আঁচলটা গালে চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ছিঃ ছিঃ
অরিন্দম বাইরে বেরিয়ে এলো। বিকালের হলদেটে রোদ এসে পড়েছে গোসালার কাছে কলোনির খোলা নর্দমায়। সে নিজের হাতের তালুটার দিকে তাকাল—সেখানে অরূপের মা রত্না দেবীর গালের সস্তা পাউডার, নারকেল তেল আর ওনার ঘামের নোনা গন্ধ লেগে আছে। সে হাতটা পকেটে পুরে নিল। ধুলো উড়িয়ে হেঁটে চলল কলোনির গলি দিয়ে, মাথা নিচু করে, কিন্তু ভেতরটা এক অদ্ভুত, অনমনীয় শক্তিতে পূর্ণ। এই প্রথম সে নারী শরীর দেখেছে। সম্ভগ করেছে।
পরবর্তী কয়েক মাসে সেই ভয়ের দৃশ্যপট নতুন রূপ নিতে শুরু করেছিল।
নিজের ভেতরের, স্বামীকে আর ছেলে কে ঠকানোর অপরাধবোধ আর পাপ করবার ভীতি যখন রত্না দেবীকে রাতের পর রাত ঠিকমত ঘুমোতে দেয়নি, তখন আত্মরক্ষা ও বেঁচে থাকার এক নতুন কৌশল তাঁর ভেতরে জাগতে শুরু করেছিল। কলোনির তার অভাবের সংসার, স্বামীর সামান্য রোজগার বাড়ি ঘর রং করবার মিস্ত্রি হিসেবে, আর ছেলের ভবিষ্যতের টানাপোড়েন তাঁকেও শেখাল কীভাবে অপরাধকেও একটা অস্ত্রে পরিণত করা যেতে পারে। রত্নাদেবী এরপরে ও অরিন্দমকে বারে বারেই অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। একরকম বাধ্যই হতেন বাড়িতে কেউ না থাকলে আর অরিন্দম এই বাড়িতে আসলে, ঘরের দরজায় ভেতর থেকে সিটকানি তুলতে। অরিন্দম কিন্তু খুবই চেষ্টা করত ওনাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে। তখন খুবই অস্বস্তি হতো রত্নাদেবীর অরিন্দমের সেই শৃঙার , চুম্বন গ্রহণ করতে নিজের শরীরে কিন্তু ওনারও যে ওকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিলো না। অরিন্দম আদর করাও শিখে গেছিল নিজে থেকেই , বই পরে ।তাকে কিছু শেখাতে হয় নি।
সেদিনও আকাশ কিছুটা মেঘলা ছিল। কলোনির টিনের চালে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। অরূপ সেদিন স্কুলে হয়তো কোনো ফুটবল ম্যাচের কাজে আটকে গেছে, বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। অরিন্দম আসবে স্কুল পালিয়ে। রত্না দেবী ফোনে ডেকেছিলেন ওকে।
অরিন্দম দরজায় কড়া নাড়তেই রত্না দেবী দরজা খুলে দিলেন। তবে এবার তাঁর চোখে আগের মতো আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি ছিল না। তাঁর পরনে ছিলো একটি পরিষ্কার রঙিন সুতির শাড়ি, চুলে নতুন করে বাঁধন। সিঁথিতে অনেকতা সিদুর, গালে গলায় হালকা সস্তা পাউডার।
অরিন্দম ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিতে হাত দিতেই রত্না দেবী শক্ত গলায় বলে উঠলেন, "ছিটকিনি দিবি না। দিতে হবে না"
অরিন্দম হাত থামিয়ে তাকাল। "কেন?"
"যা বলছি শোন। দরজা ওরকমই ভেজানো থাক।" রত্না দেবী খাটের পাশে রাখা লোহার পুরোনো ট্রাঙ্কটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ট্রাঙ্কের ওপর একটা সস্তা কার্ডবোর্ডের চকোলেটের বাক্স রাখা ছিল।
"তুই ভাবিস একমাত্র তুই খুব চালাক, তাই না রে বাপ্পা?" রত্না দেবী ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে এখন ভীতি নয়, বরং এক হিসেবি মধ্যবিত্ত নারীর ধারালো চাউনি।
"কী বলতে চাইছেন?" অরিন্দম এগিয়ে এলো।
"তুই ভেবেছিস তুই যা খুশি করবি আমাকে নিয়ে , আর আমি মুখ বুজে সব সহ্য করব? তুই আমাকে ভয় দেখাবি অরূপের কথা বলে, অরূপের বাবার কথা বলে? কলোনির লোকের কথা বলে?" রত্না দেবী চকোলেটের বাক্সটার দিকে ইঙ্গিত করলেন। "ওটার ভেতরে কী আছে জানিস তো?"। অরিন্দম বাক্সের দিকে তাকাল, তারপর রত্না দেবীর চোখের দিকে। "কী আছে ওটাতে?"
"ছবি, তোর আর আমার কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের" রত্না দেবীর ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত, শুকনো হাসি ফুটে উঠল। "অরূপদের স্কুলের ক্যামেরার কথাটি মনে আছে? যেটা দিয়ে কালীতলার পিকনিকের ছবি তুলেছিলিস তুই ? সেই ক্যামেরাটা দিয়েই গত সপ্তাহে তোর অজান্তেই ছবিগুলো তুলে রেখেছি আমি। তোর আর আমার অসাবধান মুহূর্তের ছবি।
অরিন্দম এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল, কিন্তু সে মুখে তা প্রকাশ হতে দিল না। "আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।"
"মিথ্যে? একদমই নয়" রত্না দেবী একটু এগিয়ে এলেন। তাঁর গলার স্বর এখন ভারী, নিচু ও স্পষ্ট। "পরীক্ষা করে দেখবি? খুলে দেখেই নে তাহলে । এই ছবিগুলো যদি তোর বাবার হাতে গিয়ে পড়ে? যদি তোদের স্কুলের মাস্টারমশাই, হেডস্যার দেখেন? যদি এই কলোনির মোড়ে টাঙিয়ে দেওয়া হয়? তখন তোর পড়াশুনো, তোর স্কলারশিপের কী হবে অরিন্দম? তোর ওই বড় বড় পণ্ডিত হওয়ার স্বপ্নেরই বা কী হবে?"
অরিন্দম রত্না দেবীর মুখের প্রতিটি রেখা লক্ষ্য করল। ঘরের ভেতরের আর্দ্রতার মধ্যে রত্না দেবীর স্বর যেন আরো বেশি ধারালো শোনালো। সে বুঝতে পারল, রত্না দেবী সত্যি ছবি তুলেছেন কি না সেটা খুব একটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো—তিনি এই ফাঁদটা নিখুঁতভাবে কিন্তু পেতেছেন। শিকার আর শিকারির ভূমিকা এক মুহূর্তে উল্টে গেছে। "আপনি কী চান আমার কাছে ?" অরিন্দম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল।
রত্না দেবী একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চাউনি এবার একটু শিথিল হলেও নিষ্ঠুরতা কিন্তু কমলো না। তিনি খাট থেকে অরিন্দমের স্কুল ব্যাগ টা টেনে নিলেন। সেটির চেইন খুলে ভেতরে হাত পুরে দিলেন। "তোর বাবা তোকে তোদের টেস্ট পরীক্ষার বই আর টিউশন ফি দেওয়ার জন্য ১০০টা টাকা দিয়েছিল না কালকে? আমি কিন্তু সেটা জানি। তুই নিজে অরূপকে বলছিলিস কালকে।" রত্না দেবী খাতার ভেতর থেকে চকচকে নীল রঙের নোটটা টেনে বের করলেন। "এই যে….এটা আমার"
"ওটা আমার টিউশন ফি-র টাকা," অরিন্দম হাত বাড়াল। " জহর স্যারকে না দিলে স্যার ইংলিশ ক্লাসে বসতে দেবে না যে।"
"দেবে…দেবেরে," রত্না দেবী নোটটা নিজের শাড়ির আঁচলের খোঁটে শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, "তোর জহর স্যারকে বলবি টাকাটা তোর হারিয়ে গেছে। তোর বাবাও তোকে আবার টাকা দেবে। তোদের তো আর টাকার অত অভাব নেই। আয় আমার কাছে…তোকে এবারে আদর করে দেই…."
অরিন্দম হাত নামিয়ে নিল। সে স্থির চোখে রত্না দেবীর দিকে চেয়ে রইল।
"তুই আমাকে নষ্ট করেছিস বাপ্পা," রত্না দেবী খাটে গিয়ে বসলেন, তাঁর গলায় আবার পুরোনো সেই বিষণ্ণতার সুর ফিরে এলো, কিন্তু আঙুল দুটো টাকার খোঁটটাকে শক্ত করে চেপে ধরে ছিল। "আমাকে এই বয়েসে তোর জোর খাটিয়ে পাপের ভেতর টেনেও নামিয়েছিস। এখন এই সংসার চালাতে গিয়ে আমাকে হাজারটা হিসাব করতে হয়। অরূপের নতুন জামা নেই, ঘরে চাল থাকে না প্রায়ই... এই টাকাটাও আমার দরকার । আমাকে এখন থেকে তুই টাকা দিবি..আমিও খুব আদর করবো তোকে! কেমনতো । "এটা কিন্ত ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে মাসিমা," অরিন্দম ধীরস্বরে বলল।
"এটা ব্ল্যাকমেইল নয় রে বোকা," রত্না দেবী জানালার বাইরে নেমে আসা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন, "এটা শুধু তোর আর আমার মধ্যে একটা হিসাব। তুই আমার শরীর চাস,আমার করা আদর চাস তোর শরীরে। আর আমারও টাকা চাই। তুই যেমন আমাকে ব্যবহার করবি, আর আমিও তোকে ব্যরবহার করব। এতে তোর বাধা থাকার কথা নয় , তাই না?"
অরিন্দম কিছু সময় নীরব হয়ে রইল। মেঝের লাল সিমেন্টের ওপর জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছিল। সে বুঝতে পারল—রত্না দেবীও ওনার অপরাধবোধকে বেঁচে থাকার সুবিধায় রূপান্তর করে নিয়েছেন। এই ঘরে এখন আর কোনো নির্দোষ মানুষ নেই।
অরিন্দম এক ধাপ এগিয়ে এলো। রত্না দেবী কিন্তু এবার আর পিছিয়ে গেলেন না বা সোজা হয়ে বসলেন না। তিনি স্থির হয়ে বসে রইলেন, যেন এই চুক্তির মূল্য তিনি ইতিমধ্যেই আদায় করে নিয়েছেন। রত্না দেবীও মুখ তুলে অরিন্দমের ঠোঁটের নিচে নিজের ঠোঁট রেখে ফিসফিস করলেন" সোনা ছেলে তো তুই …. তাই না?…উমমমম….দুষ্টু…ছেলে। যাও আমার বুঝি লজ্জাটজ্জা থাকতে নেই? "
"পরের সপ্তাহেও কি আবার টাকা আনতে হবে?" অরিন্দম জিজ্ঞেস করেছিল।
"হু যেদিন বলব, সেদিন আনবি," রত্না দেবী ওনার বুকের শাড়ির আঁচলটা নিজের কোলের ওপরে ফেলে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "আর অরূপের সামনে , অরূপের বাবার সামনে একদমই স্বাভাবিক থাকবি। ওরা যেন এসবের একটুও কিছু বুঝতে না পারে।..বুঝতে পেরেছিস তো? "
অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রত্না দেবীর মুখোমুখি দাঁড়াল। ঘরের ভেতর বৃষ্টি আর সস্তা পাউডারের গন্ধটা আবার ভারী হয়ে উঠল। কোন কথা না বলে, অরিন্দম নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। রত্না দেবী চোখ বুজে মাথাটা পেছনের দেয়ালটায় টিকিয়ে রাখলেন—চুনকামের সাদা গুঁড়ো আবার তাঁর চুলে এসে লাগল, কিন্তু এবার আর তিনি তা ঝেড়ে ফেলার কোনো চেষ্টা করলেন না। অরিন্দমের হাত রত্না দেবীর ব্লাউজের ভেতরে । চাপ । সেটা ছিল ব্ল্যাকমেইল, আবার একই সাথে পাপের বখরা ভাগ করে নেওয়া। রত্না দেবী তাকে শোষণ করছিলেন, আর অরিন্দম সেই শোষণের বিনিময়ে কিনে নিচ্ছিলেন তাঁর ভেতরের পশুর স্বাধীনতা। রত্না দেবী অরিন্দমের চিবুক নেড়ে বললেন " একটা মোস কোথাকার। "সেদিনই অরিন্দম বুঝেছিল—এই পৃথিবীতে কেউ সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়। পাপ যখন লেনদেনে পরিণত হয়, তখন অপরাধবোধের তীব্রতা কমে গিয়ে জন্ম নেয় এক নিষ্ঠুর পারস্পরিক নির্ভরতা।
পরবর্তীকালেও, রত্না দেবীর এই দাবি কেবল ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছর তিন পর হবে অরিন্দম তখন ইংরেজি অনার্সে প্রেসিডেন্সি থেকে BA ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে, বসন্তের ছুটিতে অরূপদের পরিবারের সঙ্গে বাসন্তী ও সুন্দরবনের প্রান্তঘেঁষা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছিল অরিন্দম। অরিন্দম যে যাবে তাদের সঙ্গে সেটা কিন্তু রত্না দেবী মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু ওনার উপায়ও ছিলো না। ছেলে অরূপের বায়না আর জেদ ছিলো যে ওর স্কুলের বন্ধু অরিন্দমও তাদের সঙ্গে যাবে। অরূপের বাবার ও আপত্তি কিছু ছিলো না। বাধ্য হয়েই মেনেও নিতে হয়েছিল রত্না দেবীকে অরিন্দমের যাওয়া তাদের সঙ্গে বেড়াতে।
সেই ভ্রমণের প্রথম রাতেই, কাঠের এক পুরনো দোতলা ডাকবাংলোয় যখন রাতের ডিনার সেরে অরূপ ঘুমিয়ে পড়েছে সারাদিনের পথের ক্লান্তিতে, আর অরূপের বাবাও এক বোতল স্থানীয় তাড়ির নেশায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মধ্যেও নাক ডেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, রাত তখন দুটো আড়াইটে হবে হয়তো অরিন্দম তখন জানালার ফাঁক দিয়ে রত্না দেবীকে ফিসফিস করে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল। রত্নাদেবিও ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন বাপ্পাকে বারে বারেই ফিস ফিস করে অস্বীকার করে দরজা খুলতে ও ওর সঙ্গে যেতে।
" না এলে কিন্তু আমি এখনই কাকাবাবুকে আর অরূপকে কালকেই বলব, আপনি এতদিন ধরে আমার কাছ থেকে কত টাকা ব্ল্যাকমেইল করে নিয়েছেন," অরিন্দমের হুমকি ছিল ধারালো ছুরির মতো। রত্নাও অস্বীকার করছিলেন বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে। রত্না দেবীর জানাই ছিল বাপ্পার চাওয়া কী হবে এতো রাতে।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে চাপা গলায় ফিস ফিস করে রিস্ক গুলো বোঝাবার পরও যখন বাপ্পা জানালা থেকে নড়ে নি, ,একরকম বাধ্য হয়েই দরজা খুলে-বাইরে এসে অন্ধকারে অরিন্দমের মুখোমুখি। এর পরও অরিন্দমকে বোঝাবার হাজারো আপ্রাণ ব্যর্থ চেষ্টা। এটাই তো ভয় পেয়েছিলেন রত্নাদেবী অরিন্দমকে তাদের সঙ্গে বেড়াতে নিয়ে আসতে। অরিন্দমও নাছোড়বান্দা । কী বা আর করতেন রত্না দেবী? পেছন পেছন রত্না দেবী ডাকবাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন ডাকবাংলোটার পাশেই নদীর ঘাটের দিকে। ঘাটের পারে আগেই একটা ছোট দেশি নৌকা ভাড়া করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল অরিন্দম। অন্ধকারের মধ্যে নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে রত্না দেবী নৌকায় উঠতে খুবই ভয় পাচ্ছিলেন জলে পরে যাবার। না না করছিলেন অনেক বার। নৌকোয় উঠতে গিয়ে জলে পরে যাবার ভয় পাচ্ছিলেন। শেষে অরিন্দম ওঁর হাত ধরে একরকম টেনেই তুলেছিল নৌকায়। নৌকার নোঙর তুলে প্রায় মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে লগি পুঁতে দেওয়া হলো। চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন সেই নদী, নদীর ওপরে আকাশে অজস্র তারা-ওঠা খোলা আকাশ, আর চারপাশে ম্যানগ্রোভের নিঝুম অন্ধকার। দোতলা ডাকবাংলোটা সেই অন্ধকারে অনেক দূরে ছায়ার মত দেখাচ্ছিল। নৌকার পাটাতনে রত্না দেবী হাঁটু মুড়ে বসে ভয়ে ভয়ে আর নদীর শীতের হাওয়ায় কাঁপছিলেন।
"বাপ্পা... এখানে হঠাৎ কেন নিয়ে এলি তুই আমাকে? কেউ দেখে ফেললে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে সেই বোধটা তোর আছে না নেই!" রত্না দেবীর গলার স্বর আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠছিল। অরিন্দম লগিটা কাঠের পাটাতনে শক্ত করে বেঁধে রেখে রত্না দেবীর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসেছিল। অন্ধকারের মধ্যেও তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল।
"কেউ দেখবে না,শুধু আমিই তো দেখব আপনাকে চাঁদের আর তারার আলোয়" অরিন্দম খুব নিচু গলায় বলেছিল "চারপাশে তো শুধু নদীর জল আর জঙ্গল। এখানে আপনি, আমি, আকাশ ভর্তি তারা জল, আর অন্ধকার ছাড়া কেউই নেই, কোনো সমাজও নেই, কোনো নীতি নেই, ভয়ও নেই। "
"তুই না সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস বাপ্পা আমাকে যেনো দেখিস নি তিন বছরে? কী আর বাকী রেখেছিস দেখার ? !" রত্না দেবী পিছিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু নৌকার কাঠের পাড় ওঁর পিঠে ঠেকল। "অরূপ ঘুমোচ্ছে ওপারে, তোর কাকা ঘুমোচ্ছে... তুই আমাকে এইখানে বেড়াতে এসেও ছারবিনা……. ?"
অরিন্দম কোনো জবাব না দিয়ে রত্না দেবীর বা কাঁধের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা ধীরেসুস্থে ফেলে দিল। রাতের নোনা বাতাস এসে লাগল রত্না দেবীর উন্মুক্ত ঘাড়ে ও পিঠে।
" দেখুন সামনে তাকিয়ে, আমাদের বাংলোটাকে ছায়ার মত লাগছে, ওই যে দূরে। চারধারে জল আর জল। ওপরে আকাশে চাঁদ আর কত তারা। চাঁদ টাকেও দেখুন " কখনও এই খোলা আকাশের নিচে ,তারাদের নিচে, কেউ আদর করেছে নাকি আপনাকে? আমি কিন্তু করবো আজকে। দেখি ব্লাউজটা খুলে দেই। " "ছিঃ আমি পারবো নারে এই পাপ করতে।"
" ন্যাকামি করছেন কেনো? যে পাপের বিনিময়ে আপনি আমার কাছ থেকে প্রায় মাসেই একশো/দুশো টাকা নেন, সেটা বুঝি আজ আবার নীতি আর ভয়ের মুখোশ পরছে? আপনিও তো আমাকে ব্যবহার করতেই চেয়েছেন তাইনা?,। তাহলে আজ এই খোলা আকাশের নিচে পিছপা হচ্ছেন কেন? আসুন তো "
রত্না দেবী কয়েক মিনিটের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। রাতের অন্ধকারের মাঝেই উনি তাকালেন ২০ বছরের অরিন্দমের দিকে। চাঁদের আর তারার আলোয় অরিন্দমের সুগঠিত চওড়া বুক, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর অদম্য পৌরুষের এক উন্মাদ শক্তি যেনো প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। অরিন্দমের পৌরুষের তেজ তো ওনার জানা। গত তিন বছর ধরে অরিন্দম তাকে নিয়ে বিছানায় যায়।
অরিন্দমও হাত বাড়িয়ে রত্না দেবীর পরনের নতুন শাড়ির পেঁচগুলো ওনার কোমড় থেকে ধীরে ধীরে টেনে আলগা করতে শুরু করেছিল। রত্না দেবী প্রথমে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওঁর হাতের গ্রিপে কোনো জোর ছিল না। "বাপ্পা... না...রে…" রত্না দেবী শ্বাস ফেলে ফিসফিস করলেন, কিন্তু ওঁনার গলার স্বরে আর প্রতিবাদ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত সম্মোহন। অরিন্দম রত্না দেবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, "আপনি কী নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না, তাই না? কিন্তু এই নদীর জল সাক্ষী, আজ রাতের পর আপনার ভেতরে আর কোনো অপরাধবোধ থাকবে না।"
রত্না দেবীর চোখ জোড়া অরিন্দমের অবয়বে আচ্ছন্ন হয়ে রইল। ২০ বছরের তরুণ যুবকের শরীরের উত্তাপ, স্পষ্ট পেশির টান আর কোনো বাধা না মানা উদ্ধত ও টান টান পৌরুষের রূপের সামনে রত্না দেবীর মধ্যবয়সী, কামনার বাঁধগুলো যেন আস্তে আস্তে চুরমার হয়ে গেল। ওঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা সামাজিক ভয়, দারিদ্র্যের গ্লানি আর সংসারের ক্লান্তি হারিয়ে গেল মাঝ নদীর হাওয়ায়। রত্না দেবী নৌকার ছাউনির ভেতরে দ্রুত চলে যেতে চাইলেন। পরনে তখন ওনার শুধুই নতুন কেনা সাদা সায়া। আর সবই উন্মুক্ত
নৌকার ছাউনির ভেতরে রত্না দেবীর চাপা গলা উঠলো একসময় "তুই সত্যিই একটা রাক্ষসরে বাপ্পা..." রত্না দেবী একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শাখা পরা হাত দুটো দিয়ে অরিন্দমের গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজেই নিজেকে তুলে দিলেন অরিন্দমের হাতে। ওনার গলায় আর তখন কোনো কম্পন ছিল না, ছিল সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। "আমাকে শেষই করে দে বরঞ্চ তুই..আজকের রাতে.। তোকে নিয়ে আর পারিনা বাপু। সারাদিন কম ধকল যায় নি আমারও।"
তারা ভর্তি খোলা আকাশের নিচে, মাঝ নদীর অন্ধকারে, নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া নোনা জলের হাওয়ায় নৌকার কাঠের পাটাতন জোরে জোরে আর ছন্দে ছন্দে দুলতে লেগেছিল। সেখানে কোনো রকমের লোকলজ্জার আবরণ ছিল না, কোনো বাঁধাধরা গৃহস্থালির চার দেয়ালও ছিল না।কোনো বিছানাও ছিলো না । হঠাৎ কেউ এসে পড়বার ভয়ও ছিলো না। রত্নাদেবীও কী করতেন আর । নৌকার সেই দুলুনিতে জলে পড়ে যাবার খুউব ভয়ও হচ্ছিল ওনার। চোখ বুজে তাই অরিন্দমের বন্য শক্তির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । পরণের নতুন সাদা পেটিকোটের বাঁধন ও একসময় হঠাৎ আলগা হয়ে গোড়ালির কাছে পরে গেছিলো। সামান্য বাধা দিতে চাইলেও টেকেনি আর সেই বাধা। নৌকার প্রতিটি দুলনিতে, দুটি অসম বয়েসে দেহের সংঘাত নদীর নির্জন নীরবতাকে এক অদ্ভুত ও আদিম সুরঙ্গমা এনে দিয়েছিল। রত্না দেবী তার ঘরের ভেতরে যা কোনোদিন পারেননি তার গলা চিরে দিয়ে প্রথমবার রুদ্ধ ও ব্যাকুল সিৎকার হারিয়ে যেতে লাগল গভীর রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার কলতান আর নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ তরঙ্গে।
একবার নয় । তিন তিন বার। সেই প্রথম রত্নাদেবীর মধ্যে এর জন্য কোনো অপরাধ বোধ অনুভূত হয়নি নিজের মধ্যে যা প্রতিবারই আগে হতো সন্তানের বয়েসি বাপ্পার সঙ্গে মিলনে। খারাপও লাগে নি। খিল খিল করে খুবই হাসতে হাসতেই নৌকার পাটাতনের ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে পরে নিজের দুটো পা বাপ্পার চওড়া কাঁধে তুলে দিতে দিতে বলেছিলেন "পারিস ও কিন্তু বটে তুই বাপ্পা। সত্যি কারেরই মোষ একটা তুই। আমার বয়স হয়েছে তো! এই বুড়ো বয়েসে এসে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়লে নিবি তো সেটার দায়িত্ব? নাকি তখন ছেড়ে পালাবি আমাদের। তোর কথা কিন্তু অরূপ বা তার বাবা কেউই টের পায়নি আজ পর্যন্ত, গত তিনবছর ধরে একদিনের জন্যও।" ওপরের আকাশে এতো যে তারা থাকে সেটা আগে কোনোদিন দেখেন নি রত্না দেবী। মনে মনে অরিন্দমের কাছে কৃতজ্ঞতাও বোধ করছিলেন উনি। "আমি বারাণসী চলে যাবো মাসীমা। রেজাল্ট বের হলে " "কেনো রে? হঠাৎ এই কথা। আর পছন্দ হচ্ছে না বুঝি এই মোটা বুড়িকে। " "ফার্স্ট ক্লাসটা পেলে, মাস্টার্স আর পি এইচ ডি করার জন্য ওখান থেকে। আমার বাবাও চাইছেন ওখান থেকেই করি" "আর কোনো টাকাও দিবিনা আমাকে সেটাইতো বলতে চাইছিস? " "না। দেবো ! যেমন দিচ্ছিলাম। ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে নেবেন আপনার নামে। পাঠিয়ে দেবো স্কলার শিপের টাকা পেয়ে।"
"অরূপ টা পাশ দিয়ে একটা চাকরী পেলেই আর চাইবো না তোর কাছে। ও তো পরীক্ষা দিলো এবার । তোর জন্যেই দিতে পারলো। "
ও
স্মৃতির দ্বিতীয় তরঙ্গটা ভেসে এল বেনারস থেকে।অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানালার রেলিঙে সিগারেটের শেষ অংশটা চেপে নেভাল। ঠোঁটে ভেসে উঠল এক বিষাদময়, নীরব হাসি। স্মৃতিটা এবারে হাত বদলে চলে গেল বেনারসের ঘাটগুলোতে। সেটা আশির দশকের প্রথম দিকে। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে (BHU) তখন অরিন্দমের মাস্টার্স ও ডক্টরেটের জন্য গবেষণা চলছে। ১৯৪৭-এর দেশত্যাগী এক রিফিউজি কলোনির মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান অরিন্দমের পরনে থাকত ইস্তিরি করা সুতির পায়জামা আর দেশী সুতোর কুর্তা।
কাশী তে বি এইচ ইউ তে হোস্টেল এর খরচ চালানোর টাকা অরিন্দমের ছিল না । বেনারসের মদনপুরের গলিতে, এক অত্যন্ত বিত্তশালী ও অবিবাহিতা সুন্দরী নর্তকী-বারাঙ্গনা চন্দ্রিমা পান্ডে দেবী—যাঁকে নাকি সবাই রজনী পান্ডে বলে জানত—ওঁর তিন তলা অট্টালিকার নিচতলায় পুরনো কাগজপত্র ও নথি খোঁজার নাম করে থাকার জন্য আশ্রয় পেয়েছিল অরিন্দম। কিন্তু ওঁর মন পড়ে থাকত ওপর তলার ঝাড়বাতির আলোয়, যেখানে সন্ধে নামলেই তানপুরা ও ঘুঙুরের শব্দে এক নতুন নতুন মায়াবী পৃথিবী জেগে উঠত ওপরের তলায়।
বেনারসের মদনপুরের রাত তখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। অসি নদী আর বরুণা নদীর আর্দ্র হাওয়া গলিটার নোনাধরা ইটের খাঁজে খাঁজে একধরনের ভারী জলীয় বাষ্প তৈরি করেছিল। গলির মুখে মোষের তাজা গোবরের টক গন্ধ আর মঠ থেকে আসা মরা বেলফুলের বাসির ওপর চেপে বসেছিল এক চড়া, দমবন্ধ-করা আতরের সুবাস—'শামামা' আর 'খাস'।
অরিন্দম তখন পঁচিশ বছরের পিএইচডি-র গবেষক। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক, চোখে তার মোটা কাচের চশমা, পরনে গোধারা রাস্তার থেকে কিনে আনা সুতির ঢিলেঢালা ইস্তরী করা পায়জামা আর একটা হলুদ রঙের কুর্তা, যার কনুইয়ের কাছে সূক্ষ্ম সুতোর তালি মারা। পকেটে গোনাগেঁতি কয়েকটা সিকি-আধুলি টাকা আর মাথার ভেতরে মাইকেল, হেমচন্দ্র আর বাইরন বব ডিলান এর পংক্তিমালা।
চন্দ্রাণী পান্ডের অট্টালিকার একদম নিচের তলায়, একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে তাঁর ঠাঁই হয়েছিল—১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের সময় বেনারসের কায়স্থ পরিবারের পুরনো কিছু দলিলাদি খুঁজে বের করার গবেষণার অজুহাতে। কিন্তু অরিন্দমের চোখ দলিলের চেয়েও বেশি আটকে থাকত ওপর তলার ঝাড়বাতির আলোয়, যেখানে সন্ধে নামলেই তবলার চাঁটি আর ঝুনঝুন ঘুঙুরের শব্দে এক মায়াবী, ভিনগ্রহের পৃথিবী জেগে উঠত।
মেহফিল তখন ভেঙে গেছে। শেঠ রামকিশোর আর তাঁর সঙ্গীরা সুগন্ধি পানের বাটা আর মেহেন্দির সুবাস পেছনে ফেলে নেমে গেছেন পাইপ দেওয়া সিঁড়ি দিয়ে। তবলিয়া বুড়ো মিরাজ খাঁ তানপুরাটা কাপড়ের খাপে পুরতে পুরতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলেন।
অরিন্দম সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেছিলেন। তাঁর পায়ের চটি দুটো সিঁড়িতে কোনো শব্দ তৈরি করছিল না; কিন্তু তাঁর বুকের ভেতরের ধুকপুকানি যেন নীরব অট্টালিকাটায় প্রতিধ্বনি তুলছিল।
চন্দ্রাণী পান্ডের কামরার খাসিয়াত কাঠের ভারী দরজাটা আধভেজানো ছিল। ভেতরে আতরের ধোঁয়া আর মোমের চর্বি পোড়ার গন্ধ একধরনের নিবিড়, ঝিমঝিম আবহাওয়া তৈরি করেছে। ঘরের মেঝেতে বিছানো ফারসি গালিচার ওপর আতর আর সুরার পাত্র উল্টে পড়ার মেটে দাগ।
ত্রিশ বছরের চন্দ্রাণী দেবী তখন মেহফিলের জাঁকজমক ঝেড়ে ফেলছিলেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের রূপোর থালা থেকে একটা একটা করে ভারী অলঙ্কার খুলে রাখছিলেন। তাঁর পরনে লাল আর সোনালি কাথিয়াওয়াড়ি বেনারসি শাড়ি, যার রেশমি তন্তুর খসখস শব্দে ঘরের বাতাস থরথর করে কাঁপছিল।
"কভি আপনে কামরে সে বাহার নিকলে হো, শায়র সাহেব?"
চন্দ্রাণী পান্ডে পেছনে ফেরেননি। বেলজিয়াম কাচের ঘোলাটে আয়নার প্রতিফলনেই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন্দমকে। চন্দ্রাণীর গলার স্বর ছিল পান-জর্দার রসে ভারী, অথচ অদ্ভুত এক নিরাসক্ত বিদ্রূপে ভরা।
অরিন্দম একপা একপা করে ভেতরে এলেন। তাঁর শুকনো জুতোর সোলে মেঝের সুতি গালিচায় একটু ধুলো ঝরল। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন চন্দ্রাণী দেবীর বিশাল কাঠ-খোদাই করা পালঙ্কের ঠিক নিচে, চন্দ্রাণীর মেহেন্দি-পরা খালি পায়ের কাছাকাছি।
"আমি... আমি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলাম, চন্দ্রাণী দিদি," অরিন্দমের গলা কেঁপে গেল। তাঁর দুই হাত উরুর ওপর শক্ত হয়ে বসে রইল। "আজ শেঠজি যখন তোমাকে ওই শাড়িটা উপহার দিচ্ছিলেন... আর তুমি ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসছিলে... আমার মনে হচ্ছিল আমি শ্বাস নিতে পারছি না।"
চন্দ্রাণী পান্ডে হাতের ভারী মুক্তোর কানের দুলটা সাবধানে মখমলের বাক্সে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর পিঠের ওপর ছড়ানো কালো ঘন চুল, যার মধ্যে জুঁই ফুলের বাসি মালাটা তখনও একটু ম্লান সুবাস ছড়াচ্ছে।
"তুমি শ্বাস নিতে পারছ না, অরিন্দম?" চন্দ্রাণী নিচু হয়ে অরিন্দমের চশমার আড়ালের ব্যাকুল চোখের দিকে চাইলেন। তাঁর মুখে কোনো রাগ ছিল না, কেবল ছিল এক গভীর, অভিজ্ঞ নারীর করুণা। "কেন? শেঠজি তো ওঁর নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে শাড়ি কিনেছেন। আর তুমি তো আমার ঘরে আছ স্রেফ একটা পুরনো কাগজের নথি খোঁজার বাহানায়। তোমার তো এখানে শ্বাস আটকানোর কথা নয়।"
"তুমি কি কিছুই বোঝো না চন্দ্রাণী দিদি?" অরিন্দম সামনের দিকে ঝুঁক রাজনৈতিক ও সামাজিক সীমানা ভোলার এক কাঁচা ব্যাকুলতায়। তিনি চন্দ্রাণীর শাড়ির আঁচলের কোণটা কাঁপা হাতে স্পর্শ করলেন। "তুমি এই নরকে কেন আছ? এই লোভী, ভণ্ড পুরুষগুলো প্রতিদিন এসে তোমাকে কেনে... ওরা তোমার শরীরটাকে দেখে টাকার মেপে। আমি... আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাই।"
কথাটা ঘরের ঝিম ধরে থাকা শান্ত বাতাসে যেন একটা পাথর ছুঁড়ে দিল। চন্দ্রাণী পান্ডে হাসলেন না। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা বিষাদময় রেখা টেনে গেল মাত্র। তিনি এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন অরিন্দমের দিকে। অরিন্দমের চশমার কাচ, কাদার দাগ লাগা পায়জামার তলা আর তাঁর সেই সুতির কুর্তা—সবকিছুকে যেন চন্দ্রাণীর চোখ দুটো মেপে নিল এক মুহূর্তে।
তিনি হাত বাড়ালেন। লম্বা, সুন্দর মেহেন্দি-আাঁকা আঙুলগুলো দিয়ে অরিন্দমের চিবুকটা আলতো করে স্পর্শ করলেন—কোনো সোহাগ নয়, যেন কোনো দুর্লভ অথচ তুচ্ছ প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস পরীক্ষা করছেন।
"তুমি আমাকে উদ্ধার করবে, অরিন্দম?" চন্দ্রাণীর গলার স্বর ছিল গঙ্গার জলের মতো ঠাণ্ডা, ধীর এবং ধারালো। "কিস চিজ সে? প্যায়সে সে? ইয়া আপনে ইস ফকিরে রোমান্স সে?"
"আমি তোমাকে ভালোবাসি, চন্দ্রাণী!" অরিন্দমের গলায় একটা তীব্র, আর্ত চিৎকার ফুটে উঠল। তিনি চন্দ্রাণীর হাতটা নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরার চেষ্টা করলেন। "এই লোকগুলো তোমাকে স্রেফ নর্তকী ভাবে, শরীরের পণ্য ভাবে। আমি তোমাকে মর্যাদা দেব। কথা দিচ্ছ আমি তোমাকে আমার স্ত্রী করে রাখব... আমার পড়ার ঘরে, আমার কবিতার পাশে..."
চন্দ্রাণী পান্ডে খুব শক্ত এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন। তাঁর গলার মেহেন্দির রং যেন আলোর বিপরীতে আরও লাল হয়ে উঠেছিল। তিনি ধীরে ধীরে নিজের পূর্ণ উচ্চতা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
"মর্যাদা দেবে? কে? তুমি?" চন্দ্রাণীর গলায় এবার ফুটে উঠল এক কঠিন, অনতিক্রম্য প্রাচীর। "মর্যাদা কী জিনিস সেটা আগে জানো, বাঙালি মশাই? মর্যাদা হলো ধনীদের বিলাসিতা। যাদের পেটে তিনবেলা ভাত আছে, বাক্সে সোনা আছে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভিটে আছে,ব্যাংক ব্যালেন্স আছে ! ভালো চাকরীআছে—মর্যাদা তাদের সাজে। তুমি তো শুনেছিলাম এক রিফিউজি পরিবারের এক কলোনির ছেলে। কে তোমাকে চাকরী দেবে সাহিত্যে phd করে? জানো তোমার মত হাজারো phd ওই ঐশী ঘাটে, কুলির দোকানের যোগান দারি কাজ করে!তোমার পকেটে কালকের রুটির পয়সা নেই, পরনেও দেখ বন্ধুর থেকে চেয়ে চেয়ে পরা পোশাক। আর তুমি এসেছ কিনা আমাকে 'মর্যাদা' দিতে?"।
"আমি অন্যান্য পুরুষদের মতো নই চন্দ্রাণীদিদি! আমি তোমার শরীর কিনতে আসিনি!" অরিন্দম হাঁটু গাড়া অবস্থাতেই গর্জে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।
"কিন্তু আমার শরীরটাই তো আসল, শায়র সাহেব!" চন্দ্রাণী রুপোর পানের বাটা থেকে সুপারি আর জর্দার খণ্ড তুলে মুখে পুরলেন। তাঁর চোয়ালও শক্ত হয়ে উঠল। "তুমিও কিন্তু আমার এই শরীরটাকেই চাও। কিন্তু তোমার ভেতরের ওই গরিবের অহংকার আর নগণ্য পণ্ডিতগিরি তোমাকে শেঠজির মতো সোজা কথা বলতে দিচ্ছে না। শেঠজি এসেছিলেন, উনি আমাকে হাজার হাজার টাকার নোটের তোড়া দিয়েছেন, আমার শরীরের প্রতিটা ভাঁজকে ছুঁয়েছেন দেখেছেন। উনি কিন্তু ভণ্ড নন। উনি জানেন উনি কী কিনছেন, আর আমিও জানি আমি ওনাকে কী বিক্রি করছি। হিসাবটা খুব পরিষ্কার এখানে।"। চন্দ্রাণী একধাপ এগিয়ে এলেন। তাঁর বেনারসির রেশমি শায়ায় অরিন্দমের মুখটা প্রায় ঢেকে গেল। "আর তুমি?" চন্দ্রাণী নিচু হয়ে অরিন্দমের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, যার মধ্যে জর্দার ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে এল, "তুমি দরিদ্র এক ছাত্র বি এইচ উ তে, তাই তুমি আমাকে কবিতা দিয়ে, প্রেমের বড় বড় গল্প দিয়ে কিনতে এসেছ। তুমি চাও বিনামূল্যে, স্রেফ দুটো মিঠে কথার বিনিময়ে আমার এই শরীরটাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে বিছানায় হাসিল করতে—তোমার কয়েকটা বাচ্চা আমার গর্ভে জন্ম দিতে যাতে তোমার অহংকার তৃপ্ত হয় যে একজন 'পণ্ডিত' একটা 'বেশ্যা'কে উদ্ধার করেছে। তোমার লালসা শেঠজির চেয়ে কোনো অংশে কম নয় অরিন্দম, কিন্তু তোমার পকেটে রেস্তো নেই বলে তুমি সেটাকে 'প্রেম' বলছ।"
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের সমস্ত আলো যেন এক মুহূর্তে নিভে গেল তাঁর চোখের সামনে। তাঁর মুখের ওপরের চশমাটা যেন ভারী লোহার মতো চেপে বসল। তিনি মুখ তুলে রজনী পান্ডের দিকে তাকানোর শক্তি হারিয়ে ফেললেন।
"বেরোও এখান থেকে এখন..আমাকে কিছু দিন ভাবতে দাও," চন্দ্রাণী শান্ত, সমতল গলায় বললেন। তিনি দরজার দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। "নিজের স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফিরে যাও। দলিলের ওপর ধুলো ঝাড়ো। শরীর নিয়ে ব্যবসা করা নারীদের বায়রনের, বোদোলিয়ার কবিতা শোনানোর অহেতুক চেষ্টা কোরো না। আমাদের আসল দাম বোঝার ক্ষমতা তোমার মতো ফকিরে কবিদের কোনোদিন হবে না।"
অরিন্দম ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর পা দুটো যেন আর তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তিনি দরজার দিকে এগোলেন, মাথা নিচু করে।
তিনি ঘরের সীমা পার হওয়ার আগেই পেছন থেকে রজনী পান্ডে ভারী কাঠের দরজার পাল্লা দুটো এক টানে টেনে নিলেন।
ঠাস! এক তীব্র, ধাতব শব্দে দরজার পিতলের ছিটকিনিটা খোপে ঢুকে গেল। ঠিক সেই একই শব্দ—যা তার ১৭ বছর বয়সে সোদপুরের রত্না দেবীর ঘরের টিনের চালের নিচে শুনেছিলেন তিনি। যে শব্দটা মানবজীবনের সমস্ত রোমান্টিকতাকে চুরমার করে এক নগ্ন, নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অরিন্দম বাইরে বেরিয়ে এলেন। রাতের কাশী তখন এক শ্মশানের মতো নীরব। তিনি হাঁটতে হাঁটতে অসি ঘাটের ধাপে এসে বসলেন। গঙ্গার ঘোলা জল রাতের অন্ধকারে কালির মতো দেখাচ্ছিল। ঘাটের চাতালে শীতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকা দুটো কুষ্ঠ রোগী আর দুটো অভুক্ত কুকুরের ঠিক পাশাপাশি তিনি পা ছড়িয়ে বসলেন। পকেটে থাকা ভিজে দেশলাইয়ের বাক্সটা বার করে তিনি এক কাঠিতে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। সেই অন্ধকার ঘাটে বসে, গঙ্গার মনিকর্নিকা ঘাট থেকে ভেসে আসা চিতার পোড়া গন্ধের ভেতর অরিন্দমের মনে হলো—ক্ষমতা আর লালসার এই পৃথিবীতে 'প্রেম' আসলে এক সুন্দর, আত্মপ্রবঞ্চনামূলক মিথ্যে ছাড়া আর কিছুই নয়। চন্দ্রাণী পান্ডে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন তখনও দরিদ্র ও দুর্বল এক ডক্টরেট করা ছাত্র ইংরেজি সাহিত্যে; আর সোদপুরের রত্না দেবী তাঁর নিচে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, কারণ অরিন্দমের কাছে ছিল তাঁর গোপন পাপের ব্ল্যাকমেইলের শক্তি। দুটি ঘটনার ভেতরেই কোনো স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল না; ছিল স্রেফ ক্ষমতা, সম্পত্তি আর টিকে থাকার হিংস্র লেনদেন। অরিন্দম চশমাটা খুলে হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে বসে রইলেন। গঙ্গার হাওয়া তাঁর কনুইয়ের তালি দেওয়া শার্টের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে তাঁর হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিয়ে গেছিলো সেদিন।
"স্যার?"
শ্রেণীকক্ষের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে রিয়া সেন। তার পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার, হাতে তুলনামূলক সাহিত্যের কিছু মোটা খাতা। তার চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি—বুদ্ধিমত্তা ও আকর্ষণের এক বিপজ্জনক মিশ্রণ।
অরিন্দম ধীরেসুস্থে জানালার রেলিঙ থেকে সরিয়ে নিলেন নিজেকে। তিনি আয়তাকার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালেন। ডাস্টবিনের পাশের সেই কুকুরটি তখন গলি পার হয়ে চলে গেছে। বর্ষার মেঘলা আলোয় ক্লাসঘরের দেয়ালগুলোকে এক বিশালাকার খাঁচার মতো মনে হচ্ছে।
"বলো রিয়া। বোদলেয়ারের অংশটা শেষ করলে?" অরিন্দম তাঁর টেবিলে রাখা কাঠের চেয়ারটায় গিয়ে বসলেন। তাঁর স্বর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, সংযত এবং একজন সম্মানীয় অধ্যাপকের মতোই ভারী। রিয়া এগিয়ে এলো। সে টেবিলের ওপর খাতাগুলো রাখল। তার হাত থেকে এক হালকা, অচেনা পারফিউমের গন্ধ ভেসে এলো—যা রজনী পান্ডের আতর বা রত্না দেবীর নারকেল তেলের মতো নয়, কিন্তু একই ভাবে আদিম ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে।
"স্যার, বোদলেয়ার লিখেছেন—'পাপের পথটাই সবচেয়ে সুন্দর, কারণ সেখানে কোনো বিচারক থাকে না।' এটা কি সত্যিই সম্ভব, স্যার? মানুষ কি পাপের ভেতর দিয়ে নিজের স্বাধীনতা খুঁজে পেতে পারে?"
অরিন্দম শান্ত চোখে রিয়ার দিকে তাকালেন। মেয়েটির চিবুকের গড়নে এক অদ্ভুত জেদ রয়েছে। তিনি মেহগনি কাঠের ওপর নিজের ডেনিম শার্ট পরা হাত দুটো রাখলেন।
"স্বাধীনতা কোনো উপহার নয় রিয়া," অরিন্দম খুব ধীরে ধীরে বললেন, যেন নিজের সাথেই কথা বলছেন। "ওটা একটা খেসারত। যখন তুমি জানবে তুমি অপরাধ করছ, এবং তবুও তুমি থামবে না—তখনই তুমি বুঝতে পারবে তুমি কতটা স্বাধীন, আর কতটা একা।"
রিয়া এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে অরিন্দমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের কোণে ঝুলতে থাকা পাখাটা একটানা একঘেয়ে শব্দে ঘুরে চলেছে—যেন সময়ের চাকা, যা সোদপুর এর নর্দমা, বেনারসের ঘাট আর কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের এই ক্লাসঘরকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
অধ্যায় ৩: সীমানা অতিক্রম
ঘরের কোণে রাখা অনেক বছরের পুরনো পিয়ানোটার ওপর ব্রাসের তৈরিল্যাম্পটা জলছাপ তৈরি করেছিল হলুদ দেয়ালে। বাইরে বিডন স্ট্রীট এর রাস্তা জুড়ে দুপুরের রোদ থিতু হয়ে বসছে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা হালকা বৃষ্টি হয়ে গেছে; স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটির গন্ধ আর খোলা জানলা দিয়ে আসা ছাতিম ফুলের ঝাঁঝালো সুবাস ঘরটায় একধরনের ভারী, ঘুমঘোর আবহাওয়া তৈরি করেছে। অরিন্দমের বিডন স্ট্রীট এর স্টাডি রুমের চারপাশের তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো বই—বোদলেয়ার, মালার্মে, জীবনানন্দ, বায়রন, বব ডিলান। টেবিলের ওপর রিয়ার হাতে লেখা ডায়েরিটা খোলা। নীল কালিতে টানা টানা অক্ষরে লেখা কয়েকটা পংক্তি।
অরিন্দম কাচের গ্লাসে বরফের কিউব ফেললেন। টুং করে একটা মিহি শব্দ হলো। ক্রিস্টালের গ্লাসে অ্যাম্বার রঙের তরলটুকু ঢালতে ঢালতে তিনি একবার রিয়ার দিকে তাকালেন।
রিয়া সোফার কোণে বসে ছিল। তার একহাতে পাতলা রেশমের ওড়নার খুঁট, অন্যহাতটা কোলে রাখা। তার শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গেছে, কাঁধের কাছে ফর্সা চামড়ায় ঘরের আলো পড়ে একটা মসৃণ আভা তৈরি করেছে।
"তুমি বরফ নেবে, না জল?" অরিন্দম গ্লাসটা রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
রিয়া চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা প্রশ্রয়ও। সে গ্লাসটা হাতে নিল, তবে পানের জন্য নয়; স্রেফ হাত রাখার একটা অবলম্বন হিসেবে। বরফঠাণ্ডা গ্লাসের গায়ে তার আঙুলগুলো ভিজে উঠল।
"স্যার, আমি তো সচরাচর... এসব খাই না," রিয়া নিচু গলায় বলল।
"সবকিছুরই একটা প্রথমবার থাকে, রিয়া। তাছাড়া এটাকে মদ ভাবারও দরকার নেই। এটাকে ভাবতে পারো বোদলেয়ারের সেই শার্দুল-রঙিন বিষ—যা মানুষের রক্তে নামলে চেতনার ভেতরের বন্ধ দরজাগুলো একটা একটা করে খুলে যায়।" অরিন্দম নিজের গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে রিয়ার মুখোমুখি কাঠের রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন।
টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পের আলোয় রিয়ার চোখের মণি দুটো যেন দুটো কাচের গুলির মতো দেখাচ্ছিল।
"আপনি বোদলেয়ারের 'ফ্লেয়ার দ্যু মাল' (Les Fleurs du mal)-এর কথা বলছেন?" রিয়া গ্লাসটা সামান্য ঘুরিয়ে বলল। "কিন্তু বোদলেয়ার তো পাপকে নন্দনতত্ত্বের রূপ দিয়েছিলেন। তিনি সৌন্দর্যকে খুঁজেছিলেন সমাজের। পচনের ভেতর, ব্যাধির ভেতর। জীবনানন্দও তো একভাবে তাই করেছিলেন... 'শবকাটা ঘরের এক পাশে' বসে থাকা সেই অমানবিক বিষণ্ণতা।"
অরিন্দম একটু হাসলেন। তাঁর হাসিতে একধরনের শান্ত, আত্মবিশ্বাসী প্রশ্রয় ফুটে উঠল।
"জীবনানন্দ বা বোদলেয়ার—কেউই সমাজকে তোষামোদ করতে লেখেননি, রিয়া। সাধারণ মানুষ যাকে পাপ বলে, শিল্পী তাকে দেখে কেবলই উপাদানের বিশুদ্ধতা হিসেবে। একটা গোলাপ যতটা সত্য, কানাগলিতে পড়ে থাকা পচা লাশের গন্ধও ততটাই সত্য। তুমি তোমার ডায়েরিতে যে কবিতাগুলো লিখেছ, সেখানেও তো আমি সেই একই রকমের ছটফটানি দেখছি।"
অরিন্দম সামনে ঝুঁকলেন। তাঁর হাত পৌঁছে গেল রিয়ার খোলা ডায়েরিটার ওপর। তাঁর দীর্ঘ, মেদহীন আঙুলগুলো ডায়েরির পাতার ওপর নামল। রিয়া অজান্তেই একটু সোজা হয়ে বসল, তার শ্বাস সামান্য দ্রুত হলো।
"এই যে লাইনটা..." অরিন্দম নিচু, গম্ভীর গলায় পড়তে লাগলেন, "'আমার শরীরের ভেতরে একটা অন্য নদী বয়, যার জল মিষ্টি নয়, লোনা... যে জল পান করলে তৃষ্ণা মেটে না, জন্মায়।'—এটা কার কবিতা, রিয়া? জীবনানন্দের? নাকি তোমার নিজের ভেতরের কোনো গোপন স্বীকারোক্তি?"
রিয়া গ্লাসটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখল। তার হাতদুটো হঠাৎই কাঁপছিল। "ওটা... ওটা আমার থিসিসের আনুষঙ্গিক নোট। আমি দেখাতে চাইছিলাম, কীভাবে আধুনিক কবিতায় নারী-শরীর কেবল ভোগের বস্তু না হয়ে আত্ম-অনুসন্ধানের এক অস্বস্তিকর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।"
"তাই? কিন্তু তুমি নিজে কি সেটা বিশ্বাস করো?" অরিন্দম রিয়ার দিকে আর একটু এগিয়ে এলেন। চেয়ার আর সোফার মাঝের দূরত্বটুকু এখন নামমাত্র। "নাকি তুমিও সমাজ আর নৈতিকতার সেই পুরানো খাঁচাটায় বন্দি হয়ে থাকতে চাও, যেখানে শরীরের প্রতিটি ব্যাকুলতাকে 'পাপ' বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়?"
রিয়া অরিন্দমের চোখের দিকে চাইল। ওই চোখে কোনো লম্পটতা ছিল না, ছিল এক প্রবল, সম্মোহনী অধিকারবোধ। একজন শিক্ষকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার যে অদৃশ্য তেজস্তূপ, তা রিয়াকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল।
"স্যার," রিয়া সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত গলায় প্রশ্ন করল, "আপনার কি মনে হয় কবিতা দিয়ে নীতিবোধকে ঢাকা যায়?"
অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা খেলে গেল। তিনি চোখ সরালেন না।
"নীতিবোধ তো তাদের জন্য রিয়া, যাদের শিল্প তৈরি করার ক্ষমতা নেই," অরিন্দম খুব ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন। "সাধারণ মানুষ তৈরি করেছে নীতিবোধ, কারণ তারা স্বাধীনতাকে ভয় পায়। কিন্তু একজন কবি, একজন শিল্পী—সে যদি নিজের কাম, নিজের ক্ষুধা, নিজের পতনকে সরাসরি স্পর্শ করতে না পারে, তবে তার সৃষ্টি তো স্রেফ শুকনো পাতা।"
কথাটা ঘরের শান্ত হাওয়ায় যেন কোনো ভারী সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ল। রিয়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে অনুভব করল, তার যুক্তির সমস্ত কাঠামো এই ৫৮ বছরের মানুষটার একটা কথার আঘাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
অরিন্দম হাত বাড়ালেন। কিন্তু এবার আর ডায়েরির পাতায় নয়, তাঁর আঙুলগুলো আলতো করে গিয়ে স্পর্শ করল রিয়ার হাতের কবজি। যেখানটায় সোনার সরু বালাটা আটকে ছিল।
রিয়া কিন্তু চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার বিন্দু মাত্র চেষ্টাও করল না, কেবল তার চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল।
"আপনার... আপনার হাতের ছোঁয়াটা খুব ঠাণ্ডা, স্যার," রিয়া ফিসফিস করে বলল। তার স্বর ছিল প্রায় অস্ফুট।
"কারণ আমি যে বহু বছর ধরে এক ধরণের বরফ জমা শূন্যতার ভেতর বেঁচে আছি, রিয়া," অরিন্দম থামলেন না। তাঁর আঙুলগুলো ধীর গতিতে রিয়ার কবজি বেয়ে উঠছিল কনুইয়ের দিকে। প্রতিটি স্পর্শ ছিল মেপে নেওয়া, কোনো তাড়াহুড়ো নেই, যেন তিনি কোনো দুর্লভ কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টচ্ছেন অত্যন্ত সাবধানে। "তোমার মতো তরুণী, যার রক্তে কবিতার উত্তাপ আছে... সে কি পারে না এই বরফটাকে একটু গলাতে?"
"এটা ভুল হচ্ছে... স্যার" রিয়া বুক ভরে শ্বাস নিল। তার ভেতরের সুপিরিয়র-ইগো বা সামাজিক অনুশাসন যেন শেষবারের মতো একটা দুর্বল প্রতিবাদ জানাতে চাইল। "বিশ্ববিদ্যালয়... আপনার বয়স... আমার কেরিয়ার... অয়ন…. যদি কেউ জানতে পারে এসব?"
"জানতে পারা আর থাকার মধ্যে অনেক তফাত, রিয়া," অরিন্দম একেবারে রিয়ার মুখের কাছাকাছি মুখ নেমে এলেন। রিয়ার রেশমি চুলের চেনা সুবাস, তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছন্দ অরিন্দমের প্রৌঢ় বয়সের নিভে আসা রক্তে এক অদ্ভুত, বিপজ্জনক জোয়ার এনে দিল। "সমাজ আমাদের কেবল বাইরেটা দেখতে পায়। ভেতরে আমরা কে ও কী, তা কেবল আমরাই জানি। এই ঘরটার বাইরে যে পৃথিবীটা আছে, তা মিথ্যা। এই মুহূর্তটাই আসল।"
অরিন্দম রিয়ার চিবুকটা আলতো করে ধরে ওপরে তুললেন। রিয়ার চোখে তখন এক অদ্ভুত পরাভব। একাধারে দ্বিধা আর ভয়, আর অন্যদিকে প্রথম বার এক নিষিদ্ধ একটা অভিজ্ঞতার দিকে তলিয়ে যাওয়ার তীব্র আকর্ষণ। তার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেলো। জিভের অগ্রভাগ তার ঠোঁট চেটে নিলো বার কয়েক। অপরের পাটির ঝকঝকে দাঁত নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল বেশ জোরেই। তলপেটে চিন চীন ব্যথা। অরিন্দম লক্ষ করলেন সব
অরিন্দম ঝুঁকে এলেন। ঘরের ল্যাম্পের আলোটা তাদের ওপর দুটো দীর্ঘ, মিশে যাওয়া ছায়া তৈরি করল দেয়ালে।
বাইরে তখন আবারও বৃষ্টি নামছে। রেললাইন ধরে একটা মালগাড়ি চলে যাওয়ার ভারী, বুক-কাঁপানো শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। কিন্তু এই বন্ধ ঘরের ভেতর, দু'টি মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ আর চামড়ার সঙ্গে চামড়ার ঘর্ষণের মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোনো পৃথিবীর অস্তিত্ব রইল না।
সীমানাটাও পার হয়েই গেল। নীরবে, অলক্ষ্যে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না। রিয়া ফিস ফিস করে বলল " এসো"
অধ্যায় ৪: খেসারত ও জালিয়াতি
বিকেলের শেষ আলোটুকু সেমিনার রুমের উঁচু, ফ্রাঙ্কো-ইন্ডিয়ান জানলার গ্রিল টপকে অরিন্দমের ডেস্কে এসে পড়েছিল। ঘরের ভেতরটা পুরোনো বইয়ের কাগুজে গন্ধ, সেঁতসেঁতে প্লাস্টার আর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ফিল্টার কফির বাসে ভারী। কলেজের করিডোর এখন ফাঁকা; শেষ ক্লাসের ঘণ্টা বাজবার পর ছাত্রছাত্রীদের কলরোলও ট্রামলাইনের শব্দে মিলিয়ে গেছে।
অরিন্দম মুখোপাধ্যায় তাঁর ওক কাঠের ডেস্কে একক সান্ধ্য-রাজত্বে বসে ছিলেন। সামনে খোলা MA থার্ড সেমিস্টারের ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের রেজিস্টার খাতাটা। বাঁ হাতে চশমার ফ্রেমটা নাকের নোলকে একটু তুলে ধরে তিনি ডাইনির আঁচড়ের মতো ডগাওয়ালা একটা ফাউন্টেন পেনের ক্যাপ খুললেন।
পৃষ্ঠা এক। রোল নম্বর জিরো-ফোর: রিয়া সেন।
নামটার পাশে উপস্থিতির ঘর খালি। টানা বাইশ টিউটোরিয়াল ক্লাসে রিয়া অনুপস্থিত। থিসিসের খসড়া ( আবস্ট্রাক্ট) অ্যাসাইনমেন্ট জমার ঘরে পেন্সিলে লেখা একটা খসড়া নম্বর—'১২'। পাশে অরিন্দমেরই নিজস্ব কাটাকুটি। এই নম্বর লাল ফিতেয় বাঁধার নিয়ম মেনে চললে মেয়েটা ওর পি এইচ ডি তো দূর, ডক্টরেট এর প্রথম সেমিনারে ওরাল পরীক্ষার সর্বনিম্ন কাট-অফ মার্কসটাও টপকাতে পারবে না।
অরিন্দম পেনটা তুলে নিলেন। লাল কালির নিবটা কাগজের বুকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে রইল। যেন একটা বিন্দু থেকে দুটো পথ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি লাল কালির ডগা দিয়ে '১২' সংখ্যাটার ওপর একটা নির্ভীক, গাঢ় রেখা টেনে দিলেন। কাটা অক্ষরের ওপর লিখে দিলেন '২৮'। পাশে স্বাক্ষরের জায়গায় তাঁর সেই চেনা, ডানা-মেলা ইম্পেরিয়াল দস্তখত—'এ. মুখার্জী'।
কালিটা একটু চুইয়ে পেছনের পৃষ্ঠায় হালকা একটা ছোপ ফেলল। অরিন্দম ব্লটিং পেপার দিয়ে আলতো করে চাপ দিলেন। নিজের এই জালিয়াতির দিকে চেয়ে তাঁর মনে কোনো ধরনের অনুশোচনা হলো না; কোনো বুকধড়ফড়ও নয়। শুধু এক অদ্ভুত শীতল তৃপ্তি তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। তিনি রিয়ার অনুপস্থিতিকে মেপে দিতে চান না; তিনি রিয়ার সম্ভাবনাকে নিজের হাতে ছাঁচ দিতে চান। যেন এই লাল কালি দিয়ে তিনি রিয়াকে আবার নিজের ক্লাসরুমে, নিজের কক্ষপথে ধরে রাখলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার পেতলের হাতলটা সশব্দে ঘুরে গেল। কোনো কড়া নাড়া নয়, সৌজন্যের কোনো সংকেত নয়—কাঠের ভারী পাল্লাটা দড়াম করে গিয়ে আছড়ে পড়ল ভেতরের দেওয়ালে।
দরজায় দাঁড়িয়ে এক যুবক। ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়স। গায়ে একটু ময়লাটে বাদামি রঙের জ্যাকেট, চুলগুলো পালের বাতাসের মতো উষ্কখুষ্ক। নিঃশ্বাসের টানে তার বুকের ছাতি উঠানামা করছে, আর চোখের তারায় একধরনের উন্মাদ, বাঁধভাঙা রাগ। অয়ন—রিয়ার সহপাঠী, নকশাল আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং বোধ করেন রিয়ার প্রেমিক।
অরিন্দম কলমটা আস্তে করে কাঠের ট্রেতে রাখলেন। চশমার ওপর দিয়ে একবার অয়নকে দেখলেন, যেন ক্লাসের কোনো দেরিতে আসা অমনোযোগী ছাত্রকে মাপছেন। তারপর ধীরেসুস্থে পাশে রাখা সাদা সিরামিকের কাপটা তুলে নিলেন। কফিটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওপরে দুধের পাতলা সর পড়েছে। তিনি তাতে একটি ছোট চুমুক দিলেন।
"ভেতরে আসার আগে অনুমতি নেওয়ার একটা সাধারণ সৌজন্য থাকে, অয়নবাবু," অরিন্দমের গলার স্বর সমতল, কোনো তরঙ্গ নেই। "বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘরগুলো তোমার ছাত্রসংগঠনের অফিস ঘর নয়।"
অয়ন এগোলো। তার বুটের শব্দে মেঝের ধুলো উড়ল। সে সরাসরি এসে অরিন্দমের ডেস্কে দু'হাত ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। তার মুখের ছায়া অরিন্দমের খাতার ওপর গিয়ে পড়ল।
"সৌজন্য? শেখাচ্ছেন ? আমাকে? " অয়ন দাঁতে দাঁত চিপল। তার চোয়ালের হাড়গুলো মাংস ঠেলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। "আপনি সৌজন্যের কথা বলছেন, প্রফেসর মুখার্জী? আপনি জানেন রিয়া গত তিন সপ্তাহ ধরে কোথায়? ও ক্লাসে আসছে না। ও নিজের বাড়ির ফোনও ধরছে না, কারও সাথে দেখা করছে না, আলো নিভিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছে! আপনি ওর সাথে ঠিক কী কী করেছেন?"
অরিন্দম কাপটা আবার সসারে ফিরিয়ে রাখলেন। পেতলের টেবিলে সিরামিকের শব্দটা একটা ছোট চাবুকের মতো শোনালো।
"রিয়া একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ৩০ বছর বয়স এবং আমার ডক্টরেট লেভেলের গবেষণার ছাত্রী," অরিন্দম হেলান দিলেন নিজের চেয়ারে, দু হাতের আঙুলগুলো একসঙ্গে জুড়ে একটা পিরামিড তৈরি করলেন। "তার ব্যক্তিগত জীবনের ছন্দপতন বা তার ক্লাসে না আসার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই, অয়ন। তুমি কি তার আইনি অভিভাবক? যতদূর জানি নয় তাই না?"
"অভিভাবকত্বের ভণ্ডামি করবেন না!" অয়ন গর্জে উঠল। সে টেবিলের ওপর একটা সজোর চাপড় মারল। রেজিস্টার খাতাটা একটু কেঁপে উঠল। "আমি জানি আপনি কে। আমি জানি এই করিডোরে আপনার ওই বুদ্ধিবৃত্তিক ছদ্মবেশের পেছনে কী পচা নর্দমা লুকিয়ে আছে সোদপুরের এক কলোনীতে আর কাশীর বি এইচ ইউ তে। আপনি প্রফেসর নন, আপনি একটা প্রেডেটর! একটা শিকারি চিল!"
অরিন্দমের চোখের পলক পড়ল না। তিনি কেবল সামান্য ভুরু কিঞ্চিৎ কুঁচকালেন, যেন কোনো রচনার বানানের ভুল দেখছেন। "শব্দ চয়নে আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত, অয়ন তোমার। ইংরেজি ভাষা সাহিত্য বিভাগের ছাত্রদের কাছে অন্তত এটুকুই কাম্য।"
"শব্দ আর সাহিত্য দিয়ে আপনি আপনার অপরাধকে ঢাকতে পারবেন না," অয়ন হাঁপাচ্ছিল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো ডেস্কে খোলা রেজিস্টার খাতার দিকে গেল। লাল কালির সেই টাটকা '২৮' নম্বরটা তখনও আবছা ভেজা।
অয়ন হঠাৎ বাঁ হাত বাড়িয়ে খাতাটার দিকে আঙুল নির্দেশ করল। তার স্বর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, "এটা কী? রিয়া গত এক মাস ধরে একটাও এসাইনমেন্টও জমা দেয়নি। ও টিউটোরিয়াল প্রেজেন্টেশনও দেয়নি। আর আপনি নিজের হাতে ওর গ্রেড শিট ম্যানিপুলেট করছেন? এটা জালিয়াতি নয়?"
অরিন্দম শান্তভাবে ডান হাত বাড়িয়ে রেজিস্টার খাতাটি বন্ধ করে দিলেন। লাল মলাটটা সশব্দে চেপে বসল। "এটা আমার অ্যাসেসমেন্ট, অয়ন। এতে একজন শিক্ষকের নিজস্ব মূল্যায়ন আর ছাত্রের সুপ্ত ক্ষমতার ওপর বিচার থাকে। যা তোমার মতো নকশাল রাজনৈতিক পোস্টার মারা মেধার বাইরে।"
"আপনার সুপ্ত ক্ষমতার বিচার আমি বুঝি স্যার!" অয়ন অরিন্দমের আরও কাছে ঝুঁকে এল। তার নিঃশ্বাসে সিগারেটের বাসি গন্ধ আর উত্তপ্ত ক্ষোভ। "আপনি নিজের পদের ভয় দেখিয়ে, কবিতার আড়ালে, জীবনানন্দের বায়রনের উপমার ফাঁদে ফেলে রিয়াকে ম্যানিপুলেট করেছেন! ও আপনাকে ভয় পায়, আবার একই সাথে নিজেকেও অপরাধী মনে করে। আর এখন আপনি ওর রেজাল্ট বদলে দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে চাইছেন? যাতে ও কোনো অভিযোগ না তুলতে পারে? রিয়ার জীবনটা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?"
অরিন্দম চেয়ার থেকে উঠলেন না। তিনি টেবিলের ওপর থেকে লাল কালির ফাউন্টেন পেনটা তুলে নিলেন এবং খুব যত্ন করে সেটার ক্যাপ আটকে দিলেন। ধাতব 'ক্লিক' শব্দটা ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
"রিয়া কোনো ছোট বাচ্চা নয়, অয়ন। কার সাথে কতদূর যেতে হয়, কোথায় কতটা উজার করতে হয়, কোথা থেকে কী হাসিল করতে হয় , আর কোথায় এসে থামতে হয়—সেটা ও খুব ভালো করেই জানে," অরিন্দম বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর একদম নিচুর দিকে নেমে গেছে, যেন বরফের ওপর ঘষা খসখসে পাথরের শব্দ। "তুমি ওর হয়ে এই নৈতিকতার ওকালতি করার অভিনয় বন্ধ করো। তোমার এই ক্ষোভ কি রিয়ার জন্য, নাকি তোমার নিজের পুরুষালি অহংকারে আঘাত লেগেছে বলে?"
অয়নের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল, তারপরই সেটা দ্বিগুণ রাগে লাল হয়ে উঠল। সে টেবিল ডিঙিয়ে অরিন্দমের কলার চেপে ধরতে পারতো, কিন্তু অরিন্দমের চোখের ভেতরের সম্পূর্ণ নিরাসক্ত, উদাসীন ভঙ্গিটা তাকে যেন এক অদৃশ্য দেওয়ালে আটকে দিল।
"আমি আপনাকে ছাড়ব না, অরিন্দমবাবু," অয়ন নিচু অথচ বিষাক্ত কণ্ঠে বলল। "কলেজের গভর্নিং বডি, অ্যান্টি-হ্যারাসমেন্ট সেল, মিডিয়া—সব জায়গায় আমি আপনার এই নোংরা মুখোশটা খুলে দেব। কাল সকালের মধ্যে যদি এই খাতা বদলে না যায়, আর আপনি যদি ইস্তফা না দেন—আমি রিয়াকে নিয়ে প্রেসের সামনেও দাঁড়াব।"
অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি মার্কসশীটের ফাইলটা তুলে নিয়ে নিজের চামড়ার ব্রিফকেসের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। পপ-লকটা বন্ধ করার শব্দ হলো—'টক'।
"নিশ্চয় যেতেই পারো," অরিন্দম ডেসকের ওপরের বইগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন। "তবে সত্যের অনেকগুলো মুখ থাকে, অয়ন। যা তুমি এক কথায়, একটা স্লোগানে বলে দিতে পারবে ভাবছ—সত্যিটা ততটাও সহজ নয়। তুমি মিডিয়াতে যেতে পারো, প্রেসে যেতে পারো। কিন্তু দিনের শেষে, রিয়ার নীরবতা কিন্তু তোমার ওই চিৎকারকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারে। সেটা মাথায় রেখে এগিও।"
অয়ন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো মুঠো হয়ে কাঁপছিল। অরিন্দমের এই নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাস, এই সম্পূর্ণ অপরাধবোধহীন নীরবতা তাকে যেন ভেতর থেকে চুরমার করে দিচ্ছিল। অয়ন একটাও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। তার জুতো জোড়ার শব্দ করিডোরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, আর পেছনের কাঠের ভারী দরজাটা আবার সশব্দে বাতাসে দুলতে লাগল।
ঘরটা আবার শান্ত।
অরিন্দম জানলার দিকে তাকালেন। বাইরের আকাশ এখন গাঢ় বেগুনী থেকে কালোয় ঢালু হচ্ছে। রাস্তায় প্রথম ল্যাম্পপোস্টের আলোটা জ্বলে উঠেছে। তিনি টেবিলের কোণে পড়ে থাকা ঠান্ডা কফির কাপটা আবার হাতে নিলেন। তলানিতে পড়ে থাকা তিতকুটে তলোনিটুকু জিভে ঠেকিয়ে জানলার গ্লাসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চাইলেন।
সেখানে কোনো শয়তান নেই, কোনো অপরাধী নেই—কেবল এক বৃদ্ধ অধ্যাপক, যিনি সূর্যাস্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের তৈরি করা নিয়মের ভেতরেই স্বস্তি খুঁজছেন।
অধ্যায় ৫: কাঠগড়ায় সততা
বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির মিটিং রুমটি পুরোনো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ভারী মহিমায় গম্ভীর। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা ডিম্বাকৃতি বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল, যার ওপরে বিগত একশো বছরের কত শত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্কের ধুলো জমা হয়ে আছে। মেহগনির তক্তায় লালচে পালিশের ভেতরে ছাদের পুরোনো ঝাড়বাতিটার হলুদ আলো প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল, যেন এক স্থির রক্তের দীঘি।
টেবিলের একপাশে মুখোমুখি বসে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি কমিটির পাঁচজন প্রবীণ সদস্য। কেন্দ্রে প্রিন্সিপাল—তাঁর চশমার পুরু কাঁচের পেছনে চোখ দুটি উদ্বেগে ও প্রচ্ছন্ন অসন্তোষে ছোট হয়ে এসেছে। তাঁর বাঁ পাশে বসা সোশ্যাল ওয়ার্ক বিভাগের প্রধান, ম্যাডাম মিত্র, যাঁর মুখের প্রতিটি রেখায় এক ধরনের পরিশীলিত এবং কঠোর নৈতিক অনুশাসন স্পষ্ট। ডান পাশে আইনের অধ্যাপক প্রবীণ বোস মশাই, যাঁর আঙুলগুলো অনবরত মেহগনির তক্তায় একটা নির্দিষ্ট ছন্দে আওয়াজ করে চলেছে। টেবিলের একেবারে কোণে, কিছুটা ছায়ায় স্থির হয়ে বসে আছেন রিয়ার বাবা—একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডাক্তার, যাঁর বার্ধক্যগ্রস্ত চেহারায় একটা গভীর অপমান ও ক্ষোভের স্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে।
আর উল্টোদিকে, বিশালাকার মেহগনির অন্য প্রান্তে, একা একটি উচ্চ-পিঠওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন অধ্যাপক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
তাঁর মেরুদণ্ড একদম সোজা, যেন কোনো ধাতব রড বসানো আছে সেখানে। হাত দুটো টেবিলের ওপর শান্তভাবে রাখা—আঙুলে কোনো কাঁপুনি নেই, চোখে কোনো চঞ্চলতা নেই। ঘরের ভেতর এক ভারী, নিথর নীরবতা, যা কেবল কোণের পুরোনো পেণ্ডুলাম ঘড়ির টিকটিক শব্দে মাঝে মাঝে সামান্য কেঁপে উঠছিল।
টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখা দুটি ফাইল। একটি রিয়ার নিজের হাতে লেখা তিন পাতার অভিযোগপত্র, অন্যটি সেই লাল কালিতে কাটাকুটি করা পি এইচ ডি ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের গ্রেডশীটের ফটোকপি।
প্রিন্সিপাল হাত দুটো মেহগনির ওপর জোড় করে রাখলেন। তাঁর গলার স্বর কিছুটা খসখসে, যেন খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও শব্দগুলো উচ্চারণ করতে হচ্ছে।
"অরিন্দমবাবু," প্রিন্সিপাল চশমাটা খুলে লেন্স পরিষ্কার করার অজুহাতে নিচু হয়ে বললেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি খুব কমই এসেছে। রিয়া সেন লিখিতভাবে অত্যন্ত স্পষ্ট অভিযোগ জানিয়েছে যে আপনি আপনার পদ ও পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে প্রলুব্ধ করেছেন। পরবর্তীতে তাকে ভয় দেখিয়ে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে একটি অনৈতিক এবং বিকৃত সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করেছেন। আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় নিয়মভঙ্গ ও ছাত্রীকে মানসিকভাবে শোষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।"
অরিন্দম কোনো নড়াচড়া করলেন না। তাঁর মুখে কোনো বিস্ময়, আতঙ্ক বা অনুতাপের ছায়াও পড়ল না। তিনি খুব ধীরেসুস্থে রিয়ার লিখিত অভিযোগপত্রের প্রথম পাতাটির দিকে তাকালেন।
"আপনার কি নিজের পক্ষে কিছু বলার আছে, অরিন্দমবাবু?" ম্যাডাম মিত্র শাড়ির আঁচলটা কাঁধে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলেন। তাঁর স্বরে প্রশাসনিক শিষ্টাচারের চেয়ে ব্যক্তিগত ঘৃণার স্পষ্ট ছোঁয়া। "একটি মেয়ে, আপনার চেয়ে বয়সে প্রায় অর্ধেক, সে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে আপনি তাকে কবিতার ছলে প্রলুব্ধ করে নিজের বাসায় ডেকে পাঠাতেন। আপনি কি এই শব্দগুলোকে অস্বীকার করছেন?"
অরিন্দম আলতো করে থুতনিতে হাত রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো অভিযোগপত্রের হস্তাক্ষরের ওপর বোলাচ্ছিল।
"অভিযোগপত্রের সাহিত্যিক ভাষাটি বেশ দুর্বল," অরিন্দম শান্ত, নিচু স্বরে বললেন। গলার আওয়াজে এক অদ্ভুত নিরাসক্ত ভাব, যেন তিনি কোনো প্রথম বর্ষের ছাত্রের ব্যাকরণের ভুল ধরছেন। "রিয়া MA ক্লাসে এর চেয়ে অনেক ভালো গদ্য লিখত। বিশেষ করে ওই 'অনৈতিক' আর 'প্রলুব্ধ' শব্দগুলোর ব্যবহার বড্ড কৃত্রিম আর আটপৌরে শোনাচ্ছে। মনে হয় কেউ ওকে শিখিয়ে দিয়েছে এইসব লিখতে।"
"এটা কোনো সাহিত্য সমালোচনার আসর নয়, অরিন্দমবাবু!" প্রিন্সিপাল মেহগনি টেবিলে সজোরে হাত চাপড়ালেন। ঘরের বাতাসটা চমকে উঠল। "এটা আপনার চাকুরিজীবনের শেষ পরিণতি নির্ধারণের কাঠগড়া! বিষয়টির গাম্ভীর্য বোঝার চেষ্টা করুন! আপনার বিরুদ্ধে ধর্ষণের সমতুল্য মানসিকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি বা নম্বর জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে। আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?"
অরিন্দম সামান্য হাসলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা শীতল রেখা ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। তিনি উল্টোদিকে বসা রিয়ার বাবার দিকে একবার চাইলেন। প্রবীণ ডাক্তার মানুষটি এক মুহূর্তের জন্য অরিন্দমের চোখের দিকে তাকালেন, তারপর পরম ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে জানলার বাইরের অশ্বত্থ গাছটার দিকে চেয়ে রইলেন।
আইনের অধ্যাপক বোস মশাই তাঁর সামনের ফাইলটা একটু এগিয়ে দিলেন। "দেখুন অরিন্দম, আমরা সবাই আপনাকে বহু বছর ধরেই চিনি। আপনার অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার অত্যন্ত চমৎকার। আমরা চাই না এই বয়সে এসে আপনার গায়ে কোনো কালি লাগুক, বা বিষয়টি থানা-পুলিশ আর স্ক্যান্ডাল হিসেবে সংবাদমাধ্যমে যাক। রিয়ার পরিবারও জলঘোলা করতে চায় না, যদি আপনি একটি উপযুক্ত পথ বেছে নেন।"
বোস মশাই তাঁর কোট থেকে একটি টাইপ করা ফোলিও কাগজ বের করে অরিন্দমের দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজটিতে ক্ষমার এক দীর্ঘ, সুসংগঠিত খসড়া টাইপ করা রয়েছে।
"আমরা একটা ড্রাফট তৈরি করেছি," বোস মশাই বললেন। "এখানে লেখা আছে যে আপনি আপনার অনিচ্ছাকৃত মানসিক ভুল এবং অসুস্থতার জন্য অনুতপ্ত। আপনি যদি এই চিঠিতে সই করেন এবং কমিটির সামনে ও রিয়ার বাবার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান, আর সেই সাথে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন—তবে আমরা এই তদন্ত এখানেই বন্ধ করে দেব। আপনার পেনশন আর গ্র্যাচুইটির টাকাটাও হয়তো আমরা আটকে রাখব না। একটা 'দুঃখিত' শব্দ কিন্তু আপনার দীর্ঘকালের সুনাম এবং বার্ধক্যের নিরাপত্তাটা রক্ষা করতে পারে।"
কাগজটা অরিন্দমের হাত থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে এসে থামল। ঘরের সবাই—প্রিন্সিপাল, ম্যাডাম মিত্র, বোস মশাই, এমনকি রিয়ার বাবাও—একসঙ্গে অরিন্দমের দিকে চাইলেন। ঘরের মধ্যকার বাতাসটা যেন অক্সিজেনের অভাবে জমে ভারী হয়ে উঠেছিল।
অরিন্দম ধীরেসুস্থে ডান হাতের তর্জনীটা বাড়ালেন। সেই এক আঙুলের আলতো চাপে টাইপ করা খসড়া কাগজটিকে তিনি ঠেলে মেহগনি টেবিলের এক দূরবর্তী, ধুলো জমা কোণে সরিয়ে দিলেন। যেন একটা মরা মাছিকে তিনি পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন।
"আমি কোনো অভিনয় করব না," অরিন্দম স্পষ্ট, নির্ভেজাল গলায় বললেন।
ম্যাডাম মিত্র চোখ বড় বড় করলেন। "অভিনয় মানে? আপনি বলতে চান আপনি যা করেছেন তা অপরাধ নয়?"
"আমি একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে আর এক মুক্ত, স্বাধীন তরুণীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম ঠিকই," অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁর চোখে কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনার নামগন্ধ নেই। "সেখানে শরীর ছিল, প্রলোভন ছিল, তীব্র কাম ছিল, আবার এক ধরনের আলগা আকর্ষণও ছিল। কিন্তু কোনো জোরজুলুম ছিল না। রিয়া যখন আমার বিছানায় এসেছিল, তখন সে নিজের পছন্দেই এসেছিল। আর যখন সে সেটা বন্ধ করতে চাইল, সে আসা বন্ধ করে দিল নিজের ইচ্ছেতেই । সরল ও স্পষ্ট ঘটনা।"
"আর ওই মার্কসশীটের জালিয়াতি?" প্রিন্সিপাল চেঁচিয়ে উঠলেন। "ওটাও কি আপনার স্বাধীন ভালোবাসা?"
অরিন্দম এক মুহূর্ত থামলেন। জানলার বাইরে দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে যাওয়ার ডানা ঝাপটানির শব্দ হলো।
"গ্রেড বদলানোটা ছিল এক দুর্বল মুহূর্তে নেওয়া একটা বোকা বোকা সিদ্ধান্ত," অরিন্দম বললেন। "ওটা রিয়াকে ধরে রাখার একটা নিচু চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু তার জন্য আমি আপনাদের তৈরি করা এই কৃত্রিম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নাটক করতে পারব না।"
"আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কী বলছেন?" বোস মশাই চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। "আপনি যদি ক্ষমা না চান, তবে গভর্নিং বডি আপনাকে বরখাস্ত বা টার্মিনেট করতে বাধ্য হবে। আপনার সারা জীবনের অ্যাকাডেমিক অর্জন শূন্যে মিলিয়ে যাবে। কোনো কলেজ আপনাকে আর ছোঁবে না। সমাজের চোখে আপনি একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এখনও দশবছর আপনি অধ্যাপনা করতে পারেন-৭২ পর্যন্ত"
অরিন্দম এবার শান্তভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর সুউচ্চ শরীরটা টেবিলের ছায়াকে আরও দীর্ঘ করে দিল। তিনি নিজের জ্যাকেটের বোতামটা আঁটসাঁট করলেন।
"সমাজ বা আপনাদের তৈরি এই সাজানো নৈতিকতার আদালতের এক্তিয়ারকে আমি স্বীকার করি না," অরিন্দম ধীরপায়ে তাঁর চামড়ার ব্রিফকেসটা হাতে তুলে নিলেন। "আমি যা করেছি, তার প্রতিটি সত্য ও কামনার দায় আমি নিজের ভেতর বহন করব। কিন্তু আপনাদের বাঁচিয়ে দেওয়া পেনশনের টাকা বা সম্মানের ভিক্ষা পাওয়ার জন্য আমি নিজের অস্তিত্বকে ছোট করে ওই কাগজে সই করব না। ক্ষমা চাওয়ার কোনো ভণ্ডামি আমার দ্বারা হবে না।"
"অরিন্দমবাবু!" প্রিন্সিপাল হাত উঁচিয়ে ওঠার আগেই অরিন্দম থামালেন।
"আমার পদত্যাগপত্র কাল সকাল ন-টার মধ্যে আপনার টেবিলে পৌঁছে যাবে," অরিন্দম বললেন।
তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আর কারও মুখের দিকে তাকালেন না। কোনো অপেক্ষার অবকাশ না রেখে, সোজা শক্ত পায়ে পেতলের ভারী হাতল দেওয়া কাঠের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
বাইরের দীর্ঘ করিডোরে বিকেলের ঠান্ডা রোদ এসে পড়েছে। অরিন্দমের একলা বুটের শব্দ সেই খালি করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—এক অনমনীয়, একা এবং সমাজচ্যুত মানুষের নিজের শর্তে হেঁটে যাওয়ার শব্দ।
অধ্যায় ৬: বহিষ্কার ও কলঙ্ক
কলেজের গভর্নিং বডির আনুষ্ঠানিক সিলমোহর মারা চিঠিটা যখন লাল কাঠের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা হলো, তখন বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।
সেক্রেটারি মহাশয়ের আঙুল থেকে ফাউন্টেন পেনের ঢাকনাটা বন্ধ হওয়ার হালকা 'ক্লিক' শব্দ হলো। টেবিলের কোণে রাখা পিতলের পেপারওয়েটটার নিচে চিঠিটা চাপা দেওয়া। পাশে দাঁড়িয়ে ড. বোস। তিনি আলমারির কাচের দরজাটার দিকে তাকিয়ে নিজের সুতির জামার বোতাম ঠিক করছিলেন, যেন ঘরে অরিন্দম বলে কেউ উপস্থিতই নেই।
"আপনাকে আর বিভাগীয় প্রধানের ঘরে বসতে দেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত হবে না, অরিন্দমবাবু," ড. বোস গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, কিন্তু তাঁর স্বরে আত্মসন্তুষ্টির এক পাতলা আস্তরণ স্পষ্ট। " ছাত্র ইউনিয়ন বাইরে ট্রাফিক আটকে দিয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর অফিস থেকে ইতিমধ্যে চারবার ফোন এসেছে। গভর্নিং বডি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আপনাকে বরখাস্ত করা হলো।"
অরিন্দম চিঠিটার দিকে তাকালেন না। তিনি নিজের পুরনো চামড়ার ব্যাগটার জিপটা টেনে বন্ধ করলেন। ব্যাগের ভেতর তাঁর নিজের হাতে লেখা বায় রন-এর লেকচার নোটস আর বোদলেয়ারের কয়েকটা অনুবাদ রয়েছে।
"ধন্যবাদ, বোস মশাই," অরিন্দম শান্ত গলায় বললেন। "আপনাদের আমলাতান্ত্রিক দ্রুততা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হলাম।"
"ব্যঙ্গ করার সময় এটা নয়, অরিন্দমবাবু!" ড. বোসের গলা একটু চড়ে উঠল। "আপনি যা করেছেন, তা কেবল নিজের নয়, এই অর্ধ শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের মুখে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার ডায়েরির অংশগুলো ভাইরাল। খবরের কাগজগুলো তো আপনাকে পশুর চেয়েও অধম বানিয়ে ছেড়েছে।"
অরিন্দম চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। "পশুদের লজ্জা থাকে না কিন্তু বোস মশাই, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে লজ্জা পাওয়ার ভান করে। আপনারাও সেই ভানটাই করছেন।"
তিনি সেক্রেটারির ঘরের ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরোলেন।
করিডোরটা আজ শূন্য, কিন্তু কোলাহলমুক্ত নয়। মেইন গেটের দিক থেকে চারতলা ভবনের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ভেসে আসছে শতাধিক ছাত্রছাত্রী ও বাইরে থেকে আসা রাজনৈতিক ক্যাডারদের সমবেত গর্জন—"লম্পট প্রফেসর নিপাত যাক!", "শিক্ষাঙ্গনে কামুকতা চলবে না!", "অরিন্দম মুখার্জীর ফাঁসি চাই!"
স্টাফ রুমের দরজাটা আধভেজানো ছিল। ভেতর থেকে কয়েকজোড়া চোখ অরিন্দমকে পার হয়ে যেতে দেখল। কেউ একজন চা পানের কাপটা ডিশে রাখার সশব্দ আওয়াজ করল। তরুণ টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট শৌভিক, যে একসময় অরিন্দমের লেখা উপন্যাস ও কবিতার ভক্ত ছিল, সে অরিন্দমকে আসতে দেখে মুখ নিচু করে পত্রিকার পাতায় আত্মগোপন করল।
অরিন্দমের মুখে একটা অতি সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল।
তিনি প্রধান ফটকের দিকে গেলেন না। প্রধান ফটকের বাইরে তখন ট্রাইপড উঁচিয়ে বসে আছে নিউজ চ্যানেলের ক্যামেরা, ওবি ভ্যান। বাতাস ভারী হয়ে এসেছে কেরোসিনের ঝাঁঝালো গন্ধে আর পোড়া খড়ের ধোঁয়ায়। অরিন্দমের কুশপুতুলও পোড়ানো হচ্ছে। বাসের জানলা দিয়ে কৌতূহলী যাত্রীরা মাথা গলে দেখছে—একজনের নাম ধুলোয় মিশছে, সেই দৃশ্য দেখার যে চিরন্তন ক্ষুধা মধ্যবিত্ত সমাজের থাকে, কলকাতা আজ সেই ক্ষুধায় মত্ত।
অরিন্দম করিডোর পার হয়ে চলে এলেন কলেজের পেছন দিকে—ক্যান্টিন ও পুরানো শৌচাগারের পাশের সরু পথটায়। এখানটায় নোনাধরা দেওয়ালে শ্যাওলার পুরু আস্তরণ, একটা ভাঙা বেঞ্চে জলের তোড়ে প্লাস্টিকের কাপ ভেসে যাচ্ছে। মরচে পড়া একটা ছোট লোহার গেট আছে এখানে, যা সচরাচর বন্ধ থাকে এবং কলেজের সুইপাররা ময়লা ফেলার জন্য ব্যবহার করে।
অরিন্দম পকেট থেকে রুমাল বের করে ভেজা হাতটা মুছলেন। তারপর লোহার গেটের হুড়কোটা এক ঝটকায় টেনে তুললেন। এক বিকট ধাতব ক্যাঁচকোঁচ শব্দে দরজাটা খুলে গেল।
বাইরে পার্ক স্ট্রিটের এক, সরু গলি। বৃষ্টিতে নর্দমার নোংরা জল উপচে এসে জমেছে রাস্তায়। ছাতা খোলার আগেই এক পশলা প্রবল বৃষ্টি অরিন্দমের মাথার সাদা-কালো চুল আর কাঁধের ওপর চেপে বসা স্যুটকেসটাকে ভিজিয়ে দিল।
তিনি দ্রুত পায়ে গলির মুখটার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
কিন্তু নিস্তার ছিল না। গলির মুখে মোড় ঘুরতেই দুটো বাইক এসে ব্রেক কষল। তাদের পরনে রেইনকোট, কিন্তু হাতে নিউজ চ্যানেলের লোগো দেওয়া মাইক। পেছন থেকে ছুটে এল আরও তিন-চারজন ক্যামেরা-কর্মী, জল ছিটকে তাদের জুতোর সোলে।
"ওই তো! ওই তো অরিন্দম মুখার্জী! পিছনের গেট দিয়ে পালাচ্ছেন!"
ক্যামেরার লাল আলো আর ফ্ল্যাশবাতি বৃষ্টির ধারার মধ্যে চাবুকের মতো অরিন্দমের চোখে এসে পড়ল। চশমার কাচ জলে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, তিনি প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। মাইকগুলো এক লহমায় তাঁর চিবুক ও ঠোঁটের কাছে ঠেসে ধরা হলো।
"প্রফেসর মুখার্জী! রিয়া সেনের ওপর মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে আপনি কি নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে চেয়েছিলেন?"
"সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ডায়েরি ভাইরাল হয়েছে, সেটা কি আপনারই লেখা?"
"কলেজের চাকরি থেকে তো বহিষ্কৃত হলেন, নিজের এই বিকৃত মানসিকতা নিয়ে কিছু বলবেন?"
একজন চশমা পরা তরুণ সাংবাদিক, যার চোখ দুটো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছিল, সে প্রায় অরিন্দমের গায়ের ওপর চেপে বসে মাইকটা ঠেলে দিল।
"বলুন প্রফেসর! সমাজের কাছে আপনার কি কিছু জানানোর নেই? নিজেকে কি এখনও নির্দোষ ভাবেন?"
বৃষ্টির জল অরিন্দমের কপাল বেয়ে চশমার কাচ পার হয়ে তাঁর ঠোঁটে এসে পড়ছিল—তাতে নোনা স্বাদ। চারপাশের ক্যামেরা, চিৎকার, চাকা ঘোরার কাদা ছিটকানো শব্দ আর সাংবাদিকদের এই সস্তা বিচারসভার সামনে অরিন্দম স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তাঁর মুখের রেখায় কোনো অপরাধবোধ ফুটে উঠল না, কোনো ভয় বা কাকুতি-মিনতিও দেখা গেল না। কেবল ফুটে উঠল এক চরম, হিমশীতল ঘৃণা।
তিনি সাংবাদিকদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
গলির মুখে একটা হলুদ অ্যাম্বাসেডর ট্যাক্সি ধীরগতিতে যাচ্ছিল, বৃষ্টির জন্য উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপারটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে ঘুরছে। অরিন্দম হাত উঁচিয়ে চিৎকার করলেন—"ট্যাক্সি!"
ট্যাক্সিটা একদম ফুটপাথের ঘেঁষে থামল। অরিন্দম পেছনের দরজাটা খুলে ভেতরে উঠে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভারী ব্যাগটা পাশে টেনে নিলেন।
সাংবাদিক তরুণের দল ট্যাক্সির জানলার কাছে চলে এল। একজন জানলার কাচে সশব্দে থাপ্পড় মারল—"উত্তর এড়িয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন প্রফেসর? জবাব দিন!"
অরিন্দম ট্যাক্সির দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করলেন। ড্রাইভার পেছনে ফিরে তাকাল, "কোথায় যাবেন বাবু?"
"বিডন স্ট্রিট।"
ট্যাক্সিটা চালকের ক্লাচ ছাড়ার ঝাঁকুনিতে এগোতে শুরু করল। চশমাটা খুলে অরিন্দম কোর্টের ভেতরের শুকনো অংশ দিয়ে মুছতে লাগলেন। জানলার কাচটা আধখোলা ছিল, বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে আসছিল।
সেই তরুণ সাংবাদিক ট্যাক্সির সঙ্গে দু-পা দৌড়ে এসে কাচের ফাঁক দিয়ে মাইকটা গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল—"আপনার বিকৃত মানসিকতা নিয়ে অন্তত একটা কথা বলুন!"
অরিন্দম ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে জানলার কাচটা ওপরে তুলতে লাগলেন। বাইরে তখন গণ-হিস্টিরিয়ার কোলাহল, নৈতিকতার ঢাক পেটানো কলকাতার সস্তা বিচার সভা। কাচটা পুরো বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, অরিন্দম সেই সাংবাদিকের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তাঁর স্বর ছিল অত্যন্ত সমতল, নিচু, অথচ ধারালো।
"বিচারের শকুনদের খাদ্য জোগাতে আমার বয়েই গেছে।"
কাচটা একদম আটকে গেল।
বাইরের সমস্ত চেঁচামেচি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলো আর রেইনকোটের খসখস শব্দ এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল কাচের ওপারের পৃথিবীতে। কেবল বৃষ্টি ঝরার একঘেয়ে ছন্দ আর ট্যাক্সির পুরোনো ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় শব্দ ভেতরে রয়ে গেল।
ট্যাক্সিটা কলেজ স্ট্রিটের ওপর দিয়ে শিয়ালদহ হয়ে মানিকতলার দিকে রওনা দিল। অরিন্দম জানলার কাচে মাথা টিকিয়ে রাখলেন। কাচের গায়ে বৃষ্টির জল ফোঁটা ফোঁটা হয়ে জমে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে, আর বাইরে কলকাতার ঝাপসা হয়ে আসা দোকানপাট, ট্রামলাইন আর নিয়ন সাইনের লাল-নীল আলো সেই জলে ধুয়ে মুছে একটা অদ্ভুত, নিরাকার ক্যানভাস তৈরি করছে।
পতন সম্পূর্ণ হয়েছে। অরিন্দম মুখোপাধ্যায় এখন সমাজের চোখে এক চিহ্নিত পাপাচারী, এক তাড়িয়ে দেওয়া অপরাধী। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, এই অপমানের চরম মুহূর্তে এসেও তাঁর ভেতরে কোনো পস্তানি নেই। সমাজ তাঁকে বমি করে ফেলে দিয়েছে, আর তিনি সেই আবর্জনা থেকে নিজের একা থাকাটা কুড়িয়ে নিয়েছেন।
অধ্যায় ৭: টেলিফোনে দূরত্ব
ঘরের ভেতর কোনো আলো ছিল না। কেবল ব্যালকনির ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে বাইরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের একটা ফ্যাকাশে, অসুস্থ হলুদ আলো এসে পড়েছিল মেঝেতে। সেই আলো-আঁধারির সীমানায় একটা পুরোনো সেগুন কাঠের আর্মচেয়ারে বসে ছিলেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
তাঁর ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমাঙ্গুলের ফাঁকে রাখা ডার্বি সিগারেটের লালচে মুখটা অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলছিল আর নিভছিল। ঘরজুড়ে জমে ছিল নিকোটিনের এক ঘন, দমবন্ধ করা গন্ধ আর সারাদিনের জমে থাকা গুমোট নীরবতা। বাইরে কলেজের সামনের সেই চিৎকার, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বা চাকার কর্কশ শব্দ আর নেই। কিন্তু ভেতরের এই নিস্তব্ধতা বাইরের কোলাহলের চেয়েও বেশি হিংস্র।
টেবিলের ওপর রাখা কালো রঙের পুরোনো ল্যান্ডফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল।
প্লাস্টিকের ওপর ধাতব হাতুড়ির সেই তীক্ষ্ণ শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরটাকে যেন একটা ধারালো কাচ দিয়ে দু-ভাগ করে দিল। অরিন্দম নড়লেন না। সিগারেটের ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে সিলিংয়ের দিকে ছেড়ে দিয়ে তিনি স্থির হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। চারটে, পাঁচটা, ছ-টা রিং হওয়ার পর তিনি হাত বাড়ালেন।
ভারী রিসিভারটা কানে তুলতেই ওপার থেকে ভেসে এল একটা অদ্ভুত যান্ত্রিক তরঙ্গশব্দ। দিল্লির ডায়লিং কোডের সেই পরিচিত 'বিপ' শব্দ আর তামার তারের ভেতরের হালকা স্ট্যাটিক।
অরিন্দম কোনো কথা বললেন না। শুধু রিসিভারটা গালে চেপে ধোঁয়ার শেষ অংশটুকু ছাড়লেন।
"বাবা?"
ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কোনো আবেগ নেই, কোনো উত্তাপ নেই—যেন বরফশীতল কোনো কুয়ো থেকে একটা পাথর খসে পড়ল জলতলে। মেঘলা। দিল্লি থেকে ফোন করেছে তাঁর মেয়ে।
অরিন্দম এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে চেনা গলায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর গলাটা শোনালো অস্বাভাবিকরকম শুকনো। " হুমম । বল মেঘলা। কেমন আছো? "
"তুমি কেমন আছ, সে কথা জিজ্ঞেস করার কোনো অর্থ হয় না," মেঘলার স্বরটা ফ্ল্যাট, একদম সমতল। সেখানে কোনো কান্না নেই, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নেই, এমনকি একজন অপরাধীর মেয়ের যে লজ্জিত হওয়ার কথা, সেই সংকোচটুকুও অনুপস্থিত। "ইন্টারনেটে সকাল থেকে পোর্টালগুলোর খবরের শিরোনামে শুধু তোমারই নাম। আনন্দবাজার, টেলিগ্রাফ—সব জায়গাতেই। বন্ধুরা লিঙ্ক গুলো সব পাঠাচ্ছে।"
অরিন্দম আ্যাশট্রেতে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটা আস্তে চাপ দিয়ে নিভিয়ে দিলেন। একটা বিষণ্ণ হাসির আভাস তাঁর মুখে এসে মিলিয়ে গেল। "তোদের দিল্লির ডিজিটাল জমানায় কলকাতা বেশ তাড়াতাড়িই পৌঁছায় দেখছি।"
"কৌতুক কোরো না বাবা," মেঘলার গলায় বিরক্তিকর এক প্রচ্ছায় ফুটে উঠল, কিন্তু তা-ও তীব্র নয়। "তুমি নিশ্চয়ই আশা করোনি যে আজকের দিনে এসব ধামাচাপা পড়ে থাকবে? তুমি তো চিরকাল ভেবে এসেছ, তোমার চারপাশের দেয়ালগুলো এত উঁচু যে বাইরের আলো বা নোংরা কোনোটাই ভেতরে ঢুকতে পারবে না।"
অরিন্দম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রিসিভারটা আরও একটু শক্ত করে ধরলেন। "আমি কখনো ভাবিনি মেঘলা। তোমার মা আমেরিকা যাবার পর আমি শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। সমাজ সেসব তার নিজের সুবিধাজনক নাম দিয়েছে।"
"তোমার এই ফিলোজফিগুলো এখন আর খাটছে না," মেঘলা থামল। ওপার থেকে একটা কাগজের খসখস শব্দ বা হয়তো ঘরের এসি চলার একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন ভেসে এল। বাবা আর মেয়ের মাঝখানে হাজার মাইল পথ, কিন্তু এই মুহূর্তে সেই শারীরিক দূরত্বের চেয়েও মারাত্মক হয়ে উঠেছিল তাদের ভেতরের সামাজিক ও মানসিক বিচ্ছিন্নতা। রক্তাক্ত কোনো সম্পর্কের দাহ নয়, বরং একটা মরে যাওয়া সম্পর্কের শ্বেতশুভ্র ঠান্ডা থমথমে ভাব ঘিরে ধরেছিল পুরো কথোপকথনটাকে।
মেঘলা আবার বলল, "তুমি যা করেছ, সেটা নিশ্চয় তোমারই ব্যাপার। কিন্তু তুমি যে নিজেকে সবসময় নির্দোষ ভাবো, সেটাই দেখতে যা খারাপ লাগে।"
কথাগুলো অরিন্দমের কানে গিয়ে বিঁধল, কিন্তু তিনি কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন প্রকাশ করলেন না। তিনি বহু বছর ধরে তার স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতা লালন করেছেন। মেঘলা যখন ছোট ছিল, তখনও অরিন্দম বই আর ডায়েরির পাতাতেই নিজের জগৎকে খুঁজে পেতেন। পরিবার তাঁর কাছে ছিল একটা প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা যোগান দিতে আর খরচ করতে, দায়িত্ব মাত্র, তার আত্মার কোনো অঙ্গ নয়। আজ সেই অপূর্ণ সম্পর্কের দাম মেটাতে হচ্ছে। মেঘলা মানুষ হয়েছে কেবল তার মা আর ছোট এক মাসীর তত্বাবধানে ও তাদের দুজনের ছায়ায়। সেখানে অরিন্দম ছিলেনই বা কোথায়? শুধু টাকাই দিতে হয়েছে অরিন্দমকে সংসারে যখন যেমন চেয়েছে মেঘলার মা, মাসী দাদু ও দিদা।
অরিন্দম সোজা হয়ে বসলেন। অন্ধকারের মধ্যেও নিজের চোয়ালটা শক্ত করলেন তিনি। তারপর খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন:
"আমি যে নির্দোষ সেটাও দাবি করিনি তো মেঘলা। আমি শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারকদের বিচারটা মানিনি। তাই রেসিগনেশন দিয়েছি। আমার কোনো দায় নেই কোনো ছাত্রছাত্রী কী শিখলো বা না শিখলো আমার থেকে। "
ওপারে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর মেঘলার একটা ছোট ও শুকনো নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। যেন সে এক ধরনের করুণা করল অরিন্দমের এই অহংকারকে।
"রেসিগনেশন দিলে, না বহিষ্কৃত হলে, সেটা কিন্তু এখন আর কোনো পার্থক্য তৈরি করে না বাবা," মেঘলার স্বরে এবার চরম ক্লান্তি। "তুমি কোনোদিন কাউকেই মানোনি। না আমার মাকে, না আমাকে, না মেসোমশাই ও মাসীকে, না তোমার সমাজকে। তুমি শুধু নিজের তৈরি করা একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মহানুভবতা দেখেছ। আজ যখন সেই আয়নাটা ভেঙে গেছে, তুমি বলছ তুমি বিচারকদের মানো না।"
"তুইও বুঝি আমাকে বিচার করতে বসেছিস রে মেঘলা মা?"
"না," মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল। "আমি তোমাকে বিচার করার মতোও অতটা গুরুত্ব আর তোমাকে দিই না। আমি শুধু ফোন করলাম এটা নিশ্চিত হতে যে, তুমি বেঁচে আছ কি না। কারণ খবরগুলো যেভাবে আসছে...আমার ভয় হচ্ছিলো তুমি কিছু আবার করে না বস। যা সেন্টিমেন্টাল তুমি। যতই হোক আমার বাবা তো তুমি। "
"আমি বেঁচে আছিরে," অরিন্দম থামিয়ে দিলেন মেয়েকে। "আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আমার ভেতরে কোনো গ্লানিও নেই।"
"তাহলেই ভালো। নিজের সেই একাকীত্ব নিয়েই থাকো।" মেঘলার স্বরটা যেন আরও দূরে চলে গেল। "আমি দিল্লি থেকে কলকাতায় আসার এখন কোনো পরিকল্পনা করছি না তাহলে। আমার কাজেরও খুব চাপ। তা ছাড়া, এই মুহূর্তে তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে মিডিয়া আর সমাজ আমাকেও সেই একই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, যার কোনো প্রয়োজন আমার নেই।"
পারিবারিক সম্পর্কের এই নগ্ন সততা অরিন্দমকে ভেতর থেকে একমুহূর্তের জন্য নাড়িয়ে দিল। নিজের রক্ত, নিজের সন্তান—কোনো নাটকীয় হাহাকার না করে খুব সহজভাবে জানিয়ে দিল যে সে হাত ধুয়ে ফেলেছে। এই বরফশীতল বিচ্ছিন্নতা যেকোনো গালাগাল বা অভিশাপের চেয়েও শতগুণে বেশি নির্মম।
অরিন্দম মৃদুস্বরে বললেন, "আমিও তোকে আসতে বলিনি মেঘলা। আমি কারো কাছ থেকে কোনো করুণা ,আশ্রয় বা দয়া প্রত্যাশাও করি না।"
"জানি তো। তুমি কাউকেই প্রয়োজন মনে করো না। এটাই তো তোমার চিরকালের সমস্যা।" মেঘলা এক মুহূর্ত থামল। "নিজের খেয়াল রেখো। আর সম্ভব হলে ল্যান্ডফোনটা কেটে রেখে দাও, সাংবাদিকরা নিশ্চয়ই এই নম্বরেও ট্রাই করবে।"
"হুম।"
"রাখছি।"
কোনো 'ভালো থেকো' নয়, কোনো সান্ত্বনার স্পর্শ নয়। ওপার থেকে খট করে ফোনটা কেটে যাওয়ার শব্দ হলো।
তারপর শুধুই ডায়াল টোন—'টুট... টুট... টুট...'। একঘেয়ে, যান্ত্রিক আর নির্মম।
অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড সেই ডায়াল টোনটা কানে ধরে রেখে দিলেন। মনে হলো, এই যান্ত্রিক শব্দটাই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গী। রক্তের সম্পর্ক, এতদিন ধরে গড়ে তোলা পিতৃস্নেহের ক্ষীণ সুতো—সবটাই এক নিমেষে কেটে গেছে। কোনো রক্তের দাগ ছড়ায়নি, কোনো চিৎকার হয়নি, অথচ বিচ্ছিন্নতাটা হয়ে গেছে চিরস্থায়ী।
তিনি ধীরে ধীরে রিসিভারটা ক্র্যাডেল-এ নামিয়ে রাখলেন।
পকেট থেকে দেশলাই বের করে আর একটা গোল্ড ফ্লেক সিগারেট ধরালেন তিনি। বারুদের নীল আলোটা এক মুহূর্তের জন্য তাঁর শুকনো, রেখাবহুল মুখটাকে স্পষ্ট করে তুলে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ফোনটা টেবিলেই পড়ে রইল। আর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, সমাজের চোখে একজন দাগি অপরাধী এবং নিজের মেয়ের চোখে এক অপ্রাসঙ্গিক অতীত, অন্ধকারের ভেতর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের এই নিখাদ একাকীত্বকে উপভোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন।
পর্ব ২: সোদপুর ও কলোনির স্মৃতি (অধ্যায় ৮– ১৭)
অধ্যায় ৮: 'অপরাজিতা' ও ১৯৭১ সালের-এর ভূতেরা
সোদপুর স্টেশন পেরিয়ে পূব দিকের কুড়ি মিনিট হেঁটে গেলে পূর্বপল্লি পাড়ার সরু গলিটার মুখে যখন রিকশাটা এসে থামল, তখন ভোরের দিকের রক্তিম আলো আকাশের গায়ে জমে থাকা কালো মেঘের আড়ালে ধুঁকছে। গলিটার দু-পাশের নর্দমা থেকে পচা খড় আর জমা জলের এক ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে।
রিকশার ভাড়া চুকিয়ে ড.অরিন্দম মুখোপাধ্যায় পি এইচ ডি( বি এইচ উ) , ডিলিট( কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) যখন নিজের বিশাল চামড়ার ট্রাঙ্ক আর ব্যাগটা হাতে নিচে নামলেন, তখন রিক্সা চালক ভূপেন তাঁর দিকে একবার কৌতূহলী চোখে তাকাল। এই গলিতে কোনো ভদ্রলোক এভাবে কোনো ট্রাঙ্ক হাতে এসে নামেন না । কে উনি? ….খুব চেনা চেনা চেহারা। আসলে অরিন্দম যখন সোদপুর ছেড়েছিল প্রায় ৪০ বছর আগে তখন ভূপেন ছিলো ৮ বছরের কলোনির একটা ছেলে। তাই অরিন্দম কে সে চিনতে পারেনি।
গলির শেষ মাথায়, একটা প্রকাণ্ড পুরনো অশ্বত্থ গাছের ডালপালায় ঢাকা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দমদের পৈতৃক বাড়ি , 'অপরাজিতা বাড়িটা'। বাড়ির মূল ফটকের লোহার গ্রিলে মরচে ধরে ধরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, নীচের অংশটা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। প্রায় চল্লিশ বছর পরে অরিন্দম প্রথম এলেন নিজের পৈতৃক সম্পত্তি তে। গেটের ওপরের শ্বেতপাথরের ফলকটায় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষরে লেখা—অপরাজিতা, ১৯৫৪। অরিন্দমের বাবা ও মা যখন ১৯৫০ সালে ওপার পূর্বপাকিস্তানের থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে এপারে এসে চার বছর ধরে মাথা গোঁজার ছোট একটা ঠাঁই করেছিলেন, তখন এই নামটা রেখেছিলেন। অপরাজিতা মানে হলো—যাকে নাকি জয় করা যায় না। অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে একটা শুকনো, করুণ হাসি ফুটে উঠল। নাম আর বাস্তবের কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!
পকেট থেকে পিতলের ভারী, প্রায় কালচে হয়ে যাওয়া চাবিটা বের করে অরিন্দম সেটা দরজার তালাটায় পরালেন। কয়েকবার মোচড় দেওয়ার পর একটা বিকট কড়কড় শব্দে তালার ভেতরটা ভাঙল। গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একঝাঁক শুকনো পাতা আর ধুলো এসে আছড়ে পড়ল তাঁর পায়ে।
বাড়িটা একতলা আর কেমন অন্ধকার, সেঁতসেঁতে। ঢুকেই বাঁ হাতে ছোট একটা ঘর। দেওয়ালে চুনকাম খসে পড়ে ভেতরের লাল ইট উঁকি মারছে। সেই দেওয়ালের এক কোণে এখনও আধো-মোছা অক্ষরে লাল কালিতে লেখা রয়েছে কিছু পোস্টারের অবশিষ্টাংশ—'৭০-এর দশক শেষ হয়নি...', আর তার ঠিক পাশেই একটা ঝাপসা হাতুড়ি-কাস্তে এবং একটা পাঁচকোণা তারা।
এই 'অপরাজিতা' তো সত্তর দশকে আর স্রেফ একটা চুন বালি সুরকি ইট-কাঠের বাড়ি ছিল না। সত্তর দশকের শেষ দিকে যখন প্রদেশ কংগ্রেস এর স্বৈরাচারী শাসন এর বিপক্ষে সিপিআই(এম) পার্টি আর নকশালদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কলকাতার রাজপথ লাল হয়ে উঠত, তখন অরিন্দমের বাবা ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়—যিনি ছিলেন বামপন্থী অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (AITUC) একনিষ্ঠ একজন ক্যাডার এবং স্থানীয় ইউনিয়ন নেতা—নিজের অজান্তেই এই বাড়িকে একটা নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে ফেলেছিলেন। প্রতিবেশী তিনকরী বাবুর মতাদর্শ ছিল সিপিআই(এম)-এর প্রথাগত কমিউনিস্ট লাইনে, কিন্তু তাঁরই ছত্রছায়ায়, পুলিশের নজর এড়াতে, তাঁর ভাইপো আর এই কলোনির কিছু উগ্রপন্থী নকশাল ছাত্র যেমন প্রকাশ, সিদ্ধার্থ, নেতাই, বিরু, বাবলু এই ছোট ঘরটাকে একটা গোপন আস্তানা বানিয়ে তুলেছিল। মধ্যরাত্রে এখানে বসত চোরাগোপ্তা মিটিং, সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা হতো 'দক্ষিণ দেশ' আর 'মুক্তিযুদ্ধর' বুলেটিন, বালতির পর বালতি লাল রঙ গোলা হতো দেওয়াল লিখন আর পোস্টার বানানোর জন্য। পাইপগান বন্দুকের তোড়জোড়, বোমা বাঁধার মসলা লুকোনো থাকত সিঁড়ির তলার অন্ধকার কুলুঙ্গিতে।
অরিন্দম নিজের চামড়ার বিশাল ট্রাঙ্কটা মেঝের ওপর নামিয়ে রাখলেন। ট্রাঙ্কটা খোলার সময় মেঝের ধুলোর একটা পাতলা আস্তরণ উড়ল বাতাসে। তিনি নিজের কোটের বোতাম খুললেন। হাতার কফ দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে এক কোণে পড়ে থাকা একটা পুরনো নারিকেল ঝাড়ু তুলে নিলেন।
ঝাঁট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে চার দশকের পুরনো ইতিহাসগুলো যেন ধুলো হয়ে উড়তে শুরু করল। ধুলোর সেই কণার মধ্যে মিশে ছিলো ফিনাইল, বাসি চা, আর্দ্র চট আর মানুষের ভিড়ের গন্ধ। ১৯৭১ সালেও যখন ওপার বাংলা থেকে রিফিউজিদের ঢল নেমেছিল, তখন সোদপুরের গোসালা এলাকার সেই সুবিশাল রিফিউজি কলোনি ছাপিয়েও এই 'অপরাজিতা'র বারান্দায়, উঠোনেও ত্রিপল টাঙিয়ে শুয়ে ছিল কিছু অচেনা মুখ। তাদের ভেজা কাঁথা, বাচ্চাদের খিদকুটে কান্না, জখম হওয়া শরীরের গন্ধ আর পোড়া কেরোসিনের ধোঁয়া এখনও যেন এই ঘরের বাতাসে আটকে আছে।
অরিন্দম মেঝের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দেওয়ালের গায়ে হাত দিলেন। এক জায়গায় একটা পুরনো ছবি টাঙানো ছিল, ফ্রেমটা ভাঙা। ছবিতে তাঁর বাবা ও মা— মার হাতে একটা পিতলের ঘটি আর বাবার হাতের কাঠের বাক্স নিয়ে ১৯৪৭-এর দেশত্যাগের পর সোদপুরের এই ভিটেতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। ভোলাবাবুর চোখ দুটো কৌটোর মতো বসে যাওয়া, কিন্তু তার ভেতরে ছিল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক আদিম, ও হিংস্র জেদ।
অরিন্দম ঝাড়ুটা একপাশে রেখে কাঠের জানলাটা সশব্দে খুলে দিলেন। জানলার বাইরে তখন সোদপুরের বেলা। এখান থেকে মাইলখানেক দূরে, গোসালার কাছে সেই নিচু কলোনির গলিগুলো দেশবন্ধু কলোনি, নীলগঞ্জ কলোনি আর শহীদ কলোনি । নীলগঞ্জ কলোনির রঙের মিস্ত্রির অ্যাসবেস্টসের চালের তিন কামরার ঘরটা ছিল। যেখানে থাকতেন অরূপ আর তার বাবা ও মা রত্না দেবী। ওপার বাংলার শরণার্থী মানুষ গুলোর ঘরে প্রদীপের আলো জ্বলত। ইলেকট্রিসিটি ছিলো না। মানুষ গুলোর চাকরী ছিলো না। সেই টিনের চালার বাড়ি গুলো কী এই চল্লিশ বছর পরে কী আর আছে? মনে হয় না। ইটের বস্তি হয়ে গেছে হয়তো
অরিন্দম চোখ বুজলেন। চারপাশের ধুলোর গন্ধ পেরিয়ে তাঁর নাকে ভেসে এল সেই সাঁঝকালের সস্তা নারকেল তেল, গায়ের ঘাম আর রান্নার মিশ্রিত এক তীব্র গন্ধ—যে গন্ধটা রত্না মাসিমার শরীর থেকে বের হতো। ১৭ বছর বয়স থেকে ২১ বছর পর্যন্ত, চারটে বছর ধরে চলেছিল সেই গোপনতম লেনদেন দুজনের মধ্যে।
রাত নামল সোদপুরে। অরিন্দম সুইগী থেকে অর্ডার করে নিজের দুপুরের খাবার এনিয়ে নিয়েছিলেন। রাতেও তার থেকেই হয়ে যাবে। ঘর গুলো এখন অনেক পরিষ্কার।
রাস্তার আলোটা বন্ধ হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। ঘরে এখনও কোনো কারেন্ট নেই। অরিন্দম দোকান থেকে কয়েকটা মোমবাতি কিনে এনে , একটা জ্বালিয়ে , টেবিলের ওপর রেখেছেন। মোমবাতির ফ্যাকাশে শিখাটা বাতাসের ঝাপটায় কাঁপছে, আর ঘরের দেওয়ালে অরিন্দমের ছায়াকে এক দৈত্যের মতো বড় করে তুলছে।
অনেক দূরে, শেয়ালদা-রানাঘাট লাইনে একটা মালগাড়ি যাওয়ার শব্দ হলো।
ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...
ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেলটা রাতের অন্ধকার চিরে ধেয়ে এল। রেললাইনের সেই কম্পন মাটির ভেতর দিয়ে এসে 'অপরাজিতা'র পুরনো সিমেন্টের মেঝেটাকে মৃদু কাঁপিয়ে দিল। সেই কম্পনে ঘরের কোণে রাখা পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের থালাটা মনে হলো যেন নড়ে উঠল।
খাটের ওপর রাখা চামড়ার ট্রাঙ্ক থেকে নিজের একটা দামি বিছানার চাদর পেতে অরিন্দম শুয়ে পড়লেন। চশমাটা খুলে পাশে রাখা। তাঁর চোখ দুটো অন্ধকারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সব কিছুই তাকে নতুন করে কিনতে হবে এখানে। আগামী কাল সকাল থেকে শুরু করবেন। সময় একটু লাগবেই বাড়িটাকে বাসযোগ্য করে তুলতে । মেঘলা কে ডাকবেন ভাবলেন। মেয়েটা দিল্লিতে নয়ডা তে পরে আছে। ২৭ পেরিয়ে সে ২৮ এ পড়েছে।
হঠাৎ মনে হলো, ঘরটা আর ফাঁকা নেই।
মোমবাতির আলোর পরিধির ঠিক বাইরে, ঘরের অন্ধকারের মধ্যে কারা যেন এক এক করে এসে দাঁড়াচ্ছে। এক-দুই করে অনেকগুলো অবয়ব। তাদের পরনে ছেঁড়া ময়লা ধুতি, ময়লা শাড়ি, হাতে টিনের ট্রাঙ্ক আর প্লাস্টিকের বস্তা। ১৯৭১ সালের সেই পূর্বপাকিস্তানের থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্বাস্তুর দল এরা। তারা কেউ কথা বলছে না, কিন্তু তাদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে মোমের আলোয়। মরে এখন ভূত।
সেই ছায়ামূর্তিদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর পরনে হাঁটু পর্যন্ত ওঠা ধুতি, ঢোলা সাদা শার্ট । কপালে গভীর বলিরেখা, হাতে একটা পিতলের ঘটি।
ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়—অরিন্দমের মৃত বাবা।
অরিন্দম উঠে বসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর শরীর যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে। তিনি গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ করলেন। "বাবা? তুমি?"
"তুমি এখানে কেন বাবা? তুমি তো নব্বই সালেই সদেপুরে পানিহাটি অ্যাসেম্বলি ইলেকশনের সময় প্রদেশ কংগ্রেসের গুলি আর পুলিশের লাঠির মাঝখানে দাঁড়িয়ে হারিয়ে গিয়েছিলে। কত খুঁজেছিলাম আমরা সকলে তোমাকে তখন। কেউইপায় নি "
বাবার ছায়ামূর্তিটা এসে দাঁড়াল অরিন্দমের মাথার কাছে। তাঁর পেছনে ১৯৭১-এর সেই রিফিউজিদের দীর্ঘ সারি, দেওয়ালে ফুটে ওঠা শহীদ হওয়া নক্সাল যুবকদের রক্তমাখা মুখগুলো সব একে একে জড়ো হচ্ছে।
অরিন্দম চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত নিচু, এক ভাঙা গলায় বললেন:
"তোমরা..তোমাদের বাংলাদেশের ভিটেমাটি হারিয়েছিলে বাবা... আর এখন আমি হারিয়েছি আমার অহংকার। তোমাদের ছেড়ে যাওয়া আমার ভুল ছিলো বুঝতে পারছি। "
অরিন্দমের বাবার ছায়াটা নড়ল না। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এল ঘরের হাওয়ায়, যেন কোনো গভীর কুয়ো থেকে বহু পুরনো একটা প্রতিধ্বনি উঠে আসছে। কোনো ক্ষোভ নেই সেই স্বরে, আছে কেবল এক নির্দয় বাস্তবতা।
"অহংকারতো কোনো ভিটেমাটি নয় অরিন্দম, ওটা বালির বাঁধ। জল এলেই ধুয়ে যায়। তুই ভেবেছিলি তুই খুব বিদ্বান হয়েছিস, তুই লায়েক হয়েছিস। তুই কলকাতা শহরের বড় ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক, তুই মানুষের মনের ওপরও শাসন করবি? আমরা ভিটে হারিয়েছিলাম অন্যের পাকিস্তানি রোজাকারদের অত্যাচারে, আর তুই তোর নিজের এই ভিটে হারালি স্বেচ্ছায় তোর নিজের ভেতরের জন্তুটার জন্য।"
অরিন্দম দু-হাতে মুখ ঢাকলেন।
বাবার ছায়ামূর্তিটি একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতার সেই চেনা কঠোরতা। "তুই তো বলতিস মার্কসবাদ নাকি একটা ফালতু শুকনো তত্ত্ব, আর তোর পুঁজিবাদী বৈভবে মানুষ হওয়া বায় -রন হলো মানবমুক্তির আসল ভাষা। আজ তোর বায়- রন তোকে কোথায় এনে দাঁড় করালোরে অরিন্দম? সমাজ তোকে বিচার করেনি ঠিকই, কিন্তু তুই তোর নিজের অহংকারের কাছেই হেরেছিস। তুই ভাবতিস তুই বুদ্ধিজীবী, বুর্জোয়া পন্থা ক্যাপিটালিজম এই সমাজের ঊর্ধ্বে। আর আজ? তুই স্রেফ একটা চরিত্রহীন বর্জ্যপদার্থ।"
"আমি কিন্তু কারও ক্ষতি করিনি বাবা... আমি কাউকে আঘাত দিতেও চাইনি বাবা... আমি শুধু নিজে বাঁচতে চেয়েছিলাম ভালো ভাবে।"
অরিন্দম বিড়বিড় করে উঠলেন, তাঁর কথা জড়িয়ে গেল ট্রেনের হুইসেলের কর্কশ শব্দে। "আমি শুধু আমার নিজের স্বাধীনতার মূল্য দিতে চেয়েছি।"
"স্বাধীনতা?" বাবার ছায়ামূর্তিটা হাত বাড়াল। সেই হাতে পিতলের এক ঘটি আর ১৯৭১-এর সেই ভিটেমাটি হারা উদ্বাস্তুদের ধুলো মাখা। "নিজের ক্ষুধা মেটানোকে স্বাধীনতা বলে না অরিন্দম, ওটাকে বলে পশুর প্রবৃত্তি। তুই আমার 'অপরাজিতা' নামের বাড়িটাকে নিজের পাপ ঢাকার আস্তানা বানাতে যাচ্ছিস তাইতো।"
অন্ধকার ঘরের কোণ থেকে এবার একটা ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে এগিয়ে এল। মোমবাতির হলুদ শিখায় কাঁপতে থাকা বেঞ্চের ওপর, অরিন্দমের মৃত বাবার ভোলা বাবুর ফেলে যাওয়া ছায়ার জায়গায় এসে বসল ৭৫-৭৬ বছরের এক জরাজীর্ণ, কঙ্কালসার নারীমূর্তি। ১৯৭৩ এর রত্না দেবী। অরিন্দমের স্কুলের বন্ধু অরূপের মা। পরনে ওনার জীর্ণ তালি মারা একটি সুতির শাড়ি, চুলে ছাই রঙের তুষারপাত, পিঠটা বয়সের ভারে খানিকটা নুয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই অবয়বের চারপাশ থেকে ভেসে আসা চার দশক আগের সেই পরিচিত নারকেল তেল আর ঘামের সোঁদা গন্ধটা এক মুহূর্তে পুরো ঘরটার বাতাসকে স্থবির করে দিল।
অরিন্দম চশমাটা খুলে হাত নামিয়ে তাকালেন। মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলোয় রত্না দেবীর মুখটা দেখা যাচ্ছে—সেখানে এখন বয়সের বলিরেখার অগণিত মানচিত্র, চামড়া কুঁচকে গিয়ে হাড়ের খাঁজগুলো স্পষ্ট। কিন্তু চোখ দুটো আজও সেই সতেরো বছরের দুপুরে দেখা সেই গুমোট অন্ধকারের মতো গভীর ও নিরাসক্ত।
"রত্না মাসিমা?" অরিন্দম ফিসফিস করে উঠলেন, তাঁর গলায় চল্লিশ বছরের স্তব্ধতা প্রকম্পিত হলো। "তুমি... তুমি কি সত্যিই আজও বেঁচে আছ? নাকি আমার ভেতরের অপরাধবোধ তোমাকে এক অলৌকিক ছায়া বানিয়ে এখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে?"
রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা অরিন্দমের খুব কাছে এগিয়ে এসে বসল, যেমনভাবে চল্লিশ বছর আগে সেই টিনের চলার স্যাঁতসেঁতে ঘরে চৌকির ওপর তার পাশে এসে বসত। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কোনো ক্রোধ ছিল না, ছিল এক ধরণের বরফশীতল, প্রবীণ উদাসীনতা।
"তুই দেখছি এত বছর পরেও সেই সতেরো বছরের দামাল ছোকরাটাই রয়ে গেলিরে বাপ্পা," রত্না দেবীর স্বরটা যেন মেঝের ওপর শুকনো পাতার ঘর্ষণের শব্দ। "আজও নিজের কৃতকর্মের দায় ঢাকতে গিয়ে অতীতের ভূতেদের দরজায় কড়া নাড়তে এসেছিস বুঝি সোদপুরে তোদের এই বাসায়?"
অরিন্দম অন্ধকারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, যেন রত্না দেবীর অশরীরী ছায়াটাকে স্পর্শ করে সত্যতা মেপে নিতে চান। "আমি আজ জীবনের সবকিছু হারিয়েছি মাসিমা। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকতার সম্মান, স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে... সব…সব। আজ 'অপরাজিতা'র এই ভাঙা সিমেন্টের মেঝেতে বসে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের প্রথম পতন তো আপনার ওই গোসালার রিফিউজি কলোনির টিনের চালার নিচে, আপনার শরীরের আঁচল খামচে ধরার সেই দিনটাই শুরু হয়েছিল। তুমিই বলো রত্নামাসি... তুমি কি সেদিন আমাকে শুধুই এক অবাধ্য কিশোরের অত্যাচার মনে করে সহ্য করেছিলে? নাকি... নাকি তোমার ভেতরেও আমার জন্য কোনো ভালোবাসা বা প্রেমের টান ছিল? তুমি কি কোনোদিন আমাকে এতটুকুও ভালোবেসেছিলে?"
রত্না দেবী শান্ত ভঙ্গিতে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কেবল এক করুণার বিষাদ ফুটে উঠল।
"প্রেম?" রত্না দেবীর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, প্রবীণ রেখা ফুটে উঠল। "সেটা আবার কী জিনিসেররে বাপ্পা? প্রেম কি তোদের বইয়ের পাতায় পড়ে থাকা কোনো বাঁধাধরা রেসিপি নাকি? যে দু-ছটাক সমাজ, এক চামচ সিঁদুর আর কয়েকটা মিষ্টি কথা আর শরীরের আদর মেলালেই তৈরি হয়ে যায়? তোদের ওই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের প্রেম আর আমাদের রিফিউজি কলোনির কষ্ট, অনাহারের ভিটেয় টিকে থাকার লড়াই এক জিনিস নয়। প্রেম শব্দটা তোদের মতো অভিজাতদের বিলাসী মুখেই মানায় বাপ্পা। আমাদের মতো সর্বশান্ত মানুষের ঘরে কোনো প্রেম থাকে না, থাকে কেবল বেঁচে থাকার অন্ধ তাগিদ আর প্রতিদিনের অভ্যেস গুলো।"
"তাহলে কেন সহ্য করতে তুমি আমাকে? কম দিন তো আমি ঘাটিনি তোমার শরীর - প্রায় চার বছর ধরে।" অরিন্দমের গলায় এক ব্যাকুল আকুলতা ঝরে পড়ল। "প্রথম দিনেই তো তুমি আমাকে পুলিশে দিতে পারতে, অরূপকে বা কাকাবাবু বা আমার বাবাকেও বলে দিতে পারতে! তা না করে চার চারটে বছর ধরে কেন আমাকে তোমার শরীরের,মনের এতো কাছে আসতে দিয়েছিলে? শুধুই কি ভীতি ছিল? নাকি শুধুই কিছু টাকার বিনিময়ে আমাকে শোষণ করা উদ্দেশ্য ছিলো?"
রত্না দেবী সোজা অরিন্দমের চোখের দিকে তাকালেন। মোমবাতির আলোটা তাঁর চোখের মণি দুটোকে অদ্ভুতভাবে কাচের গোলকের মতো উজ্জ্বল করে তুলল।
"তোর কি মনে হয় অরিন্দম, একটা সতেরো বছরের চঞ্চল বখাটে ছেলেকে সাইত্রিশ বছরের একটা রিফিউজি ঘরের কলোনির গৃহিণী বুঝি খুবই ভয় পেয়ে চলত?" রত্না দেবীর স্বরে এক নির্মম, মনস্তাত্ত্বিক সত্য ফুটে উঠল। "না। তুই যেটাকে তোর আমার ওপরে 'অধিকার' বা 'জয়' ভেবেছিলিস, সেটা ছিল তোর বয়সের অহংকার। আমি চাইলে সেদিনই এক মুহূর্তে তোকে কলোনির মোড়ে ধরে নিয়ে গিয়ে শেষ করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। বরঞ্চ তোর আমার গড়ে ওঠা সম্পর্কটা কেউ যেন টের না পায়, সেই চেষ্টাই করেছি। দেখ আজও সেই সম্পর্ক কেউ টের পায় নি"
"কেন করোনি?"
"কারণ সেই বয়সেই তুই আমাকে এমন কিছু দিয়েছিলিস, যা আমার রঙের মিস্ত্রি স্বামী,অরূপের বাবা কোনোদিনও দিতে পারেনি," রত্না দেবী থামলেন, যেন স্মৃতির অতল থেকে এক অদ্ভুত সত্য তুলে আনছেন। "অরূপের রোগা বাপটা সারাদিন অন্যদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুনকাম আর রং করে রাতে ঘরে ফিরত। তার গায়ে থাকত কলোনির মোড়ে ভূপেনের দোকানের সস্তা মদের ঝাঁঝ আর চুনের সোঁদা গন্ধ। ফিরে এসে বাড়ির সামনের পানা ভর্তি পুকুরে কয়েকটা ডুব দিয়ে,রাতের ডাল-ভাত গিলে, ঘুমোবার আগে রাতে আমার শরীরের ভেতরে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেলে দিয়ে ,পাশে উল্টে ঘুমিয়ে পড়ত। চার দেওয়ালে বন্দি আমার ওই ক্লান্ত শরীরটা কোনোদিন জানতেই পারেনি—একজন নারী হিসেবে আমারও তো একটা সত্তা থাকতে পারে। তারও চাহিদা থাকতে পারে। সে আমাকে দেখেছিল স্রেফ সংসারের হাঁড়ি ঠেলার আর তার ছেলে সামলানোর একটা জড় আসবাব হিসেবে।"
"আর আমি? আমার চাওয়া কী ছিলো?"
"আর তুই?" রত্না দেবীর কণ্ঠ এবার আরও ধীর ও গভীর হয়ে এল। "তুই যেদিন প্রথম আমার ব্লাউজের হুক আর শাড়ির আঁচলটা ধরে টানাটানি করেছিলিস, তোর হাতের ছোঁয়ায় কোনো সামাজিক দায়িত্ব বা গৃহস্থালির ক্লান্তি ছিল না—ছিল এক উগ্র, অবাধ্য আর সর্বগ্রাসী বিকৃত একটা ক্ষিদে! কিন্তু জানিসতো বাপ্পা, তোদের মত ওই পণ্ডিতদের বইয়ে ফ্রয়েড সাহেব যাকে ওডিপাস কমপ্লেক্স বলেন, তোর সেই আদিম উগ্রতার পেছনে আসলে শুধু শরীর ছিল না—ছিল এক আকুল মাতৃতৃষ্ণাও সেটা আমার মত মুর্খ এক নারী আস্তে আস্তে বুঝে গেছিলাম! আমার ডান হাতের আঙ্গুলগুলো মুঠোয় তোর ঠাটিয়ে থাকা শক্ত পৌরুষদণ্ড টাকে জোর করেই ধরে তো থাকতাম ঠিকই আর আমার ঝোলা দুটো স্টনের চারধারে তোর জিভ বুলিয়ে শৃঙার করা চুমু খাওয়া আর বোটাদুটোকে মুখের ভেতরে নিয়ে তুই যখন টেনে টেনে চুশতিস..আমার শরীরের ভেতরটা কেমন কেমন যেন করতো। আর আমার নাভির নিচে তলপেটে যখন তুই মুখ রাখতিশ আমার বহু বছরের ঘুমন্ত সেই নারী শরীরটা তখন যেনো সাপ ঘুম ভেংগে জেগে উঠত। আর আমার বহু ব্যবহৃত জোনির ভেতরে তোর ঠাটানো অত বড় আর ওরকম শক্ত কুচকুচে কালো লিঙটা প্রবেশ করে যখন ছোট বড় ধাক্কা মারতো জরায়ু মুখে, আমার ভেতরের সে সুখ…. ….আমার শরীরের সমস্ত হাড়গোড় যেনো মরমর করে উঠতো…তোকে আমি এখন বোঝাতে পারবো না…সেই সুখ…একজন মহিলাই বুঝবে। তুই একজন মাঝ বয়সী মেয়েছেলেকে কী ভাবে তৃপ্তি দিতে হয় অল্পদিনেই শিখে গেছিলি। শুধু ভেতরে ভেতরে একটাই ভয় করত, যদি আমি হঠাৎ করেই গর্ভবতী হয়ে পড়ি তোর দ্বারা। অরূপ ও তখন ১৭ বছরের। একই ক্লাসে পড়তিস তোরা। সেই বয়সে আবারও গর্ভবতী হওয়াটাও যে বড় লজ্জার ছিলো কলোনিতে। আর সেই সন্তানকেই বা মানুষ করতাম কী ভাবে আমাদের সেই অভাবের সংসারে? কেউতো আর জানতোও না যে অরূপের বাবার মতই, তোরও বির্যরস তুই আমার জরায়ুর ভেতরে তুই মাঝে মাঝেই এসে ঢালতিস।
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে রইলেন। অন্ধকারের ভেতরেও তাঁর কপালে শীতল ঘামের ফোঁটা জমে উঠল।
রত্না দেবী বলতে লাগলেন, "তোর নিজের মা তো তোকে তার সামাজিক আভিজাত্যের অহংকারে চিরকাল তোকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তুই নিজেই একদিন অসাবধান মুহূর্তে বলেছিল আমাকে। তুই আমার ওই, মেদভর্তি শরীরের ভেতরে আসলে তোর নিজের মাতৃহৃদয়ের উষ্ণতা খুঁজেছিলিস,এবং একই সঙ্গে একটা ৩৭ বছরের পূর্ণ নারী শরীরকে ভোগ করার অধিকার ও করবার জন্য দর্পও ছিলো তোর মধ্যে। তুই আমার খোলা শরীরের আশ্রয়ে একই সঙ্গে তোর অবদমিত শৈশব আর মাতৃতৃষ্ণাকেও মেটাতে চেয়েছিলিস। তোর সেই কিশোরসুলভ অথচ অন্ধ ব্যাকুলতা আমার সেই বয়সের নারীসত্তাকেও এক অদ্ভুত ধরনের অহংকার ও তৃপ্তি দিত। আমার মনে হতো— মধ্যবিত্ত ঘরের, শিক্ষিত সমাজের, একটা সতেরো বছরের ছেলে , আমার এই নগ্ন নারীত্বের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে একটু আশ্রয় চাইছে! আমার ৩৭ বছরের বয়স্কা শরীরকে ১৭ বছরের একটা ছোট ছেলেও এমন ভাবে আরতি করে, পুজো করছে, যা আমার স্বামী বা অন্য কোনো পুরুষ কোনোদিনও করেনি,ভাবেও নি। আমার মাতৃত্ব আর নারীত্বের সুপ্ত তৃষ্ণা সেদিনগুলো সব এক হয়ে যেতো।"
" কিন্তু তুমি... তুমি কি সত্যিই এতে শান্তি পেতে রত্নামাসি?" অরিন্দম ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।
"শান্তি?" রত্নাদেবী এক বিষাদময় মৃদু হাসলেন। "শান্তি শব্দটাই খুব ছোটরে বাপ্পা। তোর সেই কাঁচা আর দিশেহারা শৃঙার, তোর ব্যাকুলতা, তোর আঙুলের স্পর্শ, তোর ঠোঁটের চুমু গুলো আমার শরীরে, আমাকে এক অপরাধবোধে ভরা রোমাঞ্চ দিতরে বাপ্পা। কিন্তু সেই উত্তেজনার পরেই নেমে আসত ভয়াবহ এক আত্মগ্লানিও। তুই যখন তোর শরীরের তোর কামের ক্ষুধা মিটিয়ে, পকেট থেকে একশো বা দুশো টাকার কয়েকটা নোট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ি চলে যেতিস, তুই চলে যাওয়ার পর আমি চৌকির বিছানার ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। নিজেকে মনে হতো একটা আস্ত নর্দমার পাঁক।"
"তাহলে সেই টাকাটা কেন নিতে?" অরিন্দমের কণ্ঠ জড়িয়ে এল।
"ওটাই তো ছিল আমার মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার ঢাল, রে বাপ্পা!" রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা এবার একটু হেলান দিল। "অরূপ যখন স্কুলে যাওয়ার আগে বলত—'মা, টিফিনের পয়সা দাও', আমি তোর দেওয়া সেই টাকাটাই তার হাতে তুলে দিতাম। নিজেকে ধোঁকা দিয়ে বোঝাতাম—'রত্না, তুই তো নিজের শরীরের কামনার জন্য এই পাপ কাজ করছিস না! তুই বাপ্পার সঙ্গে শুচ্ছিস তোর ছেলের টিউসন ফি , স্কুলের ফি ,খাতার জন্য, নতুন জামা প্যান্ট কিনে দেবার জন্য আর সংসারের চাল কেনার জন্য!' ওই টাকা নেওয়াটা ছিল আমার নিজের পাপবোধ ও অপরাধবোধকে ঢেকে রাখার একটা মানসিক কাপড়। তুই ভেবেছিলিস আমি তোকে ব্ল্যাকমেইল করছি, আর আমি ভেবেছিলাম আমি আমার আত্মগ্লানিকে কেনাবেচা করে বেঁচে থাকার বাহানা খুঁজছি।"
অরিন্দম দু-হাতে মুখ গুঁজে দিলেন। জীবনের এতগুলো বছর পর আজ সত্যটা যেন এক মনস্তাত্ত্বিক আয়না হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়াল।
"আমরা দুজনেই দুজনকে ব্যবহার করছিলাম, বাপ্পা," রত্না দেবীর গলাটা এবার আরও রূপকময় শোনালো। "তুই খুঁজেছিলিস মাতৃত্বের ছায়ায় তোর পৌরুষের আর কামনার মুক্তি আমার শরীরে, আর আমি খুঁজেছিলাম এক অবহেলিত, অতৃপ্ত, অভাবী নারীত্বের চরম তৃপ্তি আর আমার সংসারের দারিদ্র্যের উপশম। কিন্তু এই লেনদেনে কোনো বিশুদ্ধ প্রেম ছিল না। ছিল স্রেফ দুটি অপরাধী আত্মার পারস্পরিক শোষণ।"
"আর সুন্দরবনের সেই রাতের কথা? মাঝনদীতে পৌঁছে নৌকার ওপর যা যা ঘটেছিল আমাদের মধ্যে... সেটাও কি শুধুই লেনদেনই ছিল?" অরিন্দমের কণ্ঠে স্মৃতির যন্ত্রণাদায়ক উন্মোচন।
রত্না দেবী চোখ বন্ধ করলেন। অন্ধকারের ভেতর যেন চার দশক আগের ম্যানগ্রোভের হাওয়া আর নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে এল।
" সেদিন কিন্তু তুইই একরকম জোর জবরদস্তি করে নিয়ে গেছিলি আমাকে। ভেবে দেখ,আমি কিন্তু কিছুতেই যেতে চায়নি। অনেক করে বুঝিয়েছিলাম তোকে । কেননা আমি তো জানতামই তুই কী কী করতে পারিস সেই রাতে আমাকে পেলে। সেদিন মাঝনদীতে, খোলা আকাশের চাঁদের আর তারাদের দেশের নিচে, যখন তুই আমাকে নৌকার পাটাতনে একরকম জোর করেই টেনে তুলেছিলিস, সেদিন চারপাশে কোনো কলোনি ছিল না, কোনো সমাজও ছিল না, কোনো অভাবও ছিল না। সেদিন আমার খুব ভয় করছিল জলে পড়ে যাওয়ার, কিন্তু একই সঙ্গে মনে হয়েছিল—নদী আর আকাশের এই অনন্ত বিস্তারে আমরা দুজনেই ভীষণ ভাবে একা, দুটি ভাসমান অস্তিত্ব যেনো। তিন তিন বার তুই করেছিলি আমাকে মনে পড়ে কী তোর,বিভিন্ন বিভিন্ন আসনে। সারাদিনের পথের ধকল সত্বেও আমি কিন্তু এতটুকুও বাধা দেই নি তোকে। যেমন ভাবে তুই চেয়েছিলি তেমন ভাবেই। তুইও সেই গভীর রাতে এতো পাগলামি আর আমাকে এতো এতো ভাবে আদর করেছিলি, আমার শরীরটাকে,সেরকম ভাবে খুউব কম পুরুষই কোনো নারীকে আদর করতে পারেরে। আমার ভেতরের নারীসত্তা ও চিৎকার করে করে উঠেছিল। আরও আরও চাইছিল তোকে। খোলা আকাশের নিচে, তুই যখন ক্লান্ত হয়ে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলিস, আমি তোর কপালে, তোর শরীরে , জমে থাকা ঘামটুকু আঁচল দিয়ে মুছে দিয়েছিলাম। সে রাতে নিজে থেকে ভালোবেসেছিলাম ঘুমন্ত তোকে । আমার মনে হয়েছিল, তুই আমারই আরও এক অবাধ্য সন্তান—যে মাতৃস্নেহ আর নারীদেহের আকর্ষণকে আলাদা করতে শেখেনি তখনও।"
অরিন্দম ডুকরে উঠলেন, "তাহলে কেন আমাকে আটকে রাখলে না তুমি ? যেতে দিলে বেনারস? "
" বোকা ছেলে। তোকে অরূপ আর অরূপের বাবার কাছে থেকে বাঁচানোর জন্যই তো আটকে রাখিনিরে বাপ্পা," রত্না দেবীর গলায় এক পরম মাতৃত্বের বিষাদ। "কিন্তু তুইতো দেখছি তবুও মুক্ত হতে পারিসনি আমার থেকে। তুই সোদপুরের এই রিফিউজি কলোনি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বড় বড় ডিগ্রি নিতে কাশী গেলি। বড় বড় কত পাশও দিলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলি, হাজার হাজার বই পড়লি, চন্দ্রিমা-রিয়া-মাধবীদের মতো নারীদের জীবনেও এলি। কিন্তু কোনো নারীই আর তোকে পূর্ণ করতে পারল না। কারণ প্রতিটা নারীর মাঝে তুই কেবল আমাকেই খুঁজেছিলিস—আমার চুলে মাখা নারকেল তেলের সোঁদা গন্ধ আর সেই সতেরো বছরের তোর বিকৃত মাতৃতৃষ্ণাকে! তুই কাউকেই ভালোবাসতে পারিসনি, তুই শুধু ভালোবেসেছিস তোর নিজের কামনার অহংকারকে।"
"রত্নামাসি..."
"কাঁদিস না বাপ্পা। তোর অস্তিত্বের গোড়াতেই যে বিষ ঢালা ছিল, আজ তুই কেবল তার পরিণতি ভোগ করছিস। মানুষ তার নিজের কাজের অতীত থেকে কোনোদিন পালাতে পারে নারে।"রত্না দেবীর ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে ঘরের গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। মোমবাতিটা শেষবারের মতো একবার কেঁপে উঠে এক লহমায় নিভে গেল। দেওয়ালে লেখা ১৯৭০ দশকের নকশাল আন্দোলনের স্লোগানগুলোর লাল কালি যেন অন্ধকারের ভেতর আবার নতুন করে জ্বলজ্বল করে উঠল। ঘরের মেঝেটাও সামান্য যেনো কেঁপে উঠল, আর মোমবাতিটা উল্টে পড়ে গিয়ে নিভে গেল।ঘোর অন্ধকার তখন ঘরে। বাইরে আবার একটা ট্রেনের কর্কশ শব্দ ধেয়ে এল—ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...।রেললাইনের কম্পনে 'অপরাজিতা'র পুরনো মেঝেটা শিউরে উঠল। অরিন্দম তারচশমাটা পকেটে রেখে দিলেন এবার। সোদপুরের এই অন্ধকার আর নিঃসঙ্গতা তাঁকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। এখানে কোনো লাইট, কোনো প্রশংসার মঞ্চ, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ নেই। পড়ে আছে কেবল ইতিহাস, অপরাধবোধ আর আত্ম-নির্বাসনের এক দীর্ঘ, নীরব পথ।
অরিন্দম একা শুয়ে রইলেন ঠান্ডা সিমেন্টের ওপর। জানলার কাচ দিয়ে আসা রাতের আর্দ্র বাতাস তাঁর মুখে এসে লাগছে। তিনি বুঝতে পারলেন, নক্সালদের রক্ত, তার বাবার রাজনীতির ব্যর্থতা, ভোম্বল এর খুন, আর গোসালার কলোনির সেই অন্ধকার ঘরের চটচটে পাপবোধ—সবটা মিলেই তৈরি হয়েছিল তাঁর অস্তিত্ব। আজ সেই অস্তিত্বের সব মুখোশ খসে পড়েছে। পড়ে আছে কেবল এক বৃদ্ধ, নিঃস্ব মানুষ—যে জীবনের শেষ স্টেশনে এসে নিজের ভাঙা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে।
অধ্যায় ৯: ছোট বেলার বন্ধু নীলয়ের ওষুধের দোকান ও সোদপুরে রাজনীতি।
সোদপুর স্টেশন রোডের সকালে ধুলো আর গাড়ি ও অটো রিকশার পেট্রোল ডিজেলের গন্ধের মধ্যে একটা অদ্ভুত রকমের ব্যস্ততা থাকে। তিন মাথার মোড়ে অটো চলাচলের একটানা ক্যাকোফোনি, চায়ের ট্রলির বাসনের ঠুং-ঠাং শব্দ, আর এক নম্বর বা তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে আসা কলকাতা থেকে ফিরে চাকুরিজীবী ভিড়ের ত্বরান্বিত পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে এক অস্থির তরঙ্গ। মোড়ের মাথায় বিশাল বিশাল ফ্লেক্স ঝুলছে; স্থানীয় ক্লাবের তরুণ নেতার হাসিমুখের ছবি, পাশে রক্তদান শিবিরের বিজ্ঞাপন আর নতুন সরকার সমর্থিত যুব সংগঠনের ব্যানার।
সেই ফ্লেক্সের ঠিক নিচেই 'দত্ত ফার্মেসি—হোলসেল ও রিটেল'। সেই ফার্মেসি তে কলকাতা থেকে আসা কয়েকজন ডাক্তারের নাম ডিগ্রি ও কবে কবে কটা থেকে রোগী দেখবেন তাদের নাম।
কাচের ক্যাবিনেটের ওপারে লম্বা কাঠের কাউন্টার। তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো অ্যান্টিবায়োটিক, কাশির সিরাপ আর ভিটামিনের কৌটো। ভেতরে তীব্র স্পিরিট, ডেটল আর স্যাঁতসেঁতে কার্ডবোর্ডের মেলামেশা গন্ধ।
অরিন্দম দোকানে ঢুকলেন। ডান হাতের চামড়ার ব্যাগ মেঝেতে নামিয়ে রাখতে গিয়ে কাটাকাটা শব্দ হলো।
কাউন্টারের ওপারে একটা উঁচু কাঠের টুলে বসে ছিল নীলয় দত্ত। চোখে তার মোটা ফ্রেমের চশমা, গলায় লাল সুতোয় ঝোলানো আতশ কাচ। সামনে খোলা একটা মোটা বিক্রির খাতা আর ক্যাশ বাক্সের ড্রয়ার। বয়স নীলয়েরও আটান্ন, কিন্তু মাথার সামনের চুলে ছাই রঙের ঝালর আর চওড়া পেটের ওপর টানটান সুতির শার্ট তাকে একধরনের নির্বিকার, আপসহীন মধ্যবিত্ত গৃহস্থের চেহারা দিয়েছে।
বহু বছর পরে অরিন্দমকে দেখে নীলয় কলমের নিবটা খাতার ওপর স্থির রাখল। কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ হলো না। বাইরে থেকে একটা ৮১বি নম্বর বাসের হর্নের বিকট আওয়াজ এসে কাচের ক্যাবিনেটে কাঁপন তুলে দিয়ে গেল।
নীলয় চশমাটা নাকের ডগা থেকে টেনে মাথার ওপর তুলল। "বস।তুই তো বাপ্পা মানে অরিন্দম।"
কাউন্টারের পাশে দুটো প্লাস্টিকের সবুজ চেয়ার রাখা। অরিন্দম ধীরপায়ে বসে পড়লেন। কাঠের প্যানেলে হেলান দিতেই মনে হলো, তাঁর শিরদাঁড়ার ভেতরের ক্লান্ত অস্থিগুলো যেন এতক্ষণে একটু থিতু হওয়ার জায়গা পেল।
"হুম আর তুই নিলয়। প্রায় চল্লিশ বছর পরে। "
"চায়ের কথা বলব?" নীলয় খাতাটা বন্ধ না করেই শুধোল।
"না। এখন থাক।" অরিন্দম পকেট থেকে কোটের চেইনটা একটু হালকা করে দিলেন। "একটা প্রেসারের ওষুধ দরকার ছিল, নীলয়। মাথায় ডানদিকের রগটা সকাল থেকে কেমন টিপটিপ করছে।"
নীলয় উত্তর দিল না। সে টুল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে ওষুধের তাকের দিকে হাত বাড়াল। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল অরিন্দমের দিকে। "কতদিন ধরে খাচ্ছিস প্রেসারের ওষুধ?"
"নিয়মিত খাওয়া তো আর হয় না। কলকাতায় রিভিউ মিটিং বা ক্লাসের খুব চাপ থাকলে আমলোডিপিন পাঁচ মিলিগ্রাম খেতাম। কয়েকমাস হলো সে সব বন্ধ।"
নীলয় ড্রয়ার টেনে একটা ডিজিটাল স্ফিগমোম্যানোমিটার আর কফ বের করে আনল। "হাতটা বাড়া।"
অরিন্দম জামার হাতাটা কনুই পর্যন্ত গোটালেন। নীলয় অভ্যস্ত হাতে তাঁর বাইসেপসে কালো কাপড়ের প্যাডটা পেঁচিয়ে ভেলক্রোটা চেপে দিল। পাম্পের মেশিনটা মৃদু ভোঁ-ভোঁ শব্দে বাতাস ভরতে শুরু করল। কাপড়ের চাপ বাড়ছে অরিন্দমের হাতে। পারদের মিটারের জায়গায় ডিজিটাল সংখ্যাগুলো লাফিয়ে উঠছে—১২০, ১৩০, ১৪৫, ১৬০, ১৭২...
পাম্পের চাপটা কমতে শুরু করার সাথে সাথে নীলয় অরিন্দমের মুখের রেখাগুলো দেখছিল। চশমা ছাড়া অরিন্দমের চোখের নিচে কালি পড়েছে, গালের চামড়া সামান্য হলেও খানিকটা ঝুলে পড়েছে, গলার চামড়ায় বয়সের ছোট ছোট বলিরেখা।
মেশিনটা বি পিত শব্দ করে থামল। ১৫২/১০০।
নীলয় ভেলক্রোটা খুলে এক ঝটকায় আলাদা করল। "রক্তের ধাক্কায় ভেতরের নালীগুলো ছিঁড়ে যাবে তো বাপ্পা। তোদের মতো পণ্ডিতাভিমানী মানুষের সমস্যা এটাই—ভাবিস শরীরটাও নাকি কোনো শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডি, যা কেবল কবিতার উপমায় বাঁচে। শরীরটা স্রেফ পচে যাওয়া মাংসের দলা, সময়মত নুন না দিলে পচেই যায়।"
নীলয় তাক থেকে টেলমিসারটেইন ৪০ এর একটা স্ট্রিপ টেনে নিয়ে চারটে পাতা কেটে অরিন্দমের সামনে টেবিলে রাখল। "টেলমিসার্টান ৪০। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে একটা করে খাবি রোজ। বাদ দিবি না একদিনও। আর শোন, এখন থেকে পাতে নুন খাওয়া একদম বন্ধ করে দে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মাঝবয়সী লোক দোকানে ঢুকল। পরনে ইস্ত্রি করা শার্ট, হাতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। লোকটির চোখ নীলয়ের কাছ থেকে সরিয়ে সোজা অরিন্দমের মুখে এসে থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের এক হিমশীতল নীরবতা। লোকটির চোখের তারায় কোনো বিস্ময় ছিল না, ছিল এক ধরণের তীব্র সামাজিক কৌতূহল—যেন জাদুঘরের কোনো দুষ্প্রাপ্য, চিহ্নিত অপরাধীকে সামনাসামনি দেখার অমার্জিত আনন্দ।
"নীলয়দা, আমার প্রেসক্রিপশনের বাসুজেন ইনসুলিনটা দাও তো," লোকটির স্বর কিছুটা উচ্চকিত, যেন সে নিজের উপস্থিতি আর অরিন্দমের অবস্থানকে একই তলে মাপতে চাইছে।
নীলয় ঠাণ্ডা চোখে লোকটির দিকে চাইল। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ভেতরের ফ্রিজ থেকে ইনসুলিনের ভায়াল বের করে আনল। কাগজের প্যাকেটে মুড়ে টেবিলে রাখল। "চারশো কুড়ি টাকা, ব্যানার্জি বাবু।"
টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে লোকটা যাবার সময় আর একবার অরিন্দমের পকেটে থাকা কালো রোদচশমা আর জুতোজোড়ার দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর বাইরে এসে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলতে লাগল। তিনজনের মুখই ঘুরে গেল ফার্মেসির কাচের প্যানেলের দিকে।
অরিন্দম জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। প্রতিবিম্বের ওপারে তিনজোড়া চোখ যেন কোনো অদৃশ্য জল্লাদের মতো তাঁর শরীরটাকে ব্যবচ্ছেদ করছে।
নীলয় টাকাটা ক্যাশ বাক্সে রাখল। কাঠের কাউন্টারে হাতের তালু দুটো চেপে অরিন্দমের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এল।
"এখানে তুই 'প্রফেসর অরিন্দম মুখার্জী' নোস বাপ্পা," নীলয়ের স্বরে কোনো বন্ধুত্বের প্রলেপ ছিল না, ছিল এক নির্মম, উপশহরীয় বাস্তবতার কঙ্কাল। "পত্রিকার খবরের দৌলতে সবাই জানে কলকাতায় তুই কী করে এসেছিস। সাবধানে থাকিস, ক্লাব আর প্রমোটারদের নজর রয়েছে তোদের অপরাজিতা বাড়ির ওপরেও।"
অরিন্দম ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্রেসারের ওষুধের স্ট্রিপটা পকেটে পুরলেন। তাঁর গলায় কোনো উত্তেজনা দেখা গেল না, কিন্তু চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।
"মানুষের নজরকে আমি ভয় পাই নারে নীলয়, ভয় পাই তাদের করুণাকে।"
নীলয় একটা সংক্ষিপ্ত, তিক্ত শব্দ করল ঠোঁট দিয়ে। "করুণা? তুই ভাবছিস এই সোদপুরের কলোনির লোক তোকে করুণা করবে? বাপ্পা, তুই এখনও তোর সেই প্রেসিডেন্সি আর যাদবপুরের সেমিনারের ঘোর থেকে বেরোতে পারিসনি। এরা তোকে করুণা করবে না, এরা তোকে চিবিয়ে খাবে। কেন জানিস? কারণ তুই এতদিন এদের ওপরে ছিলিস। তুই ছিলিস সেই বুদ্ধিজীবী, যার নাম খবরের কাগজে উঠত, যার মেয়েরা তোকে ঘিরে থাকত। আজ যখন তুই ড্রেনে পড়েছিস, তখন এই মধ্যবিত্ত সমাজ তোকে করুণা করে নিজের নীচতাকে খাটো করবে কেন? এরা তোর মাংস খাবে।"
অরিন্দম জানলার বাইরে তাকালেন। ট্রেনের একটা হুইসেল ভেসে আসছে স্টেশন থেকে। একদল তরুণ পোস্টার লাগাচ্ছে দেওয়ালের গায়ে—'দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতার বিরুদ্ধে যুব সমাজের ধিক্কার'।
"সুমিত ঘোষ তোদের ক্লাবের এখন সর্বেসর্বা, তাই না?" অরিন্দম শুধোলেন।
"শুধু ক্লাবের নয়," নীলয় হাতের কলমটা দিয়ে টেবিলে ঠুকতে ঠুকতে বলল, "সুমিত এখন স্থানীয় কর্পোরেট ডেভেলপমেন্ট আর পৌরসভার মাঝামাঝি সেতু। এলাকা পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে কোন বাড়ি প্রমোটিংয়ে যাবে—সব সিদ্ধান্ত ওই অফিসে বসে হয়। 'অপরাজিতা'র পাঁচ কাঠা জমি আর রাজবাড়ি মার্কা পুরানো বাড়িটা ওদের চোখে একটা সোনার খনি। এতদিন তোর বাবা নিখিল মুখোপাধ্যায়ের সত্তর সালের নামটার একটা আলগা সম্মান ছিল। এখন তুই এসে ওদের কাজটা সহজ করে দিলি।"
"সহজ করে দিলাম মানে?"
"একটি চরিত্রহীন, বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপকের দখল করা পুরোনো ভিটে!" নীলয় একফোটা দ্বিধা না রেখে বলল। "পাড়ায় যদি হাওয়া ওঠে যে ওই বাড়িতে একসময় নানা অসামাজিক কাজ হতো, তাহলে ওই বাড়ি দখল করতে সুমিৎদের কোনো আইনি ঝামেলার মধ্যে যেতে হবে না। পাবলিক প্রেশার তৈরি করবে। লোকে নিজেই বলবে—'এরকম লোকের বাড়ি পাড়ায় রাখা মানে পরিবেশ নষ্ট হওয়া'। পেনপটিকন বুঝিস তো? তোদের কেতাবের ভাষা? এখন এই পুরো স্টেশন রোডটা একটা জেলখানা, আর তুই মাঝখানের খাঁচায়।"
অরিন্দম নিজের কালচে চশমাটা পকেট থেকে বের করে চোখে পরলেন। অন্ধকার কাচের আড়ালে তাঁর চোখ দুটি ঢেকে গেল।
"আমি কোনো অন্যায় করিনি নীলয়, যা করেছি তা আমার ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত। সমাজের কাছে আমি কোনো কৈফিয়ত লিখিনি, দেবও না।"
"তোর এই অহংকারটাই তোর লাশটাকে আরও পচাবে, অরিন," নীলয় গলার স্বর আরও নামিয়ে আনল। "তুই কায়দা করে বলবি 'ব্যক্তিগত জীবন'। কিন্তু সমাজ তোর ব্যক্তিগত জীবনের দরজা ভাঙতে ভালোবাসে। রিয়া সেন নামের মেয়েটার বাবা যদি এখানে কেস ঠোকে, কিংবা সোদপুরের স্থানীয় ছেলেরা যদি রাতের বেলা তোদের বারান্দায় ইট মারে, তখন তুই কোন বায়রন, বেলেদোয়ার বা জীবনানন্দ তুলে ধরে নিজেকে বাঁচাবি?"
ঠিক তখনই আবার এক তরুণ এসে কাউন্টারে দাঁড়াল। তার গায়ে চাপা জিন্সের শার্ট, গলায় মোটা রূপোর চেন। সুমিৎ ঘোষের অনুগামী।তার নাম বাবলু। সে সরাসরি অরিন্দমের দিকে না তাকিয়ে নীলয়ের দিকে চাইল।
"নীলয়দা, ক্লাবের জন্য পনেরোটা স্যাভলন আর তুলোর বান্ডিল দাও তো। ওই কলোনির মোড়ে যারা নতুন আবাসন বানাচ্ছে, ওদের প্রমোটরবাবু দিয়েছে পাঠাল।"
নীলয় নিঃশব্দে তুলো আর স্যাভলন বের করে দিল। বাবলু টাকা মিটিয়ে দেওয়ার সময় আড়চোখে অরিন্দমকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, তাচ্ছিল্যের হাসি।
"প্রফেসরবাবু না?" বাবলু হঠাৎ সরাসরি অরিন্দমের দিকে ফিরে বলল। " তা সোদপুরে কতদিন আছেন? শুনেছিলাম টিভিতে আপনার নাকি বেশ নামডাক হয়েছে?"
অরিন্দম উঠলেন। চামড়ার ব্যাগটার হাতলটা ডান হাতে চেপে ধরলেন। বাবলুর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি নীলয়ের দিকে তাকালেন। "ওষুধের দামটা কত হলোরে?"
"রাখ। পরে হবে।" নীলয়ও রুক্ষভাবে বলল।
"না। ধার আমি কারও কাছে রাখি না নিলয়।" অরিন্দম পকেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে কাউন্টারে রাখলেন।
নীলয় নোটদুটো দেখল, কিন্তু হাত দিল না। " তোর মেয়ে মেঘলার খবর কী? সে তো এখন নয়ডায় একা থাকে তাই না?"
অরিন্দমের পা দুটো মুহূর্তের জন্য দরজার কাছে থমকে গেল। তিনি পেছনে না ফিরেই বললেন, "সে তার মতো আছেরে।"
"তাকে আর এখানে আসতে বলিস না," নীলয় পেছন থেকে ভারী গলায় বলল। "এই সোদপুর আর আগের সেই সোদপুর নেই বাপ্পা। এখানে এখন সব শকুনের পাল উড়ছে। সোদ পুর এখন ইট বালি সিমেন্টের ভাগাড় । এখানে এখন প্রোমোটার দের রাজত্ব চলছে। বড় বড় দশ তলা বার তলা বিল্ডিং , মল, সুপার মার্কেট , ইওনক্স আর জেন জিদের ভিড় বাড়ছে। আমাদের সময়ের লোক জন সব চলে গেছে বা যাচ্ছে। অরিজিনাল লোকজন প্রোমোটার দের হাতে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
তোর পতন দেখতে আসা লোকগুলোর চোখে ক্ষুধা আছে। সাবধানে থাকিস কিন্তু ভাই।"
অরিন্দম ফার্মেসির কাচের দরজা ঠেলে বাইরে এলেন।
সকালের রোদটা এখন যেনো আরও প্রখর, ধুলোয় ভরা ধূসর আলো ছড়িয়ে পড়েছে স্টেশন রোডের ওপর। ফুটপাতের সব কটা মুখ—সবজি বিক্রেতা, অটোচালক, খবরের কাগজের হকার—যেন এক অজানা সুতোয় বাঁধা পড়ে তাঁর দিকে ঘুরে গেল। প্রত্যেকেই জানে। প্রত্যেকেই তাঁর পতনের প্রতিটি খুঁটিনাটি খবরের কাগজের পাতা থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে হজম করেছে।
অরিন্দম চশমার আড়ালে চোখ দুটো বুজলেন। চারপাশের এই নীরব, অদৃশ্য নজরদারি তাঁকে ঘিরে ধরেছে এক নিরেট দেওয়ালের মতো। তিনি হাঁটতে শুরু করলেন সোদপুরের পূর্বপল্লি যাওয়ার রোডের দিকে, যেখানে তার পিতৃপুরুষের জীর্ণ 'অপরাজিতা' দাঁড়িয়ে আছে নিজের নিঃসঙ্গ ক্ষয়ের অপেক্ষা নিয়ে।
অধ্যায় ১০: শেফালি দে ও জমি দখলের ছায়া
'অপরাজিতা'র সীমানা প্রাচীর ঘেঁষেই একতলা বাড়িটা। প্রায় শত বর্ষের কাছাকাছি বয়স বাড়িটার । নোনা ধরা লাল ইট, চুনকাম খসে পড়া দেওয়াল, আর ছাদের কার্নিশ থেকে নেমে আসা অশ্বত্থের শিকড় বাড়িটার জীর্ণ কঙ্কালটাকে যেন কোনোমতে ধরে রেখেছে। ঠিক তার পাশেই একটা জি প্লাস পাঁচতলা নতুন আবাসনের নির্মাণকাজ চলছে—সেখান থেকে একটানা ভাইব্রেটর আর পাইলিংয়ের ভারী ধুপধাপ শব্দ ভেসে আসছে। পুরো গলিটা ঢেকে গেছে উড়ন্ত সিমেন্টের মিহি ধূসর আস্তরণে।
অরিন্দম জং-ধরা সরু লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। উঠোনের এক কোণে আধভাঙা একটা টিউবওয়েল, তার চারপাশে সবুজ শ্যাওলার পুরু আস্তরণ।
বারান্দায় একটি জীর্ণ কাঠের ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন শেফালি দে। পঁচাশি পেরোনো প্রবীণ শরীর, ধবধবে সাদা সুতির শাড়ি জড়ানো। চোখের সামনে ঝুঁকে থাকা মোটা কাচের চশমা, আর হাতে একটা প্রাচীন পিত্তলের যাঁতি। সুপারি কাটার কুচ-কুচ শব্দটা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হলো।
অরিন্দমের পায়ের শব্দে বৃদ্ধা শেফালী দে চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে ধরলেন। ঘোলাটে ছানির আড়ালে চেনা অবয়বটা ফুটিয়ে তোলার এক ব্যাকুল চেষ্টা করলেন।
"কে? বাপ্পা? নাকি? " শেফালি পিসির গলার স্বরটা শুকনো, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতাও রয়েছে।
অরিন্দম বারান্দার সিমেন্টের সিঁড়িতে পা রাখলেন। "হ্যাঁ পিসি। আমি।"
শেফালি দে যাঁতিটা পাশে রাখা কাঠের জলচৌকির ওপর রাখলেন। চামড়া ঝুলে পড়া হাত দুটো উরুর ওপর রেখে একটু সোজা হয়ে বসলেন।
"শুনলাম নাকি কদিন আগে ফিরে এসেছিস? তা এতদিনে মনে পড়ল বুড়িটাকে? " শেফালি পিসির স্বরে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল এক শতাব্দীর সমস্ত প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের মতো নিরাসক্ত ক্লান্তি। "খবরের কাগজে তোকে নিয়ে খুব লেখালেখি হলো রে বাপ্পা দেখলাম। তোদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিচ্ছা, কলকাতার বড় বড় বাবুদের দরবারে তোকে নিয়ে কত হাঁকডাক... আমাদের এই গলির চায়ের দোকানে বসেও ছোকরাগুলো তোকে নিয়ে হাততালি দিল।- সবই কানে আসে"
অরিন্দম পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে রইলেন। "কাগজে যা লেখে, তার সবটা সত্যি হয় না পিসি।"
"সত্যি-মিথ্যে নিয়ে মাথা ঘামানোর বয়স আর আমার নেই রে," শেফালি পিসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের তারা দুটো সরিয়ে নিলেন পাশের আবাসন তৈরির দিকে। কড়কড় শব্দে মিক্সার মেশিনে পাথর আর সিমেন্ট মেশানো হচ্ছে। "আমি তো শুধু দেখছি—যে অশ্বত্থ গাছটা শুকিয়ে যাচ্ছে, তার ডালে কাক-শকুনের ভিড় একটু বেশিই জমে। তোর বাবা ভোলানাথ বেঁচে থাকলে আজ তোকে এই অবস্থায় দেখলে কী করতেন রে?"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিলেন না। বারান্দার খুঁটিতে হাত রাখলেন। কাঠের বার্নিশ উঠে গিয়ে খসখসে কাঠ বেরিয়ে এসেছে।
"কাল রাতে সোদপুর ক্লাবের উঠতি ছেলেরা এসেছিল," শেফালি পিসি আবার যাঁতিটা হাতে তুলে নিলেন। হাতের কাঁপুনি সামলে সুপারির আধখানা টুকরো কাটতে কাটতে বললেন, "সেই সুমিতের অনুগামী বাবলু আর তার সাথে আরও দুটো না তিনটে ছোকরা। মুখে হাসি, কিন্তু হাতে কাগজের তাড়া। বলে গেল—'পিসি, আশেপাশের সব জমি প্রমোটিংয়ে চলে গেছে। আপনি আর একা এই ভুতুড়ে বাড়িতে থেকে কী করবেন? সইটা করে দিন, একটা ফ্ল্যাট আর বেশ কিছু ক্যাশ টাকা পেয়ে যাবেন।' আমি না বলতেই গলার স্বর বদলে গেল। বুঝেছিস কিছু? "
"কী বলল ওরা?" অরিন্দমের গলায় এক ধরণের প্রচ্ছন্ন শীতলতা ফুটে উঠল।
"বলল, 'একলা বুড়ি মানুষ, হঠাৎ রাতে যদি ছাদের কড়ি ভেঙে মাথায় পড়ে, দেখারও কেউ থাকবে না। নর্দমার জলে যদি আমার পচা লাশ ভেসে ওঠে, পুলিশও খোঁজ নেবে না।' বুঝলি বাপ্পা?" শেফালি পিসির ঠোঁটে এক বিষাদময় হাসি ফুটে উঠল। "৭১ সালে রক্ত দিয়ে জমি বাঁচিয়েছিলাম অরিন্দম। তুই তখন ১৪-১৫! আর এখন পার্টি ক্যাডাররা এসে বলে জমি না দিলে আমাকে নাকি নর্দমায় ফেলে দেবে। কী দিন এলোরে? "
অরিন্দম ওঠানামার শব্দ শুনছিলেন দূর থেকে। স্টেশন রোডের হর্ন, পাইলিংয়ের ধাক্কা আর এই একা বৃদ্ধার দীর্ঘশ্বাস।
"রক্তের দাম এখন এখানে স্কোয়ার ফুটে মাপা হয় শেফালি পিসি, সোদপুর কলকাতা হচ্ছে যে। দুদিন পরে মেট্রো রেল যাবে এই সোদ পুরের ওপর দিয়ে। জমির দাম তো বাড়বেই পিসি" অরিন্দম খুব নিচু স্বরে বললেন। "একাত্তরের সেই কংগ্রেস নকশাল আন্দোলনের পুলিশের এনকাউন্টার, বন্ধুদের লাশ, সোদপুর স্টেশনের কাছের ওই বধ্যভূমি... সেসব এখন ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা। বর্তমান লোকজন শুধু চারপাশের এই সিমেন্টের খাঁচাগুলোকে বোঝে।"
"ইতিহাস?" শেফালি পিসি হাতটা থামিয়ে অরিন্দমের দিকে ঘোলাটে চোখ চাইলেন। "ইতিহাস তো তোদের মতো পণ্ডিতদের জন্য রে। আমাদের কাছে ইতিহাস মানে কিছু স্বজন হারানোর যন্ত্রণা, যা গলার কাছে কাঁটার মতো বিধে থাকে। তুই তো চলে গেলি কলকাতায়, অনেক পাশ দিলি, প্রফেশরও হলি। কিন্তু এই পাশের কলোনির পুরোনো খবরাখবর কিছু রাখতিস?"
অরিন্দমও ভুরু কুঁচকালেন। "কাদের কথা বলছ তুমি? কিসের খবর"
"তোর সেই ছোটবেলার খেলার আর স্কুলের সঙ্গী রে... অরূপ। রঙের মিস্ত্রি বিশ্বনাথের ছেলে।"
অরিন্দমের বুকটা ভেতর থেকে এক মুহূর্তের জন্য যেন হিম হয়ে গেল। রত্না দেবীর মোটা চেহারাটা, তাঁর সেই রঙিন সুতির শাড়ি আর টালির চালের ঘরের গন্ধটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তিনি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
"অরূপ? ও তো... ও তো ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়ছিল না? পরীক্ষা ও দিয়েছিল আমি যখন চলে যাই"
"পড়ছিল," শেফালি পিসি সদর্থক মাথা নাড়লেন। "পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স গ্র্যাজুয়েট করেছিল ছেলেটা ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে। খুব ভালো মাথা ছিল রে অঙ্কে। কিন্তু চাকরি পাবে কোথায়? কত জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছিল। তোদের মতো বড়ঘরের ছেলেদের তো সুপারিশ ছিল,কিন্তু অরূপের তো কেউ ছিল না। কয়েক বছর ধরে চাকরির পেছনে জুতো ক্ষয় করার পর, বন্ধন ব্যাংকের কয়েক লাখ টাকার লোন আর কিছু মহাজনের থেকে দেনা করে কি সব কেমিক্যালের ছোট একটা পাইকারি ব্যবসা নাকি শুরু করেছিল।"
"তারপর?" অরিন্দমের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছিল।
"ব্যবসাটা আর সামলাতে পারেনি," শেফালি পিসির স্বর আরও নিচু, আরও নির্দয় হয়ে এল। "কলোনিরই এক মেয়েকে বিয়েও করেছিল, দু দুটো ছোট ছোট ছেলেমেয়েও হয়েছিল। কিন্তু দেনার দায় দিনে দিনে পাহাড়ে গিয়ে ঠেকল। মহাজনের লোক এসে রোজ সন্ধ্যায় ওই টিনের চালার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের গালাগালি করত। অরূপ পাড়ায় আর মুখ দেখাতে পারত না। শেষমেশ একদিন..."
শেফালি পিসি থামলেন। বারান্দার ওপর দুটো চড়াই পাখি এসে বসল, পরক্ষণেই পাইলিংয়ের বিকট শব্দে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল।
"একদিন সকালে কলোনির মোড়ে শোরগোল উঠল," শেফালি পিসি বললেন। "সোদপুর ১ নম্বর রেলগেটের কাছে ডাউন শান্তিপুর লোকালটার সামনে গিয়ে নাকি দাঁড়িয়েছিল অরূপ। শরীরটা দু-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল লাইনের ওপর। একটা ছেঁড়া নীল প্যান্ট আর স্কলারশিপের পুরোনো খাতাটা ব্যাগে পড়েছিল শুধু।"
অরিন্দমের মাথার ভেতর যেন একটা ভারী রড এসে আঘাত করল। সোদপুরের রেললাইনের সেই বিকট শব্দ—ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...—যা প্রতি রাতে তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, তার ভেতরে যেন এক অদেখা বন্ধুর মাংস পেশির চূর্ণ হওয়ার শব্দ লুকিয়ে আছে।
"আর... আর রত্নামাসিমারা?" অরিন্দম কোনোমতে শব্দ দুটো উচ্চারণ করলেন।
"রত্নার কথা বলছিস?" শেফালি পিসি মুখটা অন্যদিকে ফেরালেন। " পেটের ছেলের ওই রক্তভেজা প্যান্টটা আঁকড়ে ধরে তিনদিন একফোঁটা জলও মুখে দেয়নি রে। বিশ্বনাথ তো আগেই মদ খেয়ে তার লিভার পচিয়ে মরেছিল। অরূপের মৃত্যুর চার পাঁচ বছরের মাথায় রত্নাও শেষ হয়ে গেল। সেই মেদবহুল শরীরটা শুকিয়ে একেবারে কাঠি হয়ে গিয়েছিল শেষের দিকে। একেই সুগার ধরেছিল , তার ওপরে হলো জন্ডিস আর তীব্র রক্তাল্পতা ছিলই। ওষুধ কেনার টাকাটুকুও ছিল না ওদের। ঘোলা হাসপাতালে এসে এসে দেখাতো। তোর কথাও জিজ্ঞেস করতো খুব। আমি তোর কোনো খবর রাখি কিনা? তোর ঠিকানা জানতাম না তো। "
অরিন্দম দুই হাতে বারান্দার খুঁটিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর কপালে ঘাম জমে উঠেছে। সতেরো বছর বয়সে যে বিবাহিতা নারীটির কাছ থেকে তিনি একশো টাকা বা দুশো টাকার বিনিময়ে অপরাধবোধ কিনেছিলেন, সেই টাকাটা তো এই অরূপেরই বই খাতা টিউশন ফি আর প্যান্ট কেনার জন্য জমা হতো! রত্না দেবী তো তাঁর কাছে শরীর বিক্রি করতেন না, বিক্রি করতেন নিজের অপরাধবোধ—সন্তানের ভবিষ্যৎ কেনার জন্য। পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স গ্র্যাজুয়েট হয়েও তীব্র বেকারত্ব। দেশে প্রতি বছর দুই কোটি করে নাকি চাকরী তৈরী করবে সরকার। কিন্তু সেই ১৯৮১ সাল থেকে বেকারত্ব তো বেড়েই চলেছে। বামফ্রন্ট এর আমলে তবুও কিছু কিছু লোক চাকরী পেতো এই রাজ্যে। ২০১৪ সালের পর থেকে এখন আর সরকারি, আধা সরকারি অফিসে কোনো নিয়োগ আর হয় না। সব নিয়োগ বন্ধ। কারখানা বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় গুলির সাধারণ স্ট্রিমের ডিগ্রি গুলোর কোনো দাম নেই চাকরির বাজারে আর যদি না পার্টি তে কয়েক লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। সেটা নিজেও টের পেয়েছিলেন কয়েক বছর ধরে,১৯৮৩ সালে বারাণসী থেকে phd করার পরে, কলকাতায় ফিরে এসে।
অরিন্দমের মনে হলো, তিনি যেন বহুকাল ধরে এক মৃত বন্ধুর রক্ত আর তার মায়ের আত্মগ্লানির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের পুরুষত্ব আর বুদ্ধিমত্তার অহংকারকে তৈরি করেছিলেন।
"মা-ছেলে-বাবা কেউ বাঁচেনি রে," শেফালি পিসি বলে চললেন, যেন নিজের মনেই কথা বলছেন। "অরূপের বৌটা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আছে, ওদের টিনের ঘরটা প্রমোটাররা সেই কবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে। সেখানে একটা দুই কামারার ফ্ল্যাটে তারা আছে। এখন তো সেইসব ফ্ল্যাট গুলোতে নতুন নতুন সবলোক , নতুন সব ভাড়াটে।…কেউই কাউকে চেনে না। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মরে গেলেও খোঁজ রাখে না কেউ পচা গন্ধ না ছড়ালে"
অরিন্দম ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নেমে এলেন। পা দুটি যেন সীসে দিয়ে বাঁধা।
"তুই কোথায় যাচ্ছিস বাপ্পা?" শেফালি পিসি পেছন থেকে ডাকলেন।
অরিন্দম পেছনে ফিরে তাকালেন না। তাঁর চোখের সামনে তখন উড়ন্ত সিমেন্টের ধুলো আর একাত্বরের পুরোনো সোদপুরের কলোনি একাকার হয়ে যাচ্ছে।
"পিসি," অরিন্দম বললেন, তাঁর গলায় কোনো আবেগ ছিল না, ছিল এক শ্মশান-শীতল শূন্যতা। "বাড়িটা পারলে ওদের দিয়ে দিও। স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার মতো মর্মান্তিক শাস্তি আর কিছু হয় না।"
"তুইও বুঝি দিয়ে দিবি তোদের 'অপরাজিতাকে?' দিয়ে দে তুই। আমি বেঁচে থাকতে দিতে পারবো না" শেফালি পিসির গলায় একটা তীব্র খোঁচা ছিল।
অরিন্দম কোনো উত্তর না দিয়ে গেট ঠেলে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।
বাইরে রোদটা তখন মধ্যগগনে। প্রোমোটার এর নতুন আবাসনের পাঁচতলায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন রাজমিস্ত্রি ইট গাঁথছে। আর ঠিক দূরে, স্টেশন রোড অতিক্রম করে একটা দীর্ঘ মালগাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে শহরের দিকে।
রেললাইনের সেই একই চেনা ধাতব গর্জন—
ঝক-ঝক... ঝক-ঝক...
অরিন্দম পকেটে হাত পুরে সোদপুরের সেই ধুলোভরা মেঠো গলি দিয়ে নিজেদের জীর্ণ, একাকী 'অপরাজিতা'র দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, অতীতের প্রতিটি লাশ আজ সোদপুরের ইট-কাঠ-সিমেন্ট আর লিফটের নিচে চাপা পড়ে আছে, আর তিনি হেঁটে চলেছেন এক জীবন্ত কবরস্থানের মধ্য দিয়ে।
ক্রমশ .. অধ্যায় ১১-৪৩
