মনের অন্তরালে
মনের অন্তরালে
সকালবেলা নিজের ঘরের টেবিলে বসে অতীতের কথা ভাবছিলাম। নিজের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লড়াই করেছি। লড়াই করে জিতে নিজের কোম্পানি খুলেছি, নিজেকে মালিকের চেয়ারে বসিয়েছি। কোম্পানির মাধ্যমে কত মানুষের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি!
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।
মা আমার ঘরে ঢুকে এসেছে, কখন এসেছে তা আমি টেরও পাইনি। মা আমাকে জিজ্ঞাসা করল,
— “কী রে, এত কী ভাবছিস?”
— “না মা, তেমন কিছু না। অফিসের কাজ নিয়ে ভাবছিলাম।”
মা হাসিমুখে বলল,
— “দার্জিলিং থেকে তোর মাসি চিঠি পাঠিয়েছে। সহেলির গ্রীষ্মের ছুটি পড়েছে, তোকে ওখানে যেতে বলেছে।”
মা কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
— “কাল-পরশু করে তুই ঘুরে আয়। আমিও মামার বাড়ি ঘুরে আসি, অনেক দিন যাওয়া হয়নি।”
আমি শুধু বললাম,
— “ঠিক আছে, কাল যাব। তুমি চিঠি লিখে দাও।”
বেলা এগারোটার সময় অফিসে গেলাম নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে। আমি যখন কাজ করছিলাম, তখন সুজন আমার কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
— “কী ম্যাডাম, কোথায় যাবেন? এত গুছাচ্ছেন কেন?”
— “মাসির বাড়ি দার্জিলিং যাব কাল। এক সপ্তাহের জন্য। তুমি এই দিকটা দেখে রেখো, আমি এক সপ্তাহ পর ফিরে আসব।”
আমি একটু থেমেই বললাম,
— “আমি তোমাকে ‘ম্যাডাম’ বলতে বারণ করেছি না? বস আর অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়ার আগে আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই একই স্কুলে পড়েছি, একসঙ্গে থেকে বড় হয়েছি।”
— “ঠিক আছে, স্মৃতি। ঘুরে এসো।”
বাড়ি ফিরে এসে জামাকাপড় গুছিয়ে পরের দিন ভোরে বেরিয়ে পড়লাম। মেল ট্রেনে করে এনজিপি (নিউ জলপাইগুড়ি) পৌঁছে সেখান থেকে দার্জিলিং গেলাম।
স্টেশনে সহেলি দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল।
স্টেশন থেকে ট্যাক্সি করে মাসির বাড়ি পৌঁছালাম। আমার পঁচিশ বছর বয়সে এই প্রথমবার মাসির বাড়ি এলাম। আগে মাসি কলকাতায় থাকত, ওখানেই যেতাম। সহেলি হওয়ার পর ওরা এখানে চলে আসে। মা তিন-চার বার এসেছে, কিন্তু আমি এই প্রথম।
আমাকে দেখে মাসি তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল। আমি মাসি ও মেসোকে প্রণাম করলাম। দু-একটা কথা বলে হাত-মুখ ধুতে গেলাম। খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিলাম। আজ আর কোথাও ঘুরতে গেলাম না।
বিকেলের দিকে বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সহেলির সঙ্গে আড্ডা জমল। পুরনো দিনের কথা উঠতেই আমার মনটা কেমন যেন হু হু করে উঠল।
সহেলিকে বললাম,
— “জানিস, সেই স্কুলবেলা থেকেই একটা ছেলেকে আমি খুব ভালোবাসতাম। ছেলেটার নাম সাহেত।”
আমি একটু থেমে আবার বললাম,
— “আমি তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। সেবার দুর্গাপূজার সময় ওকে প্রথম অন্যভাবে দেখেছিলাম। ঢাকের আওয়াজ আর পুজোর আলোর মাঝেই প্রথমবার মনটা কেমন যেন করে উঠেছিল। সেই দিন থেকেই হঠাৎ করে ওকে ভালোবাসতে শুরু করলাম।”
সহেলি বলল,
— “সাহেত কি সূর্য? মেসোর বন্ধুর ছেলে?”
আমি শুধু বললাম,
— “হ্যাঁ।”
আমি পড়তে যেতাম, স্কুলে যেতাম, ওকে দেখতাম। ও দোকানে থাকত, না হলে মাঠে ক্রিকেট খেলত। আমি কত রকম করে সাহেতকে বোঝাতে চেয়েছি, ও বুঝতে পারেনি। হয়তো বুঝতে চায়নি।
সাহেতের বন্ধুরা জানত আমি ওকে পছন্দ করি। আমি কোনো দিন সাহেতকে পাইনি। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি, তবুও পাইনি।
আমি একটু থেমেই বললাম,
— “সাহেতকে অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। দেখলে রাগ হতো, কিন্তু কোনো দিন ওকে কিছু বলতে পারিনি। ভালোবাসা আর বন্ধুত্ব জোর করে হয় না, তাই কোনো দিন জোর করিনি। নীরব দর্শকের মতো দূর থেকে দেখেছি, আর ভালোবেসেছি।”
আমি সহেলির দিকে তাকিয়ে বললাম,
— “জানিস তো, সকলের তো সবকিছু থাকে না। আমি সবকিছু পেয়েছি, শুধু সাহেতকে ছাড়া।”
সহেলি জিজ্ঞাসা করল,
— “তারপর?”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “তারপর বড় হলাম, নিজের কোম্পানি খুললাম। কোম্পানির নাম রাখলাম ‘সাহেত’। অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম ও ছোটদের জন্য পার্ক তৈরি করলাম, নাম রাখলাম ‘সাহেত’। সাহেতের নামে গরিব ও ভিক্ষুকদের খাবার দেওয়ার সংস্থাও খুললাম।”
এইভাবেই একটা একটা করে বছর কেটে যাচ্ছে।
সহেলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— “তাই ঠিক করেছিস, সাহেতকে না পেলে বিয়ে করবি না?”
কথাগুলো শুনে আমি শুধু হাসলাম।
সহেলি আমার হাত ধরে বলল,
— “দিদি, রাত যতই অন্ধকার হোক, যতই কঠিন হোক, প্রভাত ততই উজ্জ্বল হয়, ততই সহজ হয়। চারদিক যতই অন্ধকার হোক, কাউকে চিরদিন আটকানো যায় না। ভোর হবেই। তুই একদিন তোর জীবনের আসল আলো খুঁজে পাবি।”
আমি ওর দুটো হাত ধরে বললাম,
— “তুই ঠিক বলছিস?”
সহেলি মৃদু হেসে বলল,
— “হ্যাঁ, বলছি। একদিন ভোর হবেই। জীবনে নতুন আলো ফুটবেই।”
— সমাপ্ত —

