STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Thriller

4  

Nityananda Banerjee

Thriller

কাপালিক সাত ভাগ

কাপালিক সাত ভাগ

6 mins
239

সিরজাম স্টেশনটির এখন একটু উন্নতি হয়েছে। প্লাটফর্ম চেঞ্জের জন্য একটি ফুটব্রীজ রেলকর্তারা করে দিয়েছেন। তবু দুর্ঘটনা পিছু ছাড়ে না। এই সেদিন দুলি মেঝান লাইন পেরোতে গিয়ে চাপা পড়ল । এক্কেবারে যা তা দৃশ্য। বডি দু'টুকরো। কোমর থেকে উপর নীচে। মাথা ফেটে চৌচির। রেললাইন বরাবর ঘিলুটা কেমন লেপ্টে লেগে গেছে। নিকটবর্তী শ্মশান ছেড়ে শকুনের দল ভীড় জমিয়েছে স্টেশনে। ভয়ে কেউ ট্রেন ধরতে আসছে না । স্টেশন মাস্টার শহরের লোক। কপাল গুনে এই অজ গেঁয়ো স্টেশনে পোস্টিং পেয়েছেন। শেষ ট্রেনে বাড়ি ফেরার কথা। তিনিও দরজা বন্ধ করে বসে আছেন।

তারানাথের নজর এড়ায়নি ব্যাপারটা। আসলে তাঁর দিব্যদৃষ্টি বড়ই সজাগ। তড়িঘড়ি স্টেশন চত্বরে এসে দাঁড়ালেন। টিকিট কাউন্টারে মুখ নামিয়ে ডাকলেন - কই হে মাস্টার ? কোথায় গেলে ? একখান আদ্রা যাবার টিকিট দাও তো দেখি !

স্টেশন মাস্টার কাম বুকিং ক্লার্ক শহুরে ভদ্রলোক । এত রাতে আদ্রা যাবেন কে? কৌতূহলী হয়ে চার ইঞ্চির ফাঁক দিয়ে দেখলেন একজন কাপালিক। শুনেছেন তাঁর কথা। চোখের দেখা দেখেন নি কোনদিন। এত রাত্রে কাপালিককে দেখে আরও ভয় পেলেন। কেমন যেন ভুতুড়ে ভুতুড়ে পরিবেশ। লাইন ঘিরে শকুন, কাউন্টারে কাপালিক ! নাহ্ আজ আর রক্ষে নেই !

একটা থার্ড ক্লাশের টিকিট পাঞ্চ করে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন- ৮০ পয়সা দিন।

তারানাথ একটাকার একটি নোট এগিয়ে দিলেন। স্টেশন মাস্টার নোটটায় হাত দিয়েছেন কি দেন নি একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলেন। হিমশীতল নোট, আর কাপালিকের নির্লিপ্ত দৃষ্টি তাঁকে গভীর ঘোরে আচ্ছন্ন করল। কাপালিক বললেন - কি হে ফেরতটা দাও !

গলাটা তো তেনাদের মতই লাগছে ! একটা গোল বিশ পয়সার কয়েন এগিয়ে দিতেই কাপালিকের হাতের ছোঁয়া পেলেন । কেমন যেন কাঠ কাঠ ঠেকল আর তেমনই ঠাণ্ডা । স্টেশন মাস্টার ভিরমি খান আর কি ! কাপালিক বললেন - নাও বাপু, গাড়ি ঢুকছে। এবার আপিস বন্ধ করে এস। বাড়ি ফিরবে তো! না কি দুলির মত........

এবার যেন সত্যিই জ্ঞান হারাবার জোগাড়। কোনমতে সামলে নিয়ে বললেন - আমার আজ নাইট ডিউটি আছে। আপনি যান।

- সে কি হে ! তোমার জন্যই তো শ্মশান ছেড়ে আসছি। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব বলে। আর এখন বলছ কি না নাইট ডিউটি আছে ! মজা ছাড়ো বাপু! চলে এস। তোমার ছেলের খুব বাড়াবাড়ি। আমাকে নিয়ে চল, সারিয়ে তুলি 'খন ।

স্টেশন মাস্টার অবাক। তিনি নিজে জানেন না , আর উনি জেনে গেলেন ! নির্ঘাৎ আজ ভুতে পেয়েছে । আর ছেলের কিছু হলে তো অফিস থেকে ফোন আসত!

স্টেশন মাস্টারের উৎকন্ঠা বেড়ে চলল। বললেন - আপনি জানলেন কি করে?

- জানব না ? আমি যে যোগী, ভুত ভবিষ্যৎ সব বলে দিতে পারি। আচ্ছা বল তো, তুমি বাড়ি যেতে চাইছ না কেন ? তোমার কি ভয় করছে ? কোন ভয় নেই, চলে এস, আমি সব ঠিক করে দেব। শেষ ট্রেনটা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। এক মিনিটের স্টপেজ। না গেলে ভীষণ বিপদ । স্টেশন মাস্টার তড়িঘড়ি অফিসে তালা মেরে দারোয়ানের হাতে চাবি দিয়ে ট্রেনে উঠলেন। কাপালিককে আর দেখা গেল না। কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বসে পড়লেন । তারপর চোখ দুটো বন্ধ করে বাড়ির কথা,ছেলের কথা ভাবতে লাগলেন ।

তারানাথ একটু হেসে বললেন - কি হে মাস্টার ! এখন কেমন মনে হচ্ছে ?

আঁতকে উঠলেন মাস্টার সাহেব। এই কাপালিক তো তাঁর পিছু নিয়েছেন।

- আ---প---নি--- !

কাঁপা কাঁপা গলাম বললেন।

- হাঁ গো আমি! এ তুমি কেমন মাস্টার গো ! বলি লেখাপড়া জান তো! এমন বোকা বোকা কথা বল না তুমি !

রাগ হয় স্টেশন মাস্টারের। খুব রাগ হয় । কিন্তু প্রাণের কথা ভেবে বেশি কিছু বলেন না। শুধু দু'হাত জোড় করে প্রণাম নিবেদন করেন। বলেন - আপনার পায়ে পড়ি! আপনি আমাকে স্বস্তি দিন!

- না না না ! এখুনি কি করে স্বস্তি দেই বল? বাড়িতে তোমার ছেলে খুব অসুস্থ। এ রোগ কোন ডাক্তার সারাতে পারবে না। আমাকে যেতেই হবে।

ট্রেন আদ্রায় এসে থামল। স্টেশন মাস্টার নেমে পড়লেন। কিন্তু কাপালিক নামলেন না। ভদ্রলোক পরম নিশ্চিন্তে বাড়ির পথ ধরলেন।

প্রায় দশ মিনিট পর বাড়িতে পৌছে দেখেন ছেলের জ্ঞান নেই, স্ত্রী কপালে জলের পট্টি দিচ্ছেন।

হাতের ব্যাগ না নামিয়েই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন - কি হয়েছে গো!

স্ত্রী বললেন - সন্ন্যাসী চলে গেছেন ?

- সন্ন্যাসী !

ঘাড় নেড়ে হাঁ সূচক উত্তর দিয়ে বললেন - ভাগ্যিস উনি কৃপা করলেন। নইলে এ যাত্রা ....

স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বললেন । আর শুনলেন ঐ তান্ত্রিক এক দুলি মেঝান নামের বুড়িকে মেরে আমার ছেলের প্রাণ দিয়েছেন।

স্টেশন মাস্টার হতচকিত হয়ে ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করলেন। ছেলে উঠে বসল। বাবা-মা দু'জনেই ছেলেকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। তারপর দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে কাপালিকের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন ।

ছেলে বলল - মা জানো তো আগের দিন আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা সবাই এক শ্মশানে মা কালীর পূজো দিতে যাচ্ছি । আমি হঠাৎই ট্রেন থেকে পড়ে গেলাম।

মা ছেলের মুখে হাত চেপে বললেন - এখন শুয়ে পড়। রাত হয়েছে। আমরা একদিন যাব পূজো দিতে।

অকস্মাৎ দরজায় ধাক্কা দেবার আওয়াজ শুনে স্টেশন মাস্টার দরজার দিকে চেয়ে দেখলেন কাপালিক তাঁদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ওনাকে ফিরিয়ে আনতে স্টেশনমাস্টার অনেকটা পথ যেয়েও তাঁকে ধরতে পারলেন না। শেষ পর্য্যন্ত কাল সকালেই সকলে মিলে ঐ শ্মশানকালীর মন্দিরে যাওয়া মনস্থ করলেন।

********************************************

পরদিন ভোর না হতেই প্রথম ট্রেনটি ধরে তাঁরা সিরজাম স্টেশনে নামলেন। ঘটনাচক্রে ঐ দিনটি ছিল শনিবার এবং মাস্টারের বিশ্রামের দিন। তাঁরা ট্রেন থেকে নেমে দেখলেন স্টেশন চত্বর জমজমাট, লোকে লোকারণ্য। আর গতকালের একটাও শকুন বা এক্সিডেন্টের কোন চিহ্নই নেই। নিজের গায়ে চিমটি কেটে পরখ করে নিলেন নিজেকে। তারপর ধাতস্থ হয়ে রওনা দিলেন গন্তব্যে।

তারানাথ বটগাছের তলায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তিন আগন্তুককে আসতে দেখে গুহার ভেতর চলে গেলেন। স্টেশনমাস্টার সপরিবারে গুহার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে চতুর্দিক পর্য্যবেক্ষণ করছিলেন। বটের চাতালে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ডাঙরা নদী, তার পাড় বরাবর পাথরের চাঁই,শ্যাওড়া জঙ্গল ছাড়া কোন কিছুই দেখতে পেলেন না। এমন সময় শকুনের পাল গাছে নড়ে উঠল। তাদের কোলাহল এবং বকগাছের ডাল পাতার কাঁপুনি দেখে তিনজনই একটু ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তবু রক্ষে এই যে এখন সকালবেলা। আকাশ নির্মল এবং রৌদ্রকরোজ্বল। ভদ্রলোক গুহার ভিতরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সহধর্মিনী বাধা দিলেন।

- এখান থেকেই প্রণাম করে চল বাড়ি যাই। খুব ঢয় ভয়‌ করছে ।

- সে কি ! এতদূর এসে ফিরে যাব। সাধুবাবাকে মা কালীকে দর্শণ না করেই ?

- চল। বাড়ি চল।

ছেলে একটু মজা পেল। বলল - না মা , আমি সন্ন্যাসীঠাকুরকে দেখব। দাঁড়াও, আমি ডাকি।

ছেলে সাধুবাবখ বলে ডাক দিল। তারানাথ সাড়া দিলেন। সেই স্বর স্টেশনমাস্টার চিনতে পেরে একটু উৎফুল্ল হয়ে বললেন - বাবা গুহাতেই আছেন। চল আমরা ভেতরে যাই।

তিনজন প্রবেশমুখে আসতেই সেখানের আয়নায় তান্ত্রিককে দেখতে পেলেন। শান্ত সৌম্য মূর্তি, ধ্যান হেতু অর্ধোন্মিলীত নেত্র। যোগী ধ্যানমগ্ন। গুহায় ঢোকার রাস্তাটি এতটাই নীচু যে ছেলেকেও হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হল। তারা গর্ভগৃহে উপনীত হলেন। যোগী আসন ছেড়ে ওদের মায়ের সামনে বসতে আদেশ করলেন। তিনজনই বসলেন। তান্ত্রিক ভেতরে রক্ষিত আয়নায় সবাইকে এক যোগে চেয়ে থাকতে বললেন।

তাঁরা দেখলেন যে দুলি মেঝান নামের বুড়িটা ওদের ছেলের রক্ত পান করতে করতে লাইন পারাপার করছে। এমন হময় আপ নীলাচল এক্সপ্রেস ওকে পিষে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছেলেটির মা প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ছেলেও ভয়ে কাঁপছে। ভদ্রলোক দূখলেন গতকালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

তান্ত্রিক বললেন - শেষ রক্তবিন্দু গলাধঃকরণ হবার পূর্বেই ট্রেন এসে যায় আর দুর্ঘটনা ঘটে।

নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কেউ। তান্ত্রিক বললেন - এটাই ঘটনা। এবার যা মা কে প্রণাম কর।

তিনজনে মা কে প্রণাম করে, ভোগ নিবেদন করে গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন।



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Thriller