STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Thriller

4  

Nityananda Banerjee

Thriller

কাপালিক বারো ভাগ

কাপালিক বারো ভাগ

4 mins
256

দ্বাদশ পর্ব


কাজ সেরে তান্ত্রিক ঠাকুর পুষ্করিণী ঘাট থেকে আশ্রমের দিকে চললেন । জটাজুটধারী সন্ন্যাসী রক্তবর্ণ বসনে আচ্ছাদিত হয়ে দক্ষিণ হাতের ত্রিশুল উর্দ্ধপানে উঁচিয়ে ধরে জয় মা জয় ত্রিকালেশ্বর মহাকাল বলে ডাকতে ডাকতে গ্রাম ছাড়িয়ে শ্মশানের পথ ধরে অগ্রসর হতে লাগলেন । 

গোপেশ্বর, রামু এবং বাগদী বউয়ের মৃতদেহ নড়েচড়ে উঠল । নওলকিশোর শর্মা নিবিষ্টচিত্তে তা' প্রত্যক্ষ করে ভয়ে কাঁপতে লাগলেন । তিনি স্বেচ্ছায় ট্রাকে উঠেছেন - এস পি সাহেবের নিষেধ অমান্য করে । 

একসময় তিনটি দেহ থেকে ধোঁয়ার মত কিছু অজাগতিক দৃশ্য দেখা গেল । তিনি সংজ্ঞাহীন হলেন । ট্রাকচালকও তিনটি মৃতদেহ ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন ট্রাক থেকে নীচে নেমে যেতে দেখল এবং মুহুর্মুহু হর্ণ বাজিয়ে সম্মুখস্থ এস পির 

জিপ গাড়ির মনোযোগ আকর্ষণ করবার মরীয়া চেষ্টা করল । 

ট্রাকের সঙ্গে জিপের দূরত্ব বৃদ্ধি পেল । এই ভাবে চলতে চলতে ক্রমশ জিপটিও দৃষ্টির বাইরে চলে গেল । চালক ট্রাক থামিয়ে দিল । পশ্চাতের ফোকরে চোখ রেখে দেখতে পেল শর্মা সাহেব অচৈতন্য এবং মৃতদেহগুলি ট্রাকে নেই ।

চালক গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে লাগল । পথে একটি বৃহৎ পাথরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল । জ্ঞান হারায়নি ; দেখল তান্ত্রিক অশেষ করুণায় তার দিকে চেয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন ।

' আমাকে ক্ষমা কর ঠাকুর , পেটের দায়ে চাকরি করি - এতে আমার তো কোন দোষ নেই '

ব্যাকুল আকুতি নিয়ে করজোড়ে তান্ত্রিকের পদতলে মাথা ঠেকাল । তান্ত্রিক দয়ার সাগর । বললেন - তোর কোন ভয় নেই বেটা । আজকের রাতটা আমার আতিথ্যে কাটিয়ে আগামীকাল সকালে দেশের বাড়ি ফিরে যাবি । ভয় নেই, তোর কোন অমঙ্গল হবে না । তোকে কিন্তু এই তল্লাটে যেন আর কোনদিন না দেখি ।

ট্রাক চালক চিন্তিত হয়ে বলল - ঠাকুর, সে না হয় চলে যাব ; কিন্তু আমার ট্রাক ! ওটা না নিয়ে গেলে তো সপরিবারে উপোস দিয়ে মরতে হবে !

তান্ত্রিক বললেন - তোর যান যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছে যাবে , কিন্তু হুঁশিয়ার ! তুই নিজে থেকে ওই গাড়ির ত্রিসীমানায় যাবিনে । গেলেই মৃত্যু অবধারিত ।

চালক হতভম্ব হয়ে গেল । কি সব কথা বলছেন তান্ত্রিক ঠাকুর । ওই ট্রাকে পুলিশ কর্তার অচৈতন্য দেহ পড়ে আছে ! তাঁকে ছেড়ে গেলে পুলিশ তো তাকেই দোষী প্রমাণ করে কারাগারে নিক্ষেপ করবে !

তান্ত্রিক অপরের মনোবাসনার কথা বুঝতে পারেন । সাধারণের নিকট তা' বোধগম্য হবার কথা নয় । কঠোর সাধনা দ্বারা উপলব্ধ এই অলৌকিক ক্ষমতা একমাত্র তিনিই বোঝেন । বললেন - তোর কিছু হবে না রে বেটা । ওই পুলিশ কর্তা এতক্ষণ ঠিক থানায় পৌঁছে গেছে । থানা তোলপাড় হচ্ছে । এখনই পুলিশের দল পুনরায় এই মন্দিরে আসবে খোঁজ খবর নিতে । তার আগে চল আমার সঙ্গে গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে । মা তোকে রক্ষা করবেন।

চালক নিরুপায় হয়ে তান্ত্রিককে অনুগমন করতে লাগল ।পাথরের গুহায় যেতে আসতে হামাগুড়ি দিতে হয়- এ কথা পুলিশই বলেছিল । চালক দেখল তান্ত্রিক ঠাকুর যেমন অবলীলায় গুহায় প্রবেশ করছেন ; অনুরূপ ভাবে সেও স্বচ্ছন্দে প্রবেশ পথ পার করে ভিতরে ঢুকল ।

শুনেছিল গুহার মধ্যে একটা উৎকট কটু গন্ধ সকল সময় থাকে । অবাক হবার মত কথা যে কোন বাজে গন্ধ তো দূরের কথা ; একটা মিষ্টি আমেজপূর্ণ গন্ধে তার দেহমন প্রশান্ত করে দিল ।

তান্ত্রিক পাথরের দেওয়ালে রাখা প্রদীপগলো ফুঁ দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন । সেই দেখে চালক করতালি দিতে গেলে তারানাথ নিষেধ করলেন। বললেন - করতালি এবং করতালের শব্দে প্রদীপ নিভে যাবে , সুতরাং সে যেন হেন কাজে নিবৃত্ত থাকে ।

চালক আশ্চর্য্য প্রদীপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল । শুধু তাই নয়- সম্মুখে দণ্ডায়মান মহাকাল এবং মহাকালীর মূর্তি দেখে ভাবে বিনয়ে বিগলিত হয়ে গেল । 

তান্ত্রিক বললেন - এই মন্দিরের প্রাক্তন সেবক রামচরণ ভট্টাচার্য্যের নাম শুনেছিস ?

চালক বলল - শুনেছি কি ঠাকুর ! আমি যে তাঁর পরিবারের আশ্রিত !

তান্ত্রিক বললেন - জানি। তাই বললাম ওঁর কথা । ওঁর পৌত্রবধূ কান্তা এক্ষণে গর্ভবতী হয়েছেন । তিনি বর্তমানে যে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন সেই সন্তান এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভ্রুণ হয়ে তাঁর উদরে প্রতিপালিত হচ্ছে । তোর কাজ হল সেই পূণ্যবতী মহিলার রক্ষণাবেক্ষণ করা ।

- ঠাকুর ! তাঁর পতিদেব বিদ্যমান । সে দায়িত্ব তো তাঁরই ! আমি কি ভাবে সেখানে উপস্থিত থেকে তাঁর ভার বইব ?

- সে চিন্তা আমার । তুই শুধু আমার নির্দেশমত কাজ করে যাবি । 

চালক বিস্ময়ে হতবাক । স্বর্গত রামচরণ ভট্টাচার্য্য মহাশয় স্বয়ং দেবপ্রেরিত দূত ছিলেন । তাঁরই কল্যানে তাঁর বংশধর বর্তমানে ধনাঢ্য ব্যক্তি রূপে গ্রামে বিরাজমান। তিনি কেন একজন অপাংক্তেয় ভৃত্যকে তাঁর পত্নীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিবেন ! 

তান্ত্রিক অবগত আছেন সে ব্যাপারে । বললেন - জগন্নাথ একজন ঠগ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছে । তোর কাজ হল সেই ডাক্তারের মুখোশ খুলে দেওয়া । আমি তোকে আজ রাত্রে কিছু বিচিত্র ক্ষমতা প্রদান করব । তোকে মহাকালের দীক্ষিত করে তুলব । তখন তুই বিশেষ ক্ষমতা বলে সকল কাজ করতে পারবি ।

- ঠাকুর ! এই জন্য আপনি আমাকে বেছে নিলেন কেন ?

তান্ত্রিকের দুই চোখ রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠল । তিনি ধমক দিয়ে বললেন - কৌতূহল আমি পছন্দ করি না ; আর কারও কোন প্রশ্নের জবাবও দিই না । সুতরাং তোর এই কথাগুলো আমি অগ্রাহ্য করলাম । চল সবার আগে তোকে পরিশুদ্ধ করি ।

তারানাথ চালককে নিয়ে ডাঙরা নদীতে নামলেন । তখন জৈষ্ঠ্যমাস । প্রচণ্ড দাবদাহে চাতালের বটগাছও নেতিয়ে পড়েছে । নদীতে এক বিন্দু জল নাই । সন্ধ্যাবেলায়ও নদীর বালু তপ্ত রয়ে গেছে । তান্ত্রিক আদেশ করলেন - যা , নদীতে অবগাহন করে আয় ।

চালকের মাথা ঘুরে যায় । তপ্ত বালুস্নান করতে বলছেন তান্ত্রিক । তার মনে হল অন্ধকার তো হতে চলেছে, এর খপ্পর থেকে পালিয়ে যাবার এই উপযুক্ত সময় । কিন্তু তান্ত্রিক যে দিব্যযোগী ! তাঁর চোখে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব । আবার কোন প্রশ্নও করা যাবে না । অগত্যা বালুস্নানই বিধেয় ।

( চলবে )



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Thriller