হাওয়া বদল

হাওয়া বদল

3 mins
1.6K


"তোর কি মনে হয়, হাওয়াটা কোন দিকে যাচ্ছে?"


জনশূন্য এই মোহনার তীরে হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে প্রায় উল্টে গেলাম। পিছন ফিরে দেখি টুকটুকে ফর্সা, দাঁত ফোকলা বুড়ো, পরনে কাছা করা সাদা ধুতি, কাঁধে লাল নীল গামছা, দিব্যি ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছে। যেন আমার অবাক হয়ে প্রায় পড়ে যাওয়াটা ভারী মজার বিষয়! মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম ঠিকই তবে বুড়োর ভাবখানা এত হাস্যকর যে আমিও আর মুচকি না হেসে থাকতে পারলাম না।


"তা দাদু, এরম হঠাৎ করে চমকানোর প্রয়োজন ছিল কি?"


বুড়ো এক গাল হেসে বললো, "বেশ করেছি!"


"তাই বুঝি?"


"হ্যাঁ! তুই এখানে একা একা কি করছিস রোদের মধ্যে? বাড়ি নেই? বাড়ি যা!"


"আহা, দাদু, ছোটো বাচ্চা নাকি আমি? আমার বাড়ি অনেক দূর আছে। এখানে ঘুরতে এসছি। গাড়িটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই ওদিকে মরা পোড়ানো দেখছিলাম। আমাদের শহরে তো এমনটি কখনো হতে দেখিনি, তাই কৌতূহল হোলো আরকি। তবে তুমিই বা এত বেলায় এখানে কি করছো? বাড়ি যাও না!"


"তুই আমারে বাড়ি যেতে বলবি আর আমি যাব? আবদার তো কম নয়! তা তোদের শহরে কি মানুষ মরে না নাকি?"


"মানুষ মরবে না কেন! তবে এরম ভাবে সমুদ্র সৈকতে কোনদিন এত কাঠ জোগাড় করে মরা পোড়াতে দেখিনি।"


"হুঁ। এখানে এরমই হয়।"


"হ্যাঁ, গ্রামের লোকেরা বলছিলো।"


"সব তো চলে গেছে দেখছি। ছেলেপুলে গুলিও গেছে।"


"হ্যাঁ, অনেক্ষণ আগেই চলে গেছে। বললো জোয়ার এসে নিয়ে যাবে সব।"


"ওটাই তো মজা। তা তুই কি জোয়ার আসার জন্য হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস নাকি?"


"না না। চলে যাব, এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? এই নীরবতা ছেড়ে যেতে মন চাইছে না আরকি। শহরে বড্ড আওয়াজ।"


"তাহলে আর আমার শহরে না যেতে পারার আফশোষ রইলো না! তা বললি না যে, তোর কি মনে হয়, হাওয়াটা কোন দিকে যাচ্ছে?"


"হুঁ। কিকরে বলি বলোতো দাদু? আগুনের রেখা দেখে তো মনে হচ্ছে দক্ষিণ দিকে হাওয়া টানছে।"


"ঠিক বলেছিস। আমিও সেটাই ভাবছিলাম। ভালোই হলো। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম অষ্ট্রেলিয়া যাব! ওইটা দক্ষিণ দিকেই না রে? ছোটবেলায় তো ইস্কুলে সেটাই পড়েছিলাম মনে হচ্ছে।"


"বাব্বাহ! তুমি অষ্ট্রেলিয়া যাবে?"


"যাবো তো! তারপর যাবো আমেরিকা, জাপান, ইতালি, উহু! জমিয়ে ঘুরবো!"


মিথ্যে বলবো না, বুড়োর উদ্যম দেখে বেশ লাগলো। "তা দাদু, অষ্ট্রেলিয়া তো দক্ষিনেই তবে তুমি কিরম করে যাবে শুনি? পাসপোর্ট ভিসা আছে?"


"কেনো রে? তোকে কৈফিয়ত দেবো কেনো? আমি উড়ে উড়ে যাবো!"


"হ্যাঁ, তো উড়ে উড়ে যেতে গেলেই তো -"


"এই চুপ! তর্ক করিসনে। এবার যেতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।" বলেই বুড়ো হন্ত দন্ত হয়ে হাঁটা দিলো সমুদ্রের দিকে।


"কোথায় চললে দাদু? জোয়ার এসে যাবে তো!"


বুড়ো ঘুরে তাকালো না। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চেঁচালো, "অষ্ট্রেলিয়া যাচ্ছি!"


আশ্চর্য বুড়ো দেখছি! বলে কিনা অষ্ট্রেলিয়া যাচ্ছে দৌড়ে দৌড়ে, ও না তো, উড়ে উড়ে! পাগল নাকি? "আরে সেটা ওরম করে যাওয়া যায় নাকি! আর এখনই বা হঠাৎ অষ্ট্রেলিয়া যেতে চাইছো কেন?"


দূর থেকে বুড়োর উত্তর এলো, "হাওয়া বদল। তুই বুঝবিনা!"


আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি আশ্চর্য বুড়ো জ্বলন্ত চিতার কাছে মিলিয়ে গেলো। না, চোখের ভুল! অত দূরে এই খারাপ চোখদুটি নিয়ে যতই চোখ কুঁচকে তাকাইনা কেন, আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। ভাবলাম, পাগল বুড়ো, কিছুক্ষন পর নিজেই ফিরে আসবে। কিন্তু মনটা কেমন কেমন করে উঠলো। পাগল যদি সমুদ্রে গিয়ে মরেটরে যায়? 


তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে ফেরত এলাম। ড্রাইভার গাড়ির ভেতরেই ছিল। "দাদা, ওই চিতা যেদিকে জ্বলছে চলুন তো। ভেজা বালি দিয়ে চালাতে অসুবিধে হবে না।"


"কেন দিদি? জোয়ার আসার সময় হয়ে গেছে যে!"


"আরে চলুন না! বেশিক্ষণ লাগবে না!"


"ঠিক আছে।" দোনোমোনো করে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে দ্রুত চললো চিতার দিকে। 


আমি জানলা দিয়ে মাথা বের করে খুঁজতে থাকলাম বুড়ো কে। দেখতে পেলাম না কোথাও। জলজ্যান্ত লোকটা এত তাড়াতাড়ি কোথায় চলে গেলো? 


"দিদি, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? সবাই কিন্তু চলে গেছে এইখান থেকে।"


"হ্যাঁ, ওই পাগল বুড়োটা বললো হাওয়া বদল করবে নাকি উড়ে উড়ে অষ্ট্রেলিয়া গিয়ে! ওই লোকটা মরবে! জলে নেমে পড়ে যদি -"


ড্রাইভার রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "সন্ধ্যে নামছে, দিদি। শহরে ফিরছি। আপনাকে হোটেলে নামিয়ে দেবো।"


আমি কিছু বলার আগেই ফোর্থ গিয়ারে গাড়ি ছুটলো।


Rate this content
Log in

More bengali story from Advocate Tejaswinee Roychowdhury

Similar bengali story from Drama