STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

5  

Partha Pratim Guha Neogy

Inspirational

ভুল প্রেসক্রিপশন

ভুল প্রেসক্রিপশন

3 mins
5

সেদিন সন্ধ্যায় ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, যেন বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেছে।

কয়েকদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন।

চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রেসক্রিপশনটা আর একবার দেখে নিল সে। তারপর পাশের ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধগুলো কিনে বাড়ি ফিরল।

রাতের খাবারের পর প্রথম ওষুধটা খাওয়ার সময় হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল প্রেসক্রিপশনের ওপর।

একটা নাম যেন ঠিক চিনতে পারছে না।

সে ফোনে প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে ডাক্তারবাবুকে পাঠাল।

কয়েক মিনিট পর উত্তর এল—

“আপনি এখনই কোনও ওষুধ খাবেন না। প্রেসক্রিপশনটা আমাকে আবার পাঠান।”

অরিন্দম অবাক হয়ে লিখল—

— “কিন্তু ডাক্তারবাবু, এই প্রেসক্রিপশন তো আপনিই দিয়েছেন!”

ওপাশে কিছুক্ষণ কোনও উত্তর এল না।

তারপর একটি মাত্র মেসেজ—

“না। এটা আমার হাতের লেখা নয়।”

অরিন্দমের বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।

সে টেবিলের ওপর রাখা ওষুধগুলোর দিকে তাকাল।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

ডাক্তারবাবুর কল।

— “অরিন্দমবাবু, আপনি কোথা থেকে প্রেসক্রিপশনটা পেয়েছেন?”

— “আপনার চেম্বার থেকেই।”

— “অসম্ভব। আজ সন্ধ্যায় আমি কাউকে ওই ওষুধ লিখিনি।”

অরিন্দম এবার প্রেসক্রিপশনটা উল্টে দেখল।

পেছনে ছোট করে লেখা একটি তারিখ—

১৭ অক্টোবর, ২০২১।

আর তার নিচে একটি নাম—

অরিন্দম সেন।

তার নিজের নাম।

কিন্তু সে তো কখনও ২০২১ সালে ওই ডাক্তারের কাছে যায়নি!

হাত কাঁপতে কাঁপতে সে ফার্মেসিতে ফোন করল।

— “আপনারা যে ওষুধগুলো দিয়েছেন, সেগুলো কি প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী?”

ফার্মেসির লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—

— “হ্যাঁ… তবে একটা সমস্যা আছে।”

— “কী সমস্যা?”

— “এই প্রেসক্রিপশনটা আমরা আজ প্রথম দেখিনি।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

— “মানে?”

ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে উত্তর এল—

“একই প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঠিক পাঁচ বছর আগে একজন এসেছিলেন।”

— “কে?”

ফার্মেসির লোকটি নামটা বলল।

অরিন্দম সেন।

ফোনটা তার হাত থেকে পড়ে গেল।

ঘরের নীরবতার মধ্যে সে আবার প্রেসক্রিপশনটার দিকে তাকাল।

এবার তার চোখে পড়ল একেবারে নিচে লেখা একটি লাইন—

“এই ওষুধগুলো খেলে আগামীকাল সকালটা আপনি দেখতে পাবেন না।”

অরিন্দম তৎক্ষণাৎ ওষুধগুলো জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলল।

তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে, ঠিক তখনই ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এল।

“ওষুধগুলো ফেলে দিয়েছেন? ভালো করেছেন।”

অরিন্দমের বুক ধক করে উঠল।

কয়েক সেকেন্ড পর দ্বিতীয় মেসেজ—

“কারণ ওগুলো আপনার জন্য ছিল না।”

অরিন্দম স্থির হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজার কলিং বেল বেজে উঠল।

রাত তখন ১১টা ৪৭।

দরজার ওপাশ থেকে একটি শান্ত গলা—

“অরিন্দমবাবু, আপনার জন্য সঠিক প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসেছি।”

অরিন্দম দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

কারণ সেই কণ্ঠটা—

তার নিজের কণ্ঠ।

সে দরজার কাছে এগিয়ে গেল, কিন্তু হাতল স্পর্শ করল না।

ভিতর থেকে কাঁপা গলায় বলল—

— “আপনি কে?”

দরজার ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এল।

তারপর উত্তর—

“আমি সেই অরিন্দম, যার জন্য প্রেসক্রিপশনটা লেখা হয়েছিল।”

অরিন্দমের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

— “কিন্তু… আমি তো অরিন্দম!”

ওপাশ থেকে এবার খুব শান্ত স্বরে উত্তর এল—

“সেটাই তো ভুলটা হয়েছে।”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর দরজার নিচ দিয়ে একটি কাগজ ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে ঢুকে এল।

অরিন্দম কাগজটা তুলে নিল।

সেটা আর প্রেসক্রিপশন নয়।

একটি হাসপাতালের পুরনো রিপোর্ট।

রোগীর নাম—

অরিন্দম সেন।

তারিখ—

১৭ অক্টোবর, ২০২১।

রিপোর্টের নিচে লাল কালিতে লেখা—

“রোগী মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল।”

অরিন্দমের হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।

সে পিছিয়ে এল।

তারপর প্রথমবার নিজের চারপাশের ঘরটার দিকে ভালো করে তাকাল।

দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটি পাঁচ বছর আগের।

টেবিলের ওপর রাখা সংবাদপত্রের তারিখও—

১৭ অক্টোবর, ২০২১।

আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি…

অরিন্দম নয়।

সে ধীরে ধীরে আয়নার কাছে গেল।

আয়নায় তার কোনও প্রতিবিম্ব নেই।

শুধু পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দরজাটা দেখা যাচ্ছে।

আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে—

অরিন্দম।

জীবিত অরিন্দম।

হাতে একটি নতুন প্রেসক্রিপশন।

সে কাচের ওপাশ থেকে তাকিয়ে বলল—

“এবার বুঝতে পারছ? ভুল প্রেসক্রিপশনটা তোমার জন্য ছিল না… কারণ ভুল মানুষটাই বেঁচে আছে।”

আলো নিভে গেল।

পরদিন সকালে ডাক্তারবাবুর ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে ছবি এল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—

একটি পুরনো প্রেসক্রিপশন।

তার নিচে লেখা—

“রোগী: অরিন্দম সেন”

আর প্রেসক্রিপশনের একেবারে শেষে ডাক্তারবাবুর হাতের লেখায় একটি বাক্য—

“পরবর্তী সাক্ষাৎ—২২ অক্টোবর, ২০২৬।”

ডাক্তারবাবু ছবিটির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

কারণ আজকের তারিখ—

২২ অক্টোবর, ২০২৬।

আর ছবিটি পাঠানো হয়েছিল—

অরিন্দমের নিজের নম্বর থেকে।

সমাপ্ত।


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Inspirational