STORYMIRROR

Md Nurnobi islam sumon

Crime Thriller

5.0  

Md Nurnobi islam sumon

Crime Thriller

অন্ধকারের অষ্টম দরজা

অন্ধকারের অষ্টম দরজা

9 mins
11

অন্ধকারের স্বাদ, ভেজা মাটির গন্ধ আর কয়েক শতাব্দীর পুরোনো নিশ্বাসের ভার – এই নিয়েই তৈরি হয়েছিল সেই ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ, যার অস্তিত্ব শুধু ক্যাম্পাসের উপকথায় চাপা পড়ে ছিল। প্রাচীন অ্যাকাডেমিক ব্লকের নিচে, পুরোনো লাইব্রেরির শেষ তাকে রাখা একটি জীর্ণ পুঁথির ভাঁজে অর্ণব আর মিতা সেই গুপ্ত সঙ্কেত খুঁজে পেয়েছিল। এটা কোনো মানচিত্র ছিল না, ছিল একটি বিশেষ তারার বিন্যাস – যা শুধু বছরে একবার, শীতকালীন সংক্রান্তির রাতে, ক্যাম্পাসের ঘণ্টাঘরের চূড়ার ছায়া যে বিন্দুতে এসে মিশত, তাকেই নির্দেশ করত।

আজ সেই রাত।

অর্ণব তার টর্চের আলোয় পাথরের মেঝেতে জমাট বাঁধা ধূলো সরিয়ে দেখল। একটি অর্ধ-গোলাকার কালো গ্রানাইটের পাথর, যার গায়ে খোদাই করা আটটি সূক্ষ্ম রেখা, যেন কোনো দরজার কপাট। সাতটি রেখা ফিকে হয়ে আছে, কেবল অষ্টম রেখাটি সদ্য আঁকা কালির মতো কালো।

“অন্ধকারের অষ্টম দরজা…” ফিসফিস করে বলল মিতা। তার কাঁধের ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এলো ধাতব ডিটেক্টর এবং একটি ছোট, রিমোট-কন্ট্রোলড ড্রোন। মিতা ছিল কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী, কিন্তু তার নেশা ছিল লৌকিক পুরাণ আর গুপ্ত সঙ্কেত।

অর্ণব সঙ্কেত অনুযায়ী অষ্টম রেখার উপরে ঘণ্টাঘরের চূড়ার ছায়াটি ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে, একটি চাপা ঘর্ষণের শব্দ করে গ্রানাইটের পাথরটি নিচে নেমে গেল। তীব্র ঠান্ডা বাতাস ঝলসে দিলো তাদের মুখ।


পাথর সরে যেতেই সামনে এলো একটি সরু সিঁড়ি। সিঁড়ির ধাপগুলি এমন মসৃণভাবে ক্ষয়ে গেছে যে মনে হয় হাজার বছর ধরে কেউ এর উপর দিয়ে হেঁটে যায়নি। প্রথম দরজাটি ছিল এই সিঁড়ির ঠিক মুখেই, যা ভয়ের রূপে তাদের সামনে এলো।

টর্চের আলোয় সিঁড়ি ধরে নামতে গিয়েই অর্ণব অনুভব করল যেন তার শরীরের সমস্ত রক্ত জমাট বাঁধছে। বাতাস এখানে শুধু ঠাণ্ডা নয়, যেন জীবনহীন। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর আদিম সিলিকা স্যান্ডের গন্ধ। হঠাৎ সিঁড়ির একটি ধাপে পা পড়তেই অর্ণবের মনে হলো সে যেন শূন্যে পড়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক তাকে বোঝাল, সে নিচে নেমে যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবিকভাবে সে স্থির দাঁড়িয়ে। এই অনুভূতিটি এতই তীব্র ছিল যে অর্ণব সেখানেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল।

মিতা দ্রুত তার ব্যাগ থেকে একটি ছোট রূপালী যন্ত্র বের করল। “এটা ‘অ্যাকুস্টিক ভিশন ডিটেক্টর’। এই প্রকোষ্ঠগুলো উচ্চমাত্রার ইনফ্রাসাউন্ড দিয়ে সুরক্ষিত। এটা মনকে স্থির করে দেয়,” মিতা বলল। যন্ত্রটি চালু হতেই একটি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ বের হলো, যা তাদের কানের পক্ষে প্রায় অচেনা। অর্ণবের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো। “প্রথম দরজা,” মিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “প্রথম বাধাটা সবসময় মানসিক হয়। ভয়। আর এই স্থবিরতাই এখানকার প্রথম সুরক্ষা।”

তারা আবার নামতে শুরু করল। সিঁড়িটি প্রায় পঞ্চাশ ফুট নিচে নেমে একটি চওড়া করিডোরে শেষ হলো।

করিডোরটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে লম্বা। দু’পাশের দেয়ালে কোনো জানালা নেই, কিন্তু প্রতি দশ ফুট অন্তর খোদাই করা আছে অদ্ভুত সব প্রতীক – যা ক্যাম্পাসের লোগো, কিন্তু তার এক হাজার বছরের পুরোনো, অপরিচিত রূপ। এই করিডোরের শেষে ছিল একটি বিশাল পাথরের দরজা, যার উপরে প্রাচীন গ্রিক অক্ষরে একটি মাত্র শব্দ লেখা: ‘স্মৃতি’ (Mneme)।

দরজাটির কোনো হাতল বা কব্জা নেই। মাঝখানে একটি মাত্র ফাঁপা জায়গা, যেখানে কিছু একটা বসানোর কথা। অর্ণব তার ইতিহাস জ্ঞান কাজে লাগাল। “এই করিডোর হলো ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব ইতিহাস’। যে জিনিসটা বসাতে হবে, সেটা আমাদের প্রতিষ্ঠাতা, আচার্য সুরেন্দ্রের স্মৃতিচিহ্ন হতে পারে।”

মিতা খেয়াল করল, প্রতিটি প্রতীকের নিচে অতি ক্ষুদ্র, প্রায় অদৃশ্য অক্ষরে তারিখ লেখা। সবই ষোড়শ শতকের। কিন্তু অষ্টম প্রতীকটির নিচে একটি তারিখ লেখা – যা আধুনিক যুগের, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের।

“অর্ণব! অষ্টম প্রতীক। এটা আসল নয়, এটা পরে যোগ করা হয়েছে। অষ্টমের দিকে তাকাও। এটা আচার্যের নয়, এটা সেই সময়কার উপাচার্যের প্রতীক। অষ্টম চক্র— তারা নিশ্চয়ই ইতিহাস পরিবর্তন করে দিয়েছে।”

অর্ণব অষ্টম প্রতীকটির গায়ে হাত রাখতেই একটি মৃদু কম্পন অনুভব করল। প্রতীকটি সামান্য নড়ছে। তারা দু’জনে মিলে সেটি ঘুরিয়ে দিতেই বাকি সাতটি প্রতীক ঘুরে গেল, এবং ‘স্মৃতি’ লেখা দরজাটির মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় একটি গোলক আলোকিত হলো। গোলকটি আসলে একটি লেন্স।

অর্ণব তার কাছে থাকা একটি প্রাচীন রৌপ্যমুদ্রা (যা সে আচার্যের মূর্তির নিচে পেয়েছিল) সেই ফাঁকা লেন্সের উপর রাখল। লেন্সটি মুদ্রার প্রতীককে ফোকাস করে দরজার উপরে ফেলে দিলো। মুহূর্তের মধ্যে, পাথরের দরজাটি দু’পাশে সরে গেল, কোনো শব্দ না করেই।

দরজা পেরিয়ে তারা প্রবেশ করল একটি গোল ঘরে। ঘরের মেঝেটা ছিল একটি বিশাল জলাধার, যা এক ধরনের ঘন, কালো তরলে পূর্ণ। তরলটি কোনো জল নয়, তা থেকে বাষ্পের মতো কিছু একটা উপরে উঠে যাচ্ছে। ঘরের চারপাশের দেওয়ালে ছোট ছোট খাঁজ, যেন স্রোতের গতিপথ নির্দেশ করছে।

“এটা তৃতীয় দরজা: প্রবাহ,” মিতা বলল। “পুরাণ অনুযায়ী, ‘অষ্টম জ্ঞান’ হলো এমন কিছু যা সময় এবং ধারণার প্রবাহকে অস্বীকার করে। এই তরল সেই প্রবাহকে বাধা দিচ্ছে।”

চারপাশে কোনো সেতু নেই। শুধুমাত্র কয়েকটি ছোট, ভাসমান পাথরের খণ্ড।

“আমাদের পার হতে হবে,” অর্ণব বলল।

“না, আমরা এটার ভিতরে কী আছে তা দেখব,” মিতা তার ড্রোনটিকে জলাধারের উপর দিয়ে ওড়ালো। ড্রোনটি জলাধারের কাছাকাছি যেতেই তার ক্যামেরা স্থির হয়ে গেল। ড্রোনটি সামান্য কেঁপে উঠল এবং একটি ত্রুটির বার্তা পাঠালো: ‘ডেটা করাপশন: স্থানিক বিকৃতি (Spatial Distortion)’।

অর্ণব বুঝতে পারল। “এটা আমাদের চোখে প্রবাহের বিভ্রম তৈরি করছে। পাথরের খণ্ডগুলো স্থির নয়, তারা তরলের উপর ভেসে আছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি একে স্থির দেখাচ্ছে। আমাদের চোখে যা স্থির, আসলে তা গতিশীল। আমাদের মনের গতি দিয়ে এর মোকাবিলা করতে হবে।”

মিতা তার অ্যাকুস্টিক যন্ত্রটিকে আরো উচ্চ কম্পাঙ্কে সেট করল, এবার মনকে গতিশীল রাখতে। তারা প্রতিটি পাথরের খণ্ডে পা রেখে পার হলো, তাদের পা যেখানে পড়ছিল, সেই পাথরটি ছাড়া বাকি সব যেন তরলের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করছিল।

তৃতীয় দরজা পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছাল একটি সুবিশাল পাঠাগারে। না, এটি কোনো সাধারণ লাইব্রেরি নয়। এটি একটি পাথরের সিন্দুক কক্ষ। সারি সারি তাক, তাতে কোনো বই নেই, আছে শুধু খোদাই করা শিলালিপি। শিলালিপিগুলি এক অচেনা ভাষায় লেখা। ঘরের কেন্দ্রে একটি বেদী, তার উপর একটি স্ফটিক গোলক মৃদুভাবে আলো দিচ্ছে।

“এই হলো চতুর্থ দরজা: ভাষা। ভুলে যাওয়া ভাষা,” অর্ণব বলল। “যদি এটা ‘নিষিদ্ধ সত্য’ হয়, তবে তা নিশ্চয়ই এমন ভাষায় লেখা যা আর কেউ পড়ে না।”

স্ক্রিপ্টটি দেখে মিতার চোখ কপালে উঠল। “অর্ণব, এটা ল্যাটিন, গ্রিক, সুমেরীয় এবং আমাদের স্থানীয় প্রাচীন বাংলা লিপির এক অবিশ্বাস্য মিশ্রণ। এটার কোনো ব্যাকরণ নেই, এটা শুধু অনুভূতির মাধ্যমে পড়া যায়।”

তারা মনোযোগ দিয়ে শিলালিপিগুলো দেখতে শুরু করল। অর্ণব যখন সুমেরীয় অংশটি পড়ছিল, তার মনে হলো তার চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন শ্বাস নিচ্ছে। মিতা যখন ল্যাটিন অংশটি স্পর্শ করল, তার মনে হলো সে যেন এক শতাব্দীর পুরোনো কোনো শীতের দিনের গন্ধ পাচ্ছে।

স্ক্রিপ্টগুলো ছিল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার আগেকার সময়ের রেকর্ড। তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই জায়গাটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল একটি ‘ধাঁচের ধারক’ – যা মহাবিশ্বের এক নির্দিষ্ট ‘দোষ’ বা ‘ত্রুটি’ ধারণ করে রেখেছে। এই ‘দোষ’ হলো একটি সত্য, যা মানব মস্তিষ্ক ধারণ করলে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। তারা এই দোষকে নাম দিয়েছিল ‘শূন্যের স্রোত’ (The Current of Nothingness)।

চতুর্থ স্তর পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্কেত এলো স্ফটিক গোলক থেকে। তাদের উভয়ের পড়ার সময় তারা যেসব আবেগ অনুভব করেছিল, গোলকটি তা শোষণ করে নিল এবং একটি ফাটল তৈরি হলো সামনের দেওয়ালে।


ফাটল দিয়ে তারা একটি ছোট কক্ষে প্রবেশ করল, যা সম্পূর্ণভাবে পালিশ করা কালো পাথরের তৈরি। ঘরটি ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকার। শুধু তাদের টর্চের আলো।

হঠাৎ করেই টর্চের আলোয় তারা দু’জন ঘরের মাঝখানে নিজেদের প্রতিফলন দেখতে পেল। কিন্তু সেটি শুধু তাদের অবয়ব ছিল না, ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভয় আর আকাঙ্ক্ষার সংমিশ্রণ। অর্ণবের প্রতিফলন যেন তার জীবনের প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রতি ইঙ্গিত করে হাসছে। মিতার প্রতিফলন তাকে দেখাচ্ছে, তার বাবা-মায়ের সাথে শেষবারের সেই ঝগড়া, যা আর মেটানো হয়নি।

“এটা পঞ্চম দরজা: নৈতিকতার আয়না,” অর্ণব বলল। “এই নিষিদ্ধ সত্যের পথে যারা যায়, তাদের প্রথমে নিজেদের বিচারকের সামনে দাঁড়াতে হয়।”

প্রতিফলনগুলো কথা বলতে শুরু করল, তাদের দুর্বলতাগুলো তীব্রভাবে তুলে ধরল। অর্ণব যখন তার প্রতিচ্ছবি থেকে চোখ সরাল, তখন প্রতিচ্ছবিটি অদৃশ্য হলো না, বরং তীব্রভাবে অর্ণবের দিকে এগিয়ে এলো। তার মনে হলো সে এখনই পাগল হয়ে যাবে।

মিতা তার চোখ বন্ধ করে বলল, “অর্ণব, আয়না সবসময় মিথ্যে বলে না, কিন্তু মিথ্যের প্রতিচ্ছবি দেখায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সত্য খুঁজছি, আমাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে নয়। যদি এই শূন্যের স্রোত অস্তিত্বের সত্য হয়, তবে আমাদের ভুলের কোনো অস্তিত্ব নেই, শুধু বর্তমান আছে।”

এই চরম দার্শনিক সত্য তাদের দু’জনকে এক মুহূর্তে সমস্ত মানসিক আক্রমণ থেকে মুক্তি দিলো। প্রতিফলনগুলো কালো পাথরের মধ্যে মিলিয়ে গেল। দেয়ালে তখন দেখা গেল একটি নতুন, উজ্জ্বল রেখা: ‘গ্রহণ’ (Acceptance)।

এই দরজাটি ছিল অপেক্ষাকৃত আধুনিক, কিন্তু রহস্যময়। কক্ষটি ছিল একটি কন্ট্রোল রুমের মতো। মাঝখানে একটি ধাতব প্যানেল, তাতে অসংখ্য বাটন আর স্ক্রীন। কিন্তু সব স্ক্রীনই নিভে আছে।

“এটা ষষ্ঠ দরজা: অষ্টম চক্রের হস্তক্ষেপ,” মিতা বলল। “তারা সত্য ধারণ করে, কিন্তু তারা এটাকে ব্যবহারও করতে শিখেছিল। এই যন্ত্রপাতিগুলো তাদের।”

একটি স্ক্রীনের উপর একটি ছোট লেখা ভেসে উঠল: ‘যদি তুমি সত্য জানতে চাও, তবে সত্যের ধারককে জাগরিত করো।’

অর্ণব বুঝতে পারল। ‘সত্যের ধারক’ বলতে সেই ডিভাইসকে বোঝানো হচ্ছে যা এই ‘শূন্যের স্রোত’কে ধারণ করে। আর ‘অষ্টম চক্র’ হলো সেই গোপন গোষ্ঠী, যাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় এই সত্য রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কালের স্রোতে তারা রক্ষক থেকে ব্যবহারকারী হয়ে উঠেছিল।

মিতা দ্রুত তার ল্যাপটপ বের করে ধাতব প্যানেলের একটি পোর্টের সাথে যুক্ত করল। প্যানেলের পাওয়ার সিস্টেমে প্রবেশ করতে গিয়ে সে একটি সাংকেতিক জাল ভেদ করল। “অর্ণব, এই সিস্টেমে একটি ব্যাকআপ লগ ফাইল আছে। গত পঁচিশ বছরে এখানে কী হয়েছে, সব আছে!”

লগ ফাইল থেকে তারা জানতে পারল, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অষ্টম চক্রের সদস্যরা এই ‘শূন্যের স্রোত’ ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা ছাত্রদের মন নিয়ন্ত্রণ করত, জ্ঞানের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করত। এবং তাদের মধ্যে একজন, যিনি ছিলেন উপাচার্য, তিনিই ‘অষ্টম প্রতীক’ যোগ করেছিলেন।

হঠাৎ মিতার ল্যাপটপ থেকে একটি তীব্র অ্যালার্ম বেজে উঠল। “অর্ণব! আমরা পাওয়ার আপ করে ফেলেছি! মূল চেম্বার জেগে উঠেছে! এবং অ্যালার্মটা অন্য কোথাও সিগনাল পাঠাচ্ছে! অষ্টম চক্র জেনে গেছে আমরা এখানে আছি!”

তাড়াতাড়ি তারা কন্ট্রোল রুমে একটি বাটন খুঁজে পেল, তাতে লেখা: ‘নিষ্ক্রিয়’ (Deactivate)। অর্ণব সেটি চাপার আগেই কন্ট্রোল প্যানেলের একটি অংশ খুলে গেল, ভেতরে একটি ক্ষুদ্র, কাঁচের টিউব।

কন্ট্রোল রুমের দরজা খুলতেই তারা দেখল একটি বিশাল, গোলাকার প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্মের চারদিকে ঘন মেঘের মতো ধূম্র, যা থেকে মৃদু আলো বের হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে একটি ধাতব গোলক, যার চারপাশে সাতটি ছোট, স্পন্দিত স্ফটিক। স্ফটিকগুলো একেকটি রং ছড়াচ্ছে, যা যেন একধরনের শক্তি। এটিই ছিল সপ্তম দরজা: ‘সংযোজন’ (Synthesis)।

“স্রোত এখন সচল,” অর্ণব ফিসফিস করে বলল। “এই স্ফটিকগুলোই সেই শক্তিকে শোষণ করে রাখে।”

প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে গিয়ে তারা দেখল, প্ল্যাটফর্মটি আসলে মূল ভূগর্ভস্থ কক্ষের একটি বিশাল গম্বুজ। এবং এই গম্বুজের ঠিক নিচে, শত শত ফুট গভীরে, দেখা যাচ্ছে একটি বিশাল ধাতব ভল্টের দরজা। তার গায়ে লেখা: ‘অষ্টম দরজা’ (The Eighth Door)।

গোলকটি থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, কোনো ভাষা নয়, শুধু কম্পন: “তোমাদের যাত্রা এখানেই শেষ। জ্ঞান ধারণের ক্ষমতা তোমাদের নেই। ফিরে যাও, বিস্মৃতির মাঝে শান্তিতে থাকো।”

অর্ণব মিতার দিকে তাকাল। মিতার চোখগুলো স্থির। “না, অর্ণব, আমরা ফিরে যাব না। সপ্তম দরজা হলো এই সাতটি স্ফটিককে একীভূত করা। যদি আমরা এদের শক্তি এক করি, তবে অষ্টম দরজা খোলার জন্য যথেষ্ট শক্তি উৎপন্ন হবে। কিন্তু এটা বিপজ্জনক।”

অর্ণব তার কাঁধের ব্যাগ থেকে সেই পুরোনো পুঁথিটি বের করল, যার মধ্যে প্রথম সঙ্কেত ছিল। পুঁথির শেষ পাতায় একটি বিশেষ চিত্র আঁকা ছিল – সাতটি স্ফটিকের বিন্যাস, যা গোলককে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।

মিতা দ্রুত প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে গিয়ে স্ফটিকগুলোকে পুঁথিতে আঁকা বিন্যাস অনুযায়ী স্থান পরিবর্তন করতে লাগল। যখনই সে একটি স্ফটিক সরাচ্ছিল, গোলক থেকে বের হওয়া আলো তীব্র হয়ে উঠছিল।

ষষ্ঠ স্ফটিকটি সরানোর পরই বিকট শব্দে কন্ট্রোল রুমের আধুনিক দরজাটি ভেঙে গেল। তিনজন লোক – কালো পোশাকে ঢাকা, হাতে টর্চ – তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের মুখ ঢাকা, কিন্তু তাদের চোখে ছিল তীব্র ঘৃণা। এরা অষ্টম চক্রের বর্তমান সদস্যরা।

“থামো! ওই জ্ঞানকে মুক্তি দিও না!” তাদের মধ্যে একজন চেঁচিয়ে উঠল।

মিতা শেষ স্ফটিকটি স্পর্শ করল। সমস্ত স্ফটিকের আলো এক হয়ে প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে অবস্থিত গোলকটিকে আঘাত করল। তীব্র ঝলকানিতে গোলকটি ফেটে গেল।

অষ্টম দরজার দিকে তাকাল অর্ণব। শত শত ফুট নিচে অবস্থিত সেই ভল্টের দরজাটি তখন বিকট ঘর্ষণের শব্দ করে খুলে যাচ্ছে। ভিতরে শুধু কালো, ঘূর্ণায়মান, নক্ষত্রহীন অন্ধকার। এই অন্ধকার যেন আলোর অভাব নয়, বরং আলোরই অনুপস্থিতি। এটাই ‘শূন্যের স্রোত’।

অর্ণব দ্রুত মিতাকে টেনে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের কিনারায় গেল। অষ্টম চক্রের লোকেরা তখন তাদের দিকে বন্দুক তাক করে এগিয়ে আসছে।

অর্ণব নিজেকে শূন্যে ভাসিয়ে দিলো। সে জানে না নিচে কী আছে, কিন্তু জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়। সে মিতাকে বলল, “আমরা শুধু নিচে ঝাঁপ দিতে পারি। সত্যের দিকে। প্রস্তুত?”

মিতা মাথা ঝাঁকাল। তাদের ঠিক পেছনে, কালো পোশাকের লোকেরা চিৎকার করতে লাগল।

অর্ণব মিতাকে নিয়ে গম্বুজের কিনার থেকে সেই অনন্ত, ঘূর্ণায়মান অন্ধকারের দিকে ঝাঁপ দিলো। নিচে, অষ্টম দরজা খুলে গেছে। যে নিষিদ্ধ সত্যটি ক্যাম্পাসের ভিত্তিভূমিকে ধরে রেখেছিল, তা উন্মোচিত হচ্ছে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Md Nurnobi islam sumon

Similar bengali story from Crime