আসির দশকের প্রেম
আসির দশকের প্রেম
29 /08 /2023
কলমে - কৃষ্ণ ব্যানার্জী
না ছিলো সেল ফোন , না ছিলো ফেসবুক , না ছিলো চ্যাটের সুবিধা কিন্তু প্রেম ছিলো ভারি মজার । আমরা চার বন্ধু প্রতিদিন বিকালে খেলা শেষ করে মাঠের পাশের একটা রকে কিছুটা সময় বসে থাকতাম । ঠিক 6 টার সময় পাড়ার কিছু মেয়ে পড়তে আসতো প্রদীপ মাস্টারের কোচিনে । ওদের মধ্যেই একজনের নাম ছিলো সপ্না । সপ্না স্বপ্নের মতোই সুন্দর ছিলো । বাবা সরকারি চাকুরে , সেই সময় 40 হাজার স্যালারি । দুই মেয়ে , কোনো কিছুর অভাব নেই । পোশাক আশাকে একদম আপসারা দেখতে লাগতো সপ্নাকে । আমাদের মধ্যে রণর বাবার বেশ টাকাকরি ছিলো তাই আমরা তিনজন স্বপ্নাকে বৌদি বৌদি বলে জ্বালাতাম , মজা করতে করতে একদিন রণ ভালোবেসে ফেলে স্বপ্নাকে , গল্প এখান থেকেই শুরু । প্রেমে পড়লো রণ মাথা খারাপ সকলের । স্বপ্না নামক বিড়ালের গলাতে এই প্রেমের ঘন্টা বাঁধবে কে ? কি ভাবেই বা তাকে বিষয়টা জানাবো আমরা । একমাত্র রাস্তা প্রেমপত্র , সে না হয় হবে কিন্তু পৌঁছাবে কে ? লিখেইবা দেবে কে ? এই দুটো বিষয় আসতেই আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম , কেন জানিনা ওদের তিন জোড়া চোখ একসাথে ধেয়ে এলো আমার দিকে , বুঝেনিলাম বিড়ালটা আমাকেই হতে হবে ।
পাড়াতে মানুষের পাশে থাকার সুবাধে মোটামুটি সকালেই আমার সাথে কথা বলতো । সেই সূত্রে ওদের গ্রূপের দু একটা মেয়ে আমাদের সাথে কথা বলতো তাই ঘন্টা আমাকেই বাঁধতে হবে । শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম কিন্তু চিঠিতে লেখা হবে কি ? ইতিপূর্বে প্রেমে কেউ পারিনি আমরা ।
রবিবার দুপুরের ভোজনের অয়োজন হলো রণ দের বাড়িতে , এগারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম রণদের বাড়িতে , পাক্কা 3 ঘন্টা কেটে গেলো , কাগজে একটাও দাগ টানতে পারলামনা আমরা । কি দিয়ে শুরু করবো কিছুই বুঝতে পারলামনা । এমন সময় কাকিমা নিছথেকে ডাক দিলেন খাবার রেডি । আগাগোড়াই খেতে আমি একটু বেশিই ভালোবাসতাম , লাফিয়ে নেমে পড়লাম বিছানা থেকে । রণ বলল কিরে চিঠিটার কি হবে ? আমি বললাম খালি পেটে অক্ষর গুলো কেমন জানো জড়িয়ে যাচ্ছে , আগে ইঞ্জিন একটু টেল দিয়ে আসি তারপড় কিছু একটা বুদ্ধি নিশ্চই আসবে ।
চিকেন কষা , ঘন মুসুরির ডাল , বেগুন ভাজা , পায়েস , চাটনি এবং শেষ পাতে মিষ্টি। পেতপুরে গেলার পড়, দেহটা কেমন জানো শুই শুই করছে কিন্তু শুতে ডিবেটা কে ? দুইঘন্টা কাসরত করে আবার কিছু একটা লেখা হলো । চিঠিটা অনেকটা সেপসাইট গোল দেবার মাতো । চিঠির বয়ানটা তোমাদের সাথে একটু শেয়ার না করলেই নয় ।
প্রিয়তমা …………….
আমি …….. কিছুদিন যাবত তোমাকে কিছু বলতে চাইছি কিন্তু বলতে পারিনি তাই পত্রে জানালাম । তুমি যখন আমার সামনেদিয়ে যাও , তোমার দেহ থেকে যে সেন্টের গন্ধ আমি পাই সেই গান্ধ আমাকে রাতভোর গুমাতে দেয়না । এতে আমার শরীরের কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে । তুমি যখন আমার সামনে দিয়ে চলে যাও তোমার চলন দেখে আমি সঙ্গা হারাতে বসি কিন্তু নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নেই । তোমার চোখগুলো কেমন জানো আমাকে গিলে খেতে জায় , যদিও আমি তোমার চোখে ডুবে মরতে রাজি রয়েছি । তোমার হাঁসিটা আমাকে কেমন জানো পাগোল কোরে দেয় । কেমন জানো মনেহয় আমি হাওয়াতে ভাসছি । কাল তোমাকে দেখার পড় নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে অবশেষে এই চিঠিটা লিখছি । একটা অনুরোধ রয়েছে , চিঠিটা যদি তোমার পছন্দ না হয় বা আমাকে পছন্দ না হয় তা হলে চিঠিটা ছিঁড়ে দিও আর যদি পছন্দ হয় তাহলে জানিও ………… ইতি পূর্বে কখনো কাউকে প্রেমপত্র লিখিনি যদি কোনো ভুল ত্রুটি থেকে থাকে একটু মানিয়ে নিও । আমি তোমার উত্তরের অপেক্ষাতে থাকবো ।
ইত্য-
তোমার …………………
চিঠি সম্পূর্ণ হলো , আবার পৌঁছে দিলেই কাজ শেষ কিন্তু কাকে বলবো চিঠিটা পৌঁছে দিতে । পরের দিন সন্ধ্যায় ওদের পড়া । সকালে রিমলির বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম আমি । কাকিমা আমাকে দেখতে পেয়েই বললেন রিমলি ভিতরের ঘড়ে আছে , তুই সকালে কিছু খেয়েছিস ? আমার মনের ভিতরটা তখন ধরফর করছে , চিঠির কথা শুনে রিমলির প্রতিক্রিয়া কি হবে ? আমি কাকিমাকে জানালাম খেয়েছি , ওর সাথে একটু দরকার আছে তাই আলাম । কাকিমা বললেন লুচি বানাচ্ছি । লুচিড় কথা শুনে নিজেকে সামলাতে পারলামনা বলেই ফেললাম দিও দুটো । কাকিমা বললেন তোরা কথাবল আমি লুচি ভেজে নিয়ে যাচ্ছি । আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ভিতরে গেলাম । খুব নরম করে দেখলাম রিমলি আছিস নাকি । ও আমার গলা চিনতে পেরে ভিতরে আসতে বলতেই আমি ভিতরে ঢুকেই ওকে বললাম আমাকে একটা উপকার করে দিতে হবে না করলে চলবেনা । রিমলি বলল আরে বাবা আগে বলবিতো কাজটা কি ? আমি চিঠি টা অর্দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম এটা একটু সন্ধাকে দিয়ে দিবি । রিমলি অবাক হয়ে আমাকে মেপে নিয়ে বলে এটা কি ? আমি একটু তুতলে বললাম পত্র , রিমলি বলে কি পত্র ? আবার তুতলে বললাম প্রেম পত্র।। এবার রিমলি আমাকে প্রদক্ষিণ করে সামনে আসে দাঁড়িয়ে বললো তোর সাহস যে মন্দ নয় , তুই ওকে ………… আমি কানে হাত দিয়ে বললাম এটা আমার নয় , রণ দিয়েছে প্লিজ দিয়ে দিস । রিমলি চিঠিটা একটা বইয়ের মধ্যে পুড়ে বললো আমি দিয়ে দেবো কিন্তু কোন ঝামেলা হলে হলে তোরা বুঝে নিস কেমন । আমি জানালাম আচ্ছা ঠিক আছে । কাকিমা লুচি তরকারি নিয়ে হাজির আমি পেট পুড়ে খেয়ে ফিরে এসে ওদের জানাতে আমাদের মধ্যে একটা খুশির ঝড় বয়ে গেলো । রণ আমাকে কোলে তুলে নিলো । আমি নামাতে বললাম , নিচে নামাতেই আমি জানালাম এত উচ্ছাসিত হবার কিছু নেই ও বলেছে ওটা দিয়ে দেবে কিন্তু কোনো ঝামেলা হলে জানো আমরা বুঝে নেই । আমাদের মধ্যে একজন বলল আরে নারে কিছু হবেনা মেয়েটাও রণ কে ঝাড়ি মারে । আমি বললাম মারলেই মঙ্গল ।
চিঠি দেবার পর সাতদিন কেটে গাল । কোনো জবাব নেই , আমি রিমলিকে জিজ্ঞাসা করলাম কিরে চিঠিটা দিয়েছিস তো । রিমলি বলল হা । আমি এবার জিজ্ঞাসা করলাম কিছু বলেছে ? রিমলি ঘর নেড়ে জানাল না । আমি এসে জানালাম । এর পর একমাস কেটে গিয়েছে , সামনে পুজো , আমরা সিনিয়রদের সাথে বেড়াতাম চাঁদা কাটতে । আমরা সেদিন স্বপ্নাদের বাড়িতে গিয়েছি , ও আমারদিকে এমন ভাবে তাকালো আমি ভাবলাম আজি হাটে হাঁড়ি ভেঙে না দেয় । না কিছু বলল না সে । প্রাণ হাটে নিয়ে ফিরলাম সেদিন । পঞ্চুমিতে স্যারের কাছে লাস্ট পড়া , আবার লক্ষ্মী পূজার পড়ে খুলবে কোচিন । অবশেষে জবাব এলো । এটা কোনো চিঠি লেখা হয়েছে একটা মেয়েকে কিভাবে লিখতে হয় সেটুকু জানেনা । আগামীকাল মণ্ডপে দেখা করবে কথা আছে ।
যাক জবাবতো একটা এসেছে কিন্তু মণ্ডপে কেন ? পুজোর দিন আবার মারটার খাওয়াবে নাতো । আমরা রণ কে জোর জুগিয়ে বললাম আরে ভয়ের কি আছে আমরাতো রয়েছি নাকি । যাইহোক পরের দিন ওরা দেখা করলো না কোনো ঝামেলা হয়নি । এখন ওরা ছুটিয়ে সংসার করছে । ওদের দুটো বাচ্চা রয়েছে । রণ ভালো চাকরি করে । ওরা বেশ সুখেই সংসার করছে । এখান আর আমাদের আড্ডাটা ডেলি হয়না । ঐ জায়গাটা নুতানরা দখল করেছে , ওরা যদিও আজকাল আমাদের মতন প্রেমপত্র লেখেনা ওদের প্রেম চলে সেল ফোনের স্কিনে । সময় পালটেছে প্রেম পালটেছে পালটেগিয়েছে অনেক কিছুই ।
সমাপ্ত

