সময়ের অযোগ্য
সময়ের অযোগ্য
সকাল সাতটা।
অ্যালার্ম বাজার আগেই আবিরের ঘুম ভেঙে যায়। যেন শরীরের ভেতরেই একটা ঘড়ি বসানো আছে। বিছানা ছাড়ার আগেই সে একবার দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকায়। সময় মিলিয়ে নেয় নিজের সঙ্গে।
আবির সময়ের মানুষ। খুঁতখুঁতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নিয়ম মেনে চলা—এসব তার কাছে অভ্যাস নয়, দায়িত্ব।
সাতটা থেকে আটটা—তার সকালের রুটিন। স্নান, ব্রাশ, জল ভরা, ঘর গুছানো। তারপর রান্না। আটটা থেকে নয়টা—রান্না শেষ, পোশাক পরা, কিছুটা খাওয়া, বাকিটা টিফিনে ভরা।
ঠিক সাড়ে নয়টায় সে বাইক স্টার্ট দেয়।
বাড়ি থেকে কিছুটা এগোলেই সে হর্ন বাজায় দু’বার।
“টমি! বুলেট! শিবা!”
আরও কয়েকটা নাম।
কোথা থেকে যেন দৌড়ে আসে পাঁচ-ছ’টা রাস্তার কুকুর। লেজ নাড়তে নাড়তে ঘিরে ধরে আবিরকে। ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে আবির তাদের খাওয়ায়। প্রতিদিন। কোনোদিন বাদ যায় না।
নিজের ঘর যেমন পরিষ্কার রাখে, তেমনি পাড়ার এই প্রাণীগুলোকেও সে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করে।
আবিরের অফিস যেতে হয় হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে। তাই সে সবসময় হাতে একটু বাড়তি সময় রাখে। কারণ সে জানে—এই শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা সময় নয়, সিভিক সেন্স।
হাওড়া ব্রিজ—১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে উদ্বোধন হওয়া ঐতিহাসিক স্থাপনা। কত মানুষ, কত গাড়ি, কত ইতিহাসের সাক্ষী সে।
কিন্তু আজ?
স্টিলের হ্যাঙ্গার বেস ৫০% দুর্বল হয়ে গেছে—সংবাদপত্রে পড়েছিল আবির। কোথাও কোথাও নাকি ফাটলও দেখা দিয়েছে।
আর হবেনা কেন?
যে হারে মানুষ গুটখা, সুপারি, পানের থুথু ছুড়ে মারে ব্রিজের গায়ে, তাতে লোহাও একদিন হার মেনে যায়।
সেদিনও সামনে একজন লোক থুথু ফেলতেই আবির চেঁচিয়ে উঠেছিল—
— “দাদা! ব্রিজটা কি আপনার বাপের নাকি? যেখানে পারছেন থুথু ফেলছেন কেন?”
ওপাশ থেকে উত্তর এসেছিল—
— “নিজের কাজে যান। বেশি জ্ঞান দিতে হবে না!”
আবির আর কথা বাড়ায়নি। শুধু মনে মনে ভেবেছিল—
“একদিন এই ভুলের মাশুল সবাইকে দিতে হবে… সময়ের অপেক্ষা।”
মানুষ বড় অদ্ভুত। শরীরে প্রাণ থাকতে সময়কে গুরুত্ব দেয় না। আর যখন প্রাণ থাকে না—তখন সময় থাকে না।
সেই সকালেই, শহরের আরেক প্রান্তে, আরেকটি ঘটনা ঘটছিল।
একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল। এক তরুণীকে জিজ্ঞেস করল—
— “দিদি, এখন কটা বাজে বলতে পারবেন? আমার ঘড়িটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।”
তরুণীর নাম মালিনী।
— “দশটা পঁয়তাল্লিশ।”
সময় শুনেই লোকটার মুখে অস্বস্তি। বিড়বিড় করে বলল—
“আজও দেরি হয়ে যাবে…”
সবুজ সিগন্যাল জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে সে রাস্তা পার হতে গেল।
ঠিক তখনই—
একটি গাড়ি দ্রুত এসে তাকে ধাক্কা মারল।
মালিনীর চোখের সামনে মানুষটা ছিটকে পড়ে গেল। মাথা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা সময় জানতে চাইছিল, তার সময় এভাবে থেমে যাবে—সে কল্পনাও করেনি।
মালিনীর বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছিল—
“ঘড়ি বন্ধ মানে সময় থেমে যাওয়া নয়…
মানে মানুষটা আর সময়ের যোগ্য নেই।”
সে সেদিন স্কুলে যায়নি। বাড়ি ফিরে গিয়েছিল।
আর সেই মুহূর্ত থেকেই, অদৃশ্যভাবে, সময় তার জীবনে ঢুকে পড়েছিল।
মালিনী একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। ছোট্ট পরিবার—বাবা, মা আর সে।
স্বভাব শান্ত, ভেতরে দৃঢ়, আর প্রাণীদের প্রতি অদ্ভুত এক মমতা।
মন খারাপ হলে সে বই পড়ে। আর খুব বেশি খারাপ হলে—বাড়ির গলির মুখে থাকা কুকুরগুলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অদ্ভুতভাবে তাতে তার মন হালকা হয়ে যায়।
কিন্তু সেই দিনটার পর থেকে তার ভেতরে একটা অস্বস্তি বাসা বাঁধল।
বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই মানুষটা—
“দিদি, এখন কটা বাজে?”
আর তার ভাঙা ঘড়ি।
দু’দিন কেটে গেল।
তৃতীয় দিন সে আবার স্কুলে গেল। দিনটা মোটামুটি ভালোই কাটছিল। স্কুল ছুটি হলো, বাসে করে ফিরল। বাসস্টপ থেকে বাড়ি পাঁচ মিনিট হাঁটা পথ।
সন্ধ্যা নামছে।
হঠাৎ দুটো বাইকে চারজন ছেলে তার পাশে ধীর গতিতে চলতে শুরু করল। টোনটিটকরি, অশ্লীল কথা।
মালিনী গা করল না। চারপাশে লোকজন আছে, ভরসা পাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর ছেলেগুলো দ্রুত চলে গেল।
মালিনী গলির মুখে পৌঁছতেই কুকুরগুলো দৌড়ে এলো। সে তাদের একটু আদর করে বাড়ি ঢুকে গেল।
পরের দিন সকালে টিভির খবর শুনে তার বুক হিম হয়ে গেল।
“গতকাল রাতে দুটো বাইকে চারজন যুবক মদ্যপ অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার। তিনজন মৃত। একজন বেঁচে গেছে। সে জানায়—দুর্ঘটনার সময় তার ঘড়ি কাজ করছিল না, মোবাইলও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
মালিনীর মাথার ভেতর যেন শব্দ উঠল।
একই কথা।
ঘড়ি বন্ধ।
সময় বন্ধ নয়…
কিন্তু কারও জন্য সময় শেষ।
তারপরের রবিবার, একটু মন হালকা করতে সে বেরিয়েছিল।
ঠিক সেই দিনই তার দেখা হবে আবিরের সঙ্গে—
যে মানুষটা সময়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়,
কিন্তু সেদিন তার নিজের ঘড়িটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
রবিবার।
আজ আবিরের অফিস নেই।
ছয় দিন ধরে একই রুটিন—ঘর থেকে অফিস, অফিস থেকে ঘর। জীবনটা যেন যন্ত্রের মতো হয়ে গেছে। তাই সে ঠিক করল আজ কোনো গন্তব্য থাকবে না। বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়বে, যেখানে মন চাইবে যাবে।
সকালটা অদ্ভুত রকম শান্ত।
একটি সিগন্যালে এসে সে দাঁড়াল। লাল বাতি। সামনে টাইমার—৯০ সেকেন্ড।
অভ্যাসবশত আবির হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল।
ঘড়ি বন্ধ।
সে বোতাম টিপল। ঝাঁকালো। কিছুই হলো না।
“নষ্ট হয়ে গেছে বোধহয়…” — ভেবে গুরুত্ব দিল না।
গাড়ি না আসতে দেখে যখন সে এগোতে যায়। হঠাৎ তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। চারপাশের শব্দ যেন দূরে সরে গেল। কানে শুধু নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজ।
সে অজান্তেই এক পা পিছিয়ে এলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
একটি গাড়ি ভয়ানক গতিতে সিগন্যাল ভেঙে তার সামনে দিয়ে চলে গেল।
আর এক সেকেন্ড দেরি হলে…
আবির থমকে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে।
মনে হলো কেউ যেন তাকে সতর্ক করে দিল।
“সময় সবাইকে মারে না…
কিছু মানুষকে সতর্ক করে।”
সিগন্যাল সবুজ হলো। আবির আর সামনে এগোল না। কাছেই একটি পার্কে ঢুকে পড়ল।
বাইক বাইরে রেখে ভিতরে হাঁটতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার হাত থেকে ঘড়িটা মাটিতে পড়ে গেল। সে খেয়ালই করেনি।
পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ—
— “শুনছেন! আপনার ঘড়িটা পড়ে গেছে!”
আবির শুনল না। নিজের ভাবনায় হাঁটছে।
মেয়েটি ঘড়ি তুলে দৌড়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল—
— “আপনাকে অনেকবার ডাকলাম… ঘড়িটা রাস্তায় পড়ে ছিল।”
আবির ঘুরে তাকাল।
প্রথমবার মালিনীকে দেখল।
মেয়েটির চোখে একধরনের স্থিরতা, কিন্তু ভেতরে যেন অজস্র প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
আবির ঘড়ির দিকে তাকাল।
কাঁচে হালকা ফাটল।
আর আশ্চর্য—
যে ঘড়ি কিছুক্ষণ আগে বন্ধ ছিল, সেটি আবার টিক টিক করে চলছে।
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— “ধন্যবাদ… আমি খেয়াল করিনি। আমি আবির।”
— “মালিনী।”
পার্কের বেঞ্চে বসে দু’জনের কথা শুরু হলো।
কে কি করে, পরিবার, জীবন, অভ্যাস—সাধারণ কথাবার্তা।
কখন যে বিকেল গড়িয়ে রাত হলো, কেউ খেয়াল করেনি।
মালিনী হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
— “দশটা বাজে! সময় কখন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না…”
আবির বলল—
— “আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই?”
— “না, বাসে চলে যাবো। অসুবিধা হবে না।”
বাসে তুলে দিয়ে আবির বাইক স্টার্ট করল।
বাসে যাত্রী খুব বেশি ছিল না। মালিনী জানালার পাশে বসে ছিল। দিনের অদ্ভুত ঘটনাগুলো মাথার ভেতর ঘুরছিল।
পেছনের সিটে বসে থাকা তিনজন লোক বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল। চোখে কুৎসিত ইঙ্গিত। গায়ে হালকা মদের গন্ধ।
মালিনী বুঝতে পারছিল, কিন্তু চুপ করে রইল।
তার স্টপেজ এলো। সে নেমে হাঁটা শুরু করল।
রাস্তা ফাঁকা। রাত বাড়ছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর সে টের পেল—কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
হাঁটার গতি বাড়াল।
পেছনের পদশব্দও বাড়ল।
তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হলো। প্রায় দৌড়তে শুরু করল সে। সামনে তার গলির মুখ। আর একটু গেলেই বাড়ি।
ঠিক তখনই—
পা হোঁচট খেল। সে পড়ে গেল।
পেছন থেকে লোকগুলো এসে তাকে ধরে ফেলল। একজন মুখ চেপে ধরল। আরেকজন হাত।
মালিনী চিৎকার করতে চাইলো, কিন্তু শব্দ বেরোল না। শুধু “উঁ… উঁ…” অসহায় শব্দ।
চারপাশ নিস্তব্ধ। কেউ নেই।
ঠিক সেই সময়—
দূর থেকে ছুটে আসার শব্দ।
গর্জন।
ঘেউ ঘেউ।
পাড়ার কুকুরগুলো।
তারা যেন মুহূর্তে হিংস্র হয়ে উঠল। লোকগুলো ভয় পেয়ে দৌড়াতে গেল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।
তারপর শুরু হলো আর্তনাদ।
কুকুরগুলো থামেনি।
যতক্ষণ না তাদের নিথর করে দিয়েছে।
মালিনী কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। সামনে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দেহগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে জল নেই। ভয় নেই। শুধু এক অদ্ভুত শূন্যতা।
মনে একটাই কথা ভাসছিল—
“মানুষ বিশ্বাসঘাতক হতে পারে… কুকুর নয়।”
সে বাড়ি ফিরে গেল। কাউকে কিছু বলল না।
সে জানত—এই কথা বললে সমস্যা বাড়বে, কমবে না।
দু’দিন সে ঘর থেকে বেরোয়নি।
রাতের সেই দৃশ্য বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
তৃতীয় দিন আবিরের ফোন এলো।
— “চলুন, একটু বাইরে যাই। আপনার মন ভালো হবে।”
মালিনী প্রথমে না করেছিল। পরে রাজি হলো।
খোলা আকাশ, রোদ, মানুষের ভিড়—ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক হতে লাগল।
কয়েকদিন পর আবার স্কুলে গেল।
কিন্তু গিয়ে দেখল, অনেক বাচ্চা আসেনি।
প্রধান শিক্ষক জানালেন—একদিন ধরে অনেক ছাত্র অসুস্থ। ছুটি নিয়েছে।
মালিনীর মনে কৌতূহল জাগল। সে ঠিক করল, নিজে গিয়ে খোঁজ নেবে।
পরের দিন আবিরকে সঙ্গে নিয়ে সে পৌঁছল বস্তি এলাকায়।
পাশ দিয়ে একটি নালা বয়ে গেছে। বছরের পর বছর আবর্জনা ফেলা হয়েছে সেখানে। পচা জল, ভয়ানক দুর্গন্ধ।
মালিনীর আর বুঝতে বাকি নেই সেই পচা জল থেকেই বহু রোগ ছড়িয়েছে
বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা জানতে পারল—শুধু বাচ্চা নয়, বহু মানুষ অসুস্থ। কেউ হাসপাতালে ভর্তি।
আর একটা জিনিস দেখে মালিনীর বুক কেঁপে উঠল।
অনেক বাড়ির দেয়ালে টাঙানো ঘড়ি বন্ধ।
একদিন আগে থেকে।
সে আবিরের দিকে তাকাল।
আবিরও তার দিকে।
কোনো কথা না বলেও তারা বুঝে গেল—
এগুলো আর কাকতালীয় নয়।
বস্তি এলাকা থেকে ফেরার পথে দু’জনেই অস্বাভাবিক চুপ ছিল।
মালিনীর মাথার ভেতর যেন সব ঘটনাগুলো এক সুতোয় গাঁথা হতে শুরু করেছে—
দুর্ঘটনার আগে লোকটার ঘড়ি বন্ধ
বাইকওয়ালা ছেলেগুলোর ঘড়ি ও মোবাইল বন্ধ
অসুস্থ বাচ্চাদের বাড়িতে বন্ধ ঘড়ি
এগুলো কি শুধুই কাকতালীয়?
নাকি সময় সত্যিই কাউকে বাদ দিতে শুরু করেছে?
মালিনী সব খুলে বলল আবিরকে। আবিরও বলল নিজের অভিজ্ঞতা।
দু’দিন তারা শুধু এই নিয়েই ভাবল।
এই দু’দিনে শহরে আরও কয়েকটা অদ্ভুত মৃত্যু হলো— ট্র্যাফিক নিয়ম না মানা, অতিরিক্ত গতি, নোংরা পরিবেশ থেকে রোগ।
প্রতিটি ঘটনার আগেই—ঘড়ি বন্ধ।
তারা কয়েকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না।
— “মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” — “গল্প বানাচ্ছেন নাকি?”
মানুষ হাসল।
রবিবার।
তারা ঠিক করল, চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
সেদিন তারা বাইক না নিয়ে বাসে উঠল।
বাস হাওড়া ব্রিজে এসে জ্যামে আটকে গেল।
মালিনী জানালা দিয়ে দেখল—একজন লোক গুটকার থুথু ছুড়ে মারছে ব্রিজের গায়ে।
সে বাধা দিল।
লোকটা পাত্তাই দিল না।
কিছুক্ষণ পর বাসের ভেতর থেকেই কয়েকজন বলতে লাগল—
— “আরে আমার ঘড়ি কাজ করছে না!” — “মোবাইলও বন্ধ হয়ে গেছে!”
মালিনীর পাশের লোকটা—যে একটু আগে থুথু ফেলেছিল—তারও একই অবস্থা।
মালিনীর বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে আবিরের হাত চেপে ধরল।
— “আবির… সময় হয়ে গেছে।”
তারা চিৎকার করে বলতে লাগল—
— “এখান থেকে নেমে যান! দৌড়ান! এখনই!”
কেউ শুনল না।
হঠাৎ বাইরে বিশাল শব্দ।
মানুষ দৌড়াতে শুরু করল।
মালিনী আর আবির বাস থেকে নেমে দেখল—
ব্রিজটা মাঝখান থেকে ভাঙতে শুরু করেছে।
লোহার গার্ডার ছিঁড়ে যাচ্ছে। গাড়ি নিচে পড়ে যাচ্ছে। চিৎকার, আর্তনাদ, ধোঁয়া, ধুলোর ঝড়।
পুরো দৃশ্যটা যেন মৃত্যুর মেলা।
“ব্রিজ এক দিনে ভাঙে না… ছোট ছোট অবহেলা একদিন বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।”
অনেক মানুষ মারা গেল।
অনেক আহত।
অ্যাম্বুলেন্স আসতে লাগল একের পর এক।
মালিনী গুরুতর আঘাত পেল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।
এক সপ্তাহ কেটে গেল।
আবির প্রতিদিন তাকে দেখতে আসত।
মালিনী ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছিল।
ছুটি পাওয়ার দিন আবির তাকে আনতে এল।
হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে আবির হঠাৎ দেখল—চারপাশে আবর্জনা, নোংরা, পচা গন্ধ।
তার বুক ধক করে উঠল।
সে দৌড়ে গিয়ে মালিনীকে বলল।
দু’জনেই বুঝে গেল—
এবার এখানে কিছু ঘটতে চলেছে।
তারা থানায় গেল। পুলিশকে বলল হাসপাতাল খালি করতে।
পুলিশ হাসল।
— “কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে এত ভয় পাবেন না।”
দু’তিন দিন চেষ্টা করেও কিছু হলো না।
ঠিক তখনই—
মালিনীর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ভর্তি করা হলো সেই হাসপাতালেই।
হাসপাতালের করিডোরে জীবাণুনাশকের গন্ধের সঙ্গে মিশে ছিল পচা আবর্জনার গন্ধ। বাইরে ডাস্টবিন উপচে পড়ছে। নর্দমা আটকে কালো জল থমকে আছে।
মালিনী বাবার শয্যার পাশে বসে ছিল। আবিরও এসেছে।
ডাক্তার বললেন— — “আর একদিন দেখলেই ছেড়ে দিতে পারব।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ মালিনীর চোখ চলে গেল হাসপাতালের বাইরে টাঙানো বড় ঘড়িটার দিকে।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে।
তার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
— “চলো বাবা। এখনই বেরোতে হবে।”
আবির অবাক— — “কি হয়েছে?”
— “সময় থেমে গেছে…”
সে করিডোরে চিৎকার করতে লাগল—
— “যদি বাঁচতে চান, এখনই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান! দৌড়ান!”
কেউ গুরুত্ব দিল না। কেউ হাসল।
ঠিক তখনই—
ভিতরের কোনো একটি ঘর থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ।
মাটি কেঁপে উঠল। আলো নিভে গেল। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল।
তারপর একের পর এক বিস্ফোরণ।
ছাদ ভাঙতে শুরু করল।
চিৎকার, আর্তনাদ, দৌড়াদৌড়ি।
আবির মালিনীর হাত ধরে টেনে বের করতে লাগল।
কয়েকজন ডাক্তার, নার্স, দু’একজন রোগী—হাতে গোনা মানুষ বেরোতে পারল।
কিন্তু মালিনীর বাবা…
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেলেন।
মালিনীর হাতে বাবার দেওয়া ঘড়ি।
টিক… টিক… টিক…
ঘড়ি চলছে।
সময় চলছে।
কিন্তু তার বাবার সময় থেমে গেছে।
পরে তদন্তে জানা গেল—
হাসপাতালের পিছনে বছরের পর বছর আবর্জনা জমে ছিল। সেখানে শত শত ইঁদুর বাসা বেঁধেছিল। বছরের পর বছর সেখানে গর্ত করে যাচ্ছিলো । বিল্ডিংয়ের পাইপ বেয়ে রুমে ঢুকে তারা বৈদ্যুতিক তার কেটে দেয়। শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। অক্সিজেন সিলিন্ডার, মেশিন—সব মিলিয়ে বিস্ফোরণ।
অবহেলা।
শুধু অবহেলা।
এই ঘটনার পর শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
মানুষ হঠাৎ নিয়ম মানতে শুরু করল।
ট্র্যাফিক সিগন্যাল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, থুথু ফেলা—সবকিছুতে সতর্কতা।
কারণ মানুষ এখন ভয় পায়।
যখনই নিয়ম ভাঙার কথা ভাবে—
নিজের ঘড়ির দিকে তাকায়।
সময় কাউকে শাস্তি দেয় না।
সময় শুধু সতর্ক করে।
যারা সতর্কবার্তা বোঝে না— তাদের জন্য সময় থেমে যায়।
আর যারা বোঝে—
তাদের হাতে ঘড়ি টিক টিক করে বেঁচে থাকে।
